কয়লার জাতের মুরগী পালনকারী শাহদত হোসেন ও সোহেল হোসেনের গল্প

ঢাকার কেরানীগঞ্জ উপজেলার আটি বাজারের পাশ দিয়ে যে নদী বয়ে গেছে এই নদীর পাড়ের রাস্তা দিয়ে এক কিলোমিটার গেলে মধ্যেরচর গ্রামের একটি সুন্দর প্রাইমারি স্কুল। আর এই স্কুলের পিছনে গড়ে তুলেছেন একটি মুরগীর খামার। কেউ বলে এটা সোনালী মুরগীর খামার আবার কেউ বলে এটা দেশী মুরগীর খামার আবার কেউ বলে মুরগীর নামটা মিলাতে পারছিনা হাইব্রীড মুরগীর খামার। এখানে মুরগীর গাঁয়ের রংটাও কিন্তু গতানুগতিক পোল্ট্রি মুরগীর গাঁয়ের রং থেকে ভিন্ন। মুরগীর এ জাতটির নাম কয়লার। এই জাতটি মাংস উৎপাদনে বিখ্যাত জাত, আমেরিকার রোড আইল্যান্ড রেড এবং ডিম উৎপাদনকারী মিশরের বিখ্যাত ফাউমি জাতের মুরগীর সাথে ক্রস বা মিলন ঘটিয়ে সংকর জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। এই মুরগীর গায়ের রং সাধারণত সোনালীর মধ্যে কালো, পাখায় সাদা ফোটা ফোটা থাকে। গায়ের রং কখনো কখনো হলদে কালোও হয়ে থাকে। এটি আকারে অনেকটা মাঝারি গোছের। ডিমের খোসার রং ক্রিমের মত। ডিমের চেয়ে এই মুরগীর মাংসের চাহিদাই সবচেয়ে বেশী। আমাদের দেশের রেস্টুরেন্টগুলোতে সাধারণত দেশী মুরগীর মাংস বলে যেসব মুরগীর মাংস বিক্রি করা হয় তা এই কয়লার ও সোনালী নামের দুটি সংকর জাতেরই মুরগী। এই মুরগীর রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক বেশী। পূর্ণ বয়ষ্ক একটি কয়লার জাতের মুরগীর ওজন ১.৫-২ কেজি এবং মোরগের ওজন ২-২.৫ কেজি হয়ে থাকে। আমাদের দেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু এ জাতের মুরগী লালন-পালনের জন্য বেশ উপযোগী।
ইটের উপর দাড়িয়ে আছে এক মাতববর।এটার ঠ্যা চিবানোর লোভে কারো জিভে জল এসে যেতেই পারে। কেউ কেউ ভাববেন আমি নতুন কোন টপিক না পেয়ে মুরগী চেনানোর চেষ্টা করছি। যত সব আজে বাজে ভাবনা এই ড. বায়েজিদের।

হয়তো অনেকে জানেন ব্যাপারটা কিন্তু বেশির ভাগই বলবেন এইটা একটা মোটাসোটা দেশি মোরগের ছবি ছাড়া আর কিছুই না। এই দেশি মোরগ কথাটায় আমার আপত্তি আছে। আজকাল গ্রামের বাজারেও দেশি জাতের মোরগ পাওয়া যায় না।একেবারে অজপাড়া গায়ের মানুষেরা নিজেদের খাওয়ার জন্য আট দশটা দেশি মুরগী পালন করে থাকেন। আর টাকা পয়সার খুব দরকার হলে সেখান থেকে দু একটা বাজারে নিয়ে আসেন বিক্রি করার জন্য। তাহলে ঢাকার মতো জনবহুল শহরে প্রতিদিন যে হাজার হাজার মুরগী বিক্রি হয় সেগুলো কোথা থেকে আসে?
ঢাকার বাজারে বেপারীর ধোকায় দেশি মনে করে বেশি দাম দিয়ে যারা এ মোরগটি কেনে তার আসলে একটা পাকিস্তানী অরিজিন আমাদের দেশে যার নাম সোনালী আর এই কয়লার মোরগই কিনে নিয়ে যায়। আর বেপারীকেতো আসলে পুরো দোষ দেয়া যাবেনা স্বাদে গন্ধ্যে সোনালী ও কয়লার দুটি মুরগীই দেশীর মতো।
আমি চার মাস আগে গিছেলাম এমন একটি কয়লার খামারে। খামারটির দুটি ঘর মিলে কয়লার জাতের মুরগী ছিল প্রায় ৭ হাজার। খামারটির প্রতিষ্ঠাতা শাহাদাত হোসেন ও সোহেল হোসেন নামে দুইভাই। শাহাদত বড় আর সোহেল ছোট। শাহাদত যখন দশম শ্রেণীর ছাত্র তখন পিতা মারা যান। মা ভাই বোন মিলে সংসারে ৬ জন। সংসারের কিছুটা ভার এসে পড়ে শাহদতের উপর। অর্থের অভাবে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেলো। সবার পেটের অন্ন জোগানো বেশ কঠিন হয়ে দাড়ালো।সোহেল তখন ৭ম শ্রেনীর ছাত্র। তাকে দিয়েতো কোন কিছু করানো যায়না। এক আতœীয়র সহযোগিতায় শাহাদত ২০০০ সালে পাড়ি জমায় সৌদি আরবে। সেখান থেকে আয় করে টাকা পাঠায় সে টাকা দিয়ে সংসার চলতে থাকে। এর মধ্যে সোহেল ম্যাট্রিক পাস করে। সোহেলের লেখাপড়া করতে বেশি ভালো লাগেনা। সে বড় ভাইকে বলে সৌদি আরবে যাবে, বড় ভাই তার কথায় কর্ণপাত না করে তাকে দেশে থেকে ব্যবসা করতে বলে। সোহেল ২০১০ সালে একটি মাছের খামার প্রতিষ্ঠার চিন্তা করেন। কিন্তু এই এলাকাটা আবার মাছ চাষের জন্য বেশ প্রসিদ্ধ না হওয়ায় অনেক বন্ধু বান্ধব তাকে নিরুৎসাহী করে। পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ব্রয়লার মুরগীর খামার করেন। প্রথমদিকে অভিজ্ঞতা কম থাকায় তেমন সুবিধা করতে না পেরে পুনরায় শুরু করে কক মুরগীর লালন পালন। সেখানেও লোকসান গুনতে হয়েছে তার। কোন ভাবেই সোহেল ব্যবসা করে আয় বৃদ্ধি করতে পারছেনা। এর মধ্যে ২০১১ সালে শাহাদত হোসেন দেশে এলেন এবং ভাইয়ের কাছে সব কিছু শুনে চিন্তা করলেন একবার না পারিলে দেখ শত বার। দেশে থেকে যদি ব্যবসা করে কিছু করতে না পারি তাহলে দু ভাইকে সৌদি আরবেই চলে যেতে হবে।

সোহেল হোসেন
পরের দেশে গিয়ে হাড় ভাঙ্গা খাটুনি খেটে হয়তো এক সময় অনেক টাকা নিয়ে দেশে ফেরা যাবে তখনতো কোন না কোন কিছু করে খেতে হবে, বসে বসে তো খাওয়া যাবেনা। তাই দেশে থেকে যদি তিল তিল করে একটা ব্যবসা দাড় করাতে পারি তাহলে আর বিদেশে যেতে হবে না। আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে পাও বাড়াতে হবে না। মনে শাহাদতের প্রচন্ড জয় করবার দুর্দান্ত বাসনা। সে জয় করবেই। এবং দেশে থেকে জয় করে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করবে, এই বাসনায় দুই ভাই মিলে আবার মুরগীর ব্যবসা শুরু করলেন স্থানীয় এক বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে কয়লার জাতের মুরগীর বাচ্চা লালন পালন করবেন। খাবার উপযোগী করে বিক্রি করার ব্যবসা করবেন বলে সিদ্ধান্ত নেন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১ দিন বয়সের ৩ হাজার কয়লার জাতের মুরগীর বাচ্চা কিনে আনেন। ভাল ভাবে খাবার পরিবেশন ও সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে ৪০-৪৫ দিনেই সেগুলো বাজারে বিক্রির উপযুক্ত হয়ে উঠে। তিনি খামারেই প্রতি কেজি মুরগী বিক্রি করেন ১৮০-২০০ টাকায়। তারা প্রথমবার কয়লার জাতের মুরগীগুলো বিক্রি করেন ৭,৫০,০০০/-টাকা। দুই মাসের মধ্যে খরচ বাদ দিয়ে তাদের লাভ আসে ৩,০০,০০০/-টাকার উপরে। দু ভাই পেয়ে গেলেন মজা। দেশে থেকে প্রতি মাসে দেড় লাখা টাকা আয়। কল্পনাও করা যায় না। শাহদত পরিত্যাগ করলো পুনরায় সৌদি আরব যাওয়ার। প্রতিবার মুরগী তুলছে বিক্রি করছে এভাবে চার লাখ টাকা খরচ করে সুন্দর একটি ঘর তৈরী করেছে ওরা বসবাসের জন্য। আর শুধু সুন্দর ঘর তৈরী করলে হবে? ঘরনীরও দরকার আছে। তখন পরিবার থেকে দেখে পাশের গ্রামে শাহদতকে বিয়ে করিয়ে এনেছেন সুন্দর মনের এক বউ। এখন খামার দেখাশুনা করেন তিন জন। খামারে সেড বেড়েছে প্রথমে এক তারপর দুই চার মাস আগে আমি যখন ওদের খামার পরির্দনে যাই তখন ওদের খামারে মুরগী ছিল ৯ হাজার। আর পাশে আরো বড় একটি সেড তৈরী হচ্ছে যে সেডে ৫ হাজার মুরগী পালন করা যাবে। বাড়ীতে মাত্র কয়েক শতক জমি ছিল এখন কয়েক বিঘা জমি এর মধ্যে কিনে ফেলেছে। ফার্মের উত্তর পাশ ও দক্ষিণ পাশ খোলা বাতাস আসে এবং বাসাত বেরিয়ে যায়। ফার্মের চার পাশ দিয়ে যে ফাকা জায়গা আছে সেখানে তারা মৌসুমী সবজী পুইশাক, পালনশাক, ডাটা, রাঙ্গাশাক, ঢেঢ়শ, বেগুন ও মরিচ প্রভৃতি চাষ করেন। আমি মুরগীগুলো দেখে নিজের লোভ সামলাতে পারলামনা। চারটি মুরগী নিলাম আমার কাছ থেকে ওরা মাত্র ৭০০টাকা নিল। আমার স্ত্রী কন্যা মুরগীগুলো দেখে অনেক খুশি। আমি মুরগীগুলো জবাই করে ছুলে কুটে নিয়ে এলাম আমার বাসায় ঢুকার আগে দোকানে ওজন করলাম দেখলাম পাঁচ কেজি ছয়শ গ্রাম আছে। ওরা তখনও খামার থেকে মুরগীগুলো বিক্রি শুরু করেনি। বলেছিল সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই বিক্রি শুরু করবে।এই মুরগীর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সোনালী মুরগীর চেয়ে এই মুরগী গুলোর গায়ে মাংসের পরিমান একটু বেশি হয়। স্বাদের দিক থেকে দেশি মুরগীর মতো।

আসলে নতুন কোন কিছু করলে ভাল করা যায়। ওরা দুই ভাই মুরগী পালনের উপর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। শাহাদত ও সোহেলের দেখা দেখি এখন আটি বাজার এলাকার অনেক এখন এই কয়লার জাতের মুরগী পালন করছে। অনেক খামারীকে ওরা পরার্শ দেয় কিভাবে পালন করতে হবে! মুরগীকে কখন কিভাবে পরিচর্যা করতে হবে! কখন কি ধরনের ভ্যাকসিনেশন করতে হবে!
এক জনের সাফল্য আরেক জনের জন্য উৎসাহ উদ্দিপনা। ঢাকার কেরানীগঞ্জ উপজেলার মধ্যরচর গ্রামের এই দুই ভাই তাদের জীবনের টিকে থাকার কঠিন সংগ্রাম চালিয়ে দারিদ্রতাক জয় করে উপনিত হয়েছে ব্যবসায়ী হিসেবে। ইতি মধ্যে তারা মুরগীর খাবার ও ওষুধ বিক্রির জন্য একটি দোকান স্থাপন করছে।তারা আরো সামনে এগিয়ে যাবে। সামনে তারা এই কয়লার জাতের মুরগীর হ্যাচারি করবে বলে আশা প্রকাশ করছে।
























