কৃষি সাংবাদিক ড. বায়েজিদ মোড়লের গবেষণাধর্মী প্রতিবেদন,
মুরগির রানীক্ষেত (Newcastle Disease) রোগের কারণ, লক্ষণ, প্রতিকার, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা।।
বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্পের অন্যতম ভয়াবহ ভাইরাসজনিত রোগ সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ গাইড

রানীক্ষেত রোগ (Newcastle Disease বা ND) বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ সংক্রামক ভাইরাসজনিত পোল্ট্রি রোগ। বাংলাদেশে এটি “রানীক্ষেত”, “রানিখেত” বা “ND” নামে বেশি পরিচিত। এ রোগে ব্রয়লার, লেয়ার, সোনালী, দেশি মুরগি, হাঁস, কোয়েল, টার্কিসহ প্রায় সব ধরনের পাখি আক্রান্ত হতে পারে।
খামারে একবার রোগটি প্রবেশ করলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে প্রায় ৮০–১০০ শতাংশ মুরগি আক্রান্ত হতে পারে এবং মারাত্মক (Velogenic) স্ট্রেইনের ক্ষেত্রে মৃত্যুহার ৯০–১০০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তাই প্রতিরোধই এ রোগ মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
রোগের কারণ
রানীক্ষেত রোগের জন্য দায়ী Avian orthoavulavirus-1 (পূর্বের নাম Newcastle Disease Virus বা NDV), যা Paramyxoviridae পরিবারের একটি RNA ভাইরাস। ভাইরাসটি তিন ধরনের হতে পারে—
- Lentogenic (হালকা)
- Mesogenic (মধ্যম)
- Velogenic (অত্যন্ত মারাত্মক)
Velogenic স্ট্রেইনই সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর কারণ।
কীভাবে রোগ ছড়ায়?
রোগটি অত্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
সংক্রমণের প্রধান উৎস
- আক্রান্ত মুরগি
- আক্রান্ত খামারের মানুষ
- বন্য পাখি
- কবুতর
- জুতা ও কাপড়
- খাঁচা
- ডিমের ট্রে
- গাড়ি
- খাদ্য
- পানির উৎস
- বাতাস
- রোগাক্রান্ত মৃত মুরগি
ভাইরাস আক্রান্ত মুরগির—
- লালা
- নাকের স্রাব
- চোখের পানি
- মল
- নিঃশ্বাস
এর মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
কোন বয়সে বেশি হয়?
সব বয়সেই হতে পারে। তবে—
- ১–৪ সপ্তাহ বয়সে বেশি ভয়াবহ
- ব্রয়লারে দ্রুত ছড়ায়
- লেয়ারে উৎপাদন মারাত্মক কমে যায়
ইনকিউবেশন পিরিয়ড
সাধারণত ২–১৫ দিন
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ৫–৭ দিনের মধ্যেই লক্ষণ দেখা দেয়।
রোগের প্রধান লক্ষণ
১. শ্বাসতন্ত্রের লক্ষণ
- শ্বাসকষ্ট
- হাঁপানো
- মুখ খুলে শ্বাস নেওয়া
- কাশি
- হাঁচি
- নাক দিয়ে পানি পড়া
২. স্নায়বিক লক্ষণ
রানীক্ষেত রোগের সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণ।
- ঘাড় বেঁকে যাওয়া (Torticollis)
- মাথা পেছনে ঘুরে যাওয়া
- গোল গোল ঘোরা
- ডানা ঝুলে যাওয়া
- পক্ষাঘাত
- হাঁটতে না পারা
- কাঁপুনি
৩. পরিপাকতন্ত্রের লক্ষণ
- সবুজ পাতলা পায়খানা
- সাদা-সবুজ ডায়রিয়া
- খাদ্যে অরুচি
- অতিরিক্ত পানি পান
- দ্রুত ওজন কমে যাওয়া
৪. সাধারণ লক্ষণ
- ঝিমিয়ে থাকা
- পালক ফুলে যাওয়া
- চোখ বন্ধ রাখা
- দুর্বলতা
- হঠাৎ মৃত্যু
৫. লেয়ার মুরগিতে
- ডিম উৎপাদন ৩০–৮০% পর্যন্ত কমে যায়
- পাতলা খোসার ডিম
- বিকৃত ডিম
- খোসাবিহীন ডিম
- ডিমের মান নষ্ট হয়
ময়নাতদন্তে যা দেখা যায়
- ট্র্যাকিয়ায় রক্তক্ষরণ
- প্রোভেন্ট্রিকুলাসে রক্তক্ষরণ
- অন্ত্রে আলসার
- সিকাল টনসিলে রক্তক্ষরণ
- প্লীহা বড় হওয়া
- শ্বাসনালীতে মিউকাস
রোগ নির্ণয়
নিশ্চিতভাবে নির্ণয়ের জন্য—
- ইতিহাস
- ক্লিনিক্যাল লক্ষণ
- ময়নাতদন্ত
- RT-PCR
- Virus isolation
- HI Test
- ELISA
ব্যবহার করা হয়।
চিকিৎসা
গুরুত্বপূর্ণ: রানীক্ষেত রোগের ভাইরাস ধ্বংস করার মতো কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ বর্তমানে পোল্ট্রিতে ব্যবহারযোগ্যভাবে নেই। তাই চিকিৎসা মূলত সহায়ক (Supportive Treatment)।
১. ইলেকট্রোলাইট
- ORS
- Electrolyte Powder
পানিশূন্যতা কমাতে।
২. ভিটামিন
বিশেষ করে
- Vitamin C
- Vitamin A
- Vitamin E
- Vitamin B-Complex
স্ট্রেস কমাতে সাহায্য করে।
৩. মিনারেল
- Selenium
- Zinc
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক।
৪. লিভার টনিক
লিভারের কার্যকারিতা ঠিক রাখতে।
৫. প্রোবায়োটিক
অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে।
৬. অ্যান্টিবায়োটিক (সেকেন্ডারি ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণে)
ভাইরাসের বিরুদ্ধে নয়, তবে ব্যাকটেরিয়াজনিত জটিলতা কমাতে পশুচিকিৎসকের পরামর্শে ব্যবহার করা যেতে পারে। সাধারণ জেনেরিক গ্রুপের মধ্যে রয়েছে—
- Oxytetracycline
- Doxycycline
- Amoxicillin
- Enrofloxacin
- Florfenicol
অপ্রয়োজনীয় বা নির্বিচারে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা উচিত নয়।
কী করা যাবে না
- অযথা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার নয়।
- অসুস্থ মুরগি বাজারে বিক্রি নয়।
- মৃত মুরগি খোলা জায়গায় ফেলা যাবে না।
- আক্রান্ত খামারে দর্শনার্থী প্রবেশ বন্ধ রাখতে হবে।
- এক খামারের সরঞ্জাম অন্য খামারে ব্যবহার করা যাবে না।
প্রতিরোধ
রানীক্ষেত প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকাদান ও বায়োসিকিউরিটি।
বায়োসিকিউরিটি
- খামারে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ
- ফুটবাথ ব্যবহার
- জীবাণুনাশক স্প্রে
- ইঁদুর নিয়ন্ত্রণ
- বন্য পাখি প্রবেশ বন্ধ
- পরিষ্কার পানি
- নিরাপদ খাদ্য
- নিয়মিত লিটার পরিবর্তন
- মৃত মুরগি মাটিতে পুঁতে বা ইনসিনারেটরে ধ্বংস করা
টিকাদান কর্মসূচি (সাধারণ নির্দেশনা)
স্থান, ঝুঁকি ও ভ্যাকসিনের ধরন অনুযায়ী পশুচিকিৎসকের পরামর্শে সময়সূচি ভিন্ন হতে পারে। একটি প্রচলিত উদাহরণ—
- ৫–৭ দিন: B1 বা Hitchner B1 (আই ড্রপ/পানিতে)
- ১৪–১৮ দিন: Lasota
- ৩–৪ সপ্তাহ পর: Booster
- লেয়ার/ব্রিডার: উৎপাদনের আগে Inactivated ND Vaccine
- ডিম উৎপাদনকাল: প্রয়োজন অনুযায়ী পুনরায় বুস্টার
জরুরি করণীয়
যদি খামারে রানীক্ষেত সন্দেহ হয়—
- আক্রান্ত মুরগি দ্রুত আলাদা করুন।
- মৃত মুরগি নিরাপদে অপসারণ করুন।
- খামারে যাতায়াত বন্ধ করুন।
- খাদ্য ও পানির পাত্র জীবাণুমুক্ত করুন।
- নিকটস্থ ভেটেরিনারিয়ান বা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাকে জানান।
- ল্যাবরেটরিতে নমুনা পাঠান।
অর্থনৈতিক ক্ষতি
রানীক্ষেত রোগে—
- মৃত্যুহার বৃদ্ধি
- ওজন বৃদ্ধি বন্ধ
- খাদ্য রূপান্তর হার (FCR) খারাপ
- ডিম উৎপাদন কমে যাওয়া
- ওষুধ ও ব্যবস্থাপনা ব্যয় বৃদ্ধি
- বাজারে আর্থিক ক্ষতি
- খামারের সুনাম নষ্ট
এসব কারণে খামারির বড় ধরনের লোকসান হতে পারে।
খামারিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
- শুধুমাত্র অনুমোদিত উৎস থেকে বাচ্চা কিনুন।
- সঠিক টিকাদান কর্মসূচি অনুসরণ করুন।
- নিয়মিত বায়োসিকিউরিটি বজায় রাখুন।
- নতুন মুরগি আনার আগে কোয়ারেন্টাইনে রাখুন।
- অসুস্থ মুরগি দ্রুত আলাদা করুন।
- নিয়মিত ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ নিন।
- টিকা সংরক্ষণ ও প্রয়োগে কোল্ড-চেইন বজায় রাখুন।
শেষ কথা
রানীক্ষেত রোগ বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্পের জন্য অন্যতম বড় হুমকি। যেহেতু এ রোগের নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই, তাই সঠিক টিকাদান, কঠোর বায়োসিকিউরিটি, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং সহায়ক চিকিৎসাই ক্ষতি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়। প্রতিটি খামারিকে নিয়মিত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ, মানসম্মত ব্যবস্থাপনা এবং প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুসরণ করতে হবে। এভাবেই রানীক্ষেত রোগের প্রকোপ কমিয়ে লাভজনক ও টেকসই পোল্ট্রি খামার গড়ে তোলা সম্ভব।























