১৬ বছরেও রপ্তানিমুখী হয়নি পোল্ট্রি শিল্প: যেসব উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছিল শেখ হাসিনা সরকার।।
ড. বায়েজিদ মোড়লের গবেষণায় যা যা উঠে এসেছে…

বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্প দেশের প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখার অন্যতম প্রধান খাত। নব্বইয়ের দশকে সীমিত পরিসরে বাণিজ্যিক পোল্ট্রি খামার গড়ে উঠলেও পরবর্তী সময়ে বেসরকারি উদ্যোক্তা, খামারি, হ্যাচারি, ফিডমিল, ওষুধ কোম্পানি এবং বিপণনকারীদের বিনিয়োগে এ শিল্প দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে।
২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতায় ছিল। সময়টি পূর্ণ ১৬ বছর না হলেও রাজনৈতিক ও প্রচলিত আলোচনায় একে প্রায়ই “১৬ বছর” বলা হয়। এই সময়ে দেশে মুরগি, ডিম ও বাণিজ্যিক পশুখাদ্যের উৎপাদন বেড়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রকাশিত ধারাবাহিক উপাত্তেও পোল্ট্রি ও প্রাণিজ পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধির চিত্র পাওয়া যায়। তবে উৎপাদন বৃদ্ধির বড় অংশই এসেছে বেসরকারি উদ্যোক্তা ও লাখো ক্ষুদ্র-মাঝারি খামারির বিনিয়োগ ও ঝুঁকি গ্রহণের মাধ্যমে।
সরকার প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্প, প্রশিক্ষণ, ভ্যাকসিন, গবেষণা, ঋণ এবং কিছু অবকাঠামোগত কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পেও মুরগিসহ বিভিন্ন প্রাণিসম্পদ মূল্যশৃঙ্খল, খাদ্যনিরাপত্তা, প্রাণিস্বাস্থ্য এবং খামারিদের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। সুতরাং সরকার কিছুই করেনি—এমন মন্তব্য যথার্থ হবে না। কিন্তু একটি পূর্ণাঙ্গ, প্রতিযোগিতামূলক এবং রপ্তানিমুখী পোল্ট্রি শিল্প গড়ে তুলতে যে কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন ছিল, তার বড় অংশই সময়মতো বাস্তবায়িত হয়নি।
ড. বায়েজিদ মোড়লের গবেষণা ও খাতসংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে—দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি, খাদ্যের উচ্চমূল্য, বাজারে অস্থিরতা, রোগ নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা, মান নিয়ন্ত্রণ ও ট্রেসেবিলিটির অভাব, রপ্তানি অবকাঠামোর সংকট এবং প্রান্তিক খামারিদের জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষা না থাকায় বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্প সম্ভাবনা অনুযায়ী এগোতে পারেনি।
১. একটি স্বতন্ত্র ও সময়োপযোগী জাতীয় পোল্ট্রি নীতি প্রণয়ন করা প্রয়োজন ছিল
পোল্ট্রি শিল্পকে দীর্ঘদিন প্রাণিসম্পদ খাতের একটি উপখাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। অথচ এই শিল্পের সঙ্গে হ্যাচারি, ব্রিডিং ফার্ম, ফিডমিল, ওষুধ ও ভ্যাকসিন, ডিম ও মাংস উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন, কোল্ডচেইন, খুচরা বাজার এবং রপ্তানি—একটি বিশাল মূল্যশৃঙ্খল যুক্ত।
শেখ হাসিনা সরকারের উচিত ছিল প্রথম কয়েক বছরের মধ্যেই একটি স্বতন্ত্র জাতীয় পোল্ট্রি উন্নয়ন ও রপ্তানি নীতি প্রণয়ন করা। সেই নীতিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়া দরকার ছিল—
- আগামী ১০ থেকে ২০ বছরের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা;
- খামারের অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনা;
- খাদ্য, বাচ্চা ও ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণ;
- ক্ষুদ্র খামারিদের সুরক্ষা;
- রোগমুক্ত অঞ্চল প্রতিষ্ঠা;
- প্রক্রিয়াজাত মাংস ও ডিম রপ্তানির পরিকল্পনা;
- পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা;
- মূল্য স্থিতিশীলতা ও বাজার তদারকি।
বিচ্ছিন্ন প্রকল্প নেওয়া হলেও পুরো শিল্পকে উৎপাদন থেকে রপ্তানি পর্যন্ত এক কাঠামোর মধ্যে আনার মতো শক্তিশালী নীতি ও বাস্তবায়ন কর্তৃপক্ষ গড়ে ওঠেনি।
২. পোল্ট্রি উন্নয়ন বোর্ড বা শক্তিশালী সমন্বয়কারী কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়নি
পোল্ট্রি শিল্পের সঙ্গে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসটিআই, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান যুক্ত।
কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নিয়মিত সমন্বয়ের জন্য স্বতন্ত্র বাংলাদেশ পোল্ট্রি উন্নয়ন বোর্ড বা উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন স্থায়ী কমিশন গঠন করা হয়নি।
এ ধরনের একটি বোর্ড থাকলে—
- উৎপাদন ও চাহিদার সঠিক পূর্বাভাস দেওয়া যেত;
- বাচ্চা ও খাদ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা যেত;
- রোগের সময় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া যেত;
- আমদানি ও রপ্তানি নীতি সমন্বয় করা যেত;
- ক্ষুদ্র খামারি ও বড় কোম্পানির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হতো।
সমন্বিত প্রতিষ্ঠান না থাকায় অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে সংকট সৃষ্টি হওয়ার পরে। ফলে নীতিনির্ধারণ প্রায়ই ছিল প্রতিক্রিয়াশীল, পূর্বপরিকল্পিত নয়।
৩. পোল্ট্রি খাদ্যের কাঁচামালে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা গড়ে তোলা হয়নি
পোল্ট্রি উৎপাদন ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ খাদ্য। বাণিজ্যিক মুরগির খাদ্যে সাধারণত ভুট্টা প্রধান উপাদান এবং সয়াবিন মিল গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন উৎস। বিভিন্ন সময়ের খাতভিত্তিক প্রতিবেদনে পোল্ট্রি ফিডে প্রায় ৫৫–৬৫ শতাংশ পর্যন্ত ভুট্টা এবং প্রায় ২০–৩০ শতাংশ সয়াবিন মিল ব্যবহারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশকে ভুট্টা, সয়াবিন, সয়াবিন মিলসহ বিভিন্ন খাদ্য উপাদানের একটি অংশ আমদানি করতে হয়। বৈদেশিক মুদ্রার দাম, আন্তর্জাতিক বাজার, জাহাজভাড়া, বন্দরের ব্যয় এবং আমদানি শুল্কের পরিবর্তনে খাদ্যের দাম বেড়ে গেলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন প্রান্তিক খামারিরা। পরবর্তী সময়ের তথ্যে দেখা যায়, দেশের সয়াবিনের মোট চাহিদার খুব সামান্য অংশ অভ্যন্তরীণভাবে উৎপাদিত হয় এবং সয়াবিনজাত কাঁচামালের একটি বড় অংশ আমদানিনির্ভর।
সরকারের উচিত ছিল—
১. পোল্ট্রি ফিড গ্রেড ভুট্টা ও সয়াবিনের জন্য আলাদা উৎপাদন অঞ্চল ঘোষণা করা;
২. কৃষকদের উন্নত বীজ, যান্ত্রিক শুকানো ও সংরক্ষণ সুবিধা দেওয়া;
৩. ভুট্টা ও সয়াবিনের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নির্ধারণ করা;
৪. সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে সাইলো ও গুদাম নির্মাণ করা;
৫. বিকল্প প্রোটিন ও জ্বালানি উপাদান নিয়ে গবেষণা বাড়ানো;
৬. কাঁচামাল আমদানিতে স্থিতিশীল ও পূর্বঘোষিত শুল্কনীতি রাখা;
৭. খাদ্য উপাদানের মান পরীক্ষার জন্য আঞ্চলিক পরীক্ষাগার প্রতিষ্ঠা করা।
এসব উদ্যোগ যথেষ্ট মাত্রায় নেওয়া হলে খাদ্যমূল্যের অস্থিরতা কমত এবং বাংলাদেশের মুরগি ও ডিম আন্তর্জাতিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক হতে পারত।
৪. ডে-ওল্ড চিক বা এক দিনের বাচ্চার বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি

ব্রয়লার ও লেয়ার খামারের শুরুতেই খামারিকে এক দিনের বাচ্চা কিনতে হয়। কিন্তু চাহিদা ও সরবরাহে ভারসাম্য না থাকলে বাচ্চার মূল্য কখনো অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, আবার কখনো উৎপাদন খরচের নিচে নেমে আসে।
সরকারের উচিত ছিল—
- প্রতিটি হ্যাচারির উৎপাদনক্ষমতা ও সাপ্তাহিক উৎপাদন অনলাইনে প্রকাশ করা;
- গ্র্যান্ড প্যারেন্ট, প্যারেন্ট স্টক ও বাণিজ্যিক বাচ্চার কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরি করা;
- বাচ্চার মান, টিকা, ওজন এবং মাতৃরোগের অবস্থা সনদে উল্লেখ বাধ্যতামূলক করা;
- কৃত্রিম সংকট বা অতিরিক্ত উৎপাদন ঠেকাতে উৎপাদন পূর্বাভাস দেওয়া;
- অস্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণ ও সিন্ডিকেটের অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করা।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নথিতে বিভিন্ন সময়ে এক দিনের বাচ্চা বা DOC-সংক্রান্ত অসংখ্য আমদানি অনুমতি ও অনাপত্তিপত্রের উপস্থিতি দেখা যায়। কিন্তু আমদানি অনুমতি দেওয়ার পাশাপাশি দেশীয় চাহিদা, উৎপাদন, মূল্য এবং মানকে একই ডিজিটাল ব্যবস্থায় পর্যবেক্ষণের কার্যকর পদ্ধতি গড়ে ওঠেনি।
৫. ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারিদের জন্য মূল্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়নি
বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্পের সবচেয়ে দুর্বল অংশ হচ্ছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারি। বড় কোম্পানির অনেক ক্ষেত্রে নিজস্ব হ্যাচারি, ফিডমিল, ওষুধ সরবরাহ, পরিবহন, প্রসেসিং ও বিপণনব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু প্রান্তিক খামারিকে বাজারদরে বাচ্চা, খাদ্য ও ওষুধ কিনে মধ্যস্বত্বভোগীর কাছে মুরগি বা ডিম বিক্রি করতে হয়।

ফলে উৎপাদন উপকরণের মূল্য বেড়ে গেলে খামারির খরচ বাড়ে, আবার বাজারে মুরগি বা ডিমের দাম কমলে ক্ষতির পুরো চাপও খামারির ওপর পড়ে।
সরকারের উচিত ছিল—
- মুরগি ও ডিমের বিজ্ঞানসম্মত উৎপাদন ব্যয় নিয়মিত ঘোষণা করা;
- উৎপাদন ব্যয়ের নিচে দীর্ঘ সময় বিক্রি হলে জরুরি সহায়তা দেওয়া;
- জেলা পর্যায়ে খামারি বিপণন সমবায় গঠন করা;
- কৃষকের বাজার বা সরাসরি বিক্রয়কেন্দ্র চালু করা;
- ডিজিটাল নিলাম ও দৈনিক পাইকারি মূল্য প্রকাশ করা;
- বড় কোম্পানি ও চুক্তিবদ্ধ খামারির জন্য ন্যায্য চুক্তি আইন করা।
ক্ষুদ্র খামারিদের জন্য অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ, মানসম্পন্ন বাচ্চা, সাশ্রয়ী খাদ্য, প্রাণিস্বাস্থ্যসেবা এবং ন্যায্য বাজারদর প্রয়োজন—এ বিষয়টি বিভিন্ন গবেষণায়ও গুরুত্ব পেয়েছে।
৬. বাজারে সিন্ডিকেট, অস্বচ্ছতা ও মূল্য কারসাজি বন্ধে স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়নি
পোল্ট্রি বাজারে প্রায়ই একই সময়ে খামার পর্যায়ে কম দাম এবং ভোক্তা পর্যায়ে বেশি দামের অভিযোগ ওঠে। অর্থাৎ খামারি লোকসান করলেও ভোক্তা সবসময় কম দামে মুরগি বা ডিম পান না।

এর অন্যতম কারণ—
- একাধিক মধ্যস্বত্বভোগী;
- দৈনিক উৎপাদনের নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাব;
- পাইকারি বাজারের অস্বচ্ছতা;
- অঞ্চলভেদে ভিন্ন মূল্য;
- সংরক্ষণ ও কোল্ডচেইনের সীমাবদ্ধতা;
- খামারিদের দরকষাকষির ক্ষমতা কম থাকা।
সরকারের উচিত ছিল একটি জাতীয় ডিজিটাল পোল্ট্রি মার্কেট ইন্টেলিজেন্স সিস্টেম চালু করা। এতে প্রতিদিনের বাচ্চা, খাদ্য, ডিম, জীবন্ত মুরগি এবং প্রক্রিয়াজাত মাংসের উৎপাদন, সরবরাহ ও মূল্য প্রকাশ করা যেত।
শুধু বাজারে অভিযান পরিচালনা করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। বাজারের কাঠামো স্বচ্ছ করা এবং খামারিকে সরাসরি ক্রেতার সঙ্গে যুক্ত করাই ছিল স্থায়ী সমাধান।
৭. প্রাণিস্বাস্থ্য, রোগ নির্ণয় ও বায়োসিকিউরিটিতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ হয়নি
পোল্ট্রি শিল্পে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা, নিউক্যাসল, গামবোরো, ইনফেকশাস ব্রংকাইটিস, ককসিডিওসিস এবং অন্যান্য রোগ বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতি সৃষ্টি করে। এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা জীবিকা, খাদ্যনিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য—তিন ক্ষেত্রেই মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ-সংক্রান্ত পশুচিকিৎসা সেবা মূল্যায়নেও দক্ষ জনবল, অবকাঠামো, নজরদারি ও প্রয়োজনীয় সম্পদের ঘাটতি পূরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।

সরকারের উচিত ছিল—
- প্রতিটি জেলায় আধুনিক পোল্ট্রি রোগ নির্ণয় পরীক্ষাগার;
- উপজেলা পর্যায়ে নমুনা সংগ্রহ ও দ্রুত পরিবহনব্যবস্থা;
- ২৪ ঘণ্টার রোগ রিপোর্টিং অ্যাপ;
- খামার নিবন্ধনের সঙ্গে বাধ্যতামূলক বায়োসিকিউরিটি অডিট;
- রোগে মুরগি ধ্বংস করতে হলে দ্রুত ও ন্যায্য ক্ষতিপূরণ;
- স্থানীয়ভাবে মানসম্মত ভ্যাকসিন উৎপাদন;
- রোগমুক্ত অঞ্চল বা ডিজিজ-ফ্রি জোন প্রতিষ্ঠা;
- মৃত মুরগি ও বর্জ্য অপসারণের নিরাপদ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
রোগের নির্ভরযোগ্য নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ ছাড়া কোনো দেশ নিয়মিতভাবে মুরগির মাংস বা ডিমের বড় বাজারে রপ্তানি করতে পারে না।
৮. পর্যাপ্ত ভেটেরিনারি জনবল ও খামার পর্যায়ের সেবা নিশ্চিত করা হয়নি
বাংলাদেশে পোল্ট্রি খামারের সংখ্যা ও উৎপাদন বাড়লেও সেই তুলনায় সরকারি প্রাণিস্বাস্থ্যসেবা, মাঠকর্মী, বিশেষজ্ঞ ভেটেরিনারিয়ান এবং রোগ নির্ণয় সুবিধা যথেষ্ট বাড়েনি।
অনেক খামারি ওষুধ বিক্রেতা, কোম্পানির প্রতিনিধি বা অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। এতে ভুল ওষুধ, অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক, অনির্ধারিত মাত্রা এবং অসম্পূর্ণ চিকিৎসার ঝুঁকি থাকে।
সরকারের উচিত ছিল—
- উপজেলা পর্যায়ে পোল্ট্রি বিশেষজ্ঞ নিয়োগ;
- ভ্রাম্যমাণ ভেটেরিনারি ক্লিনিক;
- টেলিমেডিসিন ও কল সেন্টার;
- খামারভিত্তিক স্বাস্থ্য রেকর্ড;
- প্রেসক্রিপশন ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি নিয়ন্ত্রণ;
- ওষুধ প্রয়োগের পর প্রত্যাহারকাল মানা হচ্ছে কি না তা তদারকি করা।
বিশ্বব্যাংকের প্রাণিসম্পদ প্রকল্পগুলোতেও প্রাণিস্বাস্থ্য, খাদ্য ও খাদ্যনিরাপত্তা এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স মোকাবিলাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, যা সমস্যাগুলোর দীর্ঘস্থায়ী গুরুত্ব নির্দেশ করে।
৯. পোল্ট্রি পণ্যের রপ্তানির জন্য রোগমুক্ত অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা হয়নি
রপ্তানির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো সংশ্লিষ্ট দেশ বা অঞ্চলকে নির্দিষ্ট সংক্রামক রোগমুক্ত হিসেবে প্রমাণ করা। পুরো দেশকে একসঙ্গে রোগমুক্ত করা কঠিন হলেও অঞ্চলভিত্তিক কম্পার্টমেন্টালাইজেশন বা জোনিং করা সম্ভব।

শেখ হাসিনা সরকারের উচিত ছিল—
- কয়েকটি নির্বাচিত এলাকায় রপ্তানিমুখী পোল্ট্রি জোন স্থাপন;
- ওই এলাকায় নিয়ন্ত্রিত প্রবেশ, নির্দিষ্ট হ্যাচারি, ফিডমিল ও প্রসেসিং প্ল্যান্ট স্থাপন;
- নিয়মিত রোগ পরীক্ষা;
- প্রতিটি খামারের ডিজিটাল রেকর্ড;
- আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী জোন বা কম্পার্টমেন্টের স্বীকৃতি অর্জন।
এ ধরনের অঞ্চল প্রতিষ্ঠিত হলে মধ্যপ্রাচ্য, মালদ্বীপ, নেপাল, ভুটান এবং অন্যান্য সম্ভাব্য বাজারে প্রক্রিয়াজাত মুরগি ও ডিম রপ্তানির সুযোগ তৈরি হতে পারত।
১০. ট্রেসেবিলিটি বা উৎপত্তি শনাক্তকরণব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়নি
রপ্তানিকারক দেশকে প্রমাণ করতে হয়—মুরগি কোথায় উৎপাদিত হয়েছে, কোন হ্যাচারি থেকে বাচ্চা এসেছে, কী খাদ্য খেয়েছে, কোন ওষুধ বা ভ্যাকসিন ব্যবহার হয়েছে, কোথায় জবাই ও প্রক্রিয়াজাত করা হয়েছে।
বাংলাদেশের অধিকাংশ মুরগি এখনো প্রচলিত বাজার ব্যবস্থায় জীবন্ত অবস্থায় বিক্রি হয়। পরবর্তী গবেষণায়ও দেখা গেছে, প্রক্রিয়াজাত বাজারের অংশ তুলনামূলকভাবে খুব কম এবং প্রচলিত ওয়েট মার্কেট এখনো প্রধান বিপণন মাধ্যম।
সরকারের উচিত ছিল—
- প্রতিটি নিবন্ধিত খামারকে ইউনিক আইডি দেওয়া;
- বাচ্চা থেকে ভোক্তা পর্যন্ত ব্যাচ নম্বর চালু করা;
- খাদ্য, ওষুধ ও ভ্যাকসিনের ডিজিটাল রেকর্ড রাখা;
- পরিবহন ও জবাইখানার তথ্য যুক্ত করা;
- প্যাকেটজাত পণ্যে কিউআর কোড চালু করা।
ট্রেসেবিলিটি ছাড়া কোনো সমস্যাযুক্ত ব্যাচ দ্রুত বাজার থেকে প্রত্যাহার করা যায় না এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতার আস্থা অর্জন কঠিন হয়।
১১. আন্তর্জাতিক মানের জবাইখানা ও প্রসেসিং শিল্প গড়ে ওঠেনি
বাংলাদেশে মুরগি বিপণনের বড় অংশ জীবন্ত পাখিকেন্দ্রিক। এতে পরিবহনজনিত মৃত্যু, রোগ ছড়ানো, অস্বাস্থ্যকর জবাই, বর্জ্যদূষণ এবং পণ্যের মানহানির ঝুঁকি থাকে।

সরকারের উচিত ছিল—
- বিভাগীয় শহরে আধুনিক পোল্ট্রি জবাই ও প্রসেসিং কেন্দ্র;
- হালাল ও আন্তর্জাতিক খাদ্যনিরাপত্তা মানসম্পন্ন প্ল্যান্ট;
- ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের যৌথ প্রসেসিং সুবিধা;
- জীবন্ত মুরগির পরিবর্তে চিল্ড ও ফ্রোজেন মাংসের বাজার সম্প্রসারণ;
- কাট-আপ, মেরিনেটেড, রান্নার উপযোগী ও মূল্যসংযোজিত পণ্য তৈরিতে করসুবিধা দেওয়া।
কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রক্রিয়াজাত পোল্ট্রি পণ্য উৎপাদন করেছে এবং রপ্তানির জন্য নিবন্ধিত পণ্যের তালিকায় জীবন্ত পোল্ট্রি, ডিম ও পোল্ট্রি মাংসের শ্রেণি রয়েছে। কিন্তু শিল্পব্যাপী রপ্তানির সক্ষমতা তৈরি হয়নি।
১২. কোল্ডচেইন ও রেফ্রিজারেটেড পরিবহন সম্প্রসারণ করা হয়নি
প্রক্রিয়াজাত মুরগির নিরাপত্তা ও মান বজায় রাখতে জবাইয়ের পর নির্ধারিত তাপমাত্রা বজায় রাখা জরুরি। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ এলাকায় পর্যাপ্ত কোল্ডস্টোরেজ, চিলিং সেন্টার, রেফ্রিজারেটেড গাড়ি এবং তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণব্যবস্থা নেই।
সরকারের উচিত ছিল—
- উৎপাদন অঞ্চলভিত্তিক চিলিং ও ফ্রিজিং হাব;
- রেফ্রিজারেটেড গাড়ি আমদানিতে করছাড়;
- ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য যৌথ কোল্ডস্টোরেজ;
- সৌরশক্তিচালিত ক্ষুদ্র কোল্ডরুম;
- পরিবহনের প্রতিটি ধাপে তাপমাত্রার ডিজিটাল রেকর্ড।
কোল্ডচেইন তৈরি হলে শুধু রপ্তানি নয়, দেশের ভেতরেও মূল্য স্থিতিশীল রাখা যেত। অতিরিক্ত উৎপাদনের সময় মাংস সংরক্ষণ করে পরে বাজারজাত করা সম্ভব হতো।
১৩. ডিমের গুঁড়া ও তরল ডিম শিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি
ডিমের দাম কমে গেলে খামারিরা অনেক সময় উৎপাদন ব্যয়ের নিচে ডিম বিক্রি করতে বাধ্য হন। অথচ অতিরিক্ত ডিম থেকে তৈরি করা যায়—
- ডিমের গুঁড়া;
- পাস্তুরিত তরল ডিম;
- ডিমের সাদা ও কুসুম আলাদা পণ্য;
- বেকারি ও খাদ্যশিল্পের উপাদান;
- উচ্চ প্রোটিনযুক্ত পণ্য।
এসব পণ্য দীর্ঘদিন সংরক্ষণ এবং রপ্তানি করা সম্ভব। সরকার শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য ডিম প্রক্রিয়াজাতকরণ যন্ত্রপাতিতে করছাড়, স্বল্পসুদের ঋণ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা দিলে ডিমের বাজারে মৌসুমি ধস কমত।
কিন্তু ডিমকে শুধু খোসাসহ ভোগ্যপণ্য হিসেবে দেখা হয়েছে; শিল্পের কাঁচামাল ও রপ্তানি পণ্য হিসেবে গড়ে তোলার সুসংগঠিত কর্মসূচি নেওয়া হয়নি।
১৪. স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি সক্ষমতা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা হয়নি
আন্তর্জাতিক খাদ্যবাজারে প্রবেশের জন্য স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি বা SPS মান পূরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে রোগ নিয়ন্ত্রণ, ক্ষতিকর জীবাণু, অ্যান্টিবায়োটিক অবশিষ্টাংশ, রাসায়নিক দূষণ, পরীক্ষাগারের সক্ষমতা, পরিদর্শন ও সনদব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত।
বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্য রপ্তানিতে SPS-সংক্রান্ত সক্ষমতার ঘাটতি এবং বিনিয়োগের প্রয়োজন নিয়ে আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন হয়েছে।
সরকারের উচিত ছিল—
- আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিসম্পন্ন রেসিডিউ পরীক্ষাগার;
- সালমোনেলা, ক্যাম্পাইলোব্যাক্টার ও অন্যান্য জীবাণু পরীক্ষা;
- অ্যান্টিবায়োটিক ও রাসায়নিক অবশিষ্টাংশ পর্যবেক্ষণ;
- আমদানিকারক দেশের মান অনুযায়ী স্বাস্থ্যসনদ প্রদান;
- পরীক্ষাগারের ফলাফলের পারস্পরিক স্বীকৃতি অর্জন;
- রপ্তানি প্ল্যান্টে স্থায়ী ভেটেরিনারি পরিদর্শন।
এসব ছাড়া রপ্তানির ঘোষণা দেওয়া গেলেও বড় ও উচ্চমূল্যের বাজারে ধারাবাহিক প্রবেশ সম্ভব নয়।
১৫. অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি
রোগ প্রতিরোধ বা দ্রুত বৃদ্ধির আশায় অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে মাংস ও ডিমে ওষুধের অবশিষ্টাংশ থাকতে পারে এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স তৈরি হতে পারে।
এটি জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির পাশাপাশি রপ্তানির বড় বাধা। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে নির্ধারিত সীমার বেশি অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেলে পুরো চালান বাতিল হতে পারে।
সরকারের উচিত ছিল—
- প্রেসক্রিপশন ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি বন্ধ;
- খাদ্যে গ্রোথ প্রোমোটার হিসেবে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ;
- খামারে ওষুধ ব্যবহারের রেজিস্টার বাধ্যতামূলক;
- নিয়মিত নমুনা পরীক্ষা;
- প্রত্যাহারকাল না মানলে জরিমানা;
- প্রোবায়োটিক, এনজাইম ও উন্নত বায়োসিকিউরিটির ব্যবহার সম্প্রসারণ।
খাদ্যনিরাপত্তা ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স মোকাবিলার প্রয়োজন বহু বছর ধরে স্বীকৃত হলেও মাঠপর্যায়ে কার্যকর প্রয়োগ সীমিত ছিল।
১৬. পোল্ট্রি বীমা চালু ও জনপ্রিয় করা হয়নি
রোগ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অতিরিক্ত তাপমাত্রা, বিদ্যুৎ বিভ্রাট অথবা বাজারধসের কারণে একটি খামার কয়েক দিনের মধ্যে সম্পূর্ণ পুঁজি হারাতে পারে।
সরকারের উচিত ছিল রাষ্ট্রীয় সহায়তায় পোল্ট্রি বীমা চালু করা। বীমায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারত—
- রোগে মৃত্যু;
- প্রাকৃতিক দুর্যোগ;
- অগ্নিকাণ্ড;
- যন্ত্রপাতি বিকল;
- বাধ্যতামূলক মুরগি নিধন;
- নির্দিষ্ট সীমার বাজারধস।
বিশ্বব্যাংক-সমর্থিত প্রাণিসম্পদ প্রকল্পে জলবায়ু সহনশীলতা, খাদ্য ও খাদ্যনিরাপত্তা এবং প্রাণিসম্পদ বীমার উন্নয়নের প্রয়োজনও উল্লেখ করা হয়েছিল।
কিন্তু কার্যকর ও সহজলভ্য পোল্ট্রি বীমা দেশব্যাপী প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে ক্ষতির পরে বহু খামারি ঋণগ্রস্ত হয়েছেন অথবা ব্যবসা ছেড়েছেন।
১৭. সহজ শর্তে ঋণ ও পুনঃঅর্থায়ন যথেষ্ট ছিল না
পোল্ট্রি খামারের কার্যকর মূলধন দ্রুত ঘোরে। বাচ্চা, খাদ্য, ওষুধ ও বিদ্যুতের জন্য নিয়মিত নগদ অর্থ প্রয়োজন। কিন্তু ব্যাংকঋণ নিতে জামানত, কাগজপত্র এবং দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণে ক্ষুদ্র খামারিরা প্রায়ই ঋণ পান না।
সরকারের উচিত ছিল—
- খামার নিবন্ধনের ভিত্তিতে জামানতবিহীন সীমিত ঋণ;
- নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ তহবিল;
- রোগ বা বাজারধসের সময় ঋণ পুনঃতফসিল;
- প্রসেসিং, কোল্ডচেইন ও ডিমের গুঁড়া কারখানায় দীর্ঘমেয়াদি ঋণ;
- কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে পোল্ট্রি পুনঃঅর্থায়ন তহবিল।
বিক্ষিপ্ত কৃষিঋণ কর্মসূচি থাকলেও পোল্ট্রি শিল্পের উৎপাদনচক্র ও ঝুঁকি অনুযায়ী স্বতন্ত্র আর্থিক পণ্য ব্যাপকভাবে চালু হয়নি।
১৮. খামার নিবন্ধন ও নির্ভুল জাতীয় ডাটাবেজ গড়ে তোলা হয়নি
নীতিনির্ধারণের প্রথম শর্ত নির্ভরযোগ্য তথ্য। দেশে কত ব্রয়লার, লেয়ার, সোনালি ও দেশি মুরগির খামার আছে; কত খামার চালু বা বন্ধ; কত বাচ্চা উৎপাদিত হচ্ছে; দৈনিক ডিম ও মাংসের প্রকৃত সরবরাহ কত—এসবের হালনাগাদ তথ্য সবার জন্য সহজলভ্য ছিল না।
সরকার ২০১৬–২০৩০ মেয়াদের কৃষি ও গ্রামীণ পরিসংখ্যান উন্নয়নের কৌশল গ্রহণ করেছিল। সেখানে কৃষি পরিসংখ্যান ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য একাধিক লক্ষ্য ও কার্যক্রম রাখা হয়। কিন্তু পোল্ট্রি শিল্পে রিয়েল-টাইম উৎপাদন ও বাজার ডাটাবেজ গড়ে ওঠেনি।
এর ফলে কখনো বাচ্চার অতিরিক্ত উৎপাদন, কখনো সংকট, কখনো ডিমের দাম পতন, আবার কখনো আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে।
১৯. দেশীয় জাত ও ব্রিডিং গবেষণায় পর্যাপ্ত অগ্রাধিকার দেওয়া হয়নি
বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ব্রয়লার ও লেয়ার শিল্পের একটি বড় অংশ বিদেশি জেনেটিক লাইনের ওপর নির্ভরশীল। গ্র্যান্ড প্যারেন্ট বা প্যারেন্ট স্টক, বিশেষায়িত জাত এবং প্রযুক্তি আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়।
সরকারের উচিত ছিল—
- দেশীয় আবহাওয়াসহিষ্ণু ব্রয়লার ও লেয়ার লাইন উদ্ভাবন;
- বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট ও বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণা;
- রোগসহিষ্ণু ও কম খাদ্যে বেশি উৎপাদনশীল জাত;
- দেশি মুরগির জেনেটিক সংরক্ষণ;
- গবেষণার ফল বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে নেওয়ার ব্যবস্থা।
গবেষণা হয়েছে, কিন্তু দেশের বাণিজ্যিক পোল্ট্রি শিল্পে আমদানিনির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর মতো ধারাবাহিক ব্রিডিং কর্মসূচি গড়ে ওঠেনি।
২০. পোল্ট্রি বর্জ্য থেকে অর্থনৈতিক সম্পদ তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি
পোল্ট্রি বিষ্ঠা, মৃত মুরগি, পালক এবং জবাইখানার বর্জ্য সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা না করলে পরিবেশ দূষণ, দুর্গন্ধ, মাছি এবং রোগ ছড়ায়।
অথচ এসব বর্জ্য থেকে তৈরি করা যায়—
- বায়োগ্যাস;
- জৈবসার;
- বিদ্যুৎ;
- কম্পোস্ট;
- রেন্ডারিংয়ের মাধ্যমে শিল্পের উপাদান;
- পালক থেকে প্রোটিনজাত পণ্য।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকে পোল্ট্রি শিল্পের পরিবেশ ও বায়োসিকিউরিটি ঝুঁকির একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে পরবর্তী খাতভিত্তিক বিশ্লেষণেও চিহ্নিত করা হয়েছে।
সরকারের উচিত ছিল বড় খামার ও প্রসেসিং প্ল্যান্টে বাধ্যতামূলক বর্জ্য শোধন এবং ছোট খামারিদের জন্য ক্লাস্টারভিত্তিক বায়োগ্যাস ও কম্পোস্ট কেন্দ্র গড়ে তোলা।
২১. জলবায়ু সহনশীল পোল্ট্রি খামার নির্মাণে সহায়তা দেওয়া হয়নি
বাংলাদেশে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বৃদ্ধির কারণে হিট স্ট্রেস, খাদ্য গ্রহণ কমে যাওয়া, ডিম উৎপাদন হ্রাস এবং মুরগির মৃত্যু ঘটে। বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়েও খামার ধ্বংস হয়।
সরকারের উচিত ছিল—
- জলবায়ু অঞ্চলভিত্তিক খামারের নকশা;
- ইনসুলেশন, ভেন্টিলেশন ও কুলিং ব্যবস্থায় ভর্তুকি;
- সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাকআপ পাওয়ার;
- বন্যাপ্রবণ এলাকায় উঁচু প্ল্যাটফর্মের শেড;
- দুর্যোগের আগে সতর্কতা ও সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা;
- দুর্যোগের পরে দ্রুত পুনর্বাসন তহবিল।
বিশ্বব্যাংকের প্রাণিসম্পদ প্রকল্পেও জলবায়ু-সহনশীল উৎপাদনব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা স্বীকৃত হয়েছে।
তবে দেশব্যাপী ছোট খামারকে জলবায়ু সহনশীল করার মতো ব্যাপক কর্মসূচি দেখা যায়নি।
২২. খামারিদের কারিগরি প্রশিক্ষণ ও সার্টিফিকেশন বাধ্যতামূলক করা হয়নি
অনেক উদ্যোক্তা পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছাড়াই পোল্ট্রি খামার শুরু করেন। ফলে শেড নির্মাণ, ব্রুডিং, খাদ্য ব্যবস্থাপনা, পানি, বায়োসিকিউরিটি, টিকা, মৃত মুরগি অপসারণ এবং হিসাবরক্ষণে ভুল হয়।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ক্ষুদ্র খামারে মুরগি পালনবিষয়ক প্রকাশনাসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও পরামর্শমূলক কার্যক্রম করেছে। কিন্তু বাণিজ্যিক খামার পরিচালনার আগে স্বীকৃত প্রশিক্ষণ বা সার্টিফিকেশন বাধ্যতামূলক ছিল না।
সরকারের উচিত ছিল—
- খামারের আকার অনুযায়ী বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ;
- প্রশিক্ষিত ব্যবস্থাপক ছাড়া বড় খামারের অনুমোদন না দেওয়া;
- অনলাইন ও মাঠভিত্তিক কোর্স;
- খামারি প্রশিক্ষণের মেয়াদোত্তীর্ণ হলে নবায়ন;
- সফল খামারকে প্রদর্শনী খামার হিসেবে ব্যবহার।
২৩. নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ পোল্ট্রি কর্মসূচি গড়ে ওঠেনি
পোল্ট্রি পালন গ্রামীণ নারী, শিক্ষিত বেকার এবং ভূমিহীন মানুষের জন্য তুলনামূলকভাবে সহজ প্রবেশযোগ্য ব্যবসা। কিন্তু বাজার, প্রযুক্তি, ঋণ এবং প্রশিক্ষণের অভাবে তারা টেকসইভাবে বড় হতে পারেন না।
সরকারের উচিত ছিল—
- নারীদের জন্য ক্ষুদ্র লেয়ার ও দেশি মুরগির ক্লাস্টার;
- তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য স্টার্টআপ অনুদান;
- সমবায়ভিত্তিক ডিম সংগ্রহ ও বিপণন;
- ডিজিটাল ব্যবসা ও হিসাব প্রশিক্ষণ;
- সফল উদ্যোক্তাদের প্রসেসিং ও ব্র্যান্ড তৈরিতে সহায়তা।
এতে পোল্ট্রি শিল্প শুধু বড় কোম্পানিনির্ভর না হয়ে বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর আয় ও কর্মসংস্থানের মাধ্যম হতে পারত।
২৪. রপ্তানি বাজার অনুসন্ধানে বাণিজ্যিক কূটনীতি ছিল দুর্বল
মধ্যপ্রাচ্য ও বিভিন্ন দ্বীপরাষ্ট্রে হালাল মুরগির মাংস, ডিম, ডিমের গুঁড়া ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু রপ্তানি শুরু করতে শুধু উৎপাদন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন—
- সরকারে-সরকারে স্বাস্থ্যসনদ চুক্তি;
- আমদানিকারক দেশের অনুমোদন;
- রপ্তানি প্রতিষ্ঠানের পরিদর্শন;
- পণ্যের মান ও লেবেলিং;
- নিয়মিত সরবরাহের নিশ্চয়তা;
- বাণিজ্য মেলায় প্রচার;
- পরিবহন ব্যয় কমানোর ব্যবস্থা।
Export Promotion Bureau রপ্তানি উন্নয়ন ও বাজার সম্প্রসারণের দায়িত্বে থাকলেও পোল্ট্রি মাংস ও ডিমকে অগ্রাধিকারভিত্তিক রপ্তানি পণ্য হিসেবে গড়ে তোলার দৃশ্যমান, দীর্ঘমেয়াদি ও বড় আকারের কর্মসূচি ছিল না।
২৫. পোল্ট্রি খাতকে রপ্তানিমুখী শিল্প হিসেবে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া হয়নি
তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়া বা কৃষিপ্রক্রিয়াজাত পণ্যের মতো পোল্ট্রি খাতের জন্য সমন্বিত রপ্তানি প্রণোদনা প্রয়োজন ছিল।
প্রয়োজনীয় সুবিধাগুলোর মধ্যে থাকতে পারত—
- রপ্তানিমুখী প্রসেসিং প্ল্যান্টে কর অবকাশ;
- যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কছাড়;
- পরীক্ষাগার ও সার্টিফিকেশনের খরচে সহায়তা;
- রেফ্রিজারেটেড পরিবহনে ভর্তুকি;
- নতুন বাজারে রপ্তানিতে নগদ সহায়তা;
- রপ্তানি ঋণ ও বীমা;
- আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং।
এই সহায়তা না থাকায় অভ্যন্তরীণ বাজারের জন্য উৎপাদিত পণ্যকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার অতিরিক্ত ব্যয় বহন করা অধিকাংশ উদ্যোক্তার পক্ষে কঠিন হয়েছে।
২৬. ছোট খামারি ও বড় কোম্পানির জন্য প্রতিযোগিতার ন্যায্য নীতি করা হয়নি
বড় সমন্বিত কোম্পানি একই সঙ্গে বাচ্চা, খাদ্য, ওষুধ, খামার, প্রসেসিং ও বিপণনে যুক্ত হলে তারা উৎপাদন ব্যয় এবং বাজার নিয়ন্ত্রণে বাড়তি সুবিধা পায়।
বড় কোম্পানির বিনিয়োগ শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয়। কিন্তু নীতিমালা না থাকলে প্রান্তিক খামারি ধীরে ধীরে বাজার থেকে সরে যেতে পারেন।
সরকারের উচিত ছিল—
- উৎপাদনের বিভিন্ন স্তরে বাজারের অংশ পর্যবেক্ষণ;
- একচেটিয়া ব্যবসা প্রতিরোধ;
- কোম্পানির খামার ও চুক্তিভিত্তিক খামারের নিয়ম আলাদা করা;
- চুক্তিতে বাচ্চা, খাদ্য, ওষুধ, মৃত্যু ও বাজারঝুঁকির দায় স্পষ্ট করা;
- বিরোধ নিষ্পত্তির দ্রুত ব্যবস্থা;
- ক্ষুদ্র খামারির জন্য যৌথ ক্রয় ও বিপণন সুবিধা।
সঠিক নীতির লক্ষ্য বড় কোম্পানিকে বন্ধ করা নয়; বরং বড় বিনিয়োগ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার সহাবস্থান নিশ্চিত করা।
২৭. আন্তর্জাতিক মানের পোল্ট্রি গবেষণা ও উদ্ভাবন তহবিল গঠন করা হয়নি
খাদ্যের দক্ষতা, রোগ নিয়ন্ত্রণ, বিকল্প কাঁচামাল, স্থানীয় জাত, অ্যান্টিবায়োটিকের বিকল্প, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্বয়ংক্রিয় খামার এবং প্রক্রিয়াজাত পণ্যে নিয়মিত গবেষণা প্রয়োজন।
সরকারের উচিত ছিল—
- জাতীয় পোল্ট্রি গবেষণা তহবিল;
- বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প যৌথ গবেষণা;
- বাণিজ্যিক খামারে পরীক্ষামূলক গবেষণা;
- উদ্ভাবনের মেধাস্বত্ব সুরক্ষা;
- সফল গবেষণাকে শিল্পে স্থানান্তরের অর্থায়ন;
- পোল্ট্রি তথ্য ও গবেষণা ইনস্টিটিউট।
গবেষণাপত্র প্রকাশ করলেই শিল্প বদলায় না। গবেষণার ফল খামারের উৎপাদন খরচ, রোগ ও মৃত্যুহার কমাতে ব্যবহার করা প্রয়োজন।
২৮. সরকারি ক্রয় ও পুষ্টি কর্মসূচিতে ডিম-মুরগির স্থায়ী বাজার তৈরি করা হয়নি
সরকার স্কুলের খাবার, হাসপাতাল, কারাগার, সেনাবাহিনী, পুলিশ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং দুর্যোগকালীন খাদ্যসহায়তায় দেশীয় ডিম ও প্রক্রিয়াজাত মুরগিকে নিয়মিতভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে পারত।
এতে—
- শিশু ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পুষ্টি বাড়ত;
- উৎপাদকদের জন্য স্থায়ী বাজার তৈরি হতো;
- অতিরিক্ত উৎপাদনের সময় মূল্যধস কমত;
- প্রক্রিয়াজাত শিল্পের বিকাশ ঘটত।
ডিম ও মুরগি পুষ্টির গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলেও জাতীয় প্রাতিষ্ঠানিক ক্রয়ে পোল্ট্রি খাতকে বাজার স্থিতিশীলতার কৌশল হিসেবে ধারাবাহিকভাবে ব্যবহার করা হয়নি।
২৯. সংকটকালে দ্রুত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন কাঠামো ছিল দুর্বল
এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা বা অন্য সংক্রামক রোগে সরকারি নির্দেশে পাখি ধ্বংস করা হলে দ্রুত ও বাজারসম্মত ক্ষতিপূরণ না পেলে খামারিরা রোগ গোপন করতে পারেন। এটি পুরো শিল্পের জন্য বিপজ্জনক।
আন্তর্জাতিক ওয়ান হেলথ কাঠামোতেও রোগ নজরদারি, বায়োসিকিউরিটি, রোগ নির্ণয়, নিয়ন্ত্রণ, নিধন এবং ক্ষতিপূরণকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা হয়।
সরকারের উচিত ছিল—
- পূর্বঘোষিত ক্ষতিপূরণ হার;
- ৭ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে অর্থ প্রদান;
- ডিজিটাল আবেদন;
- ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে সরাসরি অর্থ;
- খামার জীবাণুমুক্তকরণে সহায়তা;
- নতুন বাচ্চা ও খাদ্য কিনতে পুনর্বাসন ঋণ।
৩০. পোল্ট্রিকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের কৌশলগত খাত হিসেবে দেখা হয়নি
বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্প প্রধানত অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের শিল্প হিসেবে বেড়েছে। কিন্তু পরিকল্পিতভাবে এগোলে বাংলাদেশ শুধু কাঁচা মুরগি বা খোসাসহ ডিম নয়, বরং—
- হালাল প্রক্রিয়াজাত মাংস;
- ফ্রোজেন কাট-আপ;
- মেরিনেটেড চিকেন;
- রান্না করা পোল্ট্রি পণ্য;
- ডিমের গুঁড়া;
- তরল ডিম;
- বিশেষায়িত দেশি মুরগির মাংস;
- পোল্ট্রি ভ্যাকসিন ও প্রযুক্তি
রপ্তানি করতে পারত।
এর জন্য ১০–১৫ বছরের রোডম্যাপ, রোগমুক্ত জোন, পরীক্ষাগার, প্রসেসিং, কোল্ডচেইন, ব্র্যান্ডিং এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি প্রয়োজন ছিল। এসবের কোনো একটি নয়, সবগুলো একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হতো।
সরকার কী করেছিল—ন্যায্য মূল্যায়ন
গবেষণার স্বচ্ছতার স্বার্থে এটিও স্বীকার করা প্রয়োজন যে শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে—
- প্রাণিসম্পদ উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে;
- প্রাণিসম্পদ উন্নয়নে দেশি-বিদেশি অর্থায়নে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে;
- কিছু পরীক্ষাগার, প্রশিক্ষণ, ভ্যাকসিন ও সম্প্রসারণসেবা চালু ছিল;
- বেসরকারি ফিড, হ্যাচারি ও প্রসেসিং শিল্প সম্প্রসারণের পরিবেশ তৈরি হয়েছে;
- প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পে প্রাণিস্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা, বাজার সংযোগ এবং জলবায়ু সহনশীলতার বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
তবে এ অর্জনগুলো পোল্ট্রি শিল্পকে আন্তর্জাতিক রপ্তানি প্রতিযোগিতায় নেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল না। উৎপাদন বাড়লেও উৎপাদন ব্যয়, খামারির লাভ, রোগ নিয়ন্ত্রণ, খাদ্যনিরাপত্তা, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং রপ্তানি—এসব সূচকে কাঙ্ক্ষিত কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটেনি।
সম্ভাব্য ফলাফল কী হতে পারত?
উল্লিখিত পদক্ষেপগুলো ২০০৯ সাল থেকেই পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হলে—
১. খাদ্যের উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম ও স্থিতিশীল হতে পারত;
২. প্রান্তিক খামারিদের বন্ধ হয়ে যাওয়ার হার কমত;
৩. মুরগি ও ডিমের বাজারে অস্বাভাবিক ওঠানামা কমত;
৪. রোগ ও মৃত্যুহার কমে উৎপাদন দক্ষতা বাড়ত;
৫. জীবন্ত মুরগির পরিবর্তে নিরাপদ প্রক্রিয়াজাত পণ্যের বাজার বড় হতো;
৬. ডিমের গুঁড়া ও তরল ডিম শিল্প গড়ে উঠত;
৭. মধ্যপ্রাচ্য ও আঞ্চলিক বাজারে রপ্তানির সুযোগ তৈরি হতো;
৮. আরও বেশি কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হতো;
৯. অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার ও খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি কমত;
১০. বড় কোম্পানি ও ক্ষুদ্র খামারির মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ শিল্পব্যবস্থা তৈরি হতো।
ড. বায়েজিদ মোড়লের গবেষণায় প্রধান পর্যবেক্ষণ
ড. বায়েজিদ মোড়লের গবেষণায় প্রতীয়মান হয়, বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্পের মূল সমস্যা উৎপাদনক্ষমতার অভাব নয়। উদ্যোক্তা, শ্রমিক, খামারি, প্রযুক্তি গ্রহণের মানসিকতা এবং অভ্যন্তরীণ বাজার—সবই রয়েছে।
মূল ঘাটতি ছিল—
- দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায়;
- নীতির ধারাবাহিকতায়;
- মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নে;
- উৎপাদন তথ্যের স্বচ্ছতায়;
- খামারির মূল্য সুরক্ষায়;
- রোগমুক্ত অঞ্চল প্রতিষ্ঠায়;
- আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগারে;
- প্রসেসিং ও কোল্ডচেইনে;
- রপ্তানি বাজার তৈরিতে;
- গবেষণা ও উদ্ভাবনকে বাণিজ্যিক উৎপাদনে ব্যবহারে।
শিল্পটি বড় হয়েছে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় একটি পূর্ণাঙ্গ রপ্তানিমুখী শিল্পে রূপান্তরিত হয়নি।
সমাপনী মূল্যায়ন
শেখ হাসিনা সরকারের প্রায় ১৬ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশের পোল্ট্রি খাতে উৎপাদন বেড়েছে—এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং একটি টেকসই, লাভজনক, নিরাপদ ও রপ্তানিমুখী শিল্প গড়ে তোলা এক বিষয় নয়।
সরকার যদি শুরু থেকেই খাদ্যের কাঁচামাল উৎপাদন, ক্ষুদ্র খামারির সুরক্ষা, বাজারের স্বচ্ছতা, রোগ নিয়ন্ত্রণ, ট্রেসেবিলিটি, আন্তর্জাতিক মানের জবাইখানা, কোল্ডচেইন, ডিম প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং রপ্তানি কূটনীতিতে সমন্বিত পদক্ষেপ নিত, তাহলে বাংলাদেশ আজ পোল্ট্রি পণ্যে শুধু স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশ নয়, একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানিকারক দেশ হিসেবেও পরিচিত হতে পারত।
অতীতের ব্যর্থতা নিয়ে শুধু রাজনৈতিক বিতর্ক করলেই শিল্পের উন্নয়ন হবে না। আগের সরকারের অসম্পূর্ণ উদ্যোগ, ভুল নীতি এবং বাস্তবায়ন ঘাটতি থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যৎ সরকারকে খামারি, বিজ্ঞানী, শিল্পোদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, ভোক্তা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাকে নিয়ে একটি জাতীয় পোল্ট্রি রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে।
পোল্ট্রি শিল্পকে বাঁচাতে হলে খামারিকে বাঁচাতে হবে। খামারিকে বাঁচাতে হলে উৎপাদন উপকরণের ন্যায্য মূল্য, পণ্যের লাভজনক বাজার, রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষা এবং নীতির নিশ্চয়তা দিতে হবে। তাহলেই বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্প অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের সীমা অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক বাজারে একটি শক্তিশালী রপ্তানি শিল্পে পরিণত হতে পারবে।
লেখক: ড. বায়েজিদ মোড়ল
গবেষণাধর্মী প্রতিবেদন | AgricultureNews24.com






























