
ড. মো. বায়েজিদ মোড়ল: ধান ক্ষেতে মাছ চাষ করতে হলে যে সকল কাজ করতে হবে তা নিম্নরূপ:
* জমি নির্বাচন ও সমতল করা
* ক্ষেত প্রস্তুতকরণ
* আইল নির্মাণ
* পরিখা খনন
* নালা যখন
* প্রজাতি নির্বাচন
* পোনা ছাড়া
* খাদ্য প্রয়োগ
* পরিচর্যা
* সতর্কতা।
সুবিধা
* অতিরিক্ত ফলন পাওয়া যায়
* ধানের ফলনের কোন অসুবিধা হয় না
* নিড়ানীর কাজ করে
* অনিষ্টকারী কীট-পতঙ্গ খেয়ে ফেলে
* আগাছা জন্মাতে বাধা দেয়
* সারের কাজ করে।
জমি নির্বাচন, সমতলকরণ ও প্রস্তুতকরণ:
* জমিতে ৩-৬ মাস কমপক্ষে ১০-১২ ইঞ্চি পানি থাকতে হবে।
* চারদিকে আইল এমনভাবে উঁচু করে বাঁধতে হবে যেন মাছ লাফ দিয়ে অন্য ক্ষেতে না যেতে পারে। আইল যেন পানির চাপে না ভাঙ্গে।
* বন্যার পানি যাতে না ভাসিয়ে নেয়।
* কীটনাশক ব্যবহার করা যাবে না।
* ধানের জমিতে ২-৪টি ‘কেটলী’ বা ডোবা করতে হবে এবং ডোবার সঙ্গে কিছু নালার সংযোগ রাখতে হবে। পানি শুকিয়ে গেলে যেন মাছ সেসব ডোবায় আশ্রয় নিতে পারে।
* চাষী/সমিতির সদস্যা/ সদস্যদের বাড়ীর কাছে হতে হবে। এতে রক্ষণাবেক্ষণ সহজ হবে।
* দোআঁশ মাটি সবচেয়ে ভাল।
* জমি চাষ দিয়ে সমতল করে নিতে হবে।
প্রস্তুত করণ:
জমিতে চাষে ধান লাগাতে হবে। ধান লাগানোর পর কমপক্ষে ৮ ইঞ্চি পানি থাকতে হবে এবং খান লাগানোর কমপক্ষে ২০ দিন পর পোনা ছাড়তে হবে।
আইল বাঁধা/ বাঁধ নির্মান:
জমির চারদিকে উঁচু করে আইল বাঁধতে হবে, যাতে বৃষ্টির পানি বা বর্ষাকালে পানির চাপে আইল ভেঙ্গে মাছ বের হয়ে যেতে না পারে। নালা খনন: জমির ঢাল অনুযায়ী ভিতরে নালা নির্ধারণ করতে হবে। জমির আয়তন ও মাছের সংখ্যা অনুযায়ী নালা চওড়া ও গভীর হবে।
ধানের জাত নির্বাচন:
* বি আর- ১১ (মুক্তা)
* বি আর- ১৪ (গাজী)
* বি আর- ৩ (বিপ্লব)
রোপণ পদ্ধতি:
ধানের চারা সারিবদ্ধভাবে এবং দুরত্ব বজায় রেখে রোপণ করতে হবে, যেন মাছেরা ভালভাবে চলাফেরা করতে পারে।
মাছের প্রজাতি নির্বাচন:
প্রজাতি আকার (ইঞ্চি) পরিমাণ (একরে)
সরপুঁটি, নাইলোটিকা, কমন কার্প। ৩ ১২০০-১৬০০টি
চিংড়ি একক চাষ ২ ৫০০০-৬০০০ টি
চিংড়ি মিশ্র চাষ ২২.৫৩ মোট ২২০০টি
চিংড়ি-১৫০০ টি
সরপুঁটি- ৫০০টি
রুই- ২০০টি
কাতলা, সিলভার কার্প, রুই, কার্পিও, মিরর কার্প। ৩ ১৬০০-২০০০টি
মাছের পরিচর্যা:
সম্পূরক খাদ্য প্রদান- মাছের দেহের ওজনের ২% হারে খাদ্য (খৈল+কঁড়া+ভুসি) দিতে হবে।
* আগাছা দমন- যথাসময়ে আগাছা নিড়ানীর মাধ্যমে উঠিয়ে ফেলতে হবে।
* কীটনাশক ব্যবহার না করা-অন্য জমির কীটনাশকমিশ্রিত পানি যেন না ঢুকতে পারে, সে বিষয়ে লক্ষ্য রাখতে হবে।
ধান ক্ষেতে মাছ চাষের অসুবিধা এবং সীমাবদ্ধতা:
১. ধান ক্ষেতে মাছ চাষের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, কৃষকরা জমিতে কীটনাশক ব্যবহার করে। ফলে মাছের রোগ হয়, এমনকি মাছ মারাও যেতে পারে।
২. সমিতির অধিকাংশ সদস্য/ সদস্যা ভূমিহীন; জমি থাকলেও সামান্যই; তাও আবার আইল দ্বারা বিভক্ত। কাজেই সদস্য/ সদস্যারা অল্প জায়গায় পানি-ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন আইল তৈরি করতে পারে না। ফলে, ধান ক্ষেতে মাছ চাষ সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাছাড়া, তাদের জমির চারপাশে অন্যান্য ব্যক্তির জমি থাকে। সেগুলিতে মালিকেরা তাদের খেয়াল- খুশিমত চাষ করে থাকে।
৩. অনেক এলাকায় বন্যার ফলে ক্ষেত ডুবে যায়, ফলে ক্ষেতে মাছ-চাষ পদ্ধতি হুমকির সম্মুখীন হয়।
৪. বৃষ্টি আমাদের নিয়ন্ত্রণে নয়, অনেক সময় অধিক বৃষ্টির ফলে ক্ষেতের আইল ভেঙ্গে যায়। ফলে মাছ অন্য জমি বা পার্শ্ববর্তী এলাকায় চলে যায়।
৫. অনেক সময় জমিতে পানি কমে যায় বা জমির পানি শুকিয়ে যায়। ফলে, মাছ মারা যায়।
৬. কৃষক মাছের পোনা সঠিকভাবে পরিবহণ করে না। যার ফলে রাস্তার মাঝে পোনা দুর্বল হয়ে পড়ে। এমনকি মারাও যায়।
৭. জমিতে পোনা ছাড়াও কৌশল কৃষকেরা জানে না। ফলে, মাছ জমির পানির পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইযে নিতে না পেরে দুর্বল হয়ে পড়ে। এমনকি মারাও যেতে পারে।
৮. জমির আশপাশে ডোবা বা নালা থাকলে তাতে রাক্ষুসে মাছ (শৈল, গজার, টাকি) থাকে যা পোনা খেয়ে ফেলে।
৯. জমিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে সাপ-ব্যাঙ এবং গুঁই সাপ থাকে যা মাছের পোনা খেয়ে ফেলে।
১০. বাজপাখী এবং বক জমির কিছু পোনা খেয়ে ফেলে যা ধান ক্ষেতে মাছ চাষে সমান্য সমস্যা সৃষ্টি করে।
১১. ধান ক্ষেতে মাছ চাষ করতে কৃষকদের আগ্রহ একেবারেই নেই। কারণ, এ চাষ সম্বন্ধে তারা ভালভাবে জানে না।
১২. চাহিদা অনুযায়ী মাঝের পোনা সর্বত্র পাওয়া যায় না।
১৩. জমিতে যে নালা বা ডোবা থাকে, তাতে প্রচুর পরিমাণে মাছ জমা হয়। সেগুলি থেকে মাছ চুরির সম্ভাবনা থাকে।
১৪. জমি নির্বাচনের জন্য বিভিন্ন দিক, যেমন- পানির প্রাপ্যতা, পানির উৎস, জমির ধরন, যাতায়াত ব্যবস্থা ও মাছ চাষের উপযোগী মাটি ও পানির গুণাগুণ সম্পর্কে ধারণা আবশ্যক। তাছাড়া আইল নির্বাচন, পরিখা নির্মাণ, নালা নির্মাণ, গর্ত নির্মাণ ইত্যাদি পদ্ধতিও জানতে হবে।
বিভিন্ন পদ্ধতিতে মাছ চাষ
সম্পাদের সঠিক ব্যবহার ও লাগসই উন্নয়ন এবং স্থায়িত্বশীল অ্যকোয়াকালচারের জন্য বিভিন্ন পদ্ধতিতে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর হয়ে থাকে। নীচে অ্যাকোয়াকালচারের কয়েকটি পদ্ধতির কথা সংক্ষেপে বর্ণনা করা হলো।
পেনে মাছ চাষ পদ্ধতি
স্থান নির্বাচন:
যেসব জলাশয় বন্যায় প্লাবিত হয় এবং ৪-৫ মাস জলামগ্ন থাকে, সেই সকল আবদ্ধ, উন্মুক্ত, সমুদ্র উপকূলের অগভীর জলাশয়েই পেনে মাছ চায় করা সম্ভব।
* সাময়িক বা স্থায়ীভাবে পানি থাকে এমন জলাশয়।
* সেচ প্রকল্পের বরোপিট, খাল, সংযোগ খাল, মরা নদী, হাওর-বাঁওড় বিল প্রভৃতি জলাশয়।
* জলাশয়-দূষণ ঘটতে পারে এমন স্থান নির্বাচন করা যাবে না।
* প্রবল স্রোত হতে পারে এমন জলাশয় পরিহার করতে হবে।
পেনে মাছ চাষের সুবিধা:
* কম সময়ে করা যায়
* সহজেই করা যায়
* মূলধন কম লাগে
* কারিগরি দিক সহজ
* পতিত জায়গার ব্যবহার
* সমন্বিত চাষ করা যায় এবং
* কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়।
পেন তৈরি:
পেন তৈরির উপকরণ বিভিন্ন জলাশয়ের জন্য বিভিন্ন ধরনের হাত পারে। সাধারণতঃ পেন তৈরির প্রধান প্রধান উপাদান হলো বাঁশের বেড়া, বেড়া ধরে রাখার খুটি এবং জাল। বাঁশের বানা, জাল, তারের জাল ইত্যাদি বেড়া হিসাবে ব্যবহার করা হয়। খুঁটির জন্য বাঁশ, কাঠ, লোহার পাইপ, সিমেন্টের পোল ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়।
পেন তৈরির উপকরণ:
১. মহাল/মুলি বাঁশের বেড়া
২. বন বাঁশের বেড়া/ বোনা
৩. বরাক বাঁশের বেড়া/ বানা
৪. কাঠের খুঁটি
৫. গিটবিহীন পলিথিন জাল
৬. টায়ার কর্ডের জাল
৭. সুতা জাল
৮. বানা তৈরির জন্য ব্যবহৃত নারিকেলের রশি
৯. বানা তৈরির জন্য সিনথেটিক রশি
১০. বেড়া বাঁধার জন্য তার/ রশি।
জলাশয়ের আকৃতির পরিমাপ নিয়ে বানা/ বেড়া, জাল এবং খুঁটি তৈরি করতে হবে। বানা/ বেড়া বা জালের সর্বোচ্চ উচ্চতা জলাশয়ের লেবেলের ২-৩ ফুট বেশী রাখতে হবে। জলাশয়ের প্রস্থ কম হলে খালের এক পাশ থেকে আরেক পাশ পর্যন্ত আড়াআড়িভাবে খুঁটি পুঁতে বেড়া দিয়ে পেন তৈরি করা যায়। জাল দিয়ে বেড়া দেওয়ার সময় লক্ষ্য রাখতে হবে যেন জালের ফাঁস ১০ মি.মি এর বেশী না হয়। টায়ার কর্ড বা নটলেস জাল ব্যবহার করা উচিত। যদি পানির প্রবাহ বেশী হওয়ার আশঙ্কা থাকে তবে বাঁশ দ্বারা ৩ মিটার উঁচু বানা তৈরি করে তলদেশের মাটির মধ্যে অর্ধেক পুঁতে দিতে হবে, যাতে পানির চাপে বালি বা নরম মাটি সরে না যায়।
রাক্ষুসে ও ছোট মাছ এবং মাছের শত্রু কীটপতঙ্গ পোকামাকড় দমন:
যদি পানি থাকে তবে পেন তৈরি করার পর ঘন মশারীর জাল ঘন ঘন টেনে সরিয়ে ফেলতে হবে। যদি সম্ভব হয় জাল টানার পর পেনে চুন প্রয়োগ করা যেতে পারে শতাংশে ১ কেজি হারে।
প্রজাতি নির্বাচন
পেনে মাছ চাষে প্রজাতি নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যেসকল মাছ দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং অল্প সময়ে আহরণ করা যায় সেই সকল প্রজাতির মাছ পেনে চাষ করার জন্য নির্বাচন করা হয়।
প্রজাতির বৈশিষ্ট্য হবে:
* যারা সকল স্তরের খাবার খায়
* পোনার সহজ লভ্যতা
* বাজারে চাহিদা আছে
* অল্প সময়ে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় এবং
* বাহিরের খাদ্য ছাড়াই যারা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়।
এসব দিক বিবেচনা করে রুই, কাতলা, মৃগেল, সিলভার কার্প, কার্পিও, রাজপুটি, তেলাপিয়া, চিংড়ি, ভেটকি, পাংগাস ইত্যাদি মাছের একক বা মিশ্র চাষ করা সম্ভব।
মজুদ হার:
পোনা মজুদের সময় পোনার আকার কোনক্রমেই ৪ ইঞ্চির কম যেন না। (তেলাপিয়া, রাজপুঁটি, চিংড়ী ছাড়া)
একর প্রতি ৮-১০ হাজার পোনা মজুদ করা ভালো ফল পাওয়া গেছে।
যথাক্রমে রুই: মৃগেল : কাতলা: সিলভার কার্প: কাপিংও
৩০:২০:১০:৩০।
তবে চিংড়ি বা পাংগাস ছাড়লে মৃগেল দেওয়ার প্রয়োজন নেই। রাজপুঁটি ও তেলাপিয়া ছাড়লে রুই কমাতে হবে।
পেনে খাদ্য প্রয়োগ:
মজুদকৃত পোনার মোট ওজনের ১% হারে খাদ্য প্রয়োগ করতে হবে।
খাদ্য হিসাবে খৈল: কুঁড়া:ভূসি: আটা: চিটাগুড় প্রয়োগ করতে হবে।
যাদের অনুপাত হবে যথাক্রমে ৫০:৩০:১৫:৩:২:
পরির্চযা
প্রতিমাসে ১ বার জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা উচিত এবং নমুনাকরণের পর খাদ্য প্রয়োগ ও অন্যান্য ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
আহরণ ও বাজারজাতকরণ:
পেনে ৫-৬ মাসের মধ্যেই মাছ বাজারজাতকরণের উপযুক্ত হয়। ৫/৬ মাস পরেই জাল টেনে গাছ আহরণ করে বাজারজাত করা উচিত। সাধারণতঃ মাছ খুচরা বাজারে বিক্র করলেই বেশী দাম পাওয়া যাবে।
—
























