জুম চাষ (Jhum) বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চলে সর্বাধিক প্রচলিত চাষাবাদ পদ্ধতি। এর প্রকৃত অর্থ হলো স্থান পরিবর্তনের মাধ্যমে চাষাবাদ করা। মূলত পাহাড়ের জঙ্গল পরিষ্কার করে চাষাবাদ করাই হলো জুম। এক্ষেত্রে সাধারণত পাহাড়ের গায়ে কিছু স্থানে চাষ করার পর কয়েক বছর সেই স্থানের উর্বরতা বৃদ্ধির জন্য রেখে দিয়ে আবার পাহাড়ের অন্য স্থানে গিয়ে চাষ করা হয়।জুম চাষিদের জুমিয়া বলা হয়।

জুম চাষ পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন। বর্তমানে প্রতিবছর প্রায় ২০ হাজার হেক্টর ভূমি এই পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা হয়। এই চাষ ভারতে পোড়ু, বীরা, পোনম প্রভৃতি নামেও পরিচিত।চাকমা ও মারমা সমাজের মানুষের মাঝে জুম চাষ বেশ জনপ্রিয়।
জুম চাষের ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের পুরনো। পার্বত্য চট্টগ্রাম, গারো ও খাসিয়া পাহাড়ের বাইরে ভারতের অরুণাচল, আসাম, মেঘালয়, মণিপুর, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড ও ত্রিপুরা—‘সেভেন সিস্টার্স’ খ্যাত এই সাতটি রাজ্যে জুম চাষ ব্যাপকভাবে প্রচলিত। এ ছাড়া চীন, নেপাল, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর পাহাড়ি অঞ্চলে জুম চাষের প্রাচীন ঐতিহ্য রয়েছে।

আমাদের দেশে পৌষ-মাঘ মাসে সুবিধাজনক সময়ে জুম চাষের জন্য একটুকরা জঙ্গল নির্বাচন করা হয়। তারপর সেই জঙ্গলের সব গাছ, বাঁশ, ঝাড়-জঙ্গল কেটে ফেলা হয়। কাটার পর সেগুলো রোদে শুকানো হয় চৈত্র মাস পর্যন্ত। সাধারণত চৈত্র ও বৈশাখের শুরুতে এতে আগুন জ্বেলে দেওয়া হয়। তাতে শুকিয়ে যাওয়া গাছপালা পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ওপরের ১-২ ইঞ্চি মাটিও পুড়ে যায়। ছাই ও পোড়ামাটির জন্য জমি উর্বর হয়। এরপর দু-এক পশলা বৃষ্টি হলে জমি ভিজে নরম হয়। তারপর বীজ বোনার কাজ শুরু হয়।
চৈত্রসংক্রান্তি ও নববর্ষের অনুষ্ঠানের পর সাধারণত জমিতে ফসল বোনার উৎসব শুরু হয়। এ সময় পরিবারের সবাই মিলে বীজ বোনার কাজ শুরু করে। সাধারণভাবে জন্মানো প্রধান ফসলের মধ্যে রয়েছে ধান, ভুট্টা, কাউন, তিল, শসা, মিষ্টিকুমড়া, তরমুজ, বরবটি, তুলা, কলা, আদা, হলুদ প্রভৃতি। বীজ বপনের জন্য ‘দা’ নামে সাধারণভাবে পরিচিত একটি প্রশস্ত ব্লেডের ছুরি ব্যবহৃত হয়। বাঁ হাতে দায়ের মাথা দিয়ে মাটি ফাঁক করে তাতে একত্রে মেশানো বীজ পরিমাণমতো ডান হাত দিয়ে ঢেলে দেওয়া হয়। তারপর দা তুলে নিলে মাটিতে আপনাআপনি বীজগুলো ঢেকে যায়।
























