২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের কর্মসূচি: প্রায় ৩ কোটি ৫৭ লাখ চারা রোপণ
চারা লাগানোর পাশাপাশি পরিচর্যা, বেঁচে থাকার হার পর্যবেক্ষণ ও তথ্য সংরক্ষণে গুরুত্ব; উপকূলে আরও ২ কোটি চারা রোপণের পরিকল্পনা

ঢাকা, ৭ অক্টোবর ২০২৬: পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সরকারের নেওয়া কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৩ কোটি ৫৭ লাখ চারা রোপণ করা হয়েছে। সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের দিন ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত এই অগ্রগতি হয়েছে। চলতি বছরের প্রায় ৫ কোটি ১৫ লাখ চারা রোপণের পরিকল্পনার বিপরীতে অর্জন ৬৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ।
বুধবার বিকালে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত বৃক্ষরোপণ সেলের পঞ্চম সভায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। সভায় রোপণের অগ্রগতির পাশাপাশি চারার পরিচর্যা, বেঁচে থাকার হার পর্যবেক্ষণ, প্রয়োজনীয় পুনঃরোপণ এবং সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বৃক্ষরোপণ সেলের সভাপতি নজরুল ইসলাম খান সভায় সভাপতিত্ব করেন। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. মো. সাইমুম পারভেজ সভায় উপস্থিত ছিলেন।
বৃক্ষরোপণকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার আহ্বান
সভাপতির বক্তব্যে নজরুল ইসলাম খান বলেন, বৃক্ষরোপণ কেবল একটি কর্মসূচি নয়, এটি একটি সামাজিক আন্দোলন। এই আন্দোলন সফল করতে জনসম্পৃক্ততা আরও বাড়াতে হবে।
তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী পুরস্কার বা সম্মাননা দেওয়ার সঙ্গে গাছের চারাও উপহার দেন এবং সবাইকে বৃক্ষরোপণে উদ্বুদ্ধ করেন। কর্মসূচি সফল করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি সতর্ক করেন, বৃক্ষরোপণে কোনো অনিয়ম ও অনাচার সহ্য করা হবে না।
এলাকাভিত্তিক উপযোগী গাছ নির্বাচন ও নার্সারির সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্ব
পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, প্রাকৃতিক কারণে কিছু চারা মারা যেতে পারে। তাই আগামী চার বছরের পরিকল্পনায় সব মন্ত্রণালয়কে এই বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে।
চারার চাহিদা পূরণে নার্সারির সক্ষমতা বাড়াতে বন অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেন তিনি। একই সঙ্গে কোন জেলায় কোন গাছ উপযোগী এবং তার অর্থনৈতিক মূল্য কতটা, তা বিবেচনা করে বৃক্ষরোপণ করার কথা জানান।
পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, আবহাওয়া ও ভূমিরূপ বিবেচনায় চারা রোপণ করলে বেঁচে থাকার হার বাড়ানো সম্ভব। এই বিবেচনায় আগামী ডিসেম্বর–জানুয়ারিতে উপকূলীয় এলাকায় ২ কোটি কেওড়া চারা রোপণের পরিকল্পনা রয়েছে।
রোপণের পর পরিচর্যা ও পুনঃরোপণের ব্যবস্থা রাখতে হবে
প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. মো. সাইমুম পারভেজ রোপিত চারার পরিচর্যা, সুরক্ষা এবং প্রয়োজনীয় পুনঃরোপণের ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, চারার বেঁচে থাকার হার নিশ্চিত করতে আগামী চার বছরের কর্মপরিকল্পনায় রোপণ-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা ও পর্যবেক্ষণের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। পাশাপাশি রোপণস্থলের তথ্য সংরক্ষণ করতে সব মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেন তিনি।
ছয় দপ্তরের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন
সভায় উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুত অগ্রগতি প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্ধারিত ছকে তথ্য প্রদানকারী ১১টি দপ্তরের মাধ্যমে প্রায় ৩ কোটি ৪ লাখ চারা রোপণ করা হয়েছে। অন্যান্য সংস্থার মাধ্যমে রোপণ করা হয়েছে প্রায় ৫২ লাখ ৯৩ হাজার চারা। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব উদ্যোগে রোপণ করা চারার তথ্যও সংগ্রহ করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ছয়টি দপ্তর ইতোমধ্যে নিজ নিজ বৃক্ষরোপণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে। ডিসেম্বর–জানুয়ারিতে উপকূলীয় অঞ্চলে বন অধিদপ্তরের আরও ২ কোটি ম্যানগ্রোভ চারা রোপণের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সামগ্রিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে।
কর্মসূচির অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার কাছ থেকে প্রতি ১৫ দিন অন্তর নির্ধারিত ছকে তথ্য সংগ্রহ অব্যাহত রাখার কথা বলা হয়। সরকারি দপ্তরের পাশাপাশি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্প সংগঠনের বৃক্ষরোপণের তথ্য একই কাঠামোয় সংগ্রহ করে সমন্বিত হিসাব প্রস্তুতের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরা হয়।
শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করতে ‘এক শিশু, এক গাছ’ উদ্যোগ
সভায় শিক্ষার্থীদের বৃক্ষরোপণে সম্পৃক্ত করতে ‘One Tree One Child’ বা ‘এক শিশু, এক গাছ’ উদ্যোগের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়।
পাঁচ বছরের পরিকল্পনায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের ৬ কোটি ১৫ লাখ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৫ কোটি ৪ লাখ এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের ২ কোটি ১৫ লাখ চারা রোপণের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।
তথ্যভান্ডার ও অ্যাপের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে পর্যবেক্ষণের পরিকল্পনা
বৃক্ষরোপণের তথ্য সংরক্ষণ ও মাঠপর্যায়ে পর্যবেক্ষণের জন্য ‘ট্রি মনিটরিং অ্যাপ’, কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার এবং ড্যাশবোর্ড তৈরির অগ্রগতি নিয়েও সভায় আলোচনা হয়।
এ বিষয়ে উপকমিটির সুপারিশ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণে কর্মশালা আয়োজন, তথ্য সংগ্রহের অভিন্ন কাঠামো নির্ধারণ এবং কারিগরি বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় সম্ভাব্যতা ও ব্যয় যাচাইয়ের বিষয়গুলো আলোচনায় আসে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নূরুল ইসলাম অনলাইনে সভায় যুক্ত হন। সেলের সদস্য ও কারিগরি বিশেষজ্ঞ জামাইল বশীর জেবিও মতামত তুলে ধরেন। তাঁরা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব সম্প্রসারণ, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সামাজিক দায়বদ্ধতা কার্যক্রমের আওতায় অংশগ্রহণ এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন।
সভায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানম, ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. এমদাদুল হক চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।





















