দুর্বা ও বাকশা ঘাসের ইতিহাস, বৈশিষ্ট্য, চাষপদ্ধতি, রোগবালাই, পুষ্টিমান এবং গবাদিপশুর খাদ্যে গুরুত্ব।।
ড. বায়েজিদ মোড়লের গবেষণাধর্মী প্রতিবেদন।।

বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চল, পতিত জমি, রাস্তার পাশ, পুকুরপাড়, বাঁধ ও চরাঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো বহু ঘাস যুগ যুগ ধরে গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর মধ্যে দুর্বা ঘাস অত্যন্ত পরিচিত। অন্যদিকে বাকশা বা বাকসা ঘাস দেশের কিছু অঞ্চলে স্থানীয় পশুখাদ্য হিসেবে পরিচিত হলেও এর বৈজ্ঞানিক পরিচয় ও পুষ্টিমান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য গবেষণা সীমিত।
দুটি ঘাসের পরিচয়, ইতিহাস ও পুষ্টিমান এক নয়। তাই প্রতিবেদনের প্রথম অধ্যায়ে দুর্বা ঘাস এবং দ্বিতীয় অধ্যায়ে বাকশা ঘাস সম্পর্কে আলাদাভাবে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
প্রথম অধ্যায়: দুর্বা ঘাস
১. দুর্বা ঘাসের পরিচয়
দুর্বা ঘাসের বৈজ্ঞানিক নাম Cynodon dactylon। ইংরেজিতে এটি Bermuda grass, Couch grass বা Doob grass নামে পরিচিত। এটি Poaceae পরিবারের একটি উষ্ণমণ্ডলীয়, বহুবর্ষজীবী ও লতানো ঘাস।
দুর্বা মাটির ওপর স্টোলন এবং মাটির নিচে রাইজোম ছড়িয়ে খুব দ্রুত বিস্তার লাভ করে। এর কাণ্ডের গিঁট মাটির সংস্পর্শে এলে সেখান থেকে নতুন শিকড় ও কুশি জন্মায়। এ কারণে এটি অল্প সময়ের মধ্যে ঘন সবুজ আস্তরণ তৈরি করতে পারে।
২. দুর্বা ঘাসের ইতিহাস ও বিস্তার
দুর্বার আদি উৎপত্তিস্থল নিয়ে গবেষকদের মধ্যে কিছু মতপার্থক্য রয়েছে। তবে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল, পূর্ব আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার বিস্তৃত এলাকাকে এর প্রাচীন বিস্তারকেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় সব উষ্ণ ও উপ-উষ্ণ অঞ্চলে দুর্বা পাওয়া যায়।
দক্ষিণ এশিয়ায় দুর্বা ঘাস বহু শতাব্দী ধরে ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, ঔষধি এবং কৃষিভিত্তিক জীবনের অংশ। বাংলাদেশেও পরিকল্পিত পশুখাদ্য চাষ শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া প্রাকৃতিক চারণভূমি থেকে দুর্বা খেয়ে আসছে।
বিশ্বে দুর্বা বা বারমুডা ঘাসের উন্নত জাত উদ্ভাবনের কাজ বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বিশেষ গতি লাভ করে। ১৯৪৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ‘Coastal Bermuda’ নামের একটি উন্নত হাইব্রিড অবমুক্ত করা হয়। পরবর্তী সময়ে Tifton-44, Tifton-68, Tifton-78 ও Tifton-85সহ বিভিন্ন উন্নত জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। তবে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দেশি দুর্বা এবং এসব উন্নত হাইব্রিড একই ঘাস নয়।
৩. দুর্বা ঘাসের বৈশিষ্ট্য
দুর্বা একটি উষ্ণ মৌসুমের C4 উদ্ভিদ। অর্থাৎ উচ্চ তাপমাত্রা ও পর্যাপ্ত সূর্যালোকে এটি কার্যকরভাবে খাদ্য তৈরি করতে পারে।
এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো—
- এটি বহুবর্ষজীবী ও লতানো প্রকৃতির;
- মাটির ওপর স্টোলন এবং মাটির নিচে রাইজোম তৈরি করে;
- গিঁট থেকে শিকড় ও নতুন কুশি জন্মায়;
- সাধারণত ১০–৪০ সেন্টিমিটার উঁচু ঘন আস্তরণ তৈরি করে;
- পাতাগুলো সরু, ছোট এবং নীলাভ-সবুজ;
- খরা ও গরম আবহাওয়া সহ্য করতে পারে;
- ঘন ঘন চারণ ও পশুর পদদলন সহ্য করে;
- কয়েক সপ্তাহের জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে;
- পূর্ণ সূর্যালোকে ভালো জন্মে;
- অতিরিক্ত ছায়ায় বৃদ্ধি ও ফলন কমে যায়;
- শিকড়ের বিস্তারের কারণে মাটির ক্ষয় রোধ করে;
- সড়কের ঢাল, বাঁধ ও পুকুরপাড় সংরক্ষণে ব্যবহার করা যায়;
- একবার প্রতিষ্ঠিত হলে জমি থেকে সম্পূর্ণ নির্মূল করা কঠিন।
দুর্বার শক্তিশালী বিস্তারক্ষমতা পশুচারণের জমির জন্য সুবিধাজনক হলেও ধান, ভুট্টা, সবজি বা অন্যান্য ফসলের জমিতে এটি ক্ষতিকর আগাছায় পরিণত হতে পারে।
৪. জলবায়ু ও মাটির প্রয়োজনীয়তা
দুর্বা ঘাস উষ্ণ ও রোদযুক্ত আবহাওয়ায় সবচেয়ে ভালো জন্মে। গড় দৈনিক তাপমাত্রা প্রায় ১৭–৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলে এর বৃদ্ধি ভালো হয়। তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে গেলে বৃদ্ধি ধীর হয়ে যায়।
এটি বেলে, দোআঁশ ও এঁটেলসহ বিভিন্ন ধরনের মাটিতে জন্মাতে পারে। তবে উর্বর, গভীর ও পানি নিষ্কাশনযোগ্য মাটিতে ফলন বেশি হয়। মাটির pH প্রায় ৫.৫-এর ওপরে হলে ভালো বৃদ্ধি পায়। কিছু জাত মাঝারি লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে।
৫. জমি নির্বাচন
দুর্বা চাষের জন্য উঁচু থেকে মাঝারি উঁচু, রোদযুক্ত ও পানি নিষ্কাশনের সুবিধাযুক্ত জমি নির্বাচন করা উচিত। বাড়ির পাশের পতিত জায়গা, চারণভূমি, পুকুরপাড়, বাঁধ এবং ক্ষয়প্রবণ জমিতে এটি লাগানো যায়।
তবে স্থায়ী ফসলি জমিতে দুর্বা লাগানোর আগে সতর্ক হতে হবে। এর রাইজোম ও স্টোলন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং পরবর্তী সময়ে অন্য ফসল চাষের সময় নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যায়।
৬. জমি প্রস্তুতি
দুর্বা চাষের আগে—
- দুই থেকে তিনবার চাষ দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করতে হবে;
- আগের ফসলের অবশিষ্টাংশ ও ক্ষতিকর আগাছা পরিষ্কার করতে হবে;
- মই দিয়ে জমি সমান করতে হবে;
- প্রয়োজন অনুযায়ী পানি নিষ্কাশনের নালা তৈরি করতে হবে;
- জমি তৈরির সময় ভালোভাবে পচানো গোবর বা কম্পোস্ট মাটিতে মেশাতে হবে;
- মাটি পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় চুন, ফসফরাস ও পটাশ ব্যবহার করতে হবে।
রোপণের সময় জমিতে পর্যাপ্ত রস থাকা প্রয়োজন। অতিরিক্ত শুকনা মাটিতে স্টোলন বা শিকড়যুক্ত কাটিং সহজে প্রতিষ্ঠিত হয় না।
৭. রোপণের সময়
বাংলাদেশে বর্ষার শুরু—বৈশাখ থেকে শ্রাবণ—দুর্বা লাগানোর সুবিধাজনক সময়। এ সময় মাটিতে স্বাভাবিক আর্দ্রতা থাকায় স্টোলন ও শিকড় দ্রুত প্রতিষ্ঠিত হয়।
সেচের ব্যবস্থা থাকলে বসন্ত বা অন্য সময়েও রোপণ করা যায়। তবে অতিবৃষ্টি, গভীর জলাবদ্ধতা বা প্রচণ্ড শীতের সময় নতুন রোপণ এড়িয়ে চলা ভালো।
৮. বংশবিস্তার ও রোপণপদ্ধতি
দুর্বা ঘাস বীজ, স্টোলন এবং রাইজোম দিয়ে বংশবিস্তার করে। বাংলাদেশের খামারি পর্যায়ে শিকড়যুক্ত লতা বা স্টোলন ব্যবহার সবচেয়ে সহজ।
স্টোলন বা কাটিং দিয়ে রোপণ
- রোগমুক্ত, সতেজ ও ভালো ফলনশীল দুর্বা নির্বাচন করতে হবে।
- লতানো কাণ্ড গিঁটসহ ছোট ছোট অংশে ভাগ করতে হবে।
- প্রতিটি কাটিংয়ে অন্তত দুই থেকে তিনটি জীবন্ত গিঁট রাখা ভালো।
- অগভীর নালা তৈরি করে কাটিংগুলো শুইয়ে দিতে হবে।
- কমপক্ষে একটি বা দুটি গিঁট মাটির নিচে রাখতে হবে।
- ওপর থেকে মাটি দিয়ে হালকা চাপ দিতে হবে।
- রোপণের পরপরই সেচ দিতে হবে।
দ্রুত জমি ঢাকার জন্য প্রায় ৩০–৫০ সেন্টিমিটার দূরত্বে শিকড়যুক্ত অংশ লাগানো যেতে পারে। তবে জমির উর্বরতা, রোপণসামগ্রীর আকার ও ব্যবহারের উদ্দেশ্য অনুযায়ী দূরত্ব পরিবর্তন করা যায়।
৯. সার ব্যবস্থাপনা
দুর্বা নাইট্রোজেন সারে ভালো সাড়া দেয়। তবে মাটি পরীক্ষা ছাড়া নির্দিষ্ট সারের মাত্রা নির্ধারণ করা ঠিক নয়।
সাধারণ ব্যবস্থাপনা হলো—
- জমি তৈরির সময় পচানো গোবর বা কম্পোস্ট ব্যবহার;
- প্রয়োজনীয় ফসফরাস ও পটাশ মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া;
- প্রতিবার কাটার পর প্রয়োজন অনুযায়ী ভাগ করে নাইট্রোজেন প্রয়োগ;
- সার দেওয়ার পর মাটিতে রস না থাকলে সেচ দেওয়া;
- অতিরিক্ত ইউরিয়া ব্যবহার না করা।
অতিরিক্ত নাইট্রোজেন প্রয়োগ করলে ঘাসে নাইট্রেট জমার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই দ্রুত ফলনের আশায় অতিরিক্ত ইউরিয়া ব্যবহার নিরাপদ নয়।
১০. সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা
রোপণের পর মাটি আর্দ্র রাখা প্রয়োজন। শুষ্ক মৌসুমে মাটির ধরন ও আবহাওয়া অনুযায়ী সেচ দিতে হবে। দুর্বা খরা সহ্য করতে পারলেও নিয়মিত পানি পেলে উৎপাদন ও পুনর্বৃদ্ধি ভালো হয়।
দুর্বা কয়েক সপ্তাহ জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘদিন গভীর ও পচা পানিতে ডুবে থাকলে ফলন ও গুণগত মান কমতে পারে। শিল্পবর্জ্য, নর্দমা বা হাসপাতালের বর্জ্যযুক্ত স্থানে জন্মানো দুর্বা গবাদিপশুকে খাওয়ানো উচিত নয়।
১১. আগাছা নিয়ন্ত্রণ
দুর্বা জমিতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগের সময় আগাছা নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- হাত দিয়ে আগাছা তুলে ফেলতে হবে;
- প্রয়োজনমতো হালকা নিড়ানি দিতে হবে;
- ঘাসের সঠিক ঘনত্ব বজায় রাখতে হবে;
- প্রাথমিক পর্যায়ে আগাছাকে ফুল ও বীজ তৈরি করতে দেওয়া যাবে না;
- খাদ্যঘাসে নির্বিচারে আগাছানাশক ব্যবহার করা যাবে না।
দুর্বা নিজেই আগ্রাসী হওয়ায় আশপাশের ফসলি জমিতে ছড়িয়ে পড়ছে কি না, সেটিও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
১২. কাটাই ও ব্যবস্থাপনা
দুর্বা ঘন ও পাতাবহুল হলে প্রথমবার কাটা যায়। উন্নত ব্যবস্থাপনায় প্রায় ৪–৬ সপ্তাহ পরপর কাটার কথা বলা হয়। তবে আবহাওয়া, সার, সেচ এবং বৃদ্ধির গতি অনুযায়ী কাটার সময় নির্ধারণ করতে হবে।
কাটার সময়—
- মাটি সমান করে কাটা যাবে না;
- প্রায় ৫–১০ সেন্টিমিটার গোড়া রাখতে হবে;
- ফুল বা বীজ ধরার আগেই কাটা ভালো;
- অতিবয়স্ক, শক্ত ও আঁশযুক্ত অংশ আলাদা করতে হবে;
- বর্ষার ভেজা ঘাস কিছুক্ষণ ঝরিয়ে খাওয়াতে হবে;
- কাদা, পচা বা ছত্রাকযুক্ত ঘাস বাদ দিতে হবে।
সঠিক উচ্চতায় কাটলে জমিতে ঘাসের ঘনত্ব বজায় থাকে এবং দ্রুত নতুন কুশি জন্মায়।
১৩. দুর্বা ঘাসের রোগবালাই
দুর্বা সহনশীল হলেও বিভিন্ন পরিবেশে পাতার দাগ, ব্লাইট, মরিচা, শিকড় পচা, এরগট, নিমাটোড এবং পোকামাকড়ের আক্রমণ হতে পারে।
পাতার দাগ ও ব্লাইট
লক্ষণ: পাতায় বাদামি, কালো বা ধূসর দাগ পড়ে। পরবর্তী সময়ে দাগ বড় হয়ে পাতা শুকিয়ে যেতে পারে।
প্রতিকার:
- আক্রান্ত অংশ দ্রুত কেটে সরিয়ে ফেলতে হবে;
- পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে;
- অতিরিক্ত নাইট্রোজেন প্রয়োগ বন্ধ করতে হবে;
- খুব ঘন ঘাস পাতলা করতে হবে;
- রোগমুক্ত কাটিং ব্যবহার করতে হবে;
- কাটার যন্ত্র ব্যবহারের পর পরিষ্কার করতে হবে।
মরিচা রোগ
লক্ষণ: পাতায় হলুদ, কমলা বা বাদামি গুঁড়ার মতো দাগ দেখা যায়। আক্রমণ বেশি হলে পাতা শুকিয়ে যায়।
প্রতিকার:
- আক্রান্ত ঘাস দ্রুত কেটে জমির বাইরে সরানো;
- ঘাসের অতিরিক্ত ঘনত্ব ও আর্দ্রতা কমানো;
- সুষম সার প্রয়োগ;
- পটাশের ঘাটতি পূরণ;
- মারাত্মক আক্রমণে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া।
গোড়া ও শিকড় পচা
লক্ষণ: গোড়া কালচে হয়ে পচে যায়, দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়, পাতা হলুদ হয় এবং গাছ সহজে উঠে আসে।
প্রতিকার:
- জমিতে পানি জমতে না দেওয়া;
- আক্রান্ত গাছ শিকড়সহ তুলে ফেলা;
- রোগমুক্ত স্থান থেকে নতুন কাটিং সংগ্রহ;
- কাঁচা গোবর ব্যবহার না করা;
- একই কাটার যন্ত্র ব্যবহারের পর পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করা।
পোকামাকড়
দুর্বায় ঘাসফড়িং, কাটুই পোকা, আর্মিওয়ার্ম, জাবপোকা ও অন্যান্য রসচোষা পোকা আক্রমণ করতে পারে।
প্রতিকার:
- নিয়মিত মাঠ পর্যবেক্ষণ;
- ডিমের গুচ্ছ ও আক্রান্ত অংশ সংগ্রহ করে নষ্ট করা;
- জমি ও আইল পরিষ্কার রাখা;
- প্রযোজ্য ক্ষেত্রে আলো বা ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার;
- উপকারী পোকামাকড় সংরক্ষণ;
- মারাত্মক অবস্থায় কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে নিবন্ধিত বালাইনাশক ব্যবহার।
এরগট ও ছত্রাকজনিত বিষ
ফুল বা বীজ ধরার পর আর্দ্র পরিবেশে দুর্বা এরগটজাতীয় ছত্রাকে আক্রান্ত হতে পারে। আক্রান্ত বীজমঞ্জরির বিষ পশুর খোঁড়ানো, শরীরের প্রান্তে রক্তসঞ্চালন কমে যাওয়া, অতিরিক্ত তাপমাত্রা, স্নায়বিক লক্ষণ এবং গুরুতর ক্ষেত্রে মৃত্যু ঘটাতে পারে।
ঘাস ফুল আসার আগে কাটা এবং ছত্রাকযুক্ত অংশ পশুকে না খাওয়ানোই প্রধান প্রতিরোধ।
১৪. দুর্বা ঘাসের পুষ্টিগুণ
দুর্বার পুষ্টিমান জাত, বয়স, মাটির উর্বরতা, নাইট্রোজেন সার, সেচ ও কাটার সময়ের ওপর নির্ভর করে।
| পুষ্টি উপাদান | সম্ভাব্য মাত্রা—শুষ্ক পদার্থের ভিত্তিতে |
|---|---|
| অপরিশোধিত প্রোটিন | সাধারণত ৯–১৬% |
| পুরোনো ঘাসে প্রোটিন | প্রায় ৩–৯% হতে পারে |
| কচি ও সুষম সারপ্রাপ্ত ঘাসে প্রোটিন | প্রায় ২০% পর্যন্ত হতে পারে |
| NDF | প্রায় ৪৫–৮৫% |
| ADF | প্রায় ২০–৪৫% |
| জৈব পদার্থের হজমযোগ্যতা | আনুমানিক ৪৫–৬৫% |
এগুলো আন্তর্জাতিক গবেষণায় পাওয়া সম্ভাব্য পরিসর। বাংলাদেশের প্রতিটি দুর্বার নমুনায় একই পুষ্টিমান থাকবে না। স্থানীয় ঘাসের প্রকৃত পুষ্টিমান জানতে পরীক্ষাগারে নমুনা পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
কচি ও পাতাবহুল দুর্বায় সাধারণত প্রোটিন এবং হজমযোগ্যতা বেশি থাকে। ঘাস পরিণত হলে কাণ্ড, আঁশ ও লিগনিন বৃদ্ধি পায় এবং পুষ্টিমান কমে যায়।
১৫. দুধের গাভীর জন্য দুর্বার গুরুত্ব
কচি দুর্বা গাভীর রেশনে কার্যকর আঁশ, কিছু প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজ সরবরাহ করতে পারে। এটি জাবর কাটা, লালা উৎপাদন এবং রুমেনের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সহায়তা করে।
প্রধান উপকারিতা
- সাধারণত সুস্বাদু এবং গরু আগ্রহের সঙ্গে খায়;
- রুমেনের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখে;
- জাবর কাটা ও হজমে সহায়তা করে;
- খড়নির্ভর খাদ্যে কিছু প্রোটিন ও সবুজ খাদ্য যোগ করে;
- স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য হওয়ায় খাদ্য ব্যয় কমাতে পারে;
- চারণভূমি হিসেবে দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যায়।
তবে উচ্চ দুধ উৎপাদনকারী গাভীকে শুধু দুর্বা খাওয়ালে প্রয়োজনীয় শক্তি, প্রোটিন, ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের ঘাটতি হতে পারে। দুর্বাকে খড় বা হে, দানাদার খাদ্য, প্রোটিনের উৎস, খনিজ মিশ্রণ, লবণ ও বিশুদ্ধ পানির সঙ্গে সমন্বয় করে দিতে হবে।
১৬. ষাঁড় মোটাতাজাকরণে দুর্বার গুরুত্ব
দুর্বা ষাঁড় মোটাতাজাকরণের রেশনে প্রয়োজনীয় আঁশ এবং কিছু প্রোটিন দিতে পারে। তবে শুধু দুর্বা খাইয়ে দ্রুত ও লাভজনক মোটাতাজাকরণ সম্ভব—এমন ধারণা সঠিক নয়।
আন্তর্জাতিক গবেষণায় উন্নত মানের বারমুডা চারণভূমিতে কমবয়সী ষাঁড়ের দৈনিক প্রায় ৩০০–৯০০ গ্রাম পর্যন্ত ওজন বৃদ্ধির উদাহরণ পাওয়া গেছে। ঘাসের হজমযোগ্যতা বেশি এবং সুষম কনসেনট্রেট যুক্ত হলে বৃদ্ধি আরও ভালো হতে পারে। তবে এসব ফল বাংলাদেশের দেশি দুর্বার নিশ্চিত ফলন হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
মোটাতাজাকরণে ব্যবহারের নিয়ম
- কচি ও পাতাবহুল দুর্বা সংগ্রহ করতে হবে;
- কেটে খাওয়ালে ছোট করে কুচি করা ভালো;
- ধীরে ধীরে নতুন ঘাসে অভ্যস্ত করতে হবে;
- পশুর ওজন অনুযায়ী সুষম দানাদার খাদ্য দিতে হবে;
- খনিজ মিশ্রণ ও লবণ নিশ্চিত করতে হবে;
- নিয়মিত কৃমিনাশন ও টিকা দিতে হবে;
- প্রতি ১৫–৩০ দিনে ওজন বা বুকের বেড় মাপতে হবে;
- হরমোন, স্টেরয়েড বা ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করা যাবে না।
১৭. দুর্বা খাওয়ানোর সতর্কতা
বিশেষ পরিস্থিতিতে বারমুডা ঘাসে নাইট্রেট বা সায়ানোজেনিক যৌগজনিত ঝুঁকির প্রতিবেদন রয়েছে। ঝুঁকি বাড়তে পারে—
- অতিরিক্ত ইউরিয়া বা নাইট্রোজেন প্রয়োগে;
- সার দেওয়ার পরপরই ঘাস কাটলে;
- দীর্ঘ খরার পর হঠাৎ বৃষ্টি হলে;
- প্রতিকূল আবহাওয়ায় নতুন কুশি জন্মালে;
- অপরিচিত হাইব্রিড চাষ করলে।
পশুর শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত লালা, কাঁপুনি, দুর্বলতা, পেট ফাঁপা বা হঠাৎ পড়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে ঘাস সরিয়ে দ্রুত প্রাণিসম্পদ চিকিৎসকের সহায়তা নিতে হবে।
১৮. দুর্বা চাষের অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত গুরুত্ব
দুর্বার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য, বহুবর্ষজীবী এবং ঘন ঘন চারণ সহ্য করতে পারে। ছোট খামার, বাড়ির আশপাশ, পতিত জমি, বাঁধ ও পুকুরপাড়ে এটি কম খরচে পশুখাদ্যের কিছু অংশ সরবরাহ করতে পারে।
এর ঘন শিকড়—
- মাটির ক্ষয় কমায়;
- বাঁধ ও ঢাল শক্ত রাখে;
- বৃষ্টির পানিতে মাটি ভেসে যাওয়া রোধ করে;
- অনাবাদি জমিতে সবুজ আচ্ছাদন সৃষ্টি করে।
তবে এর আগ্রাসী স্বভাব বিবেচনায় মূল্যবান ফসলি জমিতে পরিকল্পনা ছাড়া চাষ করা উচিত নয়।
দ্বিতীয় অধ্যায়: বাকশা ঘাস
১. বাকশা ঘাসের পরিচয়
বাকশা বা বাকসা বাংলাদেশের কিছু অঞ্চলে গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত একটি স্থানীয় ঘাসের নাম। খামারি পর্যায়ে একে বহুবর্ষজীবী, লতানো, নরম এবং গরু-ছাগলের সুস্বাদু ঘাস হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
কিন্তু “বাকশা ঘাস” নামে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রজাতির নির্ভরযোগ্য তথ্য সহজলভ্য নয়। অঞ্চলভেদে একই নামে ভিন্ন প্রজাতির ঘাস পরিচিত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
তাই বাকশা ঘাসের বৈজ্ঞানিক নাম নিশ্চিত না করে কোনো পরিচিত বিদেশি ঘাসের পুষ্টিমান বা ফলন এর নামে প্রচার করা উচিত নয়।
২. বাকশা ঘাসের ইতিহাস
বাংলাদেশের গ্রামীণ চারণভূমি, বিল, নিচু জমি বা আর্দ্র এলাকায় বাকশা নামে পরিচিত ঘাস দীর্ঘদিন ধরে গবাদিপশুকে খাওয়ানো হচ্ছে বলে খামারি পর্যায়ের বর্ণনায় জানা যায়। পরবর্তী সময়ে কৃষকেরা শিকড়যুক্ত গোঁড়া বা লতানো কাটিং সংগ্রহ করে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় ছড়িয়ে দিয়েছেন।
তবে বাকশা ঘাসের—
- সুনির্দিষ্ট উৎপত্তিস্থল;
- প্রথম সংগ্রাহক বা প্রবর্তক;
- বাংলাদেশে প্রথম চাষের সাল;
- সরকারি জাত হিসেবে অবমুক্তির ইতিহাস;
- গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন;
- অনুমোদিত ফলন ও পুষ্টিমানের তথ্য—
পাওয়া যায় না।
সুতরাং একে নিশ্চিতভাবে দেশি বা বিদেশি প্রজাতি হিসেবে ঘোষণা করার আগে উদ্ভিদতাত্ত্বিক শনাক্তকরণ প্রয়োজন। ফুল, বীজমঞ্জরি, পাতা, কাণ্ড, গিঁট এবং শিকড়সহ সম্পূর্ণ গাছের নমুনা কোনো কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বা স্বীকৃত হার্বেরিয়ামে পরীক্ষা করানো উচিত।
৩. বাকশা ঘাসের সম্ভাব্য বৈশিষ্ট্য
খামারি পর্যায়ের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী বাকশা ঘাস—
- বহুবর্ষজীবী প্রকৃতির;
- গোঁড়া বা লতানো কাণ্ড থেকে পুনরায় জন্মাতে পারে;
- কাটিং বা শিকড়যুক্ত গোঁড়া দিয়ে বিস্তার করা যায়;
- কচি অবস্থায় নরম ও সুস্বাদু;
- গরু, ছাগল ও অন্যান্য তৃণভোজী পশু খেতে পারে;
- আর্দ্র ও মাঝারি নিচু জমিতে টিকে থাকতে পারে;
- জমিতে ঘন আস্তরণ তৈরি করতে পারে;
- একাধিকবার কাটা যায়;
- সঠিক ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন জমিতে টিকে থাকতে পারে।
তবে “ছয় মাস পানির নিচে থাকলেও নষ্ট হয় না”, “একবার লাগালে সারা জীবন পাওয়া যায়” কিংবা “অত্যন্ত বেশি প্রোটিন রয়েছে”—এ ধরনের বক্তব্য নিয়ন্ত্রিত গবেষণায় যাচাই করা প্রয়োজন।
৪. জলবায়ু ও মাটি
বাকশা নামে পরিচিত স্থানীয় ঘাসটি আর্দ্র ও উষ্ণ পরিবেশে ভালো জন্মায় বলে খামারিদের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়। মাঝারি নিচু জমি, বিলের কিনারা বা মৌসুমি জলাবদ্ধ স্থানে এর সম্ভাবনা থাকতে পারে।
চাষের জন্য এমন জমি নির্বাচন করা উচিত যেখানে—
- পর্যাপ্ত সূর্যালোক পাওয়া যায়;
- মাটি দীর্ঘদিন অতিরিক্ত শুকনা থাকে না;
- প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত পানি বের করা যায়;
- শিল্পবর্জ্য বা নর্দমার দূষণ নেই;
- পশুখাদ্য হিসেবে নিরাপদ ঘাস উৎপাদন সম্ভব।
বৈজ্ঞানিক পরিচয় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এর নির্দিষ্ট pH, লবণাক্ততা বা জলাবদ্ধতা সহনশীলতার সীমা বলা সম্ভব নয়।
৫. জমি প্রস্তুতি
বাকশা চাষের আগে—
- দুই থেকে তিনবার চাষ দিতে হবে;
- মাটি ঝুরঝুরে ও সমান করতে হবে;
- ক্ষতিকর আগাছা সরাতে হবে;
- পানি চলাচলের জন্য নালা রাখতে হবে;
- ভালোভাবে পচানো গোবর বা কম্পোস্ট ব্যবহার করতে হবে;
- মাটি পরীক্ষার ভিত্তিতে অন্যান্য সার প্রয়োগ করতে হবে।
স্থানীয় লতানো ঘাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই প্রথমে ছোট পরীক্ষামূলক প্লটে চাষ করে এর বিস্তার ও উৎপাদন পর্যবেক্ষণ করা ভালো।
৬. রোপণের সময়
বাংলাদেশে বর্ষার শুরুতে মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকায় বাকশার কাটিং সহজে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। সেচের ব্যবস্থা থাকলে বসন্তকালেও রোপণ করা যায়।
কিছু খামারি আশ্বিন–কার্তিক মাসে বাকশা রোপণের কথা বলেন। নিচু জমি থেকে পানি নেমে যাওয়ার পর মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকায় এ সময় ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে। তবে এটি সারাদেশের জন্য একমাত্র বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত রোপণকাল নয়।
৭. বংশবিস্তার ও রোপণপদ্ধতি
বাকশা ঘাসের বীজের বিশুদ্ধতা ও অঙ্কুরোদ্গম সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। তাই শিকড়যুক্ত গোঁড়া বা গিঁটসহ সতেজ কাটিং দিয়ে রোপণ তুলনামূলক নিরাপদ।
রোপণের ধাপ
- সুস্থ, সবুজ ও রোগমুক্ত মাতৃগাছ নির্বাচন করতে হবে।
- শিকড়যুক্ত গোঁড়া অথবা দুই থেকে তিনটি গিঁটসহ কাটিং সংগ্রহ করতে হবে।
- প্রস্তুত জমিতে অগভীর নালা তৈরি করতে হবে।
- কাটিং শুইয়ে বা শিকড়যুক্ত অংশ সোজাভাবে লাগাতে হবে।
- অন্তত একটি জীবন্ত গিঁট মাটির নিচে রাখতে হবে।
- মাটি দিয়ে হালকা চাপ দিতে হবে।
- রোপণের পর সেচ দিতে হবে।
- শুকিয়ে যাওয়া বা না-ধরা কাটিং দ্রুত প্রতিস্থাপন করতে হবে।
গাছটির বৈজ্ঞানিক কৃষিতাত্ত্বিক নির্দেশিকা না থাকায় ছোট প্লটে ৩০, ৪০ ও ৫০ সেন্টিমিটার দূরত্ব পরীক্ষা করে স্থানীয়ভাবে উপযোগী দূরত্ব নির্বাচন করা যেতে পারে।
৮. সার ব্যবস্থাপনা
বাকশার জন্য গবেষণায় নির্ধারিত সারের মাত্রা পাওয়া যায় না। তাই কোনো বিক্রেতার দেওয়া মাত্রা সরাসরি অনুসরণ না করে মাটি পরীক্ষা ও স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সাধারণভাবে—
- জমি তৈরির সময় পচানো গোবর বা কম্পোস্ট ব্যবহার;
- মাটি পরীক্ষার ভিত্তিতে ফসফরাস ও পটাশ প্রয়োগ;
- প্রতিবার কাটার পর প্রয়োজন অনুসারে অল্প অল্প করে নাইট্রোজেন প্রয়োগ;
- সার প্রয়োগের পর মাটিতে রস না থাকলে সেচ;
- অতিরিক্ত ইউরিয়া পরিহার—
করা যেতে পারে।
৯. সেচ ও পানি নিষ্কাশন
বাকশাকে জলসহিষ্ণু ঘাস হিসেবে প্রচার করা হলেও এর সহনশীলতার বৈজ্ঞানিক সীমা জানা নেই। তাই—
- রোপণের পর মাটি আর্দ্র রাখতে হবে;
- শুষ্ক মৌসুমে প্রয়োজনমতো সেচ দিতে হবে;
- দীর্ঘদিন পচা ও স্থির পানি জমতে দেওয়া যাবে না;
- অতিরিক্ত পানি বের করার নালা রাখতে হবে;
- নর্দমা, হাসপাতাল, ট্যানারি বা শিল্পবর্জ্যের পানি ব্যবহার করা যাবে না।
দূষিত পানিতে জন্মানো ঘাসে রোগজীবাণু, ভারী ধাতু ও বিষাক্ত রাসায়নিক জমতে পারে, যা দুধ ও মাংসের নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করতে পারে।
১০. আগাছা নিয়ন্ত্রণ
রোপণের প্রথম দিকে বাকশা ঘাসের সঙ্গে আগাছার প্রতিযোগিতা বেশি হতে পারে। তাই—
- হাত দিয়ে আগাছা পরিষ্কার;
- হালকা নিড়ানি;
- ফাঁকা জায়গায় পুনরায় কাটিং রোপণ;
- আইল ও নালা পরিষ্কার;
- আগাছাকে বীজ তৈরি করতে না দেওয়া—
প্রয়োজন।
খাদ্যঘাসে নির্বিচারে আগাছানাশক প্রয়োগ করা যাবে না। ঘাসটি পাশের ফসলি জমিতে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ছড়িয়ে পড়ছে কি না, সেটিও পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
১১. কাটাই ও পুনর্বৃদ্ধি
বাকশা ঘাসের আদর্শ কাটার বয়স নিয়ে নির্ভরযোগ্য গবেষণা নেই। তাই গাছ নরম, পাতাবহুল এবং ফুল আসার আগের পর্যায়ে কাটা ভালো।
কাটার সময়—
- মাটি সমান করে কাটা যাবে না;
- কিছুটা গোড়া রেখে কাটতে হবে;
- কাটার পর প্রয়োজনমতো সার ও সেচ দিতে হবে;
- শক্ত ও অতিবয়স্ক কাণ্ড বাদ দিতে হবে;
- ভেজা ঘাস ঝরিয়ে নিতে হবে;
- ছত্রাক, কাদা বা পচনযুক্ত অংশ পশুকে দেওয়া যাবে না।
খামারিকে প্রতিটি কাটার তারিখ, তাজা ফলন এবং পরবর্তী কাটার ব্যবধান লিখে রাখা উচিত। এতে নিজস্ব খামারের জন্য বাকশার প্রকৃত উৎপাদনক্ষমতা জানা যাবে।
১২. বাকশা ঘাসের সম্ভাব্য রোগবালাই
বাকশার বৈজ্ঞানিক পরিচয় নিশ্চিত না হওয়ায় এর নির্দিষ্ট রোগ ও পোকার তালিকা দেওয়া সম্ভব নয়। তবে আর্দ্র এলাকায় চাষ করা অধিকাংশ পশুখাদ্য ঘাসে পাতার দাগ, ব্লাইট, মরিচা, গোড়া পচা এবং পোকামাকড়ের আক্রমণ হতে পারে।
পাতার দাগ
লক্ষণ: পাতায় বাদামি, কালো বা ধূসর দাগ; পরে পাতা শুকিয়ে যাওয়া।
প্রতিকার:
- আক্রান্ত ঘাস কেটে সরানো;
- জমিতে পানি জমতে না দেওয়া;
- ঘাস অতিরিক্ত ঘন হলে পাতলা করা;
- রোগমুক্ত কাটিং ব্যবহার;
- অতিরিক্ত ইউরিয়া বন্ধ করা।
গোড়া পচা
লক্ষণ: গোড়া নরম ও কালচে হওয়া, দুর্গন্ধ, পাতা হলুদ হয়ে যাওয়া এবং গাছ মারা যাওয়া।
প্রতিকার:
- দ্রুত পানি নিষ্কাশন;
- আক্রান্ত গাছ শিকড়সহ তুলে ফেলা;
- একই স্থান থেকে নতুন কাটিং সংগ্রহ না করা;
- কাঁচা গোবর ব্যবহার বন্ধ করা;
- কাটার যন্ত্র পরিষ্কার রাখা।
পোকামাকড়
ঘাসফড়িং, কাটুই পোকা, শুঁয়োপোকা, জাবপোকা ও অন্যান্য রসচোষা পোকা আক্রমণ করতে পারে।
প্রতিকার:
- নিয়মিত জমি পর্যবেক্ষণ;
- আক্রান্ত পাতা ও ডিমের গুচ্ছ সংগ্রহ;
- আইল ও জমি পরিষ্কার;
- প্রযোজ্য ক্ষেত্রে আলো বা ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার;
- মারাত্মক অবস্থায় কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে অনুমোদিত বালাইনাশক ব্যবহার।
১৩. বাকশা ঘাসের পুষ্টিগুণ
বাকশার প্রোটিন, আঁশ, শক্তি ও খনিজ উপাদান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য প্রকাশিত তথ্য পাওয়া যায় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ১৫–২০% বা তার বেশি প্রোটিনের যে দাবি করা হয়, তা পরীক্ষাগারের প্রতিবেদন ছাড়া গ্রহণযোগ্য নয়।
বাণিজ্যিকভাবে চাষ বা বড় খামারে ব্যবহারের আগে নিচের পরীক্ষাগুলো করা প্রয়োজন—
- শুষ্ক পদার্থ বা DM;
- অপরিশোধিত প্রোটিন বা CP;
- NDF;
- ADF;
- ছাই ও জৈব পদার্থ;
- ক্যালসিয়াম;
- ফসফরাস;
- হজমযোগ্যতা;
- নাইট্রেট;
- কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ;
- প্রয়োজন হলে মাইকোটক্সিন ও ভারী ধাতু।
একই ঘাসের কচি ও বয়স্ক নমুনার পুষ্টিমান আলাদা হবে। তাই কত দিনের ঘাস পরীক্ষা করা হয়েছে, সেটি পরীক্ষার প্রতিবেদনে উল্লেখ থাকা জরুরি।
১৪. দুধের গাভীর জন্য বাকশার গুরুত্ব
বাকশা যদি সঠিকভাবে শনাক্ত, নিরাপদ এবং পরীক্ষায় পুষ্টিকর প্রমাণিত হয়, তাহলে এটি গাভীর সবুজ খাদ্যের একটি স্থানীয় উৎস হতে পারে। নরম ও পাতাবহুল অবস্থায় গরুর খাদ্য গ্রহণ বাড়াতে এবং রুমেনে প্রয়োজনীয় আঁশ সরবরাহে সহায়তা করতে পারে।
সম্ভাব্য উপকারিতা
- স্থানীয়ভাবে সহজে উৎপাদন করা যেতে পারে;
- কচি অবস্থায় পশুর কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে;
- সবুজ খাদ্যের ঘাটতি কিছুটা পূরণ করতে পারে;
- আর্দ্র বা মৌসুমি নিচু জমি ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে;
- খামারের খাদ্য ব্যয় কমাতে সহায়তা করতে পারে;
- রুমেন সচল রাখতে আঁশ সরবরাহ করতে পারে।
তবে পুষ্টিমান না জেনে উচ্চ দুধ উৎপাদনকারী গাভীর প্রধান খাদ্য হিসেবে বাকশা ব্যবহার ঝুঁকিপূর্ণ। শুধু বাকশা খাওয়ালে শক্তি, প্রোটিন, ক্যালসিয়াম বা ফসফরাসের ঘাটতি হতে পারে এবং দুধ কমে যেতে পারে।
খড় বা হে, দানাদার খাদ্য, প্রোটিনের উৎস, খনিজ মিশ্রণ, লবণ এবং বিশুদ্ধ পানির সঙ্গে সমন্বয় করে দিতে হবে।
১৫. ষাঁড় মোটাতাজাকরণে বাকশার গুরুত্ব
বাকশা ঘাস ষাঁড়ের রেশনে সবুজ খাদ্য ও আঁশের উৎস হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু এর পুষ্টিমান ও হজমযোগ্যতার গবেষণা না থাকায় শুধু বাকশার ওপর নির্ভর করে নির্দিষ্ট দৈনিক ওজন বৃদ্ধির দাবি করা যাবে না।
নিরাপদ ব্যবহারের পদ্ধতি
- প্রথমে অল্প পরিমাণ খাওয়াতে হবে;
- ৭–১০ দিনে ধীরে ধীরে পরিমাণ বাড়াতে হবে;
- নরম ও পাতাবহুল অংশ ব্যবহার করতে হবে;
- ঘাস ছোট করে কেটে দিতে হবে;
- পশুর ওজন অনুযায়ী সুষম দানাদার খাদ্য দিতে হবে;
- লবণ ও খনিজ মিশ্রণ রাখতে হবে;
- নিয়মিত ওজন বা বুকের বেড় মাপতে হবে;
- পাতলা পায়খানা, পেট ফাঁপা বা খাদ্য গ্রহণ কমে গেলে ঘাস বন্ধ করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
ষাঁড় মোটাতাজাকরণে বাকশার প্রকৃত কার্যকারিতা জানতে একই বয়স ও ওজনের পশুর ওপর নিয়ন্ত্রিত feeding trial প্রয়োজন।
১৬. বাকশা ঘাস খাওয়ানোর সতর্কতা
বৈজ্ঞানিক পরিচয় ও পুষ্টিমান নিশ্চিত না হওয়ায় বাকশার ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
- অপরিচিত ঘাস হঠাৎ বেশি পরিমাণে দেওয়া যাবে না;
- ফুল, বীজ ও সম্পূর্ণ গাছ দেখে পরিচয় নিশ্চিত করতে হবে;
- রাস্তার পাশ বা দূষিত স্থান থেকে সংগ্রহ করা যাবে না;
- ছত্রাকধরা, পচা বা দুর্গন্ধযুক্ত ঘাস দেওয়া যাবে না;
- অতিরিক্ত ইউরিয়া দেওয়ার পরপরই কাটা উচিত নয়;
- কীটনাশক প্রয়োগের অপেক্ষাকাল শেষ না হলে খাওয়ানো যাবে না;
- গর্ভবতী ও অসুস্থ পশুকে পরীক্ষাহীন ঘাস বেশি দেওয়া উচিত নয়;
- পশুতে অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে সরিয়ে ফেলতে হবে।
১৭. বাকশা ঘাসের সম্ভাবনা ও গবেষণার প্রয়োজন
বাংলাদেশে প্রতি বছর সবুজ পশুখাদ্যের ঘাটতি দেখা দেয়। স্থানীয়ভাবে অভিযোজিত বাকশা ঘাস যদি উচ্চ ফলনশীল, সুস্বাদু, নিরাপদ এবং জলাবদ্ধতা সহিষ্ণু প্রমাণিত হয়, তাহলে এটি গুরুত্বপূর্ণ পশুখাদ্য সম্পদ হতে পারে।
এজন্য প্রয়োজন—
- উদ্ভিদতাত্ত্বিকভাবে প্রজাতি শনাক্ত করা;
- জিনগত বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করা;
- দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ফলন পরীক্ষা;
- কচি ও পরিণত ঘাসের পুষ্টিমান বিশ্লেষণ;
- খরা ও জলাবদ্ধতা সহনশীলতা যাচাই;
- রোগ ও পোকামাকড় শনাক্ত করা;
- ক্ষতিকর বা বিষাক্ত যৌগ পরীক্ষা;
- দুধের গাভীর ওপর feeding trial;
- ষাঁড়ের দৈনিক ওজন বৃদ্ধির পরীক্ষা;
- সংরক্ষণ, হে ও সাইলেজ তৈরির উপযোগিতা যাচাই।
১৮. বাকশা ঘাস সম্পর্কে খামারিদের করণীয়
- বিক্রেতার প্রচারণা শুনে বেশি দামে কাটিং কেনা উচিত নয়;
- কাটিংয়ের উৎস ও মাতৃগাছের পরিচয় জানতে হবে;
- প্রথমে ছোট জমিতে পরীক্ষামূলক চাষ করতে হবে;
- কাটার তারিখ ও ফলনের হিসাব রাখতে হবে;
- কচি ও বয়স্ক ঘাস আলাদাভাবে পরীক্ষাগারে পাঠাতে হবে;
- শুরুতে অল্পসংখ্যক সুস্থ পশুকে সীমিত পরিমাণ দিতে হবে;
- দুধ, খাদ্য গ্রহণ, গোবর ও শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন লিখে রাখতে হবে;
- ফলন ও পুষ্টিমান প্রমাণিত হওয়ার আগে বাণিজ্যিক দাবি করা যাবে না।
খাদ্যঘাসে ওষুধ ব্যবহারের সাধারণ সতর্কতা
দুর্বা ও বাকশা সরাসরি পশুকে খাওয়ানো হয়। তাই এসব ঘাসে প্রয়োগ করা রাসায়নিকের অবশিষ্টাংশ পশুর শরীর, দুধ ও মাংসে প্রবেশ করতে পারে।
অতএব—
- রোগ নির্ণয় ছাড়া ওষুধ প্রয়োগ নয়;
- খাদ্যঘাসে অনুমোদনহীন বালাইনাশক ব্যবহার নয়;
- নির্ধারিত মাত্রার বেশি প্রয়োগ নয়;
- স্প্রের সময় মাস্ক, গ্লাভস ও সুরক্ষা পোশাক ব্যবহার;
- প্রয়োগের তারিখ, ওষুধের নাম ও মাত্রা লিখে রাখা;
- অপেক্ষাকাল শেষ হওয়ার আগে ঘাস কাটা নয়;
- স্প্রে করা ঘাস বিক্রি করলে ক্রেতাকে জানানো;
- প্রয়োজনে কৃষি কর্মকর্তা ও প্রাণিসম্পদ চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ—
অত্যন্ত জরুরি।
গরুকে কতটুকু ঘাস দেওয়া যাবে?
সব গরুর জন্য কাঁচা ঘাসের একই পরিমাণ নির্ধারণ করা যায় না। পশুর ওজন, বয়স, দুধ উৎপাদন, ঘাসের শুষ্ক পদার্থ এবং রেশনের অন্য উপাদান বিবেচনা করতে হবে।
সাধারণভাবে—
- গরুর মোট দৈনিক শুষ্ক খাদ্য গ্রহণ শরীরের ওজনের প্রায় ২–৩% হতে পারে;
- ৩০০–৪০০ কেজি ওজনের গরুকে সম্পূর্ণ রেশনের ধরন অনুযায়ী প্রায় ১৫–২৫ কেজি তাজা ঘাস দেওয়া যেতে পারে;
- উচ্চ দুধের গাভী ও দ্রুত বৃদ্ধির ষাঁড়ের জন্য শুধু ঘাস যথেষ্ট নয়;
- খড় বা হে, দানাদার খাদ্য, প্রোটিন, খনিজ, লবণ ও পানি দিতে হবে;
- বাকশার পুষ্টিমান জানা না থাকলে অল্প পরিমাণ দিয়ে শুরু করতে হবে;
- একজন প্রাণিপুষ্টিবিদ দিয়ে খামারভিত্তিক রেশন তৈরি করা সবচেয়ে নিরাপদ।
পরামর্শ
দুর্বা ঘাসকে শুধু আগাছা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সঠিক জায়গায় এবং সঠিক ব্যবস্থাপনায় এটি চারণ, মাটির ক্ষয়রোধ এবং খামারের সহায়ক সবুজ খাদ্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর আগ্রাসী বিস্তার বিবেচনায় ফসলি জমিতে পরিকল্পনা ছাড়া লাগানো যাবে না।
বাকশা ঘাসের ক্ষেত্রে প্রথম ও প্রধান কাজ হলো বৈজ্ঞানিক পরিচয় নিশ্চিত করা। পরিচয় ও পরীক্ষাগারের পুষ্টিমান না জেনে কোনো ঘাসের প্রোটিন, ফলন, দুধ বৃদ্ধি বা মোটাতাজাকরণের ক্ষমতা নিয়ে অতিরঞ্জিত প্রচারণা খামারিদের আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
দুর্বা ও বাকশা—কোনোটিকেই একমাত্র খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। পরিচ্ছন্ন উৎপাদন, সঠিক বয়সে কাটাই, পরীক্ষাগারভিত্তিক মূল্যায়ন এবং সুষম রেশনের অংশ হিসেবে ব্যবহারই হবে নিরাপদ ও লাভজনক পদ্ধতি।
শেষ কথা
দুর্বা একটি আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ও গবেষিত বহুবর্ষজীবী পশুখাদ্য ঘাস। এটি মাঝারি পুষ্টিমানসম্পন্ন হলেও কচি অবস্থায় গবাদিপশুর জন্য সুস্বাদু ও উপকারী। দুধের গাভী এবং মোটাতাজাকরণের ষাঁড়ের সুষম রেশনে সহায়ক সবুজ খাদ্য হিসেবে এর যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে।
বাকশা ঘাসের স্থানীয় সম্ভাবনা থাকলেও বৈজ্ঞানিক পরিচয়, ফলন, পুষ্টিমান এবং পশুর উৎপাদনের ওপর কার্যকারিতা সম্পর্কে গবেষণার ঘাটতি রয়েছে। তাই একে সম্ভাবনাময় স্থানীয় পশুখাদ্য হিসেবে বিবেচনা করা গেলেও প্রমাণ ছাড়া উচ্চ প্রোটিন বা অসাধারণ ফলনের ঘাস হিসেবে প্রচার করা উচিত নয়।























