সিসামুক্ত বাংলাদেশ গড়তে কার্যকর পদক্ষেপের তাগিদ পরিবেশমন্ত্রীর।।
শিশু ও শ্রমিকদের সুরক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান; ব্যবহৃত ব্যাটারি ব্যবস্থাপনায় উৎপাদকের দায় নির্ধারণের কাজ চলছে।।
ড. বায়েজিদ মোড়ল | সম্পাদক, AgricultureNews24.com

ঢাকা, ১৪ অক্টোবর ২০২৬: সিসামুক্ত বাংলাদেশ গড়তে জাতীয় কৌশল অনুমোদনের পর এবার তার কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু। শিশুদের সুস্থ বিকাশ, শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বুধবার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে সিসা দূষণ প্রতিরোধবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের সেমিনারে উপস্থিত থেকে মন্ত্রীর বক্তব্য ও উপস্থাপিত উদ্যোগগুলো পর্যবেক্ষণ করি। আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পায় জাতীয় কর্মপরিকল্পনার বাস্তবায়ন, দূষণ শনাক্ত করার সক্ষমতা বৃদ্ধি, ব্যবহৃত ব্যাটারির নিরাপদ সংগ্রহ ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ এবং তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ।
আন্তর্জাতিক সিসা বিষক্রিয়া প্রতিরোধ সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে ‘সিসামুক্ত বাংলাদেশের পথে অগ্রযাত্রা: সমাধানের সম্প্রসারণ ও তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ’ শীর্ষক এ সেমিনারের আয়োজন করে পিওর আর্থ বাংলাদেশ। আয়োজনে সহযোগিতা করে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিবেশমন্ত্রী বলেন, সিসা দূষণমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সরকার বদ্ধপরিকর। এ লক্ষ্য অর্জনে সরকার অনুমোদিত ‘সিসামুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণে জাতীয় কৌশল ও বহুবর্ষমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা ২০২৬–২০৩৫’ বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয়, সরকারি সংস্থা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী ও অন্য অংশীজনদের সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
অনুমোদিত কৌশলকে মাঠপর্যায়ের কাজে রূপ দেওয়ার তাগিদ
মন্ত্রী জানান, গত ১৭ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতীয় কৌশল ও বহুবর্ষমেয়াদি কর্মপরিকল্পনাটি অনুমোদন করা হয়।
এতে সিসা দূষণের উৎস শনাক্ত করা, পরিবেশগত নজরদারি বাড়ানো, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা উন্নয়ন এবং আইন ও বিধিবিধান শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শিল্প খাতের দায়িত্বশীল অংশগ্রহণ, জনসচেতনতা, গবেষণা ও আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
পরিবেশমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উঠে আসে—অনুমোদিত কৌশলের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে বাস্তবায়নের প্রস্তুতিও সুনির্দিষ্ট হতে হবে। প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বৃদ্ধি, দূষিত এলাকার পুনর্বাসন, নিরাপদ শিল্পব্যবস্থাপনা এবং নিয়মিত পরিবেশগত পর্যবেক্ষণ জোরদারের কথা বলেন তিনি।
জাতীয় কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দিতে উন্নয়ন সহযোগী, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বেসরকারি খাতের প্রতি আহ্বান জানান মন্ত্রী।
ব্যবহৃত ব্যাটারির দায়িত্ব নিতে হবে সংশ্লিষ্ট শিল্পকে
সেমিনারের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান পায় সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারির পরিবেশসম্মত ব্যবস্থাপনা। ব্যাটারি ব্যবহারের পর কীভাবে সংগ্রহ করা হবে এবং কোথায় নিরাপদে পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা হবে—এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন পরিবেশমন্ত্রী।
তিনি জানান, এ জন্য সম্প্রসারিত উৎপাদক দায়বদ্ধতা বা ইপিআর কাঠামো প্রণয়নের কাজ চলছে। এ কাঠামোর মাধ্যমে ব্যাটারি উৎপাদক, আমদানিকারকসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দায়িত্ব নির্ধারণ এবং ব্যবহৃত ব্যাটারির নিরাপদ সংগ্রহ ও পরিবেশসম্মত পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
মন্ত্রী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রচলিত পরিবেশ আইন ও বিধিবিধান মেনে চলার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে শ্রমিক এবং শিল্প এলাকার স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার ওপর গুরুত্ব দেন।
তরুণদের উদ্যোগকে বাস্তব সমাধানে রূপ দেওয়ার আহ্বান
সিসা দূষণ প্রতিরোধে তরুণদের অংশগ্রহণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় অনুষ্ঠানে। পরিবেশমন্ত্রী বলেন, জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও স্থানীয় পর্যায়ে উদ্ভাবনী সমাধান বাস্তবায়নে তরুণ সমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তরুণদের সৃজনশীল উদ্যোগকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি কারিগরি সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনি। বাস্তবায়নযোগ্য উদ্যোগগুলো এগিয়ে নিতে সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতার আহ্বান জানান।
সেমিনারে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয় ‘সিসামুক্ত বাংলাদেশের জন্য জাতীয় যুব জোট’। সিসা দূষণ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি এবং স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর সমাধান উদ্ভাবনের লক্ষ্যে আয়োজিত চিত্রাঙ্কন ও উদ্ভাবনী উদ্যোগ প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের পুরস্কৃত করা হয়।
ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির শিক্ষার্থী শেখ সাজিদুল ইসলাম ব্যবহৃত ব্যাটারির নিরাপদ সংগ্রহ ও ফেরতব্যবস্থা নিয়ে একটি উদ্ভাবনী উদ্যোগ উপস্থাপন করেন। এ উপস্থাপনায় ব্যাটারি ব্যবহারের পর নিরাপদ ব্যবস্থাপনায় ফিরিয়ে আনার বিষয়টি সামনে আসে।
দূষণ শনাক্তে পরিবেশ অধিদপ্তর পেল দুটি বিশ্লেষণযন্ত্র
অনুষ্ঠানে পরিবেশ অধিদপ্তরের সিসা দূষণ শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়াতে দুটি বহনযোগ্য এক্স-রে ফ্লুরোসেন্স বা এক্সআরএফ বিশ্লেষণযন্ত্র হস্তান্তর করা হয়।
জাতীয় কর্মপরিকল্পনায় দূষণের উৎস শনাক্তকরণ ও পরিবেশগত নজরদারির যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, সেই কাজের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে যন্ত্র দুটি হস্তান্তর করা হয়। মন্ত্রীর বক্তব্যেও পরীক্ষাগার ও পর্যবেক্ষণব্যবস্থা শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে।
খুলনার লবণচরার অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিওর আর্থ বাংলাদেশের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার আফতাব উজ জামান খান। তিনি জাতীয় কৌশল বাস্তবায়ন, পিওর আর্থের কার্যক্রম এবং খুলনার লবণচরা এলাকায় সিসা দূষণ প্রতিকার কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
এই উপস্থাপনায় জাতীয় পর্যায়ের পরিকল্পনার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে দূষণ প্রতিকারের কাজও আলোচনায় আসে। দূষণের উৎস চিহ্নিত করা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং প্রতিকার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতার যোগসূত্র তুলে ধরা হয়।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ নাভিদ শফিউল্লাহর সভাপতিত্বে সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. কাজী আহমেদ জাকী এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ সোলায়মান হায়দার। স্বাগত বক্তব্য দেন পিওর আর্থ বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মিতালী দাস।
অনুষ্ঠানে মন্ত্রণালয় ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, উন্নয়ন সহযোগী, গবেষক, পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, তরুণ প্রতিনিধি এবং গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
সেমিনারের আলোচনায় সিসামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে অর্থায়ন, নজরদারি, শিল্পের দায়িত্ব এবং তরুণদের উদ্যোগকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে। এখন এসব উদ্যোগকে ধারাবাহিক কাজে রূপ দেওয়ার ওপরই নির্ভর করবে জাতীয় কর্মপরিকল্পনার লক্ষ্য অর্জন।























