RRP
agriculture news24.com
Health Care
Agriculture News
diamond egg
renata-ltd.com
Space for Add
Agriculture News
Spech for Promotion
avonah
Monday , 7 September 2026 |
  1. অন্যান্য
  2. অন্যান্য
  3. ইউটিউব
  4. উদ্যোক্তা
  5. উপন্যাশ
  6. এ্যাসিভমেন্ট
  7. ঔষধ
  8. কবিতা
  9. কীটনাশক
  10. কৃষি ব্যক্তিত্ব
  11. কৃষি সংবাদ
  12. কৃষি সেক্টরের নিদের্শনা
  13. কৌতুক
  14. খাবার
  15. খামার পদ্ধতি

বাংলাদেশে জাম্বু ঘাস চাষ: পরিচিতি, ইতিহাস, চাষপদ্ধতি, রোগবালাই ও নিরাপদ ব্যবহারের পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা।।

প্রতিবেদক
Dr. Bayezid Moral
September 6, 2026 6:21 pm

বাংলাদেশে জাম্বু ঘাস চাষ: পরিচিতি, ইতিহাস, চাষপদ্ধতি, রোগবালাই ও নিরাপদ ব্যবহারের পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা।।

ড. বায়েজিদ মোড়লের গবেষণাধর্মী প্রতিবেদন।।

বাংলাদেশে গবাদিপশুর খামার সম্প্রসারণের সঙ্গে সারা বছর পর্যাপ্ত সবুজ ঘাসের চাহিদা বাড়ছে। এ কারণে নেপিয়ার, পাকচং, জার্মান, পারা, ভুট্টা ও জোয়ারজাতীয় ঘাসের পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে খামারিদের মধ্যে ‘জাম্বু’ বা ‘জাম্বো ঘাস’ পরিচিতি পেয়েছে। দ্রুত বৃদ্ধি, তুলনামূলকভাবে কম সময়ে কাটার উপযোগিতা এবং ভালো সবুজ জৈবভর উৎপাদনের কারণে এটি বিশেষভাবে দুগ্ধ ও গরু মোটাতাজাকরণ খামারিদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বাংলাদেশে ‘জাম্বু ঘাস’ নামে বিক্রি হওয়া সব বীজ একই জাতের নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি জোয়ার, সুদান ঘাস অথবা জোয়ার–সুদান ঘাসের সংকরজাতীয় পশুখাদ্য ফসল। তাই শুধু স্থানীয় নাম শুনে বীজ না কিনে জাতের বৈজ্ঞানিক পরিচয়, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, অঙ্কুরোদ্‌গম হার এবং বিষাক্ততার ঝুঁকি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

জাম্বু ঘাসের পরিচয়

জাম্বু বা জাম্বো ঘাস সাধারণত বীজ থেকে জন্মানো দ্রুতবর্ধনশীল জোয়ারজাতীয় পশুখাদ্য ফসল। এর সম্ভাব্য উদ্ভিদতাত্ত্বিক পরিচয় Sorghum bicolor, Sorghum sudanense অথবা এদের সংকর—Sorghum bicolor × Sorghum sudanense

এটি নেপিয়ার ঘাসের মতো কাটিং থেকে নয়, সাধারণত বীজ থেকে চাষ করা হয়। জাতভেদে একবার অথবা একাধিকবার কাটা যায়। কিছু হাইব্রিডে পুনরায় কুশি গজানোর ক্ষমতা ভালো হলেও সব ‘জাম্বু’ বীজ বহুবার কাটার উপযোগী নয়।

বাংলাদেশের বাজারে ‘জাম্বু’, ‘জাম্বো’, ‘হাইব্রিড জাম্বু’ কিংবা ‘সুপার জাম্বু’ নামে বিভিন্ন বীজ পাওয়া যায়। এসব নাম অনেক ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক নাম; স্বতন্ত্রভাবে অনুমোদিত একটি নির্দিষ্ট জাতের নাম নাও হতে পারে।

বাংলাদেশে জাম্বু ঘাস চাষের ইতিহাস

জোয়ার বাংলাদেশের পরিচিত শস্য হলেও জোয়ার–সুদান সংকরকে ‘জাম্বু ঘাস’ নামে বাণিজ্যিকভাবে চাষ করার ইতিহাস তুলনামূলকভাবে নতুন। দেশে ঠিক কোন সালে, কোন প্রতিষ্ঠান বা কোন ব্যক্তি প্রথম এই নামে বীজ এনেছেন—এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য সরকারি নথি বা গবেষণাপত্র সহজলভ্য নয়।

প্রাপ্ত তথ্য ও খামার পর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে ধারণা করা যায়, বেসরকারি বীজ আমদানিকারক, পশুখাদ্য ব্যবসায়ী এবং প্রগতিশীল দুগ্ধখামারিদের মাধ্যমে ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে জোয়ারজাতীয় হাইব্রিড বীজ বাংলাদেশে আসে। পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইউটিউব ও খামারি পর্যায়ের প্রদর্শনীর মাধ্যমে ‘জাম্বু ঘাস’ নামটি ছড়িয়ে পড়ে।

অতএব, এর ইতিহাস লেখার ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দাবিকে যাচাই ছাড়া প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস হিসেবে উল্লেখ করা ঠিক হবে না। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং জাতীয় বীজ বোর্ডের মাধ্যমে জাতটির পরিচয় ও দেশে প্রবেশের ইতিহাস নথিভুক্ত করা প্রয়োজন।

প্রধান বৈশিষ্ট্য

জাম্বু ঘাসের বৈশিষ্ট্য জাত, মাটি, মৌসুম ও পরিচর্যার ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়। সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো হলো—

  • দ্রুত অঙ্কুরোদ্‌গম ও বৃদ্ধি;
  • গাছ লম্বা, সোজা এবং পাতা তুলনামূলক চওড়া;
  • কাণ্ড রসাল ও কিছু জাতের কাণ্ডে মিষ্টতা থাকে;
  • উষ্ণ আবহাওয়া ও রোদে ভালো জন্মে;
  • প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সাময়িক খরা তুলনামূলক ভালো সহ্য করে;
  • অতিরিক্ত জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না;
  • জাতভেদে পুনরায় কুশি গজিয়ে একাধিকবার ফসল দিতে পারে;
  • সবুজ ঘাস, কুচি করে খাওয়ানো, হে ও সাইলেজ—বিভিন্নভাবে ব্যবহারযোগ্য;
  • পরিণত হওয়ার সঙ্গে কাণ্ড শক্ত এবং আঁশের পরিমাণ বেশি হয়;
  • খুব অল্প বয়সে কাটলে ফলন কমে এবং সায়ানাইডজনিত ঝুঁকি বাড়তে পারে।

পুষ্টিমান সম্পর্কে সতর্কতা

জাম্বু ঘাসের পুষ্টিমান নির্দিষ্ট কোনো একক সংখ্যা নয়। গাছের জাত, বয়স, পাতার অনুপাত, সার প্রয়োগ, পানি, কাটার সময় এবং পরীক্ষায় fresh basis না dry matter basis ব্যবহার করা হয়েছে—এসবের ওপর ফলাফল নির্ভর করে।

অল্প বয়সে সাধারণত আমিষের অনুপাত তুলনামূলক বেশি থাকে, কিন্তু তখন ফলন ও নিরাপত্তা দুটোই বিবেচনা করতে হয়। বেশি বয়সে কাটলে মোট জৈবভর বাড়লেও কাণ্ড শক্ত হয়, আঁশ ও লিগনিন বাড়ে এবং হজমযোগ্যতা কমতে পারে। কেউ যদি ১৮–২৫ শতাংশ প্রোটিন বা অত্যন্ত বেশি ফলনের দাবি করেন, তাহলে তাঁর কাছে জানতে হবে—

  • নমুনা কত দিনের গাছ থেকে নেওয়া হয়েছে?
  • ফলাফল fresh basis, না dry matter basis?
  • কোন পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হয়েছে?
  • এক কাটার ফলন, না সারা বছরের মোট ফলন?
  • পরীক্ষিত জাতটির সঠিক নাম কী?

ল্যাবরেটরি প্রতিবেদন ছাড়া কোনো বিক্রেতার প্রচারণামূলক সংখ্যাকে নিশ্চিত পুষ্টিমান হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়।

উপযোগী মাটি ও জমি নির্বাচন

উঁচু ও মাঝারি উঁচু, পানি নিষ্কাশনযোগ্য দোআঁশ বা বেলে দোআঁশ মাটি জাম্বু ঘাসের জন্য উপযোগী। মাটিতে জৈব পদার্থ থাকলে বৃদ্ধি ভালো হয়। ভারী কাদামাটিতেও চাষ সম্ভব, তবে পানি জমতে দেওয়া যাবে না। জমিতে প্রতিদিন পর্যাপ্ত সূর্যালোক থাকা প্রয়োজন। বড় গাছ বা ভবনের দীর্ঘ ছায়ায় গাছ দুর্বল ও পাতলা হতে পারে। জমির pH এবং পুষ্টিমান জানতে সম্ভব হলে চাষের আগে মাটি পরীক্ষা করা উচিত।

জমি প্রস্তুতি

জমি ৩–৪ বার চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করতে হবে। আগের ফসলের গোড়া, বহুবর্ষজীবী আগাছা এবং জমে থাকা আবর্জনা সরিয়ে ফেলতে হবে। শেষ চাষের সময় ভালোভাবে পচানো গোবর বা কম্পোস্ট মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া ভালো।

পানি জমার আশঙ্কা থাকলে উঁচু বেড বা নালা তৈরি করতে হবে। ভারী বৃষ্টির এলাকায় নিষ্কাশন নালাই ফসল রক্ষার অন্যতম প্রধান ব্যবস্থা।

বপনের সময়

বাংলাদেশে উষ্ণ আবহাওয়ায় জাম্বু ঘাস ভালো জন্মে। সেচসুবিধা থাকলে বসন্ত থেকে বর্ষার প্রথম ভাগ পর্যন্ত বপন করা যায়। সাধারণভাবে—

  • ফেব্রুয়ারি–এপ্রিল: সেচনির্ভর চাষের উপযোগী;
  • এপ্রিল–জুন: প্রাক্‌-বর্ষা ও বর্ষার শুরুতে ভালো সময়;
  • অতিবৃষ্টির সময়ে: নিষ্কাশন নিশ্চিত না হলে বপন ঝুঁকিপূর্ণ;
  • শীতকালে: অঙ্কুরোদ্‌গম ও বৃদ্ধি ধীর হতে পারে।

স্থানীয় তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত এবং জমির অবস্থার ভিত্তিতে সময় নির্বাচন করতে হবে।

বীজ নির্বাচন ও বপনপদ্ধতি

বিশ্বস্ত ও নিবন্ধিত বিক্রেতার কাছ থেকে মোড়কজাত বীজ কিনতে হবে। মোড়কে জাতের নাম, লট নম্বর, উৎপাদন ও মেয়াদ, অঙ্কুরোদ্‌গম হার এবং আমদানিকারক বা উৎপাদনকারীর পরিচয় দেখা জরুরি।

বীজের আকার ও জাতভেদে প্রয়োজনীয় বীজের পরিমাণ পরিবর্তিত হয়। সারি করে চাষে সাধারণত কম এবং ছিটিয়ে বপনে বেশি বীজ প্রয়োজন হয়। তাই মোড়কের নির্দেশনা বা স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সাধারণভাবে—

  • সারি থেকে সারির দূরত্ব প্রায় ২৫–৪০ সেন্টিমিটার রাখা যায়;
  • বীজ ২–৪ সেন্টিমিটার গভীরে বপন করা ভালো;
  • অতিরিক্ত গভীরে দিলে অঙ্কুরোদ্‌গম কমতে পারে;
  • অঙ্কুরোদ্‌গম পরীক্ষার পর বীজের হার নির্ধারণ করা উচিত;
  • বীজ বপনের পরে হালকা মই দিয়ে মাটি সমান করতে হবে।

সার ব্যবস্থাপনা

সার প্রয়োগের নির্দিষ্ট মাত্রা মাটির পরীক্ষার ভিত্তিতে নির্ধারণ করাই উত্তম। সাধারণত জমি তৈরির সময় পচা গোবর বা কম্পোস্ট, ফসফরাস, পটাশ, সালফার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য পুষ্টি উপাদান দেওয়া হয়। নাইট্রোজেন সার ভাগ করে প্রয়োগ করলে দ্রুত বৃদ্ধি ও পুনরায় কুশি গজাতে সহায়তা করে। তবে অতিরিক্ত ইউরিয়া প্রয়োগ বিপজ্জনক হতে পারে। এতে—

  • গাছ নরম হয়ে হেলে পড়তে পারে;
  • রোগ ও পোকার আক্রমণ বাড়তে পারে;
  • নাইট্রেট জমার ঝুঁকি বাড়ে;
  • জোয়ারজাতীয় ঘাসে সায়ানাইডজনিত ঝুঁকিও প্রভাবিত হতে পারে।

প্রতিবার কাটার পর সেচ দিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী নাইট্রোজেন ও পটাশের অংশ প্রয়োগ করা যায়। কিন্তু মাত্রা নির্ধারণে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বা মৃত্তিকা পরীক্ষাগারের সুপারিশ অনুসরণ করা উচিত।

সেচ ও পানি নিষ্কাশন

বপনের সময় মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা না থাকলে হালকা সেচ দিতে হবে। অঙ্কুরোদ্‌গমের পর জমির অবস্থা ও আবহাওয়া দেখে সেচ দিতে হবে। বেলে মাটিতে ঘন এবং ভারী মাটিতে তুলনামূলক দীর্ঘ বিরতিতে সেচ প্রয়োজন হতে পারে। জলাবদ্ধতায় শিকড়ের শ্বাসপ্রশ্বাস ব্যাহত হয়, বৃদ্ধি কমে এবং গোড়া পচার ঝুঁকি বাড়ে। বর্ষায় জমিতে পানি জমলে দ্রুত নালা দিয়ে বের করে দিতে হবে।

আগাছা নিয়ন্ত্রণ

বপনের প্রথম তিন থেকে চার সপ্তাহ আগাছার প্রতিযোগিতা সবচেয়ে বেশি হয়। এ সময় এক বা দুইবার নিড়ানি দিলে ফসল দ্রুত জমি ঢেকে ফেলতে পারে। গাছ কিছুটা বড় হওয়ার পরে ঘন পাতার ছায়ায় আগাছা স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়।

ঘাস সরাসরি পশুকে খাওয়ানো হয় বলে আগাছানাশক ব্যবহারে বিশেষ সতর্কতা দরকার। অনুমোদিত ওষুধ হলেও নির্ধারিত অপেক্ষাকাল শেষ হওয়ার আগে ঘাস কাটা যাবে না।

কাটার সঠিক সময় ও পদ্ধতি

জাতভেদে বপনের প্রায় ৫০–৭০ দিনের মধ্যে প্রথম কাটার উপযোগী হতে পারে। দিন গণনার পাশাপাশি গাছের উচ্চতা, পরিপক্বতা এবং বিষাক্ততার ঝুঁকি বিবেচনা করতে হবে। অত্যন্ত কচি অবস্থায় কাটা বা সরাসরি চরানো নিরাপদ নয়।

মাটি থেকে প্রায় ১০–১৫ সেন্টিমিটার গোড়া রেখে কাটলে পুনরায় কুশি গজাতে সুবিধা হয়। পরবর্তী কাট সাধারণত গাছের পুনর্বৃদ্ধি ও আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে। ফুল বা বীজ আসার অনেক পরে কাটলে—

  • কাণ্ড শক্ত হয়ে যায়;
  • পশুর গ্রহণযোগ্যতা কমে;
  • আঁশ বাড়ে;
  • হজমযোগ্যতা ও খাদ্যমূল্য কমে যেতে পারে।

পশুকে খাওয়ানোর নিয়ম

জাম্বু ঘাস ২–৩ ইঞ্চি করে কুচি করে অন্যান্য ঘাস, খড়, সাইলেজ ও দানাদার খাদ্যের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়ানো ভালো। হঠাৎ করে একমাত্র খাদ্য হিসেবে বেশি পরিমাণ দেওয়া উচিত নয়। নতুন ঘাসের সঙ্গে পশুকে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত করতে হবে।

খালি পেটে ক্ষুধার্ত পশুকে কচি জাম্বু ঘাস দেওয়া বিপজ্জনক। পচা, দুর্গন্ধযুক্ত, ছত্রাকাক্রান্ত বা দীর্ঘ সময় স্তূপ করে রাখা ভেজা ঘাস খাওয়ানো যাবে না। খাদ্যতালিকা তৈরিতে পশুর বয়স, ওজন, দুধ উৎপাদন ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করা প্রয়োজন।

প্রুসিক অ্যাসিড বা সায়ানাইড বিষক্রিয়ার ঝুঁকি

জোয়ার ও জোয়ার–সুদান ঘাসে ‘ধুরিন’ নামের সায়ানোজেনিক যৌগ থাকতে পারে। উদ্ভিদের কোষ ভাঙলে এটি হাইড্রোজেন সায়ানাইড বা প্রুসিক অ্যাসিড তৈরি করতে পারে। এটি পশুর দেহে অক্সিজেন ব্যবহারের ক্ষমতা ব্যাহত করে দ্রুত মৃত্যু ঘটাতে পারে। ঝুঁকি বেশি থাকে—

  • খুব কচি ও কম উচ্চতার গাছে;
  • কাটার পর নতুন কুশিতে;
  • দীর্ঘ খরার পর হঠাৎ গজানো নতুন পাতায়;
  • গাছ কীটনাশক, রোগ বা প্রতিকূল আবহাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হলে;
  • অতিরিক্ত নাইট্রোজেন কিন্তু কম ফসফরাস ও পটাশযুক্ত জমিতে;
  • ঝড়, পায়ের চাপ বা কাটার কারণে কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে।

গাছ অন্তত প্রায় ৪৫–৬০ সেন্টিমিটার বা জাত অনুযায়ী নিরাপদ পরিপক্বতায় না পৌঁছানো পর্যন্ত সরাসরি চরানো উচিত নয়। সন্দেহজনক ঘাস পরীক্ষাগারে HCN ও নাইট্রেট পরীক্ষা ছাড়া খাওয়ানো নিরাপদ নয়।

নাইট্রেট বিষক্রিয়ার ঝুঁকি

খরা, অতিরিক্ত ইউরিয়া, মেঘলা আবহাওয়া, কম আলো, আগাছানাশকের ক্ষতি অথবা বৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি হলে গাছে নাইট্রেট জমতে পারে। প্রুসিক অ্যাসিড শুকানো বা সাইলেজ করার সময় অনেকাংশে কমতে পারে; কিন্তু নাইট্রেট সব ক্ষেত্রে পুরোপুরি নষ্ট হয় না।

নাইট্রেট বিষক্রিয়ায় পশুর দ্রুত শ্বাস, দুর্বলতা, কাঁপুনি, নীলচে বা বাদামি শ্লৈষ্মিক ঝিল্লি, পড়ে যাওয়া এবং মৃত্যু হতে পারে। সন্দেহ হলে সঙ্গে সঙ্গে খাদ্য সরিয়ে দ্রুত নিবন্ধিত ভেটেরিনারি চিকিৎসকের সহায়তা নিতে হবে।

সম্ভাব্য রোগব্যাধি

১. পাতার দাগ ও অ্যানথ্রাকনোজ

পাতায় ছোট লালচে, বাদামি বা কালচে দাগ দেখা যায়। পরে দাগ বড় হয়ে পাতা শুকাতে পারে।

ব্যবস্থাপনা: রোগমুক্ত বীজ, ফসল পর্যায়ক্রম, আক্রান্ত অবশিষ্টাংশ অপসারণ, সুষম সার এবং জমিতে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে।

২. পাতাঝলসানো রোগ

পাতার ওপর লম্বা ধূসর বা বাদামি ক্ষত তৈরি হয়ে ধীরে ধীরে পাতা ঝলসে যায়। উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশে রোগ বাড়তে পারে।

ব্যবস্থাপনা: সহনশীল জাত, পরিষ্কার বীজ, অতিরিক্ত ঘন বপন পরিহার এবং আক্রান্ত অংশ অপসারণ কার্যকর।

৩. মরিচা রোগ

পাতায় ছোট কমলা, লালচে বা বাদামি গুঁড়ার মতো ফুসকুড়ি দেখা যায়। মারাত্মক আক্রমণে সালোকসংশ্লেষণ ও ফলন কমে।

ব্যবস্থাপনা: আগাম শনাক্তকরণ, আক্রান্ত পাতা অপসারণ, ফসল পর্যায়ক্রম ও সুষম পুষ্টি ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।

৪. ডাউনি মিলডিউ

পাতায় হলদে ডোরা, পাতার নিচে সাদা ছত্রাকের আবরণ এবং গাছের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

ব্যবস্থাপনা: আক্রান্ত গাছ তুলে নষ্ট করা, পানি নিষ্কাশন, রোগমুক্ত বীজ এবং একই জমিতে বারবার জোয়ারজাতীয় ফসল না করা।

৫. স্মাট বা শিষের ছত্রাক রোগ

শিষ বা বীজের স্থানে কালো গুঁড়ার মতো ছত্রাক তৈরি হতে পারে। বীজ উৎপাদনের ক্ষেত্রেই এটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যবস্থাপনা: প্রত্যয়িত বীজ, অনুমোদিত বীজ শোধন এবং আক্রান্ত শিষ ছত্রাক ছড়ানোর আগে অপসারণ করতে হবে।

৬. গোড়া ও শিকড় পচা

জলাবদ্ধতা ও দূষিত মাটিতে গোড়া নরম বা কালচে হয়ে গাছ পড়ে যেতে পারে।

ব্যবস্থাপনা: দ্রুত পানি নিষ্কাশন, আক্রান্ত গাছ সরানো, অতিরিক্ত সেচ বন্ধ এবং জমির স্বাস্থ্য উন্নয়ন করতে হবে।

প্রধান ক্ষতিকর পোকা

মাজরা পোকা

কাণ্ডে ছিদ্র করে ভেতরের অংশ খায়। মাঝের পাতা শুকিয়ে ‘ডেড হার্ট’ তৈরি হতে পারে।

শুট ফ্লাই

কচি গাছের মধ্যবর্তী কাণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত করে। সময়মতো বপন, বীজের সঠিক হার এবং আক্রান্ত কুশি নষ্ট করলে ক্ষতি কমে।

জাবপোকা

পাতা ও কাণ্ড থেকে রস শোষণ করে। আঠালো পদার্থ ও কালো ছত্রাক দেখা যেতে পারে। উপকারী পোকা সংরক্ষণ এবং আক্রান্ত অংশ নিয়ন্ত্রণ জরুরি।

আর্মিওয়ার্ম ও পাতা খেকো শুঁয়োপোকা

দ্রুত পাতা খেয়ে ক্ষেত নষ্ট করতে পারে। নিয়মিত ক্ষেত পর্যবেক্ষণ, ডিম ও ছোট শুঁয়োপোকা নষ্ট করা এবং আলোক বা ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার সমন্বিত ব্যবস্থাপনার অংশ হতে পারে।

রোগ ও পোকায় ওষুধ ব্যবহারের নীতি

জাম্বু ঘাস সরাসরি গবাদিপশু খায়। তাই যেকোনো বালাইনাশকের অবশিষ্টাংশ পশুর শরীর, দুধ ও মাংসে প্রবেশ করতে পারে। রোগ নির্ণয় না করে ছত্রাকনাশক এবং পোকা শনাক্ত না করে কীটনাশক প্রয়োগ করা যাবে না।

প্রথমে পরিচ্ছন্ন চাষ, ফসল পর্যায়ক্রম, পানি নিষ্কাশন, সুষম সার, আক্রান্ত গাছ অপসারণ এবং জৈব ও যান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ওষুধ একান্ত প্রয়োজন হলে শুধু সংশ্লিষ্ট ফসল ও বালাইয়ের জন্য বাংলাদেশে অনুমোদিত পণ্য ব্যবহার করতে হবে। লেবেলের মাত্রা, ব্যক্তিগত সুরক্ষা এবং কাটার আগের অপেক্ষাকাল কঠোরভাবে মানতে হবে। স্প্রের তারিখ ও ওষুধের নাম লিখে রাখা এবং ঘাস বিক্রি করলে ক্রেতাকে জানানো জরুরি।

জাম্বু ঘাসের সুবিধা

  • দ্রুত সবুজ খাদ্য সরবরাহ করে;
  • উষ্ণ আবহাওয়ায় ভালো বাড়ে;
  • পানি ব্যবহারে তুলনামূলক দক্ষ;
  • ভালো ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য জৈবভর পাওয়া যায়;
  • কুচি ঘাস, হে ও সাইলেজ হিসেবে ব্যবহারযোগ্য;
  • নেপিয়ার ঘাসের সঙ্গে জমির ফসলবিন্যাসে বৈচিত্র্য আনে;
  • খামারে মৌসুমি খাদ্যঘাটতি কমাতে পারে।

সীমাবদ্ধতা

  • বাজারে জাত ও নাম নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে;
  • বীজনির্ভর হওয়ায় প্রতি মৌসুমে বীজ প্রয়োজন হতে পারে;
  • সব হাইব্রিড থেকে সংগ্রহ করা বীজে মাতৃগুণ বজায় থাকে না;
  • খুব কচি বা চাপগ্রস্ত গাছে প্রুসিক অ্যাসিডের ঝুঁকি রয়েছে;
  • অতিরিক্ত নাইট্রোজেনে নাইট্রেট জমতে পারে;
  • বেশি বয়সে কাণ্ড শক্ত ও হজমযোগ্যতা কম হয়;
  • স্থায়ী জলাবদ্ধ জমির জন্য উপযোগী নয়;
  • বৈজ্ঞানিক যাচাই ছাড়াই ফলন ও প্রোটিন নিয়ে অতিরঞ্জিত প্রচারণা হয়।

ড. বায়েজিদ মোড়লের পরামর্শ

জাম্বু ঘাস সম্ভাবনাময় পশুখাদ্য হলেও শুধু গাছের উচ্চতা বা প্রচারিত ফলন দেখে বড় পরিসরে চাষে যাওয়া ঠিক হবে না। প্রথমে অল্প জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে চাষ করে অঙ্কুরোদ্‌গম, রোগসহনশীলতা, কাটার পর পুনর্বৃদ্ধি, পশুর গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রকৃত ফলন লিখিতভাবে সংরক্ষণ করা উচিত।

বীজের প্যাকেট ও ক্রয় রসিদ রেখে দিতে হবে। জাতের সঠিক পরিচয় না থাকলে বীজ কিনবেন না। ফলন মাপতে অনুমান নয়—নির্দিষ্ট আয়তনের জমির ঘাস ওজন করে একর বা হেক্টরের হিসাব করুন। পুষ্টিমান জানতে স্বীকৃত পরীক্ষাগারে dry matter, crude protein, fibre, ash এবং প্রয়োজন হলে HCN ও nitrate পরীক্ষা করুন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ হলো—কচি, খরাকবলিত, অতিরিক্ত ইউরিয়াপ্রাপ্ত বা নতুন কুশিযুক্ত জোয়ারজাতীয় ঘাস ক্ষুধার্ত পশুকে দেবেন না। কোনো পশুর শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত লালা, কাঁপুনি, টলমল হাঁটা বা হঠাৎ পড়ে যাওয়ার লক্ষণ দেখা দিলে ঘাস সরিয়ে জরুরি ভিত্তিতে ভেটেরিনারি চিকিৎসক ডাকতে হবে। বিষক্রিয়ায় ঘরোয়া চিকিৎসা করতে গিয়ে সময় নষ্ট করা প্রাণঘাতী হতে পারে।

জাম্বু ঘাসকে সম্পূর্ণ খাদ্য মনে না করে সুষম রেশনের একটি উপাদান হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। ঘাসের সঙ্গে প্রয়োজন অনুসারে খড়, সাইলেজ, দানাদার খাদ্য, খনিজ ও পরিষ্কার পানি নিশ্চিত করলেই খামারি এর সর্বোচ্চ সুবিধা পেতে পারেন।

শেষ কথা

জাম্বু ঘাস বাংলাদেশের উষ্ণ আবহাওয়ায় দ্রুত উৎপাদনশীল একটি সম্ভাবনাময় জোয়ারজাতীয় পশুখাদ্য ফসল। তবে নামের বিভ্রান্তি, অজানা জাতের বীজ, অতিরঞ্জিত ফলনের দাবি এবং প্রুসিক অ্যাসিড ও নাইট্রেট বিষক্রিয়ার ঝুঁকি উপেক্ষা করা যাবে না। প্রত্যয়িত বীজ, মাটি পরীক্ষা, সুষম সার, সঠিক বয়সে কাটাই এবং নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এটি খামারের সবুজ খাদ্যঘাটতি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে প্রচলিত ‘জাম্বু’ বীজগুলোর জাত শনাক্তকরণ, ফলন, পুষ্টিমান ও নিরাপত্তা নিয়ে সরকারি গবেষণা অত্যন্ত প্রয়োজন।

তথ্যসূত্র

সর্বশেষ - ছাগল পালন

আপনার জন্য নির্বাচিত

পোল্ট্রি মুরগীর উৎপাদন ব্যয় সাশ্রয় করতে অ্যাভন অ্যানিমেল হেলথ-ভারসা মাল্টিটেক নতুন সমাধান তুলে ধরে

সমুদ্রে আমাদের সম্পদ এখনো অজানা

বাংলাদেশ থেকে কৃষিপণ্যের রপ্তানি প্রসারে হর্টেক্স ফাউন্ডেশন এর ৫(পাঁচ) বছর মেয়াদী কৌশল

জাপান–বাংলাদেশ সহযোগিতায় কার্বন মার্কেট প্রস্তুতি ত্বরান্বিত হবে

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নদী ও সমুদ্রে অক্সিজেন কমে যাচ্ছে, লবণাক্ততা বেড়ে যাচ্ছে

পোল্ট্রির বাজার ব্যবস্থায় সঠিক চর্চা না আনলে প্রান্তিক ডিম মুরগী উৎপাদন ব্যবস্থা টিকবে না।।

পৃথিবীতে উটের ইতিহাস

UMS কি ইউরিয়া মোলাসেস স্ট্র? ইউএমএস তৈরীর পদ্ধতি

দেশীয় এলএসডি ভ্যাকসিনে সুরক্ষিত হবে গবাদিপশু, কমবে খামারিদের ক্ষতি: মন্ত্রী

দেশের সব মানুষের কাছে পুষ্টিকর, সুস্বাদু ও সুদৃশ্য ইলিশ পৌঁছানো সরকারের লক্ষ্য -মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী