
ড. মো. বায়েজিদ মোড়ল:
ভূট্টা একটি দানাজাতীয় উচ্চ ফলনশীল ফসল। উপযুক্ত ব্যবস্থাপনা আবাদ করলে ফসলটি বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য-চাহিদা অনেকাংশে মেটাতে সক্ষম।
ভূট্টার ১০০ গ্রাম দানায় খাদ্যমান নিম্রূপ-
আমিষ-১১.২০ (গ্রাম), চর্বি-৩.৬০ (গ্রাম), খনিজ পদার্থ- ১.৫০ (গ্রাম), শর্করা- ৬৬.২০ (গ্রাম), আঁশ- ২.৭০ (গ্রাম), পানি- ১৪.৯০ (গ্রাম), ক্যালশিয়াম- ১০.০০ (মি. গ্রাম), লৌহ- ২.০০ (মি. গ্রাম), ক্যারোটিন- ৯০.০০ (মি.গ্রা.) এছাড়া হলুদ ভুট্টায় ৬০৫ ইউনিট ভিটামিন ‘এ’ আছে; যা গম ও চালে থাকে না।
চাষ পদ্ধতি
জমি নির্বাচন: বাংলাদেশের প্রায় সব ধরনের মাটিতে ভূট্টার চাষ করা সম্ভব। সাধারণ ভাবে উঁচু এবং মাঝারি নীচু, উচ্চ পানি ধারণ ও নিষ্কাষণ ক্ষমতাসম্পন্ন মাটি যেমন, বেলে- দোঁআশ মাটি ভূট্টা চাষের জন্য উত্তম।
পরিবশেগত চাহিদা: সফল ভূট্টা চাষের জন্য গড়ে নূন্যতম ১২ ডিগ্রী সেলসিয়াস ও সর্বোচ্চ ২৯ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রা প্রয়োজন। উৎপাদন মৌসুমে ৪৫-৬০ ডিগ্রী সে.মি. বৃষ্টিপাত আবশ্যক। বৃষ্টিপাত ২০ সে.মি এর কম হলে সেচ প্রয়োজন। মাটির প্রকৃতি মাঝারি অম্লীয় (পিএইচ৫.০) থেকে মাঝারি ক্ষারীয় (পি এইচ ৮.৫) পর্যন্ত হরেও ভূট্টা চাষ করা যেতে পারে। দেশের প্রায় ২.৩ মিলিয়নথেকে ৫.৫ মিলিয়ন হেক্টর জমি ভূট্টা চাষের উপযোগী।
জমি তৈরি: মাটিতে ‘জো’ থাকা অবস্থায় জমি ও মাটির প্রকারভেদে ৩-৪টি আড়া-আড়ি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে সমান করে নিতে হবে। শেষ চাষের সময় জমিতে প্রচুর জৈব সার প্রয়োগ করতে হবে। উত্তম ফলন প্রাপ্তির জন্য জমিতে যথাসম্ভব গভীরভাবে জাষ দিতে হবে এবং যাবতীয় আবর্জনা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে।
জাত নির্বাচন: বিভিন্ন প্রকার ভূট্টার মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনষ্টিটিউট থেকে উদ্ভাবিত বর্ণালী, শুভ্রা, মোহর ও খই ভূট্টা নামে চারটি এবং বিদেশ থেকে আমদানিকৃত সোয়ান-২ জাত আবাদ করা লাভজনক।
বপনের সময়: বেশী ফলন পেতে হলে সময় মত বীজ বপন করা উচিত। রবি মৌসুমে আশ্বিনের মাঝামাঝি থেকে অগ্রাহয়ণের মাঝামাঝি (অক্টোবর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত) এবং খরিপ মৌসুমে ফাল্যন থেকে চৈত্রের শেষ (১৫ ফেব্র“য়ারি থেকে ১৫ই এপিল) পর্যন্ত বীজ বোনার উপযুক্ত সময়। যখন বৃষ্টিপাত বেশি হয় অর্থাৎ জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ এবং যখন বেশী শীত পড়ে, অর্থাৎ পৌষ ও মাঘ মাসে ভূট্টা বপন না করাই ভাল। অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হলে বীজ পচে যেতে পারে এবং তাপমাত্রা খুব কম থাকলে ভীজ গজাতে অসুবিধা হয়।
বীজের পরিমাণ: বর্নালী, শুভ্রা, মোহর ও সোয়ান-২ জাতের জন্য হেক্টর প্রতি ২৫-৩০ কেজি (একর ১০-১২ কেজি) এবং খই ভূট্টার জন্য হেক্টর প্রতি ৩৫-২০ কেজি (একরে ৬-৮ কেজি)।
বপন পদ্ধতি: বীজ সারিতে বুনতে হবে। কারণ, ছিটিয়ে বোনার চেয়ে সারিতে বোনা ফসলের ফলন বেশী হয়। এতে বীজ অনেক কম লাগে; নিড়ানী ও সার দেওযা সহজ হয়, খরচও কম লাগে। সারি থেকে সারির দূরত্ব ৭৫ সে.মি. (প্রায় ৩০ ইঞ্চি) এবং গাছ থেকে গাছের দুরত্ব ২৫ সে.মি. (প্রায় ১০ ইঞ্চি) রাখতে হবে। সারি বরাবর দড়ি ধরে কাঠের বা লোহার হাত লাঙ্গল দিয়ে ২.৫-৩.৫ সে.মি. (১.০-১.৫ ইঞ্চি) গভীর সারি টেনে বীজ বুনতে হবে। সারিতে ২৫ সে.মি. দূরে দূরে প্রতি গোছায় ২/৩ টি বীজ লাগাতে হবে। মাটিতে রস কম থাকলে বীজ আরও গভীরে (৫-১০ সে.মি) বুনতে হবে। আগাম বন্যা মৌসুমে বন্যা প্লাবিত এলাকায় পানি সরে যাওয়ার পর জমিতে রস থাকতেই সারি করে বিনা চাষে সরাসরি বীজ মাটিতে পুঁতে লাগানো যায়। জমি বেশী কর্দমাক্ত হলে বীজ শুধু কাদার উপর রাখলেই চলে। মাটিতে রস কম থাকলে বীজগুলো আঙ্গুল দিয়ে ১.০-১.৫ সে.মি. গভীরে পুঁতে দিতে হবে। বেশী গভীরে দিলে বীজ পচে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
সার প্রয়োগ: আগে সবুজ সার এবং জমি তৈরির সময় হেক্টর প্রতি ৫-৭ টন (একর প্রতি ৬৫-৭০ মন) জৈব সার, কুইক কম্পোস্ট, খামার-জাত সার ব্যবহার করতে হবে।
চারা গাছ পাতলাকরণ: রবি মৌসুমে চারা গজাবার ১৫-২০ দিনের ভিতর ও খরিপ মৌসুমে ১০-১৫ দিনের ভিতর ক্ষেত থেকে অতিরিক্ত চারা গাছ অবশ্যই তুলে ফেলতে হবে। গোছা থেকে গোছার দূরত্ব ২৫ সে.মি. হলে প্রতি গোছায় ১টি এবং দূরত্বে বেশী হলে প্রতি গোছায় ২টি সবল চারাগাছ রেখে বাকিগুলো তুলে ফেলতে হবে।
আগাছা নিয়ন্ত্রণ: ২-৩ বার নিড়ানী কিংবা ছোট কোদালের সাহায্যে হালকাভাবে কুপিয়ে এ কাজ সমাধা করা যায়।
মাটি উঠিয়ে দেওয়া: অন্যতম আন্তঃপরিচর্যা হলে গোড়ায় মাটি উঠিয়ে দেওয়া। ভূট্টায় মাটি তুলে দেওযার উদ্দেশ্যগুলি হচ্ছে-
* গাছের মূল ভালভাবে ঢেকে দেওয়া, যাতে সহজেই খাদ্য সংগ্রহ করতে পারে;
* গাছেল গোড়া শক্ত করা, যাতে সহজে হেলে না পড়ে এবং
* সেচ ও নিষ্কাশনের জন্য নালা তৈরী করা ।
সেচ ও নিকাশ:
রবি মৌসুমে বন্যাপ্লাবিত এলাকায় বিনা চাষে ভুট্টা উৎপাদনের জমিতে যথেষ্ট রস থাকে বরে সাধারণতঃ সেচের প্রয়োজন হয় না। কিন্তু অন্যান্য এলাকায় জমি ও মাটির প্রকারভেদে ২-৩ বার সেচের প্রয়োজন হতে পারে। বীজ গজানোর ৩০-৩৫ দিন পর প্রথম সেচ; ৬০-৬৫ দিন পর (ফুল আসার আসে) দ্বিতীয় সেচ ও প্রয়োজন হলে ৮৫-৯০ দিন পর (দানা পূর্ণ হওয়ার সময়) তৃতীয় সেচ দিতে হবে। জমিতে প্রয়োজনীয় রস না থাকরে বপনের পর পরই একটা হালকা সেচ দিলে বীজ ভালভাবে গজায়।
ভুট্টা দাঁড়ানো পানি সহ্য করতে পারে না। তাই অতিরিক্ত সেচ দেয়া অনুচিত এবং অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের পর পানি নিকাশ করতে হবে।
কীট-পতঙ্গ, রোগ-বালাই ও তার প্রতিকার:
আমাদের দেশে ভুট্টার ফসলে এখনও কীট পতঙ্গ এবং রোগ-বালাই সাধারণতঃ দেখা যায়না। চারার গোড়া-কাটা পোকাগুলো সাধারণতঃ দিনের বেলায় চারা গোড়ায় মাটির নীচে লুকিয়ে থাকে। এগুলো দমন করতে হলে আক্রান্ত গাছের গোড়া থেকে মাটি সরিয়ে পোকা বের করে মেরে ফেলতে হবে। এছাড়া মোচার দানা পূর্ণ হওয়ার পর থেকে ফসল পাকা পর্যন্ত ভুট্টা ক্ষেতে শিয়াল, কাক ও টিয়া পাখির উপদ্রব দেখা যায়। এ সময় ফসল রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে।
ফসল সংগ্রহ: ফসল সংগ্রহ নির্ভর করে আবাদের উদ্দেশ্যের উপর। যেমন-
সবুজ গো-খাদ্য: গাছের যথেষ্ট দৈহিক বৃদ্ধি হয়েছে অথচ কান্ড শক্ত হয় নাই এমন পর্যায়ে গাছ কাটা হয় সাধারণতঃ ৬০-৮০ দিনে এ পর্যায়ে আসে।
সাইলেজ হিসাবে সংরক্ষণ: কব যখন সবেমাত্র পুষ্ট (গরষশ ফড়ঁময ংঃধমব) হতে শুরু করে তখন গাছ কাটা হয়।
পুড়িয়ে খাওয়া: কব বড় এবং শক্ত করে এমন পর্যায়ে অর্থাৎ সিল্ক যখন শুকিয়ে কালোবর্ণ ধারণ করে তখনই সংগ্রহ করা হয়।
দানা উৎপাদন: বীজ পূর্ণভাবে পরিপক্ক হওয়ার পর সংগ্রহ করা উচিত। এ সময়ে পাতা ও মোচার আবরণ শুকিয়ে হলদে হয়। পশু-খাদ্যের জন্য গাছের গোড়া কাটতে হয়। বীজের জন্য কব হাতে ভেঙ্গে সংগ্রহ করা হয়। উন্নত কব সংগ্রহের জন্য বিশেষ যন্ত্র ব্যবহৃত হয়।
মাড়াই- এর শুকানো: মোচা সংগ্রহের পর খোসা ছাড়িয়ে কয়েকদিন রৌদ্রে শুকিয়ে পরে মাড়াই করা হয়।
মাড়াই এর পদ্ধতি:
হাতের সাহায্যে: আঙ্গুলের সাহায্যে বীজ টেনে তোলা হয়। এ পদ্ধতি কষ্টকর ও সময় সাপেক্ষ, তবে বীজ ভাল হয়। অল্প হলে এই পদ্ধতি অবলম্বন করা যায়।
* লাঠির সাহায্যে পিটিয়ে বীজ পৃথক করা একটি সাধারণ পদ্ধতি। তবে এতে বীজ আঘাত প্রাপ্ত হয়।
* বি,এ,আর,আই কর্তৃক উদ্ভাবিত ভুট্টা-মাড়াই যন্ত্রের সাহায্যে হাত দিয়ে মাড়াইয়ের চেয়ে দ্রুত দানা ছাড়ানো যায়। এই যন্ত্র দিয়ে ১০০ কেজি দানা ছাড়াতে একজন শ্রমিকের সময় লাগে ছয় ঘন্টা, অথচ হাত দিয়ে দানা ছাড়াতে সময় নেয় এর আটগুণ অর্থাৎ ৪৮ ঘন্টা। কুষ্টিয়ার বেন উইক প্রন্ড কোম্পানি কর্তৃক প্রস্তুতকৃত মাড়াই যন্ত্রের সাহায্যে কম সময়ে দানা ছাড়ানো যায়।
শুকানো:
সাধারণতঃ ভুট্টা রোদে শুকিয়ে দানার আর্দ্রতার পরিমাণ কমিয়ে ১০-১২% এ আনা হয়। কাদা মাটি লেপ দেওয়া পরিস্কার শুকানো মেঝে, বাঁশের চাটাই অথবা কাঠের তৈরি ট্রে জাতীয় পাত্রে মোচা ও দানা শুকানো যায়।
ফলন: মৌসুমভেদে ভুট্টার বিভিন্ন জাতের ফলন নিæে দেওয়া হল-
জাতের নাম গড় ফলন টন/ হেক্টর
বর্ণালী ৪.০
শুভ্রা ৪.৫
সেয়ান-২ ৪.০
ভুট্টা ৩.০
বীজ সংরক্ষণ: বীজ সঠিক উপায়ে সংরক্ষণের জন্য নিæলিখিত সাবধানতা অবলম্বন করা প্রয়োজন:
* মোচার দুই মাথার কিছু অংশ বাদ দিয়ে শুধুমাত্র মাঝের অংশের দানাগুলো বীজ হিসাবে সংগ্রহ করতে হবে।
* যে মাঠ থেকে বীজের জন্য ভুট্টা সংগ্রহ করা হবে তার পাশাপাশি (২০০ মিটার) অন্য জাতের ভুট্টা গাছ এই সময়ে বপন করা উচিত নয়।
* সঠিক সময়ে বীজ সংরক্ষণ করতে হবে। চালুনী দিয়ে চেলে বড় ও পুষ্ট দানা সংগ্রহ করতে হবে।
* বীজ সংরক্ষনের আগে এমন ভাবে শুকিয়ে নিতে হবে যাতে আর্দ্রতা ১২% এর বেশী না থাকে। শুকানোর পর দাঁত দিয়ে চাপ দিলে ‘কট’ শব্দ করবে।
* ভেঙ্গে গেলে বুঝতে হবে দানা ভালভাবে শুকিয়েছে।
চাষী পর্যায়ে সংরক্ষণ:
মাটির কলসী, চট, ধাতুনির্মিত পাত্র, কেরোসিন টিন, পলিথিন ব্যাগ, পলিথিন আবরণ দেওয়া পট প্রভৃতি দ্রব্যাদি চাষী পর্যায়ে বীজ সংরক্ষণের জন্য ব্যবহার করা হয়। তবে পাত্রে যেন ছিদ্র না থাকে এবং পাত্রের মুখ ভালভাবে বন্ধ করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। যাতে বাহির থেকে ভিতরে বাতাস ঢুকতে না পারে। বীজ দিয়ে পাত্র ভরতি করে রাখা উচিত।
এছাড়াও, কিছুটা মোট পলিথিন ব্যাগ বীজ রাখার জন্য ব্যবহার করা যায়। তবে পলিথিন ব্যাগটি, চাটের বস্তা অথবা মটকার ভেতর রেখে বীজ ভরে পলিথিন ব্যাগের মুখ ভালভাবে বন্ধ করতে হবে। মটকার মুখ বন্ধ করে রাখতে হবে। এ ছাড়া, খোসা সমেত রান্নাঘরে চুলার উপরে (৮-১০) ফুট উঁচুতে ঝুলিয়ে রেখে বীজ সংরক্ষণ করা যায়।
ভুট্টার সঙ্গে সাথী-ফসল হিসাবে অন্যান্য ফসলের চাষ: ভুট্টার সারির মধ্যে লালশাক, পালংশাক, মরিচ, ধনে, মটর, খেসারী, সরিষা ও চীনাবাদামের চাষ সফলভাবে করা যায়।
ব্যবহার:
কাঁচা মোচা লবণ-পানিতে সিদ্ধ করে বা পুড়িয়ে খাওয়া যায়, ভুট্টার আটার সঙ্গে গমের আটা ১:২ অনুপাতে মিশিয়ে ভাল রুটি/পরোটা বানানো যায়। ভুট্টার ভাঙ্গাদানা ডালের সঙ্গে মিশিয়ে সুস্বাদু খিচুড়ি রান্না করা যায়। ভুট্টার সুজি থেকে উপদেয় হালুয়া বানানো যায়। ভুট্টার ছাতু বেশ মুখরোচক খাবার। খই ভুট্টা থেকে ধানের চেয়ে বড় আকারের বেশ সুস্বাদু খই হয় এবং মুড়কী ও সংগ্রহের পর ভুট্টার গাছ কাঁচা অবস্থায় খাদ্য হিসাবে এবং শুকনো অবস্থায় খড় হিসাবে গরু/ মহিষের খাবারের জন্য ব্যবহার করা যায়। এছাড়া শুকনো গাছ মোচার খোসা ও মোচার দানা ছাড়ানোর পর পশুখাদ্য ও জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করা যায়।
আন্তঃ ফসল হিসাবে ভূট্টার সাথে সয়াবীনের চাষ
ভূট্টা বাংলাদেশের একটি সম্ভাবনাময় উচ্চফলনশীল দানাদার ফসল। পৃথিবীতে দানা জাতীয় ভাদ্য শস্যের মধ্যে মোট উৎপাদনের দিক থেকে ভূট্টার স্থান দ্বিতীয় কিন্তু গড় ফলনের দিক থেকে ভূট্টার ফলন ৩.৫৮ টন। বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জন গোষ্ঠির খাদ্য চাহিদা শুধু ধান ও গমের উৎপাদন বাড়িয়ে মেটানোর সম্ভাবনা খুবই কম। তাই ধান ও গমের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি ভ্ট্টূার আবাদ ও উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। এছাড়া ভূট্টার ব্যবহার নানাবিধ। ভূট্টার গাছ কাঁচা অবস্থায় গো-খাদ্য হিসেবে এবং পরিপক্ক অবস্থায় জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করা যায়। ইদানিং পশু-পাখি ও মাছের খাদ্য তৈরীতে ভূট্টার দানার ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়েছে। কাজেই ভূট্টার চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। ভূট্টা, সাধারণতঃ সারিতে বপন করা হয়। সারি থেকে সারির দুরত্ব ৭৫ সে.মি.। এই সারি সমূহকে সুবিন্নস্থ করে ভূট্টার সারির মাঝে বিভিন্ন ফসল আবাদ করা সম্ভব। যে সমস্ত ফসল ভূট্টার সংগে আন্তঃফসল হিসেবে চাষ করা সম্ভব তস্মধ্যে সয়াবীন অন্যতম। সয়াবীন এ দেশে একটি নতুন ফসল। ইহা এখনও ব্যাপক ভাবে চাষাবাদ শুরু হয় নাই। সয়াবীন এ দেশে একটি নতুন ফসল। সয়াবীনের বীজের ৪০-৪৫% প্রোটিন এবং ১৮-২২% তেল থাকে। সয়াবীনের তেল ভোজ্য তেল হিসেবে খুবই জনপ্রিয়। ইদানিং পশুখাদ্য এবং মাছের খাদ্য তৈরীতেও সয়াবীনের ব্যবহার শুরু হয়েছে। সয়াবীন অন্যান্য ডালের মত ডাল হিসাবে ব্যবহার করা যায়। এছাড়া চাপাতি পরটা, পাউরুটি, বিস্কুট, দুধ ও দই ইত্যাদি তৈরীতে সয়াবীন ব্যবহার করা যায়। সয়াবীন গাছের শিকড়ে রাইজোবিয়াম নামক এক প্রকার ব্যাকটেরিযা নডিউল বা গুটি সৃষ্টির মাধ্যমে বায়ু মন্ডল থেকে যথেষ্ট পরিমাণ গাছের অতি প্রয়োজনীয় খাদ্য নাইট্রোজেন সংগ্রহ করে থাকে ফরৈ ইউরিয়া সার প্রয়োগ করা প্রয়োজন হয় না। এছাড়া এই ফসল বছরের সব মৌসুমেই চাষ করা যায়। ভূট্টার সংগে আন্তঃফসল হিসেবে সয়াবীন চাষের এক পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায় যে, দুই জোড়া সারি ভূট্টার মাঝে যে খালি জায়গা থেকে সেখানে তিন সারি সয়াবীনের চাষ করা সম্ভব। এর ফলে ভূট্টা একক ফসল হিসেবে চাষের পাশাপাশি আন্তঃফসল হিসেবে সয়াবীনের চাষ করলে মোট উৎপাদন ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে লাভজনক করা সম্ভব। নিæে আন্তঃফসল হিসেবে ভূট্টার সাথে সয়াবীন চাষের পদ্ধতি বর্ণনা করা হলোঃ
দুই জোড়া সারি ভূট্টার মাঝে তিন সারি সয়াবীনের চাষ
জমি নির্বাচন-
সেচের সুবিধা সম্পন্ন মাঝারী উঁচু জমি ভূট্টার সাথে সয়াবীনের আন্তঃফসল চাষের জন্য নির্বাচন করা উচিত। দো-আশঁ মাটি যেখানে বৃষ্টির পানি জমা থাকেনা, এসব জমি ভূট্টা ও সয়াবীন চাষের জন্য ভাল হয়। তবে রবি মৌসুমে মাঝারী থেকে নীচু জমিতেও ভূট্টা ও সয়াবীন চাষ করা যায়।
জমি তৈরী-
মাটির প্রকার ভেদে ৪-৫টি চাষ ও মই দিয়ে জমি তৈরী করতে হয়ে। মাটি ভালভাবে চাষ দিয়ে ঝুরঝুরে এবং আগাছা মুক্ত করে বীজ বপন করা উচিত। জমি এমন ভাবে তৈরী করতে হবে যেন পরবর্তীতে জমিতে সেচ দেওয়া, পানি নিস্কাশন ও অন্তবর্তীকালীন পরিচর্যা করার সুবিধা হয়।
জাতের নাম-
ভূট্টা: বর্ণালী বা অন্য কনো একই ধরনের জাত
সয়াবীন: সোহাগ (পিবি-১)
বপনের সময় নভেম্বর মাসে মাঝামাঝি হতে ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ (অগ্রহায়ন- পৌষ) বপনের উপযুক্ত সময়।
সারের পরিমাণ-
সারের নাম প্রতি হেক্টর (কেজি) প্রতি একর (কেজি) প্রতি বিঘায় (কেজি)
ইউরিয়া ১০০-১২০ ৪০-৫০ ১৫-১৮
টিএসপি ১৫৫-১৭৫ ৬০-৭০ ২০-২৪
এমপি ১০৫-১২০ ৩৫-৪০ ১২-১৪
জিপসাম ৮০-১১৫ ৩৫-৪৫ ১২-১৫
সার প্রয়োগ পদ্ধতি
ইউরিয়া সার ছাড়া অন্যান্য সব সারের সবটুকু জমির তৈরীর সময় ছিটিয়ে প্রযোগ করতে হবে। ইউরিয়া সারে এক চতুর্থাংশ ভূট্টার সারিতে বীজ বপনের আগে ছিটিয়ে প্রযোগ করতে হবে এবং বাকী ইউরিয়া সার তিন কিস্তিতে চারা গজানোর ২০-৪০ এবং ৫৫ দিন পর ভূট্টার সারির মাঝামাঝি জায়গায় উপরি প্রযোগ করে কোঁদাল দিয়ে কুপিয়ে মাটির সংগে মিশিযে দিতে হবে। এসময় মাটিতে যথেষ্ট পরিমাণ রস থাকা বাঞ্চনীয়।
বীজ বপন পদ্ধতি
ভূট্টার এক জোড়া সারি থেকে অন্য জোড়া সারির দুরত্ব ১২০ সেঃমিঃ হবে। জোড়া সারিতে এক সারি থেকে অন্য সারির দুরত্ব ৪০ সেঃমিঃ। দুই জোড়া সারির মাঝে ১২০ সেঃমিঃ জায়গা ৩০ সেঃমিঃ পর পর তিন সারি সয়াবীনের বীজ লাগাতে হবে। ভূট্টা গাছের ছায়া দ্বারা সয়াবীন গাছ কম প্রভাবিত হয়।
লোহার তৈরী টাইন অথবা কাঠের ছোট লাঙ্গল দিয়ে ৩-৫ সেঃমিঃ গভীর করে সারি তৈরী করতে হবে।
ভূট্টার বীজ সারিতে ৩০ সে.মি. পর পর দুই-তিনটি করে বুনতে হবে এবং সয়াবীন বীজ সারিতে লাগাতার বুনতে হবে। বপনের সময় সয়াবীন বীজের সংগে রাইজোবিয়াম ইনোকুলাম বা জীবানু সার মিশিয়ে নিতে হবে। বীজ বপনের পর দুই পার্শ্বের মাটি দিয়ে সারি বদ্ধ করে দিতে হবে।
জীবানুসার প্রয়োগ পদ্ধতি
বপনের আগে সয়াবীন বীজ জীবানুসার মিশিয়ে লাগালে গাছের শিকড়ে নডিউল বা গুটি সৃষ্টি হয় ফলে বাতাস থেকে নাইট্রোজেন যোগ সাধনের কাজ সহজতর হয়। একটি পাত্রে ১ কেজি সয়াবীন বীজ নিয়ে পরিস্কার পানিতে ভেজানো হাত দিয়ে নাড়াচাড়া করতে হবে যাতে সকল বীজের গা ভিজে যায়। এখন এই ভিজা বীজের মধ্যে ১৫-২০ গ্রাম ইনোকুলাম পাউডার বা জীবানু সার ছিটিয়ে দিয়ে ভালভাবে নাড়াচাড়া করতে হবে যাতে বীজের গায়ে সমভাবে পাউডার লেগে থাকে। এই ইনোকুলাম বাজীবানু সার লাগানো বীজ সাথে সাথে বপন করে ফেলতে হবে। অনেকক্ষণ রোদে ফেলে রাখলে ইনোকুলামের গুণাগুণ নষ্ট হয়ে যায়।
অন্তর্বর্তীকালীন পরিচর্যা
চারা গজানোর ১৫-২০ দিনের মধ্যে ভূট্টা গাছের চারা প্রতি হিলে একটি রেখে বাকী চারা তুলে ফেলতে হবে। আর সয়াবীনের সারিতে ৫-৭ সে.মি. পর পর একটি চারা রেখে বাকী চারা উঠিয়ে দিতে হবে। এ সময় ক্ষেতে আগাছা থাকলে নিড়ানী দিয়ে তুলে ফেলতে হবে। গাছের বয়স দেড় মাস হওয়া পর্যন্ত মাঠ আগাছা মুক্ত রাখতে হবে।
সেচপ্রয়োগ
ক্ষেতে সব সময় পর্যাপ্ত রস থাকতে হবে। রসের অভাব দেখা দিলে সেচ দিতে হবে। জমির প্রকারভেদে ৩-৪টি সেচের প্রয়োজন হয়। সাধারণতঃ ইউরিয়া সার উপরি প্রয়োগের সময় জমিতে রস না থাকলে অবশ্যই সেচ দিতে হবে। সেচের পর রস বেশী দিন ধরে রাখার জন্য কোঁদাল দিয়ে মাটি কুপিয়ে দিতে হবে যাতে সহজেই রস নষ্ট না হয়।
ভূট্টার রোগ বালাই ও পোকামাকড়
ভূট্টা গাছে সাধারণতঃ লিফ ব¬াইট বা পাতার মড়ক, ইয়ার রট বা শীষ-পাঁচ ও ডাউনি মিলডিউ রোগ দেখা যায়। লিপ ব¬াইট বা পাতার মড়ক রোগে পাতার দীর্ঘ, ডিমাকৃতি, কালো বাদামী দাগ পড়ে এবং পরে পাতা মরে যায়। শীষ পচাঁ রোগে ভূট্টার মোচায় পচন ধরে এবং ভূট্টা পিঙ্গল বর্ণের দেখায়। এই দুই রোগ গাছে দেখা দিলে প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম কিউপ্রাভিট মিশিয়ে ¯েপ্র করতে হবে। প্রয়োজন হলে প্রতি ১৫ দিন পর পর কয়েক দফায় ছত্রাকনাশক ছিটাতে হবে।
ডাউনি মিলডিউ রোগে গাছের পাতায় লম্বা কোরটিক দাগ পড়ে এবং পাতার নীচে সাদা ছত্রাক দেখা যায়। এই রোগের আক্রমণে ভূট্টার মোচা পুরোপুরি আসে না বা আকারে ছোট হয়। এই রোগ একবার গাছে দেখা দিলে তা দমন করা যায় না। এর প্রতিরোধের জন্য বীজ বোনার আগেই তা শোধন করে নিতে হবে। রিডোমিল দিয়ে বীজ শোধন করা যেতে পারে। চারা অবস্থায় কাটুই পোকা ভূট্টা গাছ কেটে নষ্ট করে। এই জন্য প্রতি হিলে ৩-৪টি বীজ লাগাতে হয়। ভূট্টার গাছে সাধারণত মাজরা পোকা বা শুট বোরারের আক্রমণ দেখা যায়। এর ক্রীড়া কীট শুষ্ক গাছের ডগার মধ্যে গর্ত করে ঢুকে ডগার ভিতরে খেতে থাকে। উপযুক্ত ও অনুমোদিত কীটনাশক ছিটিয়ে এই পোকা দমন করা যায়।
সয়াবীনের পোকামাকড় ও রোবালাই
বিছাপোকা সয়াবীনের মারাত্মক ক্ষতি করে। ডিম থেকে ফোটার পর ছোট অবস্থায় বিছাপোকাগুলো একস্থানে দলবদ্ধভাবে থাকে। আক্রান্ত গাছের পাতা জালের মত ঝাঁঝরা হয়ে যায়। সহজেই দৃষ্টিগোচরীভূত এই চিহ্ন দেখে পোকাসহ পাতা তুলে নষ্ট করে ফেলা যায়। পোকার আক্রমণ বেশী হলে অথবা ছড়িয়ে পড়লে নগস ১০০ইসি, এলসান ৫০ইসি, মার্শাল ২০ ইসি এর যে কোন একটি কীটনাশক ঔষধ প্রতি ১ লিটার পানিতে ২ মি.লি. হিসেবে মিশিয়ে আক্রান্ত গাছে ছিটাতে হবে। এছাড়া রিপকর্ড ১০ ইসি, ডেসিস ২.৫ইসি, সুমিসাইডন ২০ ইসি এর যে কোন একটি কীটনাশক ঔষধ প্রতি ১ লিটার পানিতে ১ মি.লি. হিসেবে মিশিয়ে ¯েপ্র মেশিনের সাহায্যে ছিটাতে হবে।
কান্ডের মাছি পোকা কান্ড ছিদ্র করে ভিতরের নরম অংশ খেয়ে ফেলে। ফলে অচিরেই আক্রান্ত গাছের অংশ বিশেষ অথবা সম্পূর্ণ গাছ মারা যায়। শতকরা ১০ ভাগ গাছ এ পোকার দ্বারা আক্রান্ত হলে ডাইমেক্রন ১০০ ডবি¬উ এস সি প্রতি ১ লিটার পানিতে ২ মি.লি. হিসেবে মিশিয়ে ছিটাতে হবে।
পাতা মোড়ানো পোকা সামান্যই ক্ষতি করে। তবে পোকার আক্রমণ বেশী হলে ডাইমেক্রন ১০০ ডবি¬উ এসসি প্রতি লিটার পানিতে ২ মি. লি. হিসেবে মিশিয়ে সম্পূর্ণ গাছ ভিজিয়ে ¯েপ্র করতে হবে।
সয়াবীন ক্ষেতে মাঝে মধ্যে দু-একটা গাছে গোড়া পঁচা এবং পাতায় হলুদ রোগ বা মোজাইক দেখা দিতে পারে। জমি ভাল করে চাষ দিয়ে লাগালে এবং জমি স্যাঁত সে্যঁতে না হয় তবে গোড়া পঁচা রোগে ফসল খুব একটা আক্রান্ত হয় না। তবে পাতায় হলুদ রোগ বা মোজাইক দেখা দিলে আক্রান্ত গাছটি উঠিয়ে মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে।
ফসল সংগ্রহ ও সংরক্ষণ
সয়াবীন ফসল জাত ও মৌসুম ভেদে বপন থেকে ফসল কাটা পর্যন্ত ৯০-১২০ দিন সময় লাগে। ফসল পরিপক্ক হলে গাছগুলো শুটিসহ হলুদ হয়ে আসে ও পাতাগুলো ঝরে পড়তে শুরু করে। এ সময় গাছ কেটে ২/১ দিন রোদে শুকিয়ে নিয়ে লাঠি দিয়ে আস্তে আস্তে পিটিয়ে দানাগুলো আলাদা করা যায়। তিলের ন্যায় সয়াবীনের গাছ অনেক দিনে ধরে স্তুপকৃত রাখা ঠিক নয়। এতে করে বীজ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। মাড়াই করা বীজ রোদে ভাল করে শুকিয়ে শুষ্ক ও ঠান্ডা বীজ গুদামজাত করতে হয়। একক ফসল হিসাবে চাষ করলে সাধারণতঃ মৌসুম ও এলাকা ভেদে একর প্রতি সয়াবীনের ফলন ১৫ থেকে ২০ মণ হয়। অর্থাৎ হেক্টরে প্রায় ১৫০০ থেকে ২০০০ কেজি ফলন পাওয়া যায়। ভূট্টার সংগে আন্ত ফসল হিসেবে চাষ করলেসয়াবীনের হেক্টর প্রতি ফলন ৯০০-১২০০ কেজি হতে পারে।
আন্তঃফসল হিসেবে সয়াবীনের সঙ্গে ভূট্টা চাষ করলে ভূট্টার ফলন প্রতি হেক্টরে ২.৫০-৩.০০ টন পর্যন্ত পাওয়া যায়। ভূট্টা আন্তঃ ফসল হিসেবে চাষ করলে আর্থিকভাবে বেশি লাভবান হওয়া যায়।
























