agriculturenews24.com//গবাদিপশুর বাসগৃহ ব্যবস্থাপনা।।
গবাদিপশুর বাসগৃহ ব্যবস্থাপনা
গবাদি প্রাণির বাসগৃহ ব্যবস্থাপনা,
গবাদিপশুর বাসগৃহের স্থান নির্বাচন,
গবাদিপশুর বাসগৃহের শ্রেণিবিন্যাস
বাঁধা ঘর পদ্ধতি
এক সারি বিশিষ্ট গোশালা
দ্বিসারি বিশিষ্ট গোশালা।
গবাদি প্রাণির বাসগৃহ ব্যবস্থাপনা (Housing of cattle)
বিভিন্ন প্রকার প্রাকৃতিক দূযোর্গ, বন্যপ্রাণী, চোর প্রভৃতি থেখে খামারের গবাদিপশুকে রক্ষা করার জন্য এবং উন্নত আরামদায়ক অবস্থা ও উন্নত ব্যবস্থাপনা প্রদানের জন্য আশ্রয় স্থলকে গবাদিপ্রাণির বাসগৃহ (Housing of cattle) বলা হয়। গবাদি- প্রাণির বাসগৃহ আরও যে সেকল কারণে আবশ্যক তা হলো-
১) প্রতিকূল আবহাওয়া, ঝড়, বৃষ্টি, অত্যাধিক রোদের গরম ও ঠান্ডায় আশ্রয়দান;
২) হিংস্র ও বন্য মাংসাশী জন্তুর কবল থেকে রক্ষা করা;
৩) প্রাণিকে আরামে ও স্বাস্থকর পরিবেশে লালন পালনের সুবিধা;
৪) সুষ্ঠু চিকিৎসার সুবিধা ও সংক্রমক বোগব্যাধি থেকে পশুকে রক্ষা করা;
৫) প্রাণিকে শান্ত, ধীরস্থির ও অনুগত করার সুবিধা এবং সহজেই পর্যবেক্ষণ ও চিহ্নিতকরণের সুবিধা;
৬) রাত্রে প্রাণিকে আশ্রয়দান করা ও চোরের হাত থেকে রক্ষা করা;
৭) রোগাক্রান্ত প্রাণির রোগ নির্ণয় এবং নিয়মিত গর্ভধারণ ও প্রসবের উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণে সুবিধা এবং
৮) গাভীকে দুধ দোহনে সুবিধা সৃষ্টি এবং আধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে ও জীবানুমুক্ত উপায়ে দুধ দোহন।
গবাদি প্রাণির বাসগৃহের স্থান নির্বাচন
দুগ্ধ খামার স্থাপনের জন্য প্রথম ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল খামারের জন্য উপযুক্ত স্থান নির্বাচন গবাদিপ্রাণি এবং হাঁস মুরগির খামারের উপযুক্ত স্থান নির্বাচনের জন্য বিবেচ্য বিষয়গুলো হলো :-
স্থানটি শুকানো, উঁচু ও সমতল হবে যেখানে বৃষ্টির পানি জমবে না এবং সহজেই বর্জ্য পদার্থ সমূহ নিষ্কাশন করা যাবে।
যে স্থানে খামার করা হবে সেখানকার মাটি বালু ও কাঁকর মিশ্রিত হতে হবে এবং মাটির পানি শোষণ ক্ষমতা থাকতে হবে।
যেখানে খামার করা হবে সেখানে বিদ্যুৎ ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ সুব্যবস্থা করতে হবে।
খামারে উৎপাদিত দ্রব্যাদি বাজারজাত এবং প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রয়ের জন্য উপযুক্ত যাতায়াত ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
দুগ্ধ খামার অবশ্যই জনবসতি ও জনবহুল রাস্তা থেকে দূরে হতে হবে। ঘাস চাষের জন্য প্রয়াজনীয় জমি থাকা উচিত।
খামারের স্থাপনের জন্য নির্বাচন স্থলের মূল্য তুলনামূলকভাবে কম কিনা সেটাও বিবেচনা করতে হবে।
বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের সুব্যবস্থা থাকতে হবে এবং সহজে ও স্বল্পমূল্যে শ্রমিক পাওয়ার সুযোগ থাকতে হবে।
গবাদি প্রাণির বাসগৃহের শ্রেণিবিন্যাস
গবাদি প্রাণির বাসগৃহ প্রধানত আবহাওয়া, ভৌগলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক ও অন্যান্য অবস্থার উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়। তাই বিভিন্ন অঞ্চল বা দেশের গবাদিপ্রাণির বাসগৃহ বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। আমাদের দেশের উপযোগী প্রধানত দু’ধরনের প্রাণিগৃহ (types of animal housing) নির্মাণ করা যায় যথা- (১) উদাম ঘর পদ্ধতি এবং (২) বাঁধা ঘর পদ্ধতি।
১) উদাম পদ্ধতি (Loose housing system)
এ পদ্ধতিতে বাচ্চা প্রসব ও দুধ দোহার সময় ছাড়াও দিন ও রাত্রিতে গবাদিপ্রাণিকে দেয়াল বেষ্টিতে খোলা জায়গায় (paddock) পালন করা হয়। তবে প্রতিকূল আবহাওয়া যেমন:- ঝড়, বৃষ্টি, গরম, ঠান্ডা ইত্যাদি সময় প্রাণির নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য খোলা স্থানের সংগলœ ঘর সংযুক্ত থাকে। এ ধরণের বাসগৃহে একটি খাদ্য পাত্র ও পানি পাত্র সকল প্রাণির জন্য উন্মুক্ত থাকে। বয়স্ক বাছুর ও দুধ দিচ্ছেনা এমন গাভীর জন্য উদাম ঘর পদ্ধতি সুবিধাজনক। একটি গাভীর জন্য ৩.৫ বর্গমিটার আবৃত স্থান এবং ৯.০ বর্গমিটার আয়তনের মেঝের প্রয়োজন।
২) বাঁধা ঘর পদ্ধতি (Stanchion row system)
এই পদ্ধতির গোশালাকে প্রচলিত গোশালা (পড়হাবহঃরড়হধষ নধৎহ) বলা হয়। এই পদ্ধতিতে গরুর গলায় দড়ি বা লোহার জিঞ্জির দিয়ে সীমাবদ্ধ স্থানে বেঁধে রাখা হয়। একই স্থানে গাভীর দুধ দোহন ও খাওয়ানো সম্পূর্ণ হয়। বাঁধা ঘর পদ্ধতির গোশালায় গবাদি প্রাণি সব সময় বাঁধা অবস্থায় রাখা হয়।সেজন্য গোশালা সহজে যাতে পরিষ্কার করা যায় এবং গরু যাতে আরামে থাকে সেদিকে লক্ষ্য রেখে গোশালা নির্মাণ করা প্রয়োজন। প্রধানত বাঁধা গোশালা দু’ধরনের হয়। (ক) এক-সারি বিশিষ্টি গোশালা এবং (খ) দ্বি-সারী বিশিষ্ট গোশালা।
(ক) এক সারি বিশিষ্ট গোশালা (single row system cowshed)
সাধারণত অল্পসংক্যক গবাদি প্রাণির জন্য গ্রাম অঞ্চলের গৃহস্থের বাড়িতে একটি লম্বা সারিতে গরু বেঁধে পালনের জন্য এই ধরনের গোশালা ব্যবহার করা হয়। প্রতিটি প্রাণিকে পৃথক রাখার জন্য লোহার তৈরি জিআই পাইপ দিয়ে পার্টিশন দেয়া ভাল। সাধারণত পার্টিমনের পাইপ লম্বায় ৩ ফুট ও উচ্চতাযা ১.৫ ফুট হওয়া প্রয়োজন। গোশালা হবে এক চালা বিশিষ্ট ঘর। এক চালা ঘরের ছাদ প্রায় ১০ ফুট উঁচু করতে হবে।
(ক) উদাম প্রকৃতির একটি গরুর ঘরের নমুনা ১ = ঘরের দেয়াল, ২ = মেনজার, ৩ = আবৃত মেঝে, ৪ = ছাদ, ৫= গাটার, ৬ = খোলা মেঝে, ৭ = প্রাচীর;
(খ) মুখোমুখি পদ্ধতিতে গরু রাখার গোশালার নমুনা;
(গ) পিছোপিছি পদ্ধতিতে গরু রাখার গোশালার নমুনা;
(ঘ) আদর্শ গোশালায় গরু বাঁধার স্থানের নমুনা। এই চিত্রটি ‘লাভজনক পশুপাখি পালন ও আধুনিক চিকিৎসা’ বই থেকে নেয়া হয়েছে (সামাদ ২০০২)
(খ) দ্বিসারী বিশিষ্ট গোশালা (Double row system cowshed) অধিক সংখ্যক প্রাণি পালনের জন্য দ্বিসারী বিশিষ্ট গোশালা প্রয়োজন হয়। এধরনর গোশালায় দু’সারি গরুর মাঝখানে ৪ ফুট চওড়া একটি সাধারণ পথ থাকে। এই ধরনের গোশালায় প্রাণিকে দুভাবে দুসারিতে রাখা হয়। যথা: (অ) মুখোমুখি পদ্ধতি এবং (আ) লেজের দিকে লেজ বা পিছেপিছি পদ্ধতি। মুখোমুখি ((Face- in or Face to Face system) পদ্ধতিতে গোশালায় দুই সারি প্রাণি সামনা সামনি থাকে। লেজের দিকে লেজ বা পিছেপিছি (Face-out or Tail to Tail system) পদ্ধতিতে উভয় সারির মাথা বহিমূর্খী থাকে।
গাভীর বাসস্থান গাভীর বাসস্থানকে গোশালা বলে। এদেশে গোয়াল ঘরও বলা হয়। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে দুটি পন্থায় গাভী পালন করা হয়, যথা ক) চারনভূমিতে গরু চরানোর মাধ্যমে ও খ) গোশালায় বেঁধে রেখে খাদ্য পরিবেশন ও মলমূত্র নিস্কাশেন মাধ্যমে। আমাদের দেশে গোশালা বা গোয়াল ঘরে গাভী প্রতিপালনেই এদেশে গাভী পালনের পদ্ধতি হিসেবে সমদ্রিত। এ গোশালা বাড়ির অনতিদূরে (৪৫-৬০ মিটার) একটি উঁচু জায়গায় নির্মাণ করা শ্রেয়, যাতে দুর্গন্ধ ও গরুর মলমূত্র থেকে মানুষের সমস্যা সৃষ্টি না হয়। গোশালার উচ্চটা ১০ ফুট হতে হবে। খাদ্য পরিবেশনের জন্যা চাড়ি বা গামলা ও পানির পাত্র গোশালায় থাকতে হবে। গোশালার প্রতিটি গাভীর জন্য আড়পাতা (chute) থাকে যেখানে গাভী বেঁধে রাখতে হয়। খাবারের চাড়ি পাকা কনক্রিট ও আড়পাতা মসৃণ লোহার রড় বা বাঁশ দিয়ে তৈরি করতে হয়।
গাভীর বাসস্থান বা ঘর তৈরি করার সময় বিবেচ্য বিষয়গুলো হলো-
গাভীর ঘর পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা হবে যা দক্ষিণমুখি হাওয়া আবশ্যক যাতে পর্যান্ত আলো বাতাস চলাফেরা করে।
ঘরের মেঝে পাকা এবং খসখসে হবে। এতে গাভী পা পিছলে পড়ে যাবার সম্ভবনা কম থাকে।
ঘরের মেঝে ঢালু হবে এবং নিষ্কাশন ব্যবস্থা রাখতে হবে যাতে করে গোবর, চনা ইত্যাদি সহজে পরিস্কার করা যায়।
ঘরের চালা এসবেস্ট, ছন বা বাঁস দিয়ে তৈরি করা যেতে পারে। তবে টিন ব্যবহার করলে গরমের দিনে ঘর যাতে উত্তপ্ত না হয় সেজন্য টিনের নিচে চাটাই এর ব্যবস্থা করতে হবে।
বাছুরের বাসস্থান
সাধারণত জন্মের পর থেকে এক বছরের কিছু বেশি বয়সের গরু মহিষের বাচ্চাই বাছুর নামে পরিচিতি। প্রতিটি বড় বাছুরের জন্য ৫ ফুট x ৭ ফুট=৩৫ বর্গফুট জায়গার ভিত্তিতে বাছুরের বাসস্থান তৈরি করা হয়। এ বাসস্থানে প্রচুর আলো বাতাসের ব্যবস্থা থাকতে হবে। এ বাসস্থান কাঁচা অথবা পাকা হতে পারে। এতে বাছুরের মলমূত্র নিষ্কাশনের যথাযথ ব্যবস্থা থাকতে হবে। প্রতিটি ঘরে ছোট ছোট খোপ (calf pen) তৈরি করে প্রতি খোপে একটি করে বাছুর রেখে পালন করা যায়। সেক্ষেত্রে এ খোপগুলোর প্রতিটির পরিসর হবে ৩ ফুট x ৪ ফুট x৩.৫ ফুট। অন্যদিকে, একটি নিদিষ্ট আলো-বাতাস ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ঘরে একসাথ সমবয়সী ৫-১০ টি বাছুর পালন করা যায়। তবে উভয় ক্ষেত্রেই ঘরের সামনে বেষ্টনি ঘেরা খোলা জায়গা থাকা দরকার যাতে বাছুর ব্যায়াম ও খেলাধুলা করতে পারে। বাছুরের খোপে খড়বিচালি দিয়ে বিছানা তৈরি করতে হবে। মেঝৈ পাঁকা হলে ২.৫৪ সেন্টিমিটার বা এক ইঞ্চি পুরু বিছানার প্রয়োজন হয়। মেঝে কাঁচা হলে তা যেন কর্দমাক্ত ও স্যাঁতসেঁতে না হয় সে ব্যবস্থা করতে হবে। কেননা স্যঁতসেঁতে ও নোংরা পরিবেশে বাছুর ফুসফুস প্রদাহ (pneumonia) রোগে ভূগে থাকে এ রোগ বাছুরের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়। ১.৫-২.০ মাস বয়সের বছুরকে বড় বাছুরের বাসস্থানে স্থানান্তর করা উচিত।
























