বাংলাদেশে ধান বা চাল উৎপাদন দেশটির জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং এটি দেশের কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থানসহ সামগ্রিক সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। প্রধান ফসল ও প্রধান খাদ্য হিসাবে ধান দেশিজ কৃষি উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং পুষ্টি চাহিদা পূরণের একটি প্রধান উৎস। এছাড়া এটি বাংলাদেশের জাতীয় আয়ের একটি বড় ক্ষেত্রও বটে। ২০২৩ সালে প্রায় ৩৯.১ মিলিয়ন টন চাল উৎপাদন করার মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী তৃতীয় বৃহত্তম চাল উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ২০২৫ সালে এটি এক ধাপ নিচে নেমে চতুর্থ স্থানে চলে আসে। [১]

বাংলাদেশে মৌসুম অনুযায়ী প্রধানত তিন ধরণের ধান চাষ করা হয়: আমন, আউশ এবং বোরো। বোরো ধান সাধারণত অধিক উৎপন্নশীল হয় এবং তা তুলনামূলক অধিক হারে সেচ ও রাসায়নিক সারের উপর নির্ভর হয়ে থাকে। আমন ও আউশ ধান পর্যায়ক্রমে চাষ করা হয় এবং আমন ধান সাধারণত বর্ষার বৃষ্টিতে উৎপন্ন হয়। উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর লক্ষ্যে উল্লেখযোগ্য সরকারি ও বেসরকারি প্রচেষ্টা চলমান সত্ত্বেও সীমিত যান্ত্রিকীকরণ, প্রযুক্তিগত অনুৎকর্ষতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশে ধান উৎপাদনের জন্য নানা প্রতিবন্ধকতা খাড়া করে, যার দরুণ প্রতিবেশী অন্যান্য দেশের এর উৎপাদনশীলতা তুলনামূলকভাবে কম দক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায়, বাংলাদেশ সরকার সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উচ্চ ফলনশীল বিভিন্ন ধানের জাতের উদ্ভাবন এবং উন্নয়নের দিকে মনোনিবেশ করেছে।
ইতিহাস

বাংলা অঞ্চলে গৃহপালিত ধান চাষ প্রায় ৪,০০০ বছর আগে শুরু হয়। সেই সময় কৃষকরা “কৃত্রিম নির্বাচন” প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানীয় ধানের জাত উৎপন্ন করেন, যা নির্দিষ্ট পরিবেশ ও জলবায়ুর সঙ্গে মানিয়ে নিতে সক্ষম ছিল। এই জাতগুলির অধিকাংশ ইন্ডিকা (Oryza sativa) শ্রেণির ছিল এবং সেগুলি পূর্ব ভারত ও বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে চাষ করা হতো। তবে কিছু পরিমাণ জাপোনিকা ধানও চাষ করা হতো; বিশেষত গভীর পানির অঞ্চলে। যদিও সবুজ বিপ্লবের (Green Revolution) আগে ঠিক কতটি ধানের জাত ছিল তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না; তবে এমন ধারণা করা হয় যে, ১৯৪০-এর দশকের দিকে বাংলায় প্রায় ১৫,০০০ প্রাকৃতিকভাবে নির্বাচিত ধানের জাত ছিল। [২]

১৯৬০-এর দশকের সবুজ বিপ্লব বাংলাদেশের কৃষিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে। এই সময় উচ্চ ফলনশীল জাত (HYV) ব্যবহারের কারণে দেশে ধান উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় এবং ১৯৭০-এর দশকে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) প্রতিষ্ঠিত হয়, যা উন্নত জাতের ধান উদ্ভাবনের পথ সুগম করে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট তার প্রথম উচ্চ ফলনশীল জাত বিআর১ (BR1) উন্মোচন করে, যা নতুন প্রযুক্তিনির্ভর ধান চাষের সূচনা করে। পরে বিআর ৩ (BR3) নামে আরেকটি উন্নত জাত উদ্ভাবিত হয়, যা দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং তা আউশ, আমন ও বোরো—এই তিন প্রধান মৌসুমে ব্যাপকভাবে চাষ করা হতে থাকে। এর ফলে এটি “বিআর-বিপ্লব” নামে পরিচিতি পায়। পরবর্তীতে কয়েক দশকে নতুন নতুন উচ্চ ফলনশীল জাতের প্রভাব বাড়তে থাকে, যার ফলে প্রায় ৭,০০০-এর বেশি প্রাচীন ধানের জাত অচাষযোগ্য হয়ে যায় এবং তাদের স্থান অন্য আধুনিক ধানের জাতগুলি দখল করে নেয়। ফলে বাংলাদেশের সামগ্রিক ধান উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৭০০-এর কিছু বেশি ধানের জাত সক্রিয়ভাবে চাষ করা হচ্ছে। [২][৩][৪]

১৯৮১ সালের অর্থবছর বাদ দিয়ে ১৯৮০-এর দশকে বাংলাদেশের চাল উৎপাদন একটি চলমান সাধারণ ক্রমবর্ধমান গতি প্রদর্শন করে। যাইহোক, বাৎসরিক উৎপাদন বৃদ্ধির হার তখন মাঝারি ছিল। কারণ দিন দিন দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছিল। ১৯৮৬ অর্থবছরে একটি মাইলফলক অর্জিত হয়, যখন চালের উৎপাদন প্রথমবারের মত ১৫ মিলিয়ন টন ছাড়িয়ে যায়। ১৯৮০ এর দশকের মাঝামাঝি সময় বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম চাল উৎপাদনকারী হওয়া সত্ত্বেও সেই সময়ে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মত অন্যান্য এশীয় দেশের তুলনায় বাংলাদেশের চাল উৎপাদনশীলতা খুবই কম ছিল। [৫]

২০শ শতকের শেষের দিকে, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট দেশের স্বতন্ত্র ধান চাষের মৌসুম–বিশেষ করে আমন ও বোরো– উপযোগী কিছু উন্নত জাত উদ্ভাবন করে। এর ফলে ধান বাংলাদেশের কৃষি খাতে আরও সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০১ সালের পর থেকে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট দেশের বিভিন্ন স্থানে বিস্তৃত পরীক্ষা পরিচালনা করে ধানের জিনগত উন্নতি সাধন এবং পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন করে আসছে। ২০২০ সালের মধ্যে ঐতিহ্যবাহী ও আধুনিক ধানের জাতের সমন্বয়ের মাধ্যমে ধান বাংলাদেশের কৃষি খাতে প্রধান ফসল হিসেবে জায়গা করে নেয়।
একই সময় ইনস্টিটিউটের গবেষকরা বাংলাদেশের প্রথম জিন-সম্পাদিত ধানের জাত উদ্ভাবনে প্রাথমিক সাফল্য অর্জন করেন। এসব ধানের নতুন জাত ধানের অন্যতম ভয়ংকর রোগ ব্লাস্ট, ক্ষতিকর পোকা বাদামী গাছফড়িং এবং উচ্চ লবণাক্ততার মতো প্রতিকূল পরিবেশগত প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলায় কার্যকর প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রদর্শন করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই জিন-সম্পাদিত ধান জাতের উন্নয়ন বাংলাদেশের ধান উৎপাদন ব্যবস্থাকে অধিক স্থিতিশীল এবং উচ্চ ফলনশীল করতে একটি গুরুত্বপূর্ণ জৈবপ্রযুক্তিগত অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ণ ও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষিক্ষেত্রে টেকসই উন্নয়নের জন্য ধানের নতুন জাত উদ্ভাবন ও উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। [৩][৬]
রপ্তানি
২০০৯–১০ অর্থবছরে, বাংলাদেশ সুগন্ধি চাল রপ্তানি শুরু করে, যার পরিমাণ ছিল ৬৬৩ টন। এর পরবর্তী বছরগুলিতে রপ্তানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়; ২০১৯–২০ অর্থবছরে যা মোট ১০,৮৭৯ টনে পৌঁছায়। [৭]

উদ্বৃত্ত হয়ে যাওয়ার কারণে সাধারণ চাল ( সুগন্ধি নয় এমন) রপ্তানি শুরু করার জন্য ২০১২ সালে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। কিন্তু চাল রপ্তানির জন্য অনুপযুক্ত বলে বিবেচিত হওয়ায় তা ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে ২০১৪ সালে, ব্যাপক উৎপাদন এবং পর্যাপ্ত সরকারি মজুদের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার থেকে সরকার চুক্তির অধীনে প্রথমবারের মতো শ্রীলঙ্কায় ৫০,০০০ টন সুগন্ধিহীন মোটা চাল রপ্তানি শুরু করে, যার মূল্য টন প্রতি ৪৫০ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে সেই বছর ও আগেকার বছরে উল্লেখযোগ্য চাল আমদানি করার কারণে চাল রপ্তানির ক্ষেত্রে আর কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। [৮][৯]
২০২২ সালে বাংলাদেশ দেশের খাদ্য পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কারণে বিভিন্ন জাতের সুগন্ধি চালসহ সকল প্রকারের চাল রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে। [৭]
তাৎপর্য
চাল বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান উৎস এবং তা দেশের প্রধান ফসল ও জনসংখ্যার একক প্রধান খাদ্য হিসেবে কাজ করে। এটি বাংলাদেশের মোট খাদ্যশস্য উৎপাদনের প্রায় ৯৭ শতাংশ গঠন করে এবং দেশের পুষ্টি সরবরাহের ক্ষেত্রে চাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যা মোট ক্যালোরির প্রায় ৬০ শতাংশের উৎস এবং প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ৫০ শতাংশ প্রোটিন সরবরাহ করে। [১০][১১]

শস্যটির তাৎপর্য দেশিজ পুষ্টির সরবরাহ ছাড়াও অন্য একাধিক বিষয়ের সাথে জড়িত। কারণ দেশের প্রায় ৪৮ শতাংশ গ্রামীণ শ্রমিক ধান উৎপাদনে জড়িত, যা দেশের সামগ্রিক মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রায় ১৬ শতাংশ গঠন করে এবং কৃষিজ জিডিপিতে প্রায় ৭০ শতাংশ অবদান রাখে। উৎপাদনের পরিমাণ, কর্মসংস্থান, বাণিজ্য, প্রক্রিয়াকরণ, খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির মত বিষয় বিবেচনা করে সামষ্টিক অর্থনীতি ও ব্যষ্টিক অর্থনীতি উভয় স্তরেই এর তাৎপর্য অপরিসীম। উপরন্তু, ভোক্তা মূল্য সূচকে (CPI) এর উল্লেখযোগ্য ওজন মূল্য, মুদ্রাস্ফীতি ও দারিদ্রের উপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। [১০][১১]
ধানচাষ দেশের চাষযোগ্য মোট ফসলি জমির প্রায় ৭৬ শতাংশ জুড়ে বিস্তৃত, যার পরিমাণ প্রায় ১,০৫,০০,০০০ হেক্টর (১,০৫,০০০ বর্গকিলোমিটার) জমি এবং এতে ১৩ মিলিয়নের অধিক আবাদি জমি অন্তর্ভুক্ত। এই পরিসংখ্যান বাংলাদেশের অর্থনীতি, কৃষি এবং খাদ্য নিরাপত্তায় ধানের কেন্দ্রীয় ভূমিকাকে চিত্রিত করে। [১২][১৩]
২০২৩-২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ চীন ও ভারতের পরে বিশ্বব্যাপী তৃতীয় বৃহত্তম ধান উৎপাদক দেশ হিসাবে স্থান পায়। [১৪] বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মতে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশে চাল উৎপাদন প্রায় ৩৯.১ মিলিয়ন টনে পৌঁছেছে [১৫] এবং চাল আমদানি করা হয়েছে প্রায় ১.০৫ মিলিয়ন টন, যা ২০২১ সালে আমদানিকৃত ২.৬৫ মিলিয়ন টন থেকে উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। [১৪][১৬]
২০২৫ সালে বাংলাদেশ চীন, ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার পরে চতুর্থ বৃহত্তম ধান উৎপাদক দেশ ছিল। [১]
ফসল কাটার ঋতু
বাংলাদেশে আমন ও আউশ নামে দুটি বর্ষা মৌসুমের ধান এবং বোরো নামে একটি শুকনো মৌসুমের ফসল রয়েছে। [১১]
আমন
আমন হলো বোরো ধানের পরে বাংলাদেশে চাষ করা দ্বিতীয় বৃহত্তম খাদ্যশস্য। এটি সাধারণত জুলাই এবং আগস্টের মধ্যে রোপণ করা হয় এবং নভেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে কাটা হয়। আমন ধান সম্পূর্ণভাবে বৃষ্টিপাতের উপর নির্ভর করে এবং এই ধান দেশের সব ফসলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি একর জমি জুড়ে চাষ করা হয়। [১৭]

আমন ধান প্রধানত দুই ভাবে চাষ করা হয়। সম্প্রচার পদ্ধতি ব্যবহার করে কিছু আমন ধান বসন্তে বপন করা হয়, যা বোনা আমন নামে পরিচিত। এটি গ্রীষ্মের বৃষ্টির সময় পরিপক্ক হয় এবং শরৎকালে ফসল কাটা হয়। আরেকটি অধিক উৎপাদনশীল পদ্ধতিতে রোপন করা হয়, যা রোপা আমন নামে পরিচিত। এটি বিশেষ বেডে বীজ বপন করা এবং গ্রীষ্ম বর্ষা মৌসুমে সেগুলি জমিতে রোপণ করা। [৫][১৮] সম্প্রচারিত আমন ধান প্রধানত দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে জন্মে।
আউশ
দ্বিতীয় ফসল আউশ ধান নামে পরিচিত, যা সাধারণত ধানের ঐতিহ্যগত জাত এবং বর্ষার মৌসুমে চাষ করা হয়। এটি ক্রমবর্ধমানভাবে উচ্চ-ফলনশীল এবং বামন জাতের অন্তর্ভুক্ত। আউশ ফসলের জন্য চারা মার্চ বা এপ্রিল মাসে বপন করা হয় এবং এটি এপ্রিল ও মে মাসের বৃষ্টি থেকে উপকৃত হয়। গ্রীষ্মের বৃষ্টিপাতের সময় পরিপক্ক হয় এবং গ্রীষ্ম মৌসুমেই কাটা হয়। [১৯]
বোরো
দেশে সেচ ব্যবস্থার ব্যাপক সম্প্রসারণের ফলে শুষ্ক মৌসুমেও ধান চাষের গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বিশেষ মৌসুমটি বোরো মৌসুম নামে পরিচিত। বোরো ধানের চারা সাধারণত নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি থেকে শুরু ফেব্রুয়ারির মধ্যে রোপণ করা হয় এবং এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে ফসল কাটা হয়।

বোরো ধান প্রধানত তিন ধরনের হয়: স্থানীয় বোরো, উচ্চফলনশীল জাতের (HYV) বোরো এবং হাইব্রিড বোরো। বর্তমানে, বোরো ধানই দেশের প্রধান ধান উৎপাদন মৌসুম হিসেবে পরিগণিত হয়।
উচ্চফলনশীল জাতের (HYV) বোরো ধান উৎপাদনে সেচ, সার এবং অন্যান্য ব্যয়বহুল উপকরণের ব্যাপক ব্যবহার প্রয়োজন হয়, যা এটিকে তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল করে তোলে। তবে সবুজ বিপ্লবের পর থেকে উচ্চ ফলনশীলতার কারণে এই জাতের বোরো ধান ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। অর্থনৈতিক এবং খাদ্য নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে বোরো ধান এখন দেশের চাল উৎপাদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে গণ্য হয়। [৫][২০]
প্রতিবন্ধকতা ও অসুবিধা
কীটপতঙ্গ
বিভিন্ন কীটপতঙ্গের কারণে বাংলাদেশে বার্ষিক ধানের গড় উৎপাদনের ৪ থেকে ১৪ শতাংশ উল্লেখযোগ্য ক্ষতির সম্মুখীন হয়। দুটি বিশিষ্ট রোগ ধানের ফসলের জন্য মারাত্মক হুমকি হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে: একটি হল ব্যাকটেরিয়াল লিফ ব্লাইট (বিএলবি); অপরটি হল নেমাটোড ডিটিলেঞ্চাস অ্যাঙ্গুস্টাস দ্বারা সৃষ্ট উফরা রোগ। এসব রোগ তীব্র আকার ধারণ করা সত্ত্বেও এটি সৃষ্টিকারী পোকামাকড় ও রোগ প্রতিরোধীকারী দেশি প্রযুক্তির উল্লেখযোগ্য সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা ধানের উৎপাদনকে আবহাওয়া এবং কীটপতঙ্গের প্রাদুর্ভাবের ক্ষেত্রে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। [২১]
বাজার কারসাজি

২০২১ সালে, দেশে প্রচুর ধান উৎপাদন ও আমদানি বৃদ্ধি সত্ত্বেও বাংলাদেশে চালের দাম ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়। এর কারণ ছিল, চাল বাজারের কতিপয় অসাধু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী চাল মজুদ করে কৃত্রিমভাবে চালের দাম বৃদ্ধি করে। এমন পরিস্থিতি বিশেষ করে কৃষক ও শ্রমিক শ্রেণীকে ব্যাপক প্রভাবিত করেছিল। প্রতিক্রিয়াস্বরূপ, সরকার ২০২০-২১ অর্থবছরে চালের দাম স্থিতিশীল করার জন্য হ্রাসকৃত শুল্কের মাধ্যমে ১.৩৫ মিলিয়ন টন চাল আমদানি করে। দুর্ভাগ্যবশত, চলমান বাজারে বিশৃঙ্খলার কারণে এই কৌশলটি এখনও কার্যকরভাবে চালের খুচরা দাম কমাতে সক্ষম হয়নি। [২২]
দুর্বল সরবরাহ পরিকল্পনা
বাংলাদেশেপর্যাপ্ত উদ্বৃত্ত চাল থাকার পরেও সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানি অব্যাহত রয়েছে। অথচ চালের মোট ব্যবহারের হিসাবে গবাদিপশুর খাদ্য, বীজ, কাটাই-মাড়াইয়ে ক্ষতি, গুদামে নষ্ট হওয়া এবং ফসল কাটার আগে-পরে অপচয়সহ সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত থাকে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে, দেশে এই পরিস্থিতির মূল কারণ হল নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাব। তারা সরকারি সংস্থাগুলোর পরিসংখ্যানের অসঙ্গতি নিয়েও সমালোচনা করেছেন। এর ফলে প্রকৃত চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে একটি বিভ্রান্তিকর ব্যবধান তৈরি হয়েছে, যা সরবরাহ শৃঙ্খলে জড়িত কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাচ্ছে এবং চালের স্বাভাবিক বাজারদর অনিয়ন্ত্রিত থেকে যাচ্ছে। [১৬]
পরিবেশগত সমস্যা

গবেষণায় দেখা গেছে যে, ২০১৮ সালে ধান চাষ থেকে মিথেন (CH₄) নির্গমনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ শীর্ষ ২০টি ধান উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে ৭ম স্থানে ছিল। [১০] এছাড়া ধান চাষ থেকে মোট গ্রিনহাউস গ্যাস (GHG) নির্গমনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ৬ষ্ঠ স্থানে ছিল, যেখানে মোট গ্রিনহাউজ গ্রাস নির্গমন প্রতি হেক্টরে ৯৯০৩.০৩ কেজি ছিল, যা CO₂ সমতুল্য। উল্লখ এ ক্রমে শুধুমাত্র মিথেনই (CH₄) নয়; বরং সারের ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট নাইট্রাস অক্সাইড (N₂O) এবং বিভিন্ন কৃষি কার্যক্রম থেকে নির্গত কার্বন ডাই অক্সাইডসহ (CO₂) অন্যান্য গ্যাসকেও অন্তর্ভুক্ত করে। [১০]
বিলম্বিত বর্ষার শুরু এবং কোন বছরে আউশ মৌসুমে প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ ফলনের ক্ষতি আরও বাড়িয়ে দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, ধান চাষ থেকে কৃষকদের মুনাফা ক্রমশ কমে এসেছে। যার প্রধান কারণ হলো বীজ, সার, আগাছানাশক ও কীটনাশকের মতো কৃষি উপকরণের ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়া। এছাড়াও উচ্চ শ্রম খরচ এবং দেরিতে বৃষ্টিপাতের কারণে অতিরিক্ত সেচের প্রয়োজনীয়তা কৃষকদের জন্য আরও চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। [২৩]
সীমিত যান্ত্রিকীকরণ

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন যে, বাংলাদেশ ধান উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করলেও উৎপাদনশীলতায় এখনও বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে। বর্তমানে ধান উৎপাদনের প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ১%-এ স্থির হয়ে আছে, যা প্রতিবেশী অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম। জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবের কারণেও বিপুল পরিমাণ চাষযোগ্য জমি অনাবাদি থেকে যাচ্ছে, যা বর্তমানে কৃষির উন্নয়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ধান উৎপাদন প্রক্রিয়ায় আধুনিক যন্ত্রপাতির অবাধ ও সুষ্ঠ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে এবং দেশের কৃষি খাতকে যুগোপযোগী রূপে রূপান্তর করতে হবে।

তবে বাংলাদেশে উচ্চমানসম্পন্ন উন্নত কৃষি যন্ত্রপাতি উৎপাদনের সক্ষমতা এখনো সীমিত। বিশেষত থ্রেসার, প্ল্যান্টার ও কম্বাইন হারভেস্টারের মতো বড় ও উন্নত প্রযুক্তির কৃষি যন্ত্রপাতি উৎপাদনে বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে এবং এর ফলে কৃষকদের জন্যে এসব যন্ত্রের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এছাড়া প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তার অভাব কৃষকদের জন্য আরও একটি বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে, যা কৃষি খাতে যান্ত্রিকীকরণের প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করছে বলে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন।
ভবিষ্যতে কৃষিখাতের জন্য আরো কঠিন প্রতিবন্ধকতা আসতে পারে। দেশে আর্দ্রতা বৃদ্ধির ফলে নতুন নতুন রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটতে পারে; জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে যেতে পারে এবং শীতকাল দীর্ঘায়িত হতে পারে। তাপমাত্রা ক্রমশ বাড়তে পারে; সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেতে পারে—এসব কারণ একত্রে কৃষি উৎপাদনের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে এবং উৎপাদনশীলতা আরও হ্রাসের ঝুঁকিতে পড়বে বলে ধারণা করা হয়। [২৪][২৫]
এই সংকট মোকাবিলায় কৃষি খাতে আধুনিক প্রযুক্তি ও যান্ত্রিকীকরণের ব্যাপক প্রয়োগ জরুরি। পাশাপাশি, কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং দেশীয়ভাবে কৃষিজ যন্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো দরকার, যাতে বাংলাদেশ কৃষি উৎপাদনে স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারে। [২৪]

























