বৃক্ষমেলা শেষ, সবুজ বাংলাদেশ গড়ার মূল কাজ এখন শুরু: পরিবেশমন্ত্রী।।
পাঁচ বছরে ২৫ কোটি চারা রোপণের লক্ষ্য • প্রথম বছরেই ৫ কোটি • ৩.৫ লাখের বেশি সবুজ কর্মসংস্থানের উদ্যোগ • বৃক্ষমেলায় বিক্রি ১৬ লাখ চারা।।

ঢাকা, ৯ আগস্ট ২০২৬: জাতীয় বৃক্ষমেলা-২০২৬ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হলেও বৃক্ষরোপণ, পরিচর্যা এবং সবুজ বাংলাদেশ গড়ার দায়িত্ব শেষ হয়নি; বরং এখন থেকেই শুরু হচ্ছে মূল কাজ—এমন মন্তব্য করেছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, এমপি।
তিনি বলেছেন, মেলা থেকে সংগ্রহ করা প্রতিটি চারা সঠিকভাবে রোপণের পাশাপাশি নিয়মিত পরিচর্যা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু গাছ লাগানোর সংখ্যাই নয়, রোপিত গাছ কতটি বেঁচে থাকছে—সেদিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
রোববার (৯ আগস্ট) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বন ভবনের হৈমন্তী মিলনায়তনে জাতীয় বৃক্ষমেলা-২০২৬-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
২০৩৫ সালের আগেই ২৭ শতাংশ বৃক্ষাচ্ছাদনের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব

পরিবেশমন্ত্রী বলেন, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, তরুণ ও যুব সংগঠনসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষ সম্মিলিতভাবে বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যায় এগিয়ে এলে ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশের বৃক্ষাচ্ছাদন ২৭ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারিত সময়ের আগেই অর্জন করা সম্ভব।
তিনি বলেন, এবারের জাতীয় বৃক্ষমেলা শুধু চারা কেনাবেচার একটি আয়োজন ছিল না; পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, সবুজায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জনসম্পৃক্ততা তৈরির একটি জাতীয় আন্দোলনে পরিণত হয়েছে।
“বৃক্ষরোপণে সাজাই দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ”—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আয়োজিত এবারের মেলা প্রত্যাশার চেয়েও বেশি সাফল্য অর্জন করেছে বলে জানান তিনি।
পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছের চারা রোপণের পরিকল্পনা
মন্ত্রী জানান, সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে সারাদেশে ২৫ কোটি গাছের চারা রোপণ এবং নতুন সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টির কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
এরই অংশ হিসেবে প্রথম বছরে পাঁচ কোটি চারা রোপণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এর মধ্যে বন অধিদপ্তর একাই ৩ দশমিক ৫ কোটি গাছের চারা রোপণ করবে।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, গত ৯ জুলাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও জাতীয় বৃক্ষমেলা-২০২৬ উদ্বোধন করেন। পরিবেশ ও বন সংরক্ষণে সরকারের কার্যক্রম শুধু ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর বাস্তবায়ন ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
সৃষ্টি হবে সাড়ে তিন লাখের বেশি সবুজ কর্মসংস্থান
বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিকে শুধু পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগ হিসেবে নয়, সবুজ অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির বড় সুযোগ হিসেবেও দেখছে সরকার।
মন্ত্রী জানান, এ কর্মসূচির মাধ্যমে ৩ দশমিক ৫ লাখের বেশি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে যুবসমাজ, নারী এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
পাশাপাশি সারাদেশে ১০ হাজার নতুন নার্সারি উদ্যোক্তা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে প্রায় ২ দশমিক ৫ লাখ মানুষের নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
এক মাসে বিক্রি ১৬ লাখ চারা, মূল্য প্রায় ১৬ কোটি টাকা
এবারের জাতীয় বৃক্ষমেলায় মানুষের অংশগ্রহণ ও চারা বিক্রির পরিসংখ্যানও ছিল উল্লেখযোগ্য।
মন্ত্রী জানান, মেলায় মোট ৭৪টি নার্সারি অংশ নেয়। মাসব্যাপী আয়োজনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা প্রায় ১৬ লাখ গাছের চারা কিনেছেন, যার মোট বিক্রয়মূল্য প্রায় ১৬ কোটি টাকা।
পরিবেশমন্ত্রীর মতে, বিপুলসংখ্যক চারা বিক্রি এবং এ খাতে আর্থিক লেনদেন বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের পরিবেশ সচেতনতার পাশাপাশি বাংলাদেশের নার্সারি শিল্প ও বৃক্ষভিত্তিক অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান সম্ভাবনা ফুটে উঠেছে।
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, তরুণ সমাজ এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ দেশের সবুজ অর্থনীতি গড়ে তোলার শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

‘শুধু গাছ লাগালেই হবে না, বাঁচিয়ে রাখতে হবে’
মেলা থেকে সংগ্রহ করা চারার যথাযথ রোপণ ও পরিচর্যার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে মন্ত্রী বলেন, “শুধু গাছ লাগালেই হবে না, গাছের বেঁচে থাকা নিশ্চিত করতে হবে।”
প্রতিটি রোপিত চারাকে নিয়মিত পানি দেওয়া, প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদে পরিচর্যা করার আহ্বান জানান তিনি।
মন্ত্রী বলেন, জাতীয় বৃক্ষমেলা শেষ হওয়া মানে বৃক্ষরোপণের কার্যক্রম শেষ হওয়া নয়। বরং মেলা থেকে মানুষের হাতে পৌঁছে যাওয়া লাখ লাখ চারাকে সুস্থ গাছে পরিণত করার মধ্য দিয়েই এ আয়োজনের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে।
ভবিষ্যতে বাড়বে বৃক্ষরোপণ পুরস্কারের সংখ্যা
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রধান বন সংরক্ষক মোঃ আমীর হোসেন চৌধুরী। তিনি বলেন, বৃক্ষরোপণে আরও বেশি মানুষকে সম্পৃক্ত ও উৎসাহিত করতে ভবিষ্যতে পুরস্কারের সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বর্তমান প্রজন্ম, বিশেষ করে শিশু-কিশোর ও তরুণদের গাছ এবং প্রকৃতির সঙ্গে আরও বেশি সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জলবায়ু ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী রওনাকুল ইসলাম (টিপু)।
পুরস্কার ও সনদ প্রদান

সমাপনী অনুষ্ঠানে বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার-২০২৫-এর দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অর্জনকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সম্মাননা দেওয়া হয়।
এ ছাড়া বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে বিশেষ অবদান রাখা ব্যক্তি, জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত রচনা, চিত্রাঙ্কন ও গাছ চেনা প্রতিযোগিতার বিজয়ী এবং জাতীয় বৃক্ষমেলা-২০২৬-এর নির্বাচিত স্টলমালিকদের হাতে পুরস্কার ও সনদ তুলে দেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানে বন অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট দপ্তর-সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারী, নার্সারি ও স্টল মালিক, পরিবেশ ও বন খাতের অংশীজন, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
জাতীয় বৃক্ষমেলা-২০২৬ শেষ হলেও এর মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বার্তা এখন বাস্তবায়নের পালা। মেলায় বিক্রি হওয়া ১৬ লাখ চারাসহ সারাদেশে রোপিত প্রতিটি গাছের বেঁচে থাকা নিশ্চিত করা গেলে বৃক্ষরোপণ অভিযান শুধু সংখ্যার সাফল্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা হয়ে উঠতে পারে জলবায়ু সহনশীল, সবুজ ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ার দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।






















