চিংড়ি খাতে ২,০০০ কোটি টাকার অর্থায়ন: টেকসই কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও রপ্তানি বৃদ্ধিতে প্রান্তিক চাষিদের জন্য কমপক্ষে ৭০% বরাদ্দ এবং নীতিনির্ধারণে FOAB-কে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি।
-ড. বায়েজিদ মোড়ল | Agriculturenews24.com

বাংলাদেশের চিংড়ি খাতকে ঘিরে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মাননীয় গভর্নর সাম্প্রতিক এক প্রেস ব্রিফিংয়ে ঘোষণা দিয়েছেন, দেশের চিংড়ি শিল্পের উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি বৃদ্ধি করতে ২,০০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ অর্থায়ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী এবং প্রশংসনীয়। তবে বাস্তব প্রশ্ন হচ্ছে—
এই অর্থায়নের প্রকৃত উপকারভোগী কারা হবেন?
যদি অর্থায়নের বড় অংশ কেবল রপ্তানিকারক বা বৃহৎ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে দেশের প্রায় ৩ লাখ প্রান্তিক চিংড়ি চাষি, হাজারো হ্যাচারি, ফিড কোম্পানি, ওষুধ সরবরাহকারী, ডিপো, বরফকল, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাত শিল্প কাঙ্ক্ষিত সুফল পাবে না।
অর্থাৎ উৎপাদনও বাড়বে না, কর্মসংস্থানও বাড়বে না এবং রপ্তানিও প্রত্যাশিত হারে বৃদ্ধি পাবে না।
বাংলাদেশের চিংড়ি শিল্পের বর্তমান চিত্র
বর্তমানে দেশে প্রায়
- প্রায় ২.৭০-২.৮০ লাখ হেক্টর জমিতে চিংড়ি চাষ হয়।
- প্রায় ২.৫ থেকে ৩.০ লাখ প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র চাষি সরাসরি যুক্ত।
- প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ১০ থেকে ১২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
- প্রায় ৭০টির মতো রপ্তানিযোগ্য প্রসেসিং কারখানা রয়েছে।
- ৬০-৭০টি সামুদ্রিক এবং ৮০-১০০টি স্বাদুপানির হ্যাচারি রয়েছে।
- শতাধিক ফিড, ওষুধ, আইস প্ল্যান্ট, পরিবহন ও ডিপো ব্যবসা এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত।
- শুধু একটি শিল্প নয়—এটি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ গ্রামীণ কর্মসংস্থানভিত্তিক রপ্তানিমুখী অর্থনৈতিক খাত।৮৮৯৭
রপ্তানি সক্ষমতা এখনও পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না
গত অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৩০ হাজার মেট্রিক টন হিমায়িত মাছ ও মৎস্যপণ্য রপ্তানি হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ১৯ হাজার মেট্রিক টন ছিল হিমায়িত চিংড়ি ও সংশ্লিষ্ট পণ্য। অন্যদিকে দেশের ফ্রোজেন ফুড শিল্পের বিদ্যমান প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতা প্রায় ৪ লাখ মেট্রিক টন। অর্থাৎ বিদ্যমান সক্ষমতার একটি বড় অংশ এখনও অব্যবহৃত। এটি প্রমাণ করে—মূল সমস্যা প্রসেসিংয়ে নয়, বরং পর্যাপ্ত কাঁচামাল উৎপাদনে।
উৎপাদন বাড়াতে হলে অর্থ পৌঁছাতে হবে চাষির হাতে
বাংলাদেশের অধিকাংশ চিংড়ি চাষি – ক্ষুদ্র, প্রান্তিক, বর্গাচাষি ও ব্যাংক ঋণবঞ্চিত । এদের বড় অংশ এখনও উচ্চ সুদের এনজিও ঋণ, মহাজনি, ফড়িয়া, ডিপো মালিক এর ওপর নির্ভরশীল। ফলে তারা – উন্নত পোনা ব্যবহার করতে পারে না , উন্নত খাদ্য ব্যবহার করতে পারে না , রোগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ করতে পারে না। তাই ২,০০০ কোটি টাকার কমপক্ষে ৭০% বরাদ্দ যেতে হবে প্রকৃত উৎপাদকদের কাছে ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থায়ন কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত—“উৎপাদন বৃদ্ধি।” আর উৎপাদন বাড়াতে হলে অর্থ যেতে হবে – প্রকৃত চাষি, ঘের মালিক, বর্গাচাষি, নারী উদ্যোক্তা, যুব উদ্যোক্তা এর কাছে। সে কারণে FOAB-এর পক্ষ থেকে যৌক্তিক দাবি করা হয়েছে, মোট অর্থায়নের কমপক্ষে ৭০ শতাংশ প্রকৃত প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র চিংড়ি চাষিদের জন্য সংরক্ষণ করা হোক।
কেন FOAB-কে নীতিনির্ধারণে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন?
বাংলাদেশে চিংড়ি খাতের একমাত্র জাতীয় পর্যায়ের উৎপাদকভিত্তিক সংগঠন হলো Fish Farm Owners Association Bangladesh (FOAB)। সংগঠনটি মাঠপর্যায়ে চাষি, ঘের মালিক, উৎপাদক, উদ্যোক্তা এর সঙ্গে সরাসরি কাজ করে। FOAB ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে লিখিতভাবে প্রস্তাব জমা দিয়েছে এবং অর্থ মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতেও অনুলিপি দিয়েছে। এটি একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। কারণ নীতিনির্ধারণে মাঠের বাস্তবতা জানা সংগঠনকে সম্পৃক্ত করলে অর্থের অপচয় কমে এবং প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে সুবিধা পৌঁছানো সহজ হয়।
FOAB-কে যেসব দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগী স্টেকহোল্ডার হিসেবে FOAB কাজ করতে পারে—
- প্রকৃত চাষি শনাক্তকরণ
- সদস্যভিত্তিক তথ্যভাণ্ডার
- আবেদন যাচাই
- মাঠ পর্যবেক্ষণ
- উৎপাদন মনিটরিং
- প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ
- অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিতকরণ
- জালিয়াতি প্রতিরোধ
- উৎপাদন বৃদ্ধির মূল্যায়ন
২,০০০ কোটি টাকা কীভাবে ব্যবহার করলে সবচেয়ে বেশি সুফল পাওয়া যাবে?
১. ক্ষুদ্র চাষিদের সহজ ঋণ – স্বল্প সুদে, ৫-৭ বছরের মেয়াদে, গ্রেস পিরিয়ডসহ।
২. উন্নত পোনা – SPF ও রোগমুক্ত পোনা নিশ্চিত করা।
৩. উন্নত খাদ্য – মানসম্মত ফিড ব্যবহারে সহায়তা।
৪. রোগ ব্যবস্থাপনা – ল্যাব, মোবাইল ভেট, রোগ শনাক্তকরণ।
৫. আধুনিক প্রযুক্তি – এয়ারেশন, বায়োসিকিউরিটি, পানির গুণগত মান।
৬. হ্যাচারি উন্নয়ন – মানসম্পন্ন পোস্ট লার্ভা উৎপাদন।
৭. ট্রেসেবিলিটি – রপ্তানি বাজারের শর্ত পূরণে ডিজিটাল ট্র্যাকিং।
৮. কোল্ড চেইন –ডিপো, বরফকল, পরিবহন, সংরক্ষণ।
৯. ভ্যালু অ্যাডিশন –রেডি-টু-কুক, রেডি-টু-ইট, উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদন।
১০. নতুন বাজার –চীন, জাপান, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপ।
অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে
বাংলাদেশে অতীতেও বিভিন্ন অর্থায়ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই
- প্রকৃত উৎপাদক বঞ্চিত হয়েছেন
- কাগুজে উদ্যোক্তা সুবিধা পেয়েছেন
- অর্থের অপব্যবহার হয়েছে
- কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন বাড়েনি।
এবার সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি হলে কর্মসংস্থানও বাড়বে না, রপ্তানিও বাড়বে না, বরং সরকারি অর্থের কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
FOAB সভাপতি মোল্লা সামছুর রহমান শাহীন বলেন- “বাংলাদেশ ব্যাংকের ২,০০০ কোটি টাকার এই উদ্যোগকে আমরা আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাই। তবে এই অর্থের মূল লক্ষ্য হতে হবে উৎপাদন বৃদ্ধি। আর উৎপাদন বাড়াতে হলে অর্থ অবশ্যই প্রকৃত চিংড়ি চাষির হাতে পৌঁছাতে হবে। যদি অর্থায়নের বড় অংশ কেবল কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে দেশের লাখো প্রান্তিক চাষি উপকৃত হবেন না এবং কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন ও রপ্তানি বৃদ্ধি সম্ভব হবে না। তাই আমরা কমপক্ষে ৭০ শতাংশ অর্থায়ন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিদের জন্য সংরক্ষণের দাবি জানাচ্ছি।”
FOAB সিনিয়র সহ-সভাপতি অর্থনীতিবিদ সাকিফ শামীম বলেন – “চিংড়ি খাতে অর্থায়নকে শুধু ঋণ কর্মসূচি হিসেবে দেখলে হবে না; এটি হতে হবে একটি বিনিয়োগ কর্মসূচি। উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুস্পষ্ট অর্থনৈতিক সূচক নির্ধারণ করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। স্বচ্ছতা, ডিজিটাল মনিটরিং এবং মাঠভিত্তিক যাচাই নিশ্চিত করা গেলে এই ২,০০০ কোটি টাকার প্রকল্প দেশের অর্থনীতিতে বহুগুণ ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।”
FOAB কার্যনির্বাহী সদস্য ড. বায়েজিদ মোড়ল বলেন – “বাংলাদেশের চিংড়ি শিল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো প্রান্তিক উৎপাদক। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, অধিকাংশ চাষি এখনও ব্যাংক ঋণের বাইরে থেকে উচ্চ সুদের অর্থের ওপর নির্ভর করে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে উন্নত পোনা, মানসম্মত খাদ্য, আধুনিক প্রযুক্তি ও রোগ ব্যবস্থাপনায় তারা পিছিয়ে পড়ছেন। এই বাস্তবতায় অর্থায়নের কেন্দ্রবিন্দুতে প্রকৃত চাষিকে রাখতে হবে। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ের তথ্য, প্রশিক্ষণ, তদারকি ও উৎপাদন মনিটরিংয়ে FOAB-কে সম্পৃক্ত করলে প্রকল্পের সফলতা অনেকগুণ বাড়বে।”
FOAB কক্সবাজার আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি মাওলানা মোঃ শহিদুল ইসলাম বলেন- “চিংড়ি খাতে নারীদের অংশগ্রহণ ক্রমেই বাড়ছে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক নারী উদ্যোক্তা এবং যুব উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে উপকূলীয় অঞ্চলে টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। তাই এই প্রকল্পে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানাই।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই বিশেষ অর্থায়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে FOAB একটি কার্যকর সহযোগী অংশীদার হতে পারে। মাঠপর্যায়ে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক, প্রকৃত চাষিদের তথ্যভাণ্ডার, সদস্যভিত্তিক সংগঠন কাঠামো এবং উৎপাদকদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের প্রত্যক্ষ কাজের অভিজ্ঞতার কারণে সংগঠনটি প্রকৃত উপকারভোগী শনাক্তকরণ, আবেদন যাচাই, প্রযুক্তিগত সহায়তা, মাঠ পর্যবেক্ষণ, উৎপাদন মনিটরিং এবং অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম। এতে প্রকল্পের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও কার্যকারিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আবেদন
বাংলাদেশের চিংড়ি শিল্প শুধু একটি রপ্তানি খাত নয়, এটি উপকূলীয় বাংলাদেশের লাখো মানুষের জীবন-জীবিকার ভিত্তি। তাই ২,০০০ কোটি টাকার এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনুরোধ থাকবে—
- প্রকৃত উৎপাদককে অগ্রাধিকার দেওয়া হোক।
- কমপক্ষে ৭০% অর্থায়ন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিদের জন্য সংরক্ষণ করা হোক।
- মাঠপর্যায়ের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে FOAB-কে সহযোগী স্টেকহোল্ডার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হোক।
- স্বচ্ছ, ডিজিটাল ও জবাবদিহিমূলক ঋণ বিতরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হোক।
- উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি বৃদ্ধিকে পরিমাপযোগ্য সূচকের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হোক।
শেষ কথা
FOAB-এর বিশ্বাস, বাংলাদেশ ব্যাংকের ২,০০০ কোটি টাকার এই বিশেষ অর্থায়ন কর্মসূচি যদি প্রকৃত উৎপাদককেন্দ্রিক নীতির ভিত্তিতে বাস্তবায়িত হয় এবং মাঠপর্যায়ের প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠন হিসেবে FOAB-কে পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও মনিটরিং প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করা হয়, তাহলে এই প্রকল্প বাংলাদেশের চিংড়ি শিল্পে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করবে। এর মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি, লাখো মানুষের কর্মসংস্থান, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং উপকূলীয় অর্থনীতির টেকসই উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। FOAB বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করে এই প্রকল্পকে একটি সফল ও আন্তর্জাতিক মানের মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠায় সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।
এটি কেবল একটি সংগঠনের দাবি নয়; বরং দেশের লাখো চিংড়ি চাষি, সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা এবং জাতীয় অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি নীতিগত প্রস্তাব।
























