পোল্ট্রি খামারিদের জন্য ফার্মার্স কার্ড, বিদ্যুতে ভর্তুকি ও স্বল্পসুদে ঋণের আশ্বাস// টাঙ্গাইলে বিপিআইএ-এর খামারি সমাবেশে প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু।
নিজস্ব প্রতিবেদক: ড. বায়েজিদ মোড়ল
AgricultureNews24.com

‘পোল্ট্রি খামারি বাঁচলে বাঁচবে দেশ, নিরাপদ প্রোটিন সমৃদ্ধ হবে বাংলাদেশ’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন (বিপিআইএ) টাঙ্গাইল জেলা শাখার উদ্যোগে ১৮ জুলাই ২০২৬ (শনিবার) টাঙ্গাইল সদরে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘পোল্ট্রি খামারি সমাবেশ ও মতবিনিময় সভা’।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী জনাব সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, এমপি। এছাড়াও মন্ত্রণালয়, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, বিপিআইএ-এর কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ, জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার বিপুলসংখ্যক পোল্ট্রি খামারি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন।
পোল্ট্রি খামারিরাও পাবেন ‘ফার্মার্স কার্ড’

প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, দেশের প্রাণিজ প্রোটিনের চাহিদা পূরণে পোল্ট্রি খামারিদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ খাতের উন্নয়নে সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিয়েছে।
তিনি জানান, কৃষক কার্ডের আদলে পোল্ট্রি খামারিদের জন্যও একটি বিশেষ কার্ড চালু করা হবে, যার মাধ্যমে তারা কৃষক কার্ডের আওতায় প্রদত্ত বিভিন্ন সরকারি সুবিধা ভোগ করতে পারবেন।
তিনি আরও বলেন, পোল্ট্রি ফিডের মূল্য কমানোর লক্ষ্যে ফিড মিলার ও বিপিআইএ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
অ্যান্টিবায়োটিকমুক্ত উৎপাদনের ওপর জোর
প্রতিমন্ত্রী বলেন, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের জন্য অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনোভাবেই অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা যাবে না। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় অ্যান্টিবায়োটিকমুক্ত ডিম ও মাংস উৎপাদন এখন সময়ের দাবি।
তিনি বলেন, পোল্ট্রি শিল্প টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি। এই শিল্পের মাধ্যমে দেশের লক্ষ লক্ষ যুবকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। তাই উৎপাদক ও ভোক্তার মাঝখানের অপ্রয়োজনীয় মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে একটি ন্যায্য বাজারব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার কাজ করবে।
এছাড়া তিনি টাঙ্গাইলে একটি আধুনিক পর্যটন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার বিষয়েও সরকারের পরিকল্পনার কথা জানান।

বিদ্যুতে ভর্তুকির উদ্যোগ
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব জনাব আহমেদ আলী বলেন, প্রাণিসম্পদ খাতে প্রণোদনা কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, খামারিদের জন্য বিদ্যুতে ভর্তুকি (Electricity Subsidy) প্রদানের বিষয়টি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের স্বার্থে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে এবং যথাযথ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
ডিমের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে কাজ করছে সরকার
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মো. বয়জার রহমান বলেন, ডিমের উৎপাদন ব্যয় ও বাজারমূল্যের মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে।
তিনি জানান, জাতীয় পোল্ট্রি নীতিমালা ইতোমধ্যে অনুমোদিত হয়েছে। এই নীতিমালার আলোকে একটি কৌশলপত্র (Strategy Paper) প্রণয়ন করা হবে, যার মাধ্যমে খামারিরা নীতিগত সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা পাবেন।
খামারিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের দাবি
বিপিআইএ-এর মহাসচিব এম. সাফির রহমান বলেন, দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় পোল্ট্রি খামারিদের অবদান অপরিসীম। কিন্তু উৎপাদিত ডিম ও মুরগির ন্যায্যমূল্য থেকে খামারিরা প্রায়ই বঞ্চিত হন।

তিনি সরকারের কাছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরেন—
- খামারিদের জন্য স্বল্পসুদে ঋণ
- বিদ্যুৎ বিলে রিবেট সুবিধা
- জাতীয় পর্যায়ে ডিজিটাল খামারি ডাটাবেজ
- ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের পুনর্বাসন সহায়তা
টাঙ্গাইলে চালু হয়েছে চারটি ভেটেরিনারি ল্যাব
টাঙ্গাইল জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বলেন, খামারিদের সর্বাত্মক সহযোগিতা দিতে জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর কাজ করছে।
তিনি জানান, টাঙ্গাইল জেলায় ইতোমধ্যে চারটি ভেটেরিনারি ল্যাবরেটরি সার্ভিস চালু হয়েছে, যার মাধ্যমে খামারিরা দ্রুত রোগ নির্ণয়, পরীক্ষাগার সুবিধা এবং কারিগরি সহায়তা পাবেন।
প্রযুক্তিনির্ভর পোল্ট্রি শিল্প গড়ার আহ্বান
বিপিআইএ-এর যুগ্মসচিব অঞ্জন মজুমদার বলেন, গ্রামবাংলার প্রান্তিক খামারিরাই দেশের পোল্ট্রি শিল্পের মূল ভিত্তি।
তিনি আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং জাতীয় পর্যায়ে ডিজিটাল ডাটাবেজ চালুর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
ফার্মার্স কার্ড ও বিদ্যুৎ রিবেটের দাবি
বিপিআইএ-এর যুগ্ম মহাসচিব আলমগীর হোসেন বলেন, পোল্ট্রি খামারিদের জন্য দ্রুত ফার্মার্স কার্ড চালু করতে হবে।
একই সঙ্গে তিনি স্বল্পসুদে ঋণ এবং বিদ্যুৎ বিলে রিবেট সুবিধা চালুর দাবি জানান।
ডিমের পুষ্টিগুণ নিয়ে জাতীয় প্রচারণার আহ্বান
বিপিআইএ-এর প্রচার সম্পাদক ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, ডিম সম্পর্কে মানুষের মধ্যে এখনও নানা ভুল ধারণা রয়েছে।
তিনি রেডিও, টেলিভিশন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে ডিমের পুষ্টিগুণ নিয়ে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানোর জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
এ লক্ষ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
খামারিদের বক্তব্য
টাঙ্গাইলের খামারি হাফিজুর রহমান বলেন, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে খামারিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তাই রাষ্ট্রেরও উচিত তাঁদের ন্যায্য দাবি বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
টাঙ্গাইল সদর উপজেলার খামারি সাইফুল ইসলাম বলেন, পোল্ট্রি শিল্পকে আরও আধুনিক ও সুশৃঙ্খল করতে একটি জাতীয় ডিজিটাল ডাটাবেজ চালু করা জরুরি। পাশাপাশি ডিম ও অন্যান্য পণ্য সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন অঞ্চলে কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণের দাবি জানান।
কিশোরগঞ্জ জেলা বিপিআইএ-এর আহ্বায়ক সাদেকুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন লোকসানে ডিম বিক্রি করতে করতে অনেক খামারি সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছেন। তাই ফিড ও ওষুধের মূল্য কমাতে সরকারের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
প্রান্তিক ও বড় খামারিদের জন্য পৃথক নীতিমালার দাবি
অনুষ্ঠানের সভাপতি মোশারফ হোসেন চৌধুরী বলেন, পোল্ট্রি শিল্প গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি এবং এটি লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে।
তিনি মাননীয় প্রতিমন্ত্রীর উপস্থিতি ও পোল্ট্রি শিল্প উন্নয়নে সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
তিনি প্রান্তিক ও বৃহৎ খামারিদের জন্য পৃথক নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানান, যাতে ছোট-বড় সব খামারিই তাঁদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতভাবে পান।
একই সঙ্গে তিনি ডিমের বাজারে বিদ্যমান সিন্ডিকেট ভাঙতে তেজগাঁও ও কাপ্তান বাজারে প্রশাসক নিয়োগের দাবি জানান।
প্রশ্নোত্তর ও মতবিনিময় পর্বে দেশের বিভিন্ন জেলার খামারিরা তাঁদের বাস্তব সমস্যাগুলো তুলে ধরেন এবং সরকারি কর্মকর্তারা তা সমাধানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন।
পরে মধ্যাহ্নভোজের মাধ্যমে দিনব্যাপী ‘পোল্ট্রি খামারি সমাবেশ ও মতবিনিময় সভা’-এর সফল সমাপ্তি ঘটে।
অনুষ্ঠানজুড়ে খামারিদের অন্যতম প্রত্যাশা ছিল—ন্যায্যমূল্য, উৎপাদন ব্যয় কমানো, সহজ শর্তে ঋণ, বিদ্যুৎ ভর্তুকি, ডিজিটাল খামারি নিবন্ধন এবং একটি টেকসই পোল্ট্রি শিল্প গড়ে তোলার জন্য কার্যকর সরকারি নীতি বাস্তবায়ন।



























