১ হাজার পাঙ্গাস চাষ থেকে এখন কোটিপতি
মাছ চাষী হাজী আব্দুল মোমেন
ড. মোড়ল কামরুল হাসান বায়েজিদ
জীবন মানেই সংগ্রাম। জীবন থাকলেই সংগ্রাম থাকবেই। এই জীবন সংগ্রামে জয়ী হওয়া মানুষের সংখ্যা কিন্তু বেশী নয়। মাত্র নবম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করে বাবার আর্থিক অনাটনের কারনে পড়াশুনা ছেড়ে আয়ের পথে বেরিয়ে পড়েন নরসিংদী জেলার রায়পুরা উপজেলার হাজী আব্দুল মোমেন। এখন তার বয়স ৩১ বছর। এই ৩১ বছরে পা দেওয়া নরসিংদীর রায়পুরার এক উদিয়মান তরুণ ১৯৯৮ সালে মাত্র ১০টি মোরগের এক খামারের মাধ্যমে প্রবেশ করেন কৃষি ভুবনে। কিন্তু মোরগের খামারে ভাল করতে পারেননি। রোগে সব মোরগ মারা যায়। তখন খুব কষ্ট হয় মোমেনের। মোমেনব পিতার চায়ের দোকানে কাজ করতো। তার ইচ্ছা ছিল পিতার চায়ের দোকান থেকে বেরিয়ে নিজে কিছু করবে। তখন দৃষ্টি দেন মৎস্য চাষে। চায়ের দোকানোর পাশে পৈত্রিক ২ কাঠা জমির একটি ছোট্ট পুকুরে ১ হাজার পাঙ্গাশ মাছের পোনা ছেড়ে তিনি শুরু করলেন মৎস চাষ। মাছের খাবার হিসেবে চায়ের উচ্ছিষ্ট বর্জ দিতেন পুকুরে। বছর শেষে মাছ বিক্রি করে পেলেন ১১ হাজার টাকা। প্রথম বছর উৎপাদন ভাল হওয়ায় তিনি আরো বেশী মাছ চাষে আগ্রহী হলেন। অন্যের পুকুর লিজ নিয়ে চাষ শুরু করলেন। খরচ খরচা শেষে বছর শেষে লাভ হলো ৬৭ হাজার টাকা। আরো উদ্যোমী হলেন এর পরের বছরই ভাল লাভ করলেন এবং জমি কিনে পুকুর কেটে মাছ চাষের পরিধী বাড়াতে লাগলেন। পাঙ্গাশের সাথে যোগ করলেন রুই কাতলা মৃগেল থাই পুটি চিলবারকার্প আর মনোসেক্স তেলাপিয়া। পেলেন অভাবনীয় সাফল্য।
প্রতি বছর ব্যবসা ভাল হয়, ক্রয় করেন জমি বাড়তে থাকে পুকুরের সংখ্যা। ২০০৪ সালে শুরু করেন থাই কই এর চাষ জীবনে আসে নতুন মাত্রা। চার মাসের এই ফসলে ঘুরিয়ে করে দেয় তার জীবনে মোড়। মাছ চাষের সবচেয়ে বড় খরচ হচ্ছে মাছের খাবার। মাছের খাবার খরচ কমানোর জন্য নিজেই শুরু করলেন ফিসফিড উৎপাদন। তিনি যে খাবার পুকুরে দিতেন, দেখা যেত সেই খৈল ভুষি ধানের কুড়া পানির সাথে মিশে পানি নষ্ট হয়ে যেত। ২০০০ সালে দানাদার খাবার বানানোর জন্য নিজেদের বাসায় থাকা পুরাতন সেমাই তৈরী মেশিনে দুই জন মহিলা রেখে তাদের দিয়ে ঐ মেশিনে দানাদার মাছের খাবার তৈরী শুরু করেন। ভুট্টা, গমের আটা, শুটকি মাছের গুড়া, সরিষার খৈল, ময়দা ইত্যাদির মিশ্রনে হয় ফিসফিড। কাঁচামালগুলো যেহেতু সহজ লভ্য তখন তিনি নরসিংদীর শিবপুরের ইটাখোলায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে গড়ে তুলেন এ্যালাইড
ফিসফিড নামে একটি ফিসফিড মিল। এ মিলে প্রথম দিকে প্রতিদিনের উৎপাদন ছিল ১০ টন বর্তমানে ৬০-৭০ টন পর্যন্ত উৎপাদন হচ্ছে। এরপর ভাবতে লাগলেন মাছ চাষের জন্য ময়মনসিংহ দেশের মধ্যে প্রসিদ্ধ। ময়মনসিংহে ফিসফিড মিল করলে ভাল ব্যবসা করা যাবে। তখন ময়মনসিংহ ত্রিশালের দুলালবাড়ী চুরখাইতে আল-মোমেন ফিসফিড নামে আর একটি মিল স্থাপন করেন। এ মিলে প্রতিদিনে ৪০ টন ফিসফিড উৎপাদন হয়। এছাড়া সমমনা কয় জন বন্ধু মিলে কুমিল্লায় গড়ে তোলেন প্রভাতি ফিসফিড লিমিটেড নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান এখানে মাছের খাবার উৎপাদনের পাশাপাশী মাছের হ্যাচারিও গড়ে তুলেছেন গত ২০০৫ সালে। নিজের মাছের খাবারের চাহিদা মিটিয়ে অতিরিক্ত খাবার বাজারে বিক্রি করেন তিনি। তার উৎপাদিত ফিসফিড দিয়ে এখন দেশের সব বড় বড় মাছের খামারগুলো চলছে। তার শেয়ারের প্রতিষ্ঠান ছাড়া নিজের প্রতিষ্ঠানগুলোতে বর্তমান কর্মরত আছেন ১৮৩ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারী। এছাড়া তার ১০ বিঘা জমিতে চাষ হয় ধান পাট এবং বিভিন্ন শাকসবজী। হাজী আব্দুল মোমেন প্রসঙ্গে তার পিতা হাজী আব্দুল মোতালেবের সাথে কথা হলে তিনি জানান তার পাঁচ ছেলে মেয়েদের মধ্যে মোমেন ছিল সবার ছোট এবং একটু ভাবুক প্রকৃতির। তাদের একটা মুদি দোকান ছিল। মোমেনের লেখাপড়ার চেয়ে কৃষি কাজ ও ব্যবসা বাণিজ্যের প্রতি বেশী ঝোক ছিল। সে দোকানের পাশে একটা ছোট্ট পুকুরে ১০০০ পাঙ্গাশ মাছ ছেড়ে ছিল এবং প্রথম বছরই মাছগুলি বিক্রি করে ১১হাজার টাকা পায়। এতে সে অত্যন্ত আনন্দ উপভোগ করে এবং ঐ বছরই আরো দুটি পুকুর লিজ নিয়ে মাছ চাষ শুরু করে। সে বছর ২লাখ টাকা লাভ করে। তখন জমি কিনে পুকুর কাটা শুরু করে মোমেন। পুকুরের ভিতর মাচা করে বিভিন্ন সবজীর চাষ করেন । একদিন অভাব অন্টনের জন্য মোমেন লেখাপড়া বন্ধ করে দেয়, তবে তাদের আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। প্রতি বছর ব্যবসার পরিধি বাড়তে থাকে। ছেলের এই উন্নতি দেখে হাজী আব্দুল মোতালেব খুব খুশী। সে তার ছেলের উত্তর উত্তর সুন্দর ভবিষ্যত কামনা করে।
এছাড়া হাজী আব্দুল মোমেনকে এলাকাবাসী খুব ভালবাসে এবং সবার সামনে সে এক আদর্শ । ২০০৪ সালে বণ্যার সময় বণ্যার্তদের মাঝে সে নরসিংদী জেলার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমান অর্থের সাহায্য করেন। বর্তমানে মোমেনের ৭৪ একর জমির উপর ৪০টি পুকুর। বিভিন্ন পুকুরে তার ১৫ লাখ পাঙ্গাস ও সাড়ে ৮ লাখ কই মাছ চাষ হচ্ছে। তার সম্পত্তির মোট মূল্যু এখন কয়েক কোটি টাকা। তিনি বলেন মানুষের নিজের কাজের প্রতি বিশ্বাস এবং সে যা ভাবছে সেভাবে যদি কাজ করে এবং তার চিন্তা চেতনা যদি সৎ হয় তাহলে সাফল্য আসবেই। মাছ চাষ কম ঝুকির ব্যবসা। পরিকল্পিত ভাবে চাষ করতে পারলে ব্যাঙ্কের টাকার মত। ব্যাঙ্কের টাকা রাখলে সাপ্তাহিক বন্ধ আছে সকাল বিকাল সন্ধ্যা আছে কিন্তু পুকরে মাছ থাকলে সকাল বিকাল রাত যখন টাকার প্রয়োজন হবে তখন মাছ বিক্রি করে টাকা পাওয়া যাবে। আরো বলেন মাছ চাষের জন্য একটি পুকুরের মাছ বিক্রি করতে হবে। সেই টাকা দিয়ে আর একটি পুকুরের মাছকে খাবার খাওয়াতে হবে। এক সাথে সবগুলো পুকুরে ইনভেষ্ট করতে গেলে সামাল দেওয়া খুব জটিল হয়।

২০০৭ সালে নরসিংদীর একটি নদীতে উৎসব করে মাছ ধরার সময়।
মাছ চাষি হাজি আব্দুল মোমেন দিনে দিনে মানুষের মাঝে অনকে জনপ্রিয় হতে থাকে সদা মিষ্টভাষি ও সদাউজ্জল হাসী তাকে নিয়ে যায় অনেক দুরে এই অল্প বয়সে সবার মনে নিজেকে এমন ভাবে আসন গেড়েছে যে গত ইউনয়ন পরিষদ নির্বাচনে সতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন।
তার সাথে আমার পরিচয় ২০০৬ সাল থেকে কৃষি অনুষ্ঠানের গবেষক ও প্রযোজক হিসেবে তার খামার ও বাড়ীতে আমার অনেকবার যাওয়ার সুযোগ হয়। আমার এই লেখা তার রাজনৈতিক জীবনের আগের। সফলতা কর্ম উদ্দিপণাকে বেগবান করে। সফল ব্যাক্তির সাফল্য অন্যের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে।























