শখের পাখি এভাবে জীবনের গতি বদলে দিবে আগে ভাবিনি মিলন
ড. বায়েজিদ মোড়ল
রাজশাহী শহরের বোয়ালিয়া থানার বালিয়াপুকুর গ্রামের বটতলা নামক স্থানের বাসিন্দা মামুনুর রশীদ মিলন। বাড়ীর বড় ছেলে হওয়ায় পিতা মারা যাবার পর সংসারের সমস্থ দায়ভার এসে পড়ে মিলনের উপর। মিলন তখন হাইস্কুলের ছাত্র। কি করবে কিভাবে এত বড় সংসার সে রক্ষা করবে। নানান ভাবনার মধ্যে দিয়ে তিনি মটর গাড়ীর পার্টস ক্রয় বিক্রয়ের একটি দোকান দেন। কোন ভাবে দিন চলতে শুরু করে মিলনের। মিলনের দোকানের পাশের একটি দোকান ছিল যে দোকানে পোষা পাখি ক্রয় বিক্রয় হতো। পাখি বিক্রেতা মোঃ রেজাউর রহমান আপেল একজন প্রভাবশালী বলে কয়েক জোড়া পাখি বিক্রির সাথে মোবাইল ফোনে টাকা লোড করার কাজ করে। মিলন অবসর সময়ে আপেলের সাথে পরামর্শ করে এই মটর গাড়ীর পার্টস বিক্রি করে কেবল মাত্র প্রতিদিনের চালের ও সবজীর খরচটা উঠে। কিন্তু রোগ শোক ঈদ পার্বনে কি করবে? তখনতো একটা এক্সটা অনেক টাকা লাগে আপেল অনেক সাহসী এজকন সে মিলনকে পরামর্শ দেয় খাচায় পাখি পালন করার। আপেলের কথায় মিলন প্রথমে ভয় পায়। সাহস করে শুরু করতে পারি নি।
এরপর ২০০৭ সালের কথা। তখন মিলন ইন্টারমিডিয়েট এ পড়ে। পড়াশুনা আবার সংসার চালানোর জন্য মটরপার্টসের দোকানে বসা। তারপরও নতুন কিছু একটা করতে হবে এই বাসনা তার মনের মাঝে ঝেকে বসে। কি করলে এক্সট্রা টাকা ইনকাম হবে। যার জন্য বাড়তী সময় ব্যয় করতে হবেনা। একদিন মিলন তার খালার বাসায় বেড়াতে গিয়ে দেখেন তার খালা খাঁচায় কয়েক জোড়া কবুতর পালন করছিলেন। সেই ব্যাপারটি মিলনকে বেশ আকৃষ্ট করে। খালার বাসা থেকে এসেই আপেলের সাথে পরামর্শ করে শখের বশেই ২০ টি বাজরিকা জাতের পাখি কিনে এনে খাঁচায় পালন শুরু করেন। সকালের ঘুম থেকে উঠে পাখির সেবা, তারপর বই পড়তে বসে, সেখান থেকে কলেজে যায়, কলেজ থেকে ফিরে এসে আবার পাখির সেবা যতœ খাবার দাবার ঠিক আছে কিনা সেটা তদারকি করে, তার পর হাত মুখ ধুয়ে নিজে দুপুরের খাবার খেয়ে আবার পাখিগুলো দেখে চলে যান মটর পার্টসের দোকানে। কোন কারণে দোকান থেকে বাসায় এলে মিলন চলে যায় পাখির কাছে, তারপর আবার সন্ধ্যা পর্যন্ত দোকানে গিয়ে বসে সেখান থেকে সন্ধ্যায় এসে আবার পাখির যতœ নিয়ে হাত মুখ ধুয়ে পড়তে বসে। এভাবে পাখির প্রতি যতœ নেওয়ায় পাখিরা মিলনের সাথে সেরকমই ব্যবহার করেছে। পাখিরা ডিম পেড়েছে, বাচ্চা দিয়েছে, এক বছরের মধ্যে তার খামারে পাখির সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে গেছে। অনেক বাসায় বাজরিকা ডিম পাড়ে কিন্তু বাচ্চা উৎপাদন করে না। কিন্তু মিলনের বাসায় বাজরিকা ঠিকমতোই ডিম পেড়েছে এবং বাচ্চা উৎপাদন করেছে। আর মিলন সেই ১০০টি বাজরিকা জাতের পাখি দিয়ে মিলন এই ব্যাতিক্রমী পাখির বাণিজ্যিক খামার গড়ে তোলার প্লান করেন পিছনে ছিল পরামর্শক আপেল। আপেল যা পারিনি সেটা হলো আপেল ভালোভাবে পাখির উৎপাদন করতে পারিনি। কিন্তু মিলন সেখানে সফল। এরপর আপেলের পরামর্শে মিলন লাভবার্ড, ককাটেল, লংটেল, ফিন্স, ডায়মন্ড ডোব, অস্ট্রেলিয়ান বার্ড, বিদেশী জাতের ঘুঘু ইত্যাদি বিভিন্ন প্রজাতির পাখি কিনে আনেন তার খামারে।
মিলনের বাড়িটা ১ তলা। বাড়ীর ছাদের একপাশে দোতালা করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ছাদ করতে পারেন নি বলে উপরে টিনের ছাবড়া দিয়ে সেখানে পাখিগুলো পালন শুরু করেন। দিন যায় মাস যায় মিলনের খামারে পাখির সংখ্যা বাড়তে থাকে। পাশে তিনি আরো একটা জায়গা সম্প্রসারণ করে সেখানে আরো কিছু পাখি পালন করতে থাকেন তারপরও প্রতি মাসেইতো পাখি বাড়তে লাগলো তখন তিনি একতলা চাদের পূর্ব পাশে একটু দেওয়াল গেথে সেখানেও পাখি তুললেন। এখন তার বাড়িতে মোট তিনটি ঘরে পাখি পালন চলছে।
খাচায় জন্ম খাচায় মৃত্য। শখের তোলা লাখ টাকা। ১৮০০টাকার পাখি নিয়ে মিলন পাখি পালন শুরু করেন। সেই মিলনই প্রতি মাসে ১৮০০০টাকার উপরে পাখিই বিক্র করেন। এখন তার মোট ৩ শতাধিক বাজরিকা পাখির প্যারেন্ট স্টক ও অন্যান্য পাখি আছে লাভবার্ড, ককাটেল, লংটেল, ফিন্স, ডায়মন্ড ডোব, অস্ট্রেলিয়ান বার্ড, বিদেশী জাতের ঘুঘু ইত্যাদি নিয়ে ১০০টির উপরে প্যারেন্ট স্টক আছে মিলনের এই খামারে। ঘরে খাচা করে আর ঘরের বাইরে হাড়ি পদ্ধতিতে তিনি এসব পাখি পালন করছেন।
খাঁচার মধ্যে ডিম পাড়তে কিংবা বাচ্চা উৎপাদনে তেমন সাচ্ছন্দ বোধ করে না এই পাখিরা। তখন আপেলের সাথে পরামর্শ করে এক ধরনের মাটির হাড়ির অর্ডার করে তৈরী করে আনলেন এবং সেই হাড়িতেই এই পাখিরা প্রজনন কাজটি করে থাকে। ১ জোড়া প্রাপ্ত বয়ষ্ক পুরুষ ও স্ত্রী পাখি বছরে সাধারণত ৩-৪ বার প্রজননে অংশ নেয়। আর প্রতিবারই প্রতি জোড়া পাখি ৬-৮ টি করে ডিম দেয়। সেই ডিম থেকে বাচ্চা হয়। আর সেই সব বাচ্চা ৪-৫ মাসেই আবার প্রাপ্ত বয়ষ্ক হয়ে যায়। এভাবে চক্রবৃদ্ধি হারে তার খামারে পাখির সংখ্যা বাড়তে থাকে। কিন্তু বাড়লেই কি হবে তার খামারের ধারণ ক্ষমতা হয়তো ১০০০ আছে কিন্তু সে এই ৫০০র মতো প্যারেন্ট স্টকই রাখতে চায় এই পাখি থেকে নতুন পাখি হবে। বাচ্চা বিক্রি করে আবার কোন প্যারেন্ট স্টক যদি বয়স্ক হয়ে যায় সেগুলো বিক্রি করে দিয়ে নতুন প্যারেন্ট ষ্টক তৈরী করেন। গড়ে প্রতি মাসে তার খামারে ২০০র অধিক পাখি জন্ম নেয় আর আপেলের মাধ্যমে পাখিগুলো ঢাকার কাটাবন মার্কেটে পাঠিয়ে দেয়। ঢাকার কাটাবন থেকে অনেক ধরনের বুদ্ধি পরামর্শ ও ওষুধ সরঞ্জামাদি দিয়েও সাহায্য করে। অনেক সময় কাটাবন থেকে অগ্রিম টাকা পাঠিয়ে দিয়ে পাখির অর্ডার করে, আবার অনেক সময় আগে পাখির অর্ডার করে পরে পাখি বিক্রি করে টাকা পাঠিয়ে দেয়।
প্রতি সপ্তাহে তিনি ২০-২৫ জোড়া করে পাখি স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেন। তার প্রতি জোড়া পাখির বিক্রয় মূল্য গড়ে ৩৫০-৪০০ টাকা করে। সর্বসাকুল্যে বর্তমানে তার খামারে প্রায় আড়াই থেকে ৩ লাখ টাকা মূল্যের পাখি রয়েছে। পাখি বিক্রি করে নতুন জাতের পাখি বৃদ্ধি করেন। তার সংসার চলে এখন পাখির উপর ভর করে।
বাড়ীর ছাদের উপর কিছু অংশে ফিলার করা ছিল সেই ফিলারে ঠেস দিয়ে দাড়িয়ে মিলন ভাবতো কি হবে তার জীবনে! কি ভাবে চলবে তার জীবন! কিভাবে ছোট ভাই বোনদের লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করবে! কিভাবে নিজে মানুষ হবে! জীবন যুদ্ধে সে কি হেরে যাবে! আজ সেই ফিলার গুলো দিয়েই তার শখের পাখির ঘর বানানো হয়েছে। যে ঘরের পাখি বিক্রি করে তার মাসে আয় হয় সকল খরচ বাদ দিয়ে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। যে ফিলারে সে একদিন মাথা ঠুকেছে সেই ফিলারেই সে এখন আনন্দের ধ্বনি শুনতে পায়। পাখির কিচির মিচির কলকাকলী। মিলনের বাড়ী এখন পাখি বাড়ী নামে পরিচিত হয়েছে। মিলন তার ছোট বোনের বিয়ে দিয়েছে এরপর নিজে বিয়ে করেছে তার এক ছেলে। সুখের সংসার এখন মিলনের।























