ময়মনসিংহে চালু হলো ‘অ্যাকুয়াকালচার সেন্টার অব এক্সিলেন্স’ ।। আধুনিক RAS প্রযুক্তিতে দেশের মৎস্য উৎপাদন, প্রশিক্ষণ ও রপ্তানিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন।।
ড. বায়েজিদ মোড়ল | প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক | AgricultureNews24.com

বাংলাদেশের মৎস্য খাতকে প্রযুক্তিনির্ভর, পরিবেশবান্ধব ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পর্যায়ে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে ময়মনসিংহের তারাকান্দায় আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়েছে ‘অ্যাকুয়াকালচার সেন্টার অব এক্সিলেন্স’। আধুনিক Recirculating Aquaculture System (RAS) প্রযুক্তিভিত্তিক এই কেন্দ্র দেশের মাছ চাষে গবেষণা, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি সম্প্রসারণ এবং উচ্চ উৎপাদনশীলতা অর্জনের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্তের সূচনা করবে।
গত ২৯ জুলাই ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার বানিহালা ইউনিয়নের মাঝিয়ালি গ্রামে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী, গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, উদ্যোক্তা ও মৎস্যচাষিসহ প্রায় দুই শতাধিক অতিথি অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন Fishtech (BD) Limited-এর চেয়ারম্যান খন্দকার ফরহাদ হোসেন। প্রধান অতিথি ছিলেন মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক এবং সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত জরিস ভ্যান বোমেল।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই কেন্দ্র?
বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অভ্যন্তরীণ মাছ উৎপাদনকারী দেশ। বছরে ৫০ লাখ টনেরও বেশি মাছ উৎপাদিত হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি সম্ভাবনা এখনও পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এখন সময়ের দাবি। এই বাস্তবতা থেকেই FoodTechBangladesh প্রকল্পের আওতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অ্যাকুয়াকালচার সেন্টার অব এক্সিলেন্স।

FoodTechBangladesh প্রকল্প
নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের অর্থায়নে পরিচালিত পাঁচ বছর মেয়াদি FoodTechBangladesh প্রকল্পের আওতায় Larive International-এর সমন্বয়ে Fishtech (BD) Limited, De Heus, Viqua Water Solutions, LightCastle Partners এবং Gemini Sea Food যৌথভাবে কাজ করছে। প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হলো বাংলাদেশে আধুনিক জলজ প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, গবেষণা, প্রদর্শনী এবং বাজারসংযোগ উন্নয়নের মাধ্যমে একটি টেকসই মৎস্য শিল্প গড়ে তোলা।
রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য

নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত জরিস ভ্যান বোমেল বলেন, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে মাছ উৎপাদনে বৈশ্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। তবে উৎপাদনের গুণগত মান, টেকসই প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে হলে আরও আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ করতে হবে। তিনি সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতের এই যৌথ উদ্যোগকে সময়োপযোগী ও দূরদর্শী পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন।
মহাপরিচালকের মন্তব্য
মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক বলেন, সীমিত জমি ব্যবহার করেও অধিক উৎপাদন সম্ভব—নেদারল্যান্ডস তার বাস্তব উদাহরণ। বাংলাদেশের মৎস্য, পোল্ট্রি ও ডেইরি খাতেও একই ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। তিনি জানান, গত দুই-তিন দশকে দেশের মোট মাছ উৎপাদনে অ্যাকুয়াকালচারের অবদান ১০ শতাংশ থেকে বেড়ে বর্তমানে ৬০ শতাংশেরও বেশি হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব আরও শক্তিশালী হলে এই অগ্রগতি বহুগুণ বাড়বে।
RAS প্রযুক্তির বিশেষত্ব
অনুষ্ঠানে বিশেষ উপস্থাপনায় আধুনিক Tank RAS এবং Pond RAS প্রযুক্তির কার্যকারিতা তুলে ধরা হয়। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে একই পানি পুনঃব্যবহার করে অল্প জায়গায় প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় কয়েকগুণ বেশি মাছ উৎপাদন সম্ভব। একই সঙ্গে পানি ও খাদ্যের অপচয় কমে যায় এবং উৎপাদন ব্যয়ও নিয়ন্ত্রণে থাকে।
কেন্দ্রটিতে রয়েছে আধুনিক ডিজিজ ডায়াগনসিস ল্যাবরেটরি, ওয়াটার কোয়ালিটি টেস্টিং সুবিধা এবং কারিগরি পরামর্শ প্রদান ব্যবস্থা। ফলে মাছের রোগ নির্ণয়, পানির গুণগত মান পরীক্ষা এবং তাৎক্ষণিক প্রযুক্তিগত সহায়তা একই স্থানে পাওয়া যাবে।
খামারিদের জন্য নতুন সুযোগ
Fishtech (BD) Limited-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তারেক সরকার বলেন, দেশে মাছ চাষের জমি কমে যাচ্ছে, অথচ মাছের চাহিদা বাড়ছে। তাই ভবিষ্যতের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনের কোনো বিকল্প নেই। শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানিযোগ্য মান নিশ্চিত করাও জরুরি। এ লক্ষ্যে আগামী তিন বছরে প্রায় এক হাজার মাছচাষিকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
ইতোমধ্যে যা অর্জিত হয়েছে
FoodTechBangladesh প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে ৬০টির বেশি প্রদর্শনী কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। অনলাইন ও সরাসরি মিলিয়ে প্রায় ১,৪০০ মৎস্যচাষিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি Aqua Coach নামে একটি ডিজিটাল অ্যাপের মাধ্যমে খামার ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।
খামারিদের প্রত্যাশা
অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া মৎস্যচাষিরা জানান, প্রচলিত পদ্ধতিতে উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও লাভের পরিমাণ কমছে। আধুনিক RAS প্রযুক্তি সহজলভ্য হলে কম জায়গায় অধিক মাছ উৎপাদন সম্ভব হবে এবং পানির পুনঃব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয়ও কমে আসবে। ফলে দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিরাও লাভবান হবেন।
ভবিষ্যতের মৎস্য খাত
সমাপনী বক্তব্যে খন্দকার ফরহাদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশের মৎস্য খাতকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর, পরিবেশবান্ধব এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করতে সরকারি প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী, গবেষক ও উদ্যোক্তাদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। উদ্বোধন শেষে অতিথিরা কেন্দ্রটির বিভিন্ন প্রযুক্তি, গবেষণা সুবিধা ও পরিচালন ব্যবস্থা পরিদর্শন করেন।
সমাপনী মূল্যায়ন
অ্যাকুয়াকালচার সেন্টার অব এক্সিলেন্স শুধু একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিনির্ভর মৎস্য খাতের একটি মডেল। সীমিত জমি ও পানির সর্বোচ্চ ব্যবহার, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন মাছ উৎপাদন এবং রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই উদ্যোগ দেশের মৎস্য শিল্পকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি নীতিগত সহায়তা এবং বেসরকারি বিনিয়োগের সমন্বয় ঘটলে এই ধরনের প্রযুক্তিকেন্দ্র বাংলাদেশের ব্লু ইকোনমি বাস্তবায়নেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।























