খামারী মোফাজ্জল হোসেন বেদন
নিজের ভাগ্যের নিজেই নিয়ামক
ড. বায়েজিদ মোড়ল
এক জনের সাফল্য অন্যককে কর্মদ্দিপনা সৃষ্টিকরে, মনের মাঝে স্বপ্নের জাল বুনতে বেগবান করে। মানুষ দুভাবে স্বপ্ন দেখে কেউ ঘুমের মাছে স্বপ্ন দেখে যার বাস্তবায়ন হয়না। দুঃশ্চিন্তা হয় আর কেউ নিরিবিলি বসে জীবন সাজানোর জন্য পরিকল্পনা করে স্বপ্নের প্যাটান তৈরী করে। যারা স্বপ্নের বাস্তবায়ন করে তারা আজ আমাদের মাঝে স্মরনীয বরনীয়। জীবন ঘেষা স্বপ্ন যারা দেখেন! যারা নিজেদের ভাগ্যের নিজেই নিয়ামক হোন তাদের মতো একজন কৃষক বেদন। সিলেট জেলার ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার ফরিদপুর উত্তরগাও এর মোঃ মোফাজ্জল হোসেন বেদন। এক কৃষক পরিবারে তার জন্ম। পিতা এখলাচুর রহমান, মাতার মহিবুননেসা চৌধুরী। তাদের ৫ কন্যা ও ২ ছেলের মধ্যে বেদন ছোট ছেলে এবং সবার মধ্যে তার অবস্থান ছিল ৩য় নম্বরে। কিছু দুর লেখাপড়া শেখার পর পিতার সাথে ক্ষেতে খামারে কাজ করতে থাকেন। এর মধ্যে বড় বোনের বিবাহ হয় ছোট আরেকটি বোনের বিবাহ হয়, তার বড়ভাইয়ের বিবাহ হয়। সংসারে মানুষের
সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে ব্যয় বাড়তে থাকে। বেদন হাল চাষের গরুগুলো মাঝে মাঝে চরাতে নিয়ে যেতেন। তাদের একটি দেশী জাতের গাভী ছিল। সেই গাভীর দুধ পরিবারের সবাই মিলে খেতেন।
বেদন সারাক্ষন ভাবতেন তিনি কি করবেন! কি করে তিনি সাবলম্ভি হবেন! কিভাবে তার জীবন চলবে! কিভাবে পরিবারে সচ্চলতা আসবে! ভাবতে ভাবতে বিহব্বল হয়ে তিনি পাড়ি জমান সৌদি আরবে। সৌদি আরবে গিয়ে তিনি প্রথমে পারফিউম ও কসমেটিক্সএর দোকানে কাজ নেন। পাঁচ বছর কাজ করার পর দেশে আসেন। বাড়ীর সবার সম্মতিতে দিলরুবা নাসরিনের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হোন। এরপর নতুন বউ দিলরুবাকে সাথে নিয়ে আবার চলে যান সৌদি আরবে। এবার আর পারফিউম ও কসমেটিক্সএর দোকানে চাকরি নয় সরাসরী ব্যবসা শুরু করেন। আরো ৭ বছর প্রবাসে কাটালেন এই বেদন-দিলরুবা দম্পতি। দেশে ফিরে এলেন এবং একেবারে দেশে থেকে গেলেন। সৌদি আরবে মাসে যা আয় হতো তার চেয়ে অনেক বেশি আয় তার প্রতি মাসে এখন হচ্ছে।
তখন ২০০০ সাল। ২০০১ সালে নিজ বাড়ির আঙিনায় ১টি গরু দিয়ে খামার চালু করার চেষ্টা চারিয়ে ব্যর্থ হোন।
তবে এখানে কথা আছে প্রথমে তার অবস্থা ভাল ছিল না বিদেশ থেকে ফিরে গ্রামের বাড়ীতে না উঠে সিলেট শহরের আম্বরখানা হাউজিং এষ্টেটে বাড়ী করেন। কিন্তু শহরে তিনি কি করবেন? ফিরে যান গ্রামের বাড়ী ফেঞ্চুগঞ্জের ফরিদপুর উত্তগাঁওয়ে।ইতোমধ্যে তাদের পরিবারের নতুন মুখ হিসেবে আগমন ঘটে একমাত্র কন্যা রোশনী শারমিনের। তখন গ্রামে পিতার বাড়ীতেই প্রথমে একটি দেশি জাতের গাভী পালন শুরু করেন পরিবারের দুধের চাহিদা মিটাতে। এবং ভাবতে ছিলেন একটি দেশি জাতের গাভী যা খায় একটি বিদেশী জাতের গাভী তার চেয়ে অল্প কিছু খাবার বেশি খায় কিন্তু দুধ দিবে অনেক। আর এক গরুর এক রাখাল ১০ গরুরওতো এক রাখাল। তারপর তিনি ভাবলেন উন্নত জাতের গাভী পালন করে সাবলম্ভি হওয়া যায়।
তিনি ভাবলেন ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে উঁচু ও সমতল ভুমি থাকায় ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার সবকটি ইউনিয়নে রয়েছে পশু পালন উপযোগি পরিবেশ। বন্যার প্রাদুর্ভাব কম। তাই এখানে অনেকে সারা বছর গবাদি পশু পালন করে লাভবান হতে পারেন।
সৌদি প্রবাসী এই বেদন নতুন ভাবে শুরু করেন জীবন গড়া সংগ্রাম। হতাশার সাগরে হাবুডুবু খেতে খেতে ২০০৬ সালে আবারও চারটি সেই সিরাজগঞ্জের বাগাবাড়ি এলাকা থেকে গাভী কিনে নিয়ে তিনি পুনরায় গরুর খামারের ব্যবসা শুরু করেন। আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি বেদনের। বছর গেছে গাভী বৃদ্ধি পেয়েছে। গাভী গর্ভবতি হয় বাচ্চা দেয় সেই বাচ্চা বড় হয়। সেই বাচ্চা আবার গাভীতে পরিনত হয়, বাচ্চা দেয়। এভাবেই বেদনের সমস্থা হতাশা আর বেদনা দুর করে বিশাল খামার হয়ে দাড়ায় বেদনের গ্রামের এই বাড়ীতে। সেড তোলা ও নতুন আরো ১০ গাভী ক্রয়ের জন্য কৃষি ব্যাঙ্ক থেকে ১৪ লাখ টাকা লোন তোলেন। সারি সারি বড় বড় দুটি সেড গাভী আর বাছুরে এক কলতান।
বর্তমানে তার খামারে অষ্টেলিয়ান ও ফিজিয়ান জাতের গাভী ও বাছুর মিলে রয়েছে ১০৫টি গরু। এসব গাভী থেকে প্রতিদিন প্রায় ২০০ লিটার করে দুধ পান তিনি। খামারে সার্বক্ষনিক দেখাশুনার জন্য কর্মচারি আছে ৬ জন। বেদন থাকেন শহরে খুব সকালে তিনি চলে যান খামারে। সারাদিন খামারে থাকেন। গাভী দেখাশুনা করেন। কোন গাভী পায়খানা প্রসব করলে সাথে সাথে নিজেই পরিষ্কার করেন। বেদনকে পরিষ্কার করতে দেখলে কর্মচারিরা আর কাজে ফাকি দিতে পারে না। খাবারের প্রতি নেন পচন্ড যতœ । কোন গরুটা কি খাচ্ছে কম খাচ্ছে না বেশি খাচ্ছে। কোন গাভী বা বাছুর অপুষ্টিতে ভুগছে কিনা। তার পর প্রাণিডাক্তার এলাকায় পাওয়া যায়না। উপজেলা সদরে যেতে হয়। তাদের খামারে এনে নিজে কিছু ট্রেনিংও নিয়েছে। কোন লক্ষণ দেখা দিলে গাভীকে কি খাওয়াতে হবে বা কি ভ্যাকসিন দিতে হবে এটা ভালো করে আয়াত্ব করে নিয়েছে বেদন। বেদনের কাছে খামারের প্রতিটি গাভি ও বাছুর নিজের সন্তানের চেয়েও বেশি। প্রতিটা গরুর জীবন বৃত্তান্ত তিনি লিখে রাখেন। জন্ম থেকে মৃত্য পর্যন্ত। দিলে এই দুধ ফেঞ্চুগঞ্জ বাজার ও সিলেট শহরে বিক্রি করে খামারের সমস্ত খরচ কর্মচারির বেতন দেওয়ার পরও তার মাসিক আয় থাকে লাখ টাকার মতো। সিলেট ও ফেঞ্চুগঞ্জে যে দুধের চাহিদা রয়েছে তার একটি অংশ পুরণ করছে মোফাজ্জল হোসেন বেদনের মতো এই কৃষক। উন্নত জাতের ঘাস ও প্রাকৃতিক ঘাসের ওপর দুগ্ধ উৎপাদন, গাভী প্রজণন ও বাচ্চা প্রসব নির্ভরশীল। এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত এলাকায় প্রচুর ঘাস পাওয়া যায়।এ সময় দুধের উৎপাদন বেড়ে যায়।
সিলেট শহরের টিলাগড়ে ঘাস বিক্রি হয়। এক সময় টিলাগড় থেকে প্রতিদিন ১ ট্রাক ঘাস কিনে আনতে তার ২ হাজার টাকার উপরে খরচ হতো। নিজের খামারের গাভীর খাদ্যের কথা চিন্তা করে পৈত্রিক ও নিজের কিনা ৮ বিঘা খামার এলাকার পার্শ্বের জমিতে বিদেশি জাতের ঘাস চাষ শুরু করেন। এসব জমিতে বর্তমানে উন্নত জাতের পর্যপ্ত পরিমান ঘাস উৎপন্ন হচ্ছে। তিনি এলাকার বেকার যুবকদের গরু ছাগল পালনের সুফলসহ নানা পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
মাঝে তিনি পোল্ট্রি মুরগীর খামার করতে গিয়ে একটি মোটা অঙ্কের টাকা নষ্ট করে পেলেন। গাভী পালন লাভজনক ব্যবসা খামারে বিনিয়োগ ও লাভজনক। গাভী পালন করে যে কেউ দারিদ্র অবস্থা থেকে সহজেই হতে পারেন স্বচ্ছল। বেকাত্ব থেকে মুক্তি পেতে পারেন। এতে তাদের বেকারত্ব ঘুচবে। তাছাড়া বর্তমানে এসব কর্মসুচিতে বাণিজ্যিক ব্যাঙ্ক সহজ শর্তে ঋণ দিয়ে থাকে।তাই সামান্য পুজি নিয়ে যে কেউ গাভী পালন করতে পারেন।এতে মিটবে তার বেকারত্ব ঘুচবে পুষ্ঠি চাহিদা।বন্ধ হবে দুধ আমদানিতে ব্যপক বৈদেশিক মুদ্রা খরচ।
গাভী পালনকারী মোফাজ্জল হোসেন বেদন জানান দুধ বিক্রি ছাড়াও ২০১১ সালে এক সাথে তিনি ৩০টি গাভী বিক্রি ৪০লাখ টাকা আয় করেছেন। উন্নত জাতের গাভী পালন করে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা কৃষি ও প্রাণিসম্পদ মেলা ২০১১ পুর®কৃত হয়েছেন।
























