বেগুন চাষ পদ্ধতি

বেগুন
বেগুন বাংলাদেশের জমিতে চাষকৃত একটি জনপ্রিয় শীর্ষস্থানীয় সবজি। আলুর পরে এর স্থান। প্রায় সারা বছর এটি চাষ করা যায়। তবে শীত মৌসুমে ফলন বেশি হয়।
মাটি
রবি মৌসুমই সব জাতের বেগুন চাষের জন্য অধিকতর উপযোগী। প্রায় সব ধরনের মাটিতেই বেগুন জন্মে। তবে দো-আঁশ, পলি মাটি ও বেলে দো-আঁশ মাটি বেগুনের জন্য সবচেয়ে ভালো।
জাত
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন জাতের বেগুনের চাষ হয়। এ জাতগুলোর মধ্যে উলেখযোগ্য হলো-উত্তরা, তারাপুরী, কাজলা, নয়নতারা, ইসলামপুরী, শিংনাথ, খটখটিয়া, ঝুমকা, কাজী, ভাংগুরা, এসব। উৎকৃষ্ট জাতের বেগুনের কিছু বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হলো।
জাত ফলন (হেক্টরপ্রতি) ঢলে পড়া রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কাণ্ড ও ফল ছিদ্রকারী পোকা প্রতিরোধ ক্ষমতা
উত্তরা ৬০-৬৫ টন সহনশীল মাঝারি
তারাপুরী ৭৫-৮৫ টন বেশি নাই
কাজলা ৫৫-৬০ টন সহনশীল মাঝামাঝি
নয়নতারা ৪৫-৫০ টন মাঝামাঝি মাঝারি
ইসলামপুরী ৩৬টন মাঝামাঝি নাই
শিংনাথ ৩০ টন মাঝামাঝি মাঝারি
খটখটিয়া ২৯ টন মাঝামাঝি মাঝারি
ভাংগুরা ৩০ টন মাঝামাঝি নাই
জমি তৈরি
জমি তৈরি করে ৫-৬টি চাষ ও মাই দিয়ে আগাছা বেছে মাটি মোলায়েম করে জমি তৈরি করে নিতে হবে।
বীজ বপন ও চারা উৎপাদন
শীতকালীন বেগুন চাষের জন্য মধ্য আগস্ট থেকে অক্টোবরের (আশ্বিন) মাঝামাঝি পর্যন্ত এবং বর্ষাকলীন বেগুনের জন্য মধ্য এপ্রিল (চৈত্র) থেকে মধ্য মে এবং গ্রীষ্মকালীন বেগুনের জন্য মধ্য জানুয়ারি থেকে মধ্য মার্চ (মাঘ-ফাল্গুন) পর্যন্ত চারা উৎপাদনের জন্য বীজতলায় বীজ বপন করতে হয়। বীজতলার মাটিতে প্রতি ১ ভাগ ফরমালডিহাইডের সাথে ৫০ ভাগ পানি মিশিয়ে শোধন করে নিলে ভালো হয়। প্রথমে বীজতলায় ঘন করে বীজ ফেলতে হয়। বীজ গজানোর ১০-১২ দিন পর গজানো চারা দ্বিতীয় বীজতলায় স্থানান্তর করা বাঞ্ছনীয়। বীজতলায় মাটি ও সমপরিমাণ বালি এবং কম্পোস্ট মিশিয়ে ঝুরঝুরে করে তৈরি করতে হয়। বীজ বপনের জন্য প্রতি বীজতলায় (৩দ্ধ১) বর্গ মি. প্রায় ৮ গ্রাম বীজ দরকার হয়।
চারা রোপণ
৫-৬ সপ্তাহ বয়সের চারা ৭৫ সে.মি দূরত্বে সারি করে ৬০ সে.মি দূরে দূরে রোপণ করতে হয়। বিভিন্ন জাতের বেগুন গাছের আকার অনুযায়ী এ দূরত্ব ১০-১৫ সে.মি. কম-বেশি করা যেতে পারে।
সার প্রয়োগ
উত্তরা জাতের জন্য নিæরূপ পরিমাণ সার প্রয়োগ করতে হয়।
সারের নাম মোট পরিমাণ
(হেক্টর প্রতি) শেষ চাষের সময় পরবর্তী পরিচর্যা হিসেবে
১ম কিস্তি ২য় কিস্তি ৩য় কিস্তি
গোবর ৮-১২ টান সব – – –
ইউরিয়া ৩০০ কেজি – ১০০ কেজি ১০০ কেজি ১০০ কেজি
টিএসপি ১৫০ কেজি গব – – –
এমওপি ২৫০ কেজি ৮০-৯০ কেজি – ৪০-৪৫ কেজি ৪০-৪৫ কেজি
জিপসাম ৪০ কেজি সব – – –
* মাটির উর্বরতাভেদে সার ও তার পরিমাণ পরিবর্তিত হতে পারে।
দেশী জাতের বেগুন যেমন ইসলামপুরী, খটখটিয়া, শিংনাথ এসবের ক্ষেত্রে সারের পরিমাণ ২৫% কম দিলেও চলবে। প্রথম কিস্তির সার চারা রোপণের ১০-১৫ দিন পর দ্বিতীয় কিস্তির ফল ধরা আরম্ভ হলে এবং তৃতীয় কিস্তির ফল সংগ্রহের মাঝামাঝি সময়ে দিতে হবে।
অন্তর্বর্তীকালীন পরিচর্যা
চারা রোপণের মাসখানেক পর থেকে মাঝে মধ্যে গাছের গোড়ার মাটি আলাদা করে দিতে হয়। গাছের সুষ্ঠ বৃদ্ধির জন্য শুষ্ক মৌসুমে সেচের খুবই প্রয়োজন। বেলে মাটিতে ও শীতকালে ১০-১৫ দিন অন্তর অন্তর সেচ দেয়া প্রয়োজন। তাছাড়া প্রত্যেক কিস্তি সার প্রয়োগের পরে সেচ দেয়ার প্রয়োজন হয়। তবে মাটির ‘জো’ দেখেই সেচের ব্যবস্থা নিতে হবে।
পোকামাকড় ও রোগবালাই দমন
ফল ও কাণ্ড ছিদ্রকারী পোকা বেগুনের প্রধান শত্র“। এ পোকার কীড়া, ডগা ও ফল ছিদ্র করে ভিতরের অংশ খেয়ে ফেলে এবং আক্রান্ত অংশ শেষ পর্যন্ত পচে যায়। এ পোকা দেখা গেলে রিপকর্ড বা সিমবুস ১ মি.লি. প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। তবে সমন্বিত বালাই দমন ব্যবস্থার মাধ্যমে পোকা দমন করা সবচেয়ে উত্তম। এ ব্যবস্থার জন্য নিæলিখিত পদক্ষেপ নিতে হবেঃ
# বেগুন ক্ষেতে প্রতি সপ্তাহে জরিপ করে ডগা ও ফলে মাজরা পোকার উপস্থিতি যাচাই করতে হবে।
# আক্রান্ত ডগা ও ফল কীড়াসহ ছিঁড়ে মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে।
# পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে।
# একই জমিতে প্রতিবছর বেগুনের চাষ করা যাবে না।
# স্থানীয়ভাবে পরীক্ষিত যে সব বেগুনের জাতে পোকার আক্রমণ কম হয় সে সব জাতের বেগুনের চাষাবাদ করতে হবে।
উপাত্ত সংগ্রহ-কৃষি তথ্য সার্ভিস
























