
ডেস্ক রিপোর্ট: দেশকে এগিয়ে নেওয়ার এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখার অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে গতকাল বুধবার রাজধানীসহ সারা দেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় ও ভাবগাম্ভীর্য পরিবেশে ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস পালিত হয়েছে।
দেশের প্রথম সরকারের শপথ গ্রহণ এবং স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠের ৪৮ বছর পূর্তি উপলক্ষে রাজধানী ঢাকার পাশাপাশি ঐতিহাসিক মেহেরপুরের মুজিবনগরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননেও জাতীয়ভাবে পালিত হয় নানা কর্মসূচি।
দিবসটির পেছনের দিকে তাকালে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ একমাত্র দেশ, যে দেশ যুদ্ধ ঘোষণা করে, যুদ্ধ করে, এবং যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ হিসেবে পৃথিবীর মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে বাঙালির প্রধান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ২৫মার্চ গভীর রাতে, অর্থাৎ ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। গ্রেপ্তারের পূর্বে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে যান। কিন্তু তাঁর অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। ৩ এপ্রিল তাজউদ্দিন আহমদ দিল্লীতে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে আলোচনায় বসেন। এর পূর্বে বিদেশী গণমাধ্যমের প্রশ্নে এবং সার্বিক অবস্থায় তিনি উপলব্ধি করেন, একটি স্বাধীন সরকার গঠিত না হলে, মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার পক্ষে ভারত তথা কোন বিদেশী সরকারের সাহায্য-সহযোগিতা কামনা করা নিরর্থক হবে। এ পরিস্থিতিতে তিনি জাতীয় পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে গঠিত স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের একজন নেতৃস্থানীয় সদস্য হিসাবে ইন্দিরা গান্ধীর সাথে সাক্ষাত করেন। এবং তাঁকে জানান, সামরিক বাহিনীর আক্রমণের পর পরই বাংলাদেশকে স্বাধীন ঘোষণা করে সরকার গঠিত হয়েছে, শেখ মুজিবর রহমান সে সরকারের প্রেসিডেন্ট এবং মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠকে যোগদানকারী সকল প্রবীণ সহকর্মীই মন্ত্রীসভার সদস্য। ইন্দিরা গান্ধী এ বৈঠকেই বাংলাদেশ সরকারকে মুক্তি সংগ্রামে সম্ভাব্য সকল সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেন এবং বাংলাদেশ সংলগ্ন সীমান্ত উন্মুক্ত করে ভারতীয় এলাকায় রাজনৈতিক কর্মতৎপরতা চালানোর অনুমতি দেন। ৮ এপ্রিল তাজউদ্দিন কলকাতায় ফিরে উপস্থিত আওয়ামী নেতৃবৃন্দের সঙ্গে দিল্লী বৈঠক নিয়ে আলোচনা করেন। দুই দিন বিভিন্ন আলোচনা ও বিতর্ক শেষে তাঁর প্রস্তাবিত মন্ত্রীসভা বহাল থাকে। ১০ এপ্রিল ভারতের আগরতলায় বাংলাদেশের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা একত্রিত হয়ে সর্বসম্মতিক্রমে বাংলাদেশ সরকার গঠন করেন। ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় বিশ্বের সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধিদের সামনে এই সরকার আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণ করে। বৈদ্যনাথতলার নাম পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর নামে মুজিবনগর রাখা হয়।

এই মুজিবনগর সরকারের সদস্যরা হলেন;
রাষ্ট্রপতি : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি : সৈয়দ নজরুল ইসলাম
প্রধানমন্ত্রী : তাজউদ্দীন আহমদ
পররাষ্ট্রমন্ত্রী : খন্দকার মোশতাক আহমদ
অর্থমন্ত্রী : মনসুর আলী
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী : এইচ এম কামরুজ্জামান
প্রধান সেনাপতি : এম এ জি ওসমানী
মুখ্য সচিব : রুহুল কুদ্দুস
সংস্থাপনসচিব : নূরুল কাদের খান
মন্ত্রিপরিষদসচিব : এইচ টি ইমাম
তথ্যসচিব : আবদুস সামাদ আনোয়ারুল হক খান (১৪ অক্টোবর থেকে )
অর্থসচিব : খোন্দকার আসাদুজ্জামান
পররাষ্ট্রসচিব : মাহবুবুল আলম চাষী
স্বরাষ্ট্রসচিব : এম এ খালেক
কৃষিসচিব : নূরউদ্দিন আহমদ
প্রতিরক্ষাসচিব : আবদুস সামাদ
আইনসচিব : এ হান্নান চৌধুরী
শিক্ষা উপদেষ্টা : কামরুজ্জামান এমএনএ
তথ্য, বেতার, ফিল্ম, আর্ট ও ডিজাইন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত : আবদুল মান্নান এমএনএ
পরিকল্পনা কমিশন চেয়ারম্যান : ড. মুজাফফর আহমদ চৌধুরী
সদস্য : ড. স্বদেশ বসু, ড. মুশাররফ হোসেন, ড. আনিসুজ্জামানওড. সারওয়ার মুরশিদ
এদিন নির্বাচিত পরিষদ সদস্যদের পক্ষ থেকে প্রচারিত “স্বাধীনতা আদেশ ঘোষণা”য় শাসনতন্ত্র প্রণীত না হওয়া পর্যন্তু কার্যনির্বাহী ও আইন প্রণয়নের ক্ষমতা, প্রধান সেনাপতির ক্ষমতা, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীসভার সদস্য নিয়োগের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে এবং তার অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির হাতে অর্পিত হয়। এই সরকার ২৬ মার্চ থেকে কার্যকারিতা লাভ করে এবং দৃঢ়তার সাথে দীর্ঘ ৯ মাস মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে।

দিবসটি উপলক্ষে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, আলোচনা সভা, বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন, গার্ড অব অনার প্রদান, কুচকাওয়াজ প্রদর্শনসহ বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। দিবসটি পালনে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানাতে সর্বস্তরের জনতার ঢল নামে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকাল ৭টায় বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। পুষ্পস্তবক অর্পণের পর প্রধানমন্ত্রী স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সেখানে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হিসেবেও শেখ হাসিনা দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে দলের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে আরেকবার পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এ সময় কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। পরে যুবলীগ, ছাত্রলীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, যুব মহিলা লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, শ্রমিক লীগ ও কৃষক লীগসহ আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের নেতারা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতা-কর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষ সারিবদ্ধভাবে জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এর আগে মুজিবনগর দিবস উপলক্ষে সকাল সাড়ে ৬টায় দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়, ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু ভবন ও সারা দেশে সংগঠনের কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। এ ছাড়া, মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলা গ্রামের আম্রকাননে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের উদ্যোগে পৃথক কর্মসূচি পালিত হয়। মুজিবনগরের কর্মসূচির মধ্যে ছিল সকাল ৬টায় জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন, সকাল ১০টায় মুজিবনগর স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ, সকাল সোয়া ১০টায় গার্ড অব আনার প্রদান এবং সকাল সাড়ে ১০টায় শেখ হাসিনা মঞ্চে মুজিবনগর দিবসের জনসভা।
মুজিবনগর দিবস উপলক্ষে স্মারক ডাকটিকিট অবমুক্ত করেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়। গতকাল বাংলাদেশ সচিবালয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে এই স্মারক ডাকটিকিট অবমুক্ত করেন তিনি। ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস ২০১৯ উপলক্ষে বাংলাদেশ ডাক অধিদপ্তর দশ টাকা মূল্যমানের একটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করেছে। এছাড়া দশ টাকা মূল্যমানের একটি উদ্বোধনী খাম, ৫ টাকা মূল্যমানের একটি ডাটা প্রকাশ ও একটি বিশেষ সিলমোহর ব্যবহার করা হয়েছে। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব অশোক কুমার বিশ্বাস এবং ডাক বিভাগের মহাপরিচালক এস এস ভদ্র এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
-এসজেডকে























