ছোট পাপ বড় প্রায়শ্চিত্য
(গল্পটি কাল্পনিক কারো জীবনের সাথে মিলে গেলে আন্তরিকভাবে দুখিত)

রুমানার ছেলে নাবিদুল চৌধুরি লিয়ন আজ ২২ বছরের যুবক। ভার্সিটির ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র। পড়াশুনার পাশাপাশি নাচ গান বক্সিং খেলাধুলায় অদ্বিতীয়। ক্লাস রুমের বারান্দায় দ্রুত পদে ছুটেতে যেয়ে ধাক্কা লেগে পড়ে যায় লাকমি ও লিয়ন। কালো সানগ্লাস পরিহিতা লাকমি ধাক্কার জন্য লিয়নকে দোষারোপ করে। ও বলে ‘এই যে মিঃ পথ দেখে চলতে পারেন না।’ উত্তরে নিয়ন বলে ‘চোখে এরকম কালো সানগ্লাস থাকলে পথতো দুরের কথা কিছুই চোখে বাধে না।’ একথায় লাকমি অপমান বোধ করে।
লিয়নের পরীক্ষা শেষ। রেজাল্ট বের হওয়ার অপেক্ষায়। লিয়ন ফার্ষ্ট ক্লাস ফার্ষ্ট হওয়াতে ওর বন্ধু বান্ধবগুলো ওকে নিয়ে আনন্দ ও উলাসে ফেটে পড়লে লাকমির তখন হিংসা লাগে। প্রতিশোধ স্বরুপ রাস্তা দিয়ে লিয়ন চলার সময় দ্রুত গতিতে গাড়ী চালিয়ে রাস্তার কাঁদা পানি লিয়নের গায়ে লাগিয়ে দেয়। লিয়নের বন্ধু নাননু লাট সাহেবের বেটি বলে গালি দিয়ে গাড়ীর প্রতি ক্ষিপ্ত হলে, লাকমি গাড়ী ব্যাক করে লিয়নকে বলে ‘চোখে কালো সানগ্লাস ছিলতো তাই দেখতে পাইনি।’ লিয়ন কোন কথা বলে না। তারপর লাকমি আবার বলে ‘বাসায় গিয়ে মাকে বলবে সাবান দিয়ে পরিষ্কার করে দিতে। গায়ে একটু কাঁদা লেগেছে তো’ তখন লিয়ন বলে ‘দেখ তুমি আমাকে অপমান করলে? কিন্তু মনে রেখ আমি অপমানবোধ করি নাই। আর তোমার মত এতো সুন্দর একটা মেয়ে আমার গায়ে কাঁদা লাগিয়ে দিয়েছে। এটাতো আমার সৌভাগ্য। তুমি আমার তিন ক্লাস নিচে পড়ো। তোমার সাথে আমার আড়ি ঝগড়া হওয়া উচিত নয়। তোমার সাথে আমার বন্ধুত্ব হতে পারে। যে বন্ধুত্বের সুত্র ধরে একদিন ঘর বাঁধা যায়। এক সাথে বসবাস করা যায়।’ লাকমি লিয়নের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। লিয়ন সিনেমার নায়কদের মতো করে প্রস্তাব দিয়ে চলে যায়। লাকমির সামনে এমন করে কেউ কোনদিন প্রেম নিবেদন করেনি। তাইতো কারো চোখে চোখ রাখেনি লাকমি। লাকমি লিয়নকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা শুরু করে। কিন্তু লিয়ন কোন সাড়া দেয় না। লাকমি ওর মাকে লিয়নের কথা বলে। রুমানা হক আলমকে জানায় লাকমির পছন্দ। আলম লিয়নের পরীক্ষার রিজাল্টের কথাশুনে খুশি হয়। লিয়নের মা নিলা চৌধুরী ও লাকমির পিতা মাতা এদের পছন্দকে স্বীকৃতি দিলে। লিয়ন বলে যে প্রেমে কোন ড্রামা নাই, কোন বাধা নেই, কোন বিচ্ছেদের সুর নেই, সে প্রেম, প্রেম নয়।
যশোর জজ কোর্টের এ্যাডভোকেট আরিফুল হকের একমাত্র সুন্দরী ও শিক্ষিতা কন্যা রুমানা হক। চক্রান্তের স্বীকার হয়ে প্রেমিক আলমের দ্ধারা গর্ভ ধারন করে। রুমানা হক গর্ভের সন্তান নষ্ট করতে চায় না। কারণ আলমকে সে পছন্দ করতো, ভালবাসতো। সে মনে করে আলম তার ভুল বুঝতে পারবে এবং ভালবাসার টানে রুমানার কাছে ফিরে আসবে। এভাবে ডেলিভারির সময় হয়, আলম ফিরে আসে না। রুমানার গর্ভে একটি পুত্র সন্তান হয়। হাসপাতালে হক সাহেব পুত্রটিকে হত্যা করে ফেলতে চায়, নিজের দাম্ভিকতা ও বংশ মর্যাদা রক্ষার জন্য। কিন্তু কর্মরত সেবিকা নিলা চৌধুরী, সন্তানটিকে না মেরে নিয়ে যায় এবং হক সাহেবকে কুমারী মেয়ের মা হওয়ার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেয়। তখন স্বাক্ষী হয় থাকে বাড়ীর পুরাতর চাকর ভোলা। রুমানা হক জ্ঞান ফেরার পর জানতে পারে তার মৃত পুত্র সন্তান হয়ে ছিল।
ও দিকে নিখোজ হওয়া আলম তিন বছর পর ফিরে আসে রুমানার কাছে। আলম রুমানাকে ভালবাসতো। আর যাকে ভালবাসা যায় তাকে ভুলা নাহি যায়। যত দুরে যাওয়া হোক না কেন ভালবাসা মনের মাঝে কুড়ে কুড়ে খায়। দুর থেকে ভালবাসা আরো বেশি উপলব্ধি করা যায়। ভালবাসার কাছে জিদ অহংকার সব কিছু বিলিন হয়ে যায়। চোর চোর ভয় ভয় মনে রুমানার কাছে ছুটে আসে ক্ষমা চাইতে। এরপর রুমানার দুঃখের কাহিনী শুনে পুনরায় রুমানাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেয়। এক দিন দাাম্ভিক হক সাহেব আলমকে ফিরে দিয়েছিল এই প্রস্তাবের জন্য। আর আজ সেই প্রস্তাব সাদরে গ্রহন করে কন্যা রুমানাকে আলমের হাতে তুলে দেয়। আলম রুমানার সুখের সংসার শুরু হয়। হক সাহেবের যে ভয় ছিল সে ভয় গর্বে পরিণত হয়। আলম তার আচার আচারন ব্যবহার ও কর্ম দিয়ে হক সাহেবকে জয় করে। বিয়ের পর রুমানার কোল জুড়ে এলো আর একটি ফুটফুটে কন্যা সন্তান। যার নাম রাখে লাকমি ।
কালের বিবর্তনে ব্যবসা বাণিজ্যের স¤প্রসারণের জন্য আলম-রুমানা ঢাকায় চলে আসে। আর নিলা চৌধুরী সেই ২২ বছর আগে লিয়নকে নিয়ে ঢাকায় এসে একটি হাসপাতালে চাকরি নেয়। তখন তিনিও যশোরে থাকতে পারেন নি। কারণ তার মনে ভয় ছিল, এই সন্তান কোন একদিন হক সাহেব বা তার মেয়ে এসে নিয়ে যেতে পারে। পাশাপাশি তাকেও সমাজের মানুষের নানাবিধ প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছিল।
কিন্তু সত্যি সত্যি ওদের মিলনে বাঁধা হয়ে দাড়াল। নিলা চৌধুরী যখন বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে লাকমির পিতা মাতার সামনে গেল। নিলা চৌধুরী বলতে পারল না লিয়নের পিতার নাম। আর পিতৃ পরিচয়হীন একটা ছেলের সাথে কখনো কোন সম্ভ্রান্ত ঘরের মেয়ের বিবাহ হতে পারেনা। নিলা চৌধুরী অপমানিত হল ঐ বাড়ীতে। এ সংবাদে লিয়নও ভেঙ্গে পড়ল। জানতে চাইল তার পিতৃ পরিচয়। নিলা চৌধুরী কোন কিছু বলে বুঝিয়ে রাখতে পারল না লিয়নকে। লিয়ন ছুটে গেল পিতৃ পরিচয় সংগ্রহে কিন্তু ব্যর্থ হয়ে লিয়ন উম্মাদ বা পাগল হয়ে ছুটে বেড়াছে ত্যাগ করেছে এই সভ্য সমাজ ।
এদিকে লাকমি লিয়নের শোকে শোকাহত। তার মধ্য দিয়ে লাকমির বিবাহ ঠিক করা হল উত্তরা ৬ নম্বর সেক্টরের ব্যবসায়ী রকিবুদ্দিন খানের একমাত্র ছেলে মোকিম খানের সাথে। এ বিয়েতে অবশ্য আলমের মত নেই। রুমানা সব কিছু মাথায় নিয়ে ওর বিয়ে ঠিক করেছে। করলেই কি সব হয়ে যায়। লাকমি মেনে নিতে পরে না মোকিমকে। তাই একদিন আত্মহত্যা করতে যায়। কিন্তু বাড়ীর অনেক পুরানো কাজের লোক ভোলার কাছে ধরা পড়ে। ভোলা ওকে লিয়নের কাছে নিয়ে যাবে বলে প্রতিশ্র“তি দেয়। রাতের আধারে দুজন বাসা থেকে বের হয় ধানমন্ডি লেকের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কিছু মাস্তান এসে লাকমিকে ফলো করে। লাকমির উপর হামলা করে। লাকমি ও ভোলার চিৎকার চেচামেচি ও ধাক্কাধাক্কি চলে তখন ভোলা পড়ে গিয়ে আহত হয়। আশপাশের দু চারজন লোকজন আসার আগেই লাকমি কাছের সোনাদানা যা থাকে তাই নিয়ে পালিয়ে যায়। লাকমিও মাথায় প্রচন্ড আঘাত পায়। আহত লাকমিকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। ও দিকে না খাওয়া, না নাওয়া, লিয়ন তিলে তিলে দগ্ধ হতে হতে এক সময় রাস্তার উপর পড়ে থাকে। লোকজন ধরে মিরপুর শাহআলী বাবার মাজারে ওকে রেখে আসে।
ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে গেলে চিকিৎসায় লাকমি সুস্থ হয়। বাসা থেকে পালিয়ে এসেছে বলে ভোলা বাসায় কোন খবর দেয় না। ভাবে সুস্থ্য হলে এবং লিয়নকে খুজে পাওয়া গেলে ওদের একসাথে বাসায় নিয়ে যাবে। কিন্তু লাকমি সুস্থ্য হওয়ার পর স্মৃতি শক্তি হারায় ফেলে। ভোলাকে চিন্তে পরেনা। ভোলাকে রেখে পালিয়ে যায় রাস্তায় পাগলের মতো ঘুরতে থাকে। ক্ষুধার জ্বালায় রাস্তার পাশের থেকে চায়ের দোকান থেকে পাউরুটির চুরি করে। সবাই ওকে ধাওয়া করে ঢিল ছুড়ে রক্তাক্ত করে ফেলে। রাস্তায় পড়ে কাঁদতে থাকে। অনেক রাত হয়ে গেছে মধ্য রাতের দিকে মিরপুরের আনচার ক্যাম্প এলাকায় ঘুরে বেড়াছিল রাস্তায় আবার হিরোইঞ্চিদের হাতে পড়ে। তাছাড়া অনেক সুন্দর নায়িকাদের মতো দেখতে উঠতি যৌবনপ্রাপ্ত একটি মেয়ে যে কারো লোভ জাগতেই পারে তার দিকে তাকালে। ওরা লাকমিকে ধরার চেষ্টা করে ও তখন দৌড়াতে দৌড়াতে শাহআলী বাবার মাঝারের ধারে চলে যায়। লাকমিকে দেখে মায়া লাগে মাঝারের খাদেমের। খাদেম লাকমির চিকিৎসার ব্যবস্থা শুরু করে পাশা পাশী দুজন। এখন লিয়ন মৃত্যু প্রায় লাকমিকে চিন্তে পারে। খাদেম বাবাকে ওর ভালবাসার কথা বলে। এর মধ্যে ভোলা ঘুরতে ঘুরতে আসে শাহআলীর মাঝারে সেখানে লাকমিকে খুজে পায়। মধ্যরাতে আকাশে মেঘ ঝড় ও বৃষ্টি হয় লাকমি স্মৃতি শক্তি ফিরে পায়। খাদেমের তত্ত¡াবধানে ভোলা লিয়ন ও লাকমির বিবাহ সম্পন্ন করে। রাতে ওদের বাসর হয়। তখন মাঝার শরীফ সহ সারাভুমি কাঁপতে থাকে। মাঝারের সবাই স্তম্ভিত হয়। কেউ কিছু বুঝতে পারে না। ফুল বাগানের ফুলগুলো ঝরে পড়ে, গাছের পাতা শুকায় যায়। গাছ থেকে পাখিরা উড়ে যায়।
ভোলা আসে ওদের সংবাদ নিয়ে বাড়ীতে। সংবাদ পাওয়া মাত্রই রুমানা হক ভোলাকে গালী গালাজ করে। রকিবুদ্দিন খান ও মোকিমকে নিয়ে মাঝারের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। আলম বলে যা হবার তা হয়েছে যখন বিয়ে করে ফেলেছে তখন আর কি।
আলম আর ভোলা আবার ছুটে লিয়ন ও লাকমিকে উদ্ধার করতে। ওদিকে রুমানার নেতৃত্বে রকিবুদ্দিন খান লোক দিয়ে লিয়নকে মেরে আহত করে লাকমিকে তুলে নিয়ে আসে। পথের মধ্যে আলমের সাথে রকিবুদ্দিন খানের সাথে ঝগড়া একস পর্যায়ে কথা কাটাকাটি থেকে মারামারিতে রুপ নেয়। তখন আলম মার খায়। তখন রুমানা স্বামীকে রক্তাক্ত দেখে আলমের পক্ষ নেয়। এর মধ্যে টহলরত পুলিশ এসে রকিবুদ্দিন খানদের গ্রেপ্তার করে।
ওদিকে ভোলা আহত লিয়নকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। ওদিকে আলম রুমানা ও লাকমি হাসপাতালে এসে পৌছায় অপারেশন থিয়েটার থেকে লিয়নের ভাল সংবাদ আসে। লিয়নের বন্ধু নাননু খবর পেয়ে মা নিলা চৌধুরিেেক নিয়ে হাসপাতালে আসে। হাসপাতালে ভোলা ও নিলার মধ্যে পরিচয় হয়। আলম জানতে পারে লিয়নের পরিচয়। লিয়ন, রাজু ও রুমানার হারানো পুত্র।
হারানো ধন পেয়ে রুমানা হক ও আলম পাগলের মত হয়ে যায়। কিন্তু তাদের আনন্দ দিতে পারেনি। কিছুক্ষন পরে আলম ভাবে এটা কি করে সম্ভব। আমি এদের কি পরিচয় দেব। কিভাবে বলবো লিয়ন আমার ছেলে। লাকমি আমার মেয়ে। ওর মাথায় তখন কি সব ওল্টা পাল্টা ভাবনা হলো পকেটের লাইসেন্স করা পিস্তল থেকে বেরিয়ে গেল একটি গুলি লিয়নের কপালের ওপরে। হাসপাতারের বিছানায় শুয়ে থাকা লিয়ন চোখ মেলে যখন দেখলো আলমকে। ওর পিতাকে। তখন ওর চোখে ঝাপসা এসে গেছে। কয়েক মিনিটের মধ্যে শরীর শীতল হয়ে গেল। সন্তান সম্ভাবা লাকমি ফেটে পড়ে আর্তনাদে।
লাকমি একটি কন্যা সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যায়। আর এই কন্যা সন্তানটি লিয়ন ও লাকমির পবিত্র প্রেমের ফসল।কিন্তু কি পরিচয় দিবে এই সন্তানটিকে? ওর পিতা কে? মাতা কে? পিতা-মাতার সম্পর্ক কি? আর এই কন্যা সন্তানটিকে নিয়ে আলম কিভাবে তার পাপের প্রায়শ্চিত্য করবে।
**********
























