
ড. মো. বায়েজিদ মোড়ল: আমরা বেঁচে থাকার জন্য খাই। আবার ‘ভালভাবে বেঁচে থাকার জন্য’ বিভিন্ন খাদ্য খাওয়ার প্রয়োজন হয়। খাদ্যের প্রধান কাজ তিনটি (১) কর্ম শক্তি উৎপাদন, (২) দেহ গঠন ও ক্ষয় পূরণ এবং (৩) রোগ প্রতিরোধ ও আভ্যন্তরীণ কার্যাবলী নিয়ন্ত্রণ। এ সকল কাজ করার জন্য খাদ্যের ৬টি উপাদান রয়েছে যেমন; (১) শর্করা, (২) আমিষ, (৩) তেল বা চর্বি, (৪) খাদ্যপ্রাণ, (৫) খনিজলবণ ও (৬) পানি। শরীরকে সুস্থ্য রাখার জন্য এসকল খাদ্যের অবদান অনুপাতিক হারে সমান। এখানে কেবল বিভিন্ন প্রকার তেল বীজ বা চর্বি জাতীয় খাদ্য উপাদানের বিভিন্ন দিক সম্বন্ধে আলোচনা করা হল।
মানবদেহে তেলের কাজ
* তেল বা চর্বি খাদ্য শক্তির প্রধান উৎস (শর্করা বা আমিষের সোয়া দু’গুণ)।
* তেল অত্যাবশ্যকীয় ফ্যাটি এসিডের উৎস ।
* তলে দ্রবণীয় ভিটামিনগুলির (এ,ডি,ই, এবং কে) বাহক।
* প্রোষ্টাগ্লান্ডিন উৎপন্নের উপযোগী উপাদানের উৎস।
* শরীরের বৃদ্ধি, ক্ষয়পূরণ, চর্মরোগ প্রতিরোধ ইত্যাদিসহ আরো অনেক কাজে প্রয়োজন।
কতটুকু তেল খাওয়া প্রয়োজন
বিভিন্ন বয়স, পেশা, পরিবেশ ইত্যাদির উপর নির্ভর করে প্রতিটি মানুষের জন্য কি পরিমাণ আমিষ এবং খাদ্যশক্তি প্রয়োজন তা নির্ণয় করা হয়েছে; কিন্তু কি পরিমাণ তেল বা চর্বির প্রয়োজন তা এখনও নির্ণয় করা হয় নাই। তবে পুষ্টিবিদগণের মতে একজন মানুষের প্রয়োজনীয় খাদ্যশক্তির শতকরা ১৫-২০% তেল থেকে আসা উচিত। তাহলে উপরে উল্লেখিত কার্য্যাবলী যথাযথ ভাবে সম্পন্ন হবে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যদি একজন পূর্ণ বয়স্ক মানুষের দৈনিক ২১০০০ ক্যালরী প্রয়োজন হয় তা হলে এর ৩১৫-৪২০ ক্যালরী তেল থেকে আসা উচিত। প্রতি গ্রাম তেলে ৯ ক্যালরী শক্তি থাকে। ষূতরাং ৩৫-৪৭ গ্রাম তেল/ চর্বি দৈনিক খাওয়া উচিত। ভারতীয় পুষ্টিবিদগণের মতে একজন পূর্ণ বয়স্ক মানুষের জন্য কমপক্ষে গড়ে দৈনিক ২০ গ্রাম দৃশ্যমান তেল খাওযা উচিৎ। আমরা যে সকল খাদ্য দ্রব্য (ডিম, দুধ, মাছ, মাংস, বাদাম ইত্যাদি) খাই তার মধ্যে অদৃশ্য তেল আছে এ বিষয়টিও বিবেচনায় আনতে হবে।
শিশুদের বাড়ন্ত শরীরের জন্য তুলনামূলক ভাবে বেশী খাদ্যশক্তি প্রয়োজন। যেহেতু তাদের পাকস্থলী ছোট সেহেতু তাদের খাদ্য অপেক্ষাকৃত বেশী দেল দিয়ে রান্না করা উচিৎ। অধিক¯ত্ত মাত্র ৫০ গ্রাম চীনাবাদাম প্রসূতি মা বা গর্ভবতী মহিলাদের দৈনিক অতিরিক্ত খাদ্য শক্তির চাহিদা মেটাতে পারে।
গ্লিসারোল এবং ফ্যাটি এসিডের সংযোজনে তেল/ চর্বি তৈরি হয়। স্নেহ পদার্থ বা চর্বি তরল অবস্থায় থাকলে তাকে তেল বলা হয়। তেলের শতকরা ৯৩-৯৫ ভাগ ফ্যাটি এসিড এবং ৫-৭ ভাগ গ্লিসারোল। সুতরাং কোন তেলের গুণাগুণ বা বৈশিষ্ট ফ্যাটি এসিডের বৈশিষ্টের উপর নির্ভরশীল। ফ্যাটি এসিডগুলো সাধারণতঃ ২ প্রকারের হয়। সম্পৃক্ত এবং অসম্পৃক্ত , স্নেহ পদার্থে প্রাপ্ত সম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিডগুলি হল লরিক, মাইরিষ্টিক পামিটিক, ষ্টিয়ারিক ইত্যাদি; অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিডগুলি হল অলেয়িক (১টি দ্বিবন্ধনী বিশিষ্ট)। ইরুসিক এসিড (১টি দ্বিবন্ধনী) শুধুমাত্র সরিষার তেলে এবং রিসিনোলেয়িক এসিড (১টি দ্বিবন্ধনী ও ১টি হাইক্সিল) শুধুমাত্র সরিষার তেলে এবং রিসিনোলেয়িক এসিড (১টি দ্বিবন্ধনী ও ১টি হাইক্সিল) ভেরেন্ডার তেলে থাকে। উক্ত ফ্যাটি এসিডদ্বয়ের গুণাগুণ সম্পর্কে যথাক্রমে সরিষা এবং ভেরেন্ডার অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড আবার ২ প্রকার। এক বন্ধনীযুক্ত এবং একাধিক বা বহুবন্ধনীযুক্ত ফ্যাটি এসিড। উদ্ভিদ ও পশুজাত স্নেহ পদার্থে ১,২ এবং ৩ বন্ধনীযুক্ত ১৮ কার্বন পরমানু বিশিষ্ট ফ্যাটি এসিড বেশী পাওয়া যায়। কিন্তু ৪ বন্ধনীযুক্ত ২০-২৪ এবং ১৪-১৬ কার্বন পরমানু বিশিষ্ট ফ্যাটি এসিড সামুদ্রিক উদ্ভিদ ও সামুদ্রিক জীবে বেশী পাওয়া যায়। সাধারণতঃ অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড সম্বৃদ্ধ ফ্যাট তরল হয় এবং সম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড সমৃদ্ধ ফ্যাট ঘরের তাপে ঘন থাকে যেমনঃ নারিকেল, পাম, কোকোয়া ইত্যাদি।
কোন ভেজ্যে তেলের গুণাগুণ বৃদ্ধি পায় যদি ইহাতে অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিডের পরিমাণ বেশী থাকে। সংযুক্ত ছক-১এ বাংলাদেশে আবাদকৃত তেলফসলগুলির অনুমোদিতজাত সমূহের তেলে ফ্যাটি এসিডের পরিমান দেয়া হলো। সম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিডগুলির মধ্যে পামিটিক ও ষ্টিয়ারিক এসিডই বেশী পরিমানে উদ্ভিজ তেলে মধ্যে দেখা যায়। এগুলির পরিমাণ যত বেশী থাকে তেলের খাদ্যমান ততই কমে যায়। অপরপক্ষে বহুবন্ধনীযুক্ত অসম্পৃক্ত এসিড গুলির মধ্যে লিনোলিক এবং লিনোলেনিক এসিড উদ্ভিজ তেলে বেশী থাকে। যদিও এ দু’টি ফ্যাটি এসিড আমাদের জন্য অত্যাবশ্যকীয় তথাপি কোন তেলে যদি এর পরিমান অত্যাধিক হয় তবে সে তেল দ্রুত নষ্ট হয় এবং খাদ্যমান হারায়। সূর্যমুখী এবং তিসির অধ্যায়ে এবিষয়ে বিস্তারিত আলোচিত হয়েছে। অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিডে কৃত্রিমভাবে হাইড্রোজেন পরমানু ঢুকিয়ে দিয়ে তরল তেলকে সাধারণ তাপমাত্রায় ঘন ফ্যাটে (বনস্পতি/ ডাল্ডা) পরিণত করা হয়। ইহাকে হাইড্রোজেনেশন (ঐুফৎড়মবহধঃরড়হ) বলা হয়।
র্যানসিডিটি
অপেক্ষাকৃত উষ্ণ তাপমাত্রায়, আলো, বাতাসের আর্দ্রতা ও অক্সিজেনের উপস্থিতিতে তেলজাতীয় পদার্থগুলিতে একপ্রকার খারাপ গন্ধ ও স্বাদের উদ্ভব ঘটায়। এ ঘটনাকে দুর্গন্ধতা বা র্যানসিপিটি বলে। অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিডের দ্বিবন্ধনী অঞ্চলে অক্সিডেশন বা জারনের ফলে এলডিহাইডের উৎপত্তি, প্রাকৃতিক ফ্যাট জাতীয় পদার্থে উপস্থিত জারকরস (ষরঢ়ধংব) দ্বারা মুক্ত ফ্যাটি এসিডের উদ্ভাবন এবং ফ্যাটি এসিডের বিয়োজনের ফলে দুর্গন্ধযুক্ত কিটোন যৌগের উৎপাদন ইত্যাদি কারণে র্যানসিডিটি হয়ে থাকে। তেলকে র্যানসিডিটি মুক্ত রাখতে হলে বীজ এবং তেল যথাযথভাবে গুদামজাত করতে হবে।
বিভিন্ন তেলের পুষ্টিমান
সরিষা
সরিষার বীজে গ্লুকোসিনোলেট নামক এক ধরনের রাসায়নিক দ্রব্য থাকে যা বীজের জারকরস (মাইরোসিনেজ) ও পানির সঙ্গে বিক্রিয়া করে এলাইল আইসোথায়োসায়ানেট (অওঞঈ) নামক দ্রব্যের উৎপত্তি করে। এলাইল আইসোথায়োসায়ানেটের কারণেই সরিষার তেলের ঝাঁজালো গন্ধ পাওয়া যায়। ক্যাম্পেস্ট্রিস ও নেপাসের চেয়ে জানসিয়া গ্র“পের বীজে গ্লুকোসিনোলেট বেশী থাকে। ফলে রাই সরিষার তেল তুলনামূলকভাবে বেশী ঝাঁজালো। সরিষার বীজে ৪-৫% গ্লুকোসিনোলেট থাকে এবং এর থেকে ১-১.২৫% এলাইল আইসোথায়োসায়ানেষ্ট উৎপন্ন হয়। ঘানির দ্বারা নিস্কাশিত তেলে এলাইল আইসোথায়োসায়ানেট এর ভাগ বেশী থকে (০.৫০%) কিন্তু এক্সপেলার দ্বারা নিস্কাশিত তেলে (০.১৫%) এলাইল আইসোথায়োসায়ানেট কম থাকে। সাধারণতঃ আমাদের দেশে ক্রেতাগণ গন্ধ যাচাই করে সরিষার তেলের বিশুদ্ধতা নিরুপণ করেন। এলাইল আইসোথায়োসায়ানেট শরীরে আয়োডিনের কৃত্রিম অভাব সৃষ্টির মাধ্যমে গলগন্ড রোগের উৎপত্তি ঘটতে পারে এবং পশুপক্ষীর দুধ, ডিম উৎপাদন কমায়। সিন্থেটিক এলাইল আইসোথায়োসায়ানেট বাজারে পাওয়া যায় এবং যে কোন ভোজ্য তেলে সামান্য পরিমাণে মিশ্রিত করলে সরিষার তেলের গন্ধ পাওয়া সম্ভব। এলাইল আইসোথায়োসায়ানেট উদ্বায়ী (ঠড়ষধঃরষব), ফলে রান্নার পরে তেরের ঝাঁঝালো গন্ধ কমে যায়। এখন পর্যন্ত সঠিকভাবে আমাদের খাদ্য হজম পদ্ধতিতে এ ক্ষতিকারক ভূমিকা কতখানি তা বিস্তারিতভাবে জানা যায়নি। যে সকল প্রাণী চর্বিত করে এলাইল আইসোথায়োসায়ানেট তাদের ক্ষতি করতে পারে না।
সরিষার তেল অন্যান্য ফ্যাটি এসিডের সাথে ইরুসিক এসিড নামক একটি ফ্যাটি এসিড থাকে। আমাদের দেশে উৎপাদিত জাতগুলোতে এর পরিমাণ শতকরা ৪৬-৫০ ভাগ। অতিরিক্ত ইরুসিক এসিড শরীরের জন্য ক্ষতিকারক বলে প্রমাণিত। মাত্রাতিরিক্ত ইরুসিক এসিড হৃদপিন্ডের মাংশপেশীর স্থিতিস্থাপকতা কমায় তবে স্বাভাবিক পরিমণের ইরুসিক এসিড তেমন ঝুকিপূর্ণ নয়। ইরুসিক এসিড ক্ষতিকারক না হলেও অত্যাবশ্যকীয় নয়। ইরুসিক এসিড মুক্ত সরিষার তেলে অত্যাবশীয় লিনোলিক এসিড বেশী থাকে বলে স্বাস্থ্যের জন্য ভাল (ছক-২)। উন্নত দেশে গ্লুকোসিনোলেট এবং ইরুসিক এসিড মুক্ত সরিষার জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে এবং চাষাবাদের জন্য তা ব্যবহৃত হচ্ছে। কোন কোন দেশে এ সকল সরিষা “ডাবল জিরো” নামে খ্যাত। কানাডায় “ডাবল জিরো” সরিষাকেই “ক্যানোলা” নাম দেয় হয়েছে যা আমাদের দেশের বাজারেও পাওয়া যায়। “ডাবল জিরো” হওয়ার কারণে ক্যানোলা নামক সরিষার তেলে ঝাঁঝালো গন্ধ থাকে না।
তিল
তিলের তেলে বিদ্যমান ফ্যটি এসিডের পরিমাণ সুষম বিধায় এটা অত্যন্ত উন্নতমানের ভোজ্য তেল। তিলের বীজে তেমন ক্ষতিকারক কোন পদার্থ না থাকলে আস্ত বা খোসা ছাড়ানো বীজ দিয়ে নানা রকম খাদ্য সামগ্রী প্রস্তুত করা যায়। অলেয়িক এবং লিনোলিক এসিডের পরিমাণ একত্রে প্রায় ৮০%। সিসামোল নামক প্রাকৃতিক এন্ডিঅক্সিড্যোনট উপস্থিত থাকায় এ তেল দীর্ঘদিন ভাল থাকে। তিল তেল ঔষধ ও কসমেটিক শিল্পেও ব্যবহৃত হয়। সিসামিন এবং সিসামোলিন নামক দু’টি রাসায়নিক দ্রব্যের উপস্থিতির জন্য তিলের বীজ সহজে পোকায় আক্রমণ করে না। কোন কোন দেশে (যেমন ইতালী) মার্জারীন প্রস্তুত করতে ৫% তিল তেল যোগ করা হয়যাতে মার্জারিন দ্বারা মাখনে ভেজাল দিলে সহজে পরীক্ষা করা যায়। তিলের খোসায় ক্যালসিয়াম অক্সালেট এবং তেলে ফেনোলিক কম্পাউন্ড (সিসামোল) থাকায় রং কালো ও আঠালো হয়।
চীনাবাদাম
চীনা বাদামের তেল উন্নতমানের তেল হলেও বাংলাদেশের সহজ প্রাপ্য নয়। এর তেলে ঙষবরপ ধপরফ বেশি থাকে। ঙষবরপ ধপরফ এর প্রধানগুন হলো বেশি তাপমাত্রায় স্থায়ী/ অপরিবর্তিত থাকা। অলেয়িক এসিড ভোজ্য তেলকে রন্ধন উপযোগী করে তুলতে সাহায্য করে। যে তেলে এই এসিডের পরিমনা বেশী থাকে সেই তেল যখন কোন খাদ্য ভাজার জন্য ব্যবহার করা হয় তখন পাত্রের গায়ে তেলের চক্চকে স্তর পড়ে না। ভারতসহ পৃথিবীর অনেক দেশে এখনও চীনাবাদাম তেল ভোজ্য তেল হিসাবে ব্যবহৃত হয়। বাদামের বর্তমান বাজার দরে চীনাবাদাম থেকে তেল নিস্কাশন লাভজনক নয় বিধায় সরাসরি খাওয়া হয়। অন্যান্য তেলবীজের ন্যায় বাদামেও অত্যাবশ্যকীয় ইমিনো এসিড বেশী থাকে। তেল নিস্কাশন না করে বাদাম খেলে তেল সহ অন্যান্য পুষ্টি উপাদান (আমিষ, শর্করা, খনিজ পদার্থ, ভিটামিন) সবই খাওয়া হয়। যেহেতু আমাদের প্রধান খাদ্য ভাত সেহেতু বাদামের আমিষ চালের আমিষের সাথে মিশে ভাত এবং বাদামের মিশ্র খাদ্যে আমিষের আনুপতিক দক্ষতা (চৎড়ঃবরহ ঊভভরপরবহপু জধঃরড়) বাড়িয়ে দেয়। সুতরাং বাদাম তেল খাওয়ার চেয়ে আস্ত বাদাম খাওয়া অধিক লাভজনক। ভারতে অন্ধপ্রদেশের কোন কোন এলাকায় মায়েরা চীনাবাদামের ছাতু স্কুলে ছেলেমেয়েদের টিফিন হিসাবে দিয়ে থাকেন। গর্ভবতী মহিলা এবং দুগ্ধদানকারী মাতার অতিরিক্ত খাদ্য চাহিদা পূরণের জন্য দৈনিক ৫০ গ্রাম বাদামই যথেষ্ট। যখন চীনাবাদাম উত্তোলন করা হয় তখন দানায় ৩০-৫০% আর্দ্রতা বেশী থাকলে বীজের আর্দ্রতা খুব ধীরে ধীরে কমে; ফলে বিভিন্ন ছত্রাক খুব সহজেই বীজে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং খুব অল্প সময়ে বীজের অংকুরোগত ক্ষমতা কমে যাবে। উক্ত ৩০-৫০% আর্দ্র বীজ উচ্চ তাপমাত্রায় বা সরাসরি সূয্যালোকে শুকালে বীজের তাপমাত্রা বেড়ে মেমব্রেন ফেটে বীজের অংকুরোদগম ক্ষমতা কমে যায়। শস্যদানা মাড়াইয়ের পূর্বে আর্দ্রতা ২০-২৫% এ নামিয়ে আনতে হবে। গরম বাতাসের সাহয্যে বীজ শুকাতে হলে বাতাসের তাপমাত্রা বীজের জন্য ৪৫ ডিগ্রী সেঃ এর বেশী হওয়া উচিত নয়। উচ্চতর তাপমাত্রায় শুকানো তেল দূর্গন্ধযুক্ত হতে পারে। এ দূর্গন্ধ দূর করা সম্ভব নয়।
চীনাবাদাম বীজ পরের মৌসুমে লাগানোর জন্য ৭-৯ মাস গুদামজাত করা প্রয়োজন হয়। বীজে পানির পরিমান, সংরক্ষণকাল, পারিপার্শ্বিক বাতাসের আর্দ্রতা এবং তাপমাত্রা বিশেষভাবে অংকুরোদগম ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। চীনাবাদাম এর জন্য তাই একটি সাধারণ নিয়মঃ বীজে প্রতি ১% ভাগ পানি কম হলে দ্বিগুণ সময়ের জন্য গুদামজাত করা যায়। অর্থাৎ প্রতি ৫-৬ ডিগ্রী সেঃ তাপমাত্রা কম হলে দ্বিগুণ সময়ের জন্য গুদামজাত করা যায়। ভালভাবে শুকানো প্রতি ৩০ কেজি বীজের জন্য ২৫০ গ্রাম ক্যালসিয়াম ক্লোরাইডসহ চটের বস্তার ভিতরে পলিথিন দিয়ে রাখলে ৭-৮ মাস পরেও ৮০% অংকুরোদগম ক্ষমতা বজায় থাকে।
সূর্যমুখী
সূর্যমুখী এদেশে নতুন তেল ফসল। কাজেই এর যথাযথ প্রক্রিযাজাতকরণের প্রযুক্তি সম্পর্কে উৎপাদনকারী, ব্যবসায়ী এবং ক্রেতাদের যথেষ্ট অবহিত হওয়া প্রয়োজন। সূর্যমুখী বীজ আকারে অনেক বড় এবং তেলে লিনোলিক এসিডের পরিমান বেশী। সেজন্য এর প্রতি একটু বেশী সর্তকতা অবলম্বন করা দরকার। বীজ ভালভাবে শুকানো না হলে অধিক তাপমাত্রায় তেল “র্যানসিড” হয়ে যায়। এমনকি বীজের মধ্যে তেল নষ্ট হয়ে তিক্তস্বাদযুক্ত হতে পারে। সূর্যমুখীর বীজ ভালভাবে শুকিয়ে বায়ুনিরোধক যে কোন পাত্রে অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা জায়গায় গুদামজাত করতে হয়। বীজে সঠিক পরিমাণের চেয়ে বেশী পানি থাকলে তার সংরক্ষণ ক্ষমতা কমে যায় এবং বীজ অংকুরোদগম ক্ষমতা ও হারায়। এছাড়া কীটপতংগ ও রোগবালাই দ্বারা তাড়াতাড়ি আক্রান্ত হয়। ফলে পুষ্টিমান ও খাদ্যদ্রব্য হিসাবে গ্রহণ যোগ্যতা হারায়।
সূর্যমুখীর তেলে লিনোলিক এসিডের পরিমাণ শতকরা ৫৫-৭০ ভাগ। এ এসিডের পরিমাণ উৎপাদন আবহাওয়ার দ্বারা প্রভান্নিত হয়। ফলে ভোজ্য তের হিসাবে এর তেল অতি উচ্চমানের । ভোজ্য তেলে লিনোলিক এসিডের পরিমাণ বেশী থাকলে রক্তে কোলষ্টেরলের পরিমাণ কমায়। সুতরাং উচ্চ রক্ত চাপ এবং হৃদরোগের ঝুকিপূর্ণ ব্যক্তিগণ অধিক লিনোলিক এসিড সম্পন্ন তেল (সূর্যমুখী, গুজিতিল/ গর্জনতিল, কুসুমফুল বীজের তেল) খেলে উচ্চ রক্তচাপের ঝুকি কমাতে সাহায্যে করবে। সূর্যমূখীর তেলে আলফা-টকোফেরল (ভিটামিন-ই) থাকে। তেল নিস্কাশনের পূর্বে বীজ গুদামে ভালভাবে সংরক্ষিত হয়ে না থাকলে তেলে মুক্ত-ফ্যাটি এসিডের (ঋঋঅ%) পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে তেলের মান খারাপ করে দেয়। কাজেই ভালভাবে বীজ ও তেল সংরক্ষণ করতে হবে। এক্সপেলারের সাহায্যে তেল নিস্কাশন করে শতকরা এক ভাগ খাদ্যলবণ মিশিয়ে চব্বিশ ঘন্টা ধরে থিতানোর (ঝবফরসবহঃধঃরড়হ) পর তেল রান্নার কাজে ব্যবহার করা যায়। এ প্রক্রিয়ায় তেলে স্থায়িত্ব ২-৩ মাস বাড়ানো যায়। সুযোগ থাকলে শোধন (জবভরহব) করে নেয়া ভালো। যে সকল তেলে পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিড বেশি সে ক্ষেত্রে বীজ থেকে তেল নিস্কাশনের পরে অল্পদিনেই খেয়ে শেষ করা উচিৎ। পুরানো তেলের পাত্র ভালভাবে ধুয়ে এবং শুকিয়ে নতুন তেল রাখতে হবে। সামান্য পুরানো তেল বা পানি যে কোন তেলকে দ্রুত নষ্ট করে ফেলে।
গুজি/গর্জন তিল
গুজি (গর্জন তিল) এখনও আমাদের দেশে একটি অপ্রধান তেল ফসল। কোন কোন এলাকায় অতি অবহেলা ও অযতেœ চাষ করা হয়। গুজি তিলের তেলে শতকরা প্রায় ৭০ ভাগ অত্যাবশ্যকীয় লিনোলিক এসিড থাকে। অবমুক্তি জাত শোভায় (নিগ-১) এর পরিমাণ শতকরা ৭১ ভাগ। আমরা গুজি তিলের গুণাগুণ জানি না বলে যথার্থ মূল্যায়ন করি না। ঘানী বা এক্সপেলারে ভাঙ্গিয়ে অন্যান্য তেলের ন্যায় রান্নার কাজে ব্যবহার করা যায়। অন্যান্য তেলের সাথে মিশিয়েও ব্যবহার করা চলে। ইথিওপিয়ায এক্সপেলারে ভাঙ্গনো গুজি তিলের তেল অন্যান্য ভোজ্য তেলের চেয়ে অধিক মূল্যে বিক্রয় হয়ে থাকে। উন্নত মানের অধিকারী এ ফসলকে অধিকতর গুরুত্ব সহকারে চাষাবাদ করলে আমাদের ভোজ্য তেলের ঘাটতি পূরণে সহায়ক হবে।
কুসুমফুল
কুসুমফুল এ দেশে গুজির ন্যায় আরও একটি অবহেলিত ফসল। গুণের দিক থেকে পূর্বে আলোচিত সুর্যমূখী এবং গুজি তিলের সমমানের। জাত ভেদে অত্যাবশ্যকীয় লিনোলিক এসিডের পরিমান ১৪-৮৯% হতে পারে। ফ্যাটি এসিডের ভিন্নতার উপর ভিত্তি করে কুসুমফুলকে ৫ (পাঁচ) শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়।
শ্রেণী পামিটিক ষ্টিয়ারিক অলেয়িক লিনোলিক
অতি উচ্চ লিনোলিক ৩-৫ ১-২ ৫-৭ ৮৭-৮৯
উচ্চ লিনোলিক ৬-৮ ২-৩ ১৬-২০ ৭১-৭৫
উচ্চ অলেয়িক ৫-৬ ১-২ ৭৫-৮০ ১৪-১৮
মধ্যম অলেয়িক ৫-৬ ১-২ ৪১-৫৩ ৩৯-৫২
উচ্চ ষ্টিয়ারিক ৫-৬ ৪-১১ ১৩-১৫ ৬৯-৭২
তবে উচ্চ লিনোলিক ও উচ্চ অলেয়িক প্রজাতিগুলো বাণিজ্যিক কারণে চাষ হয়ে থাকে। উক্ত প্রজাতি দুটি ভোজ্য তেল হিসাবে উন্নতমানের উচ্চ লিনোলিক এসিডযুক্ত তেল রক্তের কোলেষ্টরল কমায়। উচ্চ অলেয়িক এসিড টাইপ কুসুমফুল বীজের তেল পটোটে চিপ্স ফ্রেন্সফ্রাই ইত্যাদিতে ব্যবহার উপযোগী। রান্নার তেল হিসেবে ব্যবহার ছাড়াও এ তেল প্রসাধনী সামগ্রী হিসেবে যুগ যুগধরে ব্যবহার হচ্ছে।
তিসি
শতকরা ৪৫-৫০ ভাগ লিনোলেনিক এসিড থাকায় তিসির তেল অন্যান্য উদ্ভিজ তেলের ব্যতিক্রম। যদিও লিনোলেনিক এসিড একটি অত্যাবশ্যকীয় ফ্যাটি এসিড তথাপি এর আধিক্যের জন্য তের তাড়াতাড়ি খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে যায়। বাতাসের অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়ার ফলে লিনোলেনিক এসিড পলিমেরাইজেশন হয়ে দ্রুত একটিনরম আবরণের সৃষ্টি হয়। এ কারণে এ তেল বাণির্শ সহ বিভিন্ন শিল্পে কাজে ব্যবহৃত হয়। আমাদের দেশের উৎপাদিত তিসি অন্যান্য তেলবীজের সাথে মিশিয়ে (৪:১) তেল নিষ্কাশন করে ভোজ্য তেল হিসাবে ব্যবহৃত হয়। শতকরা ৩৫ ভাগের কম লিনোলেনিক এসিড সম্মৃদ্ধ তেল খাদ্যোপোযোগী হতে পারে। লিনোলেনিক এসিড তেলের সংরক্ষণকার বাড়ায় সংগে সংগে হলদে হতে থাকে। নিজের থেকে জরিত (অঁঃড়ড়ীরফধঃরড়হ) হওয়ার জন্য তেল দ্রুত খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে যায়। সুতরাং তিসির তেলে এ এসিড যত কম থাকে তত ভাল। অন্যান্য ভোজ্য তেলের সাথে তিসির তেল মিশ্রণের ফলে লিনোলেনিক এসিডের পরিমাণ লিনোলেনিক এসিড সম্পন্ন তিসির জাত উদ্ভাবন সম্ভব এবং তা করতে পারলেই তিসির তেল জারন সমস্যা মুক্ত হয়ে উন্নতমানের ভোজ্য তেল হ’তে পারে।
সয়াবীন
বাংলাদেশের জন্য সয়াবীন তেলশস্য, না ডালশস্য তা নিয়ে এখনও বিতর্ক আছে। তথাপি এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় সয়াবীন সকল মানুষের জন্য বিশেষ করে নিু এবং মধ্যবিত্ত সমাজের লোকদের জন্য আমিষ সমৃদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য। সয়াবীনে শতকরা ২০ ভাগ তেল এবং ৪০-৪৪ ভাগ আমিষ থাকে। অন্য কোন খাদ্যে এত আমিষ নেই। এ দেশের মানুষ বিশেষ করে শিশুরা অপুষ্টির স্বীকার। কোনো শিশু যদি বাড়ন্ত বয়সে অপুষ্টিতে ভোগে তাহলে তার মানসিক এবং শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। এমন শিশু যখন পূর্ণ বয়স্ক একজন নাগরিক হবে তখন তার বুদ্ধিমত্তা এবং কর্মক্ষমতা কম থাকবে। ফলে সে নিজে এবং সমাজ তথা দেশ ক্ষতিগ্রস্থ হবে। সয়াবীন একটি পুষ্টিকর খাদ্য বিবেচনায় দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো সহ পৃথিবীর সকল উন্নয়নশীল দেশ সমূহে এর প্রচলন ও ব্যবহার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। আমাদের খাদ্যাভ্যাসে কিছুটা পরিবর্তন এনে সয়াবীন প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় যুক্ত করতে পারলে বাংলাদেশে পুষ্টিহীনতা বহুলাংশে কমে যাবে। সয়াবীন বীজে ট্রিপ্সিন ইনহিবিটর নামক একটি পদার্থ আছে যা হজমে বিপত্তি ঘটায়। ফুটন্ত পানিতে ১৫-২০ মিনিট সিদ্ধ করে নিলে ট্রিপসিন ইনহিবিটর নষ্ট হয়ে যায় এবং সয়াবীনের গন্ধও বহুলাংশ দুর হয়।
পাম অয়েল
অয়েল পাম ফলকে প্রক্রিয়াজাত করে দু’ধরনের তেল পাওয়া যায়। প্রতিটি ফলের মাংসল অংশ থেকে ৯ ভাগ পাম তেল এবং কর্নেল থেকে ১ ভাগ পাম কার্নেল তেল পাওয়া যায়। সদ্য আহরিত পামতেলে বিটা ক্যারোটিন এবং ভিটামিন-ই অধিক পরিমানে থাকে। পাম তেল পরিশোধনের পর সর্ণাভ হলুদ রংয়ের স্বাদহীন, গন্ধহীন তেরে পরিনত হয়। ফ্রাকশনেশন প্রক্রিয়ায় তরল পাম অলেয়িন ও কঠিন পাম ষ্টিয়ারিনকে পৃথক করা হয়। পাম তেলে প্রচুর পরিমাণে এন্টিঅক্সিড্যান্টা থাকায় এবং উচ্চ তাপমাত্রায় স্থায়িত্ব বেশি থাকায় ডীপ ফ্রাইংয়ের কাজে অত্যন্ত উপযোগী। পাম তেল বিভিন্ন শিল্পে কাঁচামাল হিসাবেও ব্যবহৃত হয়। পাম তেলের ফ্যাটি এসিড উপাদানের মধ্যে ৫১% অসম্পৃক্ত যার ১১% লিনোলিক এসিড এবং ৪০% অলেয়িক এসিড। মানব এবং প্রাণী নিয়ে সম্প্রাদিত নিয়ন্ত্রিত সমীক্ষায় জানাগেছে যে মানুষের খাদ্য সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী কোলেষ্টেরল বৃদ্ধিকারক ফ্যাটি এসিড হল মাইরিষ্টিক এসিড। পাম তেলে এ এসিডের পরিমান অতি নগন্য। বিশেষজ্ঞর মতে পাম তেলে বিদ্যমান কোন ফ্যাটি এসিডই কোলেষ্টেরল বৃদ্ধিকারক নয়।
নারিকেল তেল
বাংলাদেশে নারিকেল তেল মাথার চুলে মাখার জন্য ব্যবহার করলেও ইন্দোনেশিয়, ফিলিপিন্স্, শ্রীলংকা, মালয়েশিয়া, ভারতের কর্নাটক, কেরালা, এবং তালিনাড়–সহ বিভিন্ন প্রদেশে নারিকেলের তেল ভোজ্য তেল হিসাবে ব্যবহার করা হয়। নারিকেল তেল ফ্রাকশনেশন করে সাধারন তাপমাত্রায় যে অংশ তরল থাকে সে অংশ ভোজ্য তেল হিসাবে এবং বাকীটা শিল্পে ব্যবহার করা হয়। নারিকেল তেলের ফ্যাটি এসিডের পরিমান দেয় হল।
ক্যোপরিক এসিড ৬-১০%
লরিক এসিড ৪৪-২৫%
মাইরিষ্টিক এসিড ১৩-১৯%
পারিটিক এসিড ৮-১১%
ষ্টিয়ারিক এসিড ১-৩%
অয়েলিক এসিড ৫-৮%
রেড়ী
ভোজ্য তেল হিসেবে নয়, প্রধানতঃ শিল্পে কাঁচামাল হিসাবে ব্যবহারের জন্য বেড়ীর চাষ করা হয়। রেডী তেল আঠাল ও চটচটে কিন্তু কম তাপমাত্রায় জমে যায় না। ফলে পিচ্ছিল কারক এবং পালিশের কাজে লাগে। এ তেল প্লাষ্টিক এবং সিন্থেটিক পদার্থ তৈরির কাজে ব্যবহৃত হয়। রেডীর তেলে রিসিনোলিক এসিড (প্রায় ৮৭%) এবং খৈলে রিসিন নামক পদার্থ থাকে। বীজে তেলের পরিমান বাড়লে রিসিনিন নামক এলাকালয়েডের পরিমান কমে। তেলে ‘রিসিনিন’ এবং খইলে রিসিন, থাকার কারণে রেডীর তেল মানুষের খাদ্য হিসেবে এবং খইল পশু খাদ্য হিসেবে ব্যবহারের অনুপযোগী।
তেলের স্থায়িত্ব
ক্ষুদ্র দানা বিশিষ্ট তৈলবীজ (সরিষা, তিল, গুজিতিল, ও তিস) গুদামজাত করার জন্য বিশেষ যত্ন নেয়ার তেমন প্রয়োজন হয় না। স্বাভাবিক রোদে ৪-৫ দিন শুকালে বীজের পানির পরিমাণ ৬-৭% ভাগে নেমে আসবে। এ অবস্থায় মাটির পাত্রের, টিনে বা বাঁশের ডোলে (গোবরের প্রলেপ দিয়ে) বীজ রেখে মুখ এমনভাবে বন্ধ করতে হবে যেন কীট পতংগ প্রবেশ করতে না পারে। এসকল পাত্র মাটির সংস্পর্শে রাখা যাবে না। বর্ষাকালে এক থেকে দু’বার রোদে শুকিয়ে নেয়া ভাল।
মোটা দানা বিশিষ্ট তৈলবীজ (চীনাবাদাম, সূর্যমুখী, সয়াবীন) গুদামজাত করতে বিশেষ যত্ন নিতে হয়। এ সকল বীজ গুদামজাত করার সময় ৮-৯% ভাগের বেশী পানি বীজে থাকা উচিৎ নয়। অপরিপক্ব বীজ পরিপক্ব বীজের চেয়ে আগেই দূর্গন্ধযুক্ত হয়। অপরিপক্ব বীজে পানি বেশী থাকে বলে তাড়াতাড়ি ছত্রাক দ্বারা আক্রান্ত হয় । ভাংগা বীজ বেছে ফেলতে হবে। বীজ সংরক্ষণের সাথে তেলের গুণাগুণ ও স্থায়িত্ব নির্ভরশীল।
পানি এবং জারক রসের উপস্থিতিতে তেল পঁচে যায়। ফলে দূর্গন্ধযুক্ত হয়ে খাওয়ার অনুপযোগী হয়। বাতাসের অক্সিজেন পানি, আলো ও তাপের উপস্থিতিতে তেলের মান ক্ষতিগ্রস্থ হয়। তেল রেনসিড অর্থাৎ পঁচা গন্ধযুক্ত হয় এবং ব্যবহার উপযোগী থাকে না। তেলের সাথে হাইড্রোজেন অণু রাসায়নিক ভাবে মিশিয়ে কৃত্রিম ঘি বা ডাল্ডা তৈরি করা হয়। এ উপায়ে তেল শক্ত করলে দূর-দূরান্তে বহন করা সহজতর হয় এবং দীর্ঘ দিন ভাল থাকে। বিস্কুট, চকোলেট ইত্যাদি কনফেকশনারী খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুতে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু হাইড্রোজেন সংযোজনের ফলে তেলের গুণগতমান কমে যায়। স্বাস্থ্যের জন্য ডাল্ডার চেয়ে তেল ভাল।
মারজারিন
আজকাল বিদেশে রান্নার কাজে মারজারিন বা কৃত্রিম মাখন ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কম তাপে স্থায়ী এমন উদ্ভিদ তেলগুলোর ঘনত্ব বাড়িয়ে এবং সেই সংগে ৩% লবণ মিশ্রনের মাধ্যমে মারজারিন তৈরি করা হয়। তিল, নারিকেল, পাম, সূর্যমুখী, ভূট্টা, তুলা বীজ প্রভৃতি উদ্ভিদ তেলে থেকে মারজারিন প্রস্তুত করা হয়। হৃদরোগীদের বা হৃদরোগআক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে এমন ব্যক্তিদের প্রাণীজ চর্বি ব্যবহার না করে মারজারিনের ব্যবহার স্বাস্থ্যপ্রদ।
মিশ্রতেল
বর্তমানে হৃদরোগ এবং রক্তচাপ জনিত রোগের প্রাদুর্ভাব কমানোর জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) যৌথভাবে দু’প্রকার তেলের নির্দিষ্ট আনুপাতিক সংমিশ্রনে একটা মিশ্র তেল হিসাবে ব্যবহারের সুপারিশ করেছেন। এ মিশ্রতেলের ব্যবহারে কিছু ফ্যাটি এসিড এবং কোলেষ্টেরলজনিত ক্ষতির সম্ভাবনা অনেক কম। মিশ্রতেল প্রস্তুতি ও তার ব্যবহার প্রস্তাব সুপারিশ আকারে গৃহীত হয়।
“It is advisable to blend brassica oil (high erucic acid content) or partially hydrogenated marine oils (containing long chain fatty acids) with other oils before use, especially by population groups in whose diets fat constitutes high proportion of dietary energy this may be of special importance for children.”
কোলেষ্টেরল
কোলেষ্টেরল সর্ম্পকে সচেতন মানুষের এক ধরনের ভীতি রয়েছে। কোলেষ্টেরলের কথা উঠলেই অনেকে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, মায়োকার্ডিয়াল ইনফ্রাকশন, ইস্কেমিক হৃদরোগ প্রভৃতির কথা ভাবেন। কোলেষ্টেরলের ভয়ে অনেককে অনেক উপাদেয় খাদ্যদ্রব্য পরিহার করতে দেখা যায়। প্রকৃতপক্ষে পুষ্টি সর্ম্পকে ধারণা স্বচ্ছ না থাকায় এমনটি ঘটছে। কোলেষ্টেরল শরীরের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি উপাদান। প্রাণীদেহে কোলেষ্টেরলের আধিক্য বেশি। উদ্ভিদেও সামান্য কোলেষ্টেরল পাওয়া যায়। তবে উদ্ভিজ তেলে কোলেষ্টেরল থাকেনা বললেই চলে (ছক-৩)। কোষ প্রাচীরে, লিভার, কিডনী, মগজ ইত্যাদিতে কোলেষ্টেরল বিদ্যমান। মগজের ৩৫% কোলেষ্টেরল।
কোলেষ্টেরল আমরা খাদ্যের সাথে গ্রহন করি, আবার শরীরে প্রয়োজনে কোলেষ্টেরল উৎপন্ন হয়। স্বাভাবিক সুস্থ ও পরিশ্রমী লোকদের জন্য কোলেষ্টেরল খাওয়ায় তেমন কোন বাধা নিষেধ নাই। তবে হৃদরোগ, বহুমূত্র, উচ্চরক্ত চাপ, মেদ এসব ক্ষেত্রে কোলেষ্টেরল বিপদজনক। শরীরে কোলেষ্টেরলের আধিক্যের জন্য করনারী হৃদরোগ হওয়ায় ঝুকি সর্বাধিক থাকে। বিশেজ্ঞদের মতে রক্তে কোলেষ্টেরল মাত্রা ২০০ মিলিগ্রাম প্রতি ১০০ মিলিলিটার এর মধ্যে থাকা উত্তম। হৃদরোগে ঝুকিপূর্ণ ব্যক্তিদের অধিক চর্বিযুক্ত খাদ্য সীমিত রাখা অথবা ক্ষেত্রবিশেষ বর্জন করা বাঞ্জনীয়।
যুক্তরাজ্যে ৫০ পিপিএম কোলেষ্টেরল যুক্ত তেল কোলেষ্টেরলমুক্ত হিসাবে বিবেচিত হয়।
যুক্তরাষ্টে প্রতি বেলায় খাদ্যে ২ মিলিগ্রাম কোলেষ্টেরল যুক্ত তেল কোলেষ্টেরলমুক্ত হিসাবে বিবেচিত হয়। অর্থাৎ ৫০ পিপিএম কোলেষ্টেরল যুক্ত ৪০ গ্রাম তেল প্রতি বেলায় খাওয়া যেতে পারে।
বিভিন্ন তেলবীজের গড় পুষ্টি উৎপাদান (খাদ্যোপযোগী প্রতি ১০০ গ্রামে)
ফসল ক্যালসিয়াম (মিঃ গ্রাম) ফসফরাস (মিঃ গ্রাম) লৌহ (মিঃ গ্রাম) ক্যারটিন (মিঃ গ্রাম) থিয়ামিন (মিঃ গ্রাম) রাইবোফ্লাভিন (মিঃ গ্রাম) নিয়াøি (মিঃ গ্রাম)
সরিষা ৪৯০ ৭০০ ১৮ ১৬২ ০.৬৫ ০.২৬ ৪
চীনাবাদাম ৯০ ৩৫০ ২.৮ ৩৭ ০.৯০ ০.১৩ ২০
তিল ১৪৫০ ৫৭০ ১.৫ ৬০ ১.০১ ০.৩৪ ৪.৪
সূর্যমুখী ২৮০ ৬৭০ ৫.০ ০ ০.৮৬ ০.২০ ৪.৫
সয়াবীন ২৪০ – ১২ ৪১১ ০.৭৩ ০.৭৬
গর্জনতিল ৩০০ ২৪০ ৫৭ – .০৭ ০.৯৭ ৮.৪
কুসুমফুল – – – – – – –
তিসি ১৭০ ১৭০ ২.৭ ৩০ – – –
উপাত্ত সংগ্রহ : তৈলবীজ গবেষণা কেন্দ্র, বিএআরআই
তিসির উন্নত জাত
তিসির (লিনসীড) উদ্ভিদতাত্বিক নাম Linun Utitatissimum Linn এবং ইহা Linaceae পরিবার ভুক্ত। তিসির বীজ থেকে তেল এবং ইহার কান্ড থেকে আঁশ পাওয়া যায়। বাংলাদেশে যে তিসি চাষ করা হয় তা শুধু তেল নিষ্কাশন কাজে ব্যবহার করা হয়। ইহা এই দেশের কোন কোন অঞ্চলে “মইসনা” নামেও পরিচিত। তেল ফসল হিসেবে তিসির স্থান চতুর্থ অর্থাৎ সরিষা, তিল এবং চীনাবাদামের পর। ১৯৯৫-১৯৯৬ সনে ৭০ হাজার হেক্টর জমিতে তিসির চাষ করা হয় এবং মোট উৎপাদন ছিল ৪৬ হাজার টন অর্থাৎ হেক্টর প্রতি ফলন ছিল ৬৫৭ কেজি। বাংলাদেশের ফরিদপুর, পাবনা, যশোর, রাজশাহী কুষ্টিয়া, দিনাজপুর এবং টাঙ্গাইল জেলায় বেশী পরিমান তিসির চাষ হয়। ইহা একক ফসল এবং মিশ্র ফসল হিসেবে চাষ করা হয়। মিশ্র ফসল হিসেবে ইহার চাষ খুবই জনপ্রিয়। সরিষা, ছোলা, মরিচ, ধনিয়া ইত্যাদির সাথে তিসির মিশ্র ফসল হিসেবে চাষ করা হয়। সাধারণত রবি মৌসুমে জমিতে সঞ্চিত রসেই ইহার চাষ করা হয়। বাংলাদেশে তিসির উপর খুব বেশী গবেষণা করা হয় নাই। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইস্টিটিউটের তৈলবীজ গবেষণা কেন্দ্রে নীলা (লিন-১) একটি জাত উদ্ভাবন করেছে।
উদ্ভাবনের ইতিহাস
দেশের অভ্যন্তরের বিভিন্ন এলাকা এবং বিদেশ থেকে বেশ কিছু জার্মপ্লাজম সংগ্রহ করা হয়েছিল। সেই সমস্ত সংগৃহিত জার্মপ্লাজমগুলি থেকে বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই জাতটি নির্বাচন করা হয়। এর পর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাথমিক ফলন পরীক্ষা এবং আঞ্চলিক ফলন পরীক্ষায় সর্বাধিক ফলন দেয় এবং ১৯৮৮ সনে জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক চাষের জন্য অনুমোদিত হয়। জাতটির নামকরণ করা হয় নীলা।
বৈশিষ্ট্য
এই জাতের গাছের উচ্চতা ৫০-৭৫ সেঃমিঃ পর্যন্ত হয়ে থাকে। গাছের গোড়ার দিকে বেশী ডালপালা হয় না কিন্তু আগার দিকে বেশ কিছু ডালপালা হয়। গাছে ছোট ছোট নীলাভ ফুল ধরে। শাখার আগায় ফুল ধরে এক সুদৃশ্যের সৃষ্টি করে। প্রতি গাছে ৬০-৯০ টি ফল ধরে। ফলগুলি এক প্রকার ক্যাপসুলের মত। প্রতি ক্যাপসুলে ৭-১০টি বীজ থাকে । বীজের আকার ডিম্বাকৃতি, বীজগুলি খুব মসৃণ। হাতে নিলে সাবান বা তেলের তম অনুভুতি হয়। বীজে তেলের পরিমান শতকরা ৩৫-৩৮ ভাগ এবং প্রোটিনের পরিমান ২০-২৪ ভাগ। নীলা জাত ভাল ভাবে যতœ সহকারে চাষাবাদ করলে হেক্টর প্রতি ৮৫০-৯০০ কেজি ফলন পাওয়া যায়।
মাটি ও জলবায়ু
ভারী অর্থাৎ এটেল জাতীয় মাটি তিসি চাষের জন্য সবচেয়ে বেশী উপযোগী। তবে পলি দো-আঁশ ও এটেল দো-আঁশ মাটিতেও তিসির চাষ করা যায। নাতিশীতোষ্ণ ও ঠান্ডা আবহাওয়ায় তিসি ভাল জন্মে। অধিক উৎপাদনের জন্য বিশেষভাবে ঠান্ডা পরিবেশের প্রয়োজন। তবে অত্যাধিক ঠান্ডায় (১০০- ১৫০ ডিগ্রী সেন্ট্রিগ্রেড) তাপমাত্রায তিসি ক্ষতিগ্রস্থ হয়, অধিক বৃষ্টিপাত তিসির জন্য মোটেই ভাল নয়। বাংলাদেশে যে মৌসুমে বৃষ্টি হয় না অর্থাৎ রবি মৌসুমে জমিতে সঞ্চিত রসেই ফসলটি জন্মাতে পারে।
জমি তৈরী
তিসি যেহেতু ছোট দানাদার বীজ সেহেতু সরিষা এবং তিলের মত জমি খুব ভাল করে চাষ করতে হবে। চার পাঁচটি আড়াআড়ি চাষ ও দু’তিনটি মই দিলেই জমি প্রস্তুতের কাজ হয়ে যায়। তিসির জমিতে ঢেলা উঠার সম্ভাবনা থাকে সেগুলি মুগুরের সাহায্যে ভেঙ্গে দেয়া ভাল।
বপনের সময় ও বীজের হার
কার্তিক মাস তিসি বপন করার উপযুক্ত সময়। কৃষকেরা সাধারণত বীজ ছিটিয়ে বপন করে থাকে। তবে সারি করে বীজ বপন করাই উত্তম প্রতি সারির মধ্যে ৩০ সেঃমিঃ ও সারিতে চারার মধ্যে ৫-৭ সেঃমিঃ ফাঁকা রাখা ভাল। ছিটিয়ে বপন করলে হেক্টর প্রতি ১৫-১৭ কেজি, আর সারিতে বুনলে হেক্টর প্রতি ১০-১৫ কেজি বীজের প্রয়োজন হয়।
সার প্রয়োগ
সাধারণত কৃষকেরা তিসির ক্ষেতে সার প্রয়োগের কথা চিন্তা করে না। তবে ফসলটিতে নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশ এ তিন জাতীয় সার প্রয়োগ করা প্রয়োজন এবং তাতে ভাল ফলন পাওয়া যায়।
নিম্নে বর্ণিত হারে সার প্রয়োগ করা দরকার
সারের নাম প্রতি হেক্টরে (কেজি) প্রতি একরে (কেজি) প্রতি বিঘায (কেজি)
ইউপিয়া ৭৫ ৩০ ১০
টি,এস,পি ১২০ ৪৮ ১৬
এম.পি ৪৬ ১৯ ৬
জমির উর্বরতা এবং কৃষি পরিবেশ অঞ্চল ভেদে সারের পরিমান কম বেশী হতে পারে।
জমি তৈরীর শেষ পর্যায়ে অর্থাৎ শেষ চাষের আগে সব সার ছিটিয়ে প্রযোগ করা দরকার। এর পর চাষ ও মই দিতে হয়।
আগাছা দমন ও অন্যান্য পরিচর্যা
তিসি আগাছার সঙ্গে মোটেই প্রতিযোগীতা করতে পারে না। সেজন্য তিসি ক্ষেতে আগাছা সময়মত পরিস্কার করা খুবই বাঞ্চনীয়। সারিতে বপনকৃত ফসলে গাছের গোড়ায় কিছু কিছু মাটি টেনে দেয়া ভাল।
আগাছা পরিস্কার করার পর পরই বাকী ইউরিয়া উপরি প্রয়োগ করতে হবে। হঠাৎ করে বৃষ্টিতে অথবা সেচের আধিক্যজনিত কারণে জমির উপর পানি জমে গেলে তা যথাশিঘ্র নিষ্কাশিত করে দেয়া ভাল।
কীটপতঙ্গ ও রোগ দমন
তিসি ফসলে রোগ-বালাই ও কীট পতঙ্গের আক্রমন তেমন উল্লেখযোগ্য নয়। তবে কোন কোন সময় জাবপোকার আক্রমন হতে পারে। সেক্ষেত্রে প্রতি হেক্টরের জন্য ৫.৭৬ গ্রাম ম্যালথিয়ন ৫৫০ লিঃ পানির সঙ্গে মিশিয়ে সিঞ্চন যন্ত্রের সাহায্যে ক্ষেতে প্রয়োগ করলে পোকা দমন হয়ে যায়।
বাংলাদেশে তিসির মোট সাতটি রোগ সনাক্ত করা হয়েছে। সবগুলিই ছত্রাকজনিত রোগ। এগুলির মধ্যে পাতা ঝলসানো রোগটি উল্লেখযোগ্য।
অলটারনেরিয়া লিনি নামক এক প্রকার ছত্রাকের কারণে এ রোগটি সংঘটিত হয়ে থাকে। প্রথমে পাতার উপর ঘন বাদামী বর্ণের অসম আকৃতির দাগ পড়ে। রোগের ব্যাপকতায় পাতা শুকিয়ে যায়। এ রোগের প্রতিকারের জন্য বীজ শোধন করতে হয়। বীজ বপনের পূর্বে ভিটাভেক্স-২০০, ক্যাপ্টেন (২-৩ গ্রামছত্রাকনাশক/ কেজি বীজ) ইত্যাদির সাহায্যে বীজ শোধনের মাধ্যমে বীজ বাহিত এ ছত্রাক দমন করা যায়।
ফসল কাটা ও মাড়াই ঝাড়াই
তিসি ফাল্গুন-চৈত্র মাসে পাকে। পাকলে গাছ এবং ফল সোনালী বা কিছুটা তামাটে রং ধারণ করে। ফল ভালভাবে পাকার পরই গাছ কাটা বা উপড়ানো উচিৎ কারণ ফল কাঁচা থাকলে বীজ অপুষ্ট হয়ে যায, তাতে বীজের ওজন কম হয় এবং তেলে পরিমান হ্রাস পায়। আবার ফল ক্ষেতে বেশী পেকে গেলে ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে। ফল (ক্যাপসুল) তখন একটা চাপ খেলে অথবা ঝাকি লাগলে ফেটে যায় এবং বীজ পড়ে যায়। সুতরাং উভয় দিকের প্রতি লক্ষ্য রেখে যখন দেখা ফলগুলো পেকে ফাটার উপক্রম হয়েছে তখন ফসল কাটা উচিৎ ফসল কেটে বা উপড়িয়ে নেয়ার পর গাছগুলি ছোট ছোট আঁটি বেধে বাড়ীর আঙ্গিনায় স্তুপ করে রাখা যায়। কয়েকদিন রোদে দিয়ে গাছ ভালবাবে শুকাবার পর হাত লাঠির সাহায্যে আস্তে আস্তে আঘাত করলেই ফল ফেটে বীজ বের হয়ে আসে। তখন গাছগুলো ঝাাড়া দিয়ে বীজ হতে আলাদা করে ফেলা যায়। তারপর ডাটা খোসাসহ বীজ কুলা, চালনী প্রভৃতির সাহায্যে পরিস্কার করে নেয়া যায়।
বীজ শুকানো ও গুদামজাত করণ
তিসির বীজ দু’তিন বার রোদ দিয়ে শুকিয়ে নিতে হয়। মুখে ঢাকনাযুক্ত কেরোসিন টিনে অথবা পলিথিন ব্যাগে বীজ রেখে তা গুদামজাত করা যায়।
ফলন
সাধারণভাবে তিসির প্রতি একর ৯-১০ মণ অর্থাৎ প্রতি হেক্টরে ৮.৫- ৯.৫ কুইন্টাল বা ৮৫০-৯৫০ কেজি মাত্র। তবে উন্নত পদ্ধতিতে চাষ করলে ফলন অনায়াসেই প্রতি হেক্টরে ১১-১২ কুইন্টাল, এমনকি এর বেশীও হতে পারে।
তেল নিষ্কাশন ও ব্যবহার
তিসির বীজে শতকরা ৩৫-৩৮ ভাগ তেল থাকে। ঘানিতে তিসি হতে শতকরা ২৮ ভাগ তেল আহরণ করা যেতে পারে। তিসির খৈলে ৭-১০। ভাগ তেল থেকে যায়। তিসির তেল ভোজ্য নয় তবে এ দেশের কোন কোন অঞ্চলে বিশেষ করে উত্তর বঙ্গে সরিষার তেলের সাথে মিশিয়ে তিসির তেল বিক্রি করা হয়। এর বিভিন্ন ব্যবহারের মধ্যে যন্ত্রপাতির জন্য গ্রিজ, সাবান তৈরী ইত্যাদি প্রধান। তিসির বীজ ও খৈলে তেলসহ অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থ কি মাত্রায় থাকে তা নিু তালিকায় দেখানো হয়।
উপাদান বীজ খৈলে
পানি ৬.০% ১১.৫%
প্রোটিন ২০.৩% ২৮.৩%
তেল ৩৮.০% ১০.০%
কার্বোহাইড্রেড ২৯.০% ৩১.৩%
ছাই ২.০% ৮.০%
আঁশ ৪.৮ % ১১.০%
উপাত্ত সংগ্রহ : তৈলবীজ গবেষনা কেন্দ্র, বিএআরআই
সূর্যমূখীর উন্নত জাত: কিরণী
সূর্যমূখী ফুল হিসাবে আমাদের দেশে বহুল পরিচিত। কিন্ত্র তৈলবীজ হিসাবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এর চাষ হয়ে থাকে। সম্প্রতি আমাদের দেশেও তৈলবীজ হিসাবে সূর্যমূখীর চাষ হচ্ছে। আমাদের দেশে সূর্যমূখীর চাষাবাদের জন্য ‘কিরণী’ নামে একটি অনুমোদিত জাত আছে।
উদ্ভাবনের ইতিহাস
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের তৈলবীজ গবেষণা কেন্দ্রে ১৯৭৫ ইং সনে পোলান্ড থেকে এলকোপলস্কি নামক একটি সূর্যমূখীর জাত আনা হয়। ইনস্টিটিউটের বিভিন্ন কেন্দ্রে এর চাষ করে এর মধ্য থেকে খাটো ও আগাম গাছ বাছাই করা হয়। এভাবে কয়েক বৎসর বাছাই করার পর এ জাতটির উদ্ভাবন করা হয়। পরবর্তীতে এই বাছাইকৃত জাতটি বিভিন্ন কেন্দ্রে আগাম ও খাটো জাত হিসাবে অন্যান্য আমদানীকৃত জাতের তুলনায় ভালো ফলাফল প্রদর্শন করে। পরে ১৯৮২ ইং সনে জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক ‘কিরণী’ নামে কৃষকের ক্ষেতে চাষাবাদের জন্য অনুমোদন পায়।
জাতের বৈশিষ্ট্য
সূর্যমূখী হচ্ছে বড় পাতা বিশিষ্ট (ইৎড়ধফ ষবধাবফ), শাখাবিহীন, ঔষধি (অহহঁধষ) জাতীয় তৈলবীজ শস্য। প্রতিটি গাছের অগ্রভাগে একটি গোল পুস্পস্তবক থাকে, যাকে যবধফ বলা হয়। হেডের চর্তুদিকে বড়, হলুদ পাঁপড়ীযুক্ত ৎধু ভষড়ৎবঃ ও মধ্যে ছোট আকারের উরংপ ঋষড়ৎবঃ থাকে। উরংপ ভষড়ৎবঃ হতে বীজ উৎপন্ন হয়। সূর্যমূখী সারাবৎসর চাষ করা যায় অর্থাৎ ইহা চযড়ঃড়-ৎবৎরড়ফ ংবহংরঃরাব নহে।
কিরণীর বৈশিষ্ট সমূহ নিম্নে বর্ণিত হলো
উচ্চাত : ৯০-১১০ সেমি
ফসলের জীবনকাল : ৯০- ১০০ দিন।
হেডের ব্যাস : ১০-১৪ সে.মি।
বীজের রং : কালো
ফলন : হেক্টরে ১২৫০-১৮০০ কেজি।
বীজের তেলের পরিমান : শতকরা ৪২-৪৪ ভাগ।
মাটি ও আবহাওয়া
সূর্যমূখী সাধারণত সব মাটিতেই জন্মে। তবে দো-আঁশ মাটিতে এর চাষ ভাল হয়ে থাকে। বৃষ্টি বা সেচের পানি আটকে থাকে না এমন জমিতে ফলন বেশী পাওয়া যায়। সূর্যমূখী সারা বাছর ধরে চাষ করা যায়। তবে বর্ষাকালে মাটিতে অত্যাধিক রস থাকায় বীজ বুনলে পঁচে যাবার সম্ভাবনা থাকে। যেখানে মাটিতে বোরণ, জিংক, ও ম্যাগনেশিয়ামের ঘাটতি আছে সে সব জমিতে অবশ্যই পরিমাণ মত উক্ত সার প্রয়োগ করা উচিৎ। উত্তরাঞ্চরে জেলাগুলোতে আমন ধান কাটার পর পরই সূর্যমূখীর চাষ করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। খরা ও লবণাক্ততা সহিষ্ণু হওয়ার ফলে বরেন্দ্র এবং দেশের দক্ষিণাঞ্চলে সূর্যমূখীর চাষ করা সম্ভব।
জমি তৈরি
জমি ৪-৫ বার চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুর ঝুরে করে নিতে হবে। মই দিয়ে জমি সমান করার পর ছোট ছোট প্লট তৈরি করলে পরবর্তীতে জমিতে সেচ দেওয়া, পানি নিষ্কাশন ও অন্তর্বর্তীকালীন পরিচর্যার সুবিধা হয়।
বপনের সময়
সারা বৎসর সূর্যমূখীর চাষ করা যায়। প্রধান মৌসুম গুলি নিুে বর্ণিত হলে
মৌসুম বপনের সময় মন্তব্য
রবি অগ্রহায়ণ (মধ্য নভেম্বর-মধ্যডিসেম্বর) কোন প্রাকৃতিক দূর্যোগে পতিত হয় না বলে এ সময় ফলন ভালো হয়।
খরিপ-১ বৈশাখ (মধ্যএপিল- মধ্য মে) কালবৈশাখী ঝড়ে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কর্তনের সময় অতি বৃষ্টির ফলে বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ বাধাগ্রস্থ হয়। ফলন তুলনামুলকভাবে কম হয়।
খরিপ-২ ভাদ্র (মধ্য আগস্ট-মধ্য সেপ্টেম্বর) কোন কোন বছর দেরীতে অতিরিক্ত বৃষ্টির ফলে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বপনের পদ্ধতি
সূর্যমূখীর বীজ সারিতে বুনতে হয়। সারি থেকে সারির দূরত্ব ৫০ সেঃমিঃ এবং সারিতে গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ৩০ সেঃমিঃ রাখা দরকার। এভাবে বীজ বপন করলে হেক্টর প্রতি ৮-১০ কেজি বা প্রতি বিঘার জন্য ১-১.৫০ কেজি বীজের প্রয়োজন হয়। তবে শংকর জাতের সূর্যমূখীর বীজ আকার ছোট হওয়ায় হেক্টর প্রতি ৬-৮ কেজি বীজের প্রয়োজন। জমিতে বীজ বপনের পূর্বে বীজের অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা পরীক্ষা এবং বীজ শোধন করা একান্ত প্রয়োজন।
বীজের অংকুরোধদগম ক্ষমতা পরীক্ষা
সূর্যমূখী বীজের অংকুরোদগম ক্ষমতা আদ্র আবহাওয়াতে বেশীদিন থাকে না। সে জন্য বীজ বপনের পূর্বে বীজ গজানোর ক্ষমতা অবশ্যই যাচাই করা প্রয়োজন। বপনের সময় বীজের গজানোর ক্ষমতা শতকরা ৯০ ভাগের উপরে থাকা আবশ্যক। এ ক্ষমতা কম হলে বীজের হার বাড়িয়ে জমিতে বপন করা যেতে পারে।
– পরীক্ষার জন্য বীজের ভান্ড থেকে নমুনা হিসাবে ১০০টি বীজ সংগ্রহ করুন।
– এক টুকরা কাপড় পানিতে ভিজিয়ে একটি প্লাষ্টিকের পাত্রের উপর বিছিয়ে দিন।
– কাপড়ের উপর নমুনার বীজগুলো ভালভাবে ছড়িয়ে দিন।
– অন্য এক টুকরা ভিজে কাপড় দিয়ে বীজ ঢেলে অন্ধকার জায়গায় রেখে দিন।
– তিন চার দিনের মধ্যেই বীজগুলো গজিয়ে যাবে।
– যতগুলো বীজ গজাবে সেই সংখ্যাটিই বীজের অংকুরোদগম ক্ষমতার শতকরা হার।
বীজ শোধন
মাটি ও বীজ থেকে উদ্ভুত বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধের জন্য বীজ শোধন করা একান্ত জরুরী। বীজ শোধনের ফলে প্রধানতঃ বীজ বাহিত রোগ দমন হয়। ফলে জমিতে আশানুরূপ গাছের সংখ্যা পাওয়া যায় এবং ফলন ভালো হয়।
ভিটাভেক্স-২০০ ছত্রাক নিবারন দ্বারা বীজ শোধন করা হয়। প্রতি কেজি সূর্যমুখী বীজের জন্য মাত্র (তিন) গ্রাম ভিটাভেক্স-২০০ প্রয়োজন। একটি বড় প্লাষ্টিকের ঢাকনা যুক্ত বোয়মে বা পাত্রে সূর্যমুখীর বীজ নিয়ে পরিমাণ মত ঔষধ মিশিয়ে পাত্রের মুখ বন্ধ করে ভালভাবে ঝাকিয়ে একদিন রেখে দেবার পর বীজ জমিতে বপন করতে হবে।
সার, সেচ ও অন্যান্য পরিচর্যা
সঠিক সময়ে সার প্রয়োগে সূর্যমুখীর অধিক ফলন পাওয়া যায়। বর্তমানে বাংলদেশের আবাদযোগ্য জমিকে ৩০টি কৃষি পরিবেশ অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে এবং প্রতিটি অঞ্চলে মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা করে ফসলের সঠিক সারের মাত্রা নির্ধারণকরা হয়েছে। তবে সাধারণ ভবে জমির উর্বরতা অনুসারে সূর্যমুখী চাষের জন্য হেক্টর প্রতি সারের পরিমাণ নিম্নরূপঃ
ইউরিয়া ১৮০ থেকে ২০০ কেজি
টিএসপি ১৬০ ,, ১৮০ ,,
এমপি ১৫০ ,, ১৭০ ,,
জিপসাম ১৫০ ,, ১৭০ ,,
জিংক সালফেট ৮ ,, ১০ ,,
বরিক এসিড ১০ ,, ১২ ,,
ম্যাগনেশিয়াম সালফেট ৮০ ,, ১০০ ,,
শুধুমাত্র রংপুর, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাও, বগুড়া, জয়পুরহাট, নওগা ও রাজশাহী এলাকার জন্য ম্যাগনেশিয়াম সালফেট প্রয়োজন। ইউরিয়া সারের অর্ধেক এবং বাকী সব সার শেষ চাষের সময় জমিতে ছিটিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। বাকী অর্ধেক ইউরিয়া সার দু’ভাগ করে প্রথমে চারা গজানোর ২০-২৫ দিন পর এবং দ্বিতীয় ভাগ ৪০-৪৫ দিন পর বা ফুল ফোটার পূর্বে প্রয়োগ করতে হবে। প্রতিবার সেচের পর সার প্রয়োগ করে মাটি কুপিয়ে দিতে হবে। রবি মৌসুমে প্রয়োজনানুসারে ২/৩ বার সেচ দিলে বেশী ফলন পাওয়া যায়। সেচের পর সার প্রয়োগ করা উত্তম। খরিফ মৌসুমে সাধারণত সূর্যমুখীতে কোন সেচের প্রয়োজন হয় না। সূর্যমুখীর জমিতে ১ম ইউরিয়া সার উপরি প্রয়োগের পূর্বে জমি থেকে অতিরিক্ত চারা অবশ্যই তুলে ফেলতে হবে। কোন স্থানে এক সাথে একটির বেশী চারা রাখা উচিৎ নয়। সূর্যমুখীর জমি সব সময় আগাছা মুক্ত রাখতে হয়। এছাড়া সেচ দেবার পর জো আসার সাথে সাথে মাটি কোদাল দিয়ে কুপিয়ে ঝুরঝুরে করে দিতে হয়। শেষ ইউরিয়া সার প্রয়োগ করার পর গাছের গোড়ায় অল্প মাটি তুলে দিলে ভাল হয়। সূর্যমুখীর ফলন বৃদ্ধির জন্য ফুল ফোটার সাথে সাথে এক মাসের জন্য জমিতে মৌমাছির বাক্স স্থাপন করা দরকার। যেহেতু সূর্যমুখীর একটি পরপরাগায়ীত (ঈৎড়ংং চড়ষষরহধঃবফ) শষ্য সেহেতু পর্যাপ্ত পরিমাণে মৌমাছি না থাকলে ফলন কমে যায়। জমিতে মৌমাছির বাক্স স্থাপন করলে একদিকে যেমন সূর্যমুখীর ফলন বৃদ্ধি পাবে অন্যদিকে বাক্স থেকে খাঁটি মধু সংগ্রহ করা যাবে। প্রতি তিন হেক্টর জমির জন্য একটি মৌমাছির বাক্সই যথেষ্ট।
রোগ ও পোকার আক্রমণ এবং প্রতিকার
সূর্যমুখী ফসলে রোগ ও পোকার আক্রমণ কম হয়। তবে ইদানিং এর পাতায় দাগ পড়া রোগ বা অলটারনেরিয়া লিফ ব্লাইট নামকছত্রাক রোগ দেখা যাচ্ছে। ছত্রাকের আক্রমণ বেশী হলে গাছের পাতা সম্পূর্ণ কালো হয়ে যায় এবং ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। বপনের পূর্বে ভিটাভেক্স-২০০ নামক ঔষধ দিয়ে বীজ শোধন করে নিলে এ রোগের আক্রমণ হয় না। জমিতে ছত্রাকের আক্রমণ দেখা দেবার সাথে রোভরাল ৫০ ডাব্লু-পি ২ গ্রাম ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে ১২-১৫ দিন পর পর ৩ থেকে ৪ বার দুপুরের পর জমিতে ¯েপ্র করলে আক্রমণ কমে যাবে। রোভরাল পাওয়া না গেলে রিডোমিল-এম-জেড বা ডাইথেন-এম-৪৫ একই প্রক্রিয়ায় জমিতে প্রয়োগ করতে হবে। সূর্যমুখীর জমিতে চারা অবস্থায় গোঁড়া পঁচা রোগের আক্রমণ হতে পারে। এ রোগ স্কেরোসিয়ম রলফসি নামক জমিতে ছত্রাক দ্বারা বিস্তার লাভ করে। আক্রান্ত গাছের গোড়ায় তুলার ন্যায় সাদা আশ ও সরিষার দানার মত বাদামী দানা দেখা যায়। আক্রমণ বেশী হলে সর্ম্পূর্ণ গাছ মরে যায়। গোঁড়া পঁচা এবং ঢলে পড়া রোগ বীজ ও মৃত্তিকা বাহিত বলে বপনের পূর্বে বীজ ভিটাভেক্স-২০০ ঔষধ দিয়ে শোধন করে নিলে এসব রোগের আক্রমণ কমে যায়। জমি স্যাঁতস্যাঁতে ভিজা থাকলে রোগের আক্রমণ বেশী হয়। সে জন্য মাটি নিড়ানী বা কোদাল দিয়ে কুপিয়ে আলগা করে শুকিয়ে ফেললে ছত্রাকের আক্রমণ কমে যায়। কোন কোন সময় সূর্যমুখীর পাতায় বিছা পোকার আক্রমণ হয়ে থাকে। শুরুতে পাতার নীচের দিকে বিছা পোকার শুককীট গুলো এক সংগে থাকে। পরবর্তীতে শুককীটগুলো বড় হয়ে সারা জমিতে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় এদেরকে দমন করা কঠিন। সে জন্য প্রথম অবস্থায় শুককীট গুলো দেখা দেবার সাথেসাথে মেরে ফেলা উচিৎ। সকালে একটি প্লাস্টিকের বা টিনের বালতিতে কিছু পানি ও তাতে অল্প পরিমাণ ডিজেল বা কেরোসিন নিয়ে আক্রান্ত পাতা বোটাসহ ছিড়ে বালতিতে চুবিয়ে দিলেই সব শুককীট মরে যাবে। এভাবে অল্প সময়ে এবং অল্প খরচে বিছা পোকা দমন করা যায়। পোকার আক্রমণ বেশী হলে রিপকর্ড-১০ ইসি অথবা সিম্বুস-১০ ইসি প্রতি লিঃ পানিতে ১ মিঃ লিঃ হারে ঔষধ মিশিয়ে ¯েপ্র করতে হবে। প্রতি হেক্টরের জন্য আনুমানিক ৬০০ লিটার পানি এবং সেই অনুপাতে ঔষধের প্রয়োজন।
ফসল কাটা ও শুকানো
সূর্যমুখী বপনের ৬৫-৭০ দিন পরে ফুলের বীজ পুষ্ট হওয়া শুরু হয়। এ সময় টিয়া পাখীর উপদ্রব শুরু হয়। খুব ভোরে এবং সন্ধ্যার পূর্বে পাখীর আক্রমণ বেশী হয়। বীজ পুষ্ট হওয়া থেকে শুরু করে ফসল কাটা পর্যন্ত জমিতে সকাল বিকাল পাহারার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। জমির মাঝখানের চেয়ে চারি ধারে পাখীর আক্রমণ বেশী হয়। বাঁশেরর চোঙ বা ঘন্টা বাজিয়ে অথবা জমির মাঝে কেরোসিনের টিন উঁচু করে বেধে রশির সাহায্যে দূর থেকে টেনে শব্দ করলে জমিতে পাখী বসতে পারে না। বিচ্ছিন্ন জয়গায়, স্বল্প খন্ড জমিতে সূর্যমুখীর চাষ করলে পাখীর উপদ্রব বেশী হয়। এক সংগে বেশী এলাকায় সূর্যমুখীর চাষ করলে ফসলের ক্ষতি অনুপাতিক হারে কম হয়।
সূর্যমুখী কাটার সময় হলে গাছের পাতা হলদে হয়ে আসে এবং পুস্পস্তবক (মাথা) সহ গাছগুলো নুয়ে পড়ে। বীজগুলো কালো রং ধারণ করে এবং দানাগুলো পুষ্ট ও শক্ত হয়। মৌসুমে অনুসারে ফসল পাকতে ৯০-১১০ দিন সময় লাগে। সঠিক ভাবে সূর্যমুখীর চাষ করলে হেক্টর প্রতি ১৫০০-১৮০০ কেজি বা প্রতি একরে ১৬-২০ মণ বীজ উৎপাদন করা সম্ভব।
গাছ থেকে পুষ্পস্তবক সংগ্রহ করে রোদে ২/১ দিন ছড়িয়ে দিতে হবে। এসময় মাথাগুলো নরম হয়ে যায় ফলে শক্ত বাঁশের বা কাঠের লাঠি দিয়ে সূর্যমুখীর মাথার পিছনে হালকা আঘাত করলে বেশীর ভাগ বীজ ঝরে পড়ে। অবশিষ্ট বীজ হাত দিয়ে ছাড়িয়ে নিতে হয়। বীজ ভালভাবে ঝেড়ে ৪/৫ দিন রোদ্রে শুকানো উচিৎ। বীজ ছড়ানোর পর মাথাগুলো গরুর খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করা যায়। ফসল কর্তনের পর সূর্যমুখীর গাছ ও পুস্পস্তবক জ্বালানী হিসাবে ব্যবহার করা যায়।
তৈল নিঃস্কাশন
সূর্যমুখীর বীজ ৪০-৪৫% তেল থাকে। স্থানীয় ঘানীতে বীজ ভাঙালে ২৫% তেল পাওয়া যায়। কিন্তু এক্সপেলারে বা ইলেকট্রিক ঘানীতে ভাঙ্গিয়ে সরাসরি এ তেল ভোজ্য তেল হিসাবে ব্যবহার করা যায়। একটি পাতলা কাপড় দিয়ে ছেঁকে নিলে তেলের গাঁদ আলাদা হয়ে যায়। তেলের শিশি/ পাত্রে এক চিমটি লবণ ফেলে দিলে তেল অনেক দিন ভালো থাকে। সূর্যমুখীর খৈল গরু ও মহিষের উৎকৃষ্ট খাদ্য।
বীজ সংরক্ষণ
সূর্যমুখীর বীজ এর অংকুরোদগম ক্ষমতা উষ্ণ ও আদ্র আবহাওয়াতে লোপ পায়। সে জন্য বিশেষ যত্ন সহকারে বীজ সংক্ষণ করা দরকার। সংরক্ষণের পূর্বে বীজ কয়েকবার রোদ্রে শুকিয়ে নিতে হবে যাতে বীজের আদ্রতা শতকরা ৮-১০ ভাগ নীচে নেমে আসে। ৪/৫ দিন রোদ্রে ৫/৬ ঘন্টা করে বীজ শুকালে বীজের আদ্রতা শতকরা ১০ ভাগের নীচে নেমে আসে। আদ্রতা শতকরা ১০ ভাগের নীচে হলো কিনা এটা জানার সহজ উপায় হল ৩/৪ দিন রোদ্রে শুকানো ঠান্ডা বীজ দু’আংগুলের মাঝে নিয়ে চাপ দিলেই উপরের কালো খোসা ভেঙ্গে যাবে। ভিতরের সাদা চ্যাপ্টা শাঁশ শক্ত থাকবে। সংরক্ষণের পূর্বে বীজ অবশ্যই ভালভাবে ঝেড়ে পরিস্কার করতে হবে। রোদে শুকানো বীজ ছায়ায় রেখে ঠান্ডা হওয়ার পর সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। যদি তেলের ড্রাম, কেরোসিন, দুধ বা বিস্কুটের টিনে বীজ সংরক্ষণ করা হয় তবে পাত্রগুলো অবশ্যই:-
০ সম্পূর্ণ পরিস্কার হতে হবে।
০ পাত্রে কোন প্রকার ছিদ্র থাকা চলবে না।
০ পাত্রের ঢাকনা যেন সঠিকভাবে আটকানো যায়, যাতে পাত্রের ভিতর বাতাস প্রবেশ করতে না পারে।
পরিস্কার, শুকনো, ঠান্ডা বীজ শক্ত, মোটা পলিথিন প্যাকেটে ঢেলে মুখ ভালভাবে সূতা দিয়ে শক্ত করে বাঁধতে হবে। যে পাত্রেই বীজ রাখা হোক না কেন সব সময় যেন বীজ দ্বারা পাত্র ভর্তি থাকে সে দিকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। বীজের অভাব হলে শুকানো বালি পাত্রের নীচের ও বীজের উপরে দিয়ে পাত্র ভর্তি করতে হবে।
* বীজ সংরক্ষণের পাত্র মাটিতে না রেখে অবশ্যই শুকানো উঁচু মাচাতে বা ঝুলন্ত অবস্থায় রাখা উচিৎ।
* মাটির হাড়ি বা কলসীতে বীজ সংরক্ষণ করতে চাইলে কমপক্ষে দু’বার করে আলকাতরার প্রলেপ দিয়ে শুকিয়ে নিতে হবে।
* টিন, মাটির বা ধাতব পাত্রে বীজ রাখা সম্ভব না হলে মোটা ছিদ্রহীন পলিথিন বস্তা চটের বস্তার মধ্যে রেখে শক্ত করে মুখ বন্ধ করে উঁচু শুকনো জায়গায় বীজ সংরক্ষণ করা যায়।
* দুই মাস পর পর বীজ রোদ্রে শুকিয়ে পূর্বের ন্যায় সংরক্ষণ করে রাখলে এক রবি মৌসুমের বীজ পরবর্তী রবি মৌসুমে বপন করা সম্ভব হয়।
প্রতি বছর দেশে তৈল/ তৈলবীজের ঘাটতি পূরনের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে তৈল/তৈলবীজ আমদানী করতেহয়ে। আমদানীর পরিমাণ কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা বাঁচাতে হলে আরও বেশী তৈলবীজ ফসলের চাষ করতে হবে। আমাদের দেশে তৈলবীজের প্রধান উৎস সরিষা কিন্তু নানাবিধ কারণে সরিষার চাষ বৃদ্ধির সম্ভাবনসা সীমিত। কাজেই তৈলবীজ হিসাবে সূর্যমুখীর চাষ করলে ভোজ্য তেলের ঘাটতি পূরণ সম্ভব।
সূর্যমুখীর বীজ হতে উৎকৃষ্টমানের ভোজ্য তেল পাওয়া যায়। সূর্যমুখীর বীজ শতকরা ৪০-৪৫ ভাগ তেল আছে। খাদ্যমানের দিক থেকে এ তেল অনেক উন্নত, এতে প্রায় শতকরা ৫৫ ভাগ লিনোলেইক এসিড বিদ্যমান। ফলে স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য বিশেষ করে হৃদরোগীদের জন্য সূর্যমুখীর তেল খুবই উপকারী। এই তেলে ক্ষতিকারক ইরোসিক এসিড নাই। কাজেই দেশে ভোজ্য তেলের ঘাটতি পূরণ করার জন্য সূর্যমুখীর চাষ সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।
উপাত্ত সংগ্রহ : তৈলবীজ গবেষনা কেন্দ্র, বিএআরআই
তেল ফসলের প্রধান প্রধান রোগ ও প্রতিকার
মানুষের জীবন ধারনের জন্য খাদ্যশস্যের সাথে সাথে তেলবীজ ফসলের গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশে আবাদকৃত তেলবীজ ফসলসমূহের মধ্যে সরিষা, তিল, চীনাবাদাম প্রধান এবং সূর্যমুখী, সয়াবীন ও তিসি অপ্রধান। এসব তেলবীজ ফসলের আবাদ ও ফলন যাতে বৃদ্ধি পায়, সে দিকে আমাদের সকলের লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন। আমাদের দেশের মাটি ও জলবায়ু তেলফসল চাষের উপযোগী হলেও বিভিন্ন কারণে এর ফলন হ্রাস পাচ্ছে। উৎপাদন হ্রাসের বিভিন্ন কারণসমূহের মধ্যে রোগ-বালাইয়ের আক্রমণ অন্যতম। তেল বীজের ফলন বৃদ্ধির জন্য ক্ষতিকারক রোগ সমূহের আক্রমণ থেকে ফসলসমূহকে রক্ষা করা একান্ত প্রয়োজন। তৈলবীজ গবেষণা কেন্দ্র, বি,এআর,আই এর শুরু থেকেই বিভিন্ন তেলবীজ ফসলের ক্ষতিকারক রোগসমূহের প্রতিকারের উপর পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে। গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফলের উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন তেলফসলের প্রধান ক্ষতিকার রোগসমূহের লক্ষণ, বিস্তার এবং তাদের প্রতিকারের কৌশলসমূহ নিম্নে বর্ণনা করা হলো।
সরিষা
বাংলাদেশে উৎপাদিত তেল ফসলের মধ্যে সরিষাই প্রধান। দেশের প্রায় সব এলাকাতেই কমবেশি সরিষার চাষ হয়ে থাকে। তবে রোগ-বালাই সরিষা উৎপাদনের একটি প্রধান প্রতিবন্ধক। সরিষার বিভিন্ন রোগ-বালাই এর মধ্যে পাতা ঝলসানো, ডাউনি মিলডিউ রোগ এবং স্বপুষ্পক পরজীবী উদ্ভিদই বেশি ক্ষতিকর।
১। পাতা ঝলসানো রোগ
আমাদের দেশে সরিষার রোগসমূহের মধ্যে পাতা ঝলসানো রোগটি অন্যতম। অলটারনেরিয়া ব্রাসিসী নামক ছত্রাক দ্বারা এ রোগের সৃষ্টি হয়।
লক্ষণ
সরিষা গাছের এক মাস বয়স থেকে শুরু করে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত গাছে এ রোগ আক্রমণ করতে পারে। প্রাথমিক অবস্থায় এ রোগের লক্ষণ সরিষা গাছের নিচের বয়স্ক পাতায় পরিলক্ষিত হয়। পরবর্তীতে এ ছত্রাকের আক্রমণে গাছেল পাতা এবং শুটিতে গোলাকার, গাঢ় বাদামী বা কালো দাগের সৃষ্টি হয়। দাগগুলো ধূসর, গোলাকার সীমারেখা দ্বারা আবদ্ধ থাকে। এ দাগগুলো একত্রিত হয়ে বড় দাগের সৃষ্টি করে। আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে পাতা ঝলসে যায়। এর ফলে সরিষার ফলন মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়।
আক্রান্ত বীজ, বিকল্প পোষক ও বায়ুর মাধ্যমে এ রোগ বিস্তার লাভ করে বৃষ্টি ও ঠান্ডা আবহাওয়া এ রাগ বৃদ্ধির সহায়ক।
প্রতিকার
ক) রোগ প্রতিরোধী জাতঃ এ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন জাতের সরিষার চাষ করতে হবে। তৈলবীজ গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনষ্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত বারি সরিষা-৬, দৌলত, বারি সরিষা-৭, বারি সরিষা-৮ ইত্যাদি জাতগুলো পাতা ঝলসানো রোগ প্রতিরোধী।
খ) আগাম বীজ বপনঃ আগাম সরিষা চাষ অর্থাৎ কার্তিকের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে সরিষার বীজ বপন করলে এ রোগের আক্রমন খুব কম হয়।
গ) বীজ শোধনঃ বীজ বপনের পূর্বে ভিটাভেক্স-২০০ দ্বারা শতকরা ০.২৫ ভাগ হারে (২.৫ গ্রাম ছত্রাকনাশক/কেজি বীজ) বীজ শোধন করে বপন করতে হবে।
ঘ) ছত্রাকনাশক প্রয়োগঃ এ রোগ দেখা দেয়ার সাথে সাথে রোভরাল-৫০ ডব্লিউপি শতকরা ০.২ ভাগ হারে (প্রতি লিটার পানির সাথে ২ গ্রাম ছত্রাকনাশক) পানিতে মিশিয়ে ১০ দিন পর পর তিন বার সিঞ্চন যন্ত্রের সাহায্যে সমস্ত গাছে ছিটিয়ে দিতে হবে।
২। ডাউনি মিলডিউ রোগ
পেরোনোসপোরা ব্রাসিসি নামক এক প্রকার ছত্রাক দ্বারা এ রোগ হয়।
লক্ষণ
গাছের চারা অবস্থার পর থেকে যে কোন সময় এ রোগে গাছ আক্রান্ত হতে পারে। আক্রান্ত পাতার নিুপৃষ্ঠে সাদা পাউডারের মত ছত্রাক দেখা যায় এবং পাতার উপরের পৃষ্ঠ হলদে হয়ে যায়। অনুকুল আবহাওয়ায় এ ছত্রাকের বংশ দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং এর ফলে পাতা আকারে ছোট হয়ে যায়। এ রোগ পরবর্তীতে সরিষার শুটি আক্রমণ করে এবং বীজ হতে খাদ্য গ্রহন করার ফলে উৎপাদন বহুলাংশ কমে যায়।
আক্রান্ত বীজ ও বিকল্প পোষাকের মাধ্যমে এ রোগ বিস্তার লাভ করে। গাছ ঘন করে লাগালে ও বাতাসের আর্দ্রতা কম হলে এ রোগ দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
প্রতিকার
ক) বীজ শোধনঃ রিডোমিল এম জেড-৭২ নামক ছত্রাকনাশক দিয়ে শতকরা ০.২৫ ভাগ হারে (২.৫ গ্রাম ছত্রাকনাশক/ কেজি বীজ) বীজ শোধন করে লাগাতে হবে।
খ) ছত্রাকনাশক প্রয়োগঃ রোগ দেখা মাত্র রিডোমিল এম জেড-৭২ বা ডাইথেন এম-৪৫ শতকরা ০.২ ভাগ হারে (প্রতি লিটার পানির সাথে ২ গ্রাম ছত্রাকনাশক) ১০ দিন পর পর তিন বার সমস্ত গাছে ছিটিয়ে দিতে হবে।
গ) সুষম সার ও সেচ প্রদানঃ সুষম সার ব্যবহার ও সেচের পানি নিস্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে।
৩। সপুষ্পক পরজীবী উদ্ভিদ (অরোব্যাংকি প্রজাতি)
দেশের উত্তরাঞ্চলে সরিষার ক্ষেত্রে এ পরজীবী উদ্ভিদ এর আক্রমণ দেখা যায়।
লক্ষণ
এ উদ্ভিদ এক প্রকার সপুস্পক শিকড় পরজীবী যার বংশ বৃদ্ধি সরিষার উপর নির্ভরশীল। এর বীজ মাটিতেই অবস্থান করে। সরিষা গাছের শিকড়েরর সাথে এ পরজীবী উদ্ভিদ সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে খাদ্য সংগ্রহ করে বেঁচে থাকে। এর ফলে আক্রান্ত সরিষার গাছ দুর্বল হয়, বৃদ্ধি কমে যায় এবং ফলন হ্রাস পায়। প্রতিবছর একই জমিতে সরিষা পরিবারের ফসলের চাষ করলে এ পরজীবীর বিস্তার ঘটে।
প্রতিকার
ক) ফুল আসার পূর্বেই এ পরজীবী উদ্ভিদ জমি হতে উঠিয়ে ধ্বংস করে ফেলতেহবে।
খ) বীজ বপনের পূর্বে জমি লাঙ্গল দিয়ে গভীরভাবে চাষ করতে হবে। এতে পরজীবী উদ্ভিদের বীজ মাটির গভীরে চলে যায় এবং সরিষার শিকড়ের সংস্পর্শে না থাকায় গজাতে পারে না।
গ) একই জমিতে প্রতি বছর সরিষা চাষ না করে অন্যান্য ফসল (যাতে অরোব্যাংকি হয় না) পর্যায়ক্রমিকভাবে চাষ করতে হবে।
ঘ) আগাছা নাশক যেমন ২,৪-ডি ছিটিয়ে পরজীবী উদ্ভিদকে মেরে ফেলতে হবে।
তিল
আমাদের দেশে তিলের রোগসমূহের মধ্যে কান্ড পঁচা এবং সারকোসপোরা জনিত পাতার দাগ রোগ উল্লেখযোগ্য।
১। কান্ড পঁচা রোগ
লক্ষণ
তিল গাছ এ রোগে ব্যাপকভাবে আক্রান্ত হয়ে থাকে। ম্যাকরোফোমিনা ফ্যাসিওলিনা নামক ছত্রাকের কারণে এ রোগ হয়ে থাকে। আক্রান্ত গাছের কান্ডে ছোট, লম্বা, আঁকাবাঁকা বিভিন্ন ধরনের গার খয়েরী এবং কালো দাগ দেখা যায়। এ দাগগুলো ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে এবং সমস্ত কান্ডে ছড়িয়ে পড়ে। ব্যাপকভাবে আক্রান্ত গাছের পাতা মরে যায়। এটি একটি বীজ ও মাটিবাহিত রোগ। জমিতে জলাবদ্ধতার কারণে এ রোগের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পায়।
প্রতিকার
ক) ছত্রাকনাশক প্রয়োগঃ এ রোগ দেখা দেয়ার সাথে সাথে বেভিষ্টি ১ গ্রাম বা ডাইথেন এম-৪৫ ২ গ্রাম হারে প্রতি লিটার পানির সাথে মিশিয়ে ১০ দিন পর পর ৩ বার ছিটিয়ে রোগ দমন করা যায়।
খ) বীজ শোধনঃ বীজ বপনের পূর্বে ভিটাভেক্স-২০০, হোমাই, বেভিষ্টিন ইত্যাদি ছত্রাকনাশক দ্বারা (২.৫ গ্রাম ছত্রাকনাশক/ কেজিবীজ) বীজ শোধনের মাধ্যমে রোগের আক্রমণ কমানো যায়।
গ) জমি পরিষ্কারকরণঃ ফসল কাটার পর, গাছেল শিকড়, আগাছা, আবর্জনা ইত্যাদি পুড়ে ফেলতে হবে যাতে রোগের উৎস নষ্ট হয়ে যায়।
ঘ) পানি নিষ্কাশনঃ তিলের জমি থেকে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করে এ রোগের আক্রমনের তীব্রতা কমানো যায়।
২। সারকোসপোরা জনিত পাতার দাগ রোগ
লক্ষণ
সারকোসপোরা সিসেমী নামক এক প্রকার ছত্রাকের কারণে এ রোগ হয়ে থাকে। এ রোগের আক্রমণে প্রথমে পাতায় ছোট, গোলাকার, বাদামী এবং গার বাদামী রঙের দাগ পড়ে। দাগগুলো বিভিন্ন আকারের হয় এবং ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে।
প্রতিকার
ক) ছত্রাকনাশক প্রয়োগঃ এ রোগ দেখা দেয়ার সাথে সাথে বেভিষ্টিন১ গ্রাম বা ডাইথেন এম-৪৫ ২ গ্রাম হারে প্রতি লিটার পানির সাথে মিশিয়ে ১০ দিন পর পর জমিতে ৩ বার প্রয়োগ করলে রোগের প্রকোপ কমে যায়।
খ) শস্য পর্যায়ক্রমঃ মাঠে পর্যায়েক্রমিকভাবে ফসলের চাষ করলে উপযুক্ত পোষক গাছেল অভাবে রোগ বিস্তার লাভ করতে পারে না।
গ) আগাছা দমনঃ সময়মত জমির আগাছা পরিস্কার করতে হবে।
উপাত্ত সংগ্রহ : তৈলবীজ গবেষনা কেন্দ্র, বিএআরআই
চীনা বাদাম
চীনাবাদাম একটি উৎকৃষ্ট তেলবীজ এবং পুষ্টিকর খাদ্য। অন্যান্য তেলফসলের ন্যায় চীনাবাদামও অনেক রোগ-বালাই দ্বারা আক্রান্ত হয় এবং এ কারণে ফলন অনেক কমে যায়। এ পর্যন্ত বাংলাদেশে চীনাবাদামের বেশ কয়েকটি রোগ সনাক্ত করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে যথাক্রমে পাতার দাগ, রাষ্ট বা মরিচা এবং মূল ও গোড়া পঁচা রোগ অন্যতম।
১। পাতার দাগ রোগ
আমাদের দেশে চীনাবাদামের রোগসমূহের মধ্যে এ রোগটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকারক। সারকোসপোর এরাচিডিকোলা ও ফেয়োইসারিওপসিস পারোনেটা নামক দু’টি ছত্রাক দ্বারা এ রোগ হয়।
লক্ষণ
বীজ গজানোর ১ মাসের মধ্যে সারকোসপোরা এরাচিডিকোলা নামক ছত্রাকের আক্রমণ পরিলক্ষিত হয়। এ ছত্রাকের আক্রমনে সবুজ পাতার উপরিভাগে প্রথম থেকেই হলুদ বর্ণের বৃত্তাকার রেখা দ্বারা ঘেরা গাঢ় বাদামী রঙের দাগের আবির্ভাব হয়। দাগগুলো নানা আকারের হয় এবং পাতার উপর ইতস্তত ছড়িয়ে থাকে।
গাছের বয়স সাধারণত ৫৫-৬০ দিন হলে ফেয়োইসারিওপসিস পারসোনেটা ছত্রাকের আক্রমণ পাতার নীচে দেখা যায়। এ ক্ষেত্রে দাগগুলো প্রায় গোলাকার এবং গাঢ় বাদামী হতে কালো বর্ণের হয়। আক্রান্ত অংশ ছাড়া পাতার বাকি অংশের সবুজ রং মলিন হয়ে যায় এবং ধীরে ধীরে পাতা ঝরে পড়ে। এ ছত্রাকের আক্রমণে ফসলের বেশি ক্ষতি সাধিত হয়। পাতার দাগ রোগের আক্রমণের ফলে গাছের বাদাম পরিপুষ্ট হতে পারে না এবং দানা আকারে ছোট হয়। এ কারণে চীনাবাদামের ফলন প্রায় এক তৃতীয়াংশ পরিমাণ কমে যায়।
এ রোগ বাতাস ও বৃষ্টির পানির সাহায্যে এক পাতা হতে অন্য পাতা, একগাছ হতে অন্য গাছে ছড়িয়ে পড়ে। অপেক্ষাকৃত উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া এবং প্রবল বায়ু প্রবাহ এ রোগ বৃদ্ধির সহায়ক।
প্রতিকার
ক) রোগ প্রতিরোধী জাতঃ তৈলবীজ গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত বাসন্তীবাদাম (ডিজি-২) ও ঝিঙ্গাবাদাম (এসিসি-১২) জাত দুটি পাতার দাগ রোগ সহনশীল। এ দুটি জাতের চাষাবাদের মাধ্যমে রোগের আক্রমণ এড়ানো যায় এবং ভাল ফলন পাওয়া যায়।
খ) ছত্রাকনাশক প্রয়োগঃ এ রোগ দেখা দেয়ার সাথে সাথে গাছে বেভিষ্টিন১ গ্রাম হারে প্রতিলিটার পানিতে মিশিয়ে ১২ দিন অন্তর ৩ বার ছিটালে রোগের প্রবল্য কমে যায়।
গ) জমি পরিষ্কারকরণঃ যেহেতু জমিতে পরিত্যক্ত আক্রান্ত গাছের অংশের মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায় সেহেতু মৌসুমের শেষে আক্রান্ত গাছসমূহ পুড়ে ফেলে বা নষ্ট করে রোগের বিস্তার রোধ করা যায়।
ঘ) শস্য পর্যায়ক্রমঃ একই জমিতে প্রতিবছর চীনাবাদামের চাষ না করে অন্য ফসল দিয়ে শস্য পর্যায়ক্রম গ্রহন করলে রোগের প্রার্দুভাব কম হয়।
২। রাষ্ট বা মরিচা রোগ
এ রোগটি চীনাবাদামের ক্ষতিকারক রোগসমূহের মধ্যে দ্বিতীয় স্থান দখল করে আছে। পাকসিনিয়া এরাচিডিস নামক ছত্রাকের কারণে এ রোগ হয়ে থাকে।
লক্ষণ
এ রোগে গাছের যে কোন অবস্থায় আক্রমণ করতে পারে। সাধারণত বয়স্ক গাছে এ রোগের আক্রমণ বেশি দেখা যায়। প্রাথমিক অবস্থায় পাতার নিুপৃষ্ঠে লাল, লোহার মরিচা পড়ার ন্যায় সামান্য স্ফীত ছোট বিন্দুর মত অসংখ্য দাগ দেখা যায়। দাগগুলো ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। অনুকুল আবহাওয়ায় কিছুদিনের মধ্যেই সমস্ত পাতা রাষ্ট বা মরিচায় ছেয়ে যায়। আক্রমণের মাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে পাতার উপরের পৃষ্ঠেও এ রোগ দেখা যায়। আক্রান্তগাছে বাগামের দানা ছোট এবং কুঁচকানো হয়। গাছ ব্যাপকভাবে এ রোগে আক্রান্ত হলে চীনাবাদামের পাতা অকালে ঝড়ে যায় এবং ফলন বহুলাংশে কমে যায়। ফসল কাটার পর এ রোগের ছত্রাক আগাছা, আবর্জনা এবং ফসলের পরিত্যক্ত অংশে আশ্রয় নেয়। বিকল্প পোষাক হতে বায়ুর মাধ্যমে এ রোগ সুস্থগাছে এবং আর্দ্র আবহাওয়ায় বিস্তার লাভ করে।
প্রতিকার
ক) রোগ প্রতিরোধী জাতঃ ঝিঙ্গা বাদাম জাতটি রাষ্ট বা মরিচা রোগ প্রতিরোধ। এ জাতের চাষের মাধ্যমে রোগের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
খ) ছত্রাকনাশক প্রয়োগঃ এ রোগ দেখা দেয়ার সাথে সাথে ক্যালিক্সিন শতকরা ০.১ ভাগ হারে (প্রতি লিটার পানির সাথে ১ মিঃ লিঃ ছত্রাকনাশক) বা টিল্ট ২৫০ ইসি শতকরা ০.০৫ ভাগ হারে (প্রতি লিটার পানির সাথে আধা মিঃলিঃ ছত্রাকনাশক) ১২ দিন অন্তর তিন বার ছিটালে রোগের প্রকোপ কমে যায়।
গ) জমি পরিষ্কারকরণঃ পূর্ববতী ফসল থেকে স্বেচ্ছায় গজানো গাছ, আগাছা এবং আবর্জনা পুড়ে ফেলে এ রোগের উৎস নষ্ট করা যায়।
ঘ) শস্য পর্যায়ক্রমঃ জমিতে পর্যায়ক্রমিক ভাবে ফসলের চাষ করলে এ রোগের আক্রমণ কম হয়।
৩। মূল ও গোড়া পঁচা রোগ
স্কেলেরোশিয়াম রলফ্সি নামক মাটিতে বসবাসকারী এক প্রকার ছত্রাকের কারণে এ রোগ হয়।
লক্ষণ
গাছের বৃদ্ধির যে কোন অবস্থায় এ রোগ দেখা দিতে পারে। সাধারণত গাছেল যে সকল অংশ মাটির কাছাকাছি বা নিচে থাকে সে অংশসমূহ এ রোগের আক্রান্ত অংশে গার বাদামী হতে কালো দাগের সৃষ্টি হয়। এ দাগ ধীরে ধীরে কান্ডের দিকে অগ্রসর হতে থকে। রোগের এ অবস্থায় আক্রান্ত গাছের গোড়ায় বা মাটিতে ছত্রাকের সাদা মাইসেলিয়াম এবং সরিষার দানার মত ছত্রাক গুটিকা( স্কেলেরোশিয়া) লক্ষ্য করা যায়। এ রোগের কারণে গাছের মূল শিকড় আক্রান্ত হলে গাছ সর্ম্পূণ ঢলে যায় এবং পরবর্তীতে খাদ্য ও পানি চলাচলের প্রতিবন্ধকতার কারণে গাছ মরে যায়।
মাটিতে বসবাসকারী ছত্রাক গুটিকা এ রোগে সৃষ্টি করে। আর্দ্র আবহাওয়া এ রোগ বিস্তারে সাহায্য করে।
প্রতিকার
ক) গভীর চাষঃ জমি তৈরির সময় গভীর চাষের মাধ্যমে মাটি আলগা করে ৩-৪ দিন রোদে শুকিয়ে রোগের উৎস নষ্ট করে আক্রমণ কমানো যায়।
খ) বীজ শোধনঃ বীজ বপনের পূর্বে ভিটাভেক্স-২০০ নামক ছত্রাকনাশক দিয়ে শতকরা ০.২৫ ভাগ হারে (২.৫ গ্রাম ছত্রাকনাশক/ কেজি বীজ) বীজ শোধনের মাধ্যমে রোগের প্রকোপ কমানো যায়।
গ) জমি পরিষ্কারকরণঃ পূর্ববর্তী ফসলের পরিত্যক্ত অংশ, আগাছা এবং আবর্জনা পুড়ে নষ্ট করে রোগের বিস্তার রোধ করা যায়।
ঘ) শস্য পর্যায়ক্রমঃ শস্য পর্যায়ক্রম অনুসরণের মাধ্যমে রোগের প্রার্দুভাব অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
উপাত্ত সংগ্রহ : তৈলবীজ গবেষনা কেন্দ্র, বিএআরআই
সূর্যমুখী
আমাদের দেশে সূর্যমুখীর বেশ কয়েকটি রোগ সনাক্ত করা হেয়েছে। এগুলোর মধ্যে পাত ঝরসানো এবং ঢলে পড়া রোগ উল্লেখযোগ্য।
১। পাতা ঝলসানো রোগ
লক্ষণ
অলটারনেরিয়া হেলিয়ানথী নামক ছত্রাকের কারণে সূর্যমুখীর এ রোগ হয় প্রথমে পাতার ধূসর বা গাঢ় বা গাঢ় বাদামী বর্ণের অসম আকৃতির দাগ পড়ে। এ দাগগুলো একত্রে মিলিত হয়ে বড়দাগের সৃষ্টি করে এবং অবশেষে পুরো পাতা ঝলসে যায়। এ রোগটি বীজ এবং বায়ুবাহিত।
প্রতিকার
রোগ প্রতিরোধী জাত
রোগসহনশীল কিরণী জাতের সূর্যমুখীর চাষ করলে এ রোগের আক্রমণ কম হয়।
ছত্রাকনাশক
এ রোগ দেখা দেয়ার সাথে রোভবাল-৫০ ডব্লিড পি শতকরা ০.২ ভাগ হারে (প্রতিলিটার পানির সাথে ২ গ্রাম ছত্রাকনাশক) পানির সাথে মিশিয়ে ১০ দিন পর তিন বার প্রয়োগ করলে রোগের প্রকোপ কমে যায়।
জমি পরিষ্কারকরণ
ফসল কাটার পর গাছের পরিত্যক্ত অংশ (কান্ড, মূল ও পাতা) নষ্ট করে বা পুড়ে ফেললে এ রোগের উৎস নষ্ট হয়ে যায়।
২। ঢলে পড়া/ মূল পঁচা রোগ
লক্ষণ
সাধারণত স্কেলেরোশিয়াম রলফসি নামক কারণে এ রোগ হয়ে থাকে। গাছের চারা অবস্থা থেকে পূর্ণতা প্রান্ত পর্যন্ত এ রোগের আক্রমণ দেখা যায়। আক্রান্ত গাছের গোড়ায় ছত্রাকের সাদা মাইসেলিয়াম এবং গোলাকার দানার মত স্কেলেরোশিয়া দেখা যায়। প্রথমে গাছ কিছুটা নেতিয়ে পড়ে। দুই তিন দিনের মধ্যে সমস্ত গাছ ঢলে পড়ে এবং শুকিয়ে মারা যায়। সাধারণত খরিফ মৌসুমে এ রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি হয়।
প্রতিকার
ক) বীজ শোধনঃ বপনের পূর্বে ভিটাভেক্স-২০০ এর সাহায্যে বীজ শোধনের মাধ্যমে এ রোগের বিস্তার রোধ করা যায়।
খ) গভীর চাষঃ জমি তৈরীর সময় গভীর চাষের মাধ্যমে মাটি আলগা করে ৩-৪ দিন রোদে শুকিয়ে রোগের উৎস নষ্ট করে আক্রমন কমানো যায়।
গ) শস্য পর্যায়ক্রমঃ মাঠে পর্যায়ক্রমিকভাবে ফসলের চাষ করলে উপযুক্ত পোষক গাছের অভাবে রোগের জীবানু নষ্ট হয়ে যায়।
উপাত্ত সংগ্রহ : তৈলবীজ গবেষনা কেন্দ্র, বিএআরআই
সয়াবিন
বাংলাদেশে সয়াবিনের রোগসমূহের মধ্যে হলুদ মোজাইক ভাইরাস এবং মূলপঁচা রোগ দুইটি উল্লেখযোগ্য।
১। হলুদ মোজাইক ভাইরাস
লক্ষণ
সয়াবিনের সবুজ পত্রফলকের উপরিভাগে উজ্জ্ব সোনালী বা হলুদ রঙের চক্রাকার দাগের উপস্থিতি এ রোগের চারিত্র্যিক বৈশিষ্ট্য। হলদে পাতাযুক্ত আক্রান্ত গাছ সাধারণত খাটো এবং বামনাকৃতি হয়ে থাকে। এ রোগ সাধারণত মাঠে কর্মরত কৃষক এবং জাবপোকার (এফিড) মাধ্যমে আক্রান্ত গাছ হতে সুস্থ গাছে ছড়িয়ে পড়ে।
প্রতিকার
সহনশীল জাতের চাষ
বাংলাদেশ সয়াবিন-৪ (জি-২) জাতটি হলুদ মোজাইক ভাইরাস রোগে কম আক্রান্ত হয়।
রগিং
জমিতে এ রোগেআক্রান্ত গাছ দেখামাত্র তুলে পুড়ে ফেললে এ রোগের বিস্তার কমে যায়।
জাবপোকা দমন
সাধারণত জাবপোকা এ রোগ বিস্তারে সহায়তা করে। আক্রান্ত জমিতে ম্যালাথিয়ন-৫৭ ইসি (প্রতি লিটার পানির সাথে ২ মিঃ লিঃ কীটনাশক) ছিটিয়ে জাব পোকা দমনের মাধ্যমে এ রোগের বিস্তার রোদ করা যায়।
রোগমুক্ত বীজ বপন
সুস্থ এবং রোগমুক্ত বীজ বপনের মাধ্যমে এ রোগের আক্রমণ কমানো যায়।
৩। কান্ডপঁচা রোগ
লক্ষণ
এ রোগ সাধারণত স্কেলেরোশিয়াম রল্ফসি/ ফিউজারিয়াম/ রাইজোকটনিয়া নামক ছত্রাকের কারণে হয়ে থাকে। চারা বা বড় গাছের পাতা হলুদ হওয়া দেখেই মাঠে এ রোগের আক্রমণ সনাক্ত করা যায়। আক্রান্ত গাছের কান্ড এবং মূলে কালো দাগ দেখা যায়। আক্রান্ত চারা বা গাছ ধীরে ধীরে শুকিয়ে যায় এবং অবশেষে মারা যায়।
প্রতিকার
ক) বীজ শোধনঃ বীজ বপনের পূর্বে ভিটাভেক্স-২০০, ক্যাপটান (২.৫ গ্রাম ছত্রাকনাশক/ কেজি বীজ) ইত্যাদিরে সাহায্যে বীজ শোধনের মাধ্যমে রোগের আক্রমণ কমানো যায়।
খ) গভীর চাষঃ এ ছত্রাকটি সাধারণত মাটির উপরিভাগে সুপ্ত অবস্থায় থাকে। সুতরাং মাটিকে গভীর চাষের মাধ্যমে রোগের উৎস নষ্ট করে আক্রমণ কমানো যায়।
গ) জমি পরিষ্কাকরণঃ জমিতে ফসলের পরিত্যক্ত অংশ, আগাছা, আবর্জনা পরিস্কার করার ফলে এ রোগের উৎস নষ্ট হয়ে যায়ে।
পাম
পৃথিবী সৃষ্টির জন্মলগ্ন থেকে মানুষ খাদ্যের জন্য উদ্ভিদ জগতের উপর নির্ভরশীল পাম ওয়েল নামক উদ্ধিদটি ভোজ্য তেলের একটি বিশেষ সমৃদ্ধ উৎস।
পাম গাছের বৈজ্ঞানিক নাম হল “এলিইস গিনিনসিস জ্যাক”। প্রকৃতপক্ষে ভোজ্য তেল উৎপাদনকারী ফসলগুলোর মধ্যে পাম ফলের ফলনই সর্বাধিক।
প্রায় পাঁচ হাজার বৎসর আগে, মিশরের ফেরাউনের সময় থেকেই পাম ওয়েলের ইতিহাস শুরু হয়েছে। মিশরে এই ভোজ্য তেলটির আগমন ঘটে খুব সম্ভবতঃ পশ্চিম আফ্রিকা থেকে, যেখানে এলিইস গিনিনসিস জ্যাক অর্থ্যাৎ পাম গাছটির উদ্ভব হয়েছিল। বিশ শতকের গোড়ারর দিকে শোভাবর্দ্ধনকারী উদ্ভিদ হিসেবে পাম ওয়েল উদ্ভিদকে মালয়েশিয়ায় নিয়ে আসা হয়। এর ফলশ্র“তিতেই নাটকীয়ভাবে পাম ওয়ের মিল্প গড়ে উঠে। বর্তমান বিশ্বে মালয়েশিয়াই হচ্ছে সর্বাধিক পাম ওয়েল উৎপাদনকারী ও রপ্তানীকারী দেশ। বাংলাদেশেও পাম গাছ চাষাবাদ করা সম্ভব।
বিস্ময়কর পাম ওয়েল
পাম ওয়েল একটি বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ। রোপনের তিন থেকে চার বছরের মধ্যেই এই উদ্ভিদে ফলন শুরু হয়। এই গাছ ২৫-৩০ বৎসর পর্যন্ত ফলন দেয়। পাম ওয়েল গাছ চাষ করে প্রতিবছর হেক্টর প্রতি আমাদের দেশে সর্বোচ্ছ ১০ টন ভোজ্য তেল পাওয়া যায়, সেই ক্ষেত্রে আমাদের সংগ্রহীত প্রতিটি কাঁদি/ ইধহপয এ ৭০-৮০ কেজি ফল পাওয়া গিয়াছে। বাণিজ্যিক ভাবে চাষকৃত যে কোন ভোজ্য তেলের ফসল থেকে প্রাপ্ত তেল অপেক্ষা ১০-১৫ গুণ বেশী।
প্রধান প্রধান তৈল শস্যের গড় উৎপাদনশীলতা
তৈল শস্য তেল/ হেক্টর/ বছর (কেজি)
পাম ৭০০০
সরিষা/ রেপসীড ৫৫৬
বাদাম ৩৮৪
সয়াবিন ৩৫১
তিল ১৭৮
পাম তেল
পাম ওয়েল ফলকে প্রক্রিয়াজাত করে দু’ধরনের তেল পাওয়া যায়। ফলটির মাংসল অংশ (মেসোকার্প) থেকে পাম তেল আহরণ করা হয়, আর বীজ বা শাঁস থেকে পাওয়া যায় পাম কার্ণেল তেল। প্রতিটি ফল থেকে ৯ ভাগ পাম তেল ও ১ ভাগ পাম কার্নেল তেল পাওয়া যায়। সদ্য আহরিত পাও তেল বিটা ক্যারেটিনের সমৃদ্ধতম উৎস। পাম তেলে টোকোফেরল ও টোকেট্রায়েনল নামক দু’ধরনের ভিটামিন ‘ই’ অধিক পরিমাণে থাকে। পাম তেলে সম্পৃক্ত ও অসম্পৃক্ত উভয় প্রকারের ফ্যাটি এসিডের সুষম সমাহার ঘটায় ও এতে ভিটামিন ‘ই’ এর পরিমাণ অধিক মাত্রায় থাকায় পাম তেল প্রাকৃতিকভাবেই একটি সুস্থিত তেল। পাম তেলের অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিডসমুহের মধ্যে রয়েছে অধিক পছন্দনীয় একক অসম্পৃক্ত ওলিক এসিড (৪০%) এবং সম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিডের মধ্যে রয়েছে পামিটিক এসিড (৪৪%) ও স্টিয়ারিক এসিড (৫%)। পাম তেলের মধ্যে সম্পৃক্ত ও অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিডের এই সুষম সমাহারের জন্য পাম তেল অর্দ্ধ জমাট ঘনত্বে অবস্থান করে। যার ফলে পাম তেল অনেক ধরনের খাবার তৈরির জন্য উপযুক্ত বলে বিবেচিত হয় পাম তেল থেকে সলিড ফ্যাট যেমন বনস্পতি জাতীয় পণ্য উৎপাদনে ব্যয়বহুল হাইড্রোজিনেশন প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয় না। হাইড্রোজিনেশন প্রক্রিয়ায় ট্রান্স ফ্যাটি এসিড তৈরি হয় যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়েছে। পাম তেল ব্যবহারের হাইড্রোজিনেশন প্রক্রিয়ার প্রয়োজন না হওয়াতে পাম তেল থেকে উৎপাদিত পণ্যে ক্ষতিকর ট্রান্স ফ্যাটি এসিড থাকে না।
আমাদের দেশীয় প্রণালীতে পাম ওয়েল সংগ্রহের সহজ উপায়
একটু পানিতে পাঁকা পাম ফল সিদ্ধ করে হাত দ্ধারা নিগ্রানো/ চিপন দিলে রস বাহির হয়, সেই রসে পানি মিশ্রিত থাকে, এই জন্য পানি মিশ্রিত তেল পাতিলে জ্বাল দিলে পানি বাস্প হয়ে চলে যায়। তারপর বোতল জাত করে রান্নার কাজে ব্যবহার করা যায়। এই তেল স্বাদযুক্ত এবং গন্ধহীন।
পাম ওয়েল গাছ চাষাবাদ ও রক্ষণাবেক্ষণ পদ্ধতি
পাহাড়ী, চর অঞ্চর এবং সমতল ভূমি ও বাড়ীর আঙ্গীনায়ও পাম ওয়েল গাছ চাষাবাদ করা যায়। এই গাছ বন্যার পানিতে মরে না। পাম ওয়েল গাছ চাষাবাদ করিতে তেমন রাসায়নিক সার ব্যবহার করিতে হয় না। বীজ হইতে চারা উৎপাদন করতে প্রায় এক বৎসর সময় লাগে, চারা হইতে ফল পাইতে সময় লাগে তিন হইতে চার বৎসর।
পরিবেশগত ভাবে অনুকুল
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে পাম ওয়েল গাছ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাম ওয়েল গাছ চাষে নুন্যতম রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয়। পাম ফল হইতে পাম ওয়েল আহরণের সময় যে পুষ্টি সমৃদ্ধ পুনঃ ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য পাওয়া যায় তা-ই পাও ওয়েল বাগানের সার হিসাবে ব্যবহার করা হয়। রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার হ্রাস করার জন্য পাম ওয়েল উদ্ভিদ বালাই নিয়ন্ত্রণের কাজে জৈব পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। শিল্পের গবেষনা ও উন্নয়ন উদ্ভূত দুটি ধারণা যথা “শূণ্য বর্জ্য” ও “শূণ্য দহন” এখন ব্যপকভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। শূণ্য বর্জ্যরে প্রতি অংগীকারের ফলশ্র“তিতে পাম ওয়েল গাছের পাতা, গুড়ি, ফলের শূণ্য কাঁদি ব্যবহার করে নুতন নুতন দ্রব্য উৎপন্ন করা হচ্ছে । আর “ শূণ্য দহন” ধারণার কার্যকর প্রয়োগ হচ্ছে পুরনো পাম গাছগুলোকে না পুড়িয়ে খন্ড খন্ড করে চাষের জমিতে পঁচিয়ে মিশিয়ে দেয়া যায় ফলে দূষণ পরিহার করা সম্ভব হচ্ছে ও উদ্ভিদের পুষ্টি পদার্থ মাটিতে ফিরিয়ে দেয় হয়। পাতা জমিতে সার হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। পাম গাছের ১ টন শুকনো পাতা মাটিতে ৭.৫ কেজি নাইট্রোজেন, ১.০৬ কেজি ফসফরাস, ৯.৮১ কেজি পটাশিয়াম ও ২.৭৯ কেজি ম্যাগনেসিয়াম ফিরিয়ে দেয়।
পাম তেলের পুষ্টি সংক্রান্ত তথ্য
বিশ্বখ্যাত পুষ্টিবিজ্ঞানীদের দ্বারা পরিচালিত সমীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে যে পাম তেলের বিশেষ স্বাস্থ্য-প্রদ গুণাবলী রয়েছে এ সম্পর্কিত কিছু তথ্য নিম্নে দেয়া হলঃ
অন্যান্য উদ্ভিজ্জ ভোজ্য তেলের মত পাম তেলও কোলেস্টেরল-মুক্ত। কিন্তু সবচেয়ে উল্খেযোগ্য দিক হল খাদ্যে পাম তেল ব্যবহার করলে রক্তে মোট কোলেস্টরলের মাত্রা বাড়ে না।
পাম তেল খাদ্যে ব্যবহার করলে দেহে “ উপকারী” এইচ.ডি.এল (ঐউখ) কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়ে এবং “ক্ষতিকর” এল.ডি.এল (খউখ) কোলেস্টেরলের মাত্রা কমে যায়। পাম তেল রক্তের জমাট বাঁধা প্রবণতা হ্রাস করে যায় ফলশ্র“তিতে হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস পায়।
লাল পাম তেল ভিটামিন“ই” এবং বিটা ক্যারোটিনের সমৃদ্ধ উৎস। বিটাক্যারোটিন একটি এন্টি অক্সিডেন্ট ও ভিটামিন ‘এ’র প্রিকারসর।
পাম তেল থেকে প্রস্তুত সলিড ফ্যাট যেমন বনস্পতি স্বাস্থ্যের জন্য উত্তম, কারণ পাম তেলকে হাইড্রোজিনেশন করার প্রয়োজন হয় না বলে এতে ক্ষতিকর ট্রান্স ফ্যাটি এসিড থাকে না। পাম তেলের উত্তম বৈশিষ্ট সমূহ ও উপকারী গুণসমূহ বিবেচনা সাপেক্ষে বলা যায় যে, পাম তেল যে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা লাভ করছে তা মোটেই আশ্চার্যজন নয়।
কোলেষ্টেরল ও ট্রান্সফ্যাটি এসিড মুক্ত
অন্যান্য উদ্ভিজ্জ তেলের মতই পাম তেলও কোলেস্টেরল মুক্ত। প্রাকৃতিকভাবেই পাম তেল পরিতিদ মাত্রায় সম্পৃক্ত হওয়াতে খাদ্যে ফ্যাট উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার জন্য কোন হাইড্রোজিনেশনের প্রয়োজন হয় না যে কারণে পাম তেলে ট্রান্সফ্যাটি এসিড থাকে না।
পাম তেল ও পাম কার্ণেল তেল এক নয়
পাম ফলের মাংসল অংশ থেকে প্রাপ্ত পাম তেল ভৌত ও রাসায়নিক উভয় দিক দিয়ে বীজ থেকে আহরিত পাম কার্ণেল তেল থেকে ভিন্ন। নারকেল তেল থেকেও পাম তেল ভিন্ন। উল্লেখ্য যে, পাম কার্ণেল তেল এবং নারকেল তেল উভয়েই অধিকতর সম্পৃর্ক্ত।
ক্যান্সার বিস্তার রোধ করে
লাল পাম তেল ক্যারোটিনয়েডের একটি প্রধান উৎস। এই ক্যারোটিনয়েড কয়েক ধরনের ক্যান্সারকে কার্যকরভাবে প্রতিহত করতে পারে। পাম তেল সম্বলিত খাদ্যের সংগে একই পরিমাণ ক্যালরি সম্পন্ন অন্য ভোজ্য তেল সম্বলিত খাদ্যের তুলনা করে দেখা গেছে যে পরীক্ষামূলকভাবে ঘটানো স্তন ক্যান্সারের সংঘটন ও বিকাশ উভয় ক্ষেত্রেই পাম তেল প্রতিরোধমূলক ভুমিকা পালন করে। এটাও দেখা গেছে যে পাম তেলে বিদ্যমান টোকোট্রায়েনল ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি কার্যকরভাবে প্রতিহত করতে পারে।
অপরিশোধিত অবস্থায় (টহৎবভরহবফ) পাম তেল এবং অন্যান্য কয়েকটি বহুল ব্যবহৃত তেল/ফ্যাট এর কোলেস্টেরলের মাত্রার তুলনামূলক চিত্র।
তেল/ফ্যাট কোলেস্টেরল এর পরিমান
পাম তেল ১৩-১৯ পি পি এম
সয়াবিন তেল ২০-৩৫ পি পি এম
সূর্যমুখী তেল ৮-৪৪ পি পি এম
রেপসীড/ সরিয়ার তেল ২৫-৮০ পি পি এম
কর্ণ তেল ১৮-২৯ পি পি এম
বাটার / মাখন ২২০০-৪১০০ পি পি এম
বিঃদ্রঃ
১। বৃটেন এবং ইউ, এস, এ- এর স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী ৫০ পি পি এম পর্যন্ত কোলেস্টেরল মুক্ত তেলকে “কোলেস্টেরল মুক্ত” ধরা হয় কারণ ঐ পরিমাণ কোলেস্টেরল আমাদের দেহের জন্য প্রয়োজন।
২। PPM ( Parts per million)= প্রতি দশ লক্ষ ভাগের এক ভাগ।
পাম ওয়েল এর ভিবিন্ন খাবারের ব্যবহার
পাম ওয়েলে বিদ্যমান অনন্য উপাদানের জন্য পাম ওয়েল পুষ্টিতে ভরপুর এবং এর ব্যবহারও বহুমুখী। আর্দ্ধ জমাট হওয়াতে পাম ওয়েল এমন কিছু ভৌতগুণ সম্পন্ন যা অনেক খাদ্য প্রস্ততিতে প্রয়োজন হয়। অন্যান্য উদ্ভিদ তেলের মত পাম ওয়েল কোলেস্টেরল- মুক্ত এবং সহজ পাচ্য, দেহে সহজে শোষিত হয় ও শক্তির উৎস হিসাবে কাজ করে।
পাম ওয়েল অর্দ্ধ-জমাট ঘনত্বের জন্য জমাট চর্বি উৎপাদনের কাঁচামাল হিসাবে পাম ওয়েল সকরের পছন্দনীয়। মার্জারিন, শর্টনিংস ও বস্পতি উৎপাদনে এবং ø্যাক ফুডের ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইংয়ের কাজে বর্তমান বিশ্বব্যাপী পাম ওয়েল, পাম ওলিন ও পাম স্টিয়ারিন ব্যবহৃত হচ্ছে। পাম ওয়েল ব্যবহারে ব্যয়ের সাশ্রয় হয় কারণ, ব্যয় বহুল হাইড্রোজিনেশন প্রক্রিয়া ছাড়াই পাম ওয়েল ব্যবহার করা যায়। পাম ওয়েলে প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিক এন্টিঅক্সিডেন্ট থাকায় এবং উচ্চ তাপমাত্রায় এর চমৎকার স্থায়িত্ব থাকায় ডীপ ফাইংয়ের কাজ পাম ওয়েল অত্যন্ত উপযোগী।
পাম ওয়েল সু্িস্থত হওয়ায় পাম ওয়েল ভাজা খাদ্য দ্রব্য অধিক সময় পর্যন্ত খাদ্যোপযোগী থাকে। অপরপক্ষে পরিশোধিত পাম ওয়েল গন্ধ শূণ্য হওয়াতে পাম ওয়েল ভাজা খাদ্যের গন্ধ বজায় থাকে।
পাম ওয়েল খাদ্য বহির্ভূত ব্যবহার
পাম তেলের আর্থ-প্রাযুক্তিক উৎকর্ষের কারণে অভোজ্য পন্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে তেল অত্যন্ত পছন্দনীয় কাঁচামাল।
এ ধরনের পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে সাবান, ডিটারজেন্ট এবং অন্যান্য সারফ্যাকট্যান্টসমূহ।
ফ্যাটি এসিড, ফ্যাটি এলকোহল, গ্লিসারল ও অন্যান্য উদ্ভূত (ফবৎরাবফ) দ্রব্যসহ ওলিওকেমিক্যাল উৎপাদনের জন্য পাম তেল একটি উৎকৃষ্ট কাঁচামাল।
এই ওলিওকেমিক্যাল গুলো প্রসাধনী দ্রব্যাদি, ঔষধাদি এবং গৃহে ও শিল্পজগতে ব্যবহৃত বহু দ্রব্য উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়।
পাম তেলও কার্ণেল তেল থেকে প্রস্তুত ওলিওকেমিক্যাল গুলো বাইওডিগ্রেডেবল হওয়াতে পরিবেশানুকূল ডিটারজেন্ট উৎপাদনে তা বহুলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বহুমুখী পাম
পাম ওয়েল ফল ছাড়া অন্যান্য অংশের বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য গবেষণা অত্যন্ত সফল প্রমাণিত হয়েছে। পামের পাতা ও ফলশূন্য কাঁদির আঁশকে প্রক্রিয়াকাত করে মধ্যঘনত্বের ফাইবার বোর্ড ও চিপবোর্ড তৈরী করা সম্ভব হয়েছে। পাম গাছের গুঁড়ি থেকে চমৎকার আসবাবপত্র তৈরী করাও সম্ভব।
পাম ওয়েল থেকে স্বাস্থ্যকর দ্রব্য উৎপাদন
পাম ওয়েল বহুমুখীতা অন্তহীন্ সাম্প্রতিকতম উৎপাদিত দ্রব্য হচ্ছে লাল পাম তেল ও লাল পাম ওলিন। এই তেলগুলোর মধ্যে অপরিশোধিত পাম তেলে বিদ্যমান ক্যারোটিনের ৮০% ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে। প্রচলিত পদ্ধতিতে এই ক্যারোটিন পরিধোধিত তেলে ও লাল পাম ওলিনে ক্যারোটিন বিদ্যমান থাকে। মানুষের খাদ্যে ক্যারোটিন অত্যন্ত-প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর দ্রব্য। বর্তমান গবেষণায় জানা গেছে প্রাকৃতিকভাবে প্রাপ্ত পাম ক্যারোটিনের গুরুত্বপূর্ণ নিরাময়কারী গুণ রয়েছে। লাল তেলগুলোতে উচ্চমাত্রায় ভিটামিন “ই”-ও বিদ্যমান রাখা সম্ভব হয়েছে যা তেলের মধ্যে প্রাকৃতিকভাবেই থাকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাম ভিটামিন “ই” বিশেষত টোকোট্রায়েনল উপাদানটির পুষ্টিগুণের মূল্যায়ণ করা হয়েছে এবং জীবগেহে টোকোফেরলের চাইতে টোকোট্রায়েনল অধিক কার্যক্ষম বলে প্রমাণিত হয়েছে। উল্লেখ্য যে টোকোফেরল ও টোকোট্রায়েনল উভয়ই ভিটামিন“ই”। পাম তেলে টোকোট্রায়েনলের পরিমাণই বেশী। কোষের বার্ধ্যক্যীকরণ, হৃদরোগ ও ক্যান্সারের বিরুদ্ধে ভিটামিন “ই” এর প্রতিরোধী ভুমিকা আছে বলে জানা গেছে। এই বিষয়গুলোর উপর সক্রিয় গবেষণা চলছে।
লাল পাম তেল, ফল/ শাকসবজীর মধ্যে বিদ্যমান ক্যারোটিনের তুলনামূলক চিত্র
তৈল শস্য তেল/হেক্টর/বছর (কেজি)
লাল পাম তেল ৩০,০০০
গাজর ২,০০০
শাকসবজী ৬৮৫
এপ্রিকট ২৫০
টম্যাটো ১০০
কলা ৩০
কমলার রস ৮
রাষ্ট্রীয় উদ্যেগে কিভাবে পাম ওয়েল গাছ চাষাবাদ করা যেতে পারে
সরকারকে পাম ওয়েল চাষের প্রকল্প গ্রহণ করিতে হইবে এবং বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে পাম ওয়েল চাষাবাদকে বাস্তবায়িত করিতে হইবে।
সরকারী, বেসরকারী বিভিন্ন গণমাধ্যেম দ্বারা প্রচারের মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগনকে, বিভিন্ন সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানকে পাম ওয়েল চাষাবাদ সম্পর্কে ধারনা দিয়ে বৃক্ষ রোপণ অভিযান শুরু করে পাম ওয়েল চাষের প্রসার ঘটানো যায়। সরকারী প্রতিষ্ঠান যেমন স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রনালয়ের আওতাধীন যে সমস্ত রাস্তা আছে সেই রাস্তার দুই পাশে পাম ওয়েল গাছ চাষাবাদ করা যেতে পারে। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও হাসপাতালের অব্যবহৃত জায়গায়ও পাম ওয়েল চাষ করিতে সরকারী ভাবে উদ্যেগ নিতে হবে। পাহাড়ী বন বিভাগের অনাবাদী জমিতে পাম ওয়েল চাষ করা যায়। চর অঞ্চল ও উপকূল অঞ্চলে বৃক্ষ রোপন অভিযানের মাধ্যমেও চাষাবাদ করা যেতে পারে। এছাড়া দেশের সকল পুলিশ ষ্টেশন, ক্যান্টনমেন্ট, ফায়ার সার্ভিস, আনসার ও বি,ডি, আর, ক্যাম্পেও এই পাম ওয়েল গাছ চাষ করলে এক দিকে যেমন ভোজ্য তেলের অভাব পূরণ হবে অপর দিকে শোভাবর্ধন এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হবে। বন বিভাগ যে পদ্ধিতেতে বনায়ন কর্মসূচী গ্রহণ করে সেই ভাবে পাম ওয়েল গাছ চাষাবাদের প্রকল্প গ্রহণ করিলে বাংলাদেশের তেলের চাহিদা পূরণ করেও বিদেশে তেল রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। এছাড়া পাম ওয়েল চাষাবাদের মাধ্যমে বাংলাদেশের দারিদ্র বিমোচনের উল্লেখ্যযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারবে।
সূত্র : বাংলাদেশ পাম ওয়েল উন্নয়ন প্রকল্প
তিসি
বাংলাদেশে তিসির রোগ সমূহের মধ্যে পাতা ঝলসানো রোগটি প্রধান।
১। পাতা ঝলসানো রোগ
লক্ষণ
অলটারনেরিয়া লিনি নামক এক প্রকার ছত্রাকের কারণে তিসির এ রোগটি হয়ে থাকে। প্রথমে পাতার উপর ঘন বাদামী বর্ণের অসম আকৃতির দাগ পড়ে। রোগের ব্যাপকতায় পাতা শুকিয়ে যায়। এটি একটি বীজবাহিত রোগ যা যাছে প্রাথমিক ভাবে আক্রমণ ঘটায়। বাতাসের সাহায্যে বীজকণার মাধ্যমে এ রোগ বিস্তার লাভ করে। আর্দ্র আবহাওয়া এ রোগ বৃদ্ধির সহায়ক।
প্রতিকার
বীজ শোধন
বীজ বপনের পূর্বে ভিটাভেক্স-২০০, ক্যাপটান(২.৫ গ্রাম ছত্রাকনাশক/কেজি বীজ) ইত্যাদির সাহায্যে বীজ শোধনের মাধ্যমে বীজবাহিত এ ছত্রাক দমন করা যায়।
ছত্রাকনাশক প্রয়োগ
গাছে এ রাগের লক্ষণ দেখামাত্র রোভরাল ৫০ ডব্লিউপি শতকরা ০.২ ভাগ হারে (প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম ছত্রাকনাশক) ১০ দিন পরপর ত বার ছিটিয়ে দিলে রোগের প্রকোপ কমে যায়।
আগাছা দমন
সময়মত আগাছা সমনসহ ফসলের পরিচর্যার মাধ্যমে রোগের প্রার্দুভাব কমানো যায়।
চীনাবাদাম ফসলের চাষ
চীনাবাদাম একটি উৎকৃষ্ট ভোজ্য তেলবীজ এবং পুষ্টিকর খাদ্য। খোসা ছড়ানো বাদাম বীজে শতকরা ৪৮-৫২ ভাগ তেল ও শতকরা ২৪-২৬ ভাগ পোটিন বা আমিষ থাকে। বাদাম তেল সরিষার তেলের চেয়ে ভাল এবং রান্নার কাজে ব্যবহার করা যায়। এর চাষও অধিক লাভজনক। চীনাবাদাম গাছের শাখা ও পাতা পুষ্টিকর গো খাদ্য। আবার খৈলে শতকরা ৪৫-৫০ ভাগ প্রোটিন থাকে। রাইজোবয়াম নামক এক প্রকার ব্যাকটেরিয়া চীনাবাদাম গাছের শিকড় ছোট ছোট গুটি করে এর মধ্যে বাস করে। ব্যাকটেরিয়া বায়ু হতে নাইটোজেন সংগ্রহ করে মাটির উর্বরা শক্তি বাড়ায়। নদীর চর অঞ্চল সমূহে যেখানে অন্য কোন ফসল ভাল হয় না সে সকল অঞ্চলে চীনাবাদামের আবাদ খুবই ভাল। তাই চর অঞ্চলে শীত মৌসুমে এর আবাদ করা যায়। মীত বা রবি মৌসুম ছাড়াও উঁচু জমিতে খরিফ মৌসুমে এর আবাদ করা যায়। বর্তমানে রবি এবং খরিফ উভয় মৌসুমেই চীনাবাদামে আবাদ হয়ে থাকে। রবি মৌসুমে বাংলাদেশে প্রায় ৯৫ হাজার একর জমিতে এবং ফরিফ মৌসুমে প্রায় ১৫ হাজার একর জমিতে চীনাবাদামের আবাদ হয়ে থাকে। সুতরাং দেশে চীনাবাদামের আবাদ বৃদ্ধি করে এবং উচ্চ ফলনশীল জাত ব্যবহার ও উন্নত পদ্ধতিতে চাষাবাদের মাধ্যমে এর উৎপাদন বাড়িয়ে খাবার তেলের বর্তমান ঘাটতি পুরণ করা অনেকাংশ সম্ভব।
মাটি ও আবহাওয়া
চীনাবাদাম চাষের জন্যে বেলে দোঁ-আশ বা চর অঞ্চলের বেলে মাটি সবচেয়ে ভাল। কিন্তু চীনাবাদামের পেগ্ (বর্ধিত গর্ভাশয়) যাতে সহজেই মাটি ভেদ করে নীচে যেতে পারে সেজন্য মাটি বেশ নরম ও হালকা চাই। চীনাবাদাম গাছের বৃদ্ধি পর্যায়ে হালকা বৃষ্টিপাত, পর্যাপ্ত সুর্যকিরণ ও পর্যাপ্ত তাপমাত্রা বিশেষ ভাবে উপযোগী।
অনুমোদিত জাত
মাইজার বাদাম (ঢাকা-১), বাসন্তীবাদাম (ডিজি-২), ত্রিদাবাদাম (ডিএম-১) ও ঝিংগাবাদাম (এসিসি-১২) তৈলবীজ গবেষণা কেন্দ্র, বারী কর্তৃক উদ্ভাবিত চীনাবাদামের ৪টি অনুমোদিত জাত। রবি ও খরিফ মৌসুমে আবাদের জন্য এ জাতগুলোর তুলনামুলক বৈশিষ্ট শেষ পাতায় ছকে বর্ণনা করা হয়েছে:
জমি তৈরী
চীনাবাদামের গাছের পেগ্ মাটির গভীরে যায় বলে সঠিকভাবে জমি চাষ করা প্রয়োজন। তবে মাটি হালকা হলে বেশী চাষের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন রোধে ৩-৪টি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুর ঝুর করে দিতে হবে। মই দিয়ে জমি সমান করার পর জমির চার পাশে নালার ব্যবস্থা করলে পরবর্তীতে জমিতে সেচ দেওয়া এবং পানি নিষ্কাশনের সুবিধা হয়।
বপনের সময় ও পদ্ধতি
রবি ও খরিফ দুই মৌসুমেই চীনাবাদাম চাষ করা যায়। তবে রবি মৌসুমে অর্থাৎ কার্তিক মাসে (মধ্য অক্টোবর-মধ্য নভেম্বর) চাষ করলে ভাল ফলন পাওয়া যায়। অতিরিক্ত বৃষ্টি এবং অতি শীতের সময় বাদাম বপন করা উচিত নয়। অতি শীতের মধ্যে অর্থাৎ পৌষ-মাঘ মাসে বপন করলে বীজ গজাতে সময় বেশী লাগে, আর অতি বর্ষায় অর্থাৎ আষাঢ় শ্রবণ মাসে বীজ বপন করলে বীজ গজানোর ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং ফলনও তুলনামুলকভাবে কম হয়। এমনভাবে বাদাম লাগাতে হবে যেন ফসল তোলার সময় ঠিকমত রৌদ্র পাওয়া যায়। নতুবা উঠানো বাদামের গুণাগুণ শুকানোর অভাবে নষ্ট হয়ে যায়। জাত ভেদে চীনাবাদামের বীজ বপনের সময় কিছুটা তারতম্য হয়। মাইজচর বাদাম (ঢাকা-১), বাসন্তীবাদাম(ডিজি-২) ও ঝিংগাবাদাম (এসিসি-১২) বারি ও খরিফ-১ মৌসুমে চাষের জন্য অনুমোদিত। কিন্তু ত্রিদানা বাদাম (ডিএম-১) খরিফ-১ মৌসুমে চাষের জন্য অনুমোদিত। তবে খরিফ-২ মৌসুমেও এ জাতিটির চাষ করা যায়।
বপনের আগে বাদামের খোসা হতে বীজ ছাড়িয়ে নিতে হয়। বীজ এবং খোসার অনুপাত সাধারণত ৩:২ হয় অর্থাৎ ৫ কেজি খোসাসহ চীনাবাদাম হতে ৩ কেজি বীজ পাওয়া যায়। তবে জাত ভেদে কিছুটা তারতম্য হয়। জাতের বিভিন্নতায় বীজের আকৃতি ও আকার তারতম্য হওয়ায় বীজের মাত্রার পরিবর্তন হয়। নিুে জাত অনুযায়ী বীজের পমিাণ ও বীজ বপনের সময় উল্লেখ করা হয়ঃ
জাত খোসাসহ বীজের পরিমাণ কেজ/হেক্টর বীজ বপনের সময়
রবি মৌসুম খরিফ-১ মৌসুম খরিফ-২ মৌসুম
মাইজচর বাদাম (ঢাকা-১) ৯৫-১০০ কার্তিক মাস (মধ্য অক্টোবর-মধ্য নভেম্বর) ফাল্গুন মাস (মধ্য ফেরুয়ারী- মধ্য মার্চ) জ্যেষ্ঠ মাস (মধ্য মে- মধ্য জুন)
ঝিংগাবাদাম (এসিসি-১২) ১০৫-১১০ ঐ ঐ ঐ
বাসন্তীবাদাম (ডিজি-২) ১০৫-১১০ ঐ ঐ ঐ
ত্রিদানাবাদাম (ডিএম-১) ১১০-১১৫ – ঐ ঐ
চীনাবাদামের বীজ সারিতে বুনতে হয়। সারি থেকে সারির দুরত্ব ৩০ সেঃ মিঃ এবং প্রতি সারিতে গাছের দুরত্ব ১৫ সেঃ মিঃ। শুধুমাত্র ত্রিদানা (ডিএম-১) জাতের সারি থেকে সারির দুরত্ব ২৫ সেঃ মিঃ এবং সারিতে গাছের দুরত্ব ১০ সেঃ মিঃ রাখা প্রয়োজন। চীনাবাদমের বীজ হালকা মাটিতে ২.৫-৪.০ সেঃমিঃ গভীরে বপন করতে হবে। বীজ বপনের পূর্বে বীজ অংকুরোদগম ক্ষমতা পরীক্ষা এবং বীজ শোধন করা উচিৎ।
বীজের অংকুরোদগম ক্ষমতা পরীক্ষা
বীজের অংকুরোদগম ক্ষমতা নিম্নে বর্ণিত পন্থায় পরীক্ষা করা যায়
ক) পরীক্ষার জন্য ভান্ড থেকে নমুনা হিসেবে ১০০টি খোসা ছাগানো বীজ সংগ্রহ করুন।
খ) এক টুকরা কাপড় পানিতে ভিজিয়ে একটি থালা/ পাত্রের উপর বিছিয়ে দিন।
গ) কাপড়ের উপর নমুনা বীজগুলো ভালভাবে ছড়িয়ে দিন।
ঘ) এরপর আর এক টুকরা কাপড় ভিজিয়ে বীজের উপর বিছিয়ে দিন।
ঙ) তারপর আর একটি থালা/ পাত্র দিয়ে বীজ ঢেকে রেখে দিন।
৪-৫ দিনের মধ্যেই বীজগুলো গজিয়ে যাবে। বীজ গজানোর পর বীজের অংকুরোদম ক্ষমতার শতকরা হার বের করুন।
বপনের সময় বীজগুলো গজানোর ক্ষমতা শতকরা ৮০ ভাগের উপরে থাকা আবশ্যক। তবে গজানোর ক্ষমতা শতকরা ৭০-৮০ ভাগে হলে বীজের পরিমাণ বাড়িয়ে বপন করা যেতে পারে।
বীজ শোধন
উচ্চ ফলনশীল জাতের চাষ করেও কৃষক অনেক সময় আশানুরূপ ফরন পাননা। এর প্রধান কারণ জমিতে গাছের সংখ্যা খুব কম থাকে। আর জমিতে প্রয়োজনমত গাছ না থাকার প্রধান কারণ হল বপনকৃত বীজের অংকুরোদগম ক্ষমতা কম থাকা। তাছাড়া অনেক সময় বীজ বাহিত বিভিন্ন রোগ দমনের জন্য বীজ শোধন করা একান্ত প্রয়োজন। বীজ শোধনের ফলে প্রধানত: বীজ বাহিত রোগদমন এবং বীজের গজানোর ক্ষমতা বৃদ্ধিসহ বাদাম গাছ সবল ও সতেজ হয়। ভিটাভেক্স-২০০ নামক ঔষধ দ্বারা বীজ শোধন করা যায়। প্রতি কেজি চীনাবাদাম বীজের (খোসা ছাড়ানো) জন্য মাত্র ২.৫-৩.০ গ্রাম ঔষধ প্রয়োজন।
একটি বড় প্লাষ্টিকের ঢাকনায্ক্তু বোয়মে বা পাত্রে চীনাবাদামের বীজ নিয়ে পরিমাণ মত ঔষধ মিশিয়ে পাত্রের মুখ বন্ধ করে ভালভাবে নাড়াচাড়া করে বীজের গায়ে ঔষধ লাগাতে হবে। শোধিত বীজ অনিবিলম্বে জমিতে বপন করতে হবে।
সার প্রয়োগ
চীনাবাদাম গাছ শিম জাতীয় বলে শিকড়ে গুটি (নডুল) তৈরী করে রাইজোবিয়াম ব্যাকটেরিয়ার সাহয্যে বায়ু হতে নাইটোজেন সংগ্রহ করে নিজেই নাইটোজেন এর চাহিদা মিটাতে পারে। তবে ছোট বাদাম গাছগুলো যাতে সুষ্টুভাবে বেড়ে উঠতে পারে সেজন্যে কিছু ইউরিয়া সার দিলে ভাল ফলন পাওয়া যায়।
অর্ধেক ইউরিয়া ও জিপসাম এবং বাকী সকল সারের সবটুকু বীজ বপনের পূর্বে শেষ চাষের সময় জমিতে ছিটিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। বাকী অর্ধেক ইউরিয়া ও জিপসাম সার গাছের কার্যকরী ফুল আসার সময় (বপনের ৪০-৪৫ দিন পর) পার্শ্ব প্রয়োগ করতে হবে। সেই সময় জমিতে রস না থাকলে প্রয়োজনীয় সেচ দেওয়ার পর জমিতে জো আসলে সার পার্শ্ব প্রয়োগ করে গাছের গোড়ায় মাটি তুলে দিতে হবে।
সেচ এবং পানি নিষ্কাশন
খরিফ-২ মৌসুমে চীনাবাদাম চাষে সাধারণঃ সেচের প্রয়োজন হয় না। খরিফ-১ মৌসুমে ফসলের অবস্থা বুঝে প্রয়োজন বোধে একটি সেচ দেওয়া যেতে পারে। চর এলাকায় সেচ দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। রবি মৌসুমে উচু জমিতে মাটির রস তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যায় বলে সে ক্ষেত্রে প্রয়োজনবোধে ১-২ টি সেচ দেওয়া দরকার। চীনাবাদাম গাছেল গোড়ায় পানি জমলে গাছের ও বাদামের যথেষ্ট ক্ষতি হয়। তাই চীনাবাদাম ক্ষেতে প্রয়োজনীয় নালা কেটে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে।
অন্তর্বর্তীকালীন পরিচর্যা
বীজ বপনের পর একবার নিড়ানী দিয়ে জমিকে আগাছা মুক্ত রাখতে হবে। শক্তমাটি হলে ফুল আসার পর গাছে বাদাম ধরার প্রাক্কালে গোড়ায় একবার মাটি তুলে দিতে হবে।
কীট পতংগ ও রোগবালাই দমন
চীনাবাদাম ফসলে মাঝে মাঝে বিছা পোকার আক্রমণ লক্ষ্য করা যায়। এ পোকা পাতার সবুজ অংশ খেয়ে ঝাঁঝরা করে ফেলে। প্রাথমিক পর্যায়ে আক্রান্ত পাতা ছিঁড়ে ফেলে বিছা পোকার ডিম ও অল্প বয়স্ক কীড়া দমন করা যায়। বয়ঃপ্রাপ্ত বিছাপোকা দমনের জন্য রিপকর্ড ১০ ইসি বা নগস ১০০ ইসি এদের যে কোন একটি ১ মিঃলিঃ হিসাবে প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ব্যবহার করা যেতে পারে। বিছা পোকার ডিম ধ্বংস করার কাজ এলসান-৫০ ইসি, বা রিপকর্ড ১০ ইসি যে কোনটি প্রতি লিটার পানিতে ১ মিঃলিঃ হিসাবে মিশিয়ে ¯েপ্র করা যায়।
পাতায় বাদামী অথবা কাল বর্ণের দাগবড়া এবং রোগ পাতায় মরিচা বাদাম ফসলের প্রধান সমস্যা। পাতায় বাদামী বা কাল বর্ণের দাগপড়া রোগ দেখা মাত্র প্রতি লিটার পানিতে দুই গ্রাম ব্যাভিষ্টিন ঔষধ মিশিয়ে ছিটাতে হবে। রোগ দমন না হলে ১৫দিন পর পর আরও দুইবার ঔষধ দিতে হবে। মরিচা রোগ দেখা দিলে ক্যালিক্সিন বা টিল্ট ২৫০ ইসি এক মিঃ লিঃ ঔষধ ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে ১০-১২ দিন পর পর ২-৩ বার ছিটাতে হবে।
ফসল সংগ্রহ
ভাল বীজ বা গুণগতমানের বীজ পেতে হলে ফসল যথা সময় কাটতে হবে। বাদাম ফসল সঠিক সময় উঠতে হলে ফসলের পরিপক্কতা সম্বেন্ধে যথাযথ ধারনা থাকা আবশ্যক। চীনাবাদাম বীজ খুবই সংবেদনশীল বা স্পর্শকাতর। কাজেই চীনাবাদাম গাছের শতকরা ৮০-৯০ ভাগ বাদাম যখন পরিপূর্ণভাবে পরিপক্ক হয় তখন বাদামের খোসা শিরা উপ-শিরাগুলো স্পষ্টভাবে দেখা যায়। গাছের পাতাগুলো হলুদ রং ধারণ করে নীচের পাতা ঝড়ে পড়তে থাকবে। বাদামের খোসা ভাংগার পর খোসার ভিতরে সাদা কালছে দাগ দেখা যাবে এবং বীজের উপরের পাতলা আবরণ বা খোসা বাদামী বা লালচে বা বেগুনী রং (জাত ভেদে) ধারণ করলেই বুঝতে হবে ফসল উঠানোর বা কর্তন করার উপযুক্ত সময়। সাধারণতঃ আগাম বাদাম অর্থাৎ ঝিংগাবাদাম (এসিসি-১২) ও মাইজচর বাদাম (ঢাকা-১) রবি মৌসুমে সাড়ে ৪-৫ মাস এবং নারী বাদাম অর্থাৎ বাসন্তীবাদাম (ডিজি-২) ৫ থেকে সাড়ে ৫ মাসে পাকে। পরিপক্ক হবার আগে বাদাম উঠালে তা হতে ফলন এবং তেল কম হবে। আবার দেরীতে উঠালে প্রায় জাতের বাদামেই সুপ্ততা না থাকার দরুন মাটিতে পর্যন্ত রস থাকলে বীজ নীচে থাকতেই অংকুরিত হয়ে নষ্ট হয়ে যাবে। উল্লেখ থাে যে, বাসন্তী বাদাম (ডিডি-২ জাতটির বীজ ৪০-৪৫ দিন পর্যন্ত সুপ্ততা আছে, কিন্তু অন্য জাতের বাদামের সুপ্ততাকাল নেই। নিুে বিভিন্ন মৌসুমে আবাদকৃত বিভিন্ন জাতের বাদামের পরিপক্ক হওয়ার সময়কাল উল্লেখ করা হলঃ
জাত রবি মৌসুমে (শীতকাল) খরিফ-১ মৌসুমে (বসন্তকাল) খরিফ-২ মৌসুমে (শরৎকাল)
মাইজচর বাদাম (ঢাকা-১) ১৪০-১৫০ দিন ১৩০-১৪০ দিন ১২০-১৩০ দিন
বাসন্তী বাদাম (ডিজি-২) ১৫০-১৬৫ দিন ১৪৫-১৫৫ দিন ১৩৫-১৪৫ দিন
ঝিংগাবাদাম (এসিসি-১২) ১৪৫-১৫৫ দিন ১৩০-১৪০ দিন ১২৫-১৩৫ দিন
ত্রিদানাবাদাম (ডিএম-১) ১১৫-১২৫ দিন ৯৫-১০৫ দিন
বাদাম বীজ সংরক্ষণ
শস্য কাটার পর গাছ থেকে খোসাসহ ছাড়ানো বাদাম উজ্জ্বল রোদ্রে দৈনিক ৭-৮ ঘন্টা করে ৫-৬ দিন শুকিয়ে সংরক্ষণ করতে হবে। সাধারণতঃ এ অবস্থায় বীজের আদ্রতা ৮-১০% হয়ে থাকে। রোদ্রে শুকানোর পর খোসাসহ বাদাম ঠান্ডা করে প্রয়োজনীয় পাত্রে গুদামজাত করতে হবে। বাদাম বীজ সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন পাত্র বা ভান্ড যেমন পলিথিন আচ্ছাদিত বা সিনথেটিক ব্যাগ, চটের বস্তা, মাটির কলসী বা মটকা, কেরোসিন টিন বা ড্রাম, বাঁশের তৈরী ডুলী বা ঝুড়ি, পলিথিন ব্যাগ ইত্যাদি সচরাচর এ দেশে ব্যবহার হয়ে থাকে। মাটির পাত্র ও বাঁশের ডুলীতে বীজ সংরক্ষণের পূর্বে কাদামাটি ও গোবর দিয়ে আস্তরণ দিয়ে নিতেহবে, যাতে বাতাসের আদ্রতা পাত্রের ভিতরে ঢুকতে না পারে। আর চটের বস্তায় বীজ সংরক্ষণ করার পূর্বে প্রথমে চটের বস্তার সমপরিমাণ মাপের বা সাইজের পলিথিন ব্যাগ চটের বস্তার ভিতর ঢুকতে না পারে। আর চটের বস্তায় বীজ সংরক্ষণ করার পূর্বে প্রথমে চটের বস্তার সমপরিমাণ মাপের বা সাইজের পলিথিন ব্যাগ চটের বস্তার ভিতরে ঢুকিয়ে তারপর পলিথিন ব্যাগে বীজ রেখে পলিথিন ব্যাগ ও চটের বস্তার মুখ ভাল ভাবে বেধে বন্ধ করে দিতে হবে যাতে বাইরের বাতাস ব্যাগের ভিতর ঢুকতে না পারে। এর পর বাদামবীজসহ চটের বস্তা কাঠের বা বাঁশের তৈরী মাচায় রেখে দিতে হবে। বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখা গেছে যে বাদাম বীজ যথার্থভাবে সংরক্ষণের জন্য উপরে বর্ণিত পাত্রগুলির মধ্যে পলিথিন ব্যাগ বা কেরোসিন টিন বা টিনের ড্রাম বীজ সংরক্ষণের জন্য উত্তম। পলিথিন ব্যাগে বীজ সংরক্ষণ করলে বীজের মান বা গুণাগুণ এক ব্যাগ বা টিনের ড্রামে বীজ সংরক্ষণ করলে বীজের মান বা গুণাগুণ নষ্ট হয় না। তা’ছাড়া আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে বাদাম বীজ সংরক্ষণ করা যায়, যেমন-
১। ঠান্ড ঘর (কোল্ড রুম) যেখানে তাপমাত্রা ১২-১৫ ডিগ্রী সেঃ থাকে এবং বাতাসের আদ্রতা ৪০-৪৫% থাকে সেখানে ১ বৎসর থেকে ২ বৎসর পর্যন্ত শুকানো বীজ (৮-১০% বীজের আদ্রতা) সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা যায়।
২। ডিপ ফ্রিজ বা অধিক ঠান্ডা ঘর যেখানে তাপমাত্রা ৩-৪ ডিগ্রী সেঃ এবং বাতাসের আদ্রতা ৩০% এর নীচে থাকে সেখানে শুকানো বীজ (৭-৮%) বীজের আদ্রতা) ৩-৫ বৎসর পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়।
বৈশিষ্ট্য মাইজচর বাদাম (ঢাকা-১) বাসন্তী বাদাম (ডিজি-২) ত্রিদানা বাদাম (ডিএম-১) ঝিংগা বাদাম (এসিসি-১২)
রবি খরিফ-১ও২ রবি খরিফ-১ও২ খরিফ-১ও২ রবি খরিফ-১ও২
১। গাছের উচ্চতা সেঃ মিঃ ৩০-৩৫ ৩৫-৪০ ২৫-৩০
২। পার্শ্ব বিস্তার/ ব্যাস (সেঃমিঃ) ৩০-৩৫ ৩৫-৪০ ৩৫-৪০
৩। পাতার রং হালকা সবুজ হালকা সবুজ গঢ় সবুজ গঢ় সবুজ গঢ় সবুজ হালকা সবুজ হালকা সবুজ
৪। গাছের আকৃতি খাড়া খাড়া অল্প ছড়ান অল্প ছড়ান খাটো, খাড়া খাড়া খাড়া
৫। প্রতি গাছে শাখার সংখ্যা ৬-৭ ৬-৮ ৮-১০ ৮-১০ ৬-৭ ৫-৭ ৬-৮
৬। ফসলের স্থিতি কাল (দিন) ১৪০-১৫০ ১৩০-১৪০ ১৫০-১৬৫
৭। বীজের আকার মধ্যম, গোল মধ্যম, গোল বড়, লম্বা বড়, লম্বা মধ্যম, লম্বা মধ্যম, চ্যাপ্টা মধ্যম, চ্যপ্টা
৮। প্রতি বাদামে বীজের সংখ্যা ১-২ ১-২ ১-২ ১-২ ১-৪ ২-৪ ২-৪
৯। প্রতি গাছের বাদামের সংখ্যা ৩০-৩৫ ২৫-৩০ ২০-২৫ ১৫-২০ ১৫-২০ ২০-২৫ ২০-২৫
১০। বীজের রং হালকা বাদামী হালকা বাদামী লালচে বাদামী লালচে বাদামী গাঢ় লাল হালকা বাদামী হালকা বাদামী
১১। খোসাসহ বীজের পরিমাণ হেক্টর প্রতি (কেজি) ৯৫-১০০ ৯৫-১০০ ১০৫-১১০ ১০৫-১১০ ১১০-১১৫ ১০৫-১১০ ১০৫-১১০
১২। একশত বীজের ওজন (গ্রাম) ৩২-৩৫ ৩২-৩৫ ৪৫-৫০ ৪৫-৫০ ২৬-২৮ ৪০-৪৫ ৪০-৪৫
১৩। খোসা ছাড়ানো বীজের হার (%) ৭২-৭৫ ৭২-৭৫ ৬৭-৬৮ ৬৭-৬৮ ৭০-৭২ ৭৫-৭৮ ৭৫-৭৮
১৪। বীজে তেলের পরিমান(%) ৪৯-৫০ ৪৯-৫০ ৪৯-৫০ ৪৯-৫০ ৪৯-৫০ ৪৯-৫০ ৪৯-৫০
১৫। বীজের সুপ্তিকাল (দিন) নাই নাই ৪০-৪৫ ৪০-৪৫ নাই নাই নাই
১৬। ফলন হেক্টর প্রতি (কেজি)* ১৮০০-২০০০ ১৬০০-১৮০০ ২০০০-২২০০ ১৮০০-২০০০ ২০০০-২২০০ ২৪০০-২৬০০ ২০০০-২২০০
* অধিক বৃষ্টিপাত, অপর্যাপ্ত আলো ও তাপের ফলে রবি ও খরিফ-১ মৌসুমের চেয়ে খরিফ-২ মৌসুমে আবাদকৃত সব ক’টি অনুমোদিত জাতের ফলন এক তৃতীয়াংশ কম হয়।
উপাত্ত সংগ্রহ : তৈলবীজ গবেষনা কেন্দ্র, বিএআরআই
মেথী চাষ পদ্ধতি
মেথী সীম পরিবারে অন্তর্গত একটি বর্ষজীবি ফসল যা যা মাটিতে নাইট্রোজেন যুক্ত করে মাটির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি করে। যদিও মেথীর শুকনা বীজ মসলা হিসাবে অধিক পরিচিত তথাপি এর টাটকা সবুজ কচি পাতা ও কান্ড সুস্বাদু ও পুষ্টিকর সব্জী হিসাবে ব্যবহৃত হয়। বীজ নানা প্রকার তরকারী, আচার, চাটনী ইত্যাদিও স্বাদ ও সুগন্ধ বৃদ্ধির উপকরণ হিসাবে বেশ জনপ্রিয়। মেথীর যথেষ্ট ঔষধি মূল্য রয়েছে। বহুমুত্র রোগ নিয়ন্ত্রণে মেথী বিশেষ ভূমিকা পালন করে। একটি কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে এবং হজম শক্তি ও রুচি বৃদ্ধি করে। শিল্প কারখানায় মেথীর বীজ রং তৈরীতে এবং বিভিন্ন ষ্টেরিওডস নির্যাস মুক্তির কাজে ব্যবহৃত হয়। এটি গোখাদ্য হিসাবেও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। মেথী বীজ, পাতা, কাণ্ড যথাক্রমে আমিষ, শর্করা, ক্যালসিয়াম, লৌহ, ভিটামিন এ ও সি সমৃদ্ধ। মেথী ফসলের জাত উদ্ভাবণের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনষ্টিটিউটের মসলা গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীগণ গত ১৯৯৬ সাল থেকে গবেষণা কার্যক্রম শুরু করেন। পর্যায়ক্রমে দেশী ও বিদেশী জার্মপ্লাজম থেকে বাছাই করণের মাধ্যমে বাংলাশে কৃষি গবেষণা ইনষ্টিটিউটের মসলা গবেষণা কেন্দ্র কর্তৃক বারি মেথী-১ নামক একটি উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবণ করা হয়। বাংলাদেশে এটি মেথীর প্রথম উদ্ভাবিত জাত যা পুষ্টি উন্নয়নের বিশেষ ভূমিকা রাখবে।
বৈশিষ্ট্য
এটি একটি বর্ষজীবি বিরুৎ গাছের উচ্চতা ৫৫-৬০ সেঃ মিঃ। প্রাথমিক শাখার সংখ্যা ৪-৫ টি। মেথীর ফলকে ‘পড’ বলে। প্রতি গাছে শাখার সংখ্যা ৪০-৪৫টি। প্রতিটি পডের দৈর্ঘ্য ৭-৯ সেঃমিঃ যার প্রতিটিতে ১০-১২ টি বীজ থাকে। বীজগুলো শুষ্ক ও হলুদাভ বাদামী বর্ণের। এই ফসলের রোগ বালাই নেই বললেই চলে।
মাটি ও আবহাওয়া
বারি মেথী-১ জাতটি রবি মৌসুমে চাষ করা হয়। প্রায় সব প্রকার মাটিতে এর চাষ সফল ভাবে চাষ করা সম্ভব। তবে পলি- দোঁয়াশ মাটি থেকে বেলে দোঁয়াশ মাটি মেথী চাষের জন্য অধিক উপয্ক্তু। মেথী গাছের সুষ্ঠ বৃদ্ধির জন্য মাটির অম্লত্ব ৬-৭ হলে ভাল হয়।
জমি তৈরী ও বীজ বপণ
মেথী চাষের জন্য জমি খুব ভালভাবে চাষ ও মই দিয়ে তৈরী করতে হবে যাতে কোন প্রকার ঢেলা না থাকে। মাটি ও জমির প্রকার ভেদে ৪-৬টি চাষ বুনে বারি মেথী-১ এর চাষ করা হয়। ভালভাবে তৈরীকৃত জমিতে সারি থেকে সারির দূরত্ব ২৫ সেঃ মিঃ বজায় রেখে বীজ সাধারণতঃ সারি বরাবর বপণ করা হয়। পরে যখন চারা গাছ ৪-৫ পাতা বিশিষ্ট হয় তখন গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ১০ সেঃ মিঃ বজায় রেখে চারা পাতলা করে দিতে হয়।
বীজের পরিমাণ
সাধারণতঃ তৈরীকৃত জমিতে ১ মিঃ প্রশস্থ ভিটি তৈরী করা হয়। ভিটির দৈর্ঘ্য জমির পরিমাপের উপর নির্ভর করে। প্রতি হেক্টর জমিতে ১৫-২০ কেজি বীজ প্রয়োজন হয়। সেচ ও নিষ্কাশনের সুবিধার জন্য পাশাপাশি দুটি ভিটির মাঝখানে ৫০ সেঃ মিঃ প্রশস্থ নালা রাখা হয়।
সারের পরিমান ও প্রয়োগ পদ্ধতি
উচ্চ ফলন পাওয়ার জন্য সুষম সার প্রয়োগ করতে হয়। সারের মাত্রা জমির উর্বরতার উপর নির্ভরশীল। সাধারণতঃ প্রতি হেক্টরে নিুোক্ত পরিমান সারের প্রয়োজন হয়।
সারের নাম পরিমান
গোবর ৫ টন
ইউরিয়া ১৭৫ কেজি
টিএসপি ১৭৫ কেজি
এমপি ১৩৫ কেজি
জিপসাম ১১০ কেজি
পরিচর্যা
গাছের সুষ্ঠ ও স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য জমি আগাছামুক্ত রাখতে হবে। গাছের প্রাথমিক বৃদ্ধির সময় নিড়ানী দিয়ে আগাছা পরিষ্কার ও মাটি ঝুরঝুরা করে দিতে হবে এবং ১০-১৫ দিন পর ৩-৪ বার নিড়ি দিতে হবে। প্রতিবার সেচের পর ‘জো’ আসা মাত্র মাটির উপরের চটা ভেঙে দিতে হবে। এতে মাটির ভিতর আলো-বাতাস প্রবেশ করে এবং মাটি অনেকদিন রস ধরে রাখতে পারে যা পরবর্তীতে গাছের দ্রুত বৃদ্ধির সহায়ক হয়ে থাকে। মাটির প্রকারভেদে জমিতে সেচ প্রয়োগ করতে হবে। অতিরিক্ত পানি বা বৃষ্টির পানি নালা দিয়ে নিষ্কাশণের ব্যবস্থা করতে হবে।
# বারি মেথী-১ এ কোন মারাত্মক রোগ না বললেই চলে। তবে কোন রোগ দেখা গেলে প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম ডায়াথেন এম-৪৫ বা রোভরাল মিশিয়ে ১০ দিন পর পর ২-৩ বার ¯েপ্র করতে হবে। এ জাতে তেমন কোন প্রকার আক্রমণ পরিলক্ষিত হয় না।
# বীজ বপণের পর থেকে ১০৫-১১৫ দিনের মধ্যেই ফসল সংগ্রহ করা যায়। সাধারণতঃ যখন ‘পড’ সমুহ হলদে বাদামী ও কালচে বর্ণ ধারণ করে, তখন গাছ কাটা হয়। এই কাটাগাছ ১-২ দিন ছায়ায় রাখতে হয়। এরপর মাড়াই করার স্থানে ছড়িয়ে দিয়ে ২-৩ দিন রৌদ্রে শুকানোর পর ফসল মাড়াই করা হয়। মাড়াই করা বীজ ভালভাবে ২-৩ দিন রোদে শুকিয়ে বাতাসমুক্ত টিন, মাটির পট, পলিব্যাগ ইত্যাদিতে সংরক্ষণ করা হয়। বীজের রং ও সুগন্ধ বজায় রাখার জন্য সঠিক পদ্ধতি সংরক্ষণ করা উচিৎ। বারি মেথী-১ এর হেক্টর প্রতি ফলন ১২০০-১৫০০ কেজি।
বারি মেথী-১ এর চাষ পদ্ধতি
সীম পরিবারে অন্তর্গত একটি বর্ষজীবি ফসল যা যা মাটিতে নাইট্রোজেন যুক্ত করে মাটির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি করে। যদিও মেথীর শুকনা বীজ মসলা হিসাবে অধিক পরিচিত তথাপি এর টাটকা সবুজ কচি পাতা ও কান্ড সুস্বাদু ও পুষ্টিকর সব্জী হিসাবে ব্যবহৃত হয়। বীজ নানা প্রকার তরকারী, আচার, চাটনী ইত্যাদিও স্বাদ ও সুগন্ধ বৃদ্ধির উপকরণ হিসাবে বেশ জনপ্রিয়। মেথীর যথেষ্ট ঔষধি মূল্য রয়েছে। বহুমুত্র রোগ নিয়ন্ত্রণে মেথী বিশেষ ভূমিকা পালন করে। একটি কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে এবং হজম শক্তি ও রুচি বৃদ্ধি করে। শিল্প কারখানায় মেথীর বীজ রং তৈরীতে এবং বিভিন্ন ষ্টেরিওডস নির্যাস মুক্তির কাজে ব্যবহৃত হয়। এটি গোখাদ্য হিসাবেও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। মেথী বীজ, পাতা, কাণ্ড যথাক্রমে আমিষ, শর্করা, ক্যালসিয়াম, লৌহ, ভিটামিন এ ও সি সমৃদ্ধ। মেথী ফসলের জাত উদ্ভাবণের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনষ্টিটিউটের মসলা গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীগণ গত ১৯৯৬ সাল থেকে গবেষণা কার্যক্রম শুরু করেন। পর্যায়ক্রমে দেশী ও বিদেশী জার্মপ্লাজম থেকে বাছাই করণের মাধ্যমে বাংলাশে কৃষি গবেষণা ইনষ্টিটিউটের মসলা গবেষণা কেন্দ্র কর্তৃক বারি মেথী-১ নামক একটি উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবণ করা হয়। বাংলাদেশে এটি মেথীর প্রথম উদ্ভাবিত জাত যা পুষ্টি উন্নয়নের বিশেষ ভূমিকা রাখবে।
বৈশিষ্ট্য
এটি একটি বর্ষজীবি বিরুৎ গাছের উচ্চতা ৫৫-৬০ সেঃ মিঃ। প্রাথমিক শাখার সংখ্যা ৪-৫ টি। মেথীর ফলকে ‘পড’ বলে। প্রতি গাছে শাখার সংখ্যা ৪০-৪৫টি। প্রতিটি পডের দৈর্ঘ্য ৭-৯ সেঃমিঃ যার প্রতিটিতে ১০-১২ টি বীজ থাকে। বীজগুলো শুষ্ক ও হলুদাভ বাদামী বর্ণের। এই ফসলের রোগ বালাই নেই বললেই চলে।
মাটি ও আবহাওয়া
বারি মেথী-১ জাতটি রবি মৌসুমে চাষ করা হয়। প্রায় সব প্রকার মাটিতে এর চাষ সফল ভাবে চাষ করা সম্ভব। তবে পলি- দোঁয়াশ মাটি থেকে বেলে দোঁয়াশ মাটি মেথী চাষের জন্য অধিক উপয্ক্তু। মেথী গাছের সুষ্ঠ বৃদ্ধির জন্য মাটির অম্লত্ব (চঐ) ৬-৭ হলে ভাল হয়।
জমি তৈরী ও বীজ বপণ
মেথী চাষের জন্য জমি খুব ভালভাবে চাষ ও মই দিয়ে তৈরী করতে হবে যাতে কোন প্রকার ঢেলা না থাকে। মাটি ও জমির প্রকার ভেদে ৪-৬টি চাষ বুনে বারি মেথী-১ এর চাষ করা হয়। ভালভাবে তৈরীকৃত জমিতে সারি থেকে সারির দূরত্ব ২৫ সেঃ মিঃ বজায় রেখে বীজ সাধারণতঃ সারি বরাবর বপণ করা হয়। পরে যখন চারা গাছ ৪-৫ পাতা বিশিষ্ট হয় তখন গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ১০ সেঃ মিঃ বজায় রেখে চারা পাতলা করে দিতে হয়।
বীজের পরিমান
সাধারণতঃ তৈরীকৃত জমিতে ১ মিঃ প্রশস্থ ভিটি তৈরী করা হয়। ভিটির দৈর্ঘ্য জমির পরিমাপের উপর নির্ভর করে। প্রতি হেক্টর জমিতে ১৫-২০ কেজি বীজ প্রয়োজন হয়। সেচ ও নিষ্কাশনের সুবিধার জন্য পাশাপাশি দুটি ভিটির মাঝখানে ৫০ সেঃ মিঃ প্রশস্থ নালা রাখা হয়।
সারের পরিমান ও প্রয়োগ পদ্ধতি
উচ্চ ফলন পাওয়ার জন্য সুষম সার প্রয়োগ করতে হয়। সারের মাত্রা জমির উর্বরতার উপর নির্ভরশীল। সাধারণতঃ প্রতি হেক্টরে নিুোক্ত পরিমান সারের প্রয়োজন হয়।
সারের নাম পরিমান
গোবর ৫ টন
ইউরিয়া ১৭৫ কেজি
টিএসপি ১৭৫ কেজি
এমপি ১৩৫ কেজি
জিপসাম ১১০ কেজি
পরিচর্যা
গাছের সুষ্ঠ ও স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য জমি আগাছামুক্ত রাখতে হবে। গাছের প্রাথমিক বৃদ্ধির সময় নিড়ানী দিয়ে আগাছা পরিষ্কার ও মাটি ঝুরঝুরা করে দিতে হবে এবং ১০-১৫ দিন পর ৩-৪ বার নিড়ি দিতে হবে। প্রতিবার সেচের পর ‘জো’ আসা মাত্র মাটির উপরের চটা ভেঙে দিতে হবে। এতে মাটির ভিতর আলো-বাতাস প্রবেশ করে এবং মাটি অনেকদিন রস ধরে রাখতে পারে যা পরবর্তীতে গাছের দ্রুত বৃদ্ধির সহায়ক হয়ে থাকে। মাটির প্রকারভেদে জমিতে সেচ প্রয়োগ করতে হবে। অতিরিক্ত পানি বা বৃষ্টির পানি নালা দিয়ে নিষ্কাশণের ব্যবস্থা করতে হবে।
# বারি মেথী-১ এ কোন মারাত্মক রোগ না বললেই চলে। তবে কোন রোগ দেখা গেলে প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম ডায়াথেন এম-৪৫ বা রোভরাল মিশিয়ে ১০ দিন পর পর ২-৩ বার ¯েপ্র করতে হবে। এ জাতে তেমন কোন প্রকার আক্রমণ পরিলক্ষিত হয় না।
# বীজ বপণের পর থেকে ১০৫-১১৫ দিনের মধ্যেই ফসল সংগ্রহ করা যায়। সাধারণতঃ যখন ‘পড’ সমুহ হলদে বাদামী ও কালচে বর্ণ ধারণ করে, তখন গাছ কাটা হয়। এই কাটাগাছ ১-২ দিন ছায়ায় রাখতে হয়। এরপর মাড়াই করার স্থানে ছড়িয়ে দিয়ে ২-৩ দিন রৌদ্রে শুকানোর পর ফসল মাড়াই করা হয়। মাড়াই করা বীজ ভালভাবে ২-৩ দিন রোদে শুকিয়ে বাতাসমুক্ত টিন, মাটির পট, পলিব্যাগ ইত্যাদিতে সংরক্ষণ করা হয়। বীজের রং ও সুগন্ধ বজায় রাখার জন্য সঠিক পদ্ধতি সংরক্ষণ করা উচিৎ। বারি মেথী-১ এর হেক্টর প্রতি ফলন ১২০০-১৫০০ কেজি।
ক্ষতিকারক পোকা
বাদামী গাছ ফড়িং
ধান ফসল বিশেষ করে বোরো ধানের জমিতে বাদামী গাছ ফড়িং পোকাটি মারাত্মকভাবে ক্ষতি করে থাকে। এছাড়া আউশ ও রোপা আমন ধানেও এ পোকার আক্রমণের তীব্রতা দেখা যায়। বাদামী গাছফড়িং পোকাটি মারাত্মকভাবে ক্ষতি করে থাকে। এছাড়া আউশ ও রোপা আমন ধানেও এ পোকার আক্রমণের তীব্রতা দেখা যায়। বাদামী গাছফড়িং দীর্ঘদিন ধরে আমাদের দেশে থাকলেও ধানের জমিতে এ পোকার আক্রমণের ব্যাপকতা লক্ষ করা যায় মাত্র অল্প কিছু দিন ধরে। এ পোকা দ্বারা আক্রমণের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ার প্রধান করণ হচ্ছে সব মৌসুমেই উন্নতমানের পরিচর্যা এবং উচ্চফলনশীল জাতের ধান ব্যবহারের দ্বারা ধানের জমিতে যে পরিবেশের সৃষ্টি হয় তার ফলে বাদামী গাছফড়িংয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। ধানের চারা অবস্থা থেকে শুরু করে ধান পাকার পূর্ব পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে এ পোকার আক্রমণ হতে পারে।
পোকাটি দেখতে কেমন?
সাধারণত একটি পূর্ণ বয়স্ক বাদামী গাছফড়িংয়ের রঙ বাদামি হয়। এ পোকা আকারে ছোট, পেট মোটা এবং লম্বায় ৩-৫ মিলিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। এ পোকা পাখায্ক্তু ও পাখা বিহীন দু’ধরনেরই হতে পারে। পাখাযুক্ত পোকা দ্রুত উড়তে পারে। তবে পাখাবিহীন হাজার হাজার পোকার জন্ম দিতে পারে। বছরে এ পোকার প্রায় ১১-১১টি প্রজন্ম দেখা যায়। পাখাবিহীন পোকা অধিকহারে ডিম দিয়ে থাকে। এ ছাড়া পাখাযুক্ত পোকা দ্রুত স্থানান্তর করে থাকে। ডিম থেকে খুব ক্ষুদ্র বাচ্চা বের হয় এবং এরা গাছের রস খেয়ে বেঁচে থাকে। সদ্য ফোটা বাচ্চাগুলো খুবই ছোট হয় এবং এদের গায়ের রঙ সাদা বা হালকা বাদামি রঙয়ের হয়ে থাকে।
পোকার অবস্থান
বাচ্চা ও পূর্ণবয়স্ক বাদামী গাছফড়িং আলো ও বাতাস বেশি পছন্দ করে না। গাছের গোড়ার দিকে যেখানে ছায়া ও আর্দ্রতা থাকে এসব স্থানে এরা অবস্থান নেয়। এখানে থেকে পোকা গাছের কাণ্ড ও পাতার খোল হতে রস শুষে খায়।
পাখাযুক্ত পোকারা উড়ে জমির একস্থান থেকে অপর স্থানে অথবা এক জমি থেকে অন্য জমিতে চলে যেতে পারে। সাধারণত যেসব জমিতে ঘন করে গাছ লাগানো হয় বা জমিতে বেশি করে সার ব্যবহারের ফলে গাছ খুব ঘন হয়ে থাকে এবং ধান গাছে আলো বাতাস চলাচলে বাধাগ্রস্ত হয়ে সেসব জমিতে বাদামি গাছফড়িং খুব তাড়াতাড়ি বংশবিস্তার করে থাকে । সাধারণত ধান গাছে যখন থোড় ও ফুল আসে ঠিক তখনই গাছে এ পোকার সংখ্যা বাড়তে থাকে।
পোকার জীবন বৃত্তান্ত
বাদামী গাছফড়িং তিন পর্যায়ে এদের বংশবিস্তার করে থাকে। তাহলো- ডিম, বাচ্চা (নিষ্ফ) ও পূর্ণবয়স্ক পোকা। স্ত্রী পোকা প্রথমে পাতার খোলে বা পাতার মধ্য শিরায় বেশ কতকগুলো ডিম পাড়ে। এরা একসাথে অনেকগুলো গাদায় ডিম পাড়ে। প্রতিটি গাদায় প্রায় ৪০০-৬০০টি ডিম থাকে। এসব ডিমের ওপর পাতলা চওড়া একটা আবরণ থাকে। ডিম পাড়ার ৭-৯ দিনের মধ্যে প্রতিটি ডিম ফুটে সাদা রঙয়ের অতিক্ষুদ্র বাচ্চা বের হয়। এসব বাচ্চা পাতার খোল থেকে রস শুষে এবং এভাবে বড় হতে থাকে।
বাচ্চা পূর্ণবয়স্ক পোকায় পরিণত না হওয়ার আগ পর্যন্ত পাঁচবার খোলস পরিবর্তন করে। এভাবে একটি বাচ্চার পরিপূর্ণ ফড়িং হতে ১৩-১৫ দিন সময়ের প্রয়োজন হয়। প্রথম পর্যায়ে বাচ্চাগুলোর রঙ সাদা থাকে, তবে পরে এরা বাদামি রঙ ধারণ করে। ডিম হতে পূর্ণ বয়স্ক পোকায় পরিণত হতে এদের প্রায় ২৫ দিন সময় লাগে। এপোকার জন্ম হার খুব দ্রুত। বছরে এরা ১০-১১ বার বংশবিস্তার করে থাকে।
আক্রমণ কাল
সাধারণত মার্চ মাসে এ পোকার সংখ্যা কম থাকে। এরপর এ পোকা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেয়ে এপ্রিল-মে মাসে প্রচুর হয়। জুন মাসে আবার এদের সংখ্যা কমতে থাকে এবং সেপ্টেম্ব মাস পর্যন্ত এ পোকা কম সংখ্যায় থাকে। পুনরায় অক্টোবর মাসে এ পোকার সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। এভাবে বৃদ্ধি পেয়ে নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে এরা আবার সর্বোচ্চ সংখ্যায় হয়ে যায়।
ক্ষতির লক্ষণ
এ পোকা আবহাওয়া অনুকূল পেলে সাধারণত দ্রুত বংশ বিস্তার করে থাকে। যেসব স্থানে এ পোকার সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, সেসব স্থানের ধান গাছগুলো শুকিয়ে যায় এবং দূর থেকে এসব জমি পোড়া ক্ষেতের মতো দেখা যায়। জমির এ ধরনের শুকিয়ে যাওযা অবস্থাকে ‘ফড়িং পোড়া’ (হপার বার্ণ) বলা হয়। জমির ফড়িং পোড়া এ অবস্থা কয়েকদিনের মধ্যেই পুরো জমিতে বিস্তার লাভ করে থাকে। সাধারণত ধান গাছে ফুল আসার পর এ ধরনের ক্ষতি হতে দেখা যায়। তবে অন্যস্থান থেকে অধিকসংখ্যক পোকা উড়ে এসে অল্প বয়স্ক ধানের জমি যদি আক্রমণ করে তখনো জমির এ ধরনের ‘ফড়িং পোড়া’ ক্ষতি দিতে পারে। বয়স্ক গাছে অর্থাৎ ফুল আসার সময় প্রতি গাছে ২০-২৫টি ফড়িং থাকলে ধানের তেমন ক্ষতি করতে পারে না। তবে এ সংখ্যা যদি গাছ প্রতি ৩০০-৪০০টি হয় তাহলে গাছ মরে শুকিয়ে যায় এবং ফড়িং পোড়া অবস্থার সৃষ্টি করে। শুষ্ক আবহাওয়ায় ধান ক্ষেতে যদি পানি জমা থাকে এবং বাতাসের আর্দ্রতা বেশি হয় তখনই এ পোকার আক্রমনের প্রকোপ বাড়ে। থোড় আসর পর পোকার আক্রমণ হলে ধান চিট হয়ে যায়। বাদামি গাছফড়িংয়ের আক্রমণের ফলে শতকরা ২০ থেকে ১০০ ভাগ পর্যন্ত ফসল নষ্ট হয়ে থাকে।
প্রতিকার
* যেসব এলাকায় এ পোকার আক্রমণ হয়েছে বা আক্রমণের আশঙ্কা রয়েছে সেসব এলাকার ধানের জমি প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে একাবার তদারক করতে হবে।
* গাছের গোড়ায় এ পোকা বা তাদের বাচ্চা আছে কি না তা সকাল বেলায় পরীক্ষা করতে হবে। একটি কাঠি দিয়ে গাছের গোড়ায় আঘাত করা হলে পোকাগুলো পানিতে ভাসতে দেখা যাবে।
* উপদ্রুত এলাকা, যেমন- বৃহত্তর রাজশাহী, ময়মনসিংহ, বরিশাল, খুলনা, চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রতিরোধশীল জাত ব্রি ধান ৩৫ অথবা আগাম জাত যেমন ব্রি ধান ৩৩ কিংবা বিআর-৬ এর চাষ করা যেতে পারে।
* ঘন করে গাছ রোপণ করা হলে এ পোকা তাড়াতাড়ি বংশবৃদ্ধি করে, তাই ধানের চারা অন্তত ২৫ সেমি. দূরে দূরে রোপণ করতে হবে। এতে প্রতিটি গাছ প্রচুর আলো বাতাস পাবে এবং এ পোকা দ্বারা গাছ আক্রান্ত হবে না।
* ধানের যেসব জমি বেশি উর্বর সেসব জমিতে নির্ধারিত মাত্রায় অর্ধেক হারে ইউরিয়া সার প্রয়োগ করতে হবে। বাদামি গাছফড়িংয়ের আক্রমণ হলে ধানে ফুল আসার আগেই জমিতে ইউরিয়া সারের উপরিপ্রয়োগ বন্ধ রাখতে হবে।
* ধানের জমি এ পোকা দ্বারা আক্রান্ত হলে জমির পানি ৭-৮ দিনের জন্য সরিয়ে নিয়ে পোকার বংশ বৃদ্ধি কমানো যায়।
* জমিতে বাদামি গাছফড়িংয়ের প্রচুর প্রাকৃতিক শত্র“ আছে। এরা ফড়িংয়ের ডিম, বাচ্চা ও পোকা খেয়ে এদের সংখ্যা কমিয়ে রাখে। এসব উপকারী প্রাণী বা পোকার যাতে ক্ষতি না হয় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।
* বাদামি গাছফড়িং গাছের গোঁড়ায় থাকে। যন্ত্রের দ্বারা গাছে কীটনাশক ওষুধ ছিটানো ওষুধ ধুয়ে গেলে এক সপ্তাহ পরে আবার গাছে ওষুধ করতে হবে।
* জমিতে গড়ে কুশি প্রতি ১.৫টি হিসেবে বাচ্চা বা পূর্ণবয়স্ক গর্ভবতী পোকা থাকলে স্থানীয় কৃষি কর্মীর সহায়তা নিয়ে সুপারিশকৃত মাত্রায় কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে।
* সর্বোপরি জমিতে হাতজাল, আলোর ফাঁদ ব্যবহার করে, জমিতে হাঁস ছেড়ে, ক্ষেতে ডালপালা পুঁতে বা জমিতে উপকারী পোকার পরিমাণ বাড়ানোর মাধ্যমে বাদামি গাছফড়িং সহজে, খরচ ছাড়া এবং পরিবেশ সুস্থ রাখার মাধমে দমন করা সম্ভব।
চিনার উফশী জাত (তুষার)
বাংলাদেশে ধান, গম ইত্যাদি প্রধান খাদ্যশস্যের পাশাপাশি গৌন খাদ্যশস্য সমূহের গুরুত্ব কম নয়। চিনা এমনি একটি ফসল। দীর্ঘদিন ধরে এ দেশে চিনার চাষ করা হচ্ছে। উচ্চফলনশীল ধান গম চাষের প্রসারের ফলে চীনার আবাদ অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। তবে খরা বা বন্যার পর কৃষি পূণর্বাসনে চিনা যথেষ্ট অবদান রাখতে পারে। দেশের বিভিন্ন কৃষি পরিবেশে কম বেশী চিনার চাষ করা হয়। তবে অনুর্বর এলাকা অথবা চরাঞ্চলে এ ফসলটি ব্যাপকভাবে চাষ করা হয়। চিনা খরা প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন এবং খাদ্যমানের দিক থেকে চাল, গম, ভুট্টা ইত্যাদির চেয়ে আমিষ এবং খনিজ উপাদানে অধিক সমৃদ্ধ। নিুে চাল, গম ও চিনার তুলনামূলক খাদ্যমানের একটি ছক দেয়া হলো।
চাল, গম ও ভুট্টার তুলনায় মিলেট খাদ্যমান (ভক্ষণ যোগ্য অংশের প্রতি একশত গ্রামে)।
পুষ্টি উপাদান চিনা ঋুরা এারুয়া চাল গম ভুট্টা
আমিষ ১২.৫ ৬.২ ৭.৩ ৬.৪ ১১.৮ ১১.১
চর্বি ১.১ ২.২ ১.৩ ০.৪ ১.৫ ৩.৬
খনিজ ১.৯ ৪.৪ ২.৭ ০.৭ ১.৫ ৩.৬
আঁশ ২.২ ৯.৮ ৩.৬ ০.২ ১.২ ২.৭
অন্যান্য
শ্বেতসার ৭০.৪ ৬.৫ ৭২.০ ৭৯.০ ৭১.২ ৬৬.২
ক্যালরী ৩৪১.০ ৩০৭.০ ৩২৮.০ ৩৪৮.০ ৩৪৬.০ ৩৪২.০
পানি ১১.৯ ১১.৯ ১৩.১ ১৩.৩ ১২.৮ ১৪.৯
উৎসঃ কে, ও রাচি। দি মিলেটস। ইম্পর্টেন্স, ইউটিলাইজেশন এন্ড আউটলুক। পৃষ্ঠা-৪৮। ইক্রিসাট, ১-১১-২৫৬, বেগম পেট , হায়দ্রাবাদ-৫০০০১৬
জাত উদ্ভাবনের ইতিবৃত্ত
তুষার জাতটি ১৯৭২ সনে ডযরঃব গরষষবঃ (হোয়াইট মিলেট) নামে ফ্রান্স থেকে বাংলাদেশে আনা হয় এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের খাদ্য শাখায় প্রাথমিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে বাছাই করা হয়। এর পর বেশ কয়েক বৎসর অত্র ইনস্টিটিউটের বিভিন্ন আঞ্চলিক ও উপ-কেন্দ্রে বিভিন্ন পরীক্ষার পর এ জাতটি উচ্চফলনশীল, অধিক রোগবালাই প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন এবং এদেশের আবহাওয়া উপযোগী বলে চুড়ান্তভাবে নির্বাচন করা হয়।
বৈশিষ্ট্য ও গুনাগুন
তুষার জাতের উচ্চতা মাঝারি (৭০-৭৫ সেঃমিঃ) এবং গাছগুলো বেশ শক্ত, ফলে সহজে নুয়ে পড়ে না। এজাতের গাছের শীষ তুলনামূলকভাবে আকারে বেশ লম্বা (২০ সেঃমিঃ) এবং শীষে বীজগুলো গুচ্ছ আকারে থাকে। এ জাতের বীজের রং হালকা ঘিয়ে এবং বীজ আকারে বেশ বড়। স্থানীয় জাতের চেয়ে তুষারের ফলন শতকরা ৩৭ ভাগ বেশী এবং এটি স্থানীয় জাতের চেয়ে প্রায় ১০দিন আগে পাকে।
জমি নির্বাচন ও তৈরী
পানি জমে না এমন বেলে দো-আঁশ বা দো-আঁশ মাটি চিনা চাষের জন্য উপযুক্ত। ‘জো’ আসার পর মাটির প্রকার ভেদে ২-৪ টি আড়াআড়ি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে বীজ বুনতে হবে।
বপনের সময়
তুষারের চাষ রবি মৌসুমে করা হয়। কার্তিক মাসের মাঝামাঝি থেকে পৌষ মাস পর্যন্ত এর বীজ বোনা যায়। তবে অগ্রহায়ণ মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে পৌষ মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত বুনলে ভাল ফলন পাওয়া যায়।
বীজের পরিমান
ছিটিয়ে বুনলে হেক্টর প্রতি ২০ কেজি এবং সারিতে বুনলে ১৮ কেজি বীজ বুনতে হবে। অবশ্য বীজের অংকুরোদগম ক্ষমতার উপর বীজের পরিমান নির্ভর করে।
বপন পদ্ধতি
বীজ ছিটিয়ে অথবা সারিতে বোনা যায়। সারিতে বুনলে দু’সারির মাঝে দূরত্ব রাখতে হবে ২০-৩০ সেঃমিঃ। হাতলাঙ্গল দিয়ে ৩-৫ সেঃ মিঃ গভীরে সারি টেনে বীজ বুনতে হবে এবং মাটি দিয়ে ভালভাবে বীজ ঢেকে দিকে হবে।
চারাগাছ পাতলাকরণ ও আগাছা দমন
চারা গজানোর পর ৬-৮ সেঃমিঃ দূরত্বে একটি কওে চারা রেখে মাঝের চারাগুলো তুলে ফেলতে হবে। ক্ষেতে আগাছা জন্মালে তা নিড়ানী দিয়ে তুলে ফেলা দরকার।
সার প্রয়োগ
সাধারণতঃ অনুর্বর জমিতে চিনার চাষ করা হলেও সার প্রয়োগে এর ফলন অনেকাংশে বৃদ্ধিপায়। চিনা চাষের জন্য নিুলিখিত হারে সার প্রয়োগ করলে ভাল ফলন পাওয়া যায়।
রাসায়নিক সার পরিমাণ (হেক্টর প্রতি)
ইউরিয়া ৯০ কেজি
টিএসপি ৭০ কেজি
মিউরেট অব পটাশ ৩৫ কেজি
সেচের ব্যবস্থা থাকলে শেষ চাষের সময় অর্ধেক ইউরিয়া এবং সবটুকু ফসফেট ও পটাশ সার প্রয়োগ করতে হবে। বাকী অর্ধেক ইউরিয়া বীজ বপনের ৩৫-৪০ দিন পরে উপরি প্রয়োগ করতে হবে। তবে, ইউরিয়া উপরি প্রয়োগের সময় প্রয়োজন হলে একটি হালকা সেচ দিতে হবে। কিন্তু সেচবিহীন চাষে সম্পূর্ণ সার চাষের সময় প্রয়োগ করতে ভাল ফলন পাওয়া যায়।
সেচ ও পানি নিস্কাশন
চিনার জন্য পানি সেচের দরকার পড়ে না। তবে বেলে দো-আঁশ মাটিতে রসের অভাব হলে ২-১টি হালকা সেচের ব্যবস্থা করলে অধিক ফলন পাওয়া যায়। সেচের পানি ক্ষেতে জমে যাতে ফসলের ক্ষতি করতে না পারে সে জন্য পানি নিস্কাশনের ব্যবস্থা থাকা দরকার।
কীটপতঙ্গ, রোগবালাই ও তার প্রতিকার
উদ্ভাবিত তুষার জাতটিতে অন্যান্য জাতের তুলনায় গোড়াপঁচা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা রয়েছে বেশী। এছাড়া এতে পোকামাকড়ের আক্রমণ কম হয়। পোকার আক্রমণের তীব্রতা বুঝে হেক্টর প্রতি ৪০ আউন্স (২.৫ গ্যালন পানিতে শিশির ৯ ক্যাপ বা ৪৫ মিঃলিঃ) ডায়াজিনন বা ম্যালাথিয়ন কীটনাশক ছিটানো যেতে পারে।
ফসল সংগ্রহ, মাড়াই ও সংরক্ষণ
তুষারের শীষের দুই-তৃতীয়াংশ দানা যখন খড়ের রং ধারণ করে তখন বুঝতে হবে ফসল কাটার সময় হয়েছে। ফসল কাটার সময় হলে শীষসহ গাছ কেটে তা রোদে শুকাতে হবে এবং লাঠি দিয়ে পিটিয়ে অথবা গরুর পায়ে মাড়িয়ে দানা ছাড়াতে হবে। ছাড়ানো দানা ভালভাবে রোদে শুকিয়ে ঠাণ্ডা করে মাটি বা রোদে শুকিয়ে ঠাণ্ডা করে মাটি বা টিনের পাত্রে মুখ বন্ধ করে রাখতে হবে যাতে বাইরের বাতাস পাত্রে ঢুকতে না পারে। এছাড়া মোটা পলিথিন ব্যাগেও বীজ সংরক্ষণ করা যায়। মাঝে মাঝে বীজ রোদে শুকানোর পর ঠাণ্ডা করে পুনরায় একইভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। তুষারের গড় ফলন প্রতি হেক্টরে ২.৫-৩.০ টন।
ব্যবহার
কাউনের মত চিনার চালও আতপ অথবা সিদ্ধ দু’ভাবেই খাওয়া যায়। ঢেকি বা কাইলে ধানের মত ছেঁটে চাল বের করা যায়। এক কুইন্টাল (১০০ কেজি) চিনার পায় ৮৫ সের চাল পাওয়া যায়। চিনা সাধারণতঃ ভাত হিসেবে খাওয়া হয়। সরাসরি ভাত হিসেবে অথবা চালের সাথে মিশিয়ে ভাত হিসেবে খাওয়া যায়। ধানের চাল অপেক্ষা চিনার চালে ভাতের পরিমান বেশী হয়। আতপ চিনা ডালের সাথে মিশিয়ে খিচুরী পাক করা যায়। নানা রকম সবজী মিশালে খিচুরী আরও উপদেয় এবং পুষ্টিকর হবে। দুধ চিনি মিশিয়ে পায়েশ এবং চিনার আটা দিয়ে তৈরি বিভিন্ন রকমের তেলে ভাজা পিঠা সকলের জন্য সুস্বাদু খাবার। এছাড়া চিনা ভেজে পাকানো গুড়ে মোয়া বা নাড়– তৈরী করা যায়। ভাজা চিনা গুড়া করে ছাতু হিসেবেও খাওয়া যায়।
ফলন
ভালোভাবে কলার চাষ করলে গাছ প্রতি প্রায় ২০ কেজি বা হেক্টরপ্রতি প্রায় ২০-৪০ টান ফলন পাওয়া যাবে।
আন্তঃ ফসল হিসাবে তিলের সাথে চীনাবাদামের চাষ
তিল বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ভোজ্যতেল ফসল। বাংলাদেশে আগাম খরিফ এবং নাবি খরিফ মৌসুমে তিলের চাষ করা হয়। তবে দুই তৃতীয়াংশ তিল আবাদ হয় আগাম খরিফ মৌসুমে অর্থাৎ মার্চ- মে মাসে এবং বাকি এক তৃতীয়াংশ চাষ হয় নাবি খরিফ মৌসুমে অর্থাৎ সেপ্টেম্বর-নভেম্বর (ভাদ্র-কার্তিক) মাসে। তিল একটা খরসহিষ্ণু ফসল। ইহা জমিতে জলাবদ্ধতা অথবা অতিরিক্ত রস সহ্য করতে পারেনা, এ অবস্থা হলে তিলের গাছ মরে যায। উঁচু ঢালু জমি যেখানে পানি আটকে থাকে না সে সব জমি তিল চাষের জন্য নির্বাচন করা উচিত। তিল সাথি ফসল এবং মিশ্র ফসল হিসাবে বিভিন্ন ফসলের সাথে আবাদ করা যায় যেমন আউশ ধান, কাউন প্রভৃতি ইদানিং পরীক্ষার মাধ্যমে দেখা যায় যে, তিলের সাথে আন্তঃফসল হিসাবে চীনাবাদামের চাষ করা যায়। চীনাবাদামের একটি জাত ত্রিদানা বাদাম (ডি, এম-১), যার উচ্চতা ১০-১২ সে.মি. এবং মাঠে বেশী জায়গা দখল করে না। এই জাত আগাম খরিফ মৌসুমে চাষের জন্য খুবই উপযোগী। এই জাতের জীনাবাদামের পড়ে ২/৩/৪ টি করে বীজ থাকে। চীনাবাদাম অতিবৃষ্টিতে সহজে নষ্ট হয় না, ফলে কোন বছর তিল ফসল নষ্ট হলেও চীনাবাদাম সহজে নষ্ট হয় না। ফলে কৃষক আর্থিকভাবে পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্থ হবে না। নিুে তিল ফসলের সাথে আন্তঃফসল হিসাবে চীনাবাদাম চাষের প্রযুক্তির বর্ণনা দেয়া হল।
“ দুই জোড়া সারি তিলের মাঝে তিন সারি চীনাবাদামের চাষ”
জমি নির্বাচন
মাঝারি উঁচু থেকে উঁচু ঢালু জমি নির্বাচন করা উচিত যাতে বৃষ্টির পানি বেশীক্ষণ না দাড়ায়। দো-আঁশ, অথবা বেলে দো-আঁশ মাটি নির্বাচন করা উচিত।
জমি তৈরী
মাটি ভালভাবে চাষ ও মই দিয়ে ঝুরঝুরে করে নিতে হবে যাতে জমিতে বড় বড় টিলা না থাকে। বীজ বপনের পূর্বে জমি মই দিয়ে সমান করে নিতে হবে। বৃষ্টির পানি অথবা সেচের পানি নিষ্কাশনের জন্য নালার ব্যবস্থা রাখতে হবে। উঁচু করে বেড তৈরী করলেও সুফল পাওয়া যায়।
জাতের নাম
তিল: টি-৬ অথবা অন্য কোন জাত
চীনাবাদাম: ত্রিদানাবাদাম (ডিএম-১)
বপনের সময়
আগাম খরিফ মৌসুমের জন্য ফেব্র“য়ারী মাসের মাঝামাঝি থেকে পুরো মার্চ মাস (ফালগুন মাস) এবং নাবি খরিফ মৌসুমের জন্য আগষ্ট-সেপ্টেম্বর (ভাদ্র) মাস বপনের উপযুক্ত সময়।
বীজের হার
নিম্নবর্ণিত হারে বীজ বপন করতে হবে।
হেক্টর প্রতি (কেজি) একর প্রতি (কেজি) বিঘা প্রতি (কেজি)
তিল + চীনাবাদাম তিল + চীনাবাদাম তিল + চীনাবাদাম
৫.০ + ৫০.০ ২.০ + ২০.০ ০.৭০ + ৬.৫
বীজ বপন পদ্ধতি
দুই জোড়া সারির তিলের মাঝে তিন সারি চীনাবাদাম লাগাতে হবে। তিলের সারি থেকে সারির দুরত্ব ৩০ সেঃ মিঃ এবং সারিতে লাগাতার বীজ বপন করতে হবে। চীনাবাদামের এক সারি থেকে অন্য সারির দুরত্ব ২৫ সেঃ মিঃ এবং সারিতে এক গাছ থেকে অন্য গাছের দুরত্ব ১০ সেঃ মিঃ। বীজ লাগানোর সময় প্রতি হিলে ১টা বা ২টা বীজ দিতে হবে। বীজের সংখ্যা অংকুরোদগম ক্ষমতার উপর নির্ভরশীল। তিল ও চীনাবাদাম পর সারি মাটি ঢেকে দিতে হবে।
সার
সারের মধ্যে ইউরিয়া, এমপি, টিএসপি, জিপসাম, জিংকঅক্সাইড, বরিকএসিড। এই সারের মাত্রা বিভিন্ন কৃষি পরিবেশ অঞ্চলে জমির উর্বরতা ভেদে কম বেশী হয়। যা কৃষি বিভাগ থেকে জেনে নেওয়া প্রয়োজন।
সার প্রয়োগ
উপরে উল্লেখিত সারসমূহ জমি তৈরীর শেষ চাষের সময় ছিটিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। ইহা ছাড়াও ২০ কেজি ইউরিয়া সার উপরি প্রয়োগ করতে হবে শুধু মাত্র দুই সারির তিলের মাঝামাঝি জায়গায় ছিটিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। এ সময়ে জমিতে পর্যাপ্ত রস থাকা প্রয়োজন।
আগাছা ও গাছের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ
খরিফ মৌসুমে ক্ষেতে বিভিন্ন ধরনের আগাছা দেখা যায়। ফসলের বয়স ৩০ দিন হওয়া পর্যন্ত আগাছা মুক্ত রাখা দরকার। সে জন্য দুবার নিড়ানী দেয়া প্রয়োজন হয়। ত্রিদানাবাদামের গাছ ছোট বিধায়, আগাছা গাছকে ঢেকে ফেলতে পারে এবং গাছের বর্ধন বন্ধ করতে পারে। সারি থেকে অতিরিক্ত চারা উঠে ফেলতে হবে। তিলের সারিতে ৫/৭ সে. মি. পর পর একটা গাছ এবং চীনাবাদামের সারিতে ১০ সে.মি. পর পর একটা করে গাছ থাকা বাঞ্চনীয়।
সেচ প্রয়োগ ও পানি নিস্কাশন
আগাম খরিপ মৌসুমে কোন কোন বছর ভাল বৃষ্টিপাত হয়। সে বছর সেচের কোন প্রয়োজন হয় না। কিন্তু কোন কোন বছর বৃষ্টিপাত হয় না অথবা খুব কম হয় সে বছর সেচের প্রয়োজন হয়। মাঝে মাঝে গাছের বাড়ন্ত অবস্থায় অতিবৃষ্টি হয় সেজন্য পানি দ্রুত নিস্কাশনের জন্য নালার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
পোকামাকড় ও রোগ দমন
চীনাবাদাম ও তিলের ক্ষেতে বিছা পোকার প্রাদুর্ভাব হয়। এই পোকা গাছের সবুজ পাতা খেয়ে ঝাঝরা করে ফেলে এই পোকা দমনের জন্য প্রাথমিক অবস্থায় আক্রান্ত পাতা ছিঁড়ে বিছা পোকার ডিম ও অল্প বয়স্ক কীড়া দমন করা যায়। বয়ঃপ্রাপ্ত বিছা পোকা দমনের জন্য রিপকর্ড ১০ ইসি বা নগস ১০০ ইসি এদের যে কোন একটি ১ মি.লিঃ হিসাবে প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ব্যবহার করা যেতে পারে। চীনাবাদামের পাতায় দাগ পড়া রোগ এবং পাতায় মরিচা রোগ প্রধান সমস্যা। পাতায় দাগ পড়া রোগের জন্য প্রতি লিটার পানিতে দুই গ্রাম ব্যাভিষ্টিন ঔষধ মিশিয়ে ছিটাতে হবে। মরিচা রোগ দমনের জন্য ক্যালিক্সিন বা টিল্ট ২৫০ ইসি প্রতি লিটার পানিতে ১ মি.লি. মিশিয়ে ১০-১২ দিন পর পর ২-৩ বার প্রয়োগ করতে হবে।
তিলের গোড়া পঁচা রোগ
তিল ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করতে পারে। এ রোগ দেখা দিলে গাছে ছোট, লম্বা, আঁকাবাঁকা, গভীর, খয়েরী এবং কালো দাগ দেখা দেয়। আক্রমণ বেশী হলে পাতা ঝরে এবং গাছ মরে যায়। তিলের জমি থেকে অতিরিক্ত পানি নিস্কাশনের ব্যবস্থা করতে পারলে এ রোগের প্রদূর্ভাব কম হয়। এই রোগ বীজ বাহিত ছত্রাক দ্বারা সৃষ্টি হয় বলে বেভিষ্টিন, ক্যাপটান, হোমাই বা ভিটাভেক্স ২০০ ছত্রাকনাশক দ্বারা প্রতি কেজি শুকনা বীজ ২-৩ গ্রাম ঔষধ মিশিয়ে বীজ শোধন করে বীজ বাহিত ছত্রাক প্রাথমিক পর্যায়েই দমন করা যায়।
ফসল সংগ্রহ
তিল ফসল ৮৫-৯০ দিন বয়স হলে কর্তন করা যায়। তিলের বীজ পরিপক্ক হলে পাতা, কান্ড ও শুটির রং হলুদ হয়ে যায়। নীচের দিকের শুটি পাকতে শুরু করলেই ফসল সংগ্রহ করা উচিত। বেশী দেরী করলে শুটি ফেটে বীজ পড়ে যেতে পারে এবং ফলন কমে যাবে। কাজেই একটু কাঁচাকাঁচা থাকতেই ফসল কেটে মাড়াই স্থানে নিয়ে স্তুপ করে ২-৩ দিন রাখতে হবে। এর পর কয়েকদিন রোদে শুকিয়ে গরু দিয়ে মাড়াই করে অথবা লাঠি দিয়ে পিটিয় বীজ আলাদা করা যায়। বীজ রোদে দিয়ে ভাল ভাবে শুকিয়ে সংগ্রহ করতে হয়। ত্রিদানা জাতের চীনাবাদাম পরিপক্ক হতে ১১০-১২০ দিন সময় লাগে। সময়মত ফসল কর্তন করতে না পারলে এ জাতের চীনাবাদাম মাঠেই পরিপক্ক বীজ অংকুরোধগম হয়ে যায় এবং ফলন কমে যায়। কাজেই ৭০-৮০ ভাগ বাদাম পরিপক্ক হলেই ফসল তুলতে হয়। ফসল তোলার পর বাদাম বীজ ভালভাবে রোদে শুকিয়ে আদ্রতা ৮-১০% নিয়ে আসার পর বীজ সংরক্ষণ করতে হয়।
ফলন
আন্তঃফসল হিসাবে চাষ করলে প্রতি হেক্টর জমিতে ৫০০ কেজি তিল এবং ১২০০ কেজি চীনাবাদাম পাওয়া যায়। একক ফসল হিসাবে চাষের চেয়ে ইহা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক।
























