বাংলাদেশে পোল্ট্রি একটি সম্ভাবনাময় ও বিকাশমান শিল্প।
ড. বায়েজিদ মোড়ল

পোল্ট্রি খামারের প্রধান সুবিধা নিজের বাড়ীতেই খামার গড়ে তুলা যায়। পরিবারের সবাই মিলে মুরগীর দেখাশুনা ও পরিচর্যা করা যায়। বিশেষ করে নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বেশি। একটু প্রশিক্ষন নিয়ে খামার গড়ে তুললে চলে, পাশাপাশী একটু যোগাযোগ করলে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও চিকিৎসকরা সার্বিক সহযোগিতা, চিকিৎসা ও কারিগরী পরামর্শ দিয়ে থাকে।
বাংলাদেশে পোল্ট্রি একটি সম্ভাবনাময় ও বিকাশমান শিল্প। নানা প্রতিকূলতার মধ্যে ফার্ম পরিচালনা করেও বাজারে স্বল্প মূল্যে মুরগি ও ডিম সরবরাহ করছে দেশীয় পোল্ট্রি খামারীরা। পোল্ট্রির মাংস ও ডিম উৎপাদন অনেক সহজ ও কম সময় লাগে। বাংলাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। চাষযোগ্য জমি প্রতি বছর শতকরা ২.৫ ভাগ হারে কমে যাচ্ছে। এমন অবস্থায় পোল্ট্রি শিল্প বেশ লাভজনক ও ভূমি সাশ্রয়ী খাত। ৮০’র দশকে পোল্ট্রি শিল্পের যাত্রা শুরু । ৯০’র দশকে বিনিয়োগের পরিমাণ এসে দাড়ায় ১৫০০ কোটি টাকা। সেটা বর্তমানে ৪০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি এসে দাড়িয়েছে। প্রায় ৭০ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হয়েছে। যার মধ্যে ৪৫ শতাংশ নারী উদ্যোক্তা। এখন বলা যায় বাংলাদেশের এমন কোন গ্রাম নেই যে গ্রামে পোল্ট্রি খামার গড়ে ওঠেনি।
ছোট বড় মিলে প্রায় ৭০ হাজার পোল্ট্রি খামার আছে। প্রতিদিন ডিম উৎপাদন হয় প্রায় ২ কোটি। প্রতিদিন মাংশ উৎপাদন হয় ১৯৩০ মেট্রিক টন। সপ্তাহে একদিন বয়সের মুরগির বাচ্চা উৎপাদন হয় প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ।
আগে ডিম ও বয়লার মুরগী আমদানী করা হতো। এখন আমদানী শূণ্য। হ্যাচিং ডিম আমদানী করা হতো। এখন ১১ টি গ্রান্ড প্যারেন্টস্টক ও ছোট বড় মিলে আরো ৮০/৯০টি প্যারেন্টস্টক ফার্মের উৎপাদন দিয়ে দেশের অভ্যন্তরীন হ্যাচিং ডিমের শতভাগ পূরন করা হচ্ছে। এখন দেশে ফিড মিলের সংখ্যা আছে ১৯০টি এর মধ্যে আধুনিক এবং নিবন্ধিত ফিড মিল ৭৮টি। যা থেকে বাৎসরিক প্রায় ৪২ লাখ মেট্রিক টন পোল্ট্রি ফিড উৎপাদন হচ্ছে। আগে শতভাগ প্যাকেটজাত ফিড আমদানী করতে হতো, বর্তমানে তা প্রায় শূণ্য। তবে চাহিদার মাত্র ৩৫-৪০ শতাংশ ভুট্টা দেশে উৎপাদিত হয়। বাকিটা বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানী করতে হচ্ছে।

দেশে এক হাজার মুরগী নিয়ে ফার্ম করা যায়, এমন খামারী আছে। আবার এমনও খামারী আছে, যার ২টি খামার থেকে প্রতিদিন ১৩/১৪ লাখের উপরে ডিম উৎপাদন করা হয়। মাত্র ১০-১২ একর জমির উপর স্থাপনা তৈরী করে। এখন সেডের মধ্যে তিন লিয়ার তাক থেকে সেডে ৬ লিয়ার ৭ লিয়ার ৯ লিয়ার তা‘কে মুরগী রেখে ডিম উৎপাদন হচ্ছে অটোমেটিক সিসটেমে। যেটাকে খামার না বলে ডিম উৎপাদনের ফ্যাক্টরি বলা যায়। এখন ১টি সেডে ৩ লাখ ৮০ হাজার মুরগী পালনের সেড দেশে স্থাপিত হয়েছে।
মুরগীর মাংস প্রসেসিং বা প্রক্রিয়াজাত করে অনেক ধরনের রেডি খাবার তৈরীর কারখানা গড়ে উঠেছে। সেখানে প্রচুর মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে। এখন প্যাকেটেই ডিম ও ডিম জাত অনেক ধরনের খাবার পাওয়া যায়। এখন মহল্লায় মহল্লায় ফাষ্ট ফুডের দোকান গড়ে উঠছে। ডিম সিদ্ধ করে বিক্রি করে মানুষের সংসার চলছে। সিদ্ধ ডিম ফেরি করে বিক্রি করেও মানুষের দিনপাত চলছে। কেবল মুরগীর মাংস ও ডিম থেকে উৎপাদিত বেশ কয়েক প্রকার খাবার বিক্রির নিজস্ব দোকান তৈরী হয়েছে।
মুরগীর মাংস ও ডিম থেকে তৈরী খাবারগুলোর মধ্যে রয়েছে-মোরগ পোলাও, চিকেন খেচুড়ি, চিকেন ঝালফ্রাই, চিকেন ফ্রাইড রাইস, চিকেন ফ্রাই, চিকেন গ্রিল, চিকেন চুপ, চিকেন বল, চিকেন নাগেট, চিকেন সছেস, চিকেন কাটলেট, চিকেন রোস্ট ফ্রাই, চিকেন উইং ফ্রাই, চিকেন লিভার ফ্রাই ও চিকেন চুপ, চিকেন পেটিস, চিকেন রোল, চিকেন বার্গার, চিকেন মাসালা, চিকেন সমুচা, চিকেন সিংগাড়া, চিকেন চিপস, চিকেন কেক ইত্যাদি ইত্যাদি।
২০০০ সালের দিকে দেশে পোল্ট্রি শিল্পে প্রথম বার্ডফ্লু’র সংক্রমণ শুরু হয়। এরপর ২০০৭ ও ২০০৯ সালে দেশে পোল্ট্রি শিল্পে এভিয়েন ইনফ্লুয়েঞ্জা বা বার্ডফ্লু’ মারাত্নক আকার ধারন করে ৷ ঐ সময় ৪০ হাজার খামার বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় ৭০০কোটি টাকা লোকসান হয়। খামারীদের জন্য বিশাল ধাক্কা। বার্ডফ্লুর ধারাবাহিকতায় ২০১০সালে বন্ধ হয়ে যায় ৮৪টি প্যারেন্ট স্টক খামার ও ১৪ হাজার বাণিজ্যিক খামার। ২০১২ সালে অবশিষ্ট থাকে মাত্র ৩২টি প্যারেন্ট স্টক খামার ও ৫০ হাজার বাণিজ্যিক খামার। তখন বার্ডফ্লু নিয়ে ব্যাপক হৈ চৈ হয়। কিছু কিছু খামারী ক্ষতিপুরনের জন্য সরকার থেকে সামান্য কিছু সাহায্য পেলেও বেশির ভাগ খামারী নিঃস্ব হয়ে যায়। নতুন করে খামার করার জন্য তারা ব্যাঙ্ক ঋণও পায় না। নিরাপত্তাহীনতার জন্য পোল্ট্রি খামারে ব্যাঙ্ক ঋন দিতে চায় না।

২০১৩ সাল ও ২০১৫ সালে এসে মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষ। রাজনৈতিক সহিংসতা। হরতাল অবরোধ জ্বালাও পোড়াও পেট্রোল বোমায় ধ্বংসের মুখে পড়ে দেশের পোল্ট্রি শিল্প। লোকসানের পরিমাণ ছিলো সরাসরি দুই ধাপে ৯ হাজার কোটি টাকার উপরে।
কেবল ২০১৩ সালে কমার্শিয়াল লেয়ারে লোকসান ছিলো ১২৫০ কোটি টাকা।
ডিম উৎপাদন খাতে ৮৪০ কোটি টাকা। ডিওসি উৎপাদনে ৪৫০ কোটি টাকা।
ফিড ম্যানুফেকচারিং খাতে ১২০০ কোটি টাকা। ঔষধ খাতে প্রায় ২০০ কোটি টাকা।

সোহেল হোসেন
এ ছাড়াও বন্দর মাশুল, যানবাহন ভাংচুর কিংবা অগ্নি সংযোগ, ব্যাংকের সুদ, মাত্রারিক্ত দামে কাঁচামাল ক্রয়সহ অন্যান্য লজিষ্টিক খাতে লোকসানের পরিমাণ আরো প্রায় ১১০০ কোটি টাকার উপরে। এখানে শেষ নয়, বার্ষিক ৭০-৮০ হাজার কোটি টাকার টার্নওভার থমকে গিয়েছিল।
১৮-২০ হাজার টাকার ট্রাক ভাড়া তখন ১ লাখ ২০ হাজার টাকায় উঠেছিল। তারপরও রক্ষা ছিলনা। মাঝ রাস্তায় গাড়ি ভাংচুর হয়েছিল, আবার আগুনে পুড়ে ছাইও হয়ে গিয়েছিল। শেষ হয়ে যাচ্ছিলো পেট্রোল বোমায় সব কিছু। ঐ সময় মুরগী, বাচ্চা ও ফিড বহনকারী ৭৬টি গাড়ি অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুরের শিকার হয়েছিলো। দিন যতই যাচ্ছিলো লোকসানের পরিমাণ চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ছিলো। পরিবহনের অভাবে মুরগির খাদ্য, ঔষধ এবং আনুষঙ্গিক পণ্য খামারে পৌঁছাতে না পারায় মুরগিগুলোকে বাঁচিয়ে রাখাও কঠিন হয়ে পড়েছিলো। তখন পোল্ট্রি শিল্পের ৬ সংগঠনের সমন্বয়ে জাতীয় সমন্বয় কমিটি (বিপিআইসিসি)ও পোল্ট্রি শিল্পের প্রায় ৫ হাজার মালিক রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধের দাবিতে রাজপথে নেমেছিলো। সেদিনটি ছিল ২০১৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর, ঢাকা জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে প্রায় ২৫ হাজার একদিন বয়সী মুরগির বাচ্চা মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিয়েছিল। রাজপথে ডিম বিছিয়ে দিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছিলো এই পোল্ট্রি খামারিরা। খামারে ডিম ও মুরগির স্তুপ-জমলেও যানবাহনের অভাবে বাজারে পাঠাতে পারছিল না। নিজের হাতে একটা জীব হত্যা করা যে কতো কষ্টের! খামারীরা নিজের হাতে সুস্থ্য সবল মুরগীর বাচ্চা হত্যা করতে পারি নি। তাই বিনা পয়সায় মুরগির বাচ্চা বিলি করে দিতে এসেছিলো, যেন হৃদয়বান মানুষেরা ওদের খাবার দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে পারে। কি মর্মান্তিক ছিলো সে দিনগুলি…

খামারীদের মনের আকুতি, বেচে থাকার লড়াই, আমরা মানব সৃষ্ট দুর্ভিক্ষ চাইনা। আমাদের প্রতিটি দিন সুন্দর ও শুভময় রাখতে চাই। আমার সন্তানকে দুধে ভাতে রাখতে চাই। প্রতিদিন একটি ডিম খাওয়াইয়ে মেধাবী জাতী হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।
তখন খামারীদের অনেক দাবী ছিলো যেমন-
১। দেশের পোল্ট্রি খাতকে হরতাল-অবরোধসহ সব ধরণের রাজনৈতিক কর্মসূচির আওতামুক্ত রাখতে হবে।
২। মুরগী, বাচ্চা, ডিম, ফিড এবং ঔষধ বহনকারী সব ধরণের যানবাহনকে হরতাল-অবরোধের সময় বিশেষ নিরাপত্তা দিতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি।
তাদের আরো কথা ছিলো এমন-আর হানা হানি জ্বালাও পোড়াও চায় না। চায় না রাস্তা ঘাট বন্ধ করে ঘরে বসে থাকতে। চায় না নিজেদের হাতে একটি প্রাণি হত্যা করতে।
একবার ভাবুনতো, পোল্ট্রি মুরগী না থাকলে এক কেজি খাসি কিংবা গরুর মাংসের দাম কত টাকা হবে?
ফার্মে পাঙ্গাশ, তেলাপিয়া আর কৈমাছ চাষ না হলে মাছ খেতে পারতেন? দেশের সম্পদ আমাদেরকেই রক্ষা করতে হবে। সম্পদ বৃদ্ধি করতে হবে।
এরপর রাজনৈতিক অবস্থার উন্নতি হয়, সাথে সাথে ঘুরে দাড়ায় পোল্ট্রি শিল্প। যে যেভাবে পেরেছে আবার পোল্ট্রি শিল্পে বিনিয়োগ করেছে। প্রবাস জীবন যাপন করে দেশে ফিরে এসে পোল্ট্রি শিল্পে বিনিয়োগ করেছে। ২০১৫ সালের পরে এসে সারাদেশে ছোট বড় প্রায় ১৬ হাজার নতুন ব্রয়লার, লেয়ার ও ককরেল মুরগীর খামার গড়ে উঠেছে। নতুন করে এই খাতে আরো ১৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। জিটিডিপিতে পোল্ট্রি শিল্পের অবদান প্রায় ২.৪ শতাংশ। এখন এসে একটি মহল দেশী উদিয়মান শিল্পটাকে ধ্বংশ করার জন্য নকল ডিম ও প্লাস্টিকের ডিম নামে ধূয়ো তুলে কু-প্রচারনা চলানো হচ্ছে।
পোল্ট্রি শিল্পের অগ্রগতির পেছনে কিছু প্রতিবন্ধকতা ও সরকারের কাছে কিছু প্রত্যাশা আছে এই শিল্পের মানুষদেরঃ
- ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে পোল্ট্রি শিল্পের কর অব্যহতি সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়েছে।
- ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পোল্ট্রি ফিডের প্রধান দু’টি উপকরণ ভুট্টা ও সয়াবিন অয়েল কেক এর ওপর থেকে কর ও শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি ছিল। কিন্তু বাজেটে ভুট্টার ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর বহাল আছে এবং সয়াবিন অয়েল কেক এর কাস্টমস শুল্ক শূণ্য করা হলেও নতুনভাবে ৫ শতাংশ রেগুলেটরি ডিউটি আরোপ করা হয়েছে। টাকার অবমূল্যায়ন, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি, কাঁচামাল আমদানিতে অতিরিক্ত খরচ এবং কর ও শুল্ক আরোপের কারণে বিগত তিন বছরে উৎপাদন খরচ ক্রমেই বেড়েছে এবং আরও বাড়বে বলে ধারনা করা হচ্ছে।
- পোল্ট্রি নীতিমালা : কাগজে আছে বাস্তবে নেই।
- পাটের ব্যাগে পোল্ট্রি ও ফিস ফিড মোড়কীকরণে বাধ্যবাধকতা আরোপ। পাটের ব্যাগে মোড়কীকরণ করা হলে ৭-১০ দিনের মধ্যেই বাতাসের জলীয়বাষ্পের সংস্পর্শে এসে তা ছত্রাকে আক্রান্ত হয়ে বিষাক্ত হয়ে পড়বে। আর এই বিষাক্ত ফিড খেলে মুরগির নানাবিধ রোগ-ব্যাধি এমনকি মৃত্যুও ঘটতে পারে।
- এইচ.এস কোডের জটিলতায় চট্টগ্রাম কাস্টমস থেকে পণ্য খালাসে ভোগান্তি বেড়েছে ।
- দেশীয় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে সুদের হার অনেক বেশি। বিদেশী কোম্পানীগুলো যেখানে মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ হার সুদে ঋণ এনে এদেশে ব্যবসা করছে। সেখানে আমাদের দেশে বড় খামারি/উদ্যোক্তাগণও ১০ থেকে ১২ শতাংশের নিচে ঋণ পাচ্ছেন না। আর ছোট খামারীরা মহাজনের চড়া সুদে আছে।
- পোল্ট্রি একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর সেক্টর। একজন স্বচ্ছল খামারিও রাতারাতি নিঃস্ব হয়ে যেতে পারেন। এখাতে পুঁজির নিরাপত্তা নেই। নেই পোল্ট্রি বীমা। পৃথক অধিদপ্তর কিংবা পোল্ট্রি উন্নয়ন বোর্ডও নেই।
- পোল্ট্রির পাইকারি বাজারে খামারি কিংবা উদ্যোক্তাদের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। মধ্যস্বত্তঃভোগীদের দৌরাতœ এত বেশি যে খামারিরা রীতিমত অসহায়।
- পোল্ট্রি শিল্প সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সরকারের তথ্য-উপাত্ত হাল নাগাদ না থাকার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই অনুমান-নির্ভর তথ্য ব্যবহার করা হচ্ছে। ভুল তথ্যের উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিলে ভয়ঙ্কর পরিনাম দেখা দিতে পারে।
- বার্ড-ফ্লু’র ভ্যাকসিনের লো-প্যাথজেনিক ভাইরাসের (H9N2) কারণে খামারিরা বেশ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। ক্ষেত্র বিশেষে উৎপাদন ৩০-৩৫ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পাচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের কারণে খামারিরা হাইলি প্যাথজেনিক এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস (H5N1) এর ভ্যাকসিন আমদানি ও ব্যবহারের অনুমতি পেয়েছে। কিন্তু লো-প্যাথজেনিক ভাইরাস (H9N2) এর ভ্যাকসিন আমদানির অনুমতি পায়নি এখনও। দেশীয়ভাবে ভ্যাকসিন উৎপাদন করাও জরুরী। কারণ জীবানুরা খুব দ্রæত নিজেদের পরিবর্তন করে ফেলে। ফলে পুরাতন ভ্যাকসিন, নতুন স্ট্রেইন এর প্রতিষেধক হিসেবে কোন কাজে আসেনা।
- দেশীয় পোল্ট্রি শিল্প রফতানির জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। প্রয়োজন পোল্ট্রি জোনিং করা দরকার।
- পোল্ট্রি শিল্প উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার পোল্ট্রি উন্নয়ন নীতিমালা-২০০৮’ প্রণয়ন করেছেন। নীতিমালায় যা কিছু বলা আছে তার যথাযথ প্রয়োগ নেই। সারাদেশ জুড়েই প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রাণিসম্পদ কার্যালয় আছে। পোল্ট্রি মুরগী ছাড়াও গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, হাঁস, কবুতর, টার্কি প্রভৃতি বিষয়ক কাজে তাঁদের ব্যস্ত থাকতে হয়। সেখানে দক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারির সংখ্যাও পর্যাপ্ত নয়।
- পোল্ট্রি খামারে এন্টিবায়োটিক ও প্রোবায়োটিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নীতিমালা অনুসরন করার এবং ঔষধের রেসিডুয়াল কার্যকারিতা পোল্ট্রিজাত সামগ্রীতে যাতে না থাকে সেজন্য Withdrawal Period মেনে চলার কথা বলা হয়েছে। প্রথমত: এ নীতি শুধু কাগজে কলমেই রয়ে গেছে। দ্বিতীয়ত: এ সকল বিষয়ে খামারিদের প্রশিক্ষণেরও কোন ব্যবস্থা নেই।
সরকারের কাছে প্রত্যাশা
- দেশের মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার বৃহত্তর স্বার্থে পোল্ট্রি সেক্টরকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত কর অব্যহতি সুবিধা প্রদান করা দরকার। সব ধরনের কাঁচামাল, ঔষধ, প্রিমিক্স এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি আমদানির উপর থেকে সব ধরনের শুল্ক, কর, ভ্যাট এবং এডভান্স ট্রেড ভ্যাট (এটিভি) তুলে নিতে হবে। অগ্রিম আয়কর (এআইটি) বাতিল করতে হবে। কাস্টমস জটিলতা নিরসন করতে হবে।
- ২০২১ সাল নাগাদ প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে ব্যাংক ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে (৫-৭ শতাংশে) নামিয়ে আনতে হবে।
- নিরাপদ পোল্ট্রি ফিডের উৎপাদন এবং এ খাতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার স্বার্থে অবৈধ ফিড মিল এবং টোল ম্যানুফ্যাকচারারদের বিরুদ্ধে জোরালো অভিযান এবং কঠোর আইনী ব্যবস্থা নিতে হবে।
- ছোট-বড় সব ধরনের খামার, হ্যাচারি এবং ফিড মিলকে নিবন্ধনের আওতায় আনতে হবে।
- খোলা বাজারে জীবন্ত মুরগি বিক্রি ক্রমান্বয়ে বন্ধ করতে হবে। ওয়েট মার্কেটগুলো নিয়মিতভাবে জীবানুনাশক দিয়ে পরিস্কার রাখতে হবে।
- ব্যাকওয়ার্ড পোল্ট্রি থেকে যেহেতু জীবানু ছড়িয়ে পড়ছে তাই ব্যাকওয়ার্ড পোল্ট্রিতেও ভ্যাকসিন দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
- বিদেশী কোম্পানীগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। কোন কোন খাতে তারা বিনিয়োগ করতে পারবে, সর্বোচ্চ কী পরিমান মার্কেট শেয়ার নিতে পারবে, কি পরিমান মুনাফা নিজ দেশে নিয়ে যেতে পারবে কিংবা রি-ইনভেস্ট করতে হবে ইত্যাদি বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকতে হবে।
- পোল্ট্রি ওয়েস্ট রিসাইক্লিং প্লান্ট স্থাপনকে উৎসাহ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে। এখাতে দাতাদের দেয়া ফান্ডকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে।
- পোল্ট্রি প্রসেসিং ও ফারদার প্রসেসিং ইন্ডাষ্ট্রিকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করতে হবে।
- ২০২১ সাল নাগাদ এ শিল্পে বিনিয়োগের পরিমান ৫৫-৬০ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করতে হলে পুঁজির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। পোল্ট্রি বীমার ব্যবস্থা করতে হবে। পোল্ট্রি’র জন্য পৃথক অধিদপ্তর বা পোল্ট্রি উন্নয়ন বোর্ড গঠন করতে হবে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারিদের রক্ষায় সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে।
- বাংলাদেশে জনপ্রতি মুরগির মাংস খাওয়ার পরিমান বছরে মাত্র ৪.২ কেজি। আমেরিকায় মুরগির মাংস খায় জনপ্রতি প্রায় ৫০.১ কেজি। কানাডায় প্রায় ৩৬.৫ কেজি।
- জনপ্রতি নূন্যতম ডিম খাওয়া উচিত বছরে ১০৪ টি। উন্নত বিশ্বে বছরে জনপ্রতি গড়ে প্রায় ২২০ টির মত ডিম খাওয়া হয়। জাপানে জনপ্রতি ডিম খাওয়ার পরিমান বছরে প্রায় ৬০০টি। আমাদের দেশে এর পরিমান জনপ্রতি মাত্র ৪৫-৫০টি। পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে, স্বাস্থ্যবান ও মেধাবী ভবিষ্যত প্রজন্ম গড়তে হলে ডিম ও মুরগির মাংস খাওয়ার পরিমান অন্ততঃ দ্বিগুণ করতে হবে। কনজাম্পশন বাড়াতে সরকারিভাবে প্রচার-প্রচারণার উদ্যোগ নিতে হবে।
উৎপাদনমুখী এ শিল্পটি বিকাশের সব সুযোগ এদেশে বিদ্যমান। বর্তমান সরকার সাম্প্রতিকালে পুষ্টি নীতিমালা পাশ করেছেন। বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য এম.ডি.জি ভিশন-২০২১ বাস্তবায়নের জন্য সরকার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সরকার ও বেসরকারি পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের যৌথ উদ্যোগে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রণয়ন করে সামনে এগিয়ে যাবে পোল্ট্রি শিল্প।
























