ফরমালিন অপব্যবহারের ইতিহাস খুব বেশি দিনের নয়
– ড. বায়েজিদ মোড়ল

২০০৬ সালের অক্টোবর মাসে আমি বাংলাভিশন টিভি চ্যানেলে চাকরি করা কালীন কৃষি পণ্যের উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত যে সব হাত বদল হয়, আর দামের তারতম্য ঘটে, তার উপর রিপোর্ট করতে গিয়েছিলাম ময়মনসিংহ। তখন রাতের বেলা ময়মনসিংহের পুকুরে জাল ফেলে মাছ ধরে, সেই মাছ ট্রাকে করে ঢাকার কাওরান বাজারে নিয়ে আসার পথে, যে সব হাতে দামের তারতম্য হচ্ছিল, তার উপর রিপোর্ট করতে ছিলাম। তখন মাছ সংরক্ষনে ফরমালিনের ব্যবহার কাওরান বাজারে এসে পাই। আমি বাংলাভিশনের শ্যামল বাংলা অনুষ্ঠানে ৩০ অক্টোবর ২০০৬ তারিখে একটি পজেটিভ রিপোর্ট প্রচার করেছিলাম। মাছ সংরক্ষনে প্রচুর বরফ দরকার হয় কিন্তু ফরমালিন ব্যবহার করলে সাশ্রয় হয়। এক ট্রাক বরফ দিয়ে, যে পরিমান মাছ সংরক্ষন করা যায়। ঐ পরিমান মাছ সংরক্ষন করতে, ২০০ টাকার এক কেজি ফরমালিনই যথেষ্ঠ। আমার এই প্রতিবেদন প্রচারের পর, ঢাকা সিটি কলেজের একজন শিক্ষক আমাকে ফোন করে, ফরমালিন ব্যবহারের উপর কিছু কথা বললেন। আমি ও আমার সহযোগী জাহিদুল কবির ফরমালিনের উপর তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করতে লাগলাম। তখন কোথাও কোন তথ্য খুজে পাই না। পত্র পত্রিকা এমনকি বই পুস্তকেও খুজে পাচ্ছিলাম না। সিটি কলেজের ঐ শিক্ষকের কথার উপর ভিত্তি করে ২৪ নভেম্বর ২০০৬ তারিখে মাছ সংরক্ষনে ফরমালিন ব্যবহার উচিত নয়, এমন একটি রিপোর্ট প্রচার করলাম। এরপর দুটি মানুষ আমি আর জাহিদুল কবির সরকারী বে-সরকারী বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরতে লাগলাম। কেউ কোন তথ্য দিতে পারে না। ঢাকার বিভিন্ন বাজারের ক্রেতা-বিক্রেতাদের সাথে কথা বলে, কিছু কিছু প্রতিক্রিয় পেতে লাগলাম। ছোট ছোট রিপোর্টগুলো আমাদের সাহস বৃদ্ধি করে দিল। তখনকার বাংলাভিশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব মুস্তাফিজুর রহমান ( বর্তমানে জিটিভির প্রধান উপদেষ্টা ) ফরমালিন নিয়ে আমার কথাশুনে আমাকে উৎসাহ দিলেন, আর বললেন তিনি আমার সাথে আছেন।
ছোট্ট একটা গল্প ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে সতেজ দেখে ৮০০গ্রাম ওজনের একটি সিলবারকার্প মাছ কিনি। মাছটির আঁশ ছড়ানোর পর, টুকরা করতে গেলে, কাঁটা আর মাছ আলাদা হয়ে যায়। কিন্তু মাছ পচা গন্ধ থাকে না। মাছটি রান্না করা হলে, কাঁটা আলাদা, মাছ আলাদা দেখে ফেলে দিই। তখন বুঝিনি মাছে কি ব্যবহার করা হয়েছিল।

একদিন কথা প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত আমার শালাবাবু শরিফুল ইসলাম রতন (বর্তমানে গাজীপুরের নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট) আমাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসী অনুষদে নিয়ে গেল। তখন প্রফেসর আ ব ম ফারুক স্যার আমাকে গবেষনায় সাহায্য করবেন বলে কথা দিলেন। এরপর তিনিও তথ্য সংগ্রহ করতে থাকেন। আমি ঢাকার বিভিন্ন বাজারে মাছে ফরমালিন ব্যবহারের শারীরিক ঝুকির উপর তথ্য সংগ্রহ করতে লাগলাম ও প্রচার করতে থাকলাম। আমার সহযোগী জাহিদুল কবির আমাকে জানায়, চলেন ঢাকার বিভিন্ন বাজার থেকে মাছ সংগ্রহ করি। তাই হাতিরপুল, নিউমার্কেট, টাউন হল মার্কেট ও কৃষি মার্কেট থেকে ১১ ধরনের মাচের স্যাম্পল সংগ্রহ করে দিই। ৮টি স্যাম্পলে ফরমালিন পায়। সবচেয়ে বেশি মাত্রায় ফরমালিন পাই কাস্কি মাছে। এরপর ঢাকার মাছ বাজারের বিক্রেতাদের দাবী ওঠে মাছে ফরমালিন দিয়ে সংরক্ষন করে দেয় ভারত ও মায়ানমার। তখন ভারত ও মায়ানমার থেকে বড় বড় রুই, কাতাল ও মৃগেল মাছ আমদানী হতো, দেশী মাছের চেয়ে ঐ মাছের দাম কম ছিল।
আমি শ্যামল বাংলা অনুষ্ঠানের টিম নিয়ে চলে যাই টেকনাফ। বন্দরে মাছ খালাস হওয়ার সময়, মায়ানমারের বোট থেকে একটি রুই, একটি কাতল ও একটি মৃগেল মাছ বালতিতে বরফ দিয়ে সংরক্ষন করে নিয়ে আসি ঢাকায়। পাশাপাশী ঐ মায়নমারের মাছ বহনকারী গাড়িটিকে ফলো করে আসি, ফেনি এসে আমাদের গাড়ীর অকটেন পুরিয়ে গেলে, ঐ গাড়ীটিকে হারিয়ে ফেলি। ঐ মাছ এনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসী অনুষদে পরীক্ষার জন্য দিই। তখন প্রফেসর আ ব ম ফারুক, প্রফেসর ড. আবু সারা শামছুর রউফ ও প্রাণরাসায়ন ও অনুপ্রান বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. আফতাব উদ্দিন এর যৌথ পরীক্ষা নিরিক্ষার পর ঐ মাছের স্যাম্পেলে ফরমালিনের উপস্থিতি পায় না। তবে অতিমাত্রায় ক্লোরিন ব্যবহারের কথা জানায়। এই প্রতিবেদনটি প্রচার করি ২৬ জানুয়ারী ২০০৭ সালে।
আমি এর উপর লেখা তৈরী করে অধিকাংশ জাতীয় দৈনিক পত্রিকা অফিসে দিই। কেবলমাত্র যুগান্তর পত্রিকা তখন রিপোর্টের কিছু অংশ ছাপায়।এই সময় তারকাখ্যাত ম্যাজিস্ট্রেট রোকন-উদ-দৌলা বাংলাভিশনে আসেন। তখন তার সাথে কথা বলি। তিনি আমাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষনা রিপোর্ট দেখতে চাইলেন, আমি তাকে দিলাম। তার কমেন্ট নিয়ে আরো একটি রিপোর্ট প্রচার করি ৯ ফেব্রুয়ারী ২০০৭ তারিখে। তখনকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কৃষি ও মৎস্য উপদেষ্ঠা ড. সি এস করিম সাহেবের সহযোগিতায় থাইল্যান্ড থেকে ফরমালিন সনাক্তকরন কীট নিয়ে এলেন। ২০ ফেব্রুয়ারী ২০০৭ তারিখে রায়সাহেব বাজার ও ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০০৭ তারিখে সোয়ারীঘাটে ভ্রাম্যমান আদালত প্রায় ২০০ মণ মাছ আটক করে ডাম্পিং করে দেয়। আমি ০২ মার্চ ২০০৭ তারিখে বাংলাভিশনের শ্যামল বাংলা অনুষ্ঠানে ২৫ মিনিটের একটি রিপোর্ট প্রচার করি। এই রিপোর্টের শতাধিক সিডিকপি তখন মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন জায়গায় দিতে হয়। তখন ফার্মেসী অনুষদের প্রফেসর আ ব ম ফারুক, প্রফেসর ড. আবু সারা শামছুর রউফ ও প্রাণরাসায়ন ও অনুপ্রান বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. আফতাব উদ্দিন তারা এই স্যাম্পল পরীক্ষা নিরিক্ষা করার জন্য কোন টাকা আমার কাছ থেকে নেয় না। এরপর বিভিন্ন টিভি চ্যানেল ও পত্র-পত্রিকায় প্রফেসর আ ব ম ফারুক ও প্রফেসর ড. আবু সারা শামছুর রউফ সাক্ষাতকার দিতে থাকেন। এর মধ্যে ড. রউফ সাহেবের পরামর্শে ঢাকার বিভিন্ন বাজার থেকে আঙ্গুর আপেল ন্যাশপতি বেদানা খুরমা-খেজুরসহ বেশ কয়েক ধরনের ফলের উপর ফরমালিন পরীক্ষা হয়। তখন আঙ্গুর ও আপেলে অতিমাত্রায় ফরমালিন ব্যবহার হয়েছে জানা যায়। এই সময় চিকিৎসক ও গবেষকরা মানুষের শরীরের সকল মরণঘাতক রোগগুলো যেমন ব্রেইন ক্যান্সর, রক্তে ক্যান্সর, লিভার ক্যান্সার, অন্ধত্ব, বন্ধাত্বতা, প্রোস্টেট, ডিজ অর্ডার ও কিডনি ড্যামেজের মতো মত সব জটিল রোগের কথা বলা হলো।
এই সময় দেশের সকল স্তরের মানুষের মুখে মুখে উঠে আসে ফরমালিন। আমার সহকর্মী ও বন্ধুরাতো আমাকে ফরমালিন মোড়ল নামে ডাকা শুরু করলো। এরপর গবেষনা শুরু করলাম কি করলে ফরমালিন দেওয়া থাকলেও সেই পন্য খাওয়া যাবে। ফার্মেসী অনুষদের প্রফেসর ড. আবু সারা শামছুর রউফ গবেষনা করে বের করলেন কোন পন্যে ফরমালিন সন্দেহ হলে ২% লবন পানিতে অথবা ভেনেগার দিয়ে ১০ মিনিট ভিজিয়ে রেখে পরে ভাল ভাবে ধুয়ে রান্না করে খাওয়া যাবে। ফার্মেসী অনুষদের প্রফেসর ড. আবু সারা শামছুর রউফ আরো পরীক্ষা নিরিক্ষা করে আমাকে জানালেন যে, যে জিনিসের মধ্যে রক্ত, আমিষ ও প্রোটিন থাকবে, কেবল সেখানেই ফরমালিন বিকৃয়া ঘটায়। যদি মাছ মাংশ ও দুধে যদি ফরমালিন দেওয়া হয়, তাহলে সেটা মানুষের জন্য খাওয়ার উপযোগী থাকবে না। ফল ও শাক-সবজিতে ফরমালিন দিলে সেটা ২% লবন পানিতে অথবা ভেনেগার দিয়ে ১০ মিনিট ভিজিয়ে রেখে রান্না করে খাওয়া যাবে।
আর আম কলা লিচু আঙ্গুর আপেল বেদানায় ফরমালিন পানিতে চুবিয়ে রাখলে ফলের স্বাভাবিক রং নষ্ট হয়ে যাবে। নিদৃষ্ট মাত্রায় ফরমালিন মিশৃত পানিতে চুবিয়ে রাখলে ফল কয়েক বছর সংরক্ষন করা যায়। তবে মিশ্রন থেকে ফল বের করে রেখে দিলে, ২/৩দিনের মধ্যে পচে নষ্ট হয়ে যাবে।
এখানে একটা কথাই বলবো, ফরমালিন দিয়ে আম সংরক্ষন করা যায় না। আম পাকানোও যায় না। ফরমালিন মিশ্রনে আম ডুবালে সতেজ রং নষ্ট হয়ে যায়। আমের ভিতরে ফরমালিন বিকৃয়া ঘটাতে ভিতরে যায় না।
এরপর বাসায় ফরমালীর পরীক্ষার জন্য বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষনা পরিষদ বা বিসিএসআরআই এর খাদ্য-বিজ্ঞান প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট গবেষনা করে একটি স্বল্প খরচের কীট উদ্ভাবন করে ২০০৭ সালে।

২০১২ সালে এসে এফবিসিসিআই ঢাকার বিভিন্ন বাজারকে ফরমালিন ফ্রি বাজার ঘোষনা করে, কিছু কীট এনে বাজারে দেয় পরীক্ষার জন্য। এর কিছু দিন পর ঐ বছরই বাংলাদেশ কৃষি গবেষনা কাউন্সিলের একজন পরিচালক ড. মনিরুল ইসলাম গবেষনা করে প্রমান দিলেন ফরমালিন ২% লবন পানিতে নষ্ট হয়ে যায়। এমনকি ফরমালিন খোলা জায়গায় রাখলে বাতাসে মিলে যায়। ফরমালিন মিশ্রনে কোন বস্তু চুবিয়ে উঠায়ে ২/৩বার পানিতে ধুয়ে নিলেও ফরমালিন চলে যায় ( তবে এখানে সন্দেহ থাকে) কিন্তু ২% লবন পানিতে কোন সন্দে থাকেনা। তিনি এই বিষয়ে একটি ছোট্ট বইও প্রকাশ করেন। তার কথার পিছনে কিছু যুক্তি থাকে, যারা বিজ্ঞান গবেষনায় কাজ করেন, দেখা গেছে ৩০ বছর চাকরি জীবন শেষ করেছেন, সারা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ যাদের (ব্রেইন ক্যান্সর, রক্তে ক্যান্সর, লিভার ক্যান্সার, অন্ধত্ব, বন্ধাত্বতা, প্রোস্টেট, ডিজ অর্ডার ও কিডনি ড্যামেজের মতো) এই ধরনের রোগ ঐভাবে দেখা দেই নি। তিনি বেশি করে জোর দেন মেয়েদের লিপিস্টিক ব্যবহারে অনেক ধরনের রোগ হতে পারে, নেইল পলিশ ও বিভিন্ন ধরনের প্রসাধনীর মধ্যে অনেক ধরনের খারাপ ক্যামিকেল থাকে, যা মানব দেহের জন্য মারাত্নক ক্ষতিকর। তিনি আরো জোর দেন, ফরমালিন থেকে তৈরী হয় ফরমিকা। আর ফরমিকা দিয়ে তৈরী আমাদের আসবাবপত্রগুলো, আমাদের বসবাসের কক্ষগুলো ভেন্টিলেটার বিহীন হওয়ায়, বাইরের বাতাস ভিতরে আসা ও ভিতরের বাতাস বাইরে বের হতে না পারায়, মানবদেহ অনেক ধরনের রোগে আক্রান্ত হয়।
ফরমালিন নিয়ে এতো প্রচার প্রচারনা হলো। কথায় কথায় আমরা ফরমালিন বলি। রাজনীতিতে ফরমালিন, দুর্নীতিতে ফরমালিন, সন্ত্রাসে ফরমালিন, ঘুষ বানিজ্যে ফরমালিন, দলীয়করণে ফরমালিন, খুন-খারাবীতে ফরমালিন, মিথ্যাচারে ফরমালিন, সড়ক দুর্ঘটনায় ফরমালিন, অন্যায়-অবিচারে ফরমালিন এবং অপকর্মেও ফরমালিন।
কিন্তু সত্যিকারের ফরমালিনের উপর ঐধরনের কোন গবেষনা হলো না যে, ফরমালিন যে কোন উপায়ে মানব দেহে প্রবেশ করলে সত্যিকারে কি ধরনের রোগ ব্যাধি হতে পারে। কি কি হতে পারে।
প্রফেসর আ ব ম ফারুক স্যার মিডিয়াতে প্রথম যে কথাগুলো বলেছিলেন, কেবলমাত্র সেই কথাগুলোই প্রচলতি আছে। এর উপর গবেষনা করে, এর বাইরে আর কোন নতুন কথা, কেউ বলতে পারছে না। এমনকি ফারুক স্যারও ২০১২ সালের পর আর গবেষনা করছেন না, করলেতো নতুন আরো কিছু কথা বলতেন। ২০০৭ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত কৃষি ও মৎস্য মন্ত্রণালয় থেকে ফরমালিন অপব্যবহারের উপর বেশ সজাগ দৃষ্টি রাখেন। ফরমালিন ক্রয়-বিক্রয়ের উপর নীতিমালা আছে। বেশ কড়া নিয়ম।
যে কোন পণ্যের ক্যামিকেল নির্ণয়ের জন্য বাংলাদেশেই অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠানের ল্যাবরেটরি আছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষনা পরিষদ বা বিসিএসআরআই এ এলসিএমএসএমএসসিস্টেম মেশিন আছে যেখানে এক বিলিয়ন ভাগের এক ভাগ পর্যন্ত এনজাইম নির্ণয় করা যায়। এই ধরনের মেশিন বা এর চেয়ে আরো বেশি ক্ষমতা সম্পন্ন মেশিন আছে এস জি এস এ। এসজিএস বাংলাদেশের গার্মেন্টস পন্য পরীক্ষা নিরিক্ষা করে রিজাল্ট দিয়ে দেয়, সারা বিশ্বের কোথায়ও এই রিপোর্টের দ্বিমত পোষন করেনা।
২০০৭ সালের আগষ্ট মাসে আমার ওস্তাদ জনাব শাইখ সিরাজ তার হৃদয়ে মাটি ও মানুষ অনুষ্ঠানে ও নিউজের মধ্যে মুড়ি ভাজায় ইউরিয়া সার ব্যবহারের উপর প্রতিবেদন প্রচার করেন। তখন সারা দেশে হৈ চৈ পড়ে যায়। মেশিনে ভাজা মুড়ির বিপক্ষে সবাই কথা বলেছিল।
২০০৭ সালে ৯ সেপ্টেম্বর এ আমিও মাঠে নামি। এই মুড়ি ভাজার উপর ধারাবাহিক রিপোর্ট তৈরী করে বুঝাতে সক্ষম হই, মুড়ি ভাজতে ইউরিয়া ব্যবহার করলে, এতে মুড়িপ্রস্তুতকারকের কোন লাভ হয় না। মুড়ি বেশি ফোলে না, ওজন বৃদ্ধি হয় না। মুড়ি বেশি সাদাও হয় না। শুধু শুধু বাড়তি খরচ। তখন বিভিন্ন বাজার থেকে স্যাম্পল সংগ্রহ করে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষনা পরিষদ বা বিসিএসআরআই এ পরীক্ষা-নিরিক্ষা করার জন্য দিয়েছিলাম। তারা নিরিক্ষা করে দিয়েছিল মেশিনে ভাজা মুড়িতে কোন ইউরিয়া নেই। এখন কিন্তু মুড়িতে ইউরিয়া বিষয়টি নিয়ে মানুষ সচেতন হয়েছে।
আমাদের আম আর কলায় কার্বাইড ও ইথেফোন ব্যবহার করে পাকানো নিয়ে কয়েক বছর পরপর হৈ চৈ পড়ে।
পাকা টমেটো, আম, কলা পেঁপে ও আনারসের মতো উপাদেয় বিভিন্ন ফল কৃত্রিম উপায়ে পাকানোর জন্য ব্যবহৃত একটি রাসায়নিক দ্রব্যের নাম ক্যালিসিয়াম কার্বাইড। ইথ্রেল (ethrel বা ইথেফোন (ethephon) ব্যবহার করে কৃত্রিম উপায়ে ফল পাকানো যায়। ইথ্রেল বা ইথেফোন ক্যালসিয়াম কার্বাইডের মতো ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক উপাদান নয়। কারন ক্যালিসিয়াম কার্বাইডের সঙ্গে স্বাস্থ্য ও জীবনের জন্য বিপজ্জনক। অল্প পরিমানে দুটো বিষাক্ত উপাদানের মিশ্রণ থাকে। উপাদানগুলো হলো আর্সেনিক ও ফসফরাস। ভুল পদ্ধতিতে উচ্চমাত্রায় ক্যালসিয়াম কার্বাইড ব্যবহার করা হলে ফলে আর্সেনিক ও ফসফরাস দ্বারা দুষিত হয়ে পড়তে পারে। উচ্চমাত্রায় আর্সেনিক আমাদের শরীরে প্রবেশ করলে, স্বাস্থ্যহানী ও জীবন বিপন্ন হতে পারে। উচ্চ মাত্রায় কার্বাইড দিলে ৬ ঘন্টায় ফলের রং আসে এটা শরীরের জন্য খুবই ক্ষতিকর। মাত্রা একটু কমালে ১২ ঘন্টায় রং চলে আসে এটাও শরীরের জন্য ক্ষতিকর, আরো মাত্রা কমালে ২৪ ঘন্টায় রং চলে আসে। এই ধরনের ফল খেলে বমি বদ হজমসহ পেটের পীড়া হয়। মাত্রা কমিয়ে ১০ টন ফল পাকাতে এক কেজি ব্যবহার করা হলে। ফল পাকতে দুই দিন লাগে। এইটাই উত্তম পদ্ধতি। শরীরের জন্য ঝুকিপূর্ণ নয়। সারা বিশ্বে স্বীকৃত পদ্ধতি এটি।

OLYMPUS DIGITAL CAMERA
প্রাকৃতিক উপায়ে ফল পাকার পিছনে যে রাসায়নিক উপাদানটি মূল ভূমিকা পালন করে থাকে তার নাম ইথাইলিন। ইথাইলিন গাছ বা ফলে উৎপাদিত ছোট আকৃতির একটি রাসায়নিক যৌগ। ফল যখন পরিপক্ক হয়, তখন ফলে ইথাইলিনের উৎপাদনের পরিমান থাকে সর্বোচ্চ মাত্রায়। ইথাইলিন ফল এ বিভিন্ন জিনকে উদ্দীপিত করার ফলে, তৈরী হয় নানা ধরনের প্রয়োজনীয় সংখ্যক এনজাইম এবং পেকটিনেজ। কাঁচা ফলের মধ্যে থাকে স্বাদহীন দীর্ঘ আকৃতির শর্করা, যাকে আমরা বলি স্টার্চ। এমাইলেজ স্টার্চকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে সুক্রোজ – ফ্রুকটোজের মতো ছোট আকৃতির যৌগে রূপান্তিরিত করে দেয়। এই বিক্রিয়ার ফলে আঠাতুল্য গুণাবলীকে কমিয়ে ফলকে মিষ্টি ও রসালো করে তোলে। অন্যদিকে পেক্টনিজে ফলের শক্ত খোসা বা আবারণ পেকটিনকে ভেঙ্গে দিয়ে, তাকে নরম করে ফেলে। অন্য আরেক ধরনের এনজাইম ফলে সবুজ ক্লোরোফিলকে রাসায়নিক রূপান্তরের মাধ্যমে কেরোটিনয়েডের মতো রঙিন উপাদান সৃষ্টি করে বলে, পাকা ফল লাল বা হলুদ বর্ণ ধারন করে। বিভিন্ন এনজাইমের রাসায়নিক কর্মকান্ডের ফলে বিভিন্ন রঞ্জকপদার্থের সৃষ্টি হয় বলে পাকা ফল বিভিন্ন রং ধারন করে। অন্য একটি এনজাইম ফল এ বিদ্যমান এসিডকে ভেঙে দিয়ে তার অম্লত্বকে নিরপেক্ষ করে দেয় বলে, কাঁচা ফল পাকলে আর টক থাকে না। ফলে বৃহদাকৃতির যৌগগুলো ভেঙে ছোট ছোট উদ্বায়ী যৌগে রূপান্তরিত হয় বলে, আমরা ফলের নানা সুগন্ধ পাই।
গাছে সব ফল এক সঙ্গে পাকে না। ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফার লোভে, অল্প সময়ের মধ্যে সব ফল বিক্রি করার উদ্দেশ্যে পরিপক্ক-অপিরপক্ব সব ধরনের ফল পেড়ে নিয়ে এক সঙ্গে কৃত্রিম উপায়ে পাকানোর পন্থা গ্রহন করে। অপরিপক্ব ফল কৃত্রিম উপায়ে পাকানো হলে প্রকৃত স্বাদ পাওয়া যায় না। ফল পাকানোর জন্য ক্যালসিয়াম কার্বাইড ব্যবহার করা হলেও মূলত ফলের ওপর কার্বাইডের কোনো প্রত্যক্ষ ভুমিকা থাকে না। ফল পাকানোর জন্য যে রাসায়নিক যৌগটি প্রত্যক্ষভাবে কাজ করে তার নাম অ্যাসিটাইলিন গ্যাস যা ইথাইলিনের মতো অনুরুপ একটি সমগোত্রিয় রাসায়নিক দ্রব্য। ক্যালসিয়াম কার্বাইড পানি বা জলীয় বাষ্পের সঙ্গে বিক্রিয়া করে ক্যালসিয়াম হাইড্রোক্সাইড এবং অ্যাসিটাইলিন গ্যাস উৎপন্ন করে। ফল পাকানোর ক্ষেত্রে অ্যাসিটিইলিনের ভুমিকা ঠিক ইথাইলিনের মতো। কার্বাইড মিশ্রিত পানি স্তুপ করা ফল এর ওপর ছিটিয়ে দিয়ে পাতা বা খড় দিয়ে ঢেকে রেখে অল্প সময়ে ফল পাকিয়ে ফেলে। একটি প্যাকেটে কার্বাইড পুরে একটি বদ্ধঘরে জমিয়ে রাখা ফলের স্তুপের পাশে রেখে দিলে ফল থেকে জলীয়বাষ্প ক্যালসিয়াম কার্বাইডের সঙ্গে বিক্রিয়া করে পর্যাপ্ত পরিমানে অ্যাসিটাইলিন উৎপন্ন করবে যা ফল পাকাতে সাহায্য করে।
প্রকৃত সত্য হলো ফল বা টমেটো পাকানোর জন্য মাত্রাতিরিক্ত ইথেফোনের প্রয়োজন হয় না। ভারতে ফল ও টমেটো পাকানোর জন্য ইথেফোন ও ইথেল ব্যবহারের অনুমতি প্রদান করা হয়েছে। কারন ইথেফোন ও ইথেল ক্যালসিয়াম কার্বাইডের মতো অত ঝুকিপূর্ণ নয়।
আমরা জানি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কৃত্রিম উপায়ে ফল পাকানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশেও কৃত্রিম উপায়ে ফল পাকানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রে কাঁচা সবুজ রঙের কলা আমদানী করে ইথাইলিন গ্যাস স্প্রে করে ২৪ ঘন্টার পর থেকে কলার খোষা হলুদ হতে শুরু করে ৩৬ ঘন্টায় কলার খোসা পুরোটাই হলুদ হয়ে যায়। এই কলা ৭২ ঘন্টা পর্যন্ত ভাল থাকে।
যারা বাজার থেকে পাকা আম কলা ও টমেটো কিনবেন তাদের জন্য সতর্কতা হলো:
১. ফল খাওয়ার আগে খুব ভাল করে পানিতে ধুয়ে নিন। যদি ২%-৫% লবন মিশ্রিত পানি হয় তাহলে ১০০% নিরাপদ হয়ে যায়। পানিতে ২ থেকে ১০ মিনিট পর্যন্ত ডুবিয়ে রাখা যাবে।
২.আম ও আপেল এবং ন্যাশপতি খাওয়ার সময় খোষা ছুলে টুকরা টুকরা করে কেটে খাবেন। আর আঙ্গুর, জাম, চেরি ২% লবন মিশ্রিত পানিতে ৫-১০ মিনিট ডুবিয়ে রেখে তারপর ভাল করে ধুয়ে খাবেন।
৩. মৌসুমের ফল মৌসুমেই খাবেন। অন্যমৌসুমে বা মৌসুম আসার আগে পাকা টসটসে ফলের মোহে পড়বেন না।
বন্ধুরা আম কলা পেঁপে তরমুজ লিচু কাঁঠাল ও টমেটো আমাদের দেশে প্রচুর পরিমানে হয়। যখন এই ফলগুলো বাজারে আসতে শুরু করে তখন আমাদের অসাধু ফল আমদানীকারকরা চিন্তায় পড়ে যায়, তাদের ব্যাবসা কমে যায়। তখন তারা মরিয়া হয়ে ওঠে, দেশে উৎপাদিত ফলের দোষ ত্রুটি খোজার চেষ্টা করে। আর তারাই আগাম ফল কিনে তাতে বেশি পরিমানে কার্বাইড দিয়ে পাকিয়ে সরকারের অসাধু কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় বিভিন্ন ধরনের প্রচার প্রবাগন্ডা তৈরী করে। এতে দেশের সহজ সরল মানুষ দেশের ফলের প্রতি আকৃষ্ট না হয়ে, বিদেশী ফলের প্রতি ঝুকে পড়ে। এই দুষ্টু চক্রের ফন্দি ফিকির ও শয়তানী না বুঝে ভোক্তা অধিকার ফোরাম, পোবাসহ বেশ কিছু এনজিও ও সেচ্চাসেবী সংগঠন আছে তারা মাতামাতি শুরু করে। বন্ধুরা আপনারা কি কখনো দেখেছেন বিদেশী কোন ফলের উপর ভ্রাম্যমান আদালত কাজ করেছে। কোন পরীক্ষা নিরিক্ষা করে ভাল-মন্দ কোন কথা বলেছে। আরো একটি কথা যারা নিরাপদ খাদ্যের জন্য আন্দোলন করে, সভা সিম্পজিয়াম করে, ফরমালিনমুক্ত আম-সবজী, কার্বাইডমুক্ত কলা টমেটোর কথা বলে তারা কি কখনো এই আম জাম কলা পেঁপে তরমুজ টেমেটো নিয়ে কখনো কি বাংলাদেশের স্বীকৃত কোন গবেষনাগার বা ল্যাবরেটরিতে নিয়ে পরীক্ষা নিরিক্ষা করেছে?

২ মিনিটের মধ্যে রাস্তায় আমে ফরমালিন আছে বলে আম নষ্ট করে ফেলছেন। বিগত ১২ বছর ধরেওতো আমের উপর ল্যাবরেটরিতে গবেষনা করে একটি রিপোর্ট কেউ প্রকাশ করতে পারিনি। যে প্রাকৃতিকভাবে কাঁচা আমের আঠায় কত% ফরমালিন থাকে। পাকা আমে কত% ফরমালিন থাকে। এভাবে প্রতিটা পণ্যে কাঁচা অবস্থায় কত% ফরমালিন থাকে। আবার পাকা অবস্থায় কত% ফরমালিন থাকে। কার্বাইড দিয়ে পাকানো আমে কোন কোন এনজাইম কি পরিমানে বাড়ে সেটা মানব শরীরের জন্য কতটা হুমকি স্বরূপ।
যেদিন মাছ চাষে বাংলাদেশ বিশ্বে চতুর্থস্থান হলো তার পরের দিন থেকে বিদেশীদের চক্রান্তে সায় দিয়ে আমাদের দেশের কিছু আবাল ও জগন্নতম ব্যাক্তি ফরমালিন খেলা, পেরেক ঢুকানো খেলায় মত্ত হলো।
যেদিন সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয় স্থান হলো তার পরের দিন থেকে বিদেশীদের চক্রান্তে সায় দিয়ে আমাদের দেশের কিছু মস্তিস্কবিকৃত পাগল ও জগন্যতম ব্যবসায়ী সবজিতে ফরমালিন ও রং মেশানো খেলায় মত্ত হলো।
বাংলাদেশের ফজলি আম আর আম্রপালি বিশ্বসেরা। এতো স্বাদ, সুগন্ধ আর মিষ্টান্ন, যে খায় তাকে পাগল করে দেয়। এইটাকে নষ্ট করার জন্য বিদেশীদের চক্রান্তে সায় দিয়ে আমাদের দেশের কিছু কুত্তার বাচ্চা নামে খ্যাত মানুষ কার্বাইড, ইথেফোন, ইথেল, ইথাইলিনের নাম করে ধ্বংশ করায় মত্ত হলো।
বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষনা পরিষদ বা বিসিএসআরআই এর খাদ্য-বিজ্ঞান প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসী অনুষদের সহযোগিতায় আমি আর রোকন-উদ-দৌলা সাহেব, সেই ২০০৬-০৭ সালে যে সামান্য কিছু কাজ করেছিলাম। তার উপর ভিত্তি করে আজও সবাই কথা বলছেন। কত জন কত ধরনের বাণিজ্যও করে যাচ্ছেন। কেহই এটার সলুশনে আসার চেষ্টা করছেন না। এমনকি সরকারও দো-টানায় আছেন। মাঝে ২০১১/১২ সালের দিকে ফার্মগেটের বাংলাদেশ কৃষি গবেষনা কাউন্সিলের পরিচালক ড. মনিরুল ইসলাম একটা গবেষনা করলেন তার মনে হয় প্রকল্পের টাকা শেষ, এখন নিশ্চুপ।
আমি সাংবাদিকতা করি। একজন সাংবাদিক নিজের থেকে কিছু বলতে পারেনা। কোন এক ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কথা তথ্য উপাত্ত তাদের ইচ্ছায় সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলতে পারে।
পরিশেষে একজন উন্নয়ন সাংবাদিক হিসেবে, সব সময় দেশের, দেশের মানুষের, দেশের মাটির, মাটিতে উৎপাদিত ফসলের উন্নয়নে কাজ করি। আমার দেশের উৎপাদিত ফসলে দুষ্টু চক্রের ঘৃনিত থাবা এলে কড়া ভাষায় প্রতিবাদ করে যাবার অভিপ্রায় রইলো।
























