
সরদার জাহিদুল কবীর: সারাজীবনে তীল তীল করে জমানো অর্থে এক খন্ড জমি, একটি প্লট বা একটি ফ্ল্যাট কেনা গ্রাম বা শহুরে মানুষের অনেক বড় স্বপ্ন। এই স্বপ্ন পূরণের পথে রয়েছে নানা ঘাত-প্রতিঘাত। প্রতারনা এর মধ্যে একটি। ক্রেতা বিক্রেতার সাথে, বিক্রেতা ক্রেতার সাথে এই প্রতারনার আশ্রয় নিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে সারাজীবনের স্বপ্নটা একটু ভুলেই মুছে যেতে পারে। এ জন্যে প্রোপার্টি ডেভেলপার কোম্পানিগুলোকে জমি বা প্লট দেওয়ার সময় বা ফ্ল্যাট কেনার আগে বেশ কিছু আইনি বিষয় রয়েছে যেগুলো জানলে প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। কেউ যদি এই ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়ে পড়েন তো আপনি ‘রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন এবং ব্যবস্থাপনা আইন ২০১০’র সাহায্য নিতে পারেন।
এই আইনের সুবিধা:
>> এই আইনে বলা হয়েছে যে, চুক্তিতে ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে।
>> যেসব উপকরণ ব্যবহার করা হবে চুক্তিতে অবশ্যই তার বিবরণ থাকতে হবে। প্রণীত অনুমোদিত নকশাও আবাসন নির্মাতা ক্রেতাকে দিতে বাধ্য থাকবেন।
>> চুক্তির ভিত্তিতেই পছন্দসই প্লট বা ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেবেন। আবার আপনার বিনা অনুমতিতে বরাদ্দ করা প্লট বা ফ্ল্যাট পরিবর্তন করতে পারবেন না।
>> চুক্তিতে উল্লিখিত শর্তের বাইরে অতিরিক্ত কোনো অর্থ দিতে ক্রেতা বাধ্য থাকবেন না। যদি কোনো উন্নতমানের সরঞ্জাম সংযোজনের দরকার হয়, তাহলে দুই পক্ষের পারস্পরিক সম্মতিক্রমে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়া যেতে পারে।
>> সমুদয় মূল্য পরিশোধের ৩ মাসের মধ্যে আবাসন নির্মাতা দখল হস্তান্তর, দলিল সম্পাদন এবং নিবন্ধনের যাবতীয় কাজ সম্পাদন করে দেবেন। হস্তান্তরকালে আয়তন কমবেশি হলে তার মূল্য ক্রয়মূল্য অনুযায়ী ৩ মাসের মধ্যে সমন্বয় করতে হবে।
>> আবাসনের মূল্য শুধুমাত্র ব্যাংকের মাধ্যমে এককালীন বা কিস্তিতে পরিশোধ করা যাবে। কোনো ক্রেতা এককালীন অথবা কিস্তিতে মূল্য পরিশোধে ব্যর্থ হলে আবাসন নির্মাতা ৬০ দিন আগে নোটিশ দিয়ে বরাদ্দ বাতিল করতে পারবেন। সে ক্ষেত্রে তিনি জমা করা অর্থ পরবর্তী ৩ মাসের মধ্যে চেকের মাধ্যমে ক্রেতাকে একসঙ্গে ফেরত দিতে বাধ্য থাকবেন। আবার আপনি বিলম্বিত সময়ের জন্য কিস্তির অর্থের ওপর ১০ শতাংশ হারে সুদ প্রদান করে কিস্তি পরিশোধ করতে পারবেন। তবে এটি ৩ বারের বেশি করতে পারবেন না।
>> আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট সময়ে ফ্ল্যাট হস্তান্তরে ব্যর্থ হলে চুক্তিতে নির্ধারিত ক্ষতিপূরণসহ সব অর্থ ক্রেতাকে ৬ মাসের মধ্যে ফেরত দিতে হবে। চুক্তিতে ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখ না থাকলে তা পরিশোধিত অর্থের ওপর ১৫ শতাংশ হারে নির্ধারিত হবে।
>> কোনো কারণে বরাদ্দ বাতিল করতে চাইলে আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকে আপনার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পরিশোধিত অর্থের ১০ শতাংশ বাদ দিয়ে বাকি অর্থ ৩ মাসের মধ্যে এককালীন চেক অথবা পে-অর্ডারের মাধ্যমে ফেরত দিতে হবে।
ডাউন পেমেন্টের আগে:
>> জমির দলিল সঠিক কিনা তা ভালো করে যাচাই করে নেয়া।
>> ডেভেলপার কোম্পানির সরকারি অনুমোদন আছে কি না তা দেখে নেয়া।
>> রাজউক কর্তৃক অনুমোদিত প্ল্যানের কপি আছে কিনা তা দেখে নেয়া।
>> ডেভেলপার কোম্পানি রিহাবের সদস্য কি না তাও যাচাই করে নেয়া।
>> প্লট/ফ্ল্যাট বরাদ্দের নির্ধারিত সময় এবং সব শর্ত ভালো করে বুঝে নেয়া।
শেষ কিস্তির সময়:
>> কিস্তি যখন শেষ হবে তখন এক মাসের মধ্যে প্লট/ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন দলিল বুঝে নেয়া।
>> তবে যদি কোনো কারণে কিস্তির টাকা পরিশোধে বিলম্ব হয় তাহলে কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা যাচাই-বাছাই করে মেনে চলুন।
আইনের সাহায্য:
চুক্তি অনুযায়ী আপনার বুকিংকৃত প্লট/ফ্ল্যাটটি সময় মতো না হলে অথবা চুক্তিতে যে নির্মাণ উপকরণ ব্যবহারের কথা উল্লেখ ছিল তা না করলে, নকশা পরিবর্তনসহ বিভিন্ন বিষয়ে ওই কোম্পানিটি যদি চুক্তিপত্র ভঙ্গ করে তাহলে নিজেদের মধ্যে সমাধান না হলে বিষয়টি সালিস আইন ২০০১ মোতাবেক সালিসি ট্রাইব্যুনালে যেতে হবে। তখন সালিসি ট্রাইব্যুনাল বিষয়টি নিষ্পত্তি করবে। ৩০ দিনের মধ্যে উভয় পক্ষ যদি ট্রাইব্যুনাল গঠনে ব্যর্থ হন তাহলে যেকোনো পক্ষ বিবদমান বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য উপযুক্ত আদালতে মামলাও করতে পারবেন। এই আইনের অধীনে অপরাধগুলো প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক বিচার্য বিষয়। বিচারের সময় ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসারে সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে বিচার করবেন আদালত। এই আইনের বিধিবিধান লঙ্ঘন করলে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা ৩ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে।
সূত্র: অনলাইন
























