মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতে মন্ত্রণালয়–আইসিসিসিএডি সমঝোতা।।
ঢাকা, রবিবার, ৫ আশ্বিন (২০ সেপ্টেম্বর): মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের সুযোগ কাজে লাগাতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইসিসিসিএডি) মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে।

রোববার মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সহযোগিতা অনুবিভাগের যুগ্মসচিব বেবী রাণী কর্মকার এবং আইসিসিসিএডির রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি অ্যাডভাইজার ড. ফজলে রাব্বি সাদেক আহমেদ নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন দেশের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা, অতিবৃষ্টি, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং রোগব্যাধির ঝুঁকি এ দুই খাতের উৎপাদন ও জীবিকায় ক্রমবর্ধমান চাপ সৃষ্টি করছে। এ পরিস্থিতিতে গবেষণা, পরিকল্পনা, দক্ষ জনবল এবং কার্যকর অর্থায়নের সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি।
সমঝোতা স্মারকটি যেন শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে—এ আহ্বান জানিয়ে সচিব বলেন, এর আওতায় গৃহীত কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে দৃশ্যমান ও কার্যকর অবদান রাখতে হবে। মন্ত্রণালয় এবং এর অধীন দপ্তর, অধিদপ্তর ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের জন্য যে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তার সুযোগ তৈরি হবে, তার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, এ উদ্যোগের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও অর্থায়নের সুযোগ কাজে লাগানোর নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। সমন্বিত প্রচেষ্টা ও পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে সমঝোতা স্মারকটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রকল্প প্রণয়নে সহায়তা

সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং এর অধীন অধিদপ্তর ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়াতে সহযোগিতা করবে আইসিসিসিএডি। দেশীয় বাস্তবতা ও আন্তর্জাতিক জলবায়ু কাঠামোর আলোকে কর্মকর্তাদের সক্ষমতা উন্নয়ন, কারিগরি জ্ঞান বিনিময় এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।
একই সঙ্গে গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান থেকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের জন্য অর্থায়নের সুযোগ কাজে লাগাতে প্রকল্প ধারণা তৈরি, প্রকল্প প্রস্তাব প্রণয়ন এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রস্তুতিতে সহযোগিতা করা হবে।
এর ফলে জলবায়ু সহনশীল মৎস্যচাষ, প্রাণিসম্পদ উৎপাদন, রোগ নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য ও পানি ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগ প্রস্তুতি এবং ক্ষতিগ্রস্ত খামারি ও মৎস্যচাষিদের অভিযোজন সক্ষমতা বাড়াতে নতুন প্রকল্প গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
নীতি ও কর্মসূচিতে জলবায়ু বিষয়কে মূলধারায় আনা
সমঝোতার আওতায় মন্ত্রণালয়ের নীতি, পরিকল্পনা, কর্মসূচি ও নিয়মিত কার্যক্রমে জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত বিষয়গুলোকে মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করতে কারিগরি সহায়তা দেবে আইসিসিসিএডি। পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক ফোরাম ও পলিসি ডায়ালগে মন্ত্রণালয়ের অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব জোরদারেও সহযোগিতা করা হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক জাতিসংঘ সম্মেলন—কনফারেন্স অব দ্য পার্টিজ বা কপে কার্যকর অংশগ্রহণের জন্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিমূলক সহায়তাও দেবে প্রতিষ্ঠানটি।
এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় বাংলাদেশের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের ঝুঁকি, প্রয়োজন এবং অর্থায়নের দাবি আরও কার্যকরভাবে তুলে ধরার সক্ষমতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
জলবায়ু ঝুঁকিতে গুরুত্বপূর্ণ দুই খাত
বাংলাদেশে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং লাখো পরিবারের আয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে জলাশয়ের পরিবেশ ও পানির গুণগত মানের পরিবর্তন, উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি, মাছের আবাসস্থল ও প্রজননচক্রের ওপর চাপ, গবাদিপ্রাণি ও হাঁস-মুরগির তাপজনিত ধকল, খাদ্য ও সুপেয় পানির সংকট এবং নতুন রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।
ফলে খাত দুটিতে অভিযোজনভিত্তিক গবেষণা, আগাম সতর্কতা, জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, মন্ত্রণালয় ও আইসিসিসিএডির এ সমঝোতা বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা, পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য এবং নিয়মিত অগ্রগতি মূল্যায়নের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হলে মৎস্যচাষি ও খামারিদের জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি জাতীয় খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা সুরক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশনের মো. মীর হোসেন, মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব নীলুফা আক্তার, মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. মো. লতিফুল ইসলাম, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিকল্পনা ও মূল্যায়ন কোষের চিফ ড. মো. হাবিবুর রহমান এবং আইসিসিসিএডির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিব হকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।























