
ড. মো. বায়েজিদ মোড়ল: ধান ফসল বিশেষ করে বোরো ধানের জমিতে বাদামী গাছ ফড়িং পোকাটি মারাত্মকভাবে ক্ষতি করে থাকে। এছাড়া আউশ ও রোপা আমন ধানেও এ পোকার আক্রমণের তীব্রতা দেখা যায়। এখানে পোকাটির নানান দিক তুলে ধরা হলো।
বাদামী গাছফড়িং
বাদামী গাছফড়িং পোকাটি মারাত্মকভাবে ক্ষতি করে থাকে। এছাড়া আউশ ও রোপা আমন ধানেও এ পোকার আক্রমণের তীব্রতা দেখা যায়। বাদামী গাছফড়িং দীর্ঘদিন ধরে আমাদের দেশে থাকলেও ধানের জমিতে এ পোকার আক্রমণের ব্যাপকতা লক্ষ করা যায় মাত্র অল্প কিছু দিন ধরে। এ পোকা দ্বারা আক্রমণের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ার প্রধান করণ হচ্ছে সব মৌসুমেই উন্নতমানের পরিচর্যা এবং উচ্চফলনশীল জাতের ধান ব্যবহারের দ্বারা ধানের জমিতে যে পরিবেশের সৃষ্টি হয় তার ফলে বাদামী গাছফড়িংয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। ধানের চারা অবস্থা থেকে শুরু করে ধান পাকার পূর্ব পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে এ পোকার আক্রমণ হতে পারে।
পোকাটি দেখতে কেমন?
সাধারণত একটি পূর্ণ বয়স্ক বাদামী গাছফড়িংয়ের রঙ বাদামি হয়। এ পোকা আকারে ছোট, পেট মোটা এবং লম্বায় ৩-৫ মিলিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। এ পোকা পাখায্ক্তু ও পাখা বিহীন দু’ধরনেরই হতে পারে। পাখাযুক্ত পোকা দ্রুত উড়তে পারে। তবে পাখাবিহীন হাজার হাজার পোকার জন্ম দিতে পারে। বছরে এ পোকার প্রায় ১১-১১টি প্রজন্ম দেখা যায়। পাখাবিহীন পোকা অধিকহারে ডিম দিয়ে থাকে। এ ছাড়া পাখাযুক্ত পোকা দ্রুত স্থানান্তর করে থাকে। ডিম থেকে খুব ক্ষুদ্র বাচ্চা বের হয় এবং এরা গাছের রস খেয়ে বেঁচে থাকে। সদ্য ফোটা বাচ্চাগুলো খুবই ছোট হয় এবং এদের গায়ের রঙ সাদা বা হালকা বাদামি রঙয়ের হয়ে থাকে।
পোকার অবস্থান
বাচ্চা ও পূর্ণবয়স্ক বাদামী গাছফড়িং আলো ও বাতাস বেশি পছন্দ করে না। গাছের গোড়ার দিকে যেখানে ছায়া ও আর্দ্রতা থাকে এসব স্থানে এরা অবস্থান নেয়। এখানে থেকে পোকা গাছের কাণ্ড ও পাতার খোল হতে রস শুষে খায়।
পাখাযুক্ত পোকারা উড়ে জমির একস্থান থেকে অপর স্থানে অথবা এক জমি থেকে অন্য জমিতে চলে যেতে পারে। সাধারণত যেসব জমিতে ঘন করে গাছ লাগানো হয় বা জমিতে বেশি করে সার ব্যবহারের ফলে গাছ খুব ঘন হয়ে থাকে এবং ধান গাছে আলো বাতাস চলাচলে বাধাগ্রস্ত হয়ে সেসব জমিতে বাদামি গাছফড়িং খুব তাড়াতাড়ি বংশবিস্তার করে থাকে । সাধারণত ধান গাছে যখন থোড় ও ফুল আসে ঠিক তখনই গাছে এ পোকার সংখ্যা বাড়তে থাকে।
পোকার জীবন বৃত্তান্ত
বাদামী গাছফড়িং তিন পর্যায়ে এদের বংশবিস্তার করে থাকে। তাহলো- ডিম, বাচ্চা (নিষ্ফ) ও পূর্ণবয়স্ক পোকা। স্ত্রী পোকা প্রথমে পাতার খোলে বা পাতার মধ্য শিরায় বেশ কতকগুলো ডিম পাড়ে। এরা একসাথে অনেকগুলো গাদায় ডিম পাড়ে। প্রতিটি গাদায় প্রায় ৪০০-৬০০টি ডিম থাকে। এসব ডিমের ওপর পাতলা চওড়া একটা আবরণ থাকে। ডিম পাড়ার ৭-৯ দিনের মধ্যে প্রতিটি ডিম ফুটে সাদা রঙয়ের অতিক্ষুদ্র বাচ্চা বের হয়। এসব বাচ্চা পাতার খোল থেকে রস শুষে এবং এভাবে বড় হতে থাকে। বাচ্চা পূর্ণবয়স্ক পোকায় পরিণত না হওয়ার আগ পর্যন্ত পাঁচবার খোলস পরিবর্তন করে। এভাবে একটি বাচ্চার পরিপূর্ণ ফড়িং হতে ১৩-১৫ দিন সময়ের প্রয়োজন হয়। প্রথম পর্যায়ে বাচ্চাগুলোর রঙ সাদা থাকে, তবে পরে এরা বাদামি রঙ ধারণ করে। ডিম হতে পূর্ণ বয়স্ক পোকায় পরিণত হতে এদের প্রায় ২৫ দিন সময় লাগে। এপোকার জন্ম হার খুব দ্রুত। বছরে এরা ১০-১১ বার বংশবিস্তার করে থাকে।
আক্রমণ কাল
সাধারণত মার্চ মাসে এ পোকার সংখ্যা কম থাকে। এরপর এ পোকা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেয়ে এপ্রিল-মে মাসে প্রচুর হয়। জুন মাসে আবার এদের সংখ্যা কমতে থাকে এবং সেপ্টেম্ব মাস পর্যন্ত এ পোকা কম সংখ্যায় থাকে। পুনরায় অক্টোবর মাসে এ পোকার সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। এভাবে বৃদ্ধি পেয়ে নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে এরা আবার সর্বোচ্চ সংখ্যায় হয়ে যায়।
ক্ষতির লক্ষণ
এ পোকা আবহাওয়া অনুকূল পেলে সাধারণত দ্রুত বংশ বিস্তার করে থাকে। যেসব স্থানে এ পোকার সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, সেসব স্থানের ধান গাছগুলো শুকিয়ে যায় এবং দূর থেকে এসব জমি পোড়া ক্ষেতের মতো দেখা যায়। জমির এ ধরনের শুকিয়ে যাওযা অবস্থাকে ‘ফড়িং পোড়া’ (হপার বার্ণ) বলা হয়। জমির ফড়িং পোড়া এ অবস্থা কয়েকদিনের মধ্যেই পুরো জমিতে বিস্তার লাভ করে থাকে। সাধারণত ধান গাছে ফুল আসার পর এ ধরনের ক্ষতি হতে দেখা যায়। তবে অন্যস্থান থেকে অধিকসংখ্যক পোকা উড়ে এসে অল্প বয়স্ক ধানের জমি যদি আক্রমণ করে তখনো জমির এ ধরনের ‘ফড়িং পোড়া’ ক্ষতি দিতে পারে। বয়স্ক গাছে অর্থাৎ ফুল আসার সময় প্রতি গাছে ২০-২৫টি ফড়িং থাকলে ধানের তেমন ক্ষতি করতে পারে না। তবে এ সংখ্যা যদি গাছ প্রতি ৩০০-৪০০টি হয় তাহলে গাছ মরে শুকিয়ে যায় এবং ফড়িং পোড়া অবস্থার সৃষ্টি করে। শুষ্ক আবহাওয়ায় ধান ক্ষেতে যদি পানি জমা থাকে এবং বাতাসের আর্দ্রতা বেশি হয় তখনই এ পোকার আক্রমনের প্রকোপ বাড়ে। থোড় আসর পর পোকার আক্রমণ হলে ধান চিট হয়ে যায়। বাদামি গাছফড়িংয়ের আক্রমণের ফলে শতকরা ২০ থেকে ১০০ ভাগ পর্যন্ত ফসল নষ্ট হয়ে থাকে।
প্রতিকার
* যেসব এলাকায় এ পোকার আক্রমণ হয়েছে বা আক্রমণের আশঙ্কা রয়েছে সেসব এলাকার ধানের জমি প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে একাবার তদারক করতে হবে।
* গাছের গোড়ায় এ পোকা বা তাদের বাচ্চা আছে কি না তা সকাল বেলায় পরীক্ষা করতে হবে। একটি কাঠি দিয়ে গাছের গোড়ায় আঘাত করা হলে পোকাগুলো পানিতে ভাসতে দেখা যাবে।
* উপদ্রুত এলাকা, যেমন- বৃহত্তর রাজশাহী, ময়মনসিংহ, বরিশাল, খুলনা, চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রতিরোধশীল জাত ব্রি ধান-৩৫ অথবা আগাম জাত যেমন ব্রি ধান-৩৩ কিংবা বিআর-৬ এর চাষ করা যেতে পারে।
* ঘন করে গাছ রোপণ করা হলে এ পোকা তাড়াতাড়ি বংশবৃদ্ধি করে, তাই ধানের চারা অন্তত ২৫ সেমি. দূরে দূরে রোপণ করতে হবে। এতে প্রতিটি গাছ প্রচুর আলো বাতাস পাবে এবং এ পোকা দ্বারা গাছ আক্রান্ত হবে না।
* ধানের যেসব জমি বেশি উর্বর সেসব জমিতে নির্ধারিত মাত্রায় অর্ধেক হারে ইউরিয়া সার প্রয়োগ করতে হবে। বাদামি গাছফড়িংয়ের আক্রমণ হলে ধানে ফুল আসার আগেই জমিতে ইউরিয়া সারের উপরি প্রয়োগ বন্ধ রাখতে হবে।
* ধানের জমি এ পোকা দ্বারা আক্রান্ত হলে জমির পানি ৭-৮ দিনের জন্য সরিয়ে নিয়ে পোকার বংশ বৃদ্ধি কমানো যায়।
* জমিতে বাদামি গাছফড়িংয়ের প্রচুর প্রাকৃতিক শত্র“ আছে। এরা ফড়িংয়ের ডিম, বাচ্চা ও পোকা খেয়ে এদের সংখ্যা কমিয়ে রাখে। এসব উপকারী প্রাণী বা পোকার যাতে ক্ষতি না হয় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।
* বাদামি গাছফড়িং গাছের গোঁড়ায় থাকে। যন্ত্রের দ্বারা গাছে কীটনাশক ওষুধ ছিটানো ওষুধ ধুয়ে গেলে এক সপ্তাহ পরে আবার গাছে ওষুধ করতে হবে।
* জমিতে গড়ে কুশি প্রতি ১.৫টি হিসেবে বাচ্চা বা পূর্ণবয়স্ক গর্ভবতী পোকা থাকলে স্থানীয় কৃষি কর্মীর সহায়তা নিয়ে সুপারিশকৃত মাত্রায় কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে।
* সর্বোপরি জমিতে হাতজাল, আলোর ফাঁদ ব্যবহার করে, জমিতে হাঁস ছেড়ে, ক্ষেতে ডালপালা পুঁতে বা জমিতে উপকারী পোকার পরিমাণ বাড়ানোর মাধ্যমে বাদামি গাছফড়িং সহজে, খরচ ছাড়া এবং পরিবেশ সুস্থ রাখার মাধমে দমন করা সম্ভব।
সূত্র:কৃষি তথ্য সার্ভিস
























