RRP
agriculture news24.com
Health Care
Agriculture News
diamond egg
renata-ltd.com
Space for Add
Agriculture News
Spech for Promotion
avonah
Monday , 7 September 2026 |
  1. অন্যান্য
  2. অন্যান্য
  3. ইউটিউব
  4. উদ্যোক্তা
  5. উপন্যাশ
  6. এ্যাসিভমেন্ট
  7. ঔষধ
  8. কবিতা
  9. কীটনাশক
  10. কৃষি ব্যক্তিত্ব
  11. কৃষি সংবাদ
  12. কৃষি সেক্টরের নিদের্শনা
  13. কৌতুক
  14. খাবার
  15. খামার পদ্ধতি

কলাই ঘাস চাষের ইতিহাস, বৈশিষ্ট্য, চাষপদ্ধতি, রোগব্যাধি, পুষ্টিগুণ এবং গবাদিপ্রাণির খাদ্যে গুরুত্ব।।

প্রতিবেদক
Dr. Bayezid Moral
September 6, 2026 8:25 pm

কলাই ঘাস চাষের ইতিহাস, বৈশিষ্ট্য, চাষপদ্ধতি, রোগব্যাধি, পুষ্টিগুণ এবং গবাদিপ্রাণির খাদ্যে গুরুত্ব।।

ড. বায়েজিদ মোড়লের গবেষণাধর্মী প্রতিবেদন।।

বাংলাদেশে গবাদিপ্রাণি পালনের অন্যতম বড় সমস্যা হলো সারা বছর পর্যাপ্ত পুষ্টিকর সবুজ খাদ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা। অধিকাংশ খামারে নেপিয়ার, ভুট্টা, জার্মান ও অন্যান্য শস্যজাতীয় ঘাস বেশি ব্যবহার করা হলেও খাদ্যতালিকায় প্রোটিনসমৃদ্ধ লেগিউমজাতীয় ঘাসের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম থাকে। এ ঘাটতি পূরণে কলাই ঘাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

কলাই ঘাস দ্রুত বৃদ্ধি পায়, বাতাসের নাইট্রোজেন মাটিতে আবদ্ধ করতে পারে এবং অল্প সময়ে পুষ্টিকর সবুজ খাদ্য উৎপাদন করে। সঠিক অনুপাতে নেপিয়ার, ভুট্টা, জোয়ার বা অন্যান্য ঘাসের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়ানো হলে এটি দুধের গাভি ও মোটাতাজাকরণের ষাঁড়—উভয়ের জন্যই উপকারী। তবে কলাই ঘাসকে একমাত্র বা সম্পূর্ণ খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।

কলাই ঘাস বলতে কোন উদ্ভিদ বোঝায়?

বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় ‘কলাই ঘাস’ নামটি একাধিক কলাইজাতীয় উদ্ভিদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। কোথাও গবাদিপ্রাণির খাদ্য হিসেবে চাষ করা কাউপি বা ফেলন—বৈজ্ঞানিক নাম Vigna unguiculata—কে কলাই ঘাস বলা হয়। আবার কোনো কোনো এলাকায় মাসকলাই বা উড়দ—Vigna mungo—এর সবুজ গাছ ও ফসলের অবশিষ্টাংশকেও কলাই ঘাস বলা হয়।

গবাদিপ্রাণির খাদ্যের জন্য পরিকল্পিতভাবে চাষের ক্ষেত্রে সাধারণত দ্রুতবর্ধনশীল, বেশি পাতাযুক্ত ও নরম কাণ্ডের কাউপি অথবা কলাইজাতীয় উদ্ভিদকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। তাই বীজ কেনার আগে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তা বা নির্ভরযোগ্য বীজ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে উদ্ভিদের প্রজাতি ও জাতের সঠিক পরিচয় নিশ্চিত করা জরুরি।

এই প্রতিবেদনে প্রধানত গবাদিপ্রাণির সবুজ খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত কাউপি বা কলাইজাতীয় লেগিউম ঘাস সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

কলাই ঘাস চাষের ইতিহাস

কাউপির আদি উৎপত্তিস্থল আফ্রিকা বলে অধিকাংশ উদ্ভিদবিজ্ঞানী মনে করেন। হাজার হাজার বছর ধরে আফ্রিকার শুষ্ক ও আধা-শুষ্ক অঞ্চলে এটি মানুষের খাদ্য, সবজি এবং গবাদিপ্রাণির খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পরবর্তী সময়ে বাণিজ্য, অভিবাসন ও কৃষি সম্প্রসারণের মাধ্যমে ফসলটি দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়ে।

বাংলাদেশ ও ভারতীয় উপমহাদেশে কলাইজাতীয় ফসলের চাষ বহু পুরোনো। ঐতিহ্যগতভাবে কলাইয়ের দানা মানুষের খাদ্য, সবুজ গাছ ও শুকনা অবশিষ্টাংশ গবাদিপ্রাণির খাদ্য এবং পুরো ফসল মাটির উর্বরতা বৃদ্ধির কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে বাংলাদেশে ঠিক কোন বছরে কলাই প্রথম গবাদিপ্রাণির ঘাস হিসেবে চাষ শুরু হয়—এমন নির্ভরযোগ্য একক ঐতিহাসিক দলিল পাওয়া যায় না।

দেশে বাণিজ্যিক ডেইরি, গরু মোটাতাজাকরণ এবং উন্নত খামারব্যবস্থা সম্প্রসারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কলাই, কাউপি ও অন্যান্য লেগিউমজাতীয় ঘাসের গুরুত্ব বেড়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে কাউপি এখন দানা, সবজি, সবুজ খাদ্য, শুকনা খড়, সাইলেজ এবং সবুজ সার—সব ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত একটি বহুমুখী ফসল। বাংলাদেশ বায়োসেফটি পোর্টালের কাউপি পরিচিতি

কলাই ঘাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য

কলাই ঘাস একবর্ষজীবী লেগিউমজাতীয় উদ্ভিদ। জাতভেদে গাছ খাড়া, আধা-লতানো কিংবা লতানো হতে পারে।

এর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো—

  • দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং সাধারণত ৫০–৭০ দিনের মধ্যে কাটার উপযোগী হয়।
  • পাতা বেশি এবং কচি অবস্থায় কাণ্ড তুলনামূলক নরম থাকে।
  • গবাদিপ্রাণির কাছে সাধারণত রুচিকর।
  • শিকড়ের গুটিকায় থাকা রাইজোবিয়াম ব্যাকটেরিয়া বাতাসের নাইট্রোজেন আবদ্ধ করে।
  • মাটির জৈব পদার্থ ও উর্বরতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
  • উষ্ণ আবহাওয়া এবং তুলনামূলক কম বৃষ্টিতেও টিকে থাকতে পারে।
  • এককভাবে অথবা ভুট্টা, জোয়ার ও বাজরার সঙ্গে মিশ্রভাবে চাষ করা যায়।
  • সবুজ ঘাস, শুকনা খড় ও মিশ্র সাইলেজ হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
  • নেপিয়ার ঘাসের তুলনায় এর প্রোটিনের পরিমাণ সাধারণত বেশি।
  • জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না।
  • বয়স বেশি হলে কাণ্ড শক্ত, আঁশযুক্ত এবং কম হজমযোগ্য হয়ে যায়।
  • এটি সাধারণত একবর্ষজীবী; নেপিয়ারের মতো কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে ফলন দেয় না।

উপযোগী আবহাওয়া ও মাটি

কলাই উষ্ণ আবহাওয়ার ফসল। সাধারণত ২৫–৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ভালো বৃদ্ধি পায়। পর্যাপ্ত সূর্যালোক ও মাঝারি আর্দ্রতা ভালো ফলনের জন্য সহায়ক।

বেলে দোআঁশ থেকে দোআঁশ এবং পানি নিষ্কাশন সুবিধাযুক্ত মাটি কলাই ঘাস চাষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। এঁটেল মাটিতেও চাষ করা যায়, তবে জমিতে পানি জমে থাকলে শিকড় পচা, গাছ হলুদ হয়ে যাওয়া এবং ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

অতিরিক্ত অম্লীয় বা লবণাক্ত জমিতে জাতভেদে ফলন কমতে পারে। চাষের আগে মাটির অম্লত্ব, লবণাক্ততা এবং পুষ্টি উপাদান পরীক্ষা করলে সঠিক সার ব্যবস্থাপনা করা সহজ হয়।

চাষের উপযুক্ত সময়

বাংলাদেশে অঞ্চল, জমির ধরন, বৃষ্টিপাত ও সেচসুবিধা অনুযায়ী কলাই ঘাস বপনের সময় কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে। সাধারণভাবে—

  • ফেব্রুয়ারি–মার্চ: সেচসুবিধাযুক্ত জমিতে গ্রীষ্মকালীন চাষ;
  • মার্চ–এপ্রিল: খরিফ-১ মৌসুম;
  • আগস্ট–সেপ্টেম্বর: খরিফ-২ মৌসুম;
  • বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার পর কিছু এলাকায় স্বল্পমেয়াদি ফসল হিসেবে চাষ করা যায়।

প্রবল বৃষ্টির সময় নিচু ও পানি নিষ্কাশনের সুবিধাবিহীন জমিতে বপন করা উচিত নয়।

জাত ও বীজ নির্বাচন

গবাদিপ্রাণির খাদ্যের জন্য এমন জাত নির্বাচন করতে হবে যার—

  • পাতা ও শাখা বেশি;
  • কাণ্ড নরম ও রসাল;
  • দ্রুত বৃদ্ধি ঘটে;
  • সবুজ ঘাসের ফলন বেশি;
  • রোগসহনশীলতা ভালো;
  • স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজন রয়েছে।

দানা উৎপাদনের জাত এবং সবুজ খাদ্য উৎপাদনের জাতের বৈশিষ্ট্য এক নয়। তাই বাজার থেকে শুধু ‘কলাই বীজ’ নামে অজ্ঞাত বীজ না কিনে প্রত্যয়িত অথবা বিশ্বস্ত উৎস থেকে বীজ সংগ্রহ করা উচিত।

বীজ কেনার সময় জাতের নাম, উৎপাদনের তারিখ, অঙ্কুরোদ্গম হার এবং মেয়াদ যাচাই করতে হবে।

জমি তৈরি

জমির আগাছা ও আগের ফসলের অবশিষ্টাংশ পরিষ্কার করতে হবে। মাটির ধরন অনুযায়ী দুই থেকে চারটি চাষ এবং মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে ও সমতল করে নিতে হবে।

ভারী মাটি কিংবা বেশি বৃষ্টিপ্রবণ এলাকায় উঁচু বেড ও নালা তৈরি করলে অতিরিক্ত পানি দ্রুত বেরিয়ে যেতে পারে। শেষ চাষের সময় ভালোভাবে পচানো গোবর বা কম্পোস্ট মাটিতে মিশিয়ে দিলে মাটির গঠন, পানি ধারণক্ষমতা ও জৈব পদার্থের পরিমাণ বাড়ে।

বীজের হার ও বপনপদ্ধতি

শুধু সবুজ খাদ্য উৎপাদনের জন্য সাধারণত হেক্টরপ্রতি প্রায় ২৫–৩৫ কেজি বীজ প্রয়োজন হতে পারে। ছিটিয়ে বপন করলে বীজ কিছুটা বেশি লাগে। সারিতে বপন করলে কম বীজে গাছের সুষম ঘনত্ব বজায় রাখা এবং আগাছা পরিষ্কার করা সহজ হয়।

সারিতে বপনের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে—

  • সারি থেকে সারির দূরত্ব: ২৫–৩০ সেন্টিমিটার;
  • গাছ থেকে গাছের দূরত্ব: ১০–১৫ সেন্টিমিটার;
  • বীজ বপনের গভীরতা: ৩–৫ সেন্টিমিটার।

অতিরিক্ত গভীরে বীজ বপন করলে অঙ্কুরোদ্গম কমে যেতে পারে। বপনের আগে অল্প কিছু বীজ ভেজা কাপড় বা টিস্যুতে রেখে অঙ্কুরোদ্গম পরীক্ষা করা ভালো।

বীজের পরিমাণ জাত, বীজের আকার, অঙ্কুরোদ্গম ক্ষমতা, মৌসুম ও চাষপদ্ধতি অনুযায়ী পরিবর্তিত হবে।

রাইজোবিয়াম দিয়ে বীজ শোধন

যে জমিতে আগে কলাইজাতীয় ফসল চাষ করা হয়নি, সেখানে উপযুক্ত প্রজাতির রাইজোবিয়াম কালচার দিয়ে বীজ শোধন করা উপকারী। এতে শিকড়ে গুটি সৃষ্টি এবং বাতাস থেকে নাইট্রোজেন সংগ্রহের ক্ষমতা বাড়ে।

রাইজোবিয়াম প্রয়োগ করা বীজ সরাসরি রোদে শুকানো যাবে না। ছায়ায় শুকিয়ে দ্রুত বপন করতে হবে। ছত্রাকনাশক ও রাইজোবিয়াম—দুটিই ব্যবহার করতে হলে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ অনুযায়ী পৃথক ধাপে প্রয়োগ করা উচিত।

সার ব্যবস্থাপনা

কলাই লেগিউমজাতীয় ফসল হওয়ায় শিকড়ের মাধ্যমে নাইট্রোজেন সংগ্রহ করতে পারে। তাই নেপিয়ার বা ভুট্টার মতো অধিক পরিমাণ ইউরিয়া সাধারণত প্রয়োজন হয় না। অতিরিক্ত ইউরিয়া প্রয়োগ করলে গাছ অস্বাভাবিক নরম ও রোগপ্রবণ হতে পারে এবং শিকড়ের গুটি তৈরিও কমে যেতে পারে।

সারের সঠিক পরিমাণ নির্ধারণের জন্য মাটি পরীক্ষা করা সবচেয়ে নিরাপদ। সাধারণভাবে প্রয়োজন হতে পারে—

  • ভালোভাবে পচানো গোবর বা কম্পোস্ট;
  • অল্প পরিমাণ প্রারম্ভিক নাইট্রোজেন;
  • ফসফরাস;
  • পটাশ;
  • সালফার;
  • ঘাটতি থাকলে জিংক বা বোরন।

অঞ্চল, মাটি ও জাতভেদে সারের চাহিদা পরিবর্তিত হয়। তাই নির্দিষ্ট মাত্রায় সার প্রয়োগের আগে উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

সেচ ও পানি নিষ্কাশন

বপনের সময় মাটিতে পর্যাপ্ত রস না থাকলে হালকা সেচ দিতে হবে। অঙ্কুরোদ্গমের পর দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হলে প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ দেওয়া যায়।

ফুল আসার সময় তীব্র খরা অথবা অতিরিক্ত পানি—দুটিই ক্ষতিকর। জমিতে যেন পানি জমে না থাকে সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। দীর্ঘ সময় জলাবদ্ধ থাকলে কচি গাছ দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

আগাছা ব্যবস্থাপনা

বপনের প্রথম ২০–৩০ দিন আগাছা নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় আগাছা আলো, পানি ও পুষ্টির জন্য কলাই গাছের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে।

সাধারণত বপনের ১৫–২০ দিন পর প্রথম নিড়ানি দেওয়া যায়। প্রয়োজন হলে পরে আরেকবার আগাছা পরিষ্কার করতে হবে। সারিতে বপন করলে নিড়ানি দেওয়া ও পরিচর্যা করা তুলনামূলকভাবে সহজ হয়।

ঘাস কাটার উপযুক্ত সময়

কচি অবস্থা থেকে ফুল আসার শুরুর পর্যায়ে কলাই ঘাসের পুষ্টিমান, রুচিশীলতা ও হজমযোগ্যতা সাধারণত ভালো থাকে। গবাদিপ্রাণির খাদ্যের জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে বপনের প্রায় ৫০–৬০ দিন পর অথবা প্রায় ৫০ শতাংশ গাছে ফুল আসার সময় কাটা উপযোগী।

খুব আগে কাটলে প্রতি এককে ফলন কম হয়। আবার বেশি দেরিতে কাটলে—

  • কাণ্ড শক্ত হয়;
  • আঁশ ও লিগনিনের পরিমাণ বাড়ে;
  • হজমযোগ্যতা কমে;
  • গবাদিপ্রাণির খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ কমতে পারে;
  • প্রতি কেজি শুকনা পদার্থে প্রোটিনের অনুপাত কমে যায়।

জাতভেদে কাটার পর কিছু গাছ আবার বাড়তে পারে। তবে কলাই মূলত একবর্ষজীবী ফসল এবং অনেক ক্ষেত্রে একটি প্রধান কাটাই থেকেই ভালো ফলন পাওয়া যায়। নেপিয়ার ঘাসের মতো কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিক কাটাইয়ের প্রত্যাশা করা ঠিক নয়।

সম্ভাব্য ফলন

জাত, মৌসুম, মাটি, বীজের হার, গাছের ঘনত্ব এবং পরিচর্যার ওপর সবুজ ঘাসের ফলন ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়। ভালো ব্যবস্থাপনায় হেক্টরপ্রতি আনুমানিক ২০–৩০ টন সবুজ ঘাস পাওয়া যেতে পারে। উন্নত জাত ও অনুকূল পরিবেশে ফলন আরও বেশি হতে পারে।

কিছু উন্নত খাদ্যোপযোগী কাউপি জাতে হেক্টরপ্রতি প্রায় ৩–৫ টন শুকনা পদার্থ উৎপাদনের তথ্য পাওয়া যায়। তবে স্থানীয় মাঠপরীক্ষা ছাড়া কোনো জাতের অস্বাভাবিক বেশি ফলনের প্রচারণা গ্রহণ করা উচিত নয়।

কলাই ঘাসের পুষ্টিগুণ

কলাই ঘাসের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি লেগিউমজাতীয় এবং তুলনামূলকভাবে প্রোটিনসমৃদ্ধ। জাত, গাছের বয়স, পাতা ও কাণ্ডের অনুপাত, মাটি, সার ব্যবস্থাপনা ও পরীক্ষাপদ্ধতি অনুযায়ী পুষ্টিমান পরিবর্তিত হয়।

শুকনা পদার্থের ভিত্তিতে কচি কলাই বা কাউপি ঘাসে সাধারণত নিম্নোক্ত পুষ্টি উপাদান থাকতে পারে—

পুষ্টি উপাদানসম্ভাব্য পরিমাণ
ক্রুড প্রোটিনপ্রায় ১৪–২২%
ক্রুড ফাইবারপ্রায় ২০–৩০%
মোট খনিজ বা অ্যাশপ্রায় ৮–১২%
ক্যালসিয়ামশস্যজাতীয় ঘাসের তুলনায় সাধারণত বেশি
ফসফরাসমাঝারি; ক্যালসিয়ামের তুলনায় কম
শুকনা পদার্থকচি সবুজ ঘাসে প্রায় ১৫–২৫%

এই সংখ্যাগুলো স্থির নয়। একই জাতের কলাই ঘাসেও কাটার বয়স ও চাষাবাদের কারণে বড় পার্থক্য হতে পারে। গবেষণায় কিছু উন্নত কাউপি জাতে শুকনা পদার্থের ভিত্তিতে ২০ শতাংশের বেশি ক্রুড প্রোটিন পাওয়া গেছে। কিন্তু এটিকে সব জমি ও সব জাতের নিশ্চিত পুষ্টিমান হিসেবে উল্লেখ করা ঠিক হবে না। তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাউপি চাষ নির্দেশিকা

দুধের গাভির জন্য কলাই ঘাসের গুরুত্ব

দুধ উৎপাদনের জন্য গাভির খাদ্যে পর্যাপ্ত শক্তি, প্রোটিন, কার্যকর আঁশ, খনিজ, ভিটামিন ও পরিষ্কার পানি প্রয়োজন। শুধু খড়, পরিণত নেপিয়ার কিংবা নিম্নমানের ঘাসনির্ভর খাদ্যে প্রোটিনের ঘাটতি থাকলে কলাই ঘাস সেই ঘাটতির একটি অংশ পূরণ করতে পারে।

সুষম খাদ্যতালিকায় কলাই ঘাস ব্যবহারের সম্ভাব্য সুবিধা হলো—

  • রুমেনের উপকারী অণুজীবের জন্য প্রয়োজনীয় নাইট্রোজেন সরবরাহ করে;
  • নিম্নমানের খড় ও পরিণত ঘাসের হজমে সহায়তা করতে পারে;
  • খাদ্যের রুচিশীলতা বাড়াতে পারে;
  • গাভির শারীরিক অবস্থা বজায় রাখতে সহায়তা করে;
  • দুধের প্রোটিন তৈরির প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহে ভূমিকা রাখে;
  • ব্যয়বহুল প্রোটিনসমৃদ্ধ দানাদার উপাদানের ওপর নির্ভরতা আংশিক কমাতে পারে;
  • পর্যাপ্ত শক্তির সঙ্গে সরবরাহ করা হলে দুধ উৎপাদন ধরে রাখতে সহায়ক হতে পারে।

তবে কলাই ঘাস খাওয়ালেই দুধ নিশ্চিতভাবে বেড়ে যাবে—এমন দাবি বৈজ্ঞানিক নয়। দুধের পরিমাণ নির্ভর করে গাভির জাত, বয়স, দুধদানের পর্যায়, স্বাস্থ্য, মোট খাদ্যগ্রহণ, খাদ্যে শক্তি ও প্রোটিনের ভারসাম্য এবং সার্বিক খামার ব্যবস্থাপনার ওপর।

ষাঁড় মোটাতাজাকরণে কলাই ঘাসের গুরুত্ব

মোটাতাজাকরণে ষাঁড়ের মাংসপেশি বৃদ্ধির জন্য প্রোটিন এবং দৈহিক ওজন বৃদ্ধির জন্য পর্যাপ্ত শক্তি প্রয়োজন। কলাই ঘাস ভালো প্রোটিন সরবরাহ করলেও ভুট্টা, দানাদার খাদ্য বা শস্যজাতীয় ঘাসের মতো উচ্চ শক্তিসমৃদ্ধ খাদ্য নয়।

সঠিকভাবে ব্যবহার করা হলে কলাই ঘাস—

  • মাংসপেশি গঠনের প্রয়োজনীয় প্রোটিন সরবরাহে সহায়তা করে;
  • খড়ভিত্তিক খাদ্যের সামগ্রিক পুষ্টিমান উন্নত করে;
  • খাদ্য গ্রহণ ও হজমে সহায়তা করতে পারে;
  • খৈল বা অন্য প্রোটিন উৎসের প্রয়োজন কিছুটা কমাতে পারে;
  • মোটাতাজাকরণের খাদ্যতালিকাকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করে;
  • গবাদিপ্রাণির স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও শারীরিক অবস্থা বজায় রাখতে সাহায্য করে।

স্বাস্থ্যসম্মত ওজন বৃদ্ধির জন্য কলাই ঘাসের সঙ্গে নেপিয়ার, ভুট্টা বা জোয়ারের ঘাস, খড়, পরিমিত দানাদার খাদ্য, লবণ, খনিজ মিশ্রণ এবং পর্যাপ্ত পরিষ্কার পানি দিতে হবে। শুধু কলাই ঘাস খাইয়ে লাভজনক মোটাতাজাকরণ সম্ভব নয়।

কতটুকু কলাই ঘাস খাওয়ানো যায়?

সব গবাদিপ্রাণির জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ নির্ধারণ করা নিরাপদ নয়। দৈহিক ওজন, বয়স, দুধ উৎপাদন, শারীরিক অবস্থা এবং অন্য খাদ্যের পরিমাণ বিবেচনা করে কলাই ঘাস দিতে হবে।

পূর্ণবয়স্ক গরু সাধারণত দৈনিক তার দৈহিক ওজনের প্রায় ২–৩ শতাংশ শুকনা পদার্থ গ্রহণ করতে পারে। তবে দুধের উৎপাদন ও খাদ্যের মান অনুযায়ী এর তারতম্য ঘটে।

ব্যবহারিকভাবে—

  • প্রথমে দৈনিক ২–৩ কেজি তাজা কলাই ঘাস দিয়ে অভ্যস্ত করা যেতে পারে;
  • কয়েক দিনে ধীরে ধীরে পরিমাণ বাড়াতে হবে;
  • পূর্ণবয়স্ক গরুকে সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবে দৈনিক প্রায় ৫–১০ কেজি দেওয়া যেতে পারে;
  • বড় ও উচ্চ উৎপাদনশীল গাভির ক্ষেত্রে পুষ্টিবিদের তৈরি খাদ্যতালিকায় পরিমাণ বেশি হতে পারে;
  • মোট সবুজ খাদ্যের প্রায় এক-চতুর্থাংশ থেকে এক-তৃতীয়াংশ কলাই ঘাস এবং বাকি অংশ শস্যজাতীয় ঘাস রাখা একটি ব্যবহারিক প্রাথমিক অনুপাত হতে পারে।

এগুলো সাধারণ নির্দেশনা। উচ্চ উৎপাদনশীল গাভি এবং নিবিড় মোটাতাজাকরণের ষাঁড়ের ক্ষেত্রে খাদ্যের নমুনা পরীক্ষা করে প্রাণিপুষ্টিবিদের মাধ্যমে সুষম খাদ্যতালিকা তৈরি করাই উত্তম।

কলাই ঘাস খাওয়ানোর সতর্কতা

কচি লেগিউমজাতীয় ঘাস একবারে বেশি খেলে কিছু গবাদিপ্রাণির পেট ফাঁপা বা ব্লোট হতে পারে। তাই—

  • খালি পেটে বেশি পরিমাণ কচি কলাই ঘাস দেওয়া যাবে না;
  • কলাই ঘাস দেওয়ার আগে কিছু খড় বা সাধারণ ঘাস দেওয়া ভালো;
  • শিশির বা বৃষ্টিতে অতিরিক্ত ভেজা অবস্থায় বেশি পরিমাণ খাওয়ানো উচিত নয়;
  • খাদ্যতালিকায় হঠাৎ পরিবর্তন করা যাবে না;
  • নেপিয়ার, ভুট্টা, জোয়ার বা খড়ের সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে;
  • পচা, ছত্রাকযুক্ত বা দুর্গন্ধযুক্ত ঘাস খাওয়ানো যাবে না;
  • রাস্তার পাশের ধুলাবালি ও দূষিত পানির সংস্পর্শে জন্মানো ঘাস ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে;
  • বালাইনাশক প্রয়োগের পর নির্ধারিত অপেক্ষাকাল শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঘাস কাটা যাবে না।

গবাদিপ্রাণির বাম পাশ অস্বাভাবিক ফুলে গেলে, শ্বাসকষ্ট হলে, বারবার পেটের দিকে তাকালে অথবা অস্থিরতা দেখা দিলে দ্রুত রেজিস্টার্ড ভেটেরিনারি চিকিৎসকের সহায়তা নিতে হবে।

কলাই ঘাস দিয়ে সাইলেজ তৈরি

কলাই ঘাসে প্রোটিনের পরিমাণ ভালো হলেও সহজে গাঁজনযোগ্য শর্করা ও শুকনা পদার্থ তুলনামূলক কম থাকতে পারে। তাই শুধু কলাই ঘাস দিয়ে সাইলেজ তৈরি করলে অতিরিক্ত রস বের হওয়া, দুর্গন্ধ সৃষ্টি এবং দুর্বল গাঁজনের ঝুঁকি থাকে।

ভালো সাইলেজ তৈরির জন্য—

  • ভুট্টা বা জোয়ারের সঙ্গে কলাই ঘাস মিশিয়ে কাটা;
  • কাটার পর প্রয়োজন হলে কয়েক ঘণ্টা ছায়ায় মেলে রেখে অতিরিক্ত আর্দ্রতা কমানো;
  • প্রায় ২–৩ সেন্টিমিটার আকারে কুচি করা;
  • সাইলো বা পাত্রে ভালোভাবে চাপ দিয়ে বাতাস বের করা;
  • সম্পূর্ণ বায়ুরোধী করে সংরক্ষণ করা;
  • সাইলো খোলার পর প্রতিদিন প্রয়োজনীয় অংশ দ্রুত ব্যবহার করা—

উপকারী।

সাইলেজে ছত্রাক, কালো দাগ, পচা গন্ধ বা অস্বাভাবিক পিচ্ছিল অবস্থা দেখা গেলে গবাদিপ্রাণিকে খাওয়ানো যাবে না।

কলাই ঘাসের প্রধান রোগ ও প্রতিকার

১. হলুদ মোজাইক রোগ

এটি ভাইরাসজনিত একটি গুরুত্বপূর্ণ রোগ। আক্রান্ত পাতায় হলুদ ও সবুজ ছোপ দেখা যায়। গাছের বৃদ্ধি কমে যায় এবং মারাত্মক আক্রমণে প্রায় পুরো পাতা হলুদ হয়ে যেতে পারে। সাদা মাছি এ ভাইরাস ছড়াতে সহায়তা করে।

প্রতিকার—

  • রোগমুক্ত ও সহনশীল জাতের বীজ ব্যবহার;
  • আক্রান্ত গাছ দ্রুত তুলে নষ্ট করা;
  • জমি ও আশপাশ আগাছামুক্ত রাখা;
  • সাদা মাছির উপস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ;
  • হলুদ আঠালো ফাঁদ ব্যবহার;
  • প্রয়োজন হলে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে অনুমোদিত বালাইনাশক প্রয়োগ।

২. পাতার দাগ রোগ

পাতায় ছোট বাদামি, ধূসর বা গোলাকার দাগ দেখা যায়। পরে দাগ বড় হয়ে একত্রিত হতে পারে এবং পাতা শুকিয়ে যেতে পারে। আর্দ্র ও বৃষ্টিপ্রবণ আবহাওয়ায় রোগ দ্রুত ছড়ায়।

প্রতিকার—

  • সুস্থ ও শোধিত বীজ ব্যবহার;
  • অতিরিক্ত ঘন করে বপন না করা;
  • পানি নিষ্কাশন নিশ্চিত করা;
  • আক্রান্ত গাছের অবশিষ্টাংশ সরিয়ে ফেলা;
  • একই জমিতে বারবার কলাই চাষ না করা;
  • প্রয়োজন হলে অনুমোদিত ছত্রাকনাশক ব্যবহার।

৩. অ্যানথ্রাকনোজ

আক্রান্ত গাছের কাণ্ড, পাতা ও ফলে কালচে অথবা দেবে যাওয়া ক্ষত তৈরি হয়। বীজ ও আক্রান্ত ফসলের অবশিষ্টাংশ থেকে রোগ ছড়াতে পারে।

প্রতিকার—

  • প্রত্যয়িত রোগমুক্ত বীজ ব্যবহার;
  • উপযুক্ত উপাদান দিয়ে বীজ শোধন;
  • পর্যায়ক্রমে ভিন্ন গোত্রের ফসল চাষ;
  • আক্রান্ত গাছ অপসারণ;
  • অতিরিক্ত সেচ ও ঘন করে বপন পরিহার;
  • প্রয়োজন হলে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে ব্যবস্থা গ্রহণ।

৪. মরিচা রোগ

পাতার নিচে মরিচার মতো বাদামি গুঁড়াযুক্ত ফুসকুড়ি দেখা যায়। আক্রমণ বেড়ে গেলে পাতা হলুদ হয়ে শুকিয়ে পড়ে এবং খাদ্যের ফলন কমে যায়।

প্রতিকার—

  • রোগসহনশীল জাত নির্বাচন;
  • আক্রান্ত গাছের অবশিষ্টাংশ নষ্ট করা;
  • পরিমিত দূরত্বে বপন;
  • ক্ষেতের ভেতর বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখা;
  • প্রয়োজন অনুযায়ী অনুমোদিত ছত্রাকনাশক প্রয়োগ।

৫. গোড়া ও শিকড় পচা

আক্রান্ত গাছের গোড়া কালো বা বাদামি হয়ে যায়, শিকড় পচে এবং গাছ ঢলে পড়ে। জলাবদ্ধতা, অপরিশোধিত বীজ ও মাটিতে রোগজীবাণুর আধিক্য এর প্রধান কারণ।

প্রতিকার—

  • দ্রুত পানি নিষ্কাশন;
  • বপনের আগে বীজ শোধন;
  • উঁচু বেডে চাষ;
  • আক্রান্ত গাছ মাটিসহ তুলে নষ্ট করা;
  • একই জমিতে বারবার কলাই চাষ না করা;
  • অতিরিক্ত সেচ বন্ধ রাখা।

৬. পাউডারি মিলডিউ

পাতায় সাদা গুঁড়ার মতো আবরণ পড়ে। আক্রমণ বেড়ে গেলে পাতা হলুদ হয় এবং ধীরে ধীরে শুকিয়ে যায়।

প্রতিকার—

  • ক্ষেত পরিষ্কার রাখা;
  • বাতাস চলাচলের জন্য পরিমিত দূরত্ব বজায় রাখা;
  • আক্রান্ত অংশ অপসারণ;
  • কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে অনুমোদিত ছত্রাকনাশক প্রয়োগ।

কলাই ঘাসের ক্ষতিকর পোকামাকড়

কলাই ফসলে জাবপোকা, সাদা মাছি, থ্রিপস, বিছাপোকা, পাতা মোড়ানো পোকা ও ফল ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণ হতে পারে।

জাবপোকা

জাবপোকা কচি পাতা ও ডগা থেকে রস শোষণ করে। এতে পাতা কুঁকড়ে যায় এবং গাছের বৃদ্ধি কমে যায়। এরা ভাইরাসজনিত রোগ ছড়াতেও ভূমিকা রাখতে পারে।

সাদা মাছি

সাদা মাছি পাতার রস শোষণ করে এবং হলুদ মোজাইক ভাইরাস ছড়াতে সহায়তা করে। আক্রান্ত গাছ দুর্বল ও হলুদ হয়ে যায়।

বিছাপোকা ও পাতা মোড়ানো পোকা

এরা পাতা খেয়ে ফেলে অথবা পাতা মুড়িয়ে ভেতরে অবস্থান করে। মারাত্মক আক্রমণে পাতার পরিমাণ ও সবুজ ঘাসের ফলন কমে যায়।

ফল ছিদ্রকারী পোকা

বীজ বা দানা উৎপাদনের জন্য কলাই রাখা হলে ফল ছিদ্রকারী পোকা উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করতে পারে।

সমন্বিত দমনব্যবস্থা

  • নিয়মিত ক্ষেত পর্যবেক্ষণ;
  • আগাছা পরিষ্কার;
  • আক্রান্ত ডগা ও পাতা সংগ্রহ করে নষ্ট করা;
  • হলুদ আঠালো ফাঁদ ব্যবহার;
  • আলোর ফাঁদ ও প্রয়োজন অনুযায়ী ফেরোমন ফাঁদ স্থাপন;
  • উপকারী পোকামাকড় সংরক্ষণ;
  • অনুমোদিত নিমভিত্তিক উপাদান ব্যবহার;
  • আক্রমণ অর্থনৈতিক ক্ষতির সীমা অতিক্রম করলে নিবন্ধিত বালাইনাশক প্রয়োগ।

গবাদিপ্রাণির খাদ্যে বালাইনাশক ব্যবহারের সতর্কতা

কলাই ঘাস সরাসরি গবাদিপ্রাণিকে খাওয়ানো হয়। তাই নির্বিচারে রাসায়নিক প্রয়োগ করলে তার অবশিষ্টাংশ গবাদিপ্রাণির শরীর, দুধ ও মাংসে প্রবেশ করতে পারে।

এ কারণে—

  • রোগ বা পোকা শনাক্ত না করে ওষুধ প্রয়োগ করা যাবে না;
  • অনুমোদনহীন বালাইনাশক ব্যবহার করা যাবে না;
  • নির্ধারিত মাত্রার বেশি প্রয়োগ করা যাবে না;
  • একই রাসায়নিক বারবার ব্যবহার করা উচিত নয়;
  • প্রয়োগের তারিখ, ওষুধের নাম ও মাত্রা লিখে রাখতে হবে;
  • অপেক্ষাকাল শেষ হওয়ার আগে ঘাস কাটা যাবে না;
  • স্প্রে করা ঘাস বিক্রি করলে ক্রেতাকে বিষয়টি জানাতে হবে;
  • প্রয়োজনে কৃষি ও প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার পরামর্শ নিতে হবে।

কলাই ঘাসের অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত গুরুত্ব

কলাই ঘাসের সুবিধা শুধু গবাদিপ্রাণির খাদ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি—

  • খামারে প্রোটিনসমৃদ্ধ সবুজ খাদ্যের উৎস তৈরি করে;
  • পতিত বা স্বল্পমেয়াদি খালি জমি কাজে লাগাতে সাহায্য করে;
  • শিকড়ের মাধ্যমে মাটিতে নাইট্রোজেন যোগ করে;
  • পরবর্তী ফসলে নাইট্রোজেন সারের চাহিদা কিছুটা কমাতে পারে;
  • মাটিতে জৈব পদার্থ যোগ করে;
  • ভুট্টা বা জোয়ারের সঙ্গে মিশ্র চাষে খাদ্যের পুষ্টিমান উন্নত করে;
  • খড় ও নিম্নমানের ঘাসের পুষ্টিগত সীমাবদ্ধতা কমাতে সাহায্য করে;
  • খামারে উৎপাদিত খাদ্যের পরিমাণ বাড়িয়ে বাজারনির্ভরতা কমাতে পারে।

তবে বীজের দাম, একবর্ষজীবী বৈশিষ্ট্য, রোগের ঝুঁকি, জলাবদ্ধতার সংবেদনশীলতা এবং সম্ভাব্য বাজারমূল্য বিবেচনা করে চাষের আগে লাভ-ক্ষতির হিসাব করা প্রয়োজন।

পরামর্শ

কলাই ঘাসকে কোনো অলৌকিক বা একক সম্পূর্ণ খাদ্য হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এটি মূলত প্রোটিনসমৃদ্ধ সবুজ খাদ্য, যা শস্যজাতীয় ঘাস ও অন্যান্য খাদ্য উপাদানের সঙ্গে সমন্বিতভাবে ব্যবহার করলে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়।

খামারিদের প্রতি পরামর্শ—

১. প্রথমে উদ্ভিদ ও জাতের সঠিক পরিচয় নিশ্চিত করুন। শুধু ‘কলাই ঘাস’ নামে অজ্ঞাত বীজ কিনবেন না।

২. বড় পরিসরে চাষের আগে ৫–১০ শতক জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে চাষ করুন।

৩. পানি নিষ্কাশনযোগ্য জমি নির্বাচন করুন এবং জলাবদ্ধতা প্রতিরোধ করুন।

৪. মাটি পরীক্ষা করে সার দিন। লেগিউম ফসল বলে অতিরিক্ত ইউরিয়া ব্যবহার করবেন না।

৫. ফুল আসার শুরুতে ঘাস কাটুন। বেশি পরিণত হলে পুষ্টিমান ও হজমযোগ্যতা কমে যায়।

৬. খালি পেটে একসঙ্গে বেশি কলাই ঘাস দেবেন না। খড়, নেপিয়ার, ভুট্টা অথবা জোয়ারের ঘাসের সঙ্গে মিশিয়ে দিন।

৭. দুধের গাভির খাদ্যে শুধু প্রোটিন নয়—পর্যাপ্ত শক্তি, কার্যকর আঁশ, খনিজ, ভিটামিন ও পরিষ্কার পানি নিশ্চিত করুন।

৮. ষাঁড় মোটাতাজাকরণে কলাই ঘাসকে প্রোটিনের উৎস হিসেবে ব্যবহার করুন। পর্যাপ্ত শক্তির জন্য সুষম দানাদার খাদ্য দিতে হবে।

৯. বালাইনাশক প্রয়োগের পর অপেক্ষাকাল শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঘাস কাটবেন না।

১০. পচা, ছত্রাকযুক্ত, দুর্গন্ধযুক্ত বা দূষিত ঘাস গবাদিপ্রাণিকে খাওয়াবেন না।

১১. সম্ভব হলে স্থানীয় পরীক্ষাগারে ঘাস ও দানাদার খাদ্যের পুষ্টিমান পরীক্ষা করে খাদ্যতালিকা তৈরি করুন।

১২. উচ্চ উৎপাদনশীল গাভি ও নিবিড় মোটাতাজাকরণের ষাঁড়ের জন্য প্রাণিপুষ্টিবিদ বা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

শেষ কথা

কলাই ঘাস বাংলাদেশের গবাদিপ্রাণির জন্য একটি সম্ভাবনাময় ও প্রোটিনসমৃদ্ধ লেগিউমজাতীয় সবুজ খাদ্য। এটি দুধের গাভির খাদ্যে প্রোটিনের ঘাটতি পূরণ, নিম্নমানের খড়ের ব্যবহারযোগ্যতা বৃদ্ধি এবং মোটাতাজাকরণের ষাঁড়ের মাংসপেশি গঠনে সহায়তা করতে পারে। পাশাপাশি মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি এবং রাসায়নিক নাইট্রোজেন সারের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ সৃষ্টি করে।

তবে সফলতার জন্য সঠিক জাত নির্বাচন, সময়মতো বপন ও কাটাই, পানি নিষ্কাশন, সমন্বিত রোগ-পোকা ব্যবস্থাপনা এবং সুষম খাদ্যতালিকায় পরিমিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। কলাই ঘাস এককভাবে সম্পূর্ণ খাদ্য নয়। নেপিয়ার বা ভুট্টাজাতীয় ঘাস, খড়, দানাদার খাদ্য, খনিজ উপাদান ও পরিষ্কার পানির সঙ্গে সমন্বিতভাবে ব্যবহার করলেই এর প্রকৃত পুষ্টিগত ও অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া সম্ভব।

সর্বশেষ - ছাগল পালন