খুলনায় নিরাপদ ও অ্যান্টিবায়োটিকমুক্ত ব্রয়লার উৎপাদন নিয়ে কর্মশালা।।
খুলনা, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬: নিরাপদ, টেকসই ও আধুনিক ব্রয়লার উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে খুলনায় দিনব্যাপী বিভাগীয় কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। কর্মশালায় সঠিক পুষ্টি ও খামার ব্যবস্থাপনা, রোগ প্রতিরোধ, বায়োসিকিউরিটি, দায়িত্বশীল অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার এবং অ্যান্টিবায়োটিকমুক্ত মাংস উৎপাদনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) নগরীর সোনাডাঙ্গায় হোটেল গ্র্যান্ড খুলনায় ওয়ার্ল্ড’স পোল্ট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন—বাংলাদেশ শাখা (WPSA-BB) এ কর্মশালার আয়োজন করে। এতে পোল্ট্রি খাতের উদ্যোক্তা, খামারি, বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, সরকারি কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীরা অংশ নেন।
আয়োজকেরা জানান, মাঠপর্যায়ের খামারিদের আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ব্রয়লার পালন সম্পর্কে বাস্তবভিত্তিক ধারণা দেওয়া এবং নিরাপদ ও মানসম্মত মাংস উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোই ছিল কর্মশালার মূল লক্ষ্য।
সকালে নিবন্ধনের পর অতিথিদের আসন গ্রহণের মধ্য দিয়ে কর্মশালার মূল কার্যক্রম শুরু হয়। স্বাগত বক্তব্যে কর্মশালার উদ্দেশ্য এবং WPSA-BB-এর কার্যক্রম তুলে ধরেন সংগঠনের সদস্য মো. জাকারিয়া ইসলাম।
পুষ্টি ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব

‘নিরাপদ ও আদর্শ ব্রয়লার খামার তৈরিতে পুষ্টি ও ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব’ শীর্ষক সেশন পরিচালনা করেন WPSA-BB-এর সদস্য মোহাম্মদ নাজমুস সাকিব হামিম।
তিনি বয়সভিত্তিক সুষম পুষ্টি, মানসম্মত খাদ্য, নিরাপদ পানি, সঠিক ফিড ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং খামারের সার্বিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। আলোচনায় বলা হয়, শুধু ভালো মানের বাচ্চা বা ফিড ব্যবহার করলেই কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন নিশ্চিত হয় না। বাচ্চার জেনেটিক সম্ভাবনার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পুষ্টি, পানি, তাপমাত্রা, বায়ু চলাচল, বায়োসিকিউরিটি ও দৈনন্দিন পরিচর্যার সমন্বিত প্রয়োগ জরুরি।
চিকিৎসার চেয়ে রোগ প্রতিরোধে জোর

‘নিরাপদ ও আদর্শ ব্রয়লার খামার তৈরিতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব’ বিষয়ে আলোচনা করেন খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক ডা. মো. শহিদুল ইসলাম।
তিনি রোগ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্যকর খামার পরিবেশ, বায়োসিকিউরিটি, পরিচ্ছন্নতা ও জীবাণুনিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব তুলে ধরেন। রোগ দেখা দেওয়ার পর চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করে নির্ধারিত টিকাদান কর্মসূচি অনুসরণ এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাপনায় বেশি গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সেশনে খামারে মানুষ ও যানবাহনের প্রবেশ–বহির্গমন নিয়ন্ত্রণ, সরঞ্জাম ও পরিবহন ব্যবস্থাপনা এবং নিয়মিত পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্তকরণের মাধ্যমে রোগের ঝুঁকি কমানোর বিষয়েও আলোচনা হয়।
অ্যান্টিবায়োটিকমুক্ত উৎপাদনে বিকল্প ব্যবস্থাপনা

কর্মশালায় বিশেষ গুরুত্ব পায় অ্যান্টিবায়োটিকমুক্ত ব্রয়লার উৎপাদন। ‘অ্যান্টিবায়োটিকমুক্ত ব্রয়লার উৎপাদনের বিবেচ্য বিষয়সমূহ’ শীর্ষক সেশন পরিচালনা করেন WPSA-BB-এর সদস্য মো. আবদুর রহমান।
তিনি অপ্রয়োজনীয় ও অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ঝুঁকি, রোগের সঠিক শনাক্তকরণ, প্রয়োজনভিত্তিক চিকিৎসা এবং উন্নত খামার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রোগের চাপ কমানোর উপায় তুলে ধরেন। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে প্রিবায়োটিক, প্রোবায়োটিক, পোস্টবায়োটিক, সিনবায়োটিক, ব্যাকটেরিওফাজ, ফাইটোজেনিক উপাদান ও এনজাইমের সম্ভাব্য ভূমিকার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে এসব পদ্ধতির কার্যকর ও দায়িত্বশীল প্রয়োগের মাধ্যমে ভোক্তার আস্থা তৈরির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।
হাঁস শিল্পে নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা

কর্মশালায় দেশের সম্ভাবনাময় হাঁস পালন খাত নিয়ে আলোচনা করেন এ.এফ.এম. ফয়জুল ইসলাম মানিক। তিনি বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় সাত কোটি হাঁস রয়েছে এবং হাঁসের সংখ্যায় দেশটি চীন ও ভিয়েতনামের পর বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। হাঁসের ফিড, হ্যাচারি, নিরাপদ ডিম ও মাংস, প্রক্রিয়াজাতকরণ, ভ্যাকসিন এবং রোগ নির্ণয় সেবাকে ঘিরে বড় বাজার তৈরি হচ্ছে। তবে উন্নত জেনেটিকস, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও কোল্ড চেইনে এখনো গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি রয়েছে।
তিনি বলেন, হাঁস শিল্প জনগণের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত প্রাণিজ আমিষের বড় উৎস হতে পারে। একই সঙ্গে হ্যাচারি, ফিড, ভ্যাকসিন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্রান্তিক পর্যায়ের সেবা খাতে বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি দ্রুত বিকাশমান একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র।
খামারিদের সমস্যা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে মতবিনিময়
কর্মশালার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্বে খামারিদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় করা হয়। অংশগ্রহণকারী খামারিরা ব্রয়লার উৎপাদনে তাদের মাঠপর্যায়ের সমস্যা, চ্যালেঞ্জ ও বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। বিশেষজ্ঞরা তাদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন এবং খামার ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে পরামর্শ দেন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে WPSA-BB-এর সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ফয়েজুর রহমান বলেন, পোল্ট্রি শিল্পের টেকসই উন্নয়নে খামারি, শিল্প উদ্যোক্তা, গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
খুলনা বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরিচালক ডা. মো. আব্দুর রহিম মাঠপর্যায়ে প্রাণিসম্পদ ও পোল্ট্রি উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি সেবা এবং ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. ফারুক হাসান নিরাপদ পোল্ট্রি উৎপাদনে বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
খামার পর্যায় থেকেই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতের আহ্বান

প্রধান অতিথির বক্তব্যে খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. মো. আসাদুজ্জামান সরকার বলেন, নিরাপদ ও মানসম্মত পোল্ট্রি উৎপাদনে বিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞান ও আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ জরুরি। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ভোক্তার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে খামার পর্যায় থেকেই যথাযথ ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করতে হবে।
তিনি বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সরকারি সংস্থা, পোল্ট্রি শিল্প ও খামারিদের মধ্যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময় বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।

কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন WPSA-BB-এর প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক এবং বিভাগীয় কর্মশালা কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মো. ইলিয়াস হোসেন। তিনি বলেন, আধুনিক ও নিরাপদ ব্রয়লার খামার প্রতিষ্ঠায় শুধু উৎপাদন বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; পুষ্টি, স্বাস্থ্য, বায়োসিকিউরিটি, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ খাদ্য এবং দায়িত্বশীল অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের সমন্বিত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি পোল্ট্রি খাতের উন্নয়নে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও জ্ঞান বিনিময়ের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের খামারিদের আধুনিক প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে আরও বেশি সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন।
কর্মশালার শেষ পর্যায়ে প্রশিক্ষণ-পরবর্তী মূল্যায়নের মাধ্যমে আলোচিত বিষয়গুলো সম্পর্কে অংশগ্রহণকারীদের জ্ঞান ও উপলব্ধির পরিবর্তন যাচাই করা হয়।

আয়োজকদের মতে, সঠিক পুষ্টি, আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনা, রোগ প্রতিরোধ, বায়োসিকিউরিটি এবং অ্যান্টিবায়োটিকমুক্ত নিরাপদ ব্রয়লার উৎপাদনকে একটি সমন্বিত প্রশিক্ষণ কাঠামোর আওতায় আনার ক্ষেত্রে এ কর্মশালা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। মাঠপর্যায়ে খামারিদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা ছড়িয়ে দিতে দেশের অন্যান্য বিভাগেও এ ধরনের আয়োজন প্রয়োজন।
সমগ্র অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন WPSA-BB-এর সদস্য মোহাম্মদ নাজমুস সাকিব হামিম।

































