আঙ্গুর চাষ পদ্ধতি

আঙ্গুর আমাদের দেশে রোগীর পথ্য হিসেবে ব্যাপক ব্যবহৃত একটি ফল। এতে প্রোটিন,শর্করা,চর্বি, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, লৌহ, খনিজ, পটাশিয়াম, থায়ামিন, রিবোফ্লাবিন, ভিটামিন-এ, বি, সি উপাদান রয়েছে। তাছাড়া প্রতি কেজি আঙ্গুর থেকে প্রায় ৪৫০ ক্যালরি খাদ্যশক্তি পাওয়া যায়।
বর্তমানে বাংলাদেশেও আঙ্গুরের চাষ জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
মাটি
উর্বর অথচ পানি জমে থাকে না এমন দো-আঁশ মাটি আঙ্গুর চাষের জন্য উপযুক্ত। তবে বেলে দো-আঁশ মাটিতেও পর্যাপ্ত জৈব সার ব্যবহার করে আঙ্গুর চাষ করা যায়। আমাদের দেশের যে অঞ্চলের মাটির পিএইচ ৬.৫০ থেকে ৭.০০ এর মধ্যে আছে সেসব অঞ্চলে আঙ্গুর চাষ ভালো হবে। যেসব অঞ্চলের মাটিতে পিআইচ ৫.৫০ এর নিচে সেসব অঞ্চলে আঙ্গুর চাষ করতে হলে মাটিতে চুন ব্যবহার করতে হবে। আঙ্গুর চাষের জন্য পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের দরকার হলেও ভেজা ও স্যাঁতসেঁতে মাটিতে আঙ্গুরের চারা বাড়তে পারে না। তাছাড়া শক্ত মাটি আঙ্গুর চাষের জন্য ভালো নয়। তাই বাতাস চলাচলসহ গাছের প্রয়োজনীয় পানিও খাদ্য ধারণে সক্ষম এবং প্রচুর জৈব পদার্থ রয়েছে এমন মাটি আঙ্গুর চাষের জন্য উপযোগী।
জাত
বাংলাদেশে বর্তমানে আঙ্গুরের ৩টি জাত বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। জাতগুলো হলো-
জাক্কাউঃ
এ জাতটি বছরে দু’বার ফলন দেয়। প্রথমবার মার্চ-এপ্রিলে (১৭ ফাল্গুন-১৭ বৈশাখ) ফুল আসে এবং জুন-জুলাইতে ফল পাকে, দ্বিতীয়বার ফল আসে জুলাই-আগস্টে (১৭ আষাঢ়-১৬ভাদ্র) এবং ফল পাকে অক্টোবর-নভেম্বর (১৬ আশ্বিন-১৬ অগ্রহায়ন) মাসে। ফুল হতে ফল পাকার জন্য মোট ১২০দিন সময় লাগে। প্রথমদিকে আঙ্গুরের রঙ গাঢ় সবুজ থাকে তবে পাকার আগে বাদামী রঙ ধারণ করে। এ আঙ্গুরে বীজ থাকে, ছল কিছুটা শক্ত, তবে বেশ রসালো এবং চিনি বা ফ্রুকটোজের পরিমাণ শতকরা ১৮-২০ ভাগ। এ থেকে জ্যাম, জেলি ও আচার তৈরি করা যায়।
ব্ল্যাক পার্লঃ
এটি একটি দ্রুতবর্ধনশীল জাত। লতা হালকা খয়েরী রঙয়ের এবং জাক্কাউয়ের মতো বছরে দু’বার ফলন দেয়। ফুল আসার প্রায় ৮০-৯০ দিন পর থেকে আঙ্গুরের সবুজ রঙ ধীরে ধীরে মেরুন রঙ-এ পরিবর্তিত হয় এবং পাকার পূর্বে সম্পূর্ণ গাঢ় কালো-লাল রঙ-এ রুপান্তরিত হয়। এটিও বীজযুক্ত আঙ্গুর এবং এতে চিনির পরিমাণ রয়েছে শতকরা ১৭-১৮ ভাগ।
ব্ল্যাক রুবি ঃ
এ জাতের গাছ ধীরে ধীরে বাড়ে এবং কচি অবস্থায় পাতা হালকা লাল রঙয়ের হয়। এ জাতের আঙ্গুরের রং প্রথমে সবুজ হলেও পরে ফুল আসার ৮০-৯০ দিন পর চামড়ার রঙ কালো হতে শুরু করে এবং পাকলে গাঢ় কালো রঙ হয়ে যায়। জাক্কাউয়ের মতো এরাও বছরে দু’বার ফলন দেয়। বীজযুক্ত এ আঙ্গুরে চিনির পরিমাণ শতকরা ১৮-১৯ ভাগ। ফল পাকতে ১১০ থেকে ১২০ দিন সময় লাগে। এ জাতের ফলন পূর্বেও দুই জাতের তুলনায় কম হলেও থোকাগুলো খুবই আকর্ষনীয়।
এখানে আলোচিত ৩টি জাত ছাড়া আমাদের দেশে আরো যেসব জাতের চাষ করা যেতে পারে সেসব হচ্ছে- হোয়াইট মালাগ, বাঙ্গালোর নীল, কনর্কড, বিউটি সীডলেস, পুষা সীডলেস, থমসন সীডলেস, আনাব-ই-শাহী, পারফেক্ট ইত্যাদি।
বংশ বিস্তার
আঙ্গুরের বংশ বৃদ্ধি বীজ এবং কলমের মাধ্যমে হতে পারে। তবে বিভিন্ন পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে যে, বীজের মাধ্যমে বংশবিস্তার করা হলে মাতৃগাছের গুণাগুণ সঠিকভাবে বজায় থাকে না। অপরদিকে কাণ্ডের কাটিং প্রাফটিং ও বার্ডিং পদ্ধতিতে কলমের মাধ্যমে বংশবিস্তার করলে মাতৃগাছের গুণাগুন যথেষ্ট বজায় থাকে। তাই বীজের পরিবর্তে কলমের মাধ্যমে বংশ বিস্তার বা চাষাবাদ করাই উত্তম। আঙ্গুরের কলম তৈরির কয়েকটি
পদ্ধতি এখানে সংক্ষেপে বর্ণনা করা হলোঃ
কাটিং পদ্ধতি ঃ
এটি সবচেয়ে সহজ ও জনপ্রিয় পদ্ধতি। প্রধানত শীতের সময় আঙ্গুর গাছ সুপ্ত অবস্থায় থাকে। সেজন্য কাটিং করার এটিই উপযুক্ত সময়। কাটিং করতে হলে জানুয়ারি (১৮পৌষ-১৮মাঘ) মাসের দিকে প্রথমে তিন চোখবিশিষ্ট একটি কাণ্ড বেছে নিতে হবে। তারপর ১৫ সে.মি. লম্বা করে কাণ্ডটি ধারালো ছুরি দিয়ে উপরের দিকে সমান তেরছা করে এবং নিচের দিকে সমান্তরাল করে কাটতে হবে। কাণ্ড কাটার পর সেগুলো একত্রিত করে বেঁধে অন্ধকার ঘরে প্রায় ২৪ ঘন্টা রেখে দিতে হবে, যাতে কাটা অংশ থেকে বের হওয়া আঠালো রস শুকিয়ে যেতে পারে। তারপর কাণ্ডের একটি চোখ গিঁটসহ কিছুটা কাত করে বীজতলায় রোপণ করতে হবে, অপর দু’টি চোখ মাটির উপরের দিকে থাকবে। কাটিং রোপণের ৪-৫ সপ্তাহ পর সেচ দিতে হবে এবং কাটিং রোপণের ৩-৪ মাস পর চারাগুলো মূল জমিতে রোপণ করতে হবে। সাধারণত জানুয়ারি (১৮ পৌষ-১৮ মাঘ) মাসে কাটিং বীজতলায় রোপণ করা হলে, ফ্রেরুয়ারি (১৯মাঘ-১৬ ফাল্গুন) মাসে নতুন পাতা গজাতে শুরু করে এবং মার্চ-এপ্রিল (১৮ ফাল্গুন-১৬ চৈত্র) মাসে মূল জমিতে রোপণের উপযুক্ত হয়।
গুটি কলম পদ্ধতি
আঙ্গুরের সুস্থ, সবল ও সোজা কাণ্ড বেছে নিয়ে তার ২-৩ সে.মি (১ ইঞ্চি) পরিমাণ জায়গা থেকে বাকল বা চামড়া ছুরি দিয়ে তুলে ফেলতে হবে, যাতে কাঠ দেখা যায়। তবে কাণ্ডের বাকল তোলা স্থানটি যাতে দু’টি চোখের মাঝামাঝি অবস্থানে থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। তারপর বাকল তোলা স্থানে সার-গোবর মিশ্রিত মাটি (৩ ভাগ এঁটেল মাটি ও ১ ভাগ পচা গোবর) লাগিয়ে পলিথিন কাগজ দিয়ে মুড়িয়ে দুই মাথায় সুতলী দিয়ে বেঁধে দিতে হবে। এভাবে ৩-৪ সপ্তাহ থাকার পর বাকল তোলা স্থান থেকে নতুন শিকড় গজাতে শুরু করবে এবং তখন তা কেটে মূল জমিতে রোপণের ব্যবস্থা করতে হবে।
বাডিং পদ্ধতি
বাডিং পদ্ধতিতে আঙ্গুরের এক জাতকে অন্য জাতে রূপান্তরিত করা যায়। এ পদ্ধতি গোলাপ ফুলের বাডিং এর মতোই। প্রথমে স্টক গাছের কিছু অংশের চামড়া বা বাকল তুলে সেখানে অন্য একটি নির্বাচিত গাছের একই পরিমাণ চোখসহ চামড়া লাগিয়ে প্লাস্টিকের পাতলা কাগজ দিয়ে চোখটা বাদ দিয়ে বাকি অংশ মুড়িয়ে দিতে হবে এবং ১০-১৪ দিন পর দেখা যাবে যে সংযুক্ত বাকলটি স্টক গাছের সাথে লেগে গেছে। তখন প্লাষ্টিক কাগজের বাঁধন খুলে দিতে হবে এবং স্টক গাছের উপরের অংশ কেটে দিতে হবে।
গাছের কাণ্ড ছাঁটাই পদ্ধতি
আঙ্গুর গাছের ডাল ও কাণ্ড ছাঁটাই অত্যন্ত জরুরি একটি বিষয়। আঙ্গুর গাছের নতুন ডালে ফুল ও ফল ধরে বিধায় সঠিক নিয়মে কাণ্ড ছাঁটাই না করা হলে ফুল ফল ধরবে না। গাছ রোপণের পর হতে মাচায় ওঠা পর্যন্ত প্রধান কাণ্ড ছাড়া অন্যান্য সকল পার্শ্ব শাখা ভেঙে দিতে হবে যাতে গাছ তাড়াতাড়ি বাড়ে। এখন আঙ্গুরের কাণ্ড ছাঁটাই পদ্ধতি বিষয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো।
প্রথম ছাঁটাই
মাচায় কাণ্ড উঠার ৫০ সে.মি (২০ ইঞ্চি) পর প্রথম কাণ্ডের শীর্ষদেশ ভেঙে দিতে হবে যাতে কাণ্ডের উভয়দিক হতে দু’টি করে চারটি শাখা গজায়।
দ্বিতীয় ছাঁটাই
প্রথম ছাঁটাইয়ের ১৫-২০ দিন পর যখন শাখাগুলো আরো প্রায় ৫০ সে.মি. (২০ ইঞ্চি) পরিমাণ হবে তখন উক্ত ৪টি শাখার মাথা কেটে দিতে হবে যাতে প্রতিটি শাখার উভয়দিক হতে পূর্বের মতো ২টি করে মোট ১৬টি
প্রশাখা গজায়।
তৃতীয় ছাঁটাই
১৬টি প্রশাখা ২০-২৫ দিন পর যখন প্রায় ৪০-৫০ সে.মি. লম্বা হবে তখন আবারো প্রত্যেকটি প্রশাখার মাথা কেটে দিতে হবে। এভাবে ১৬টি প্রশাখা হতে ৬৪টি প্রশাখা গজাবে। তবে গাছের দুর্বলতার জন্যে অনেক
সময় এতগুলো প্রশাখা পাওয়া যায় না। সাধারণত আঙ্গুর গাছের ছাঁটাই খুব সাবধানে করা দরকার যাতে ফলবান শাখা ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে না কাটা পড়ে।
জমি তৈরি ও সার প্রয়োগ
পানি জমে থাকবে না অথবা পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রয়েছে এমন বেলে দো-আঁশ মাটির জমি আঙ্গুর চাষের জন্য নির্বাচন করা হয়ে থাকে। বাগান তৈরির পূর্বে জমি ভালোভাবে চাষ করে মাটি ঝুরঝুরা করে নিতে হবে। তারপর চারা রোপণের জন্য মাদা বা গর্ত তৈরি করতে হবে। গর্তের আকার হবে যথাক্রমে দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও গভীরতায় ৭৫ সে.মি. (২১২ফুট) হারে। চারা রোপণের পূর্বে প্রতি মাদা বা গর্তে ৪০ কেজি গোবর বা আবর্জনা পচা সার, ১০০ গ্রাম ইউরিয়া, ৫০০ গ্রাম টিএসপি, ৪০০ গ্রাম এমপি সার এবং ১০০ গ্রাম সরিষার খৈল ভালোভাবে মাদার মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। তারপর গর্ত বা মাদাটি ২০-২৫ দিন ফেলে রেখে নিয়মিত সেচ দিতে হবে যাতে মাদায় সারগুলো পচে যায়।
চারা রোপণ
সার প্রয়োগের পর মাদা বা গর্তটি যখন চারা রোপণের উপযুক্ত হবে তখন বীজতলা থেকে সুস্থ, সবল ও সতেজ চারা তুলে রোপণের ব্যবস্থা করতে হবে। চারা রোপণের পর হালকা সেচ দিতে হবে এবং চারাটি যাতে সোজা হয়ে বাড়তে পারে সেজন্য একটি কঞ্চি বা খুর্ঁুটি চারার সাথে হালকা করে বেঁধে দিতে হবে। বাংলাদেশে সার¬া ব¬ছরই আঙ্গুরের চারা রোপণ করা যায় এবং এ দেশের আবহাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে মার্চ-এপ্রিল (১৭ ফাল্গুন-১৭বৈশাখ) মাস চারা রোপণের উপযুক্ত সময়।
সার ব্যবস্থাপনা
চারার বয়স সারের মাত্রা/ চারা বা গাছপ্রতি
গোবর গরিষার খৈল ইউরিয়া টিএসপি এমওপি
১-৩ বছর ২৫ কেজি ৫০ গ্রাম ১০০ গ্রাম ৫০০ গ্রাম ৪০০ গ্রাম
৪ বছর এবং এর অধিক ৩০-৪০ কেজি ১০০ গ্রাম ১৫০ গ্রাম ৬০০ গ্রাম ৫০০ গ্রাম
প্রতি বছর জানুয়ারি মাসে গাছ ছাঁটাইয়ের পর উলিখিত হারে সার প্রয়োগ করা প্রয়োজন।
অন্যান্য পরিচর্যা
# আঙ্গুরের চারা রোপণের পর ফুল আসার সময় এবং খরার সময় গাছে পরিমিত সেচ দিতে হবে।
# আঙ্গুরের কাণ্ড লতা ভালোভাবে বেড়ে উঠার জন্য মাচা তৈরি করে দিতে হবে।
























