প্রধান প্রধান ফসলের চাষাবাদ পদ্ধতি
দানা জাতীয় শস্যঃ ধান

ভূমিকাঃ
দানা ফসলগুলোর মধ্যে ধান অন্যতম। বিশ্বজনসংখ্যার প্রায অর্ধেকই খাদ্য হিসাবে চাল ব্যবহার করে। বাংলাদেশে বছরে উৎপাদিত দানা ফসলের ৯০ শতাংশ আসে একমাত্র ধান থেকে। বিভিন্ন প্রকার ধান ফসলের মধ্যে রোপা আমনের জমি সবচেয়ে বেশি। কিন্তু ফলনের বিবেচনায় বোরো ধান শীর্ষে। জমির পরিমাণ বিবেচনায় আমনের পরই আউশের স্থান। মোট আবাদি জমির ৮০ শতাংশে ধান চাষ হয়। জাতীয় গড় ফলন ১.৫ টন/হে.।
বাংলাদেশের জলবায়ু ও মাটিতে ধান উত্তমরূপে অভিযোজিত। তাছাড়া, আলো-নিরপেক্ষ জাত উদ্ভাবিত হওয়ায় ৩টি ঋতুতে ধান আবাদ করা সম্ভব। ধান কেবল মানুষের জন্যই নয় বরং এ থেকে উপদ্রব্য হিসাবে প্রাপ্ত খড় গো-মহিষের প্রধান রাফেজ খাদ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া খুদ, তুষ, কুঁড়া, হাঁস-মুরগি ও গো-খাদ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয়। দানা শস্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশী কার্বোহাইড্রেট চাউলে পাওয়া যায়। তাছাড়া এতে প্রোটিন, ফ্যাট, ভিটামিন এবং আয়রনও কিছু কিছু বিদ্যমান।
শ্রেণীকরুণঃ
বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ধানের শ্রেণীকরণ করা যেতে পারে। যেমন-
আবাদের মৌসুম হিসাবেঃ
ক) আউশ (অঁং) ধান: আউশ ধান স্বল্পমেয়াদী এবং আলোনিরপেক্ষ ফসল। তাই বছরের যেকোন সময়ে এই ধান উৎপাদন করা সম্ভব। তবে মার্চ-এপ্রিলে এই ধান বপন করা হয়। আবাদের পদ্ধতি হিসেবে আউশ ধান ২ রকমের। যথা-
ক্স বোনা (ইৎড়ধফ পধংঃ) আউশ: মাঠে সরাসরি বীজ বপন করে আবাদ করা হয়। মূলতঃ বৃষ্টির উপর নির্ভর করে আবাদ করা হয় বিধায় একে বৃষ্টিনির্ভর (জধরহভবফ) আউশও বলে।
ক্স রোপা (ঞৎধহংঢ়ষধহঃ) আউশ: প্রথমে বীজতলায় চারা উৎপাদন এবং পরে কাদাময় মাঠে রোপণ করে আবাদ করা হয়।
খ) আমন (অসধহ) ধান ঃ দীর্ঘমেয়াদী; সাধারণতঃ আলোস্পর্শকাতর তথা খাটো দিবসের ফসল। মধ্য জুলাই থেকে আগষ্টের প্রথম সপ্তাহে ধান রোপণ করা হয়। আবাদের পদ্ধতি অনুসারে আমন ধান ২ রকমের যথা-
ক্স বোনা আমনঃ মাঠে সরাসরি বীজ বপন করা হয়। গভীর পানিতে ডুবে থাকা জমিতে এ ধান হয় বিধায় একে গভীর পানির ধান (উববঢ় ধিঃবৎ ৎরপব) বলে।
ক্স রোপা আমন: প্রথমে বীজতলায় চারা উৎপাদন করে পরে মাঠে রোপণ করা হয়।
গ) বোরো (ইড়ৎড়) ধানঃ সব সময়ই চারা রোপণ করে আবাদ করা হয়। ধানের মৌসুম নভেম্বর থেকে মে পর্যন্ত বি¯তৃত।
আলোস্পর্শকাতরতা অনুসারে:
১. আলোনিরপেক্ষ ধান: ফুল উৎপাদনে এরা দিনের দৈর্ঘের দ্বারা প্রভাবিত নয়। এদেরকে চবৎরড়ফরপধষষু ভরীবফ ৎরপব াধৎরবঃু বলে। ধানের অধিকাংশ জাত এ ধরনের।
২. খাটো-দিবসী ধান: ফুল উৎপাদনে এরা খাটো দিবসের উপর নির্ভরশীল। এ ধরনের অধিকাংশ জাতে এ দেশে নভেম্বরের শেষে ফুল আসে। তাই এদেরকে ঞরসবষু ভরীবফ ৎরপব াধৎরবঃু বলে।
ধান চাষ পদ্ধতি:
চারা তৈরি: চারা তৈরির জন্য রোগমুক্ত, পরিপুষ্ট, পরিস্কার বীজ ব্যবহার করা উচিত।
বীজ বাছাই:
পরিস্কার পানির মধ্যে বীজ ছেড়ে দিয়ে নাড়াচাড়া করার পর কিছুক্ষণ রেখে দিলে অপরিপুষ্ট হালকা, রোগা-ভাঙ্গা বীজ ভেসে উঠবে। হাত অথবা চালুনি দিয়ে ভাসমান বীজগুলো পৃথক করে নিতে হবে। ভারী বীজগুলো নীচ থেকে তুলে নিয়ে রৌদ্রে শুকিয়ে নিতে হবে। অথবা এভাবে বাছাইকৃত বীজ জাগ দিয়ে মুখ ফুটিয়ে (অঙ্কুরিত) বীজতলায় বুনতে হবে। তাছাড়া, কুলা দিয়ে খুব ভালভাবে ঝেড়ে নিয়েও পরিপুষ্ট বীজ পৃথক করা যায়।
বীজতলা তৈরিঃ
সাধারণতঃ বোরো মৌসুমে ভেজা কাদাময় তৈরি করা হয়। আউশ ও আমন মৌসুমে ভেজা-কাদাময় ও শুকনো উভয় প্রকার বীজতলাই তৈরি করা হয়। বাংলাদেশের যেসব এলাকায় জমি উঁচু এবং মাটি বেলে দো-আঁশ সেখানে সাধারণতঃ শুকনো বীজতলা তৈরি করা হয়। অপরদিকে ভারী, এঁটেল কাঁদা মাটিতে প্রধানতঃ ভেজা বা কাদাময় বীজতলা তৈরি করা হয়ে থাকে। পানিতে ডুবে না যায় বা গাছের ছায়া না পড়ে এরূপ জায়গা বীজতলার জন্য বেছে নেওয়া দরকার।
শুকনো বীজতলাঃ
উপযুক্ত আর্দ্রতায় মাটিকে ৫-৬ বার চাষ ও মই দিয়ে একেবারে ঝুরঝুরে করার পর সমান করতে হবে। চারা গাছের পরবর্তী পরিচর্যা ও বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য এক বা সোয়া মিটার চওড়া যে কোন দৈর্ঘ্যের বীজতলা তৈরি করা যায়। বীজতলার দু’পাশ থেকে মাটি তুলে বীজতলায় দিলে পানি নিষ্কাশনের জন্য ৪০-৫০ সে.মি. প্রশস্ত নালা তৈরি হবে। বীজতলার মাটি ভালভাবে সমান করার পর শুকনো বীজ সমানভাবে বীজতলায় ছিটিয়ে বুনে উপরের মাটি নাড়াচাড়া করে বীজগুলো মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে, যাতে করে বীজগুলো আড়াই থেকে চার সে.মি. (এক থেকে দেড় ইঞ্চি) মাটির নীচে চলে যায়। ধুলামাটির হালকা আস্তরণ দিয়েও বীজগুলো ঢেকে দেওয়া যায়।
ভেজা কাদাময় বীজতলাঃ
বীজতলার জমিতে প্রয়োজনমত পানি দিয়ে, দু’তিনটি চাষ ও মই দিয়ে অন্ততঃ ৭-১০ দিন পর্যন্ত জমিতে পানি আটকে রাখা দরকার। এর ফলে জমির আগাছা, খড় ইত্যাদি পচে মাটির সঙ্গে মিশে সারের কাজ করে। তারপর জমিকে চাষ আর মই দিয়ে সোয়া এক মিটার চওড়া এবং আধা মিটার ফাঁকা রেখে শুকনো বীজতলার মত লম্বা খন্ড করে বীজতলা তৈরি করতে হবে। ফাঁকা রাখা আধা মিটার জায়গা থেকে ১০ সে.মি. পরিমাণ মাটি তুলে দু’ধারের বীজতলায় দিতে হবে। এতে দুই বীজতলার মধ্যে প্রশস্ত নালা দিয়ে সেচ বা পানি নিষ্কাশন করা ছাড়াও বিভিন্ন প্রকার পরির্চযা করা সহজ হবে। এর পর বীজতলার উপরের কাদামাটি বাঁশের চট বা কাঠের লাঠি দ্বারা সমান করতে হবে।
ভাসমান বীজতলাঃ
বন্যাকবলিত এলাকায় যদি বীজতলা করার মতো জায়গা না থাকে এবং বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর চারা তৈরির প্রয়োজনীয় সময় না পাওয়া যায়, তাহলে বন্যার পানি, পুকুর, ডোবা বা খারের পানির উপর বাঁশের চাটাই এর মাচা বা কলার ভেলা তৈরি করে তার উপর ২-৩ সে.মি. পরিমাণ পাতলা কাদার প্রলেপ দিয়ে ভেজা বীজতলার মত বীজতলা তৈরি করা যায়। বন্যার পানিতে যেন ভেসে না যায় তার জন্য এ বীজতলাকে দড়ির সাহায্যে পাড়ের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা দরকার।
দাপোগ বীজতলাঃ
বন্যাকবলিত এলাকার জন্য আরেক ধরনের বীজতলা করা যায়। বাড়ীর উঠান বা যে কোন শকনো জায়গায় অথবা কাদাময় সমতল জমিতে কাঠ, ইট অথবা কলাগাছেল বাকল দিয়ে চৌকোনা ঘরের মত করতে হবে। বীজতলার নীচে কলাপাতা বা পলিথিন বিছিয়ে তার মধ্যে অংকুরিত বীজ বুনতে হবে। এ বীজতলার মাটি থেকে চারাগাছ কোনরূপ খাদ্য বা পানি গ্রহণ করতে পারে না বলে বীজতলার বিশেষ যতœ নিতে হয় এবং মাত্র দু’সপ্তাহে পরই চারা রোপণ করা দরকার।
বীজতলায় বীজ বপন:
কমপক্ষে শতকরা ৮০টি বীজ গজায় এ রকম পুষ্ট ও পরিস্কার বীজ ২৪ ঘন্টা পানিতে ডুবিয়ে রেখে ঘরের এক কোনায় বস্তাবন্দী অবস্থায় অথবা বড় মাটির পাত্রে বা ড্রামে জাগ দিয়ে রাখলে ধানের মুখ ফেটে অঙ্কুর বের হয়ে আসবে। এ অঙ্কুর বের হয়ে বোনার উপযুক্ত হতে আউশ ও আমন মৌসুমে প্রায় ৪৮ ঘন্টা এবং বোরো মৌসুমে ৭২ ঘন্টা সময় লাগবে। এরূপ অঙ্কুরিত চারা কেবলমাত্র ভেজা কাদাময়, ভাসমান ও দাপোগ বীজ তলায় বপন করা হয়। শুকনো বীজ তলায় বোনার জন্য বীজ জাগ দেওয়ার প্রয়োজন নাই। প্রতি বর্গমিটারে ৮০ গ্রাম অর্থাৎ ১ একরে ৩২ কেজি বোনা দরকার। যদি বীজতলার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা না থাকে, তবে জাগ ছাড়া অন্যান্য বীজতলার জন্য এ বীজের পরিমাণ বাড়িয়ে প্রতি বর্গমিটারে ১০০ গ্রাম (১ একর ৪০ কেজি) করা যেতে পারে। বীজ ফেললে কাগদার ভিতরে বীজ ডুবে যায় এমন অবস্থায় বীজ ফেলা ঠিক নয়। বীজতলার মাটি কাদা এমন হবে যেন বীজ ফেললে বীজের পিঠ কাদার উপরে ভেসে থাকে।
বীজতলার যতœ:
সুস্থ সবল চারা তৈরি করতে হলে বীজতলায় বীজ বপনের পর বিশেষ যতœ নেওয়া দরকার। ভেজা বীজতলায় সব সময় পানি রাখা দরকার এবং দাপোগ বীজতলায় প্রতিদিন ঝর্নার সাহায্যে পানি ছিটিয়ে একখন্ড তক্তা দিয়ে বীজগুলো সমানভাবে চেপে দিতে হবে। বোরো মৌসুমে শীতের জন্য চারার বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। এ কারণে বীজতলা পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা যেতে পারে কিংবা বীজতলায় বেশী পানি রাখতে হবে। বীজতলার আকার বড় হলে পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা ব্যয়বহুল হবে বা পানির উৎস কাছাকাছি না থাকলে পানি দেওয়া সম্ভব হবে না। সেক্ষেত্রে প্রতিদিন খুব সকালে নলাকার বাঁশ দিয়ে গাছে জমাকৃত কুয়াশা ফেলে দিতে হবে। এতে চারার বৃদ্ধি ভল হয়। এছাড়া তরল সার প্রয়োগের মাধ্যমেও শীত মৌসুমে চারার বৃদ্ধি সহ গুণগত মানের চারা তৈরি করা যেতে পারে।
সেচ:
বীজ বপনের তিন চার দিন পর থেকে চারা গজানো পর্যন্ত সেচের পানি দ্বারা নালা ভরতি করে রাখতে হবে। এর মধ্যে বীজতলা শুকিয়ে গেলে চারার শিকড় বেশী বড় হয়ে যায়। এ ধরনের চারা তুলতে বেশ কষ্ট হয়।
পানি নিষ্কাশন :
জমিতে আটকে থাকা পানি অনেক সময়ে চারা বৃদ্ধি কমিয়ে দেয় এবং চারা দুর্বল পড়ে। তাই মাঝে মাঝে পানি বের করে নতুন পানি দিলে দুর্বল চারা সবল হয়।
আগাছা- পোকা-মাকড় ও রোগ দমন:
বীজতলাতে আগাছা, পোকা-মাকড় ও রোগ বালাই দেখা দিলে দমন করা প্রয়োজন। বীজতলা ঠিকভাবে তৈরি করা হলে আগাছার প্রকোপ হয় না। পোকার আক্রমণও মন হয়। কখনও কখনও চার ধ্বসা রোগ হয়ে থাকে, এটা ছত্রাক রোগ। এ রোগ বীজতলায় পানি থাকা অবস্থায় এবং শুকনা অবস্থায়ও হতে পারে। এক্ষেত্রে এ রোগদমনের জন্য, শুকনা অবস্থায় যদি হয় তবে বীজতলা পানিতে ভরে দিতে হবে এবং পানি থাকা অবস্থায় হলে বীজতলা শুকিয়ে দিতে হবে।
সার প্রয়োগ:
উর্বর ও মাঝারি জমিতে বীজতলা তৈরি করতে কোনরূপ সার প্রয়োগের প্রয়োজন হয় না। অনুর্বর বা অল্প উর্বর জমিতে কেবলমাত্র প্রতি বর্গ মিটারে দু’কেজি গোবর বা পচা আবর্জনা সার প্রয়োগ করলে চলে।
চারা উঠানো:
চারা উঠানোর আগে বীজতলাতে বেশী করে পানি দিতে হবে যেন বীজতলায় মাটি ভিজে একেবারে নরম হয়ে যায়। বেশ যতœ সহকারে বীজতলা থেকে চারা উঠানো দরকার, যাতে চারা গাছের কান্ড ভেঙ্গে না যায়।
চারা পরিবহণ:
অনেক সময় দেখা যায়, বন্যা বা অন্য কোন কারণে এক এলাকায় চারার অভাব হলে অন্য এলাকা থেকে চারা এনে ঘাটতি পূরণ করা হয়। এক্ষেত্রে বস্তাবন্দি অবস্থায় বা আঁটি বেঁধে চারা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বহন করা হয়। লক্ষ্য রাখতে হবে বস্তাবন্দি অবস্থায়/বাঁধা অবস্থায় চারাগুলো যেন বেশী সময় না থাকে। যদি কোন কারণে চারা লাগাতে সময় লাগে, তবে চারাগুলো সম্ভব হলে কাঁদাযুক্ত অবস্থায় বা ছায়াতে রেখে দিতে হবে। আটির বন্ধন খুব শক্ত হলে ভিতরের চারা নষ্ট হয়ে যায়, তাই আটি নরম করে রাখতে হবে।
জমি তৈরি:
রোপা ধানের ফলনের উপর জমি তৈরির প্রত্যক্ষ প্রভাব পরিলক্ষিত হয় না। যেসব এলাকার মাটি অধিক ভেজা থাকার দরুন নরম থাকে, সেসব জমির আগাছা পরিস্কার করে বিনা চাষে ধান রোপণ করলেও আশানুরূপ ফলন পাওয়া যায়। জমি চাষ সরাসরি ধানের ফলনকে না বাড়লেও রোপণ-পরবর্তী পরিচর্যা সহজতর করে। ফলে উৎপাদন- খরচ অনেকাংশ কমে যায়। মাটির প্রকারভেদে ৩-৫ বার চাষ ও মই দিলে চলে। জমিতে প্রয়োজনমত পানি দিয়ে ২-৩টি চাষ ও মই দিতে হবে। যেন মাটি থকথকে কাদাময় হয়। জমি উঁচু-নিচু থাকলে মই ও কোদাল দিয়ে সমান করে নিতে হবে। ভালভাবে জমি তৈরি করলে নিæলিখিত উপকার হয়:
ক্স উত্তমরূপে কাদা করা জমি বৃষ্টি বা সেচের পানির অপচয় কমিয়ে দেয়।
ক্স প্রথম চাষের পর অন্তত সাত দিন পর্যন্ত জমিতে পনি আটকে রাখা প্রয়োজন। এর ফলে জমির আগাছা, খড় ইত্যাদি পচে যাবে। এগুলো পচনের ফলে যে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট উৎপন্ন হয় তা জমিতে খাদ্য হিসাবে মজুদ থাকে।
ক্স কাদা করে জমি তৈরি করলে মাটির অক্সিজেনের শূন্যস্তর সৃষ্টি হওয়ার ফলে মাটির উর্বরতা ও সার ব্যবহারের কার্যকরতা বেড়ে যায়।
ক্স উত্তমরূপে কাদা করা তৈরি জমিতে অতি সহজে আঙ্গুল দ্বারা ধানের চারা রোপণ করা যয় এবং
ক্স উত্তমরূপে কাদা করা তৈরি জমি ভালভাবে সমতল হয় এবং সেচের পানি জমিতে সমানভাবে দাঁড়াতে পারে।
শেষ চাষ ও মই দেওয়ার সময় লক্ষ্য রাখতে হবে যেন জমি যথেষ্ট সমতল হয়। শেষ চাষের সময় সার প্রয়োগ করতে হবে। আউশ ধান কাটার পরপরই চাষ ও মই দিয়ে আবর্জনা পচনের জন্য অপেক্ষা না করে দুয়েক দিনের মধ্যেই আমনের চারা রোপণ করা দরকার।
চারা রোপণ:
১. রোপণের সময়: আউশ মৌসুমে রোপা লাগানো বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে বৃষ্টিপাতের উপর নির্ভরশীল। ঠিকমত বৃষ্টিপাত হলে বা সেচের সুবিধা থাকলে বৈশাখের (এপ্রিল-এর মাঝামাঝি) প্রথমার্ধে রোপা লাগানো বা সরাসরি জমিতে বীজ বপন করা যায়। আউশ মৌসুমে স্বল্প-জীবনকাল-ধান, যেমন চান্দিনা এবং সুফলা জাতের চারা লাগানো ভাল। আর এই মৌসুমে সরাসরি বীজ বপন করতে হলে নিজামী এবং নিয়ামত জাতের ধানই উত্তম। সময়মত আউশ ধানের চাষ না করা হলে, ঐ জমির সম্ভব হলে বৃষ্টির পর ডালজাতীয় শস্য বুনে তা সবুজ সার হিসাবে ব্যবহার করে পরবর্তী আমন ধানের ফলন বাড়ানো যায়। আমন মৌসুমের সব ধানই শ্রাবন (জুলাই মাস) মাসের মধ্যেই রোপণ করা দরকার। এসময় আলোক-সংবেদনশীল জাতের ধান, যেমন- মুক্তা, ভাদ্রের মাঝামাঝি পর্যন্ত রোপণ করা যায়। তাছাড়া, নূতন দু’টি জাতের ধান কিরণ ও দিশারী এবং নাইজারশাইল উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ভাদ্রের শেষ সপ্তাহ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আশ্বিনের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত রোপণ করা যেতে পারে। পৌষ ও মাঘ মাসে বোরো ধান রোপণ করা দরকার। বোরো ধানের চাষ সম্পূর্ণরূপে সেচের উপর নির্ভরশীল। তাই এর উৎপাদন-খরচ সবচেয়ে বেশী।
২. রোপণের নিয়মঃ রোপা লাগানোর জন্য জমিতে ছিপছিপে পানি থাকলেই চলে। ধানের চারা এলোমেলোভাবে অথবা নিদির্ষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে সারিতে রোপণ করা যায়। সারিতে রোপণ করা হলে পরবর্তী পরিচর্যা, বিশেষ করে আগাছা দমন সহজ হয়। উৎপাদন খরচ কমাতে হলে এলামেলো চারা না লাগিয়ে সারিতে রোপণ করাই ভাল। প্রতি গর্তে দুই থেকে তিনটি চারা রোপণ করা দরকার।
৩. চারা রোপণের দূরত্বঃ ধানের জাত মৌসুম ও জমির উর্বরতাভেদে ১০-৪০ সে.মি. দুরের সারিতে এবং ১০-৪০ সে.মি. দূরের গর্তে রোপণ করা যায়। যেসব এলাকার মাটি উর্বর, সেখানে পাতলা করে এবং অনুর্বর জমিতে ঘন করে ধানের চারা রোণ করা দরকার। তবে মনে রাখা আবশ্যক যে, আউশ ও আমন মৌসুমে পোকামাকড় ও রোগবালাইয়ের উৎপাত বেশী। তাই এদের দ্রুত বিস্তার রোধের জন্য এ মৌসুমে অধিক ঘন করে চারা রোপণ না করাই ভাল। নাবী আমনের বেলায় প্রতি গর্তে ৬-৮টি চারা ঘন করে লাগানো দরকার।
৪. চারার বয়স: সব জাতের জীবনকাল সময়ের দৈর্ঘ্যের উপর নির্ভরশীল নয়, যেমন- বিপ্লব, চান্দিনা, আশা এবং সুফলা প্রভৃতি ধানের চারার বয়স আউশ মৌসুমে ২০-৩০ দিন এবং বোরো মৌসুমে ৪০-৪৫ দিন হওয়া উচিত। রোপা আমনের জন্য চারার বয়স ২০-৩৫ দিন হলে ভাল হয়। স্বল্প জীবনকালের জাত, যেমন- পূর্বাচী এবং ব্রিবালম ইত্যাদির বেলায় অপেক্ষাকৃত কম বয়সের চারা রোপণ করা-ই ভাল।
সারের ব্যবস্থাপনা:
সার প্রয়োগ করতে দু’টি বিষয়ের প্রতি বিশেষ নজর রাখা প্রয়োজন। প্রথমতঃ আবহাওয়া ও মাটির উর্বরতার মান যাচাই এবং ধানের জাত, জীবনকাল ও ফলন-মাত্রার উপর ভিত্তি করে সারের মাত্রা ঠিক করা । দ্বিতীয়তঃ সারের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য কোন সার কখনও কিভাবে প্রয়োগ করতে হবে তা নির্ধারণ করা। যেহেতু কয়েকটি সারের পরবর্তী ফসলের উপর প্রভাব আছে, সেহেতু প্রয়োগ একক ফসলভিত্তিক না করে, ফসলচক্রভিত্তিক করা-ই ভাল। সবুজ সার, যেমন- ধৈঞ্চা বা ডালজাতীয় ফসরের বেলায় জৈব সার, গোবর বা পচা আবর্জনা ব্যবহারের প্রতি নজর দেওয়া সকলের প্রয়োজন।
আন্তঃপরিচর্যা
শূন্যস্থান পূরণঃ
রোপণের ৭ দিনের মধ্যেই রোপণজনিত আঘাত সহ্য করে চারা সবুজ হয়ে ওঠে। রোপিত সব চারার কিছু অংশ মরে গেলে সনাক্ত করা মাত্র নতুন চারা রোপণ করা প্রয়োজন। সাধারণতঃ ১-৫% চারা পুনঃ রোপণের প্রয়োজন হতে পারে।
আগাছা দমন:
সাধারণতঃ আমন ও বোরো মৌসুমের চেয়ে আউশ মৌসুমে, বিশেষ করে বোনা আউশে আগাছার উপদ্রব বেশী হয়। আউশ মৌসুমে প্রথম বৃষ্টিপাতের পর জমিতে দুয়েকটি চাষ দিয়ে পতিত অবস্থায় রেখে দিলে ঘাসের বীজ গজিয়ে ওঠে। কিছু দিন পর পুনরায় চাষ ও মই দিয়ে ধানের বীজ বপন করলে আগাছার উপদ্রব অনেকাংশ কমে যায। রোপা ধানের জমিতে ৩-৫ সে.মি. বা তার সামান্য কিছু বেশী পানি রাখলে জমিতে আগাছা কম জন্মায়। বিভিন্ন ধানের জাত ও মৌসুমভেদে আগাছার সঙ্গে ধান গাছের প্রতিযোগিতার বিভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। সাধারণতঃ ধানগাছ যতদিন পর্যন্ত মাঠে থাকে, তার তিন ভাগের এক ভাগ সময় জমি আগাছামুক্ত রাখলে আশানুরূপ ফলন পাওয়া যায়।
বিভিন্নভাবে আগাছা দমন করা যেতে পারে। যেমন- পানিব্যবস্থাপনা, জমি তৈরির পদ্ধতি, হাত দিয়ে টেনে উঠানো, নিড়ানী যন্ত্রের ব্যবহার ইত্যাদি। নিড়ানী যন্ত্র ব্যবহারের জন্য ধান সারিতে লাগানো দরকার। এ যন্ত্র ব্যবহারের ফলে কেবল ২ সারির মধ্যে আগাছা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু দুই গুছির ফাঁকে যে ঘাস থেকে যায়, তা হাত দিয়ে টেনে তুলতে হবে। সংগৃহীত ঘাসে যদি পরিপক্ক বীজ না থাকে, তবে তা মাটির ভিতর রেখে দিলে পচে দিয়ে জৈব সারের কাজ করবে।
পানি সেচঃ
চারা রোপণের পর জমিতে এমন পরিমাণ পানি রাখতে হবে, যেন চারা তলিয়ে বা একেবারে শুকিয়ে না যায়। রোপণের সময় থেকে কাইচ থোড় আসা পর্যন্ত ছিপছিপে পানি রাখলেও ভাল ফলন পাওয়া যায় এবং পানির অপচয় কমানো যায। অবশ্য এ পরিস্থিতিতে জমিতে প্রচুর আগাছা জন্মে। ধান গাছে যখন কুশি ছাড়া শেষ হয়ে বা কাইচ থোড়া আসা শুরু করে, তখন পানির পরিমাণ দ্বিগুণ করা উচিত। কারণ, এ সময় পানির প্রয়োজন বেশী থাকে।
পোকামাকড়
মাজরা পোকা: মাজরা পোকার কীড়া গাছের কুশি ও শীষের ক্ষতি করে।
দমন: প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন জাত, যেমন- চান্দিনা (বিআর১) ইরিশাইল (আই-আর-২০) চাষ করতে হবে।
ক্স আলোর ফাঁদের সাহায্যে
ক্স ডিমের গাদা সংগ্রহ করে নষ্ট করার মাধ্যমে
ক্স ডালপালা পুঁতে পোকা- খেকো পাখির সাহয্যে এবং
ক্স ধান কাটার পর জমি চাষ দিয়ে অথবা নাড়া পুড়িয়ে ফেলে মাজরা পোকা দমন করা যায়।
গলমাছি:
গলমাছির কীড়া ধানগাছের মাঝখানের পাতা আক্রমণ করে এবং ঐ পাতা পেঁয়াজ পাতার মত হয়ে যায়, ফলে কুশিতে আর শীষ বের হয় না।
দমন: প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন জাত, যেমন- চান্দিনা (বিআর১) ইরিশাইল (আই-আর-২০) চাষ করতে হবে।
ক্স আলোর ফাঁদের সাহায্যে
ক্স ডিমের গাদা সংগ্রহ করে নষ্ট করার মাধ্যমে
ক্স ডালপালা পুঁতে পোকা- খেকো পাখির সাহয্যে গলমাছির কীড়া দমন করা যায়।
পামরী পোকা:
পূর্ণবয়স্ক ও কীড়া উভয়েই ধান গাছের ক্ষতি করে। পূর্ণবয়স্ক পোকা পাতার সবুজ অংশ কুরে কুরে খায়। কীড়াগুলো পাতার ভেতরে সুড়ঙ্গ করে সবুজ অংশ খায়।
দমন:
ক্স হাতজাল বা গামছা দিয়ে পোকা ধরে মেরে ফেলে
ক্স গাছের পাতা ছেঁটে দিয়ে কীড়াগুলো মেরে ফেলে
ক্স আলোর ফাঁদের সাহায্যে
ক্স ডিমের গাদা সংগ্রহ করে নষ্ট করার মাধ্যমে
ক্স ডালপালা পুঁতে পোকা- খেকো পাখির সাহয্যে পামরি পোকা দমন করা যায়
এছাড়া, পাতা মোড়ানো, চুঙ্গি, লেদা, ঘাস ফড়িং, বাদামী গাছ ফড়িং, সাদা পিঠ ফড়িং, সবুজ পাতা ফড়িং ইত্যাদিও ধানের ক্ষতি করে।
উপযুক্ত পরিপক্কতায় ধান কাটার উপর ফলন অকেনাংশে নির্ভর করে। ফুল ফোটার ৩০-৪০ দিনে ধানের পরিপক্কতা আসে। জমিতে ধান গাছ শুকিয়ে গেলে ধান কাটবার অপেক্ষা করা মোটেই উচিত হবে না। এতে কিছু ধান ঝরে পড়তে পারে এবং ইঁদুর, শীষকাটা লেদা পোকা এবং পশুপাখীর আক্রমণ হতে পারে। শীষের অগ্রভাগ থেকে ধান পাকা শুরু হয়। শীষের অগ্রভাগে শতকরা ৮০ ভাগ ধানের চাল শক্ত ও স্বচ্ছ এবং শীষের নিচের অংশে শতকরা ২০ ভাগ ধানের চাল আংশিক শক্ত ও অস্বচ্ছ থাকলে ধান ঠিক মত পেকেছে বলে বিবেচিত হবে।
ধান মাড়াই করার জন্য পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন জায়গা বেছে নিতে হবে। মাড়াই করার পর ৪/৫ দিন রোদে শুকিয়ে ঝেড়ে নিয়ে পরিষ্কার করে সংরক্ষণ করতে হবে।
























