
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা, জনস্বাস্থ্য চিন্তাবিদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ করছি।
২০০৬ সালে বাংলাভিশন টিভি চ্যানেলে আমার পরিচালিত নদী ও জীবন অনুষ্ঠানের একটি পর্বে স্যার এসেছিলেন আলোচক হয়ে। চরাঞ্চলের মানুষদের কিভাবে স্বাস্থ্য সেবা দেওয়া যায় এমন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে । এরপর জীবনে যতবার দেখা হয়েছে স্যার আমার নাম ধরে ডাক দিতেন।
মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং স্যারের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।
“গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রাণ পুরুষ, প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ১১ এপ্রিল (মঙ্গলবার) আনুমানিক রাত ১০:৪০ এ গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন।”
একাত্তরে ফিল্ড হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করে মুক্তিযোদ্ধাদের সেবায় আত্ম নিয়োগকারী জাফরুল্লাহ স্যারের বড় অবদান ছিল জাতীয় ওষুধ নীতি প্রণয়নে। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র গড়ে তুলে কম খরচে দরিদ্রদের চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা করায়ও স্যারের অবদান স্মরণ করা হয়।
জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সংস্পর্শ পাওয়া জাফরুল্লাহ স্যার রাজনৈতিক অঙ্গনেও নানা ভূমিকা রেখে চলছিলেন।
নানা রোগে কাবু হয়ে গত কিছুদিন ধরে হাসপাতালে ছিলেন চৌধুরী স্যার। স্যার দীর্ঘদিন ধরে কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন। কোভিডে আক্রান্ত হওয়ার পর স্যারের লিভারেও সমস্যা দেখা দেয়। এছাড়া স্যার অপুষ্টিসহ সেপটিসেমিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন।
গত ৩ এপ্রিল নগর হাসপাতালে ভর্তির পর সেখানেই স্যারের চিকিৎসা চলছিল। গত রোববার স্যারের শারীরিক অব্স্থার উন্নতি না হলে মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়। অবস্থার অবনতি না ঘটল স্যারকে সোমবার নেওয়া হয়েছিল ‘লাইফ সাপোর্টে’।
এরপর মঙ্গলবার সকালে মেডিকেল বোর্ড বসে স্যারের রক্তে সংক্রমণ পাওয়ার কথাও জানায়। তবে দুপুরে চৌধুরি স্যারের কিডনি ডায়ালাইসিস শুরু করা হয়েছিল। এরপর রাতেই চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
জাফরুল্লাহ চৌধুরীর জন্ম ১৯৪১ সালের ২৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম জেলার রাউজানে। ঢাকার বকশীবাজারের নবকুমার স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাসের পর ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। ১৯৬৪ সালে স্যার ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন।
এরপর উচ্চ শিক্ষা নিতে জাফরুল্লাহ স্যার যুক্তরাজ্যে গেলেও ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর পড়াশোনা বাদ রেখে দেশের টানে ছুটে আসেন।
লন্ডন থেকে ফিরে ভারতের আগরতলার মেলাঘরে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে প্রথমে গেরিলা প্রশিক্ষণ নেন জাফরুল্লাহ স্যার, পরে সেখানেই ‘বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল’ প্রতিষ্ঠা করে মুক্তিযোদ্ধাদের সেবায় আত্ম-নিবেদিত হন। চৌধুরী স্যারের এই বড় ভূমিকার কথা এখনও স্মরণ করেন মুক্তিযোদ্ধারা।
স্বাধীনতার পর মেলাঘরের সেই ফিল্ড হাসপাতালকে ঢাকার ইস্কাটনে নিয়ে আসেন জাফরুল্লাহ চৌধুরী, পরে গ্রামকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুরূপে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ‘চল গ্রামে যাই’ এই স্লোগান নিয়ে হাসপাতালটি সাভারে স্থানান্তরিত হয়। তখন এর নামকরণ হয় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র।
স্বাধীনতার পর নারীর ক্ষমতায়নে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রায় অর্ধেক কর্মী নেওয়া হয়েছিল নারীদের মধ্য থেকে।
জাফরুল্লাহ চৌধুরী ১৯৭৯ সাল থেকে জাতীয় শিক্ষা কমিটির ও নারী কমিটির সদস্য ছিলেন।
১৯৮২ সালে প্রণীত জাতীয় ওষুধ নীতি প্রণয়নে অবদান রাখেন চৌধরী স্যার।
কোভিড মহামারীর সময় গণস্বাস্থ্য ফার্মাসিউটিক্যালস থেকে নমুনা পরীক্ষার কিট তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিলেন জাফরুল্লাহ চৌধুরী, যদিও সেই উদ্যোগ ফলপ্রসূ হয়নি।
দুটি কিডনি নষ্ট হওয়ার পরও দেশের ও দেশের মানুষের নানা সঙ্কটে সমাধান খুঁজতে ছুটে বেড়িয়েছেন জাফরুল্লাহ চৌধুরী।
১৯৭৭ সালে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন জাফরুল্লাহ চৌধুরী।
১৯৮৫ সালে এশিয়ার নোবেল পুরস্কার হিসাবে পরিচিত ‘র্যামন ম্যাগসাইসাই’ পুরস্কার পান।
যুক্তরাষ্ট্রের বার্কলি ইউনিভার্সিটি ২০০২ সালে স্যারকে ‘ইন্টারন্যাশনাল হেলথ হিরো’ হিসেবে সম্মাননা দেয়।
খুবই সাধারণ জীবন-যাপনে অভ্যস্ত ছিলেন জাফরুল্লাহ চৌধুরী।
কোনো রাজনৈতিক দলে যুক্ত না হলেও রাজনীতি সচেতন স্যার সব সময় বলতেন- “আমি মানুষের রাজনীতি করি।”
এখন রমজান মাস, আল্লাহ আমাদের ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী স্যারকে তাঁর দীর্ঘ জীবনের ভাল কাজের পুরস্কার স্বরুপ বেহেস্তের উন্নত মাকাম দান করুন।



























