
পোল্ট্রি খামারিদের হারানো ঐতিহ্য ফিরে পেতে যা যা করণীয়//ড. বায়েজিদ মোড়ল।।
বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্প একসময় দেশের কৃষি অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী খাত হিসেবে পরিচিত ছিল। এই শিল্প শুধু মানুষের প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণ করেনি, বরং লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। গ্রামের ছোট ছোট খামার থেকে শুরু করে আধুনিক বাণিজ্যিক খামার—সব মিলিয়ে পোল্ট্রি খাত দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে এসেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খাদ্যের দাম বৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয়, রোগব্যাধি, বাজার অস্থিরতা, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং নীতিগত কিছু দুর্বলতার কারণে অনেক খামারি লোকসানের মুখে পড়েছেন। ফলে বহু খামার বন্ধ হয়ে গেছে এবং অনেক উদ্যোক্তা এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। হারানো সেই গৌরব ও ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা এবং খামারিদের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
১. ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে
পোল্ট্রি খামারিদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো উৎপাদন খরচের তুলনায় ন্যায্য মূল্য না পাওয়া। অনেক সময় ডিম ও মুরগির দাম উৎপাদন খরচের নিচে নেমে যায়, ফলে খামারিরা বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হন। উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত একটি স্বচ্ছ বাজারব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে অযৌক্তিক দামের ওঠানামা কমে এবং খামারিরা লাভজনক মূল্য পান।
২. সুষম ও মানসম্পন্ন খাদ্যের নিশ্চয়তা
খাদ্য ব্যয় একটি পোল্ট্রি খামারের মোট উৎপাদন ব্যয়ের প্রায় ৬৫–৭০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। তাই মানসম্পন্ন ও সাশ্রয়ী মূল্যের খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি নিম্নমানের বা ভেজাল খাদ্যের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৩. উন্নত বাচ্চা ও জেনেটিক্স নিশ্চিত করা
ভালো ফলনের জন্য উন্নত জাতের ডে-ওল্ড চিক, ব্রিডার ও হ্যাচারির মান নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিম্নমানের বাচ্চা দিয়ে কখনোই ভালো উৎপাদন সম্ভব নয়। তাই মান নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
৪. রোগ প্রতিরোধে জোর দিতে হবে
বার্ড ফ্লু, নিউক্যাসল, গামবোরোসহ বিভিন্ন রোগে প্রতিবছর খামারিরা বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হন। বায়োসিকিউরিটি, সময়মতো টিকা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে রোগের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
৫. আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনা
বর্তমান সময়ে শুধু খামার করলেই হবে না, বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা জানতে হবে। তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, বায়ু চলাচল, পানির মান, আলোর সঠিক ব্যবহার, পরিচ্ছন্নতা এবং রেকর্ড সংরক্ষণ—এসব বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।
৬. খামারিদের প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি
অনেক খামারি বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে কাজ করলেও আধুনিক প্রযুক্তি সম্পর্কে জানেন না। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, সেমিনার, কর্মশালা এবং মাঠপর্যায়ে পরামর্শ সেবা চালু করা দরকার।
৭. সহজ শর্তে ঋণ ও বীমা
অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা মূলধনের অভাবে খামার সম্প্রসারণ করতে পারেন না। কম সুদে ঋণ, পুনঃঅর্থায়ন এবং পোল্ট্রি বীমা চালু করলে ঝুঁকি কমবে এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে।
৮. বাজার ব্যবস্থার ডিজিটাল রূপান্তর
দেশব্যাপী ডিম ও মুরগির চাহিদা, সরবরাহ এবং মূল্য সম্পর্কে একটি ডিজিটাল তথ্যব্যবস্থা চালু করা গেলে উৎপাদন পরিকল্পনা সহজ হবে। এতে অতিরিক্ত উৎপাদন বা ঘাটতি—উভয় সমস্যাই অনেকটা কমে আসবে।
৯. গবেষণা ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ
বিশ্বের উন্নত দেশগুলো গবেষণার মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে উৎপাদন বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশেও বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি খাতের সমন্বয়ে নতুন প্রযুক্তি, উন্নত খাদ্য এবং রোগ নিয়ন্ত্রণে আরও গবেষণা বাড়াতে হবে।
১০. শক্তিশালী খামারি সংগঠন
খামারিদের স্বার্থ রক্ষায় শক্তিশালী সংগঠন অত্যন্ত জরুরি। সংগঠনগুলো যদি বাজার, নীতিমালা, প্রশিক্ষণ ও সরকারি সিদ্ধান্তে কার্যকর ভূমিকা পালন করে, তাহলে খামারিরা আরও বেশি উপকৃত হবেন।
১১. রপ্তানির সুযোগ তৈরি
বাংলাদেশে উৎপাদিত ডিম ও পোল্ট্রি পণ্যের আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা গেলে বিদেশে রপ্তানির নতুন বাজার সৃষ্টি হতে পারে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি খামারিরাও ভালো মূল্য পাবেন।
১২. নীতিমালার ধারাবাহিকতা
পোল্ট্রি শিল্পে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য স্থিতিশীল নীতিমালা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হঠাৎ সিদ্ধান্ত বা নীতিগত পরিবর্তনের কারণে উদ্যোক্তাদের ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। তাই খামারিবান্ধব, দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবসম্মত নীতিমালা প্রয়োজন।
১৩. ভোক্তার আস্থা ফিরিয়ে আনা
অনেক সময় গুজব বা ভুল তথ্যের কারণে ডিম ও মুরগির চাহিদা কমে যায়। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ এবং সচেতনতামূলক প্রচারণার মাধ্যমে ভোক্তাদের আস্থা আরও বাড়াতে হবে।
১৪. নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের উৎসাহ
পোল্ট্রি খাতে নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। বিশেষ প্রশিক্ষণ, স্টার্টআপ সহায়তা এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।























