৮–২৯ অক্টোবর সারাদেশে ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধ।।
২২ দিনের নিষেধাজ্ঞায় পরিবহন, মজুত, বাজারজাত ও ক্রয়-বিক্রয়ও বন্ধ থাকবে।।
ঢাকা, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬: প্রধান প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে আগামী ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত মোট ২২ দিন সারাদেশে ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধ থাকবে। এ সময় ইলিশ পরিবহন, মজুত, বাজারজাত, ক্রয়-বিক্রয় ও বিনিময়ও সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ থাকবে।
মঙ্গলবার মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত ইলিশ সম্পদ উন্নয়নসংক্রান্ত জাতীয় টাস্কফোর্স কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।
সভায় প্রধান প্রজনন মৌসুমে ইলিশ আহরণ বন্ধের সময় নির্ধারণ এবং ‘মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান–২০২৬’ বাস্তবায়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়।

নিষেধাজ্ঞার আওতায় যা যা থাকবে
সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত—
- দেশের সব নদ-নদী ও জলাশয়ে ইলিশ আহরণ বন্ধ থাকবে;
- ইলিশ পরিবহন ও মজুত করা যাবে না;
- আড়ত, বাজার কিংবা অন্য কোনো স্থানে ইলিশ বাজারজাত ও বিক্রি করা যাবে না;
- ইলিশ ক্রয়, বিনিময় এবং বাণিজ্যিক লেনদেন নিষিদ্ধ থাকবে;
- মা ইলিশ রক্ষায় দেশব্যাপী বিশেষ অভিযান পরিচালিত হবে।
নিষেধাজ্ঞার সময় ইলিশ আহরণ থেকে বিরত থাকা নিবন্ধিত ও প্রকৃত জেলেদের সরকার ভিজিএফের আওতায় খাদ্যসহায়তা দেবে।
মা ইলিশ রক্ষায় কোনো ছাড় নয়: মন্ত্রী
সভাপতির বক্তব্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, ইলিশের টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করতে মা ইলিশ রক্ষার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। বরিশাল, চাঁদপুর ও ভোলাসহ দেশের প্রধান ইলিশ প্রজনন এলাকাগুলোতে নজরদারি ও অভিযান আরও জোরদার করতে হবে।
তিনি বলেন, প্রজনন মৌসুমে ইলিশ ধরা বন্ধের সিদ্ধান্ত কঠোরভাবে বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসন, মৎস্য অধিদপ্তর, নৌপুলিশ ও কোস্ট গার্ডকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। প্রয়োজন হলে গুরুত্বপূর্ণ হটস্পটগুলোতে অতিরিক্ত নৌযান, জনবল ও অন্যান্য লজিস্টিক সহায়তা দেওয়া হবে।
মন্ত্রী বলেন, শুধু নদীতে অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না; অবৈধভাবে আহরিত ইলিশ যেন বাজারে প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য বরফকল, মৎস্য অবতরণকেন্দ্র, আড়ত, পরিবহনপথ ও বাজারেও নজরদারি বাড়াতে হবে।
চাঁদপুর মোহনাসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রজননক্ষেত্রে অবৈধ জাল অপসারণে কঠোর অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, নিষিদ্ধ সময়ে কোনো অবস্থাতেই ইলিশ ধরা, পরিবহন কিংবা বাজারজাত করার সুযোগ দেওয়া যাবে না।
মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, মা ইলিশ সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করলে আগামী মৌসুমে দেশে ইলিশের উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব হবে।
ইলিশের উৎপাদন কমার কারণ গবেষণা করতে হবে
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এমপি বলেন, ইলিশের উৎপাদন কেন কমছে, তা গবেষণার মাধ্যমে খুঁজে বের করতে হবে। ইলিশ ব্যবস্থাপনার কোন পর্যায়ে দুর্বলতা কিংবা কার্যক্রমে ঘাটতি রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অবৈধ ও নিষিদ্ধ জাল বন্ধের ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, শুধু নদীতে অভিযান পরিচালনা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। নিষিদ্ধ জালের উৎপাদন, পরিবহন ও বিক্রিও বন্ধ করতে হবে। সরকারের পাশাপাশি জেলে প্রতিনিধিদেরও এসব জাল ব্যবহার না করার বিষয়ে জেলেদের সচেতন করতে হবে।
তিনি বলেন, নিষিদ্ধ সময়ে মাছ ধরা থেকে বিরত রাখতে সরকার জেলেদের প্রণোদনা ও খাদ্যসহায়তা দিচ্ছে। এই সহায়তা যেন প্রকৃত জেলেদের কাছে যথাসময়ে এবং সঠিকভাবে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে তদারকি বাড়ানো হবে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ইলিশের উৎপাদন কমে গিয়ে বিদেশ থেকে মাছ আমদানি করতে হচ্ছে—এটি উদ্বেগের বিষয়। কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। জাতীয় সম্পদ ও বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে ইলিশকে রক্ষা এবং এর উৎপাদন বাড়াতে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে।
অভিযানে থাকবে সমন্বিত বাহিনী
নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে মৎস্য অধিদপ্তরের পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, নৌপুলিশ, কোস্ট গার্ড, র্যাব, বিজিবি এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থা সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করবে। নদী, মোহনা, মাছঘাট, আড়ত, বরফকল, বাজার ও পরিবহনপথে নজরদারি জোরদার করা হবে।
সভায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন, বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. মীর হোসেন, মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক এবং বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. মো. লতিফুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন, র্যাব, কোস্ট গার্ড, বিমানবাহিনী, নৌপুলিশ ও বিজিবির প্রতিনিধিরা সভায় অংশ নেন। মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধি এবং জাতীয় মৎস্যজীবী সমিতির প্রতিনিধিরাও সভায় উপস্থিত ছিলেন।
নিষেধাজ্ঞা সফল করতে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন
ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ এবং গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পদ। প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়ার সুযোগ পেলে নদীতে জাটকার সংখ্যা বাড়ে এবং পরবর্তী মৌসুমে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হয়। তাই ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা সফল করতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি জেলে, আড়তদার, ব্যবসায়ী, পরিবহনকারী এবং সাধারণ ভোক্তাদের সহযোগিতা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, প্রকৃত জেলেদের যথাযথ খাদ্যসহায়তা প্রদান, নিষিদ্ধ জালের উৎপাদন ও বিপণন বন্ধ এবং প্রজননক্ষেত্রের পরিবেশ সুরক্ষিত রাখা গেলে দেশের ইলিশসম্পদ আরও সমৃদ্ধ হবে।






















