ড. বায়েজিদ মোড়লের গবেষণাধর্মী প্রতিবেদন,
ব্রয়লার মুরগির ইতিহাস ও বিবর্তন
( শত বছরের বৈজ্ঞানিক গবেষণা, জেনেটিক উন্নয়ন ও প্রযুক্তির হাত ধরে বিশ্বের সবচেয়ে সফল মাংস উৎপাদনকারী মুরগির জন্ম )
-ড. বায়েজিদ মোড়ল | AgricultureNews24.com

বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও দ্রুত উৎপাদনযোগ্য প্রাণিজ আমিষের অন্যতম উৎস হলো ব্রয়লার মুরগি। গরু, ছাগল কিংবা হাঁসের তুলনায় কম সময়, কম জায়গা এবং তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয়ে অধিক পরিমাণে মাংস উৎপাদন করা সম্ভব হওয়ায় ব্রয়লার শিল্প বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই বাণিজ্যিকভাবে ব্রয়লার উৎপাদন হচ্ছে এবং কোটি কোটি মানুষের কর্মসংস্থান এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত।
তবে একটি বিষয় অনেকেরই অজানা—ব্রয়লার কোনো প্রাকৃতিক জাত নয়। এটি মানুষের পরিকল্পিত বৈজ্ঞানিক গবেষণা, নির্বাচিত প্রজনন (Selective Breeding), উন্নত জেনেটিক্স, সুষম পুষ্টি এবং আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে তৈরি একটি বিশেষ ধরনের মাংস উৎপাদনকারী মুরগি। গত এক শতাব্দীতে এই মুরগির উন্নয়নের ইতিহাস কৃষি ও প্রাণিসম্পদ বিজ্ঞানের অন্যতম বড় সাফল্যের গল্প।
গৃহপালিত মুরগির উৎপত্তি
বিজ্ঞানীদের মতে, প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার বছর আগে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার লাল বনমুরগি (Red Jungle Fowl) থেকে গৃহপালিত মুরগির উৎপত্তি। প্রথমদিকে মানুষ মুরগি পালন করত ধর্মীয় আচার, ক্রীড়া (মোরগ লড়াই), ডিম উৎপাদন এবং পারিবারিক খাদ্যের জন্য। তখন মাংস উৎপাদনের উদ্দেশ্যে আলাদা কোনো জাত ছিল না। ডিম উৎপাদন কমে গেলে বা পুরুষ বাচ্চাগুলো বড় হলে সেগুলোই মাংস হিসেবে ব্যবহার করা হতো।
ব্রয়লারের আগের যুগ
উনিশ শতকের শেষভাগ এবং বিশ শতকের শুরু পর্যন্ত মাংসের জন্য ব্যবহৃত মুরগিগুলো ছিল ধীরে বেড়ে ওঠা দেশি বা দ্বৈত-উদ্দেশ্য (Dual-purpose) জাত। একটি মুরগিকে বাজারজাতযোগ্য ওজনে আনতে প্রায় ৫–৬ মাস সময় লাগত এবং খাদ্য দক্ষতাও ছিল কম। ফলে মুরগির মাংস ছিল তুলনামূলক ব্যয়বহুল এবং সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
১৯২৩ সালে ব্রয়লার শিল্পের সূচনা
আধুনিক ব্রয়লার শিল্পের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে ১৯২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ডেলাওয়্যার অঙ্গরাজ্যে। খামারি সিসিল স্টিল (Cecile Steele) ডিম উৎপাদনের জন্য ৫০টি বাচ্চা অর্ডার করেছিলেন, কিন্তু ভুলবশত তাঁর কাছে ৫০০টি বাচ্চা পৌঁছে যায়। তিনি সেগুলো ফেরত না দিয়ে বড় করে মাংস হিসেবে বিক্রি করেন এবং অপ্রত্যাশিতভাবে উল্লেখযোগ্য লাভ করেন। পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যে তাঁর খামার দ্রুত সম্প্রসারিত হয় এবং এই সফলতা অন্য খামারিদেরও উদ্বুদ্ধ করে। ইতিহাসে এই ঘটনাকেই আধুনিক বাণিজ্যিক ব্রয়লার শিল্পের সূচনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
‘চিকেন অব টুমরো’—একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রে মাংসের চাহিদা দ্রুত বাড়তে থাকে। এ সময় সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগে “Chicken of Tomorrow” কর্মসূচি চালু করা হয়। এর লক্ষ্য ছিল এমন একটি মুরগি তৈরি করা, যা দ্রুত বৃদ্ধি পাবে, বুকের মাংস বেশি হবে, খাদ্যকে দক্ষতার সঙ্গে মাংসে রূপান্তর করতে পারবে এবং কম সময়ে বাজারজাত করা যাবে। এই কর্মসূচি আধুনিক ব্রয়লার উন্নয়নের ভিত্তি স্থাপন করে এবং পরবর্তী সময়ে বিশ্বের প্রায় সব বাণিজ্যিক ব্রয়লার লাইনের জেনেটিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
নির্বাচিত প্রজননের মাধ্যমে আধুনিক ব্রয়লারের জন্ম
বিজ্ঞানীরা কর্নিশ (Cornish), হোয়াইট প্লাইমাউথ রক (White Plymouth Rock), নিউ হ্যাম্পশায়ারসহ কয়েকটি উন্নত জাতের মধ্যে ধারাবাহিক সংকরায়ণ ও নির্বাচিত প্রজননের মাধ্যমে এমন মুরগি তৈরি করেন, যা দ্রুত বৃদ্ধি পায়, কম খাদ্যে বেশি ওজন অর্জন করে এবং অধিক মাংস উৎপাদন করে। এই উন্নয়ন ছিল সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক নির্বাচনের ফল; কোনো জিন সংযোজন বা জিন পরিবর্তনের মাধ্যমে নয়।
জেনেটিক উন্নয়নের নতুন অধ্যায়
১৯৬০-এর দশক থেকে বিশ্বে বিশেষায়িত ব্রিডিং কোম্পানিগুলো গ্রেট-গ্র্যান্ড প্যারেন্ট (GGP), গ্র্যান্ড প্যারেন্ট (GP), প্যারেন্ট স্টক (PS) এবং বাণিজ্যিক ব্রয়লার—এই চার স্তরের প্রজনন ব্যবস্থা গড়ে তোলে। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের উন্নয়ন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং জেনেটিক মান সংরক্ষণ সহজ হয়। বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ ব্রয়লার কয়েকটি আন্তর্জাতিক জেনেটিক লাইনের ওপর নির্ভরশীল।
আধুনিক ব্রয়লারের বৈশিষ্ট্য
গত এক শতাব্দীতে ব্রয়লার উৎপাদনে অভূতপূর্ব পরিবর্তন এসেছে। একসময় যে মুরগিকে ১৬–২০ সপ্তাহ পালন করতে হতো, এখন উন্নত ব্যবস্থাপনায় মাত্র ৩৫–৪২ দিনেই ২–৩ কেজি ওজনে পৌঁছে যায়। একই সঙ্গে খাদ্য রূপান্তর দক্ষতা (Feed Conversion Ratio) উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে; বর্তমানে প্রায় ১.৪–১.৬ কেজি খাদ্যে ১ কেজি ওজন বৃদ্ধি সম্ভব, যা প্রাণিসম্পদ বিজ্ঞানের একটি বড় অর্জন।
বিশ্বে ব্রয়লার শিল্পের সম্প্রসারণ
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশসমূহ, থাইল্যান্ড, তুরস্ক, ভারত ও ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের প্রধান ব্রয়লার উৎপাদনকারী অঞ্চল। উন্নত জেনেটিক্স, আধুনিক হ্যাচারি, স্বয়ংক্রিয় ফিড মিল, প্রসেসিং প্ল্যান্ট এবং সমন্বিত বিপণন ব্যবস্থার কারণে ব্রয়লার শিল্প বিশ্বব্যাপী একটি বৃহৎ কৃষি-শিল্পে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশে ব্রয়লার শিল্পের বিকাশ
বাংলাদেশে ব্রয়লার পালন শুরু হয় মূলত ১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে এবং ১৯৯০-এর দশকে বাণিজ্যিকভাবে এর দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটে। উন্নত হ্যাচারি, ফিড শিল্প, ভ্যাকসিন উৎপাদন, আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনা এবং বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের ফলে বর্তমানে ব্রয়লার শিল্প দেশের অন্যতম বৃহৎ প্রাণিসম্পদভিত্তিক শিল্পে পরিণত হয়েছে। এই খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লাখো মানুষ কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন এবং দেশের প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।
ভবিষ্যতের ব্রয়লার শিল্প
ভবিষ্যতে ব্রয়লার শিল্প আরও প্রযুক্তিনির্ভর হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক খামার ব্যবস্থাপনা, ইন্টারনেট অব থিংস (IoT), স্বয়ংক্রিয় পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, রোগ পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তি, উন্নত জেনেটিক নির্বাচন এবং অ্যান্টিবায়োটিকের বিকল্প ব্যবস্থাপনা এই শিল্পকে আরও টেকসই ও দক্ষ করে তুলবে। একই সঙ্গে প্রাণিকল্যাণ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর বিষয়েও গুরুত্ব বাড়বে।
সমাপনী মূল্যায়ন
ব্রয়লার মুরগির ইতিহাস মূলত মানুষের বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন, গবেষণা এবং পরিকল্পিত উন্নয়নের ইতিহাস। মাত্র এক শতাব্দীর ব্যবধানে সাধারণ গৃহপালিত মুরগি থেকে এমন একটি উচ্চ উৎপাদনশীল বাণিজ্যিক পাখি তৈরি হয়েছে, যা আজ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের সাশ্রয়ী প্রাণিজ আমিষের প্রধান উৎস। ভবিষ্যতে জেনেটিক উন্নয়ন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আধুনিক পুষ্টি এবং টেকসই উৎপাদন প্রযুক্তির সমন্বয়ে ব্রয়লার শিল্প আরও সমৃদ্ধ হবে এবং বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
–ড. বায়েজিদ মোড়ল | AgricultureNews24.com























