কোহেলীর ৩ স্বামী
(বন্ধুর মুখে শোনা গল্প)

সিজান, মাছুম আর কোহেলী তিনজন তিনজনার বন্ধু। একই সাথে ভার্সিটিতে পড়াশুনা, সিনেমা, পার্ক, রেস্তোরা, আড্ডা, ঘোরা ফেরায় একজন বিহীন দুজন অচল। এরই ভিতর কোহেলীর মন দেওয়া নেওয়া ও ভবিষৎ পরিকল্পনা চলছে। বাইরে বুঝার সাধ্য নেই। কোহেলীর সাথে এই সর্ম্পকটা কার? ভার্সিটির পড়াশুনা শেষ হতেই ঘোরা-ফেরা নাচ-গান লুকিয়ে প্রেম করার অবসান দিতে এগিয়ে এলেন ধনী পিতা জসিম উদ্দিন। মহা ধুম ধামের মাঝে সিজানের সাথে কোহেলীর বিয়ের উৎসব শেষ করে রাঙ্গামাটি-বান্দরবান-কক্সবাজারে গেল হানিমুনে। উড়ন্ত বিহঙ্গের মত নেচে গেয়ে উড়ে চলছে দুজন। কিন্তু মাসুম পাশে নাই বলে ওদের আনন্দটা জমছে না। কারন দুজন খেলোয়ার, এদের হ্যান্ডবল, ফাউল, অফসাইড, প্লান্টিক ইত্যাদির জন্য রিফারী হিসাবে মাছুমের প্রয়োজন ছিল। যত প্রিয় বন্ধু হোক না কেন, স্বামী স্ত্রীর মিলনের সময় কাছে থাকা অবাঞ্ছনিয়। এটাই প্রমান করল সিজান ও কোহেলী।
পাহাড়ী পথ দিয়ে প্রাইভেট কারে দুজন চলছে গান গেয়ে। ড্রাইভিং করছে সিজান নিজেই। কিন্তু ওদের সুখ স্বয়ং খোদা তা-আলা ঠেকিয়ে দিল। প্রাইভেট কারের ব্রেক ফেলে করে। সিজান কোহেলীকে ধাক্কা মেরে দরজা দিয়ে বাইরে ফেলে দিয়ে, প্রাইভেট কার নিয়ে পাহাড়ের উপর থেকে নীচে পড়ে গেল। প্রাইভেট কারটি পাহাড়ের পাথরের আঘাতে ভেঙ্গে চুরে ছিন্ন ভিন্ন চ্যাপ্টা হয়ে গেল।
যথারীতি সংবাদ ঢাকায় পৌছে গেল। সিজান ও কোহেলীর পিতা মাতা ছুটে এল। সিজান মারাতœাক ভাবে আহত হয়ে হাসপাতালে এসেছে। কিন্তু কোহেলীর কোন সন্ধান পেলনা। এক দেড় মাস ডাক্তারি চিকিৎসার পর সিজান সুস্থ্য হয়ে ঢাকায় ফিরে এল। কোহেলীর পিতা কামাল উদ্দিন ও মাতা সাবিহা বেগম একমাত্র কন্যার শোকে শোকাহত। সিজান কোহেলীকে ভুলতে পারছেনা। সিজানের ধারনা সে এখনও বেঁচে আছে। তার কিছু হয়নি। সে মরতে পারে না। মাছুম বুজতে পারল, সিজানকে কোন মতেই বাড়ীতে আটকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। সিজান কোহেলীকে খুজতে যাবেই তাই কোহেলীর খোজে সিজানের সহিত মাছুমও যেতে চাইল। কিন্তু সিজান মাছুমকে সঙ্গে না নিয়ে একাই একদিন রাতের আধারে পিতা মাতাকে ফাঁকী দিয়ে বেরিয়ে পড়ল। সেই সাথে সিজানের সকল দায় দায়িত্ব ও পিতামাতাকে দেখাশুনার জন্য মাছুমকে অনুরোধ করল। প্রথমে মাছুম রাজী হয়নি। এক পর্যায়ে মাছুম রাজী হয়। সিজান মাছুমকে বলে আমার পিতা মাতা আজ থেকে তোরও পিতা মাতা। আমার সব কিছু আজ থেকে তোর। আমার অবর্তমানে তুই এ সবের মালিক। আর আমি যতদিন ফিরে না আসব। ততদিন তুই আমার পিতা মাতাকে দেখিস। আর আমি যেমন, কোন দিনও আমার পিতা মাতার অবাধ্য হয়নি, তুইও তেমনি আমার পিতা মাতার অবাধ্য হোস না ভাই। আমার পিতা মাতার কথা আদেশ নির্দেশ সন্তান হয়ে মান্য করিস। এছাড়া পিতা জসিম উদ্দিন ও মা শাহানা, মাছুমকে পুত্রের মত ভালবাসে। সিজানের এই চলে যাওয়াতে উভয় পরিবার আরেকটি শোক অনুভব করলো। মাছুম রীতিমত দুটি পরিবারের সাথে সু-সম্পর্ক রেখে সিজানকে দেওয়া কথামত, জসিম সাহেবের ব্যবসার কাজ কর্মগুলি দেখছে।
কোহেলী পাহাড়ের উপর থেকে গড়িয়ে খাদে পড়ে যায়। মাথায় প্রচন্ড আঘাতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। সোহেলের মামা বাড়ী বান্দরবান। বিকালে ঘুরতে ঘুরতে কোহেলীকে পাহাড়ের খাদে অজ্ঞান অবস্থায় পেয়ে মামার বাড়ীতে নিয়ে আসে। সেখানে কয়েকদিন চিকিৎসার পর কোহেলী সুস্থ্য হয়ে যায়। কিন্তু কোহেলী বলতে পারেনা সে কে? কি তার পরিচয়। সোহেলের দেখাশুনা ও সেবা শুশ্র“ষায় কোহেলী ভাল হয়ে উঠেছে। কিন্তু সোহেলের মামা নাসির রহমান, কোহেলী ও সোহেলের মেলামেশা মেনে নিতে পারছে না। নাসির রহমান কোহেলীর রুপ লাবন্য দেখে মুগ্ধ হয়ে বিয়ের প্রলভন দেখাচ্ছে। বিয়েটা নাসিরের নিঃসন্তান স্ত্রী রেসমী বুঝতে পেরে সোহেলকে জানায়। মামা ভাগ্নে শত্র“তায় পরিনত হয়। তখন রেসমী কোহেলীর মত নিয়ে দু জনার বিয়ে দেয়।
নাসির বাধ্য হয়ে ওদের দুজনকে স্বীকৃতি দেয়। এভাবে ওদের দু জনের নতুন জীবন অতিবাহিত হতে লাগল। দিন মাস বছর পার হয়ে পাঁচটি বছর অতিবাহিত হল। জন্ম দিয়েছে এক সন্তান। দুজন আদর করে ছেলের নাম রেখেছে রতন।
সোহেল ঢাকায় চাকরী পেয়ে, কোহেলীকে নিয়ে ঢাকায় আসার পথে, পুনরায় আবার গাড়ী এ্যাকসিডেন্ট করল। মাথায় প্রচন্ড আঘাত লেগে মাথা থেকে প্রচুর রক্ত ক্ষরন শেষে, ওর স্মৃতি শক্তি ফিরে পেল। তখনি ঘটল আরেক সমস্যা! নিজের নাড়ী ছেড়া ধন ও স্বামীকে সে চিন্তে পারলনা। আহত সন্তান ও স্বামীকে ফেলে সিজান বলে চিৎকার করে ছুটে চলল। আহত সোহেল, আহত রতনকে কোলে নিয়ে কোহেলীর পিছন অনুসরন করে ছুঠছে সোহেল।
মাছুম গাড়ী চালিয়ে যাছিল। হঠাৎ রাস্তা দিয়ে কোহেলীকে দৌড়াতে দেখে গাড়ী থামাল। দুজন দুজনকে চিনতে পারল। কোহেলী মাছুমের গাড়ীতে উঠলো। পিছনে পিছনে ছুটে আসছে রতনকে কোলে নিয়ে আহত সোহেল। কিন্তু কাছে আসার আগেই ওদের গাড়ীটি চলা শুরু করলো। সোহেল আর কোহেলীর নাগাল পেলনা। গাড়ী টেনে চলে গেল তবে সোহেল গাড়ীর নস্বরটা জেনে নিল। শুধু গাড়ীর নম্বর নিয়ে সোহেল বিরাট ঢাকা শহরের কোথায় খুজবে কোহেলীকে।
হারানো কোহেলীকে পেয়ে উভয় পরিবার খুশী হলো। পিতা-মাতা শ্বশুর শ্বশুড়ি সকলেই। শুধুমাত্র সিজানের মা শাহানার বুক ফেটে যাচ্ছে। কোহেলী ফিরে এসেছে। কিন্তু সিজান আজ নেই। সিজান কোহেলীকে কত না ভালবাসত! যে সিজান কোহেলীকে খুজতে পাঁচটি বছর হলো বেরিয়ে গেছে আর ফিরে আসেনি।
সময়ের সাথে সাথে কোহেলী জীবনে অরেকটি মোড় ঘুরলো। উভয় পরিবারই মাছুমকে ভালবাসে। কোহেলী, সিজানের কথা শুনে ভেঙ্গে পড়েছে। কোহেলীর কাছে তার পূর্বের পাঁচ বছরের কথা জিজ্ঞেসা করলে, ও কিছুই বলতে পারেনা। ও পাঁচটি বছর স্বীকার করতেই চায় না। সিজানের শোকে শোকাহত কোহেলীর মুখে, হাসি ফোটানোর জন্য মাছুমের সাথে কোহেলীর বিয়ের কথা বলাবলি করছে উভয় পরিবার। পিতা জসিম উদ্দিন সাহেব মাছুমকে পুত্র মনে করে, এ সিন্ধান্ত নিয়েছে। মাছুম ও কোহেলী প্রথমে, এ সিন্ধান্ত মেনে নিতে পারছে না। উভয় পিতা মাতার অনুরোধে এবং কোহেলীর মুখে হাসি ফোটাতে, সিজানের দেওয়া কথা রক্ষা করতে মাছুম রাজী হয়।
সিজানের বাড়ীতে বিরাট ধুম ধামের সাথে মাছুম কোহেলীর বিয়ে হয়ে গেল। সেই এক বাড়ীর একই ঘরে মাছুম ও কোহেলী বাসর সাজানো হয়েছে। রাত দ্বি প্রহর বাড়ীর সব গুলো বাতি নিভানো। ঝি-ঝি-খাঁ-খাঁ করছে চারিদিকে। হঠাৎ কলিং বেল শব্দ হলো। মা শাহানা দ্রুত বাতি জ্বালিয়ে দরজা খুলে ছুটে এল। দাড়ি গোফ ভর্তি আল খালা ছেড়া কালো জামা গায়ে শাহানার সামনে দাড়িয়ে ডাকল ‘মা’। তখন শাহানা ‘সিজান’ একটি চিৎকার করে স্তম্ভিত হয়ে গেল। সিজান মাকে জড়িয়ে ধরে বলছে,
‘মা আমাকে ক্ষমা করে দাও। মা আমি কোহেলী বড় ভালবাসি, তাই ওর ভালবাসায় অন্ধ হয়ে, তোমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমি ওকে কোথাও খুজে পায়নি। আমি আমার কোহেলীকে খুজে পায়নি।’
‘আর বলিস নারে বাবা, তোর কোহেলী ফিরে এসেছে। কিন্তু সেতো আর তোর নেই। কোহেলী এখন মাছুমের হয়ে গেছে। আজ কোহেলীর সাথে মাছুমের বিয়ে হলে গেল।’
শাহানার কথা কেড়ে নিয়ে
‘না না না, তা হতে পারেনা। আমার কোহেলী আর কাহারো হতে পারেনা।’
মাছুম আর কোহেলী সামনে এসে দাড়াল।
কি করবে এখন সিজান?
কি দেখছে সিজান?
কোহেলী এখন কার?
মাছুমের হাত ছিনিয়ে সিজান কি পারবে কোহেলীকে জয় করতে?
কোহেলী এখন কি করবে? বার বার মাছুমের দিকে তাকায়, তারপর নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না। সমার্পন করল সিজানকে। মাছুম নিজেকে অপরাধী মনে করে নিরব দাড়িয়ে আছে। কিন্তু সিজানের ডাকে সাড়া না দিয়ে পারল না। সিজান, মাছুম ও কোহেলী তিন জনের মিলনে মনে হল স্বর্গের শান্তি এসেছে।
এরপরও কথা। দীর্ঘদিন রোধ-বৃষ্টি, ঝড়, অনাহার, অনিদ্রায়, সিজানের দেহে বসবাস করছে যক্ষা ও ক্যান্সারের জীবানু। সিজান কাঁশি দিতে দিতে মাটিতে পড়ে গেল। এ পড়া শেষ পড়া আর ওঠতে পারল না। শুধু বলে গেল
‘মাছুম, তুই আমার কোহেলীকে দেখিস! সুখে রাখিস। জীবন দিয়ে রক্ষা করিস।’
সিজান পৃথিবী ছেড়ে চলে গেল। অনেক দুরে। পরের দিন সকাল ১১ টার দিকে সিজানের দাপন শেষ করে সবাই গুন গুন করে কাঁদছে। সোহেল মাছুমের গাড়ীর নম্বর ধরে খুজতে খুজতে হাজির হল সিজানের বাড়ীতে।
সোহেল, কোহেলীর ঠিকানা পেলেও, কোহেলী সোহেলের ঠিকানা পেল না? সকল অস্থিত্ব অস্বীকার করল। সোহেল, কোহেলীকে অনেক ভাবে বুঝানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হলো। সোহেল তার স্বামী, রতন তার সন্তান। তাদের বিয়ে হয়েছিল। ছোট্ট একটা সুখী পরিবার ছিল। এ সবের কিছুই স্বীকার করল না কোহেলী। কোহেলী, সোহেলকে বুঝাতে না পারলেও, বুঝতে পারল কোহেলীর মা সুরাইয়া বেগম। কোহেলীর মা সুরাইয়া বেগম, সোহেলকে বলল-তার সকল কথার সত্যতার প্রমান হাজির করতে।
চিঠিতে সব জানতে পেরে বান্দরবান থেকে ছুটে এলো মামা-মামী নাসির রহমান ও রেসমী। মা সুরাইয়া বেগম, কাবিন নামা, বিয়ের ছবি, রতনের ছবি, কোহেলীর মাতৃত্বের ছবি, দেখে বুঝতে পারল ঘটনাটা।
এখন কি করবে মা সুরাইয়া?
মেয়ে কোহেলীকে কার হাতে তুলে দেবে?
মাসুমের হাতে?
নাকি সোহেলের হাতে?
সোহেলকে কোহেলীর জীবনের ঘটনাগুলি বর্ণনা করল। সোহেল, কোহেলীর সব কিছু শুনে, কোহেলীর সুখের জন্য, জসিম উদ্দিন সাহেবের পরিবার রক্ষা করার জন্য, পুত্র রতনকে অবলম্বন করে, ফিরে চলে গেল বান্দরবান। চলে যাবার পর কোহেলীও অনুভব করল তার মাতৃত্ব। ছেলে রতনের জন্য তার কষ্ট হয়। রতনকে সে কাছে চায়। কিন্তু পিতা সোহেল রতনকে নিয়ে চলে গেছে।
**********
























