মুখে শুধু প্রাণিসম্পদ উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি, ভেজাল-নকল ও অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার নিরসনে কঠোর সাঁড়াশি পদক্ষেপ নেই—শস্যের ভেতর ভূত।।
মোহাম্মদ নুরুজ্জামান। সম্পাদক। সাপ্তাহিক কৃষি ও আমিষ পত্রিকা।।

বহু বছর আগে—না, বহু বছর বললে ঠিক হবে না; সম্ভবত দুই যুগ আগে—মরহুম সাদেক হোসেন খোকা বলেছিলেন, চিড়িয়াখানাকে খুব শিগগিরই আধুনিকায়ন করা হবে। দর্শনার্থীরা জাল দিয়ে ঘেরা বিশেষ গাড়িতে চড়ে বন্যপ্রাণীর খুব কাছে গিয়ে তাদের দেখতে পারবেন। সেখানে থাকবে আধুনিক সব ব্যবস্থা।
শুধু সাদেক হোসেন খোকা নন, আধুনিক ও বিশ্বমানের চিড়িয়াখানা নির্মাণের স্বপ্ন আমাদের দেখিয়েছেন প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করা প্রায় সব মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী। তাঁরা দায়িত্ব গ্রহণের পর আমাদের স্বপ্নই দেখিয়েছেন; আমরা এখনো সেই স্বপ্ন দেখে যাচ্ছি।
তবে একটি পন্থা অধিকাংশ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী বেশ দায়িত্বের সঙ্গেই অনুসরণ করেছেন। আর সেটি হলো—বিদেশ থেকে বিভিন্ন প্রজাতির পশুপাখি কেনা। জানি না, এসব ক্রয়সংক্রান্ত বিষয় কেন যেন খুব আনন্দের সঙ্গে এবং দ্রুততার সঙ্গে সমাধান করা হয়!
এবার আসা যাক অ্যান্টিবায়োটিক প্রসঙ্গে

গবাদিপ্রাণি, হাঁস-মুরগি ও ছাগল পালনে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার যেন আমাদের নিজেদেরই একটি সংক্রামক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। কোনোভাবেই অ্যান্টিবায়োটিকের যত্রতত্র ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের এই প্রবণতা প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না।
সভা-সেমিনারে সরকারি কর্তৃপক্ষ বিজ্ঞের মতো বলছে, অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার—বিশেষ করে যেসব অ্যান্টিবায়োটিক শুধু আমাদের দেশে নয়, বিশ্বব্যাপী নিষিদ্ধ—নিজেদের উদ্যোগেই বন্ধ করা উচিত। কিন্তু শুধু বক্তব্য দিয়ে কি এমন ভয়াবহ সমস্যার সমাধান সম্ভব?
আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, গবাদিপ্রাণি ও হাঁস-মুরগির ওপর যত্রতত্র এবং অনিয়ন্ত্রিতভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার মানবস্বাস্থ্য, প্রাণিসম্পদ ও পরিবেশের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ। এর ফলে সবচেয়ে বড় যে সংকটটি তৈরি হচ্ছে, তা হলো অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা এএমআর—অর্থাৎ জীবাণুর ওষুধ প্রতিরোধক্ষমতা।
গবাদিপ্রাণি ও হাঁস-মুরগিকে নির্বিচারে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হলে কিছু ব্যাকটেরিয়া সেই ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পরবর্তী সময়ে এসব প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে সাধারণ রোগের চিকিৎসায়ও প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকারিতা হারাতে পারে। এসব বিষয় এখন আর আমাদের কারও অজানা নয়।
এখন প্রশ্ন হলো, বিধিনিষেধ থাকার পরও খামারিদের হাতে এসব অ্যান্টিবায়োটিক তুলে দিচ্ছে কারা? কারা এগুলো উৎপাদন, আমদানি, বিপণন ও বাজারজাত করছে?
এ প্রশ্নের উত্তর প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর জানার কথা। বিষয়টি যৌক্তিকভাবে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় প্রাণিসম্পদ বিভাগের কার্যালয় রয়েছে। সেখানে ভেটেরিনারি সার্জন, ভেটেরিনারি ফিল্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট, কম্পাউন্ডার ও কৃত্রিম প্রজননকর্মীরা দায়িত্ব পালন করছেন। খামারিদের সঙ্গে তাঁদের কমবেশি যোগাযোগ থাকা খুবই স্বাভাবিক।
তাহলে তাঁদের চোখের সামনে অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ও ব্যবসা কীভাবে অব্যাহত রয়েছে—এ প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। অ্যান্টিবায়োটিকের যত্রতত্র ব্যবহারের কারণে খামারের গবাদিপ্রাণি বা হাঁস-মুরগি সত্যিকার অর্থে কোনো রোগে আক্রান্ত হলে অনেক সময় সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ করে না। ফলে খামারিরা বড় ধরনের অর্থনৈতিক লোকসানের মুখে পড়েন। এ চিত্র এখন বাস্তবেই দেখা যাচ্ছে।
গবাদিপ্রাণি ও হাঁস-মুরগির মলমূত্র সার হিসেবে জমিতে ব্যবহার করা হলে কিংবা সরাসরি জলাশয়ে ফেলা হলে অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ এবং প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া মাটি ও পানিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। জলাশয়ে এসব উপাদান মিশে গেলে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর মধ্যেও প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
অ্যান্টিবায়োটিক এখন কতটা ভয়ংকর সংকটে পরিণত হয়েছে, তা সহজেই অনুমান করা যায়। তাই শুধু মুখের বক্তব্য নয়, অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার, অবৈধ বিপণন ও বাজারজাতকরণের বিরুদ্ধে এখন প্রয়োজন কঠোর সাঁড়াশি অভিযান। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এটি কার্যকরভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়।
মানবদেহের মারাত্মক ক্ষতির দায়ভার কার?
গবাদিপ্রাণি ও হাঁস-মুরগিকে দেওয়া অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ বা রেসিডিউ নির্ধারিত প্রত্যাহারকাল অনুসরণ না করলে মাংস, দুধ ও ডিমের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী জীবাণু মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে টাইফয়েড, নিউমোনিয়া কিংবা ডায়রিয়ার মতো সাধারণ রোগও প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকে নিরাময় করা কঠিন হয়ে পড়ে। শুধু তা-ই নয়, অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকারিতা হারালে ভবিষ্যতে ছোটখাটো অস্ত্রোপচার, অঙ্গ প্রতিস্থাপন কিংবা ক্যানসারের চিকিৎসাও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এখানেই শেষ নয়। গবাদিপ্রাণি ও হাঁস-মুরগির মলমূত্রের মাধ্যমে অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ এবং প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া মাটি ও জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এর ফলে মাছ, অন্যান্য জলজ প্রাণী এবং মাটির উপকারী অণুজীব ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। দীর্ঘমেয়াদে এটি পুরো বাস্তুতন্ত্র ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। এসব ক্ষতির দায়ভার তাহলে কে নেবে?
প্রাণিখাদ্যে ভেজাল ও অ্যান্টিবায়োটিক
গবাদিপ্রাণি ও হাঁস-মুরগির ভেজাল খাদ্য খামারশিল্প এবং প্রাণিসম্পদ উন্নয়নের জন্য মারাত্মক হুমকি। অধিক মুনাফার আশায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী প্রাণিখাদ্যে নিম্নমানের, অনিরাপদ ও বিষাক্ত উপাদান মেশান বলে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে।
এমনকি কয়েকটি ফিড মিল কোম্পানির উৎপাদিত খাদ্যে অননুমোদিত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু গবাদিপ্রাণি ও হাঁস-মুরগির স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়, মানবস্বাস্থ্যের জন্যও বড় ঝুঁকি। পোল্ট্রি ফিডে প্রোটিনের মাত্রা বাড়ানোর জন্য বিপজ্জনক ক্রোমিয়ামযুক্ত ট্যানারি বর্জ্য ব্যবহারের প্রমাণ অতীতে পাওয়া গেছে। গমের ভুসি বা চোকারের সঙ্গে কাঠের মিহি গুঁড়া, নিম্নমানের ধানের কুঁড়া কিংবা বালি মেশানোর অভিযোগও রয়েছে।
দামি প্রোটিন উৎস—যেমন খৈলের—ওজন ও কৃত্রিমভাবে নাইট্রোজেনের মাত্রা বাড়াতে ইউরিয়া প্রয়োগ করা হতে পারে। ভালো দানাদার খাদ্যের সঙ্গে ছত্রাক আক্রান্ত বা নষ্ট গম, ভুট্টা ও চাল মিশিয়ে দেওয়ার অভিযোগও নতুন নয়। প্যাকেটজাত খাদ্যে প্রোটিনের মাত্রা বেশি দেখানোর জন্য মেলামাইন বা অন্যান্য ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহারের ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, নিয়মিত নমুনা পরীক্ষা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
প্রাণিস্বাস্থ্য ওষুধের বাজারে তুলকালাম কাণ্ড
দেশে প্রায় চার শতাধিক প্রাণিস্বাস্থ্য ওষুধ কোম্পানি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রচলিত তথ্য রয়েছে। আমদানিকারকসহ নিবন্ধিত ওষুধ কোম্পানির তালিকা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কাছে থাকার কথা।
কিন্তু এর বাইরে দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও অর্ধশতাধিক নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে, যাদের অনেকের বৈধ নিবন্ধন বা পরিচয় খুঁজে পাওয়া যায় না। এককথায়, তারা অবৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছে—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
সাপ্তাহিক কৃষি ও আমিষ-এ প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনের মাধ্যমে এসব কথিত অবৈধ কোম্পানির পণ্যের তালিকাসহ বিষয়টি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনের নজরে আনা হয়েছিল। কিন্তু দৃশ্যমান ও কার্যকর ব্যবস্থা কতটা নেওয়া হয়েছে, তা জনসমক্ষে স্পষ্ট নয়।
শুধু অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান নয়, সরকারি তালিকাভুক্ত কিছু কোম্পানির বিরুদ্ধেও নিয়মবহির্ভূতভাবে অ্যান্টিবায়োটিক বাজারজাত করার অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে কয়েকটি বিদেশি পোল্ট্রি শিল্পপ্রতিষ্ঠান সরকারি অনুমোদন ও চুক্তির আওতায় ফিড ও বাচ্চা উৎপাদন করছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো চুক্তির শর্ত যথাযথভাবে মানছে কি না, তা নিয়মিত ও স্বচ্ছভাবে পর্যবেক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা আছে কি না—সেই প্রশ্নও রয়েছে।
এসব কোম্পানি প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সরাসরি বিদেশ থেকে আমদানি করে থাকে। অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের আমদানি করা পণ্যের একটি বড় অংশ বেনামে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। সম্প্রতি চীনে অনুষ্ঠিত VIV Select China 2026 মেলায় সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনায়ও এ ধরনের কিছু অভিযোগ ও তথ্য সামনে এসেছে। বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
“সবাই মিলে, সবার সমন্বয়ে পোল্ট্রি শিল্পের উন্নয়নে কাজ করতে হবে। আগামী দিনে এই শিল্পের পণ্য যেন বিদেশে রপ্তানি করতে পারি, সেদিকে এগিয়ে যেতে হবে”—এ ধরনের বক্তব্য আমরা বিভিন্ন সভা-সেমিনারে প্রায়ই শুনি। কিন্তু এসব বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবতার সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া বড়ই কঠিন।
আমরা নিরাপদ নই, আমাদের সন্তানরাও নিরাপদ নয়
আমরা নিরাপদ নই; আমাদের সন্তানরাও নিরাপদ নয়। সর্বত্র ভেজাল, সর্বত্র বিষের আশঙ্কা। ভেজাল নিরসনের মাত্রা কমেনি; বরং পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়েছে।
আমাদের শস্যের ভেতরেই ভূত। আমরা একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে একই সুরে কথা বলি; আবার চোর-পুলিশ খেলা করি। একই সঙ্গে ভোজন করি, বিদেশ ভ্রমণ করি এবং শেষ পর্যন্ত সব অপরাধ যেন ক্ষমা হয়ে যায়।
ভাবটা এমন—গবাদিপ্রাণি ও হাঁস-মুরগিই তো খাবে, মানুষ তো সরাসরি খাবে না! অথচ শেষ পর্যন্ত এসব গবাদিপ্রাণি ও হাঁস-মুরগির মাংস, দুধ ও ডিমই মানুষের খাদ্যতালিকায় আসে। তাই এ ধরনের আত্মঘাতী চিন্তা এখনই মাথা থেকে ছেঁটে ফেলতে হবে।
এভাবে চলতে পারে না। এখন প্রশ্ন—কী করা প্রয়োজন?
প্রতিষ্ঠান আছে, জনবল আছে—তবু কাজ কোথায়?
দেশের বিপুলসংখ্যক খাদ্যপণ্যে ভেজালের অভিযোগ রয়েছে; কোনো কোনো খাদ্যে সরাসরি বিষাক্ত উপাদান থাকারও প্রমাণ মিলেছে। অথচ ভেজাল খাদ্য ও অবৈধ প্রতিষ্ঠানের ওপর নজরদারি করার জন্য দেশে একাধিক সরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন হাজার হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী। কিন্তু তাঁদের জনবল ও সক্ষমতার যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। ভেজাল ও অনিরাপদ খাদ্য প্রতিরোধে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা, যেখানে স্বাস্থ্য পরিদর্শকেরা কর্মরত;
- বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (BFSA);
- জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর (DNCRP);
- বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (BSTI);
- জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (IPH);
- বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (BCSIR);
- ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA);
- প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (DLS)।
উল্লিখিত প্রতিটি দপ্তরেরই ভেজাল খাদ্য, অনিরাপদ ওষুধ এবং বিভিন্ন পণ্যের মান যাচাই করে ব্যবস্থা গ্রহণের আইনগত বা প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা রয়েছে। দুঃখটা এখানেই—প্রত্যাশিত সমন্বয় ও দৃশ্যমান কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে না।
সম্প্রতি প্রাণিসম্পদজাত পণ্যের মান যাচাইয়ের এখতিয়ার নিয়ে বিএসটিআই ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মধ্যে টানাপোড়েনের চিত্রও আমরা দেখেছি। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর এই এখতিয়ারগত দ্বন্দ্বের সুযোগই অসাধু ব্যবসায়ীরা নেয়।
প্রয়োজন সমন্বিত ‘ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’
এখন সময় এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের আদলে বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী ও সমন্বিত ‘ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ গড়ে তোলার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার। খাদ্য, প্রাণিখাদ্য, ওষুধ, ফিড অ্যাডিটিভ, অ্যান্টিবায়োটিক এবং সংশ্লিষ্ট পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে প্রতিষ্ঠানটির থাকতে হবে সুস্পষ্ট ও সমন্বিত ক্ষমতা। প্রস্তাবিত কর্তৃপক্ষের অধীনে থাকতে পারে—
- খাদ্য, প্রাণিখাদ্য ও ওষুধের নিয়মিত নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা;
- অনুমোদিত পরীক্ষাগারের সমন্বিত নেটওয়ার্ক;
- ডিজিটাল নিবন্ধন ও লাইসেন্স যাচাই;
- উৎপাদন থেকে বিক্রয় পর্যন্ত পণ্যের ব্যাচভিত্তিক অনুসরণযোগ্যতা;
- আকস্মিক পরিদর্শন ও ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি;
- ভেজাল, নকল ও অবৈধ পণ্য দ্রুত প্রত্যাহারের ক্ষমতা;
- অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও ফৌজদারি ব্যবস্থা;
- পরীক্ষার ফলাফল ও অপরাধীর পরিচয় জনসমক্ষে প্রকাশ;
- ক্ষতিগ্রস্ত খামারি ও ভোক্তার জন্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা;
- নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান ও সমন্বয়।
অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে এখনই সাঁড়াশি অভিযান
অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার রোধে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরকে নমনীয়তা পরিহার করে আরও কঠোর, নিরপেক্ষ ও স্বার্থহীনভাবে কাজ করতে হবে। প্রেসক্রিপশন ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি বন্ধ করতে হবে। নিষিদ্ধ ও অননুমোদিত অ্যান্টিবায়োটিক উৎপাদন, আমদানি, মজুত, বিপণন ও ব্যবহারের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী অভিযান পরিচালনা করতে হবে।
একই সঙ্গে প্রয়োজন—
- খামার ও ফিড মিলে আকস্মিক পরিদর্শন;
- মাংস, দুধ, ডিম ও প্রাণিখাদ্যে নিয়মিত রেসিডিউ পরীক্ষা;
- ভেটেরিনারি প্রেসক্রিপশন ও ওষুধ বিক্রির ডিজিটাল রেকর্ড;
- অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের পর বাধ্যতামূলক প্রত্যাহারকাল অনুসরণ;
- অননুমোদিত ফিড অ্যাডিটিভ ও গ্রোথ প্রোমোটার নিষিদ্ধকরণ;
- অবৈধ কোম্পানির কারখানা ও গুদাম বন্ধ;
- অপরাধী প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল;
- পুনরাবৃত্ত অপরাধের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তি;
- পরীক্ষার ফলাফল ও গৃহীত ব্যবস্থা জনসমক্ষে প্রকাশ।
শুধু সভা-সেমিনারে বক্তৃতা দিয়ে প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়ন সম্ভব নয়। নিরাপদ মাংস, দুধ ও ডিম নিশ্চিত করতে হলে ভেজাল খাদ্য, নকল ওষুধ, অবৈধ ফিড অ্যাডিটিভ এবং অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও ধারাবাহিক ব্যবস্থা নিতে হবে।
সাপ্তাহিক কৃষি ও আমিষ-এর পরবর্তী প্রতিবেদনে নকল ও অবৈধ মেডিসিন, ফিড অ্যাডিটিভ এবং অ্যান্টিবায়োটিকের কথিত আমদানিকারক ও বাজারজাতকারী কোম্পানিগুলোর বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ যাচাই সাপেক্ষে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে বলে আশা করা যায়।
মানুষের জীবন, জনস্বাস্থ্য, খামারির বিনিয়োগ এবং দেশের প্রাণিসম্পদ শিল্প নিয়ে আর চোর-পুলিশ খেলার সুযোগ নেই। মুখের প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট হয়েছে—এখন প্রয়োজন কঠোর আইন প্রয়োগ, জবাবদিহি এবং দৃশ্যমান সাঁড়াশি অভিযান।






















