ছোট্ট পাখি কোয়েল স্বপ্নচুড়ায় পৌছে গেলো ইয়াসমিন তোফাজ্জল
ড. বায়েজিদ মোড়ল

চারিদিকে পাহাড় বেষ্ঠিত বান্দরবান জেলার নিউ গুলশান এলাকার ইয়াসমিন তোফাজ্জল। ইয়াসমিন ছোট বেলা থেকে স্বপ্ন দেখতো। স্বপ্ন দেখতো একটি সুন্দর ও সুখের পরিবার। যে পরিবারে তার প্রিয় মানুষটির সাথে সুখ দুঃখ ভাগাভাগি করে খুব নিবিড়ভাবে মিলেমিশে থাকবে স্বামী-স্ত্রী দুজন। সে নিজ পরিবার ও আশপাশের পরিবারে দেকতো স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া বিবাদ এমনকি মারা মারি সংসার নষ্ট হয়ে যাওয়া এমন সব ঘটনা। ইয়াসমিনের একটাই স্বপ্ন সে ভালোবেসে বিয়ে করবে এবং তাদের পরিবারে কখনোই এই ভালোবাসার মাঝে কোন ঘাটতি বা ফাটল ধরতে দিবে না। যে ভাবনা সেই কাজ। ইয়াসমিন আক্তারের মনের মতো করে ছাত্র বয়সেই ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দেয় একই এলাকার তার বাবার বন্ধু আবুল কালাম হোসেন সাহেবের বড় ছেলে তোফাজ্জল হোসেন। ইয়াসমিন নবম শ্রেণীতে আর তোফাজ্জল তখন এসএসসি পাশ করে কলেজ গোয়িং ষ্টুডেন্ট। দুজনের মাঝে ভাব ভালোবাসার কথা একে একে জেনে যায় দুই পরিবার। পাহাড়ে মুসলমান এমনিতে কম তার উপর ভাব ভালোবাসা হওয়া ছেলে মেয়ে। দুই পরিবারের কেহই ভালো ভাবে নেয়নি প্রথম দিকে। ছাত্র বয়সে প্রেম ভালোবাসা আবার বয়সওতো কম এতো কম বয়সে বিয়ে হলে সংসার হলে তারা সংসার চালাবে কি করে? নানাবিদ প্রশ্নের সমুখিন হতে হলো দুজনার। তাদের ভালোবাসার মাঝে প্রচন্ড বাধা আসে। ২০০২ সালে তোফাজ্জল এইচএসসি পাস করে। তাদের ভালোবাসার জয় করতেই হবে এটা ভেবে তোফাজ্জল চাকরির চেষ্টা করতে থাকে কপাল ভালো কিছুদিনে মধ্যে বান্দরবান সদর হাসপাতালে ব্রাদার হিসেবে তোফাজ্জলের চাকরি হয়ে যায়। এখন তোফাজ্জলকে বাধা দিবে কে বিয়ের ব্যাপারে তাই তারা পরিবারের কয়েকজনের সম্মতি নিয়ে বিয়ে করে ফেলে পরে পরিবারের সবাই তাদের মেনে নেয়। তোফাজ্জলের পিতা প্রথমে মেনে না নিলেও ছেলের কথা ভেবে মেনে নেয়। তোফাজ্জলরা ৫ ভাই যৌথ পরিবারে চলছিলো দিন। এর কিছু দিন পর একে একে তোফাজ্জলের আরো দুই ভাই বিয়ে করে। বিয়ের পর ভাইয়ে ভাইয়ে মিল থাকলেও বউদের কারণে তোফাজ্জলের যৌথ পরিবার ভেঙ্গে তিনটি পরিবার হয়ে গেল তিন ভাইর। ছোট দুইভাই ও বাবা মা নিয়ে তাদের পরিবার এর মাঝে তাদের ঘরে আলোকিত করতে জন্ম নিল এক ছেলে। তার দুবছর পর আরো এক মেয়ে তোফাজ্জলের যা আয় তা দিয়ে ৭-৮ জনের সংসার চলেনা। সরকারী চাকরি বেতন খুব কম তা দিয়ে এই পাহাড়ী অঞ্চলে সংসার চালানো খুব কষ্ট। শুরু হলো তখন নতুন করে সংসার সংগ্রাম।

সংসার সংগ্রামে জয়ী মানুষদের উপর আমার লেখা কলাম স্বপ্ন যখন সত্যি। কিভাবে ইয়াসমিন আক্তার আর তোফাজ্জল হোসেন তাদের সংসারের অভাব অনটন দুর করে স্বচ্চল জীবন যাপন করবে? কিভাবে কি করবে? সারাক্ষন ভাবতে থাকে তোফাজ্জল। তখন ইয়াসমিন তোফাজ্জলকে বলে সে ঘরে বসেই কিছু একটা করবে। তখন কি করবে এই পাহাড়ে? তারা এ দিক সে দিক বিভিন্ন জায়গায় খুজতে লাগলো কিছু একটা করা যায় কিনা। চাষের জমি নেই। তারা এই অঞ্চেলর আদি অধিবাসী নয় বলে চাষের জমি নেই। তারা বাবা নোয়াখালী থেকে আর শ্বশুর ব্রাহ্মনবাড়ীয়া থেকে মাইগ্রেট হয়ে এসেছে এখানে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর। তার বাবা একজন ক্ষুদ্র মৎস্য ব্যবসায়ী ছিলো তাই শহরের ভিতর বসতভিটা আর টিনসেড বাড়ী ছাড়া আর কিছুই করতে পারিনি। তবে ৫ ভাইকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন।

ইয়াসমিন টেলিভিশনে কোয়েল পাখির উপর প্রতিবেদন দেখে স্বামী তোফাজ্জলকে বলে সে বাসায় বসে কোয়েল পাখি পালন করবে। প্রথমে তোফাজ্জল রাজী হয়না। এই কোয়েল পাখি পালন করে কি হবে? মুরগীর ফার্ম করবে ভেবে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা বিভিন্নভাবে সংগ্রহ করে একটি সেড করে ব্রয়লার মুরগী পালন শুরু করলো। প্রথমবার ভালো হলেও পরের বার রোগে অনেক মুরগী মারা গেল। তখন ঐ খামারে কিছুদিন আর মুরগী তুলতে পারবেনা। সেই সুযোগে আবার ইয়াসমিন জিদ ধরলো যে সে কোয়েল পালন করবে। তখন তেমন অর্থ আবার তাদের নেই। ইয়াসমিন পিড়াপিড়ি শুরু করে দিলো যে সে কোয়েল পাখি পালন করবেই। তার বিশ্বাস সে সারাদিন কোয়েল পাখির যতœ নিবে আর যতœ নিলে কোয়েল পাখি তার কথা শুনবে। সে কোয়েল পালন করে ভালো করবে। যতœ নিয়ে কোন কিছু করলে তা বিফলে যায় না।

বান্দরবানে কোয়েল বিষয় কোন টেনিং সেন্টার কিংবা কোন খামার নেই। যোগাযোগ করলো চট্টগ্রাম। চট্টগ্রামের যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে এসে ইয়াসমিন ৭ দিনের টেনিং নেয়। তারপর লোহগড়ায় গিয়ে একটি খামারে ৩ দিন প্রাকটিক্যাল ট্রেনিং নেয়। এই ১০ দিনের ট্রেনিং শেষে ৩০০ পাখি নিয়ে ঐ সেডে কোয়েল পালন শুরু করে ইয়াসমিন ২০১১ সালে। তখন পাখিগুলো বয়স ছিলো ১৬ দিন। পাখিগুলোকে নিবিড় যতœ করে লালন পালন করতে থাকে ইয়াসমিন। আশপাশের মানুষ আসে কোয়েল পাখি দেখে একেক জন একেক রকম মন্তব্য করে কেহ উৎসাহ দেয় আবার কেহ পাগলের কাজ বলে তুচ্চ তাচ্ছিল্ল করে কথা বলে। দুই মাস পরে কোয়েল ডিম পাড়া শুরু করে। তিনশো কোয়েলের মধ্যে ওরা আবার ৪ঃ১ ফিমেলঃমেল পাখি রেখেছিল। প্রতিদিন দুইশোটি ডিম আসতে লাগলো। প্রথমে আশ পাশের মানুষ বিশেষ করে স্কুলে পড়া ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষক ও চাকরিজীবি যারা আছে তারা এই কোয়েলের ডিম কিনতো। প্রথমে তারা দুইটা তারপর তিন টাকা এর পরে এসে ৫টাকা দরেও কোয়েলের ডিম বিক্রি করেছেন। চাহিদা অনুযায়ী যোগান না থাকায় দাম বেশি হয়ে যায়। তারপর তারা আরো এক হাজার বাচ্চা নিয়ে আসে চট্টগ্রাম থেকে তখন খামার থেকে প্রতিদিন প্রায় ৭ থেকে ৮ শো ডিম আসতে লাগলো তার দেখা দেখি ানেকে খামার করতে আগ্রহী হলো। তখন নারায়নগঞ্জ থেকে একটি ডবলচেম্বার হ্যাচিং মেশনি নিয়ে তিনি বাচ্চা ফোটাচ্ছেন। বান্দরবানে তার কাছ থেকে বাচ্চা নিয়ে এখন ছোট ছোট ২০-২৫টি কোয়েলের খামার গড়ে উঠেছে।

তোফাজ্জল সকাল বেলা খামারে গিয়ে দেখাশুনা করে চলে যায় হাসপাতালে আর খামারে আসতে পারেনা। হাসপাতাল থেকে ফিরে রাতে তবে তার মনটা পড়ে থাকে কোয়েলের খামারে। আর ইয়াসমিন সকালে বাচ্চাদের স্কুলে পাঠিয়ে চলে যায় খামারে সেখান থেকে একটু বেরিয়ে বাচ্চাদের স্কুল থেকে বাসায় এনে রেখে আবার চলে আসে খামারে। যুব উন্নয়ন থেকে প্রশিক্ষনের সময় তারা রোগ ব্যাধি হলে কি করতে হবে আবার কি করলে রোগ ব্যাধি কামারে আসতে পারেনা সে ব্যাপারে তার ভালো জ্ঞান আছে।কখন কোয়েলকে পানি খেতে দিতে হবে কখন ঘরে বাতি জ্বালাতে হবে কখন গরের বাতি নিভিয়ে কোয়েলকে ঘুমাতে দিতে হবে। কখন খাবার দিতে হবে কখন পানি দিতে হবে কি পরিমান খাবার খেলে কি পরিমান পানি খেতে দিতে হবে। কখন কোন ধরনের ভ্যাকসিন দিতে হবে। কখন কোয়েল ডিম দেয়? ডিম দেবার কিছুক্ষন পর ডিম কালেক্ট করে ফেলতে হবে। খামারের ভিতর কোন মানুষ প্রবেশ করলে পাখিরা উড়া শুরু করে এতে পাখির ডিম দেবার পরিমান কমে যায় সেটা মাথায় রাখে ইয়াসমিন। খামারের প্রতিটি কোয়েল যেন ইয়াসমিনের কাছে তাদের সন্তান তুল্য। ইয়াসমিন তার দু সন্তানকে যতটুকু সময় দেয় তার চেয়ে অনেক বেশি সময় ও আদর যতœ করে এই খামারের কোয়েলদের। তার খামারে তিনটি জাতের কোয়েল আছে জাপানিজ, কোরিয়ান ও ইন্ডিয়ান।

ইয়াসমিন বলেন কোয়েল পাখি পালন করতে হলে এ বিষয়ে অভিজ্ঞ কারো কাছ থেকে কোয়েল পাখি পালনের বিস্তারিত জেনে নিতে হবে। এছাড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার সাথে সার্বক্ষনিক যোগাযোগ রাখতে হবে। তোফাজ্জল সরকারী হাসাপাতালে চাকরি করায় রোগ ব্যাধি হলে মানুষের মতো তাদের চিকিৎসা করেছে তাতেই তাদের রোগ নিরাময় হয়েছে তাছাড়া কোয়েল পাখির তুলনামূলক রোগ ব্যাধি একটু কম। বর্তমানে তাদের খামারে প্রায় ৬ হাজার বিভিন্ন বয়সের কোয়েল আছে তাদের হ্যাচারি থেকে প্রতিমাসে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার বাচ্চা উৎপাদন হয় বান্দরবানে বিক্রির পাশাপাশী তিনি চট্টগ্রামের পটিয়া, লোহগড়া, চন্দনাইশ ও চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে পাইকার কাষ্টমার আছে। তবে প্রথমে তাদের বেশ সমস্যা হয়েছিল বাজারজাতকরণে কিন্তু এখন চাহিদা আছে তবে তারা একটু ধীর গতিতে আগাতে চায়। দ্রæত আগালে দ্রæগ পড়ে যাবার সম্ভাবনা আছে। খামারে সার্বক্ষনিক দেখাশুনার জন্য ইয়াসমিনের পাশাপাশী দুইজন কর্মচারি আছে। প্রতিমাসে খামারে প্রায় দেড় থেকে দুই লক্ষ টাকা খরচ আছে। সব কিছু বাদ দিয়ে প্রতিমাসে তাদের ত্রিশ হাজার টাকার উপরে এখন লাভ থাকছে।

তাদের খামারের ভিতরে সাধারন মানুষ পশুপাখি সব কিছু প্রবেশ নিষেধ তবে কিছু সরকারী বেসরকারী ও সেলিব্রেটি ভিআইপি ভিজিটর আসে যারা এই খামারটি দেখার জন্য যায়।সর্বপ্রথম জাপানী বিজ্ঞানীরা কোয়েলকে গৃহপালিত পাখি হিসেবে পোষ মানানোর উপায় উদ্ভন করেছেন্ পরবর্তিতে পৃথিবীর অন্যান্য দেশ কোয়েলকে একটি লাভজন্ম পোল্ট্রি উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করেছে। পুরুষের চেয়ে কোয়েল খামার নারীদের জন্য বেশ ভালো আর ইয়াসমিন নারী বলেই সফলতা পেয়েছে। কোন কোয়েল অসুস্থ হলে বা কোন খারাপ আচারন করলে ইয়াসমিনের খাওয়া দাওয়া ঘুম বন্ধ হয়ে যেত সারাক্ষন কোয়েলের পাশে বসে থাকে। কোন অসুস্থ্য কোয়েল মারা গেলে ইয়াসমিন কেঁদেছে অনেকবার। সে মনে করে তার ভলের বা ত্রæটির কারনে পাখিটি মারা গেছে। তারা এখন যে জায়গাটায় খামার স্থাপন করেছে সেই জায়গাটা ১৫ বছরের জন্য লিজ নিয়া। সামেন জমি কিনে আরো বড় আকারে কোয়েলের হ্যাচারির পাশাপাশী সোনালী জাতের মুরগীরও হ্যাচারী গড়ে তোলার প্লান আছে ইয়াসমিন তোফাজ্জলের।

























