মোমিন-উদ-দৌলা, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ইয়ন গ্রুপ
বাংলাদেশ খাদ্যে অনেকাংশেই সয়ংসম্পূর্ণ। অথচ এদেশের ডেইরি সেক্টর অনুন্নত হওয়ার কারণে ডেইরি পণ্য আমদানিতে প্রচুর পরিমানে বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয়। সুতরাং ডেইরি সেক্টরকে উন্নতকরণ দরকার। এতে একদিকে যেমন মেধাবী জাতি গঠনে সহায়ক হবে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় রোধ করা সম্ভব হবে। যা হবে দেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতার এক চমৎকার উদাহরণ।
ইয়ন হাই-টেক ডেইরি ফার্মের কনসেপ্ট হতে পারে এদেশের ডেইরি ইন্ডাস্ট্রির জন্য একটি রোল মডেল। উন্নত জাতের গাভী এবং হাই-টেক ডেইরি ফার্মিং ছাড়া এদেশের ডেইরি সেক্টরকে উন্নত করা সম্ভব নয়। দীর্ঘ সময়ের প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ অস্ট্রেলিয়া থেকে দুইশ পঁচিশটি হলিস্টিন ফ্রিজিয়ান গাভী কার্গো বিমানে করে নিয়ে আসে ।
এই রংপুরের বদরগঞ্জে অবস্থিত ইয়ন হাই টেক ডেইরি ফার্মে সেই ২২৫টি হিপার ও প্রেগনেন্ট বকনা ঘুরছে ফিরছে বসবাস করছে, একের পর এক বাচ্চা উৎপাদন হচ্ছে। মা বাচ্চাসহ ৪৬৩টি গরু সবাইকে বাংলাদেশের আবহাওয়ার সাথে মিশে যাওয়ার চেষ্টা করানো হচ্ছে।
বিশ্বের সর্বোচ্চ প্রযুক্তি দিয়ে এই ফার্মের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে, যা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিস্ময়কর হলেও সত্য!! বর্তমানে ফার্মটিতে স্থাপনা আছে প্রায় ৪২ একর জমির উপরে যা নিজস্ব সম্পত্তি। এছাড়া আরো প্রায় ২০০ একর জমিতে কনটাক্ট ফার্মিং করে উন্নতজাতের ঘাস আর ভুট্টা চাষ করা হচ্ছে। আর এই চাষ করা ভুট্টা থেকে তৈরী করা হচ্ছে সাইলেজ যা গরুর জন্য উৎকৃষ্ট খাবার।
সুইডেনের ডি-লেভেল কোম্পানীর নক্শা অনুযায়ী গরুর শেডগুলো নির্মান করা হয়। সেই সাথে খামার ব্যবস্থাপনার জন্য নেদারল্যান্ড থেকে একজন ডেইরি খামার বিশেষজ্ঞকে ১ বছরের জন্য আবাসিক চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়।
এই যে গাভীর গলার বেল্টের সাথে ইলেক্ট্রনিক ডিভাইচ ঝুলতে দেখা যাচ্ছে। হ্যা প্রতিটি গাভীর গায়ে বসানো হয়েছে তিনটি IOT Sensor বা ডিভাইস, যা সম্পূর্ণভাবে ডেল-প্রো সফটওয়্যার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এর মাধ্যমে প্রতিটি গরুর কার্যক্রম যেমন-খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক অবস্থা, দুধ দোহন অবস্থা, ঔষুধের সঠিক ব্যবহার, প্রজনন স্বাস্থ্য নিখুঁতভাবে মনিটরিং এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
ইয়ন হাইটেক ডেইরি ফার্মের গাভীকে সারা বছর সংরক্ষিত কাঁচা ঘাস খাওয়ানোর ভুট্টার সাইলেজ উৎপাদিত হচ্ছে। পাশাপাশি ইয়ন গ্রুপের ইয়ন ফিড মিলে উৎপাদিত হচ্ছে দানাদার খাদ্য। সকল খাদ্য উপাদান সুইডেন থেকে আমদানিকৃত“টি এম আর ওয়াগনের” মাধ্যমে মিশ্রিত করে “টি এম আর” প্রস্তুত করে গবাদিপশুকে সাথে সাথে খাওয়ানো হচ্ছে, যাতে গরুর খাবারে কোনভাবেই ফাঙ্গাস না পড়ে, ফলে আফলাটক্সিন হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই থাকে না। গাভীর রোগ প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় টীকা সংগ্রহ এবং জৈব নিরাপত্তার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি স্ক্রাপারের মাধ্যমে বর্জ্য অপসারণ করা হচ্ছে।
নিরাপদ ও স্বাস্থসম্মত ভাবে দুধ দোহনের লক্ষ্যে অত্যাধুনিক মিল্কিং পার্লার স্থাপন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে কিছু গাভীকে প্রতিদিন দুইবার আর কিছু গাভীকে ৩বার হাতের স্পর্শ ছাড়াই দুধ দোহন করা হয়।
ইউটিউব লিঙ্কঃ গাভীর চলাফেরা, হিটে আসা, প্রেগনেন্সি, অসুস্থ্যতা, দুধের পরিমান | কম্পিউটার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত
আপনারা ভিডিওতে দেখতে পাচ্ছেন দুধ দোহনের সময় হলে গাভীগুলো একে একে চলে যায় মিল্কিং পার্লারের দিকে অটোসাওয়ার টানেলের মধ্য দিয়ে গোসল করে যাওয়ার পর আবার গাভীর ওলানে পানি স্প্রে করে পরিষ্কার করা হচ্ছে এরপর ব্রিজফ্যানের বাতাসে গাভীর গাঁ শুকানোর পর লাইন দিয়ে ১৬ টি গাভী পার্লারে নির্দিষ্ট জায়গায় এসে দাড়ায় এরপর ওলান জীবাণুমুক্ত করার পর ওলানে মিল্কিং মেশিন সেট করে দুধ দোহানো হয়, এই দুধ স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিল্কিং পার্লারের মাধ্যমে ‘বাল্ক মিল্ক কুলার’ ট্যাংকিতে জমা হয়। মিল্কিং এর এই পুরো প্রক্রিয়াটিই কম্পিউটারে সফটওয়্যার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বাল্ক মিল্ক কুলার’ সেকশনে সয়ংক্রিয়ভাবে দুধ ঠান্ডা হয়ে পরবর্তীতে র’মিল্ক স্টোরেজ ট্যাংকিতে যায়। এখানে স্যাম্পেলিং করার পর কোয়ালিটি কন্ট্রোল প্যারামিটার অনুযায়ী পরীক্ষা করানোর মাধ্যমে দুধের গুনাগুন এবং এন্টিবায়োটিক রেসিডিউ ফ্রি নিশ্চিত হওয়ার পর মিল্ক পাস্তুরাইজেশন সেক্শনে যায়। এখানে প্রি-হিট হয় এবং হোমোজিনাইজেশন করে ফ্যাট সমসত্ত্ব মিশ্রণ করার পর পাস্তুরাইজ করা হয়। এরপর পুনরায় কোয়ালিটি টেস্টিং এর মাধ্যমে সম্পূর্ণভাবে কোয়ালিটি নিশ্চিত হয়ে প্যাকিং সেকশনে পাঠানো হয় যেখানে, অটোমেটেড ফিলিং এর মাধ্যমে মিল্ক ফিলিং করে সেখান থেকে চার ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় কোল্ড স্টোরেজে রাখা হয়। এই পুরো প্রক্রিয়াতে সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করতে হাতের কোন স্পর্শ ছাড়াই অটোমেটেড মেশিন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় এবং সারাদেশে বিপণন করা হয়ে থাকে। ইয়নের দুধ বাকার মিল্ক নামে পরিচিত। এই দুধ থেকে প্রসেস করে বেশ কিছু পন্য যেমন বাকারা ঘি, বাকারা পনির, বাকারা দধি, বাকারা লাবাং ইত্যাদি পন্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরন করা হচ্ছে।
এই ইয়ন হাইটেক ডেইরি খামারের গরুগুলো দেশের সবচেয়ে অধিক দুধ উৎপাদনশীল হওয়ায় যে বকনা বাছুরগুলো জন্ম নিচ্ছে সেগুলো এখানে গাভী হিসেবে থাকবে। আর যে সব ষাড় বাছুরগুলো জন্ম নিচ্ছে, সে সব ষাড় বাছুরগুলোকে ভবিষ্যতে প্রজনন ষাড় হিসেবে তৈরী করছে। প্রাথমিকভাবে সরকারী অনুমতি নিয়ে তারা সিমেন কালেকশন সেন্টারের কাজ শুরু করেছে। সিমেন উৎপাদন ও বিপণনের সরকারী অনুমতি পেয়ে গেলেই ইয়ন হাইটেক ডেইরি ফার্মের অধিক দুধ উৎপাদনক্ষম ষাড় থেকে সিমেন সংগ্রহ করে দেশের ডেইরি খামারীদের মাঝে ছড়িয়ে দিয়ে দেশের ডেইরি শিল্পের উন্নয়নে ভুমিকা রাখবে এই ইয়ন হাইটেক ডেইরি ফার্ম।


































