প্রতিবেদন শেষে যা যা জানা জানতে পারবেন–
পোল্ট্রির বসন্ত রোগ কী ? বসন্তের কারণ ও সংক্রমণ, বিভিন্ন প্রকৃতির বসন্ত ।
বসন্ত রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ , মুরগির ফাউল পক্স ভ্যাকসিন, টিকা দেওয়ার নিয়ম, মুরগির ফাউল পক্স সরকারি ভ্যাকসিন, ফাউল পক্স টিকার দাম।

পোল্ট্রির বসন্ত রোগ
পোল্ট্রির বসন্ত বা ফাউল পক্স (Fowl Pox) একটি ভাইরাস জনিত অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ। সব বয়সের ও সব প্রজাতির পোল্ট্রি এতে আক্রান্ত হতে পারে। পোল্ট্রির বসন্ত একটি মারাত্মক রোগ। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ এ রোগের সঙ্গে পরিচিত। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে এ রোগের প্রাদুর্ভাব ব্যাপকতা লাভ করে । তখন মৃত্যুহার অত্যন্ত বেড়ে যায়। যদিও ফাউল পক্স বলতে সব পোল্ট্রির বসন্ত রোগকেই বুঝায় তথাপি বর্তমানে আলাদা নামেও, যেমন—পিজিয়ন পক্স, টার্কি পক্স, ক্যানারি-পক্স প্রভৃতি ডাকা হয়। পৃথিবীর প্রায় সব পোল্ট্রি উৎপাদনকারী দেশেই বসন্ত রোগ দেখাযায় । এ রোগে পাখির দেহের বিভিন্ন স্থানে । এ রোগে পাখির দেহের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষত উন্মুক্ত স্থানে এবং অভ্যন্তরীণ অঙ্গে, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র লালচে নডিউল (Nodule) সৃষ্টি হয় যা বসন্তের গুটি নামে পরিচিত ।
রোগের কারণ
পক্স ভিরিডি (Poxviridae) পরিবারের ফাউল পক্স ভাইরাস (Fowl Pox Virus) নামক ভাইরাস বসন্ত রোগের কারণ ।
সংক্রমণ নিম্ন লিখিতভাবে এ রোগ সংক্রমিত হতে পারে। যথা—
১. রোগাক্রান্ত পাখির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংস্পর্শে সুস্থ পাখিতে এ রোগ ছড়াতে পারে ।
২. ত্বকের ক্ষত বা কাটা ছেঁড়ার মাধ্যমে।
৩. ঈঁষবী(Culex-) ও অবফবং (Aedes) মশা এবং দংশনকারী কীট-পতঙ্গের মাধ্যমে ।
৪. তাছাড়া কখনো কখনো রক্ত-শোষক মাছি, ফ্লি ও আটালির মাধ্যমে ও ছড়াতে পারে।

রোগের লক্ষণ
বসন্ত রোগ প্রধানত দু’প্রকৃতিতে দেখা যায় । যথা—
ক. ত্বকীয় বা হেড ফর্ম (Cutaneous or Head Form) ঃ এ প্রকৃতিতে আক্রান্ত পাখির মুখ-মন্ডলে বসন্তের গুটি দেখা যায়। আক্রান্ত পাখির ক্ষুধামন্দা, দৈহিক ওজন হ্রাস ও ডিম উৎপাদন কমে যাওয়া প্রধান বৈশিষ্ট্য । এটিকে শুষ্ক বসন্তও (Dry Pox) বলা হয়।
খ. ডিপথেরিটিক প্রকৃতি (Diptheritic Form) ঃ এ প্রকৃতিতে প্রথমে আক্রান্ত পাখির জিহবায় ক্ষত দেখা যায় । এ ক্ষত পরে শ্বাসনালি ও ফুসফুসে বিস্তার লাভ করে। অপ্রধান জীবাণুর জটিলতায় অর্থাৎ ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমিক সংক্রমণে অবশেষে পাখির মৃত্যু ঘটে। এ প্রকৃতির বসন্ত আর্দ্র বসন্ত (Wet Pox) নামে ও পরিচিত। এ দু’প্রকৃতির বসন্ত আবার পাখিতে মৃদু ও তীব্র আকারে রোগ লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে। যেমন-
মৃদু প্রকৃতির বসন্তে
– পাখির উন্মুক্ত ত্বকে বসন্তের ফোস্কা দেখা যায়। এটিই এ প্রকৃতির প্রধান বৈশিষ্ট্য ।
– মুরগির ঝুঁটি, গল-কম্বল, পা, পায়ের আঙ্গুল ও পায়ুর চারপাশে বসন্তের গুটি বা ফুসকুঁড়ি দেখা
– যায়। এগুলো কিছুটা কালচে বাদামি রঙের হয় ।
– চোখের চারপাশে বসন্তের ফুসকুঁড়ির ফলে চোখ বন্ধ হয়ে যায়।
তীব্র প্রকৃতির বসন্তে
– দেহের মুখ-গহব্বর স্বরযন্ত্র, শ্বাসনালি ও অন্ত্রের দেয়ালে ও বসন্তের ক্ষত দেখা দিতে পারে।
– শ্বাস নালি আক্রান্তের ফলে পাখির শ্বাসকষ্ট হয় ও পাখি শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যায়।
– এতে ডিম পাড়া মুরগির ডিম উৎপাদন কমে যায় ।
-এতে পাখির মৃত্যু হার ৫০% পর্যন্ত হতে পারে।

রোগ নির্ণয়
নিম্ন লিখিত ভাবে পাখিতে বসন্ত রোগ নির্ণয় করা যায়। যথা-
রোগের ইতিহাস ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ লক্ষণ দেখে ।
মুরগির আক্রান্ত স্থানের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ প্যাথলজিক্যাল পরিবর্তন দেখে। এতে নি¤œলিখিত পরিবর্তন দেখা যায়। যথা-
১. আক্রান্ত স্থানে প্রথমে ছোট ছোট লাল দাগ হয় ।
২. পরবর্তীতে যা বড় হয়ে পুঁজ পূর্ণ হয় ও পেঁকে ঘা সৃষ্টি করে । এ ঘায়ে শেষে মামড়ি সৃষ্টি হয় ও তা পরবর্তীতে খসে পড়ে । আক্রান্ত পাখির ক্ষতের নমুনা সুস্থ পাখির ঝুঁটি বা পালকের ফলি কুলে আঁচড়িয়ে প্রবেশ করিয়ে উৎপন্ন বৈশিষ্ট্যপূর্ণ গুটি দেখে।
চিকিৎসা এ রোগের কোনো কার্যকরী চিকিৎসা নেই। তবে আক্রান্ত ক্ষতে জীবাণু নাশক ওষুধ (যেমন- মারকিউরিক্রোম) দিয়ে পরিষ্কার করে তাতে সকেটিল, সালফানিলামাইড বা অন্য কোনো জীবাণু নাশক পাউডার লাগালে সুফল পাওয়া যায়। এছাড়া ও ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমিক সংক্রমন রোধ করতে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা যেতে পারে।
মুরগির ফাউল পক্স ভ্যাকসিন
মুরগির ফাউল পক্স ভ্যাকসিন কঠিন অবস্থায় বায়ুশুন্য বোতলে সংরক্ষিত থাকে। মুরগির ফাউল পক্স ভ্যাকসিনের রং গোলাপি। বিশুদ্ধ পানিতে পুরাটা মিশিয়ে এই ভ্যাকসিন তৈরি করা হয়। ভ্যাকসিন তৈরির পরে কবুতর ও মুরগী যাদের বয়স ২৮-৩২ দিন সেগুলো কে পাখনার নিচে যেখানে পালক থাকে না, সেখানে ৪-৫ টি খোঁচা দিয়ে এই ভ্যাকসিন প্রয়োগ করতে হয়।
এই খোচা দেওয়া জায়গাটি যদি ৪-৫ দিনের মধ্যে ফুলে উঠে তাহলে বুঝতে হবে টিকা টি কাজ করছে, আর যদি ফুলে না ওঠে তাহলে বুঝতে হবে টিকা কাজ করেনি। এরকমটি হলে পুনরায় আবার আগের নিয়মে ভ্যাকসিন দিতে হবে। এই রোগের ভ্যাকসিন প্রতি বছর ১ বার দিতে হয়।
মুরগির গুটি বসন্ত রোগ বা ফাউল পক্স রোগটি মোরগ-মুরগির ভাইরাস জনিত একটি রোগ। এই রোগে আক্রান্ত হলে মোরগ-মুরগির ঝুটি, কানের লতি, পায়ের বিভিন্ন অংশ এবং পায়ুর চার পার্শ্বে গুটি বসন্তের ফুসকুড়ি দেখা দেয়। মুরগির চোখের চারিপাশে ক্ষত সৃষ্টির ফলে চোখ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। এই রোগে বাচ্চা মোরগ-মুরগির মৃত্যুর হার বেশি থাকে।
মুরগির ফাউল পক্স সরকারি ভ্যাকসিন
মাষ্টার সীড- বোডেট (Buddett) ষ্ট্রেইন (মালয়েশিয়া),
ডোজ- প্রতি ভায়াল ২০০ মুরগি,
প্রতি ভায়াল ফাউল পক্স টিকার দাম- ৪০ টাকা,
উপজেলা ও জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে এ রোগের টিকা পাওয়া যায়,
মুরগির ফাউল পক্স সরকারি ভ্যাকসিন।
টিকা দেওয়ার নিয়ম
প্রথমে ভ্যাকসিন ভায়ালে ৩ এম এল বিশুদ্ধ পানি নিয়ে ভাল করে মিশিয়ে নিতে হবে। এই বিশেষ ধরনের টিকা প্রয়োগের জন্য বিশেষ ধরনের সুঁজ বা বিকল্প হিসাবে ইনজেকশনের সুঁচ ব্যবহার করা হয়।
সুঁচের অর্ধাংশ ডুবিয়ে ২৮-৩২ দিন বয়সী মোরগ-মুরগির পাখার নিচে পালকবিহীন চামড়ায় ৪-৫ টি সুঁচ ফুটিয়ে প্রয়োগ করতে হয়। এই ভ্যাকসিন আজীবনের জন্য রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টি করতে সক্ষম।
এমন কি মা থেকে মাতৃ এন্টিবডি বাচ্চায় সঞ্চীত হয়। আর তাই এই মুরগির গুটি বসন্ত রোগের টিকা একবার প্রয়োগই যথেষ্ট, পুনরায় প্রয়োগের প্রয়োজন পড়ে না।
ফাউল পক্স টিকার দাম
সরকারি ভাবে সরবরাহকৃত প্রতি ভায়াল ফাউল পক্স টিকার দাম ৪০ টাকা। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সরবরাহকৃত এই ভ্যাকসিনের দাম তুলনামুলক অনেক বেশি। সরকারি পক্স ভ্যাকসিন বছরের সব সময় সরবরাহ থাকে না তাই অধিকাংশ খামারি বেশরকারি প্রতিষ্ঠান যেমন- এসিআই, রেনাটা, এলানকো, এফএনএফ ইত্যাদি প্রতিষ্টানের উপর নির্ভরশীল। উপজেলা ও জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে এ রোগের টিকা পাওয়া যায়।
মুরগির ফাউল পক্স বা গুটি বসন্ত রোগ
রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা
নিয়োমিত মোরগ-মুরগিকে এ রোগের টিকা বা ভ্যাকসিন দিতে হবে। সময় মত ভ্যাকসিন প্রয়োগ করলে এ রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। ফাউল পক্স রোগের ভ্যাকসিনের দাম ও মোটামুটি কম। আমাদের দেশের ভ্যাকসিন বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান যেমন- এসিআই এনিমেল হেল্থ, রেনাটা, নোভারটিস ইত্যাদি কোম্পাণির কাছে গুটি বসন্ত রোগের ভ্যাকসিন সরবরাহ আছে।
ফোউল পক্স হলো মুরগি এবং টার্কির একটি বিশ্বব্যাপী ভাইরাল সংক্রমণ। পালকহীন ত্বকে নোডুলার ক্ষত কাটিনাস আকারে সাধারণ। ডিপথেরাইটিক ফর্মে, যা উপরের জিআই এবং শ্বাস প্রশ্বাসের ট্র্যাক্টগুলিকে প্রভাবিত করে, মুখ থেকে খাদ্যনালীতে এবং শ্বাসনালীতে ক্ষত দেখা দেয়।
রোগ নির্ণয় বৈশিষ্ট্যগত স্থূল এবং মাইক্রোস্কোপিক ক্ষত এবং পিসিআর পর্যবেক্ষণ দ্বারা হয়। ভ্যাকসিনেশন রোগ প্রতিরোধ করতে পারে এবং আক্রান্ত পালের মধ্যে সীমা ছড়িয়ে দিতে পারে।
আক্রান্ত ফ্লক থেকে যেন পক্স ভাইরাস না ছড়ায় তার জন্য বায়োসিকিউরিটি নিশ্চিত করতে হবে।
নতুন ফ্লককে সম্পূর্ণরূপে রোগাক্রান্ত মুরগি থেকে আলাদা করতে হবে।
মশা মাছি নিধন করতে হবে।
বহিরাগতর প্রবেশ নিষিদ্ধ করতে হবে।
রেজিস্ট্যার্ড ভেটেরিনারিয়ান এর পরামর্শ মোতাবেক টিকা বা ভ্যাকসিন করাতে হবে।
























