শহীদ কামালের রক্ত বৃথা যেতে দেবনা
(সত্যের কাছাকাছি দাড়িয়ে কল্পনা)

যশোর জেলার একটি পল্লীগ্রাম গোবিনাথপুর। এক দারিদ্র কৃষকের সাত পুত্র কন্যার ভিতর জৈষ্ঠ্য পুত্র কামাল। অন্যান্য ভাই বোনদের ভিতর ও ছিল নম্র ভদ্র ও মেধাবী। কৃষক গায়ের ঘাম পায়ে ফেলে, খেয়ে না খেয়ে আশার প্রদ্বীপ বড় ছেলেকে লেখাপড়া শেখাছেন। এস.এস.সি ও এইচ.এস.সি প্রথম বিভাগে পাস করার পর বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে পা রাখে সে তখন। খুলনার বি.এল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের বাংলা বিভাগের ছাত্র।
প্রথম বর্ষে অনেক কষ্ট ক্লাস করে ক্লাস করে এত কষ্ট তার আর সহ্য হয় না। ভর্তির সময় পরিচিত হয় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কিছু নেতা কর্মীর সহিত। গ্রামের ছেলে সহজ সরল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের হালচাল ও রীতিনীতির প্রতি দৃষ্টিপাত করতে অনেক দেরী হয়। তাই ও সব জিনিস সহজ ভাবে মেনে নেয়। কোন মেয়ে যদি ক্লাসমেট ও বন্ধু ভেবে পরিচিত হয় তাহলে মনে করে মেয়েটি ওকে ভালবাসে। দেখতে দেখতে দু একটা আঘাত ও পায় সরল মনে। কিছুটা ধারনা জন্মে শহরের হালচাল সর্ম্পকে।
দারিদ্র পিতার আশা কামাল লেখা পড়া শিখে একদিন অনেক বড় হবে। পাশাপাশী তার ছোট ভাই বোনদেরও লেখা পড়া শেখাবে বড় চাকরী করবে। অনেক টাকা বেতন পাবে। গাড়ী বাড়ী করবে সেদিন তাদের আর দুঃখ কষ্ট থাকবে না।
তাই বাড়ীর ধান চাল কলা শাক সবজী বিক্রি করে টাকা পাঠায়। মেসে বসে বসে খায় কামাল। কামালও এ কথাটি ভাবল কোন নেতার মুখপাত্র হতে পারলে হয়ত শহরে কোথাও থাকার জায়গা পাবে। নিজের মনের সকল কথা খুলে বলল এক রাজনৈতিক নেতাকে। সে নিয়ে গেল তার চেয়ে বড় আর এক নেতার কাছে। এভাবে কেটে গেল প্রথমবর্ষ। ওকে বলে দিল কামাল আমরাতো দলের কোন কর্মী ছাড়া কাউকে হোষ্টেলে ছিট দিই না। আর লজিং টিউশনি তো দুরে থাক। তুমি কি পারবে আমাদের দলীয় কাজ করতে। কামাল এক বাক্যে রাজী হয়ে গেল।
দলের শ্লোগান মিছিল মিটিং সকল কাজে তার জুড়ি নেই। নেতা একদিন ওকে বলছে কামাল তোমার কাজে একটু ফাঁক দেখছি। তুমি হোষ্টেলে এসে আপাতত গেষ্ট হয়ে থাক। কামাল খুশীতে আট খানা। ও তখন হোষ্টেলে থাকে। এ গর্বে সারাক্ষন পোষ্টারিং, মাইকিং, শ্লোগান, মিছিল, মিটিং কলেজে থেকে শুরু করে সারাটি খুলনা শহরের এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত। আগামী বৎসর ওর নামে হোষ্টেলের সিট পেনসিলিপ হবে, এ আশায়।
একদিন কালাম হোসেন কালু সন্ত্রাস করে চাঁদাবাজী করতে গেলে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। নির্দেশ এসেছে বিকাল ৫টায় কালু ভাইয়ের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল হবে। কামাল ছুটে চলে তার পরদিন ১০টায় দ্বিতীয় বর্ষ ফাইনাল পরীক্ষা। মোটামুটি পড়াশুনা করছে।
সারা বৎসর পড়াশুনার উপসংহার হছে পরীক্ষার আগের রাতের পড়া কথাটি ওর মাথায় নেই। বিকাল থেকে শুরু করে সন্ধ্যাায়ও ওর কন্ঠ থেকে ধ্বনীত হচ্ছে “কালু ভাইয়ের চরিত্র, ফুলের মত পবিত্র’। ‘কালু ভাইয়ের কিছু হলে, জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে।’ ‘জেলের তালায় লাথী মার, কালুভাইকে মুক্ত কর।’ এর মধ্যে সুবিধা বাদীরা শুরু করল রাস্তার জ্যামে থাকা গাড়ী ভাংচুর ও বোমা বাজি নিক্ষেপ রাস্তার পাশের দোকান লুটপাট। প্রতি পক্ষ রুখে দাড়াতে, যে যেদিকে পারে ছুঠে পালায়। কামাল গিয়ে একটি সেলুনের ভিতর ঢুকে পড়ে। বেবিট্যাক্সি ও দোকান মালিকরা সেলুনের দরজা খুলে বেচারা কামালকে ভিতর থেকে বের করে খুব প্রহর করে। প্রহরে তার নাক-মুখ, মাথা ক্ষত-বিক্ষত হল। তারপর তুলে দিল পুলিশের হাতে। পুলিশ এসে যদি উদ্ধার না করতো তা হলে হয়তো মারা যেত। কারণ গণ পিটানিতো। পুলিশের নানা জিজ্ঞাসাবাদে ও শুধু একটি উত্তর করে, হোস্টেলে দলের সিটে থাকতে হলে মিছিল মিটিং করতে হয়। তার পর উপর থেকে নেতারা পুলিশের কাছে থেকে জামিনে নিল। সারা রাত হাসপাতালে থাকে। বন্ধু বান্ধব ওষুধ জোগায়। দলীয় নেতারা কামালকে ওষুধ পাতি তো দুরের কথা বিরাট নেতা বানিয়ে ফেলল। পরদিন পরীক্ষার হলে কামালের লাশের মত একটি দেহ প্রবেশ করে। বড় কষ্ট ও যন্ত্রনা সহ্য করে পরীক্ষা শেষ করল। ওর ধারনা ফেল করবে কিন্তু পরে দেখা গেল কোনমতে পাস করছে ও। তৃতীয় বর্ষে হোস্টেলে ওর নামে সিট পেনসিলিভ হল।
পড়াশুনাও মুটামুটি করেছে। দলের কাজের পাশাপাশী পরীক্ষা শেষ করল। তখন ও ফিরে যাবে গ্রামে। সংবাদ এল হায়াত ভাই চাঁদা তুলতে যেয়ে মার খেয়েছে, তার প্রতিবাদে সন্ধ্যায় মশাল মিছিল। আজ কিন্তু কামাল নিরব। বহুদিন পর আগামীকাল সকালে বাড়ী যাবে মা-বাবা ও ভাই-বোনের কাছে। মন যেতে চাচছিল না মিছিলে। বই খাতা ও কাপড় চোপড় গুছিয়ে রেখে ভাবল যাই শেষ মিছিলটা করে আসি। মিছিল শুরু হওয়ার কিছু পরেই মিছিলের উপর প্রতিপক্ষ হামলা চালাল বোমাবাজী ও গোলাগুলীর মাঝে৩ একটি বুলেট এসে লাগল কামালের বুকে। ‘মা’ বলে একটি চিৎকার করে পড়ে রইল পিচঢালা কালো রাস্তার উপর কামালের লাশটি।
এদিকে কামালের চিঠি পেয়ে মা-বাবা ভাই-বোন অধীর আগ্রহে পথ চেয়ে বসে আছে। খোকা ফিরবে বাড়ী ফিরবে। এমন সময় কানে ভেসে আসল মিছিলে শহীদ কামাল। অপরিচিত লোক সাথে কিছু গ্রামের ছেলে পেলেও ছুটেছে। একটি কফিন কাঁদে করে এনে উঠানে নামানো মাত্রই আকাশ ফাঁড়া চিৎকার করে উঠলো কামালের মা ‘আলারে…। আমার বাবার লাশ হলো পাস।
**********
























