ডাইরির ছেড়া পাতা
(একটি সত্য ঘটনা অবলম্বোনে লেখা)

আসিফ একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীতে চাকরি করে। এখনো বিয়ে করেনি। মেঝবোন সায়মাকে বিয়ে দিয়েছে দুই বছর আগে। বাড়ীতে কলেজে পড়ুয়া ছোট বোন রায়মা রয়েছে। তার বিয়ে ঠিক করে এক সাথে আসিফ বিয়ে করবে, এই ওর পরিকল্পনা। কোম্পানীর কাজে ২০ দিনের জন্য আমেরিকায় গিয়েছিল। সেখান থেকে ফিরে আসিফ গ্রামের বাড়ীতে যায়। মা বাবার সাথে দেখা করতে। আসিফ বাড়ীতে এলে বোন সায়মাও বেড়াতে আসে। সায়মার বিয়ে হয়েছে খুলনা শহরে। সায়মার স্বামী ব্যাঙ্কে চাকরি করে।
আসিফ চাকরি করে গ্রামেই একটি দোতলা বাড়ী করেছে। ভিতরে বাহিরে টাইলস দিয়েছে বলে, রাস্তা দিয়ে যাবার সময় সবাই এই বাড়ীর দিকে একবার তাকায়। অনেকে জিজ্ঞেসও করে বাড়ীটি কে করেছে? কারণ এখানে এ রকম একটি সুন্দর বাড়ী গড়ে উঠবে, যেটা অনেকের ধারণার বাইরে। আসিফ বাড়ীতে এলে আশপাশের অনেকে এসে তাদের বিপদ আপদের কথা বলে, আসিফ তাদের সাধ্যমত আর্থিক সাহায্য করে। আসিফ রাতের খাওয়া শেষ করে, ড্রয়ইং রুমে বসে টিভি দেখছে। রায়মা এই কিছু দিন হলো গান শিখছে। অনেকগুলো গান সে আয়াত্ব করে ফেলেছে। রায়মা গান গায় পাশে সায়মা বসে আছে। গানের সুর আসিফের কানে ভেসে আসে। আসিফ টিভির ভলিউম কমিয়ে গানের কথাগুলো শুনছে…
বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ঐ
মাগো আমার শোলক বলা কাজলা দিদি কই।।
আসিফ গানের কথাগুলো শুনে, ও পাশের আলমারী থেকে একটি পুরাতন ডাইরি বের করলো। তারপর ডাইরির পাতা উল্টায় আর চোখ দিয়ে পানি ছেড়ে দিয়ে, ডায়রির পাতায় চোখ বুলায়। ও ফিরে পায় ওর অতীত আর সত্যকে…
মিয়া মোঃ কুদ্দুস আলির বড় ছেলে মিয়া মোঃ মিজানুর রহমান। মিজানকে বিবাহ দিবেন বলে মেয়ে দেখতে গেলেন। মেয়ে দেখে পছন্দ হয়ে গেল রাতে নানার সাথে মিজানকে পাঠালেন আবার মেয়ে দেখতে। মিজান সানজানাকে দেখে পছন্দ করল এবং নানাবিদ প্রশ্ন করল। সত্য ও সঠিক সব প্রশ্নের জবাব দিল সানজানা ও সানজানার বড় ভাই আসিফ। সানজানাকে আসিফ খুব ভালবাসে আদর করে কখনো ওর মনে কষ্ট দেয়া কথা বা ঝগড়া করে না, বড় অন্যায় করলেও।
মিজান সব কিছু শুনে এক খানা চায়না ফনিক্স সাইকেল, একটি ঘড়ি ও অন্যান্য ঘর সাজানো মালামাল যৌতুক হিসাবে চেয়ে বিয়ে করিতে চায়। দারিদ্র পিতা এসব দিতে রাজী হয়। সেই সাথে একটি কথা বলে, আমি এক সাথে সব দিতে পারব না। তাই আমাকে সময় দিতে হবে, আমি একটি একটি করে সব জিনিস দিয়ে দিব। এ কথার উপর ভিত্তি করেই বিয়ে হয়ে যায়।
সানজানা মিজানের দাম্পত্য জীবনে দেড় বছর অতিবাহিত হল। মিজান বিয়ে করে সুন্দরী সানজানাকে নিয়ে নতুন সংসার সাজালো পিতাকে বাদ দিয়ে। পিতা ও সৎমা ঘোর শক্র হয়ে গেল। তারা সারাক্ষন পুত্র ও পুত্রবধুর অকল্যান কামনা করতে লাগল। সেই সাথে বিভিন্ন ওঝা-কবিরাজ ও দরবেশের কাছ থেকে তদবির, দাওয়া, তাবিজ সংগ্রহ করিতে লাগল। যাতে করে মিজান বউকে ফেলে পিতার কাছে চলে আসে। পিতা ও সৎমার স্বভাব চরিত্র ও কথাবার্তা বিশেষ করে ভাল না। কোন কোন তাবিজ আবার একটু কাজ দেয়, মিজান পাগলের মত ছুটে যায় পিতার কাছে। তখন তারা পরামর্শ দেয় বউকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য। কারন বিয়ের সময় অনেক কিছু আশা করে ছিলেন। কিন্তু ছেলের সানজানাকে দেখে পছন্দ হওয়ার জন্য এই সামান্য যৌতুকে রাজী হয়। তারপর এখন সাইকেল বাদে বাকী সব জিনিস পত্র দারিদ্র শ্বশুর কিনে দিয়েছেন এবং তাহা নিয়ে ছেলে বউ সংসার সাজিয়েছে। এতে করে কুদ্দুস আলির লাভটা হল কোথায়? তাই চায়না ফনিক্স সাইকেল বা তার সমমূল্য দাবী করে বসে।
আসিফ পড়াশোনায় ব্যস্ত। সায়মা, রায়মা ও বৃদ্ধ দাদীকে নিয়ে পরিবারের সদস্য ৬ জন। আসিফের পিতা ভাড়ার ভ্যান চালিয়ে যা আয় করে তা দিয়ে সংসার চালাতেই হীমশীম খেতে হচ্ছে। চাল কিনতে নুন পুরায়।
মিজান বাড়ী করেছে দিঘলিয়া থানার দেয়াড়া গ্রামে। মহল্লাটাকে কলোনী বলা হয়। এই কলোনীতে আস্তানা করেছে দৌলতপুর খুলনার প্রখ্যাত মাস্তান ও একাধিক খুনী মামলার ফেরারী আসামী। সুন্দরী ও সারল্যময় সানজানাকে দেখে ওর খুব ভাল লাগে। তাই বোন বলে স্বস্নেহে কাছে টেনে নেয় গরীব মেয়েটিকে। মিজান এদের সাথে যোগদেয়, সন্ধ্যার পর বাড়ীতে চলে আসে ও ভাবে এদের পাশে থাকলে সবাই ওকে ভয় পাবে। যাকে যা খুশি বলতে পারবে। ওর মনে মনে অনেক সাহস হয়। এই সুযোগে ওই শয়তান, কখনো ভালবেসে কিছু খাদ্য কিনে দেয়, আবার কখনো মাছ মুরগী কিনে দেয় রান্না করে দেবার জন্য। গ্রাম্য অল্প শিক্ষিতা সানজানা পরের চিন্তা না করেই সহজ ভাবে মেনে নিয়ে স্বামীর কথামত কাজ করে।
প্রতিবেশী সকল মহিলারা সানজানার এ আবির্ভাব সহ্য করিতে পারে না। তাদের সাথে যোগ দেয় মিজানের ফুফু ও ফুফাত ভাই ভাবী বোনরা। তাতে বোঝা যায় সানজানার শক্র মহল্লার সবাই। খুনি, পলাতক ওয়ান্টেড মাস্তান রোকনের ভয়ে সানজানাকে কিছু বলতে পারে না। তবে দুর থেকে ঢিল ছুড়ে ছুড়ে মারে। সেই সাথে মিজানের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সময়টাকে কাজে লাগায় এবং সানজানার বিরুদ্ধে কুৎসা রটাতে দ্বিধাবোধ করে না। মিজান সানজানাকে ঝগড়া ঝাটি করে আবার প্রহর করে কখনো কখনো। সেই সাথে পিতা ও সৎমার পরামর্শে সাইকেলের জন্য চাপ প্রয়োগ করে। কাজ কর্ম নেই ঠিকমত তিন বেলা পেট পুরে খেতে পারছে না। এখন সাইকেল কিনে দিবে কিভাবে। শুধু ওয়াদা করে আর সময় নেয়। এভাবে সামনে ভাল কাজ কর্ম হবে সে সময় সাইকেলটা কিনে দিতে পারবে। কিন্তু পারে না, সময় আর আসেনা, যেমনটি চায়। আসিফ ম্যাট্রিকে ভালো রেজাল্ট করে দৌলতপুরের সরকারী বিএল কলেজে ভর্তি হয়। সানজানা আসিফকে ওদের বাড়ীতে বেড়াতে যেতে বলে। সানজানার অনুরোধ ও কান্না কাটিতে শান্তনা দিবার জন্য বলে আমি যাব তোদের বাসায়। তোদের বাসায় যেতে গেলে আমার মিষ্টি নিয়ে যেতে হয়। আমাকেতো এক কেজি মিষ্টি কিনে নিয়ে যাওয়ার তৌফিক খোদা দেয়নি এখনো। তারপরও একদিন এক বন্ধুকে সাথে নিয়ে বোনকে দেখতে গেল। বোনের কাঁদ কাঁদ কন্ঠ ও মলিন মুখ দেখে ভাইর বুকটা ফেড়ে যাচিছল।
কথা প্রসঙ্গে সানজানা একটি কথা বলল-মিয়াভাই, সাইকেল দেওয়ার কথা ছিল কিন্তু দিতে দেরি হচ্ছে বলে. ওরা আমাকে দাঁতের উপর রাখে। রাত দিন ঝগড়া করে, আমাকে মারে। আবেগে আপ্লুত হয়ে পিঠের কাপড় সরিয়ে ফেলল, তিন চারটি প্রহরের চিহ্ন দেখতে পেল। হাতের পেশী ও ঘাড় বরাবর একটি লম্বা লাল রেখা টানা দেখে আরেক দিকে মুখ ফিরালো এবং চোখ বুঝে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল আসিফ। চোখ দিয়ে দু ফোটা পানি গড়িয়ে গেল। বুক ফেড়ে আর্তনাদ আসছিল বন্ধু রয়েছে সাথে তাই নিজেকে সামলিয়ে নিল। বোনকে শান্তনা দিতে গিয়ে বলল- সানজানা আমি সাইকেল কিনে নিয়ে তারপর তোদের বাড়ীতে আসব।
চারিদিকে সানজানার বিরুদে ষড়যন্ত ও চক্রান্ত চলছে। সানজানা একদিন রাগ করে বাড়ি চলে গেল। সাইকেল কিনে না দিলে ও আর আসবে না। মা ভিষন বিপদে পড়ল। সানজানাকে বিভিন্ন ভাবে বুঝাতে লাগল। বুঝানো ছাড়া আর কি করার আছে। দারিদ্র পরিবার থেকে এক সাথে সাত/আট হাজার টাকা বের করা কি সম্ভব? সময় না হলে দিতে পারবেনা।
রোকন অতি চতুর। সবাই তার গতিবিধি বুঝে ফেলবে বুঝে, মিজানকে চাপ দিল শ্বশুরালয় থেকে সানজানাকে ফিরিয়ে আনতে। মিজান গেলে, আসিফের মা জামাই মিজানকে কাকতি মিনতি করে আর কিছুদিন সময় নিল। এর ভিতর সানজানাকে আর কখনো কিছু বলবেনা। সানজানা সকলের অনুরোধে মাকে শুধু একটি কথা বলে আসলো। আমি যাবনা, তোমারা আমাকে জোর করে পাঠাচ্ছো। ওরা যদি আমার উপর আবার নির্যাতন করে, তাহলে আমার লাশ আসবে এ বাড়ীতে। এসব সংবাদ ওর বড় ভাই হিসেবে আসিফ কিছু জানেনা। সে লজিং থেকে পড়াশুনা করছে। বেশ কয়েকটি টিউশানী করে তিন হাজার টাকা সংগ্রহ করে ফেলেছে। ভাবছে আর দুই তিন মাস পরেই সাইকেলের টাকা হয়ে যাবে। তারপর সাইকেল কিনে নিয়ে বোন সানজানার বাড়ীতে যাবে।
দুপুর বেলা ক্লাস শেষ করে কলেজে মাঠের ভিতর দিয়ে হাটছে। একটি ছেলে এল আসিফকে খোজ করিতে। ছেলেটির কাছে সংবাদ শুনল সানজানার খুব অসুখ। আসিফের লজিং বাড়ীর ছাত্র-ছাত্রীর পরীক্ষা চলছে। সব কিছু উপেক্ষা করে ছুটল আসিফ। ওর মনের ভিতর কেমন যেন একটা খটকা লাগল। পকেটে ঐ তিন হাজার টাকা আছে। একটা হাহাকার একটা শুন্যতা অনুভব করল। বোনের বাড়ীর নিকট যেতেই বুঝতে পারল কোন একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে। সানজানা বলে একটি চিৎকার করে ছুটে গেল ভিতরে। লোকের ভিড় ঠেলে দেখতে পেল, সানজানা উত্তর দক্ষিন হয়ে শুয়ে আছে উঠানে। সবাই ওকে ঘিরে আছে তখন আসিফের কানে শুধু একটি কথাই ভেসে এলো ‘ওরা সারাক্ষন আমাকে দাঁতের উপর রাখে। রাতদিন ঝগড়া করে, আমাকে মারে’ আসিফ প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে কাগজে জড়ানো তিন হাজার টাকা বের করে টাকার দিকে আর সানজানার মুখের দিকে বার বার তাকাতে লাগল। হাতের টাকাগুলি সানজানার মাথার কাছে উড়ে গিয়ে পড়লো। ও শুধু সানজানার গলার ফাঁসে আঁটা কালো দাগের দিকে চেয়ে রইল। কন্ঠ থেকে শব্দ বের করে, সাইকেল, একটি সাইকেলের জন্য আমার বোনটি মারা গেল।
এরপর আসিফ কলেজে খুব মন মরা হয়ে থাকে। হাসে না, কারো সাথে মেশে না। ওর এই মন মরা অবস্থা দেখে ওর বন্ধু সোহাগ ওর কাছে জানতে চায়, তার মন মরা থাকার ঘটনা। সোহাগ সব কথা শুনে, ওকে শান্তনা দিল-বন্ধু তোর বোন যদি বদমায়েশ রোকনের কারনে মারা যেয়ে থাকে, তো তুই তোর বোনের মৃত্যুর চল্লিশার আগে বিচার পেয়ে যাবি। সত্যি সত্যি ঘটে গেল সে রকমই এক ঘটনা। চল্লিশার আগেই খুনি রোকন মিজানুরসহ তিন সহচর এক রাতে খুন হয়ে যায়। রোকনের বুক গুলি করে ঝাঝরা বানিয়ে দেয়। রোকনের লাশ চেনা পর্যন্ত যাচ্ছিল না। আসিফ, মিজানুর ও রোকনের মৃত্যর খবর পেয়ে ছুঠে যায়। মিজানুর ও রোকনের লাশ আসিফ দেখতে পায়না, তবে বোনের মৃত্যর প্রতিশোধ নিয়েছে আল্লাহ সেটা মনে করে। ঐ দিন রাতে শুয়ে শুয়ে ভাবছে সোহাগকে ওই রোকনের ঠিকানা বলে দিয়েছিল এবং সোহাগ ওকে যে প্রতিশ্র“তি দিয়েছিল সেটা সত্যি সত্যি বাস্তবায়ন হলো। ধরে নিল সোহাগ বন্ধু হলেও, সে কিন্তু কোন আন্ডার গ্রাউন্ড পার্টির সাথে জড়িত থাকতে পারে। ও প্রচন্ড বেগে সোহাগকে ভয় পেল। কিন্তু কি আর হবে, সোহাগ অনার্স পরীক্ষা চলাকালীন অবস্থায় রাত ৯ টার দিকে সন্ত্রাসীদের হাতে মারা যায়। আসিফ মনে মনে ভাবে অনার্স পরীক্ষা শেষ হলেই ঢাকা চলে যাবে। ঢাকায় গিয়ে মাস্টার্স করবে।
অনার্স পাস করে আসিফ ঢাকা চলে আসে। একটি রিসার্চ ফার্মে ফিল্ড ইনভেষ্টিগেটর হিসেবে কাজ করে। এভাবে দুই বছর ঐ ফার্মে কাজ করতে থাকে, এর মধ্যে মাস্টার্স পাস করলে একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীতে চাকরি পায়।
চোখের সামনে ভেসে ওঠে আসিফের সত্যিকারের কাজলাদিদির মুখ। তখনো গ্রামে ইলেকট্রিসিটি যায়নি, অজ পাড়া গাঁ। সানজানা আসিফের শাট প্যান্ট পরিষ্কার করে রোদে শুকিয়ে কাঁসার বাটি গরম করে ইস্ত্রি করে দিত। আসিফ রাত জেগে বই পড়তো, সানজানা পাশে বসে থাকতো। আসিফ যাতে বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে না পড়ে। আসিফ বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়লে বলতো ‘মিয়াভাই, চোখে পানি দিয়ে আসো, তাহলে ঘুম কম আসবে।’ আসিফ বলতো ‘সানু, তুই আমার সাথে রাত জেগে থাকিস কেন? ঘুমিয়ে পড়।’ সানজানা বলতো-‘মিয়াভাই, তুই লেখা পড়া করিস। লেখা পড়া করতে গেলে মাথায় অনেক চাপ পড়ে, তার জন্য দুধ ডিম ফল মুল খেতে হয়। তাতো আমাদের ভাগ্যে নেই। তোর পাশে বসে থাকি, তুই ঘুমিয়ে পড়লে ডেকে দিই। তোর ভাল রেজাল্ট শুনলে আমার খুব ভাল লাগে, মিয়াভাই। যখন কেউ তোর ভাল বলে, আমি খুব আনন্দ পাই। খেয়ে পরে তো কোনদিন সুখ পায়নি, তোর পাশে বসে থেকেই সুখ পাই।’ আসিফ বলে-‘সানু, আমাকে নিয়ে তুই কি ভাবিস?’ সানজানা বলে-‘মিয়াভাই, আমি কি ভাবি তুই বুঝিস না? আমরা তিন বোন, তুই আমাদের একটি মাত্র ভাই। তোর ওপর নির্ভর করছে আমাদের তিনটি বোনের ভাগ্য। তুই যদি বড় হোস, আমরা তিন বোন ভাল থাকবো। আর তুই যদি মানুষ হতে না পারিস, আমাদের এই পোড়া কপাল আজীবন পোড়া থাকবে। কোনদিন সুখের মুখ দেখতে পারবো না।’
সানজানা ছোট বেলা থেকে নামাজ পড়তো। রাতে এশার নামাজ পড়ে মোনাজাতের সময় আসিফের জন্য দোয়া করতো প্রতিদিন। ‘আল্লাহ আমার মিয়া ভাইকে সব সময় ভাল রেখ। আমার জীবনের বিনিময় হলেও আল্লাহ তুমি আমার মিয়াভাইকে মানুষের মতো মানুষ করবা। আমার মিয়াভাইকে অনেক বড় অফিসার বানাবা।’
সানজানা রাত জেগে বসে থাকতো লেবু আর লবন দিয়ে সরবত বানিয়ে। আসিফের শরীর কখনো খারাপ হলে সানজানা পাগল হয়ে যেত। একটি বাচ্চা ছোট থাকলে মা যা করে। ঠিক ছোট বোন হয়ে সলামা বড় ভাইয়ের জন্য তাই করতো। আসিফের পরীক্ষায় ভাল রেজাল্টের জন্য সানজানা আল্লাহর কাছে নফল রোজা মানোত করতো, নফল নামাজ মানোত করতো।
দারিদ্রের কষাঘাতে এমন লক্ষীকে এক অযোগ্য কুপাত্রের হাতে অর্পন করেছিল। যে বোনটিকে যত্ন করেনি। নিজের ভাবেনি। একদিন ভগ্নিপতি মিজান স্বামী হয়ে রাতের আধারে সানজানাকে এক লম্পট রোকনের হাতে তুলে দেয়। সানজানা নিজেকে বাঁচানোর জন্য, নিজের সম্মান বাঁচানোর জন্য, শত চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। মিজান রোকনকে রাতের আঁধারে নিজের ঘরে ঢুকিয়ে বাহিরে বসে পাহারা দিয়েছে। বউকে দিয়ে কিছু টাকা আয়ের ধান্দা করেছে। মহাসম্ভ্রম হারিয়ে আত্নহননের পথ বেছে নিয়েছিল আসিফের কাজলা দিদি। আসিফ, দু®কৃতিকারী রোকন আর মিজান আরেক সন্ত্রাসীদের হাতে খুন হওয়ার আগে জানতে পারেনি এই ঘটনা। জানতে পারলে হয়তো ঘটনা তখন অন্যরকম হতো।
সায়মা-রায়মা সানজানার কথা ভুলে গেছে। কারণ ওরা তখন অনেক ছোট ছিল। সানজানা ভাতের হাড়ির প্রথম ভাত আসিফের জন্য রাখতো। আসিফ ভাত না খেলে সানজানা কখনোই ভাত খায় নি। সায়মা-রায়মাকে বলতো-তোমরা কখনোই মিয়াভাইর চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলবে না।
হতভাগা সানজানার যখন বিয়ে হয় তখন আসিফের কোন মত ছিল না। আসিফের ইচ্ছা ছিল ও লেখা পড়া শেষ করে ভাল চাকরি করবে। ওর বেতনের টাকা দিয়ে ও সানজানাকে জামা কাপড় কিনে দিবে, সাজনা-গাজনার জন্য স্নো, পাউডার, লিপিষ্টিক, ফিতা কিনে দিবে। সানজানা সেগুলো পরে আসিফের সামনে দিয়ে ঘুরবে। খুশি হয়ে মিয়াভাইকে জড়িয়ে ধরবে। কিন্তু মাত্র দেড় বছরের ছোট এই সানজানা। তাইতো দেশের নিয়ম অনুযায়ি বোনকে অনেক আগেই স্বামীর ঘরে চলে যেতে হয়। আসিফ সানজানাকে বলেছিল-‘সান, তুই বিয়েতে রাজি হোসনে।’ তখন বুদ্দিমতি সানজানা আসিফকে বলেছিল-‘মিয়াভাই, আমাকে নিয়ে তোর ইচ্ছে কি, সেটা আমি জানি। তোর ইচ্ছাটা সায়মা ও রায়মাকে দিয়ে পূরণ করিস। তোর কাছে আমি ছোট থাকলেও সমাজের কাছে আমি বড় হয়ে গেছি। এখন আমার বিয়ে না হলে, সমাজে আমার নামে বদনাম হবে, গ্রামের মানুষ আমার নামে দূর্নাম ছড়াবে। তোর ও আব্বার, সবার নামে নানা কথা বলবে, এই সমাজের মানুষেরা। আর বোন বড় হলে স্বামীর ঘরে চলে যায়। ভাইয়ের কাছ থেকে বোন অনেক দুরে চলে যায়। অনেক দুরে। এই সত্যকে মেনে নিতে হয় ভাই। আর আমিতো তোকে ছেড়ে খুব বেশি দুরে যাচ্ছিনা। তোকে যখন দেখতে মন চায়, চলে আসবো তোর কাছে। তুই চলে যাবি আমার শ্বশুর বাড়ীতে।’
সেদিন সত্যকে উপলব্ধি করে অনেক কেঁদে ছিল আসিফ। সানজানা কথা দিয়ে কথা রাখেনি। আসিফের এখন সানজানাকে একটু দেখতে মন চায়। মন চায় বুকে জড়িয়ে ধরে লক্ষী ছোট বোন বলে আদর করতে। সানজানার সব চাওয়া পাওয়া পূরণ করতে। মন চায় সানজানাকে সুন্দর কাপড় পরিয়ে সাজু গুজু করিয়ে রাজ রানী বানিয়ে চোখের সামনে সানজানার হাসি খুশি মুখটা দেখতে। সানজানার সমস্ত আবদার পূরণ করার সামার্থ আসিফের আছে। কিন্তুসানজানা আজ চলে গেছে অনেক দুরে। তাই সানজানাকে ছেড়ে ওর অনেক কষ্ট। চাপা কষ্ট। কোমলমতি এতো সুন্দর একটি লক্ষীবোন, ওকে ফাঁকি দিয়ে চলে যাবে। ও তখন বুঝতে পারিনি। বুঝতে পারলে হয়তো সানজানাকে বিয়ে দিত না। আসিফের মতো তেমনি প্রতিটা ভাই যদি বুঝতে পারতো, তার আদরের বোন স্বামীর ঘরে গিয়ে কষ্ট করবে, স্বামীর অমানুষিক নির্যাতনের স্বীকার হবে, তাহলে কোন ভাই, তার আদরের বোনকে, বিয়ে দিয়ে, স্বামীর ঘরে পাঠাতো না। সারাটা জীবন ভাইয়ের সংসারে আগলে রাখতো। এমনি ভালবাসে প্রতিটা ভাই, তার বোনকে। ভাই সব যন্ত্রনা সহ্য করতে পারে, বোনের অপমান জীবত অবস্থায় সহ্য করতে পারে না।
আসিফ একদিন পুর্নিমার রাতে ভাঙ্গা ঘরের ফাঁকা দিয়ে আকাশের তারার কালপূরুষ দেখতে ছিল। সানজানা পাশে বসে বলেছিল-‘মিয়াভাই তুমি কি দেখ?’ আসিফ বলেছিল-‘কালপুরুষ।’ তখন আবার সানজানা বলেছিল-‘ঐ কালপূরুষটা তুমি, আর ঐ পাশের মিটমিট করে জ্বলছে যে তারাটি ঐটা আমি।’ আসিফ যখন তার কাজলাদিদির কথা মনে পড়ে, তখন ও আর ওকে সামলায় রাখতে পারেনা। অঝোর ঝরে চোখের পানি ফেলে কাঁদতে থাকে। দারিদ্রতা ওর কাজলাদিদিকে ওর কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে। আজ সানজানার স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয়েছে, কিন্তু সানজানা চলে গেছে আকাশের তারা হয়ে আকাশে। মিটমিট করে জ্বলছে। আসিফের যখন সানজানার কথা মনে আসে তখন ঐ দুর আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। আকাশের তারার মাঝে ওর শোলক বলা কাজলাদিদিকে দেখতে পায়।
রায়মাকে ডেকে আসিফ একটি গানের চারটি লাইন সুর করার জন্য বলে…
যার শুভ কামনায় এ মন
পেল আজ সুখের সন্ধ্যান
সে হলো… সে হলো
মায়ের মমতায় বোন।।
**********






















