RRP
agriculture news24.com
Health Care
Agriculture News
diamond egg
renata-ltd.com
Space for Add
Agriculture News
Spech for Promotion
avonah
Tuesday , 18 August 2026 |
  1. অন্যান্য
  2. অন্যান্য
  3. ইউটিউব
  4. উদ্যোক্তা
  5. উপন্যাশ
  6. এ্যাসিভমেন্ট
  7. ঔষধ
  8. কবিতা
  9. কীটনাশক
  10. কৃষি ব্যক্তিত্ব
  11. কৃষি সংবাদ
  12. কৃষি সেক্টরের নিদের্শনা
  13. কৌতুক
  14. খাবার
  15. খামার পদ্ধতি

নর্থ বেঙ্গল গ্রে ক্যাটল এর ইতিহাস ও ঐতিহ্য

প্রতিবেদক
Md. Bayezid Moral
August 18, 2026 1:00 pm

নর্থ বেঙ্গল গ্রে ক্যাটল এর ইতিহাস ও ঐতিহ্য//নর্থ বেঙ্গল গ্রে ক্যাটল (North Bengal Grey Cattle): হারিয়ে যেতে বসা উত্তরবঙ্গের ধূসর গরুর ঐতিহ্য, বৈশিষ্ট্য, সম্ভাবনা ও সংরক্ষণের অপরিহার্যতা।।

বাংলাদেশের দেশীয় গবাদিপশুর বৈচিত্র্য আমাদের প্রাণিসম্পদের অমূল্য জিনগত সম্পদ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পরিবেশ, জলবায়ু এবং কৃষিভিত্তিক জীবনযাত্রার সঙ্গে খাপ খাইয়ে গড়ে উঠেছে নানা ধরনের দেশীয় গরুর জাত। এসব জাতের মধ্যে নর্থ বেঙ্গল গ্রে ক্যাটল (North Bengal Grey Cattle) বা উত্তরবঙ্গের ধূসর গরু একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। শক্তিশালী কর্মক্ষমতা, পরিবেশ সহনশীলতা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং উন্নত মাংসের গুণাগুণের কারণে এই জাতটি দীর্ঘদিন ধরে উত্তরাঞ্চলের কৃষকের নির্ভরতার প্রতীক।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, নির্বিচারে সংকরায়ন, দেশীয় জাত সংরক্ষণে দীর্ঘদিনের অবহেলা এবং অধিক উৎপাদনশীল বিদেশি জাতের বিস্তারের ফলে বাংলাদেশের এই মূল্যবান জিনগত সম্পদ আজ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।

বাংলাদেশে নর্থ বেঙ্গল গ্রে (NBG) গরুর বৈশিষ্ট্য, উৎপাদনশীলতা ও প্রজনন সক্ষমতা নিয়ে পরিচালিত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাঠভিত্তিক গবেষণা সম্পন্ন করেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক M. Al-Amin, A. Nahar, A.K.F.H. Bhuiyan এবং M.O. Faruque। বগুড়া জেলার বিভিন্ন এলাকায় পরিচালিত এ গবেষণা নর্থ বেঙ্গল গ্রে গরুর শারীরিক বৈশিষ্ট্য, উৎপাদন, প্রজনন ও সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক তথ্য তুলে ধরে।

উৎপত্তির ইতিহাস

নর্থ বেঙ্গল গ্রে ক্যাটল (North Bengal Grey Cattle) বাংলাদেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের একটি ঐতিহ্যবাহী দেশীয় গরুর জাত। এর বিস্তার মূলত রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, গাইবান্ধা, বগুড়া এবং রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলে। একসময় এসব অঞ্চলের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি, বিশেষ করে হালচাষ, গরুর গাড়ি টানা এবং গ্রামীণ কৃষিকাজে এই জাতের গরুর ব্যাপক ব্যবহার ছিল। বর্তমানে নির্বিচারে সংকরায়নের কারণে বিশুদ্ধ নর্থ বেঙ্গল গ্রে ক্যাটলের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলেও উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় এখনো এ জাতের কিছু বিশুদ্ধ ও প্রায় বিশুদ্ধ বৈশিষ্ট্যের গরুর দেখা মেলে।

গবেষকদের মতে, ব্রিটিশ শাসনামলের শেষভাগ এবং জমিদারি প্রথার সময় উত্তর ভারত থেকে আনা শক্তিশালী ও কর্মক্ষম ধূসর বর্ণের গরুর সঙ্গে উত্তরবঙ্গের স্থানীয় দেশীয় গরুর দীর্ঘদিনের প্রাকৃতিক সংকরায়নের মাধ্যমে ধীরে ধীরে একটি নতুন জিনগত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন জনগোষ্ঠীর সৃষ্টি হয়। পরবর্তী কয়েক প্রজন্ম ধরে একই ধরনের শারীরিক গঠন, ধূসর বর্ণ, উচ্চ কর্মক্ষমতা, অভিযোজন ক্ষমতা এবং প্রজনন বৈশিষ্ট্য ধারাবাহিকভাবে বজায় থাকায় এটি একটি স্বতন্ত্র স্থানীয় জার্মপ্লাজম (Indigenous Genetic Resource) হিসেবে পরিচিতি লাভ করে, যা বর্তমানে নর্থ বেঙ্গল গ্রে ক্যাটল নামে স্বীকৃত।

দেশীয় পরিবেশের সঙ্গে দীর্ঘদিনের অভিযোজনের ফলে এ জাতের গরু উত্তরবঙ্গের আবহাওয়া, খাদ্যাভ্যাস এবং রোগব্যাধির সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই খাপ খাইয়ে নিয়েছে। এ কারণেই প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞরা নর্থ বেঙ্গল গ্রে ক্যাটলকে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশীয় জিনগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করেন এবং ভবিষ্যৎ প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন ও জলবায়ু সহনশীল গবাদিপশু সংরক্ষণে এ জাতের গুরুত্ব ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় অংশগ্রহণকারী অধিকাংশ কৃষক জানান, বহু বছর আগে ভারতের বিহার ও উত্তর প্রদেশ অঞ্চল থেকে আনা কর্মক্ষম ধূসর গরুর সঙ্গে উত্তরবঙ্গের স্থানীয় দেশীয় গরুর দীর্ঘমেয়াদি সংকরায়নের মাধ্যমে বর্তমান নর্থ বেঙ্গল গ্রে জাতের বিকাশ ঘটেছে। যদিও এর উৎপত্তি নিয়ে আরও জিনগত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে, তবুও উত্তরাঞ্চলে এটি একটি স্বীকৃত স্থানীয় জার্মপ্লাজম হিসেবে বিবেচিত।

গবেষণার এলাকা ও পদ্ধতি

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা বগুড়া সদর, শিবগঞ্জ ও কাহালু উপজেলায় ১০০টি নর্থ বেঙ্গল গ্রে গরুর ওপর মাঠপর্যায়ে জরিপ পরিচালনা করেন। গবেষণায় শারীরিক বৈশিষ্ট্য, উৎপাদন ক্ষমতা, প্রজনন, খাদ্য ব্যবস্থাপনা ও খামারিদের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করা হয়।

নর্থ বেঙ্গল গ্রে ক্যাটল চেনার উপায় (Breed Characteristics)

নর্থ বেঙ্গল গ্রে ক্যাটলকে (North Bengal Grey Cattle) অন্যান্য দেশীয় গরুর জাত থেকে আলাদা করে চেনার জন্য এর কয়েকটি স্বতন্ত্র বাহ্যিক (Phenotypic) ও শারীরিক (Morphometric) বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ জাতের গরুর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিচয় হলো এর ধূসর বা ছাই বর্ণের দেহরং, যা বয়স, লিঙ্গ এবং পরিবেশভেদে কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে।

গায়ের রং (Coat Colour)

এ জাতের গরুর গায়ের রং সাধারণত—সাদা, হালকা ধূসর (Light Grey), ধূসর (Grey), গাঢ় ধূসর (Dark Grey), ছাই রঙ (Ash Grey)পূর্ণবয়স্ক ষাঁড়ের ক্ষেত্রে ঘাড়, কাঁধ ও কুঁজের লোম বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আরও গাঢ় ধূসর বা ছাই বর্ণ ধারণ করে, যা এ জাতের অন্যতম স্বাতন্ত্র্যসূচক বৈশিষ্ট্য।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, এ জাতের কানের গড় দৈর্ঘ্য প্রায় ১৮ সেমি, শিংয়ের গড় দৈর্ঘ্য প্রায় ৯ সেমি এবং মাথা তুলনামূলক সরু ও ছোট।

বাহ্যিক ও শারীরিক বৈশিষ্ট্য (Phenotypic and Morphometric Characteristics)

নর্থ বেঙ্গল গ্রে ক্যাটলের শরীরের গঠন অত্যন্ত শক্তিশালী, সুষম এবং কর্মক্ষম। গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের পর্যবেক্ষণে এ জাতের গরুর নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়—

  • মাথা শরীরের তুলনায় ছোট ও পরিপাটি।
  • শরীর দীর্ঘ, সুগঠিত ও কমপ্যাক্ট প্রকৃতির।
  • বুক গভীর ও প্রশস্ত, যা অধিক কর্মক্ষমতার নির্দেশক।
  • পা শক্তিশালী ও সোজা হওয়ায় দীর্ঘ সময় হালচাষ, গাড়ি টানা এবং চলাচলে সক্ষম।
  • কাঁধ সুগঠিত এবং পূর্ণবয়স্ক ষাঁড়ের কুঁজ সুস্পষ্ট ও শক্তিশালী।
  • শিং ছোট থেকে মাঝারি আকারের, সামনের দিকে বাঁকানো এবং আগা সূচালো।
  • ঠোঁট, ঠোঁটের চারপাশ, চোখের চারপাশ (Eye Ring), ভ্রু এবং খুর সাধারণত কালো বর্ণের।
  • লেজ লম্বা এবং লেজের পুচ্ছ (Tail Switch) সম্পূর্ণ সাদা, যা এ জাতের অন্যতম সহজে শনাক্তযোগ্য বৈশিষ্ট্য।

দেহের পরিমাপ (Average Morphometric Measurements)

প্রাপ্তবয়স্ক নর্থ বেঙ্গল গ্রে গাভীর গড় শারীরিক পরিমাপ সাধারণত নিম্নরূপ—

বৈশিষ্ট্যগড় পরিমাপ
উচ্চতা (Height at Withers)প্রায় ৯৪ সেমি
শরীরের দৈর্ঘ্য (Body Length)প্রায় ১০৫ সেমি
বুকের পরিধি (Heart Girth)প্রায় ১২৭ সেমি
জীবন্ত ওজন (Live Weight)প্রায় ২৪০–২৫০ কেজি

জন্মের সময় একটি বাছুরের গড় ওজন প্রায় ১৮.৪ কেজি এবং পূর্ণবয়স্ক গাভীর গড় জীবন্ত ওজন প্রায় ২৪১ কেজি।

দুধের পাশাপাশি শক্তিশালী কর্মক্ষমতার জন্য বিখ্যাত

বাংলাদেশের অনেক দেশীয় গরুর তুলনায় এই জাতের ষাঁড় ও বলদ অধিক শক্তিশালী। একসময় উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ মাঠে জমি চাষ, লাঙ্গল টানা, ধান মাড়াই এবং গরুর গাড়ি টানার প্রধান শক্তি ছিল এই জাতের বলদ।বর্তমানে কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণের কারণে সেই ব্যবহার কমে এলেও এর কর্মক্ষমতা এখনো প্রশংসিত।

দুধ উৎপাদন ক্ষমতা ও দুধের গুণগত মান

নর্থ বেঙ্গল গ্রে ক্যাটল বাংলাদেশের দেশীয় গরুর জাতগুলোর মধ্যে দুধ উৎপাদনের দিক থেকে সম্ভাবনাময় একটি জাত। যদিও এটি উচ্চ উৎপাদনশীল বিদেশি দুগ্ধজাত গরুর মতো অধিক দুধ দেয় না, তবে স্বল্প ব্যয়ে পালন, উন্নত অভিযোজন ক্ষমতা এবং তুলনামূলক ভালো দুধের গুণগত মানের কারণে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারিদের জন্য এটি একটি লাভজনক দেশীয় জাত হিসেবে বিবেচিত হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, এ জাতের গাভীর গড় ল্যাকটেশন (Lactation Period) প্রায় ২১৯ দিন এবং গবেষণা খামারে পর্যবেক্ষিত সর্বোচ্চ দৈনিক দুধ উৎপাদন প্রায় . কেজি। তবে মাঠপর্যায়ে উন্নত জাত নির্বাচন, সুষম খাদ্য ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা এবং বৈজ্ঞানিক খামার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অনেক খামারে একটি নর্থ বেঙ্গল গ্রে গাভী দৈনিক থেকে লিটার পর্যন্ত দুধ উৎপাদন করতে সক্ষম হয়।

গবেষণাকালে অধিকাংশ কৃষক কেবল ধানের খড় ও স্থানীয় সবুজ ঘাস খাওয়াতেন। খুব কম খামারি কনসেনট্রেট খাদ্য ব্যবহার করলেও নর্থ বেঙ্গল গ্রে গরু সন্তোষজনক উৎপাদন বজায় রাখতে সক্ষম হয়। এটি এ জাতের খাদ্য ব্যবহারে দক্ষতা ও অভিযোজন ক্ষমতার প্রমাণ বহন করে।

দুধের গুণগত বৈশিষ্ট্য

নর্থ বেঙ্গল গ্রে গরুর দুধের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর উন্নত গুণগত মান। এ জাতের দুধ সাধারণত—তুলনামূলক বেশি ফ্যাটসমৃদ্ধ, ঘন ও পুষ্টিকর, স্বাদে উন্নত, দই, ঘি, ক্ষীর, মাখন ও বিভিন্ন ধরনের ঐতিহ্যবাহী দুগ্ধজাত খাদ্য তৈরির জন্য অত্যন্ত উপযোগী।

দুধে তুলনামূলক বেশি সলিডস (Milk Solids) থাকায় স্থানীয় পর্যায়ে এ জাতের দুধের গ্রহণযোগ্যতা দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে। গ্রামীণ পরিবারের পুষ্টি চাহিদা পূরণ, শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য নিরাপদ প্রাণিজ পুষ্টির উৎস হিসেবে এবং ক্ষুদ্র দুগ্ধভিত্তিক উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নর্থ বেঙ্গল গ্রে ক্যাটল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশুদ্ধ জাত সংরক্ষণ, উন্নত প্রজনন কর্মসূচি এবং বিজ্ঞানভিত্তিক খাদ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে এ জাতের দুধ উৎপাদন ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আরও বৃদ্ধি পাবে।

মাংস উৎপাদনে সম্ভাবনাময়

মাংসের গুণগত মানের দিক থেকেও এই জাত অত্যন্ত সমাদৃত। এর মাংস—কোমল, সুস্বাদু, তুলনামূলক কম চর্বিযুক্ত ও বাজারে অধিক গ্রহণযোগ্য কোরবানির পশু হিসেবেও উত্তরাঞ্চলে এই জাতের যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে।

অভিযোজন ক্ষমতায় অনন্য

দেশীয় জাত হিসেবে নর্থ বেঙ্গল গ্রে ক্যাটলের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর অভিযোজন ক্ষমতা। এরা—

  • অতিরিক্ত গরম ও শীত সহ্য করতে পারে।
  • খরা ও অপেক্ষাকৃত প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকে।
  • স্থানীয় ঘাস, খড়, ফসলের অবশিষ্টাংশ এবং প্রাকৃতিক খাদ্যে ভালোভাবে বেড়ে ওঠে।
  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক বেশি।
  • ব্যবস্থাপনা ব্যয় কম।

জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে এমন অভিযোজনক্ষম দেশীয় জাতের গুরুত্ব আরও বাড়ছে।

বাচ্চা প্রসবের পর পুনরায় ঋতুচক্রে (Postpartum Heat) ফিরে আসতে গড়ে প্রায় ১১০ দিন সময় লাগে।

খাদ্য ব্যবস্থাপনা

গবেষণায় দেখা গেছে—অধিকাংশ কৃষক ধানের খড় ও স্থানীয় ঘাস খাওয়াতেন। কনসেনট্রেট খুব কম ব্যবহার করতেন। তবুও গরুগুলো ভালো উৎপাদন করছিল।

গ্রামীণ অর্থনীতির নীরব সৈনিক

উত্তরাঞ্চলের হাজারো ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের জীবিকার অন্যতম ভিত্তি এই জাতের গরু। এটি কৃষককে দেয়—

  • দুধ
  • বাছুর
  • জৈব সার
  • কৃষি শ্রমের শক্তি
  • অতিরিক্ত আয়

ফলে এটি শুধু একটি গবাদিপশু নয়; বরং গ্রামীণ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

কেন হারিয়ে যাচ্ছে এই জাত?

বর্তমানে কয়েকটি বড় কারণে নর্থ বেঙ্গল গ্রে ক্যাটল দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে।

. অনিয়ন্ত্রিত সংকরায়ন

বিদেশি জাতের সঙ্গে নির্বিচারে সংকরায়নের ফলে বিশুদ্ধ জাতের সংখ্যা দ্রুত কমছে।

. দেশীয় জাত সংরক্ষণে দীর্ঘদিনের অবহেলা

অনেক বছর ধরে উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে শুধু বিদেশি জাতের ওপর জোর দেওয়ায় স্থানীয় জিনগত সম্পদ উপেক্ষিত হয়েছে।

. বিশুদ্ধ প্রজনন কেন্দ্রের অভাব

বিশুদ্ধ ষাঁড় ও সংগঠিত ব্রিডিং কর্মসূচির ঘাটতি রয়েছে।

. খামারিদের সচেতনতার অভাব

অনেক খামারি এখনো বিশুদ্ধ দেশীয় জাত সংরক্ষণের গুরুত্ব সম্পর্কে অবগত নন।

সংরক্ষণে আশার আলো

ইতোমধ্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর দেশীয় গরুর জিনগত সম্পদ সংরক্ষণের অংশ হিসেবে নর্থ বেঙ্গল গ্রে ক্যাটল সংরক্ষণ (Conservation) কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। এ উদ্যোগ সফল করতে প্রয়োজন—

  • বিশুদ্ধ প্রজনন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা
  • জিনগত নিবন্ধন (Breed Registration)
  • খামারি পর্যায়ে সংরক্ষণ কর্মসূচি
  • জার্মপ্লাজম সংরক্ষণ
  • কৃত্রিম প্রজননে বিশুদ্ধ বীর্য ব্যবহার
  • মাঠ পর্যায়ে গবেষণা সম্প্রসারণ
  • খামারিদের প্রশিক্ষণ ও আর্থিক প্রণোদনা

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও তুলনা

বর্তমান বিশ্বে দেশীয় গবাদিপশুর জিনগত সম্পদ (Animal Genetic Resources) সংরক্ষণকে কৃষি ও প্রাণিসম্পদ উন্নয়নের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, নতুন নতুন সংক্রামক রোগের বিস্তার, খাদ্যের ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে উন্নত ও উন্নয়নশীল—উভয় ধরনের দেশই এখন স্থানীয় ও অভিযোজনক্ষম গবাদিপশুর জাত সংরক্ষণে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় পরিবেশে অভিযোজিত এসব জাত তুলনামূলক কম খাদ্যে বেঁচে থাকতে পারে, স্থানীয় রোগ প্রতিরোধে সক্ষম এবং প্রতিকূল আবহাওয়ায়ও উৎপাদন বজায় রাখতে পারে।

ভারতে গির (Gir), সাহিওয়াল (Sahiwal), থারপারকার (Tharparkar), রাঠি (Rathi) এবং কাংরেজ (Kankrej)-এর মতো দেশীয় গরুর জাত সংরক্ষণ ও উন্নয়নের জন্য জাতীয় পর্যায়ে নিবন্ধন, বিশুদ্ধ প্রজনন কর্মসূচি এবং জিনগত উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ব্রাজিলে গিরগুজেরাত (Guzerá) জাতের সংরক্ষণ ও বাণিজ্যিক উন্নয়নের মাধ্যমে দেশীয় জার্মপ্লাজমকে উচ্চ অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করা হয়েছে। একইভাবে ইথিওপিয়া, কেনিয়া, নেপাল এবং বিভিন্ন আফ্রিকান দেশেও স্থানীয় গবাদিপশুর জাত সংরক্ষণকে খাদ্য নিরাপত্তা ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছে যে, বিশ্বের বহু দেশীয় গবাদিপশুর জাত দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে প্রতিটি দেশের নিজস্ব প্রাণিজ জিনগত সম্পদ সংরক্ষণ, সঠিক নথিভুক্তকরণ (Breed Registration), জিনগত মূল্যায়ন (Genetic Characterization), জিন ব্যাংক (Gene Bank) প্রতিষ্ঠা এবং পরিকল্পিত প্রজনন ব্যবস্থার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

এই বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের নর্থ বেঙ্গল গ্রে ক্যাটলও একটি মূল্যবান দেশীয় জার্মপ্লাজম। এর অসাধারণ অভিযোজন ক্ষমতা, তুলনামূলক উন্নত রোগ প্রতিরোধশক্তি, স্বল্প ব্যয়ে পালনযোগ্যতা এবং স্থানীয় পরিবেশে টিকে থাকার সক্ষমতা আন্তর্জাতিকভাবে সংরক্ষিত অন্যান্য দেশীয় গরুর জাতের সঙ্গে তুলনীয়। তাই বাংলাদেশেও এ জাতকে শুধু একটি আঞ্চলিক গরুর জাত হিসেবে নয়, বরং দেশের কৌশলগত প্রাণিজ জিনগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ ও উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করা সময়ের দাবি।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, একটি দেশীয় জাত সংরক্ষণ মানে কেবল ঐতিহ্য রক্ষা নয়; বরং ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু অভিযোজন, গবেষণা, উন্নত প্রজনন প্রযুক্তি এবং টেকসই প্রাণিসম্পদ উন্নয়নের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করা। নর্থ বেঙ্গল গ্রে ক্যাটলের ক্ষেত্রেও একই দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে পারলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে দেশীয় প্রাণিসম্পদ সংরক্ষণে একটি কার্যকর ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মডেল গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।

গবেষকদের পর্যবেক্ষণে—

  • কম খাদ্যে টিকে থাকে
  • রোগ প্রতিরোধ ভালো
  • স্থানীয় পরিবেশে সহজে খাপ খায়
  • ক্ষুদ্র কৃষকের জন্য উপযোগী
  • বলদ হিসেবে অত্যন্ত কার্যকর

গবেষণার সীমাবদ্ধতা

গবেষণাটি মূলত বগুড়া জেলার তিনটি উপজেলার ১০০টি গরুর ওপর পরিচালিত হয়েছিল। ফলে পুরো উত্তরাঞ্চলের জন্য ফলাফল সাধারণীকরণে সতর্কতা প্রয়োজন। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে বৃহত্তর পরিসরে আরও গবেষণা পরিচালনা করা প্রয়োজন।

গবেষণার তাৎপর্য

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এ গবেষণা প্রথমবারের মতো নর্থ বেঙ্গল গ্রে গরুর শারীরিক বৈশিষ্ট্য, উৎপাদন, প্রজনন ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে মাঠভিত্তিক বৈজ্ঞানিক তথ্য উপস্থাপন করেছে। ভবিষ্যতে এ জাত সংরক্ষণ, উন্নয়ন এবং নীতিনির্ধারণে গবেষণাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।

ভবিষ্যৎ করণীয়

বাংলাদেশের দেশীয় গবাদিপশুর জিনগত সম্পদ (Animal Genetic Resources) সংরক্ষণ এখন আর শুধু ঐতিহ্য রক্ষার বিষয় নয়; এটি খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজন, টেকসই প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মূল্যবান জার্মপ্লাজম সংরক্ষণের একটি জাতীয় দায়িত্ব। বিশেষ করে নর্থ বেঙ্গল গ্রে ক্যাটলের মতো বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় জাতকে টিকিয়ে রাখতে সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং খামারিদের সমন্বিত উদ্যোগের বিকল্প নেই।

সুপারিশগুলো হলো—

১. জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দেশীয় জার্মপ্লাজম হিসেবে স্বীকৃতি

নর্থ বেঙ্গল গ্রে ক্যাটলকে জাতীয় পর্যায়ে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত দেশীয় গরুর জাত হিসেবে চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ ও উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।

২. জাতীয় Breed Registry ও Digital Breed Database

বিশুদ্ধ নর্থ বেঙ্গল গ্রে ক্যাটলের জন্য একটি জাতীয় Breed Registry এবং প্রতিটি জেলার দেশীয় গরুর তথ্যসংবলিত ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে, যাতে বিশুদ্ধ জাত শনাক্তকরণ, নিবন্ধন এবং বংশপরিচয় সংরক্ষণ সহজ হয়।

৩. বিশুদ্ধ প্রজনন কেন্দ্র (Nucleus Breeding Farm) স্থাপন

রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, গাইবান্ধা, বগুড়া ও রাজশাহীর মতো উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে Nucleus Breeding Farm প্রতিষ্ঠা করে বিশুদ্ধ জাত সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণ করতে হবে।

৪. বিশুদ্ধ ষাঁড় ও উন্নত কৃত্রিম প্রজনন কর্মসূচি

বিশুদ্ধ নর্থ বেঙ্গল গ্রে ষাঁড় উৎপাদন ও সংরক্ষণের পাশাপাশি কৃত্রিম প্রজননের জন্য বিশুদ্ধ বীর্য (Semen) উৎপাদন, সংরক্ষণ এবং মাঠপর্যায়ে ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অনিয়ন্ত্রিত সংকরায়ন কমে আসে।

৫. জিনগত গবেষণা ও DNA সংরক্ষণ

BLRI, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমন্বয়ে এ জাতের Genetic Characterization, Genomic Study এবং DNA Gene Bank প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে ভবিষ্যৎ গবেষণা ও সংরক্ষণ কার্যক্রম আরও শক্তিশালী হয়।

৬. মাঠপর্যায়ে বিশুদ্ধ জাত শনাক্তকরণ ও নিবন্ধন

দেশব্যাপী জরিপ পরিচালনা করে বিশুদ্ধ নর্থ বেঙ্গল গ্রে ক্যাটল শনাক্ত, নিবন্ধন এবং তাদের বংশগত তথ্য সংরক্ষণের জন্য একটি আধুনিক ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।

৭. খামারিদের জন্য প্রণোদনা ও প্রশিক্ষণ

যেসব খামারি বিশুদ্ধ নর্থ বেঙ্গল গ্রে ক্যাটল পালন ও সংরক্ষণ করবেন, তাদের আর্থিক প্রণোদনা, সহজ শর্তে ঋণ, উন্নত প্রশিক্ষণ এবং কারিগরি সহায়তা প্রদান করতে হবে।

৮. দেশীয় জাতভিত্তিক উন্নয়ন নীতিমালা

বিদেশি জাতের সঙ্গে সংকরায়নের পাশাপাশি দেশীয় গরুর জাত সংরক্ষণকে সমান গুরুত্ব দিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় দেশীয় প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

৯. গবেষণা, ব্র্যান্ডিং ও বাজার উন্নয়ন

নর্থ বেঙ্গল গ্রে ক্যাটলের দুধ, মাংস এবং জিনগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণা সম্প্রসারণের পাশাপাশি এ জাতকে একটি স্বতন্ত্র দেশীয় ব্র্যান্ড হিসেবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত করে বাজার সৃষ্টি করতে হবে।

১০. সমন্বিত জাতীয় সংরক্ষণ কর্মসূচি

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (BLRI), বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় (CVASU) এবং অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে একটি National Indigenous Cattle Conservation Program বাস্তবায়ন করা সময়ের দাবি।

১১. জিনগত বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ (Molecular Characterization)

কেবল বাহ্যিক গঠন বা দেহের রং দেখে কোনো গরুর বিশুদ্ধ জাত নির্ধারণ করা সবসময় সম্ভব নয়। এজন্য আধুনিক ডিএনএ (DNA) বিশ্লেষণ, মলিকুলার মার্কার (Molecular Marker) এবং জিনোমভিত্তিক (Genomic) গবেষণার মাধ্যমে নর্থ বেঙ্গল গ্রে ক্যাটলের স্বতন্ত্র জিনগত বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করা প্রয়োজন। এ ধরনের গবেষণা বিশুদ্ধ ও সংকর প্রাণীকে পৃথকভাবে চিহ্নিত করতে সহায়তা করবে এবং ভবিষ্যতে উন্নত প্রজনন কর্মসূচি গ্রহণের জন্য একটি শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক ভিত্তি তৈরি করবে। পাশাপাশি এই গবেষণা দেশের অন্যান্য দেশীয় গরুর জাতের সঙ্গে নর্থ বেঙ্গল গ্রে ক্যাটলের জিনগত সম্পর্ক ও বৈচিত্র্য নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

১২. জাত নিবন্ধন (Breed Registration)

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে প্রতিটি স্বীকৃত গবাদিপশুর জাতের জন্য একটি জাতীয় Breed Registry বা জাত নিবন্ধন ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশেও নর্থ বেঙ্গল গ্রে ক্যাটলের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় নিবন্ধন ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে প্রতিটি বিশুদ্ধ প্রাণীর পরিচিতি, বংশপরিচয় (Pedigree), উৎপাদন ক্ষমতা, প্রজনন ইতিহাস, স্বাস্থ্যগত তথ্য এবং মালিকানার তথ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। একটি কার্যকর Breed Registration ব্যবস্থা বিশুদ্ধ জাত সংরক্ষণ, পরিকল্পিত প্রজনন এবং ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

১৩. জিন ব্যাংক (Gene Bank) প্রতিষ্ঠা

নর্থ বেঙ্গল গ্রে ক্যাটলের জিনগত বৈচিত্র্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করতে একটি আধুনিক Gene Bank প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। এ ধরনের জিন ব্যাংকে বিশুদ্ধ ষাঁড়ের বীর্য (Frozen Semen), ভ্রূণ (Embryo), ডিএনএ নমুনা এবং অন্যান্য জিনগত উপাদান দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ করা যায়। কোনো কারণে মাঠপর্যায়ে বিশুদ্ধ জাতের সংখ্যা কমে গেলেও এই সংরক্ষিত জিনগত উপাদান ব্যবহার করে পুনরায় বিশুদ্ধ জাতের বিস্তার ঘটানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ গবেষণা, জিনগত উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও একটি জাতীয় Gene Bank গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

বিশ্লেষণ

বাংলাদেশে গত তিন দশকে প্রাণিসম্পদ উন্নয়নের প্রধান লক্ষ্য ছিল দুধ ও মাংস উৎপাদন বৃদ্ধি। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিভিন্ন সময়ে হলস্টেইন ফ্রিজিয়ান, জার্সি, শাহীওয়ালসহ বিদেশি ও উন্নত জাতের গরুর সঙ্গে দেশীয় গরুর সংকরায়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এতে উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও একই সঙ্গে দেশের বহু মূল্যবান দেশীয় জিনগত সম্পদ ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়েছে। নর্থ বেঙ্গল গ্রে (NBG) ক্যাটল সেই ক্ষতিগ্রস্ত দেশীয় জাতগুলোর অন্যতম।

আজকের বাস্তবতায় প্রাণিসম্পদ উন্নয়নকে শুধু অধিক দুধ বা মাংস উৎপাদনের দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করলে চলবে না। জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্যের ক্রমবর্ধমান মূল্য, নতুন রোগের বিস্তার এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এমন গবাদিপশুর প্রয়োজন, যা স্থানীয় পরিবেশে সহজে টিকে থাকতে পারে, কম খাদ্যে উৎপাদন বজায় রাখতে সক্ষম এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় শক্তিশালী। নর্থ বেঙ্গল গ্রে ক্যাটল এই বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি সফল উদাহরণ।

আমার পর্যবেক্ষণে, নর্থ বেঙ্গল গ্রে ক্যাটলের সবচেয়ে বড় শক্তি এর অভিযোজন ক্ষমতা (Adaptability)। উত্তরাঞ্চলের খরা, শীত, মৌসুমি জলাবদ্ধতা এবং সীমিত খাদ্যসম্পদ—সবকিছুর সঙ্গে এই জাত বহু প্রজন্ম ধরে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে। এ ধরনের অভিযোজন কোনো গবেষণাগারে তৈরি করা সম্ভব নয়; এটি শতাব্দীব্যাপী প্রাকৃতিক নির্বাচন এবং কৃষকের অভিজ্ঞতার ফল। তাই এই জিনগত বৈশিষ্ট্য হারিয়ে গেলে তা আর সহজে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে না।

বাংলাদেশে বর্তমানে কৃত্রিম প্রজনন কর্মসূচিতে বিদেশি জাতের বীর্যের ব্যবহার ব্যাপক হলেও দেশীয় জাত সংরক্ষণে একই মাত্রার গুরুত্ব এখনো দেখা যায় না। ফলস্বরূপ অনেক এলাকায় বিশুদ্ধ নর্থ বেঙ্গল গ্রে গরু শনাক্ত করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে এ জাতের স্বকীয় বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণ হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলো আজ তাদের নিজস্ব দেশীয় গবাদিপশুর জাত সংরক্ষণে বিপুল বিনিয়োগ করছে। কারণ তারা উপলব্ধি করেছে যে, একটি দেশীয় জাত হারিয়ে গেলে তার সঙ্গে হারিয়ে যায় বহু প্রজন্মের অভিযোজন ক্ষমতা, রোগ প্রতিরোধের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য এবং অমূল্য জিনগত বৈচিত্র্য। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও নর্থ বেঙ্গল গ্রে ক্যাটলকে একই দৃষ্টিভঙ্গিতে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

আমার মতে, এখনই নর্থ বেঙ্গল গ্রে ক্যাটলের জন্য একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। এর আওতায় বিশুদ্ধ জাত শনাক্তকরণ, Breed Registration, Molecular Characterization, Gene Bank প্রতিষ্ঠা, বিশুদ্ধ ষাঁড় সংরক্ষণ, কৃত্রিম প্রজননের জন্য বিশুদ্ধ বীর্য উৎপাদন এবং মাঠপর্যায়ে খামারিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (BLRI), প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (DLS), বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন।

নর্থ বেঙ্গল গ্রে ক্যাটলকে সংরক্ষণ করা মানে কেবল একটি দেশীয় গরুর জাতকে রক্ষা করা নয়; বরং বাংলাদেশের প্রাণিজ জিনগত সম্পদ, কৃষি-ঐতিহ্য এবং ভবিষ্যৎ টেকসই প্রাণিসম্পদ উন্নয়নের ভিত্তিকে সুরক্ষিত করা। আজকের সঠিক সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে—এই ঐতিহ্যবাহী জাত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে জীবন্ত সম্পদ হিসেবে পৌঁছাবে, নাকি শুধুই গবেষণাপত্রের ইতিহাস হয়ে থাকবে।

**”বিদেশি জাত আমাদের উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু দেশীয় জাতই আমাদের ভবিষ্যৎ টিকিয়ে রাখবে। কারণ উৎপাদন প্রযুক্তি দিয়ে বাড়ানো যায়, কিন্তু হাজার বছরের জিনগত অভিযোজন একবার হারিয়ে গেলে তা আর ফিরিয়ে আনা যায় না।” — ড. বায়েজিদ মোড়ল।

শেষ কথা

নর্থ বেঙ্গল গ্রে ক্যাটল (North Bengal Grey Cattle) কেবল উত্তরবঙ্গের একটি দেশীয় গরুর জাত নয়; এটি বাংলাদেশের কৃষি-ঐতিহ্য, প্রাণিসম্পদের জিনগত বৈচিত্র্য (Animal Genetic Resources), গ্রামীণ অর্থনীতি এবং শতাব্দীপ্রাচীন কৃষিসংস্কৃতির এক অমূল্য উত্তরাধিকার। প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে অসাধারণ অভিযোজন ক্ষমতা, তুলনামূলক উচ্চ রোগ প্রতিরোধশক্তি, স্বল্প ব্যয়ে পালনযোগ্যতা, উন্নত কর্মক্ষমতা এবং দুধ ও মাংস উৎপাদনের সম্ভাবনা এ জাতকে দেশের টেকসই প্রাণিসম্পদ উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। জলবায়ু পরিবর্তন, ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ব্যয় এবং পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের এই সময়ে নর্থ বেঙ্গল গ্রে ক্যাটলের মতো দেশীয় ও অভিযোজনক্ষম জাত ভবিষ্যতের খাদ্য ও প্রাণিসম্পদ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত সংকরায়ন, বিশুদ্ধ প্রজনন ব্যবস্থার অভাব এবং দীর্ঘদিনের অবহেলার কারণে এ জাত আজ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। এখনই যদি বিজ্ঞানভিত্তিক সংরক্ষণ, বিশুদ্ধ প্রজনন, জিনগত গবেষণা এবং মাঠপর্যায়ে পরিকল্পিত উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ করা না হয়, তাহলে আগামী প্রজন্ম হয়তো নর্থ বেঙ্গল গ্রে ক্যাটলকে শুধু গবেষণাপত্র বা ইতিহাসের পাতায় দেখবে—বাংলার মাঠে-ঘাটে নয়।

অতএব, নর্থ বেঙ্গল গ্রে ক্যাটল সংরক্ষণ মানে শুধু একটি গরুর জাতকে রক্ষা করা নয়; বরং বাংলাদেশের মূল্যবান জিনগত সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, কৃষি-ঐতিহ্য, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তাকে সুরক্ষিত রাখা। সরকার, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (BLRI), বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং খামারিদের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই এই অমূল্য দেশীয় জাতকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব। আজকের সঠিক সিদ্ধান্ত ও কার্যকর সংরক্ষণ কর্মসূচিই নিশ্চিত করতে পারে যে, নর্থ বেঙ্গল গ্রে ক্যাটল ভবিষ্যতেও বাংলাদেশের গর্ব হিসেবে মাঠে-ঘাটে টিকে থাকবে এবং দেশীয় প্রাণিসম্পদ উন্নয়নের এক উজ্জ্বল ভিত্তি হয়ে আগামী প্রজন্মের পথ দেখাবে।

“একটি দেশীয় গরুর জাত হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি প্রাণীর বিলুপ্তি নয়; হারিয়ে যায় শতাব্দীর অভিযোজন, কৃষকের অভিজ্ঞতা, জিনগত বৈচিত্র্য এবং একটি জাতির কৃষি-ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। নর্থ বেঙ্গল গ্রে ক্যাটল সংরক্ষণ তাই কোনো একক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়—এটি আমাদের সবার জাতীয় অঙ্গীকার হওয়া উচিত।”

তথ্যসুত্র

ড. শফিকুর রহমান (শশী)
পিএইচডি ইন এনমিলে ব্রিডিং এন্ড জেনেটিক্স
বিসিএস (লাইভষ্টক)
উপ-পরিচালক, কৃত্রিম প্রজণন দপ্তর, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর

প্রকল্প পরিচালক, দুধ ও মাংশ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রুভেন বুল উৎপাদন প্রকল্প, ডিএলএস

সর্বশেষ - ছাগল পালন

আপনার জন্য নির্বাচিত

সারাদেশে জলাশয়গুলো চিহ্নিত করে দেশি মাছের প্রজাতি রক্ষা করতে হবে

বাংলাদেশে ব্রয়লার প্যারেন্ট স্টক, গ্র্যান্ড প্যারেন্ট স্টক (GPS) ও হ্যাচারি শিল্পের ইতিহাস ও বিবর্তন

এক নজরে বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্পের ১৯৩৫-২০২৬ সাল । অ্যাক্সন লিমিটেড-বাংলাদেশ কর্তৃক প্রস্তুতকৃত প্রতিবেদন।

মিঠাপানির মাছ উৎপাদনে বিশ্ববিদ্যালয় লেক হতে পারে নতুন দৃষ্টান্ত

পৃথিবীতে রুই-কাতলা মাছ চাষের ইতিহাস

বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফা

প্রধানমন্ত্রীর করোনা তহবিলে এক কোটি টাকা অনুদান দিল বিপিআইসিসি

খামার শুরুটা সহজ টিকিয়ে রাখা বড়ই কষ্ট!

মাংস আমদানি করে দেশের ক্ষতি করতে চাই না

রমজানে ২৫টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে গরু-৬৫০ ড্রেস্ড ব্রয়লার-২৪৫, দুধ-৮০, ডিম-৮ টাকায় ভোক্তাদের কাছে বিক্রি করবে সরকার