RRP
agriculture news
Health Care
Open
diamond egg
renata-ltd.com
fishtech
Ad3
Spech for Promotion
avonah
বুধবার , ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ২১শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
  1. অন্যান্য
  2. অন্যান্য
  3. ইউটিউব
  4. উদ্যোক্তা
  5. উপন্যাশ
  6. এ্যাসিভমেন্ট
  7. ঔষধ
  8. কবিতা
  9. কীটনাশক
  10. কৃষি ব্যক্তিত্ব
  11. কৃষি সংবাদ
  12. কৃষি সেক্টরের নিদের্শনা
  13. কৌতুক
  14. খাবার
  15. খামার পদ্ধতি
 

পুকুরে মুক্তাচাষ

প্রতিবেদক
Md. Bayezid Moral
আগস্ট ১৮, ২০১৯ ১০:৫৪ পূর্বাহ্ণ
Pearl cultivation in the pond

Pearl cultivation in the pond

১.ভূমিকা

ড. মো. বায়েজিদ মোড়ল: মুক্তা জীবন্ত ঝিনুকের দেহের ভেতরে জৈবিক প্রক্রিয়ায় তৈরি এক ধরনের রত্ন। এটি সৌখিনতা ও আভিজাত্যের প্রতীক। কোন বাইরের বস্তু ঝিনুকের দেহের ভেতরে ঢুকে নরম অংশে আটকে গেলে আঘাতের সৃষ্টি হয়। ঝিনুক এই আঘাতের অনুভুতি থেকে উপশম পেতে বাইরে থেকে ঢোকা বস্তুটির চারিদিকে এক ধরণের লালা নি:সরণ করতে থাকে। ক্রমাগত নি:সৃত এই লালা বাইরের বস্তুটির চারিদিকে জমাট বেঁধে ক্রমান্বয়ে মুক্তায় পরিণত হয়। মুক্তা দৃশ্যতা মসৃণ, গোলাকার অথবা ডিম্বাকৃতি, ঝকঝকে উজ্জ্বল ও আকর্ষনীয় স্থায়ী রং বিশিষ্ট হয়ে থাকে।

মুক্তার প্রধান ব্যবহার হলো নারীদের অলংকার হিসাবে। এছাড়া কিছু কিছু জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য মূল্যবান ঔষধ তৈরিতেও মুক্তা ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে মুক্তার যেমন ব্যাপক চাহিদা আছে তেমটি অভ্যন্তরীনভাবেও মুক্তার চাহিদা একেবারে কম নয়। তাছাড়া মুক্তা চাষকৃত ঝিনুকের খোলস দিয়েও নানা ধরনের অলংকার ও সৌখিন দ্রব্যাদিও তৈরি করা যায়। ঝিনুকের খোলস ক্যালসিয়ামের একটি উত্তম উৎস যা হাঁসমুরগির খাদ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ঝিনুকের মাংস চিংড়ি ও মাছের খাদ্য হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ একজন চাষী মুক্তা চাষ করে মুক্তার পাশাপাশি ঝিনুকের খোলস ও মাংস বিক্রি করেও লাভবান হতে পারেন।

আর্ন্তজাতিক বাজারে মুক্তার চাহিদা উত্তরোত্তর বেড়ে চলেছে। এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ এর বাণিজ্যিক গুরুত্ব বিবেচনায় সাম্প্রতিক সময়ে মুক্তাচাষ প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে মুক্তাচাষ করছে। এক্ষেত্রে এশিয়ার দেশগুলির মধ্যে চীন ও জাপান প্রধান মুক্তা উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হয়েছে। ভারতেও এরইমধ্যে মুক্তাচাষ আরম্ভ হয়েছে। বাংলাদেশে প্রাকৃতিক উৎস হতে মুক্তা আহরণের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। প্রায় ২৫০০ বছর আগে থেকে বাংলাদেশে মুক্তার ব্যবহার চলে আসছে বলে তথ্য পাওয়া যায়। তবে পরিবেশ দূষণ, আবাসস্থলের পরিবর্তন, নির্বিচারে ঝিনুক আহরণ ইত্যাদি নানাবিধ কারণে বর্তমানে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক উৎস থেকে ঝিনুক ও মুক্তার প্রাপ্যতা অনেকাংশে কমে গেছে।

এমনি একটি প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ মৎস গবেষণা ইনষ্টিটিউট মুক্তা উৎপাদনের প্রযুক্তি উদ্ভাবনে এগিয়ে আসে এবং এতে প্রশংসনীয় সফলতা লাভ করেছে।

২. স্বাদুপানির ঝিনুকের বৈশিষ্ট্য

মুক্তা তৈরি হয় ঝিনুক থেকে। তাই মুক্তা তৈরির আগে ঝিনুকের বৈশিষ্ট্য ও এর জীবন চক্র সম্পর্কে প্রাথমিক ধারনা থাকা দরকার।

২.শারীরতত্ত্ব

স্বাদুপানির ঝিনুকের তিনটি প্রধান বৈশিষ্ট্য আছে। এগুলি হলো:

১)           এটি দুই খোলসযুক্ত যার মাঝখানে নরম দেহ থাকে,

২)           খোলসের ভেতরের একটি নরম দেহ থাকে যাতে শ্বসনতন্ত্র, পরিপাকতন্ত্র এবং অন্যান্য অপরিহার্য অঙ্গ রয়েছে, এবং

৩)           একটি মাংসল পা থাকে যা ঝিনুকের চলাচল, গর্ত করা এবং তলায় স্থির থাকার কাজে সহায়তা করে।

 খোলস কতকগুলো বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান যা দেখে ঝিনুক সনাাক্ত করা যায়। খোলসের ভেতরের দিকের উজ্জ্বল স্তরটিকে নেকার বা মুক্তার স্তর বলা হয়। নেকার সাদা, গোলাপী, কমলা, সোনালী ইত্যাদি রংয়ের হতে পারে। খোলসের বাইরে স্তরটি শক্ত কাইটিনের তৈরি যা খোলসকে রক্ষা করে। ঝিনুকের খোলস প্রজাতিভেদে গোলাকার, লম্বা, ডিম্বাকৃতি বা ত্রিকোণাকৃতির হতে পারে।

২.পরিবেশতত্ত্ব

২.২.১ আবাসস্থল: স্বাদুপানির ঝিনুক বিভিন্ন ধরনের জলাশয়ে, যেমন- পুকুর-দীঘি, খাল-বিল, নদী-নালা, হাওর-বাওর ইত্যাদিতে পাওয়া যায়।

২.২.২ খাদ্য: ঝিনুক অমেরুদন্ডী জলজ প্রানী। এরা ফিল্টার বা ছাঁকনভোজী। অর্থাৎ এরা পানিতে ছাঁকন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রাকৃতিক খাদ্য সংগ্রহ করে। অল্প বয়স্ক ঝিনুক পানিতে ভাসমান শেওলা অর্থাৎ এককোষী অ্যালজি, যেমন- ডায়াটম, গোল্ড  অ্যালজি, গ্রীন অ্যালজি, ইউগ্লেনা ইত্যাদি ছাঁকন প্রক্রিয়ায় সংগ্রহ করে খায়। পূর্ণঙ্গ ঝিনুক এককোষী অ্যালজি ছাড়াও কলোনিবদ্ধ অ্যালজি, জৈবি পদার্থ, ছোট জুপ্লাংকটন ইত্যাদি খায়।

২.২.৩ বৃদ্ধি: ঝিনুকের বৃদ্ধি নির্ভর করে বয়স, লিঙ্গ এবং পরিবেশের ওপর। পূর্ণাঙ্গতা প্রাপ্তির পূর্বে এদের বৃদ্ধি দ্রুত হয় তারপর বৃদ্ধির গতি ধীর হয়। সৃষ্টু বদ্ধির জন্য পানির সঠিক তাপমাত্রা হলো ১৫০-৩০০ সে. এবং অনুকূল তাপমাত্রা ২০০-৩২০ সে.। পানির দ্রবীভূত অক্সিজেন ও পিএইচ এর সঠিক মাত্রা এবং অন্যান্য গুণাবলিও ঝিনুকের বৃদ্ধির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

২.জীবন চক্র

ঝিনুকের জীবনচক্র বেশ জটিল। বর্ষাকাল ঝিনুকের প্রজনন সময়। এ সময় পুরুষ ও স্ত্রী ঝিনুক প্রজননকাঝে লিপ্ত হয়। পুরুণ ঝিনুক শুক্ররস নিঃসৃত করে। শুক্ররস স্ত্রী ঝিনুকের দেহে ঢুকে ডিমকে নিষিক্ত করে। এভাবে নিষিক্ত ডিম ফুলকার সাথে লেগে থাকে এবং বৃদ্ধি পেয়ে লার্ভায় পরিণত হয় যাকে গ্লোকিয়িা বলা হয়। গ্লোকিডিয়া যখন স্ত্রী ঝিনুকের দেহ থেকে বের হয়ে আসে তখন অবশ্যই একটি পোষক মাঝের (পুঁটি, টাকি, শিং, মাগুর ইত্যাদি) সংস্পর্শে আসে এবং পরজীবী হিসেবে ফুলকা, পাখনা বা দেহের সাথে লেগে থাকে। কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ এভাবে লেগে থাকার পর গ্লোকিডিয়া পোষাক মাছের দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পুকুরের তলায় চলে যায় এবং তরুণ ঝিনুক হিসেবে জীবন শুরু করে। পূনার্ঙ্গ হয়ে প্রজনন শুরু করতে ঝিনুকের ২-৫ বছর সময় লাগে।

২.বাংলাদেশে মুক্তা উৎপাদনকারী ঝিনুক

মুক্তা তৈরি করতে পারে এমন ৪টি প্রজাতির ঝিনুক বাংলাদেশে শনাক্ত করা হয়েছে। এই ৪টি প্রজাতি হলোঃ

১.            ল্যামেলিডেনস মারজিনালিস

২.           ল্যামেলিডেনস করিয়ানাস

৩.           ল্যামেলিডেনস ফেঞ্চুগ্যনজেনসিস

৪.           ল্যামেলিডেনস জেনকিনসিয়ানাস

স্থানীয়ভাবে প্রাপ্য ঝিনুক হতে ইনস্টিটিউটে তিনটি পদ্ধতিতে মুক্তা উৎপাদনের প্রচেষ্টা চালানো হয়।

১)           ম্যান্টল টিসু অপারেশন- এই পদ্ধতিতে একটি ঝিনুকের ম্যান্টল টিস্যু কেটে নিয়ে ছোট ছোট খন্ডে বিভক্ত করে অন্য ঝিনুকের ম্যান্টলের মধ্যে প্রবেশ করানো হয়। ঝিনুকের দেহের অভ্যন্তরে পর্দার মত পাতলা যে টিস্যু খোলসের সাথে লেগে থাকে তাকে ম্যান্টল টিস্যু বলা হয়। ম্যান্টল টিস্যু থেকে নিঃসৃত রস দিয়ে মুক্তা তৈরি হয়। ম্যান্টল টিস্যু অপারেশন পদ্ধতিতে দেশীয় প্রজাতির একটি ঝিনুকে ১০-১৫ টি মুক্তা উৎপাদন করা যা।

২)           নিউক্লিয়াস অপারেশন- এই পদ্ধতিতে কোন ছোট দানাদার বস্তু ঝিনুকে ঢুকিয়ে দেয়া হয়।

৩)           ইমেজ অপারেশন- এতে মোম দিয়ে তৈরি পছন্দমাফিক কোন বস্তু বা প্রাণীর ইমেজ ঝিনুকের দেহে ঢুকিয়ে দেয়া হয়।

৩. মুক্তা উৎপাদনের মূলনীতি

৩.১  প্রাকৃতিক মুক্তা উৎপাদন

৩.১.নিউক্লিয়াস-বিহীন মুক্তা

যখন ঝিনুকের বহিঃত্বকে (খোলসের সাথে ম্যান্টলের লেগে থাকা অংশ) কোন রূপ ক্ষতের সৃষ্টির হয়, ফুলে ওঠে কিংবা হঠাৎ আঘাত পায়, তখন বহিঃত্বকের কিছু কোষ ম্যান্টলের মধ্যে ঢুকে যায়। বহিঃত্বকের এই কোষগুলো বিভাজন এবং পুনরুৎপাদন প্রক্রিয়ায় বৃদ্ধি পেয়ে মুক্তার থলি তৈরি করে। মুক্তার থলি অনবরত আঠালো পদার্থ নি:সরণ করতে থাকে যাকে নেকার বলা হয়। নেকার জমে মুক্তার স্তরের সৃষ্টি হয়।

৩.চাষকৃত মুক্তা উৎপাদন

কোন বহিঃস্থ বা বাইরের বস্তু, যেমন- বালিকণা, পাথরকণা বা পরজীবী হঠাৎ করে যখন ঝিনুকের ম্যান্টলে ঢুকে যায়, তখন তার সাথে বহিঃম্বকের টুকরাও ঢুকে পড়ে। ঐ টুকরা বৃদ্ধি পেয়ে একটি থলি তৈরি করে এবং বহিঃস্থ বস্তুকে ঘিরে ফেলে। এই থলি অবিরাম আঠালো রস বা নেকার নিঃসর ণ করে যা বহিঃস্থ বস্তুর চারপাশে জমা হয়। ফলে ক্রমান্বয়ে নিউক্লিয়াস মুক্তা তৈরি হয়।

৩.চাষকৃত মুক্তা উৎপাদন

মুক্তা তৈরির প্রাকৃতিক নিয়ম অনুসরণে ঝিনুকের দেহাভ্যন্তরের ম্যান্টাল টিস্যুতে একটি বহিঃস্থ বস্তু (ম্যান্টল টিস্যু বা নিউক্লিয়াস) ঢুকিয়ে মুক্তা তৈরি করা হয়। একেই চাষকৃত মুক্তা বলা হয়।

পানির তাপমাত্র (সে.)                               ১৫                     ২০                   ২৫        ৩০

মুক্তা থলি তৈরির জন্য সময় (দিন)              ১৩-১৫                  ১০-১২               ৮- ৯      ৫-৭

৩.২.নিউক্লিয়াস মুক্তা তৈরি

এই প্রক্রিয়ায় ঝিনুকের দেহে ম্যান্টল টিস্যুসহ একটি নিউক্লিয়াস ঢুকিয়ে দেয়া হয়। ম্যান্টল টিস্যু বৃদ্ধি পেয়ে নিউক্লিয়াসের চারপাশে একটি মুক্তা থলি তৈরি করে। মুক্তা থলি নেকার নিঃসরণ করে নিউক্লিয়াসটিকে পুরোপুরি ঢেকে ফেলে। এভাবেই নিউক্লিয়াস মুক্তা তৈরি হয়।

৪.মুক্তা উৎপাদনের জন্য অপারেশন পদ্ধতি

মুক্তা তৈরির জন্য ঝিনুকের দেহে বহিঃস্থ বস্তু ঢোকানোর কৌশলকে অপারেশন পদ্ধতি বলা হয়। এই পদ্ধতি বেশ সূক্ষ্ম এবং দ্রুত শেষ বা বাঞ্ছনীয়। নতুবা ঝিনুকের মৃত্যু ঘটবে। ফলে মুক্তা চাষ কার্যক্রম ব্যাহত হবে। বহিঃস্থ বস্তু হিসেবে ম্যান্টল টিস্যু নিউক্লিয়াস বা ইমেজ প্রবেশ করানো।

৪.ম্যান্টল টিস্যু অপারেশন পদ্ধতি

এই অপারেশনের দুইটি ধাপ আছে। যথা-

১)           ম্যান্টল টিস্যুর টুকরা তৈরি করা,

২)           ঝিনুকের প্রতিস্থাপন করা।

এই দুইটি ধাপ একই সঙ্গে সম্পন্ন করতে হয়। এছাড়া, কাজটি দ্রুততম সময়ে শেষ করতে হয়ে।

৪.১.১ম্যান্টল টিস্যুর টুকরা তৈরি

ক) ঝিনুক নির্বাচন

অপারেশনের জন্য ১-২ বৎসর বয়সের ঝিনুক, যার দৈর্ঘ্য ৬-৮ সে.মি., স্বাস্থ্যবান এবং শক্ত এমন ঝিনুক বেছে নিতে হবে।

খ) টিস্যু সংগ্রহের স্থান

ঝিনুকের ম্যান্টল টিস্যুর কিনারার দিক থেকে টিস্যু সংগ্রহ করতে হবে। কেননা, মাঝের দিকের টিস্যুর নেকার নিঃসরণ ক্ষমতা কম।

গ) টিস্যু সংগ্রহের কৌশল

একটি ঝিনুক সম্পূর্ণ খুলে বা ফাঁক করে ম্যান্টল টিস্যুর বহি:ত্বক লম্বা করে কেটে বিচ্ছিন্ন করতে হবে। এভাবে বিচ্ছিন্ন করা টিস্যু একটি গ্লাস বোর্ডে রেখে ছোট ছোট টুকরা করে কাটতে হবে।

ম্যান্টল টিস্যু সংগ্রহ ব্যাপারে নিুলিখিত বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবেঃ

*             অপারেশনে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি পরিস্কার করতে হবে এবং  ৭০% অ্যালকোহলে ভিজিয়ে জীবাণুমুক্ত করে নিতে হবে।

*             পৃথক করার সময় ম্যান্টল টিস্যুতে যেন সূর্যালোক বা রোদ না লাগে সে দিকে লক্ষ রাখতে হবে। ম্যান্টল টিস্যুকে সবসময় আর্দ্র রাখতে হবে।

*             ম্যান্টল টিস্যুর টুকরা মুক্তার গুণগত মানকে সরাসরি প্রভাবিত করে। টিস্যুর টুকরা ছোট, পাতলা এবং বর্গাকৃতির (আকার ২-৩  ২-৩ মি.মি, পুরুত্ব ০.২-০.৩ মি.মি) হতে হবে।

*             ম্যান্টল টিস্যুর কোষগুলো যাতে বেঁচে থাকে সে জন্য অপারেশন সময় সংক্ষিপ্ত হতে হবে।

৪.১.ম্যান্টল টিস্যু প্রতিস্থাপন

ক) অপারেশনের জন্য ঝিনুক নির্বাচন

শক্ত, স্বাস্থ্যবান, প্রশস্ত, সুস্পষ্ট বৃদ্ধি রেখা সম্পন্ন, ১-২ বৎসর বয়সের ঝিনুক অপারেশনের জন্য নির্বাচন করতে হবে।

খ)  ম্যান্টল টিস্যু প্রতিস্থাপনের পূর্বে করণীয়

*  ঝিনুকের দুটি খোলসের মধ্যে ঝিনুক খোলার চিমটা স্থাপন করতে হবে। তার পর আস্তে আস্তে চাপ দিয়ে ৮-১০ মিমি পর্যন্ত ফাঁক করতে হবে।

* দুটি খোলসের মধ্যে কাঠের কীলক স্থাপন করতে হবে যাতে খোলসদুটি বন্ধ না হয়ে যায়। এরপর অপারেশন তাকের ওপর রাখতে হবে। স্টিলের পাতলা পাত দিয়ে ঝিনুকের ফুলকা এবং অভ্যন্তরীণ অঙ্গ হালকাভাবে এক পাশে সরিয়ে রাখতে হবে। ম্যান্টলের উপরিতলে লেগে থাকা আঠালো পদার্থ, কাদা, বালি ইত্যাদি পরিস্কার করে নিতে হবে।

গ) প্রতিস্থাপনের স্থান

ঝিনুকের পেছন দিকের অংশের ম্যান্টলের বহিঃপ্রান্তে টিস্যু প্রতিস্থাপন করলে মুক্তা ভালো হয়।

ঘ) প্রতিস্থাপন পদ্ধতি

হুক এবং নিডল এর সাহায্যে এক টুকরা ম্যাান্টল টিস্যু নিতে হবে। উল্লম্বভাবে ঝিনুকের ম্যান্টলে একটি গর্ত সৃষ্টি করতে হবে। এরপর গর্তের মধ্যে টুকরাটি স্থাপন করতে হবে। পেছন থেকে সামনের দিকে একইভাবে একের পর এক টুকরা ম্যান্টল টিস্যু স্থাপন করতে হবে। যতটি টুকরা স্থাপন করা হবে ততটি মুক্তাই সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তবে প্রতি স্থাপনযোগ্য টিস্যুর টুকরা ঝিনুকের আকারের ওপর নির্ভর করে।

প্রতিস্থাপনের সময় লক্ষণীয়

*             যে টিস্যুটি প্রতিস্থাপিত হচ্ছে তার কানেকটিভ টিস্যু অপারেশনকৃত ঝিনুকের ম্যান্টল টিস্যুর সাথে লেগে থাকবে।

*             টিস্যুর টুকরা ম্যান্টলের দুইটি স্তরের মাঝখানে ঢোকাতে হবে। ম্যান্টল ছিদ্র করে ঢোকালে মুক্তা খোলসে  লেগে যাবে।

*             প্রতিস্থাপনের জন্য গর্তের সঠিক পরিমাপ হবে ০.৪-০.৫ মি.মি।

*             কতটি টিস্যু প্রতি স্থাপন করা যাবে তা নির্ভর করে ঝিনুকের আকারের ওপর। একটি ১০ সে. মি. দৈর্ঘ্যের ঝিনুকে প্রতি পার্শ্বে ১০-১২ টি করে মোট ২০-২৫ টি পর্যন্ত টিস্যু প্রতিস্থাপন করা যায়।

*             ঝিনুকের পিছন দিকের ম্যান্টল টিস্যু পুরু এবং সুগঠিত যা মুক্তা উৎপাদনের জন্য সহায়ক। তাই পিছনের দিকে অপেক্ষাকৃত বেশি টুকরা স্থাপন করতে হবে।

*             মুক্তার গুণগতমানের জন্য অপারেশন দক্ষতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একবারের প্রচেষ্টাতেই গর্তে টিস্যু স্থাপন করতে হবে। একবারে প্রবেশ করাতে না পারলে ঐ টুকরাটি বাদ দিয়ে নতুন টুকরা নিতে হবে।

*             ম্যান্টল টিস্যু সংগ্রহ থেকে শুরু করে অন্য ঝিনুকে প্রতি স্থাপন পুরা পদ্ধতিটি ১০ মিনিটের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। এর অন্যথা হলে ম্যান্টল টিস্যুর বেঁচে থাকার হার কমে যাবে।

*             সমস্ত যন্ত্রপাতি পরিস্কার ও জীবানুমুক্ত করে নিতে হবে। অপারেশনের সময় যেন রোগের সংক্রমণ না ঘটে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

৪.নিউক্লিয়াস অপারেশন পদ্ধতি

এই প্রক্রিয়ায় একটি নিউক্লিয়াস (বহিঃস্থ বস্তু) টিস্যু সহ ঝিনুকের দেহে প্রবেশ করানো হয় ঃ

৪.২.নিউক্লিয়াস

ঝিনুকের পুরু খোলস থেকে নিউক্লিয়াস তৈরি করা হয়। তাছাড়া ক্ষুদ্র এবং গোলাকার অন্য কিছু, যেমন- ছোট পুঁতি, ছোট মুক্তা, মাছের চোখের বল, পাথর কণা, ইত্যাদিও নিউক্লিয়াস হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

৪.২.অপারেশনের জন্য ঝিনুক নির্বাচন

অপারেশনের জন্য নির্বাচিত ঝিনুকের আকার হবে ১০-১২ সে.মি এর চেয়ে বেশি। অন্যান্য গুণাবলি ম্যান্টল টিস্যু অপারেশনের জন্য নির্বাচিত ঝিনুকের গুণাবলির অনুরূপ।

৪.২.নিউক্লিয়াস প্রতিস্থাপন করার স্থান

ঝিনুকের তিনটি স্থানে নিউক্লিয়াস প্রতিস্থাপন করা যায়।

১। পিছনের দিকে যেখানে ম্যান্টল বেশ পুরু,

২। ভিসেরা বা পরিপাক যন্ত্রের উপরিভাগে, এবং

৩। পায়ের মাংসে।

৪.২.নিউক্লিয়াস প্রতিস্থাপন

নিউক্লিয়াস প্রতিস্থাপনের জন্য ম্যান্টল টিস্যুর টুকরা তৈরির পদ্ধতি ম্যান্টল অপারেশনের ক্ষেত্রে অনুসৃত পদ্ধতির অনুরূপ। একটি ধারালো সুচের সাহায্যে ঝিনুকের দেহে একটি ক্ষত তৈরি করতে হবে। তারপর চাপ দিয়ে একটি গর্ত তৈরি করতে হবে। গর্তের আকার নিউক্লিয়াসের আকারের ওপর নির্ভর করে। এরপর  নিউক্লিয়াসটি গর্তের তলদেশে স্থাপন করতে হবে। নিউক্লিয়াসের গায়ে একটি ম্যান্টলের টুকরা স্থাপন করার পর গর্তের মুখ বন্ধ করে দিতে হবে।

৪.ইমেজ মুক্তা অপারেশন পদ্ধতি

ঝিনুকের ম্যান্টলের নিচে একটি ইমেজ প্রবেশ করিয়ে দিলে সেই ইমেজের ওপর মুক্তার একটি প্রলেপ পড়ে যা দেখতে খুবই সুন্দর এবং আকর্ষনীয়। মুক্তার এই ইমজেকে মুক্তা বলা হয়।

৪.৩.ইমেজ তৈরী

মোম, খোলস, প্লাস্টিক, স্টিল ইত্যাদি দিয়ে পছন্দমাফিক ইমেজ তৈরি করা যায়। কিছুটা অবতল হতে হবে এবং ঝিনুকে যেন সহজেই ঢোকানো যায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

৪.৩.অপারেশন পদ্ধতি

* ইমজেটি পানিতে ভেজাতে হবে। 

* ঝিনুকটি খুলতে হবে এবং দুটি খোলস ৮-১০ মি.মি খোলা রাখতে হবে। তারপর কাদা, বালি, আঠালো পদার্থ ইত্যাদি পরিস্কার করতে হবে।

* একটি পাতলা পাত দিয়ে খোলসের কিছু অংশ থেকে ম্যান্টল আলাদা করতে হবে। তারপর সাবধানে ইমেজটি ঢুকিয়ে দিতে হবে এবং সঠিক অবস্থানে স্থাপন করতে হবে।

* সাবধানতার সাথে ম্যান্টলের গর্ত থেকে বাতাস এবং পানি বের করে দিতে হবে।

৫. অপারেশনকৃত ঝিনুকের চাষ

অপারেশনকৃত ঝিনুক ২-৩ বৎসর পানিতে চাষ করার পর তাতে মুক্তা তৈরি হয়। এই সময়কালে ব্যবস্থাপনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ব্যবস্থাপনার ওপর মুক্তার পরিমাণগত ও গুণগতমান নির্ভর করে।

৫.অপারেশনকৃত ঝিনুক চাষের জন্য জলাশয়

পুকুর, নদী, হ্রদ এবং অন্যান্য জলাশয় যাতে দুষণ বা রোগের প্রাদুর্ভাব নেই এমন জলাশয় মুক্তাচাষের জন্য নির্বাচন করতে হবে।

পুকুরঃ মুক্তা চাষের জন্য পুকুরই সবচেয়ে ভাল এবং সহজে ব্যবস্থাপনা করা যায়। পুকুরের আয়তন ৫০ শতাংশ বা তার চেয়েও বড় হতে পারে। পানির গভীরতা হবে ৫-৭ ফুট। পানির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য সার প্রয়োগ করতে হবে। মুক্তাচাষের পুকুরে প্রচলিত নিয়মে তৃণভোজী মাছ, যেমন- রুই, কাতলা, মৃগেল, গ্রাসকার্প, বিগহেড কার্প ইত্যাদি চাষ করা যাবে। তবে সিলভার কার্প বা রাক্ষুসে মাছ চাষ করা যাবে না।

উম্মুক্ত জলাশয় ঃ উম্মুক্ত জলাশয়, যেমন- নদী, হ্রদ, ইত্যাদিতেও মুক্তা চাষ করা যায়। নদীর কূলবর্তী এলাকা এজন্য নির্বাচন করা যায়। এসব এলাকায স্রোত থাকে এব ংবেশি অক্সিজেন থাকে যা মুক্ত উৎপাদনের জন্য সহায়ক। তবে কূলবর্তী এলাকায় প্রাকৃতিক খাদ্য কম থাকে এবং পরিবেশ জটিল হয়।

৫.চাষের পরিবেশ

চাষের পরিবেশের সাথে ঝিনুকের বৃদ্ধি এবং মুক্তা উৎপাদন সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। এজন্য মুক্তাচাষে কাক্সিক্ষত ফলাফল লাভের জন্য চাষের অনুকূল পরিবেশ বজায় রাখতে হবে।

৫.২.পানির গভীরতা

মুক্তাচাষের জন্য পুকুরের পানির গভীরতা ৫-৭ ফুট (১.৫-২.৫ মিটার) হলে ভাল হয়। গভীরতা এর কম বা বেশি হলে অনুকূল পরিবেশ বজায় রাখা যায় না।

৫.২.পানির প্রবাহ

পুকুরের পানিতে সামান্য প্রবাহ সৃষ্টি করা গেলে ঝিনুকের বৃদ্ধিসাধনে এবং মুক্তা উৎপাদনে সহায়ক হয়। তাই সম্ভব হলে প্যাডল হুইল ব্যবহার করে সামান্য প্রবাহের ব্যবস্থা করা যায়। তাছাড়া মাসে একবার পুকুরের কিছু পরিমাণ পানি পরিবর্তন করলে ভাল হয়।

৫.২.পানির পিএইচ বা ক্ষারত্ব

ঝিনুকের বৃদ্ধির জন্য পানির অনুকুল পিএইচ হলে ৭ থেকে ৮ । অম্লীয় (পিএইচ ৬.৫ এর চেয়ে কম) অথবা ক্ষারীয়( পিএইচ৮.৫ এর চেয়ে বেশি)। পি এইচ ঝিনুকের বৃদ্ধি এবং মুক্তা উৎপাদনের জন্য উপযুক্ত নয়। পুকুরের পানির পিএইচ কমে গেলে শতাংশে ১ কেজি হারে পাথুরে চুন প্রয়োগ করতে হবে।

৫.২.পুষ্টি পদার্থ

ক্যালসিয়াম মুক্তা উৎপাদনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান। ঝিনুকের খোলস এবং মুক্তার প্রধান উপাদান হলো এই ক্যালসিয়াম। পানিতে ক্যালসিয়াম যাতে প্রতি লিটারে ১০ মিলিগ্রাম এর চেয়ে বেশি থাকে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। এজন্য প্রতি মাসে শতাংশে ১ কেজি হারে পাথুরে চুন প্রয়োগ করতে হবে। অন্যান্য ক্যালসিয়াম সার, যেমন- কলি চুন বা পোড়া চুনও প্রয়োগ করা যায়। ঝিনুক এবং অন্যান্য জলজ জীবের জন্য ম্যাগনেসিয়াম, সিলিকা, ম্যাঙ্গানিজ এবং লৌহ প্রয়োজন। জৈব এবং অজৈব সার প্রয়োগের মাধ্যমে পানিতে পরিমাণ বাড়াতে হবে।

৫.২.প্রাকৃতিক খাদ্য

ঝিনুকের খাদ্য প্রহণ প্রক্রিয়া মূলত পরোক্ষ। ফুলকার মাধ্যমে এরা পানিতে বিদ্যমান অ্যালজি, ক্ষুদ্রাকার জুপ্লাংকটন, অণুজীব অর্থাৎ ব্যাকটেরিয়া ইত্যাদি জৈব দ্রব্য ছেঁকে ছেঁকে খায়। তাই পুকুরে যথেষ্ট পরিমাণ প্রাকৃতিক খাদ্য বিদ্যমান রাখার জন্য নিয়মমাফিক সার প্রয়োগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পানির রং এবং স্বচ্ছতা দেখে প্রাকৃতিক খাদ্য আছে কি না তা যাচাই করা যায। ঝিনুক চাষের জ্যণ পানির উপযুক্ত এবং হলো হলুদাভ সবুজ এবং স্বচ্ছতা ৩০ সে.মি.। এরূপ রং না থাকলে কিংবা স্বচ্ছতা ৩০ সে.মি এর বেশি হলে নিুে বর্ণিত হারে সার প্রয়োগ করতে হবেঃ

সারণি ২. পুকুরে দৈনিক সার প্রয়োগের পরিমাণ।

সার   /  সারের পরিমাণ (প্রতি শতাংশে)

গোবর/ অথবা কম্পেস্ট/ অথবা হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা                                

২০০-৩০০ গ্রাম/ ৩০০-৪০০ গ্রাম/ ১৫০-২০০ গ্রাম

ইউরিয়া                ৪-৫ গ্রাম

টিএসপি               ৩ গ্রাম

ব্যবস্থাপনার সুবিধার্থে সাপ্তাহিক বা পাক্ষিকভাবেও সার প্রয়োগ করা যায়। এক্ষেত্রে উপরিবণির্ত তালিকার ৭ বা ১৫ গুণ হারে সার প্রয়োগ করতে হবে। তিন প্রকার সার প্লাস্টিকের গামলা বা মাটির চারিতে ৩-৪ গুণ পানির মধ্যে ১৮-২৪ ঘন্টা ভেজাতে হবে। সার ভেজানোর পর প্রয়োগের আগে একটি লাঠি দিয়ে ভালোভাবে ঘেঁটে নিতে হবে। সূর্যালোকিত দিনে সকাল ১০ টার মধ্যে গুলানো সার পুুকুরের চারদিকে সমানভাবে ছিটিয়ে দিতে হবে। বৃষ্টির সময় বা মেঘলা দিনে এবং শীতকালে পানির তাপমাত্রা খুব কমে গেলে সার প্রয়োগ করা উচিত নয়।

৫.২.পানির তাপমাত্রা

ঝিনুকের খাদ্যগ্রহণ, বৃদ্ধি এবং নেকার নিঃসরণের ক্ষেত্রে পানির তাপমাত্রা একটি গুরুত্বপূর্ন বিষয়। পানির অনুকূল তাপমাত্রায় ঝিনুজ দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং নেকার দ্রুত নিঃসৃত হয়ে দ্রুত মুক্তা গঠিত হয়। মুক্তাচাষে পানির অনুকূল তাপমাত্রা হলো ২০-৩০ ডিগ্রী সে.।

৫.চাষের পুকুরের ঝিনুক স্থাপন

* ঝিনুক রাখার জন্য আড়াআড়ি ভাবে পুকুরে নাইলনের মোটা রশি টানাতে হবে। রশির দুই পান্তে বাঁশের খুঁটির সাথে বাঁধতে হবে।

* পরিমাণমত ফ্লোট বা ভাসান যুক্ত করে রশিটিকে ভাসমান রাখতে হবে।

* ঝিনুক নেটের ব্যাগে রেখে তা রশি থেকে নাইলন সুতা দিয়ে এমনভাবে ঝুলিয়ে দিতে হবে যেন নেট ব্যাগে স্থাপিত ঝিনুক১.০-১.৫ ফুট পানির নিচে অবস্থান করে।

* প্রতিটি নেট ভ্যাগে ২-৩টি করে ঝিনুক রাখতে হবে।

৫.৪       অপারেশনকৃত ঝিনুকের চাষ ঘনত্ব

অপারেশনের ৩-৪ ঘন্টার মধ্যে ঝিনুক পুকুরে স্থানান্তর করতে হয়। এতে বেঁচে থাকার হার বৃদ্ধি পায়, ক্ষত দ্রুত সেরে ওঠে এবং নেকার নিঃসরণ বৃদ্ধিপায়। প্রতি শতাংশে ২০০ থেকে ২৫০ হারে ঝিনুক মজুদ করলে মুক্তার বৃদ্ধি ভাল হয়। প্রত্যেক নেট ব্যাগে ২-৩টি করে ঝিনুক থাকবে। দুইটি নেট ব্যাগে রম্েযধ দূরত্ব থাকবে ২৫-৩০ সে.মি এবং দুইটি রশির মধ্যে দুরত্ব হবে৪-৫ ফুট (১.২-১.৫ মিটার) (চিত্র-১৫)।

৫.৫       চাষ ব্যবস্থাপনা

মুক্তাচাষকে এক ধরণের মৎস্যচাষ বলা চলে। ব্যবহার উপযোগি মুক্তা পেতে ২ থেকে ৩ বৎসর সময় লাগে। একারণে চাষকালীন ব্যবস্থাপনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

৫.৫.১   অপারেশনকৃত ঝিনুক প্রতি পালন

অপারেশনের পর প্রথম মাসে ঝিনুক সাধারণত: দুর্বল হয়ে পড়ে। এই দুর্বলতা কাটিয়ে তোলার জন্য পুকুরে যথেষ্ট খাদ্য ও উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিস্থাপিত নিউক্লিয়াস এবং ম্যান্টল টিস্যুর টুকরা ঝিনুক থেকে বের হয়ে যেতে পারে। তাই অপারেশনের প্রথম ১৫ দিন পর ঝিনুক পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এরপর মাসে একবার মুক্তার বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

এজন্য

*             ঝিনুক খোলার চিমটা দিয়ে সাবধানে দুইটি খোলস সামান্য ফাঁক করতে হবে এবং ছায়াযুক্ত স্থানে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। অপারেশনের ১৫ দিন পর সবগুলি এবং পরবতীতে প্রতিবারে ১০-১৫ টি ঝিনুক পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

*             পর্যবেক্ষণ কাজটি দ্রুততম সময়ে শেষ করতে হবে যাতে ঝিনুকটি মারা না যায়।

*             প্রতিস্থাপিত নিউক্লিয়াস এবং ম্যান্টল টিস্যুর টুকরা নষ্ট হয়ে থাকলে তা আবার প্রতিস্থাপন করতে হবে।

*             মৃত ঝিনুক থাকলে তা সরিয় করে নিতে হবে।

৫.৫.২  পানির গভীরতা বজায় রাখা

চাষকালীন সময়ে ঝিনুক ঝুলানোর গভীরতা যথাযথভাবে বজায় রাখতে হবে। ঋতু অনুযায়ী ঝুলানোর গভীরতা কমবেশি করতে হবে যাতে অতিরিক্তত তাপ বা ঠান্ডায় ঝিনুকের ক্ষতি না হয়। শীতকালে ঝুলানোর গভীরতা কিছুটা কম হতে পারে, এক্ষেত্রে ২০ সেমি এর কাছাকাছি রাখতে হবে। এই গভীরতায় যথেষ্ট খাদ্য এবং মুক্তা উৎপাদনের জন্য অনুকূল পরিবেশ যেমন পানির তাপমাত্রা, সূর্যালোক, অক্সিজেন ইত্যাদি উপযুক্ত মাত্রায় বিদ্যমান থাকে। গ্রীস্মকালে উপরিস্তরের পানির তাপমাত্রা ৩০০ সে. এর চেয়ে বেশি হয়ে যায় যা ঝিনুকের বৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে। এমনটি অনেক সময় ঝিনুকের মৃত্যুর কারণ হয়। এক্ষত্রে ঝিনুক অধিকতর গভীরতায় রাখতে হবে।

৫.৫.৩  পানির গুণাগুণ বজায় রাখা

মুক্তাচাষের ক্ষেত্রে পানির গুণাগুণ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা সরাসরি ঝিনুকের বৃদ্ধি এবং মুক্তা উৎপাদনের প্রভাবিত করে। মুক্তাচাষের জন্য পানির সঠিক রং হলো হলুদাভ সবুজ এবং স্বচ্ছতা ৩০ সে.মি। যদি পানি পরিস্কার এবং স্বচ্ছতা ৩৫ সে.মি এর বেশি হয় তবে বোঝা যাবে যে পুকুরে প্রাকৃতিক খাদ্য কমে গেছে। তখন দ্রুত পানিতে সার প্রয়োগ করতে হবে। অন্যদিকে স্বচ্ছতা যদি ২৫ সে.মি এর কম হয়ে যায় তবে পুকুরে নতুন পানি মেশাতে হবে যাতে প্লাংকটনের অতিরিক্তজন্মানোর কারণে অক্সিজেন কমে না যায়।

৬.মুক্তা আহরণ

৬.আহরণপূর্ব ব্যবস্থাপনা

মুক্তাচাষের সময়কাল তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ যা ২ থেকে ৫ বৎসর পর্যন্ত হতে পারে। চাষের এই সময় নির্ভর করে কি আকারের মুক্তা তৈরি করা হবে তার ওপর। বড় আকারের মুক্তা তৈরির জন্য অপেক্ষাকৃত বেশি সময় লাগে। তবে এতে লাভ বেশি। মুক্তা আহরণের পূর্বে বিশেষ যতœ নিতে হয় যাতে মুক্তার ঔজ্জ্বল্য এবং গুণগতমান ভাল হয়। তাই আহরণের কয়েকদিন পূর্বে পুকুরে প্রাকৃতিক খাদ্য বাড়ানোর জন্য সার প্রয়োগ করতে হবে এবং পানির সঠিক গুণাগুন বজায় রাখতে হবে।

৬.আহরণের সময়কাল

ডিসেম্বর থেকে ফেব্র“য়ারি হলো মুক্তা আহরণের সমচেয়ে উপযুক্ত সময়। এই সময় নেকার নিঃসরণ কম হয় ফলে মুক্তার ওপর একটি শক্ত আবরণ পরে। এতে মুক্তার উপরিতল মসৃণ ও উজ্জ্বল হয় এবং মুক্তার গুণগতমান খুবই ভাল হয়।

৬.আহরণএবং সংরক্ষণ পদ্ধতি

মুক্তার গুণগত মান বজায় রাখার জন্য সঠিক নিয়মে আহরণ ও সংরক্ষণ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চাষকৃত ঝিনুক থেকে মুক্তা আহরণের জন্য দুইটি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। একটি হলো জীবিত ঝিনুক থেকে মুক্তা সংগ্রহ করা। অপারেশনকৃত ঝিনুকের প্রাপ্যতা কম হলে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। অপর পদ্ধতিটি হলো ঝিনুক কেটে মুক্তা সংগ্রহ।

৬.৩.জীবিত ঝিনুক থেকে মুক্তা সংগ্রহ

নিুলিখিত পদ্ধতিতে জীবিত ঝিনুক থেকে মুক্তা সংগ্রহ করা যায়-

*             ঝিনুক খোলার চিমটা দিয়ে ঝিনুকের খোলস খুব সাবধানতার সাথে সামান্য ফাঁক করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে যাতে সংযোজন পেশি (যে পেশি ঝিনুকের দুটি খোলসকে আটকিয়ে রাখে) ছিড়ে না যায়।

*             মুক্তার থলি থেকে বাইরের দিকে একটি পাতলা পাতের সাহায্যে সামান্য চাপ দিয়ে মুক্তা বের করে আনতে হবে।

*             মুক্তা সংগ্রহ শেষে ঝিনুক আবর পালন করা যেতে পারে এবং তা মুক্তাচাষে ব্যবহার করা যায়।

৬.৩.২ ঝিনুক কেটে মুক্তা সংগ্রহ

ঝিনুক কেটে মুক্তা সংগ্রহের পদ্ধতি নিুরূপঃ

*             ঝিনুকের দেহ থেকে ম্যান্টল আলাদা করে নিতে হবে।

*             ম্যান্টলগুলো তোয়ালের সাহায্যে ঘষতে হবে। এতে ম্যান্টল থেকে মুক্তা পৃথক হয়ে যাবে।

*             ম্যান্টল টিস্যু ধুয়ে ফেলে দিলে পাত্রের তলায় মুক্তা জমা হবে।

*             এইভাবে কয়েকবার তোয়ালে দিয়ে ঘষলে ম্যান্টল থেকে মুক্তা পুরাপুরি পৃথক হয়ে যাবে।

*             মুক্তা থেকে আঠা জাতীয় পদার্থ দুর করার জন্য ঘন লবন পানিতে ৫ থেকে ১০ মিনিট ডুবিয়ে রাখতে হবে।

*             লবন পানি দুর করার জন্য মুক্তা পুনরায় কয়েকবার  পরিস্কার পানি দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে।

৬.৩.সংরক্ষণ

মুক্তা শুকাতে হবে এবং নরম সুতি কাপড় বা সিল্কের কাপড় দিয়ে ঘষতে হবে। এতে মুক্তা চকচকে হয়ে উঠবে। না শুকানো পর্যন্ত মুক্তা ছায়ায় রাখতে হবে।

শুকানোর পর মুক্তা সতর্কতার সাথে সুতি কাপড়ের ব্যাগে বায়ুযুক্ স্থানে সংরক্ষণ করতে হবে। এতে মুক্তার ঔজ্জ্বলতা বজায় থাকবে। বায়ুরোধী পাত্রে মুক্তা রাখলে ঔজ্জ্বল্য কমে যাবে। উজ্জ্বলতা কমে গেলে বিক্রয় মূল্যও কমে যাবে।

৮.উপসংহার

বাংলাদেশে প্রচুর পুকুর-দীঘি, খাল-বিল, হাওর-বাওর ও নদী-নালা আছে যা মুক্তাচাষের জন্য উপযুক্ত। মুক্তাচাষ মাছের ক্ষতি করে না বিধায় পুকুরে মাছ চাষের পাশাপাশি অতিরিক্ত ফসল হিসেবে মূল্যবান মুক্তাচাষ করে বাড়তি আয় করা যায়। তাছাড়া মুক্তা উৎপাদনের জন্য চাষকৃত ঝিনুক ছাঁকন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পুকুরের পরিবেশ উন্নত করে। মুক্তাচাষ ব্যয়বহুল বা কঠিন বিষয় নয়। এক্ষেত্রে বড় পুঁজি হচ্ছে ব্যক্তিগত উদ্যাগ ও শ্রম। দেশের বেকার যুবকরা যদি এ ব্যাপারে এগিয়ে আসেন তবে মুক্তাচাষে বিরাট সফলতা অর্জন করা সম্ভব হবে এবং ব্যাপক জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে। বিশেষ করে আমাদের দেশের অবহেলিত নারীসমাজ এ কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে। কারণ, মুক্তাচাষের জন্য ঝিনুকে কৌশলে বহিঃস্থ পদার্থ প্রবেশ করানোর ক্ষেত্রে পুরুষ অপেক্ষা মহিলারা অধিক ধৈর্য ও দক্ষতার পরিচয় দেন। সঠিক পদ্ধতিতে মুক্তাচাষ করতে পারলে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়েও মুক্তা রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।

বাংলাদেশ মৎস গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত মুক্তাচাষ প্রযুক্তি সম্প্রসারিত হলে এই অপ্রচলিত জলজ সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হবে এবং এতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে এক নব দিগন্তের সূচনা হবে।

উপাত্ত সংগ্রহ-বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, ময়মনসিংহ

সর্বশেষ - গরু পালন