সৌদি আরবের আলমারাই//মরুভূমিতে প্রায় ২ লাখ গরু নিয়ে গড়ে ওঠা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ দুগ্ধ সাম্রাজ্য।।
ড. বায়েজিদ মোড়লের গবেষণাধর্মী প্রতিবেদন।।

চারদিকে মরুভূমি। প্রচণ্ড গরম। বৃষ্টিপাত অতি সামান্য। গবাদিপশুর জন্য প্রাকৃতিক সবুজ চারণভূমিও খুব সীমিত। এমন পরিবেশে প্রায় ২ লাখ গরু পালন করে বছরে প্রায় ১৫০ কোটি লিটার দুধ উৎপাদন—প্রথম শুনলে অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে।
কিন্তু সৌদি আরবের আলমারাই (Almarai) এই অসম্ভবকেই সম্ভব করেছে।
১৯৭৭ সালে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে শুধু বিশাল দুগ্ধ খামার নয়; গরুর খাদ্য সংগ্রহ, গরু পালন, দুধ উৎপাদন, দুধ প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেটজাতকরণ, হিমায়িত ও শীতল পরিবহনের মাধ্যমে বাজারজাতকরণ—সবকিছুকে একই ব্যবস্থাপনার আওতায় এনে বিশাল খাদ্যশিল্প গড়ে তুলেছে।
সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আলমারাইয়ের ৮টি দুগ্ধ খামারে ১ লাখ ৮৯ হাজারের বেশি গরু রয়েছে। এসব খামার থেকে বছরে প্রায় ১৫০ কোটি লিটার দুধ উৎপাদিত হয়।
কীভাবে মরুভূমির মধ্যে এত গরু পালন করা হচ্ছে? এত গরুর খাবার কোথা থেকে আসে? কীভাবে দুধ দোহন করা হয়? গরমের মধ্যে গরুকে কীভাবে সুস্থ রাখা হয়? উৎপাদিত বিপুল দুধ কোথায় যায়? এবং প্রায় পাঁচ দশকে আলমারাই কীভাবে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ দুগ্ধ ও খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হলো—এই প্রতিবেদনে সেই বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।
১. আলমারাইয়ের যাত্রা শুরু ১৯৭৭ সালে
আলমারাই প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৭ সালে সৌদি আরবে। এর প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্স সুলতান বিন মোহাম্মদ বিন সৌদ আল কাবির।সে সময় সৌদি আরব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছিল। নগরায়ণ বাড়ছিল, মানুষের আয় বাড়ছিল এবং একই সঙ্গে নিরাপদ ও মানসম্মত দুধ ও দুগ্ধজাত খাবারের চাহিদাও বৃদ্ধি পাচ্ছিল।
এই বাজারকে সামনে রেখেই আধুনিক পদ্ধতিতে দুধ উৎপাদন ও সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়।শুরুটা দুধ দিয়ে হলেও পরবর্তী প্রায় পাঁচ দশকে প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে বিশাল খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
২০০০ সালে ফলের রসের ব্যবসায় প্রবেশ করে আলমারাই। ২০০৫ সালে সৌদি আরবের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয় প্রতিষ্ঠানটি।এরপর রুটি ও বেকারি পণ্য, মুরগি, শিশুখাদ্যসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে থাকে।
২. একটি খামার নয়, বিশাল খামারব্যবস্থা
আলমারাই সম্পর্কে একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন—এটি একটি জায়গায় গড়ে ওঠা ২ লাখ গরুর খামার নয়।বরং একাধিক বিশাল দুগ্ধ খামার নিয়ে গড়ে ওঠা সমন্বিত খামার ও খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা।
২০২৫ সালের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে—৮টি দুগ্ধ খামার ১ লাখ ৮৯ হাজারের বেশি গরু এবং বছরে প্রায় ১৫০ কোটি লিটার দুধ উৎপাদনের সক্ষমতা। অর্থাৎ সাধারণভাবে বলা যায়, আলমারাইয়ের গরুর সংখ্যা প্রায় ২ লাখের কাছাকাছি। তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—১ লাখ ৮৯ হাজার গরুর সবগুলোই দুধ দেওয়া গাভী নয়। এর মধ্যে বাছুর, বাড়ন্ত বকনা, গর্ভবতী গাভী, শুকনা গাভী এবং দুধ দেওয়া গাভীসহ বিভিন্ন বয়স ও উৎপাদন পর্যায়ের পশু রয়েছে।
৩. দিনে গড়ে প্রায় ৪১ লাখ লিটার দুধ
বছরে ১৫০ কোটি লিটার দুধ উৎপাদনের সংখ্যাটি কত বড়, সেটি বোঝার জন্য দৈনিক হিসাবে দেখা যেতে পারে। ১৫০ কোটি লিটারকে ৩৬৫ দিনে ভাগ করলে দৈনিক গড় উৎপাদন দাঁড়ায় প্রায়—৪১ লাখ লিটার দুধ।
তবে এটি বার্ষিক উৎপাদন থেকে বের করা দৈনিক গড় হিসাব। প্রতিদিন উৎপাদন একই থাকে না।তারপরও সংখ্যাটি দেখায় আলমারাইয়ের দুগ্ধ খামারগুলো কত বড় পরিসরে পরিচালিত হচ্ছে।
৪. মরুভূমির গরমে এত গরু বেঁচে থাকে কীভাবে?
আলমারাইয়ের খামার ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি হলো সৌদি আরবের প্রচণ্ড গরম মোকাবিলা করা।উচ্চ উৎপাদনশীল গাভীর জন্য অতিরিক্ত গরম বড় সমস্যা। গরমে গাভীর খাদ্য গ্রহণ কমতে পারে, দুধ উৎপাদন কমে যেতে পারে, প্রজননক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যসমস্যা দেখা দিতে পারে।
এ কারণে বড় আকারের সৌদি দুগ্ধ খামারে গরুর জন্য ছায়া, পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল, শীতলীকরণ ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।মূল বিষয় হচ্ছে—গরুকে মরুভূমির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করার পাশাপাশি গরুর থাকার জায়গাটিকেই যতটা সম্ভব আরামদায়ক করে তোলা। এ কারণেই খামারের অবকাঠামো ও তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
৫. প্রায় ২ লাখ গরুর খাবার আসে কোথা থেকে?
এত গরু পালনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি—এত খাবার আসবে কোথা থেকে? প্রায় ২ লাখ গরুর জন্য প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ঘাস, খড়, শস্য, প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাদ্য প্রয়োজন। আলমারাইয়ের বিশেষত্ব হলো, তারা শুধু স্থানীয় বাজার থেকে খাদ্য কিনে এত বড় খামার পরিচালনার ওপর নির্ভর করেনি। প্রতিষ্ঠানটি বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন পশুখাদ্য আমদানি করে বলে তাদের প্রকাশিত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া বিদেশে নিজস্ব কৃষি কার্যক্রমের মাধ্যমেও পশুখাদ্যের একটি অংশ উৎপাদন করা হয়।
৬. গরু সৌদি আরবে, খাবার উৎপাদন বিদেশেও
আলমারাইয়ের দুগ্ধ খামার পরিচালনার সবচেয়ে ব্যতিক্রমী দিকগুলোর একটি হলো তাদের আন্তর্জাতিক পশুখাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা। যুক্তরাষ্ট্র ও আর্জেন্টিনাসহ বিভিন্ন স্থানে প্রতিষ্ঠানটির কৃষিজমি ও কৃষি কার্যক্রম রয়েছে। ২০২৫ সালের হিসাবে যুক্তরাষ্ট্র ও আর্জেন্টিনায় তাদের ২৭টি কৃষি খামার থাকার তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। এসব খামার থেকে ওই বছর ২ লাখ ৫৭ হাজার টনের বেশি পশুখাদ্য উৎপাদিত হয়েছে। অর্থাৎ—
গরু সৌদি আরবে, কিন্তু তাদের খাবারের একটি অংশ উৎপাদিত হচ্ছে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের দেশে।
এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে পশুখাদ্যের দাম বেড়ে গেলে বা কোনো দেশে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হলে প্রতিষ্ঠানটি কিছুটা হলেও নিজস্ব সরবরাহব্যবস্থার সুবিধা পায়।
৭. কেন বিদেশে পশুখাদ্য উৎপাদন?
সৌদি আরবের মতো শুষ্ক দেশে প্রচুর পরিমাণে পশুখাদ্য উৎপাদন করতে গেলে বিপুল পানি প্রয়োজন।বিশেষ করে আলফালফা বা অন্যান্য সবুজ ঘাস উৎপাদনে পানির প্রয়োজন অনেক।তাই বিপুলসংখ্যক গরুর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আলমারাই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কৃষি ও পশুখাদ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।এটি তাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কারণ একটি বড় দুগ্ধ খামারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শুধু গরু কেনা নয়—
সারা বছর সঠিক মানের খাবার নিশ্চিত করা।
খাবার না থাকলে ২ লাখ গরু কোনো সম্পদ নয়; বরং বিশাল আর্থিক বোঝায় পরিণত হবে।
৮. গরুর খাবার ব্যবস্থাপনাই দুধ উৎপাদনের ভিত্তি
উচ্চ উৎপাদনশীল গাভী থেকে বেশি দুধ পেতে শুধু বেশি খাবার দিলেই হয় না। গাভীর বয়স, ওজন, দুধ উৎপাদনের পরিমাণ, গর্ভাবস্থা এবং শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতে সুষম খাদ্য দিতে হয়।খাদ্যে শক্তি, আমিষ, আঁশ, খনিজ ও ভিটামিনের সঠিক ভারসাম্য প্রয়োজন।এত বড় খামারে প্রতিটি গরুকে একই ধরনের খাবার দিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়। তাই গরুকে বিভিন্ন দলে ভাগ করে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্য ব্যবস্থাপনা করাই বড় বাণিজ্যিক দুগ্ধ খামারের অন্যতম ভিত্তি।
৯. গরুর স্বাস্থ্য রক্ষা কীভাবে করা হয়?
প্রায় ২ লাখ গরু থাকলে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা অত্যন্ত কঠোর হওয়া প্রয়োজন। একটি সংক্রামক রোগ বড় খামারে ছড়িয়ে পড়লে অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে।তাই বড় দুগ্ধ খামারে চিকিৎসার চেয়ে রোগ প্রতিরোধকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এর মধ্যে রয়েছে—নিয়মিত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ, টিকাদান, পরিচ্ছন্নতা, খামারে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, অসুস্থ পশু আলাদা রাখা, খুরের পরিচর্যা, ওলানের স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং দুধের মান নিয়মিত পরীক্ষা করা। একই সঙ্গে প্রতিটি গরুর উৎপাদন ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ করা বড় খামার পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ।
১০. প্রজনন ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
এত বড় দুগ্ধ খামারে নিয়মিত বাছুর জন্ম না হলে ভবিষ্যতের দুধ উৎপাদন ধরে রাখা সম্ভব নয়।তাই কোন গাভী কখন গরমে এসেছে, কখন প্রজনন করানো হয়েছে, গর্ভধারণ করেছে কি না, সম্ভাব্য প্রসবের তারিখ কখন—এসব তথ্য নিয়মিত সংরক্ষণ করতে হয়। উন্নত দুগ্ধ খামারে গরুর বংশগত মানও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পরবর্তী প্রজন্মের গাভীর দুধ উৎপাদন, স্বাস্থ্য ও দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনক্ষমতার সঙ্গে বংশগত বৈশিষ্ট্যের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
১১. দুধ দোহনও একটি শিল্পকারখানার মতো ব্যবস্থা
প্রায় ২ লাখ গরুর খামারে হাতে দুধ দোহনের প্রশ্নই আসে না। বৃহৎ স্বয়ংক্রিয় দোহন ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্দিষ্ট নিয়মে গাভী দোহন করা হয়।দোহনের সময় পরিচ্ছন্নতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।কারণ খামারে ভালো দুধ উৎপাদন করেও দোহনের সময় জীবাণু মিশে গেলে পুরো উৎপাদনব্যবস্থাই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দোহনের পর দুধ দ্রুত ঠান্ডা করা এবং নির্ধারিত তাপমাত্রায় প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে পৌঁছানো হয়।
১২. খামার থেকে সরাসরি ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত
আলমারাইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এখানেই। প্রতিষ্ঠানটি শুধু দুধ উৎপাদন করে অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে কাঁচা দুধ বিক্রি করে না।বরং—গরুর খাবার সংগ্রহ → গরু পালন → দুধ দোহন → দুধ সংগ্রহ → প্রক্রিয়াজাতকরণ → প্যাকেটজাতকরণ → শীতল পরিবহন → দোকানে সরবরাহ → ভোক্তা এই পুরো ব্যবস্থার বড় অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখে। এ কারণেই আলমারাইকে শুধু একটি দুগ্ধ খামার না বলে সমন্বিত খাদ্য উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থা বলা বেশি যথার্থ।
১৩. আলমারাই কী কী পণ্য তৈরি করে?
দুধ দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও আলমারাই এখন অসংখ্য খাদ্যপণ্য তৈরি করে।দুগ্ধজাত পণ্যের মধ্যে রয়েছে—তাজা দুধ, দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য দুধ, লাবান, দই, পনির, ক্রিম, স্বাদযুক্ত দুধ এবং অন্যান্য দুগ্ধজাত খাবার।এ ছাড়া রয়েছে—ফলের রস ও বিভিন্ন পানীয়, রুটি, কেক ও বেকারি পণ্য, মুরগির মাংস ও প্রক্রিয়াজাত মুরগির পণ্য এবং শিশুখাদ্য।সাম্প্রতিক সময়ে আরও বিভিন্ন ধরনের খাদ্যপণ্যে ব্যবসা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
১৪. শুধু গরু নয়—বিশাল মুরগির খামারও রয়েছে
আলমারাইয়ের ব্যবসা কত বড় হয়েছে তা বোঝার জন্য তাদের মুরগির কার্যক্রমের দিকে তাকানো যেতে পারে।২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে—৭টি মুরগির খামার।
এর মধ্যে ছয়টি হাইল এবং একটি আল-জউফ এলাকায়।তাদের ১,৭০০-এর বেশি সক্রিয় মুরগির ঘর রয়েছে।মুরগি প্রক্রিয়াজাত করার জন্য রয়েছে ২টি বড় কারখানা।২০২৫ সালে এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে ৩০ কোটির বেশি মুরগি প্রক্রিয়াজাত করা হয়েছে।
১৫. ১৯টি উৎপাদন কারখানা
আলমারাইয়ের বিশাল খামারের সঙ্গে সমান গুরুত্বপূর্ণ হলো তাদের খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ অবকাঠামো।২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে—
১৯টি উৎপাদন কারখানার অধীনে ৩৪টি উৎপাদন কেন্দ্র।
এসব কেন্দ্রে দুধ, দুগ্ধজাত খাবার, ফলের রস, মুরগির পণ্য, রুটি ও বেকারি সামগ্রী এবং শিশুখাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরি হয়।ফলে কাঁচা দুধ বিক্রির পরিবর্তে সেই দুধকে বিভিন্ন মূল্যসংযোজিত পণ্যে রূপান্তর করে প্রতিষ্ঠানটি বেশি বাজারমূল্য তৈরি করতে পারে।
১৬. ১২ হাজারের বেশি গাড়ির বিশাল পরিবহন ব্যবস্থা
আলমারাইয়ের সাফল্যের পেছনে খামার ও কারখানার পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরিবহন ও বিপণন ব্যবস্থা।প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে—
১২ হাজারের বেশি পরিবহন ও সরবরাহকারী গাড়ি।
এ ছাড়া রয়েছে ১২৯টি বিক্রয় ও সরবরাহ কেন্দ্র।দুধ ও দুগ্ধজাত খাবারের বড় অংশ পচনশীল। তাই নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় দ্রুত দোকানে পৌঁছানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।এই বিশাল শীতল পরিবহন ব্যবস্থাই আলমারাইকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তাজা খাদ্য বাজারে সরবরাহ করতে সাহায্য করছে।
১৭. ২ লাখ ২০ হাজারের বেশি দোকানে পণ্য
২০২৫ সালের হিসাবে আলমারাইয়ের পণ্য সাতটি দেশের ২ লাখ ২০ হাজারের বেশি খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে পৌঁছে।
আর তাদের বিভিন্ন পণ্য ১৫ কোটির বেশি ভোক্তার বাজারে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি করেছে।প্রতিষ্ঠানটি বছরে ৩০০ কোটি কেজির বেশি খাদ্যপণ্য বিক্রি করে।এই সংখ্যা থেকে বোঝা যায়, আলমারাইয়ের সাফল্যের আসল রহস্য শুধু উৎপাদনে নয়; বিশাল বাজার ও শক্তিশালী সরবরাহব্যবস্থাতেও।
১৮. ৫০ হাজারের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান
এত বড় খামার, কারখানা ও পরিবহন ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য প্রয়োজন বিশাল জনবল।২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী আলমারাইয়ের বিভিন্ন কার্যক্রমে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ কাজ করেন।তারা পশুপালন, পশুচিকিৎসা, খাদ্য ব্যবস্থাপনা, দুধ উৎপাদন, কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্রকৌশল, মান নিয়ন্ত্রণ, পরিবহন, বিক্রয়, তথ্যপ্রযুক্তি, গবেষণা এবং প্রশাসনসহ বিভিন্ন বিভাগে কাজ করেন।
১৯. দুধের মান কীভাবে ধরে রাখা হয়?
প্রায় ৪১ লাখ লিটার দৈনিক গড় দুধ উৎপাদনের মতো বিশাল ব্যবস্থায় মান নিয়ন্ত্রণ না থাকলে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে।এ কারণে খাদ্য থেকে শুরু করে গাভী, দোহন, দুধ সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেটজাতকরণ এবং বাজারজাতকরণ—প্রতিটি পর্যায়ে মান নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ।সহজ ভাষায় বলতে গেলে—
গরুর খাবার ভালো না হলে গরু ভালো থাকবে না।
গরু সুস্থ না থাকলে ভালো দুধ পাওয়া যাবে না।
দোহনের সময় পরিচ্ছন্নতা না থাকলে দুধের মান নষ্ট হবে।
প্রক্রিয়াজাতকরণ ঠিক না হলে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে।
আর শীতল পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে ভালো পণ্যও ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হতে পারে।
এই পুরো ধারাবাহিক ব্যবস্থার ওপর আলমারাই বিশেষ গুরুত্ব দেয়।
২০. আলমারাইয়ের দুগ্ধ ব্যবসা কত বড়?
২০২৫ সালে আলমারাইয়ের শুধু দুগ্ধ বিভাগ থেকেই আয় হয়েছে প্রায়—
১ হাজার ২৮৫ কোটি সৌদি রিয়াল।
আগের বছরের তুলনায় এই খাতের আয় প্রায় ৫ শতাংশ বেড়েছে।আর প্রতিষ্ঠানটির মোট আয়ের প্রায় ৫৮ শতাংশ এসেছে দুগ্ধ ব্যবসা থেকে।সৌদি আরবের তাজা দুধের বাজারে আলমারাইয়ের অংশ প্রায় ৬৭.৫ শতাংশ বলে তাদের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।এটি সৌদি দুগ্ধবাজারে প্রতিষ্ঠানটির শক্তিশালী অবস্থান নির্দেশ করে।
২১. পুরো প্রতিষ্ঠানের আয় কত?
২০২৫ সালে আলমারাইয়ের মোট বিক্রয় আয় ছিল প্রায়—
২ হাজার ২০৭ কোটি সৌদি রিয়াল।
একই বছরে নিট মুনাফা ছিল প্রায়—
২৪৬ কোটি সৌদি রিয়াল।
এ থেকেই বোঝা যায়, আলমারাই এখন আর শুধু বড় খামার নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বৃহৎ খাদ্য উৎপাদনকারী ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান।
২২. ভবিষ্যতের জন্য ১ হাজার ৮০০ কোটি রিয়ালের বিনিয়োগ পরিকল্পনা
আলমারাই বর্তমান অবস্থানে থেমে নেই।প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি সৌদি রিয়ালের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।এর মাধ্যমে বর্তমান ব্যবসা সম্প্রসারণ, নতুন খাদ্যপণ্য তৈরি, উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নতুন বাজারে প্রবেশের পরিকল্পনা রয়েছে।অর্থাৎ ভবিষ্যতের আলমারাই শুধু দুগ্ধজাত খাবার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, আরও বড় আন্তর্জাতিক খাদ্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার পথে এগোচ্ছে।
২৩. আলমারাইয়ের সাফল্যের আসল রহস্য কী?
অনেকে মনে করতে পারেন, আলমারাই সফল হয়েছে কারণ তাদের প্রায় ২ লাখ গরু রয়েছে।কিন্তু বিষয়টি আসলে উল্টো।তারা আগে এমন একটি শক্তিশালী ব্যবস্থাপনা কাঠামো তৈরি করেছে, যার কারণে এত বিপুলসংখ্যক গরু পালন করা সম্ভব হয়েছে।
তাদের সাফল্যের মূল ভিত্তিগুলো হলো—পরিকল্পিত পশুখাদ্য সরবরাহ, উন্নত জাতের গরু, তাপ নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক দোহনব্যবস্থা, রোগ প্রতিরোধ, তথ্যভিত্তিক খামার পরিচালনা, নিজস্ব প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা, শক্তিশালী শীতল পরিবহন, বিশাল বাজার এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।এই সবকিছু একসঙ্গে কাজ করছে বলেই প্রায় ২ লাখ গরুর এই বিশাল ব্যবস্থা টিকে আছে।
২৪. বাংলাদেশের খামারিদের জন্য কী শিক্ষা রয়েছে?
বাংলাদেশে আলমারাইয়ের মতো প্রায় ২ লাখ গরুর খামার তৈরির প্রয়োজনও নেই, বাস্তবতাও ভিন্ন।কিন্তু আলমারাইয়ের ব্যবস্থাপনা থেকে বাংলাদেশের ছোট, মাঝারি ও বড় দুগ্ধ খামারি অনেক কিছু শিখতে পারেন।প্রথম শিক্ষা—
আগে খাবার, পরে গরু।
১০০ গরুর খাবারের নিশ্চয়তা না থাকলে ১০০ গরু কেনা উচিত নয়।দ্বিতীয় শিক্ষা—
প্রতিটি গরুর হিসাব রাখতে হবে।
কোন গাভী কত দুধ দিচ্ছে, কত খাবার খাচ্ছে, কতবার প্রজনন করানো হয়েছে, কখন বাচ্চা দেবে, কতবার রোগে আক্রান্ত হয়েছে—এসব তথ্য সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
তৃতীয় শিক্ষা—
শুধু কাঁচা দুধ বিক্রি করলে লাভের সুযোগ সীমিত থাকে।
দুধ থেকে দই, ঘি, পনির, মাখন, মিষ্টি বা অন্যান্য মূল্যসংযোজিত পণ্য তৈরি করলে নতুন বাজার তৈরি হতে পারে।
চতুর্থ শিক্ষা—
উৎপাদনের আগেই বাজার নিশ্চিত করতে হবে।
আলমারাইয়ের শক্তি শুধু দুধ উৎপাদন নয়; উৎপাদিত পণ্য দ্রুত ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেওয়ার নিজস্ব বিশাল ব্যবস্থা রয়েছে।
২৫. বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও বড় চ্যালেঞ্জ
প্রায় ২ লাখ গরু মানে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ গোবর, মূত্র ও ব্যবহৃত পানি তৈরি হওয়া।তাই এ ধরনের বৃহৎ খামারে বর্জ্য সংগ্রহ, পানি ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং বর্জ্যকে পুনর্ব্যবহারের বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।বাংলাদেশে বড় দুগ্ধ খামার তৈরির ক্ষেত্রে এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ।গোবরকে শুধু বর্জ্য হিসেবে না দেখে জৈব সার, বায়োগ্যাস এবং কৃষির উপকরণ হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা খামার তৈরির শুরু থেকেই থাকা উচিত।
২৬. প্রায় পাঁচ দশকে কোথায় পৌঁছেছে আলমারাই?
১৯৭৭ সালে যাত্রা শুরু করা আলমারাই ২০২৫ সালের শেষে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে—
৮টি দুগ্ধ খামার,
১ লাখ ৮৯ হাজারের বেশি গরু,
বছরে প্রায় ১৫০ কোটি লিটার দুধ উৎপাদন,
৭টি মুরগির খামার,
১,৭০০-এর বেশি মুরগির ঘর,
বছরে ৩০ কোটির বেশি মুরগি প্রক্রিয়াজাতকরণ,
১৯টি উৎপাদন কারখানা,
৩৪টি উৎপাদন কেন্দ্র,
১২৯টি বিক্রয় ও সরবরাহ কেন্দ্র,
১২ হাজারের বেশি গাড়ি,
৫০ হাজারের বেশি কর্মী,
২ লাখ ২০ হাজারের বেশি খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র
এবং ১৫ কোটির বেশি ভোক্তার বাজার।
এই সংখ্যাগুলো দেখায়—আলমারাই এখন শুধু একটি দুগ্ধ খামার নয়, বরং একটি বিশাল কৃষি, প্রাণিসম্পদ, খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণন ব্যবস্থা।
শেষ কথা
সৌদি আরবের আলমারাইয়ের গল্প শুধু মরুভূমিতে প্রায় ২ লাখ গরু পালনের গল্প নয়। এটি প্রতিকূল পরিবেশকে প্রযুক্তি, অর্থ, পরিকল্পনা ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জয় করার গল্প।
যে দেশে বিস্তীর্ণ সবুজ চারণভূমি নেই, প্রচণ্ড গরম এবং পানির সংকট একটি বড় বাস্তবতা—সেই দেশেই বছরে প্রায় ১৫০ কোটি লিটার দুধ উৎপাদনের ব্যবস্থা গড়ে তোলা আধুনিক প্রাণিসম্পদ শিল্পের বিস্ময়কর উদাহরণ।
আলমারাই দেখিয়েছে—শুধু বেশি গরু থাকলেই বড় খামার হয় না; বড় খামারের জন্য আগে বড় ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হয়।
একটি সফল আধুনিক দুগ্ধ খামারের মূল ভিত্তি হলো—উন্নত জাত + সুষম খাদ্য + আরামদায়ক পরিবেশ + রোগ প্রতিরোধ + সঠিক প্রজনন + আধুনিক দোহন + প্রক্রিয়াজাতকরণ + শীতল পরিবহন + নিশ্চিত বাজার + দক্ষ ব্যবস্থাপনা।বাংলাদেশের জন্য আলমারাইয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এখানেই।
আমাদের হয়তো মরুভূমিতে ২ লাখ গরুর খামার তৈরির প্রয়োজন নেই। কিন্তু ২০, ৫০, ১০০ কিংবা ১ হাজার গরুর খামারকেও যদি খাদ্য থেকে বাজার পর্যন্ত একটি সমন্বিত ব্যবসায়িক ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তাহলে বাংলাদেশের দুগ্ধ খাতের উৎপাদনশীলতা ও লাভজনকতা দুটোই বাড়ানো সম্ভব।

সংক্ষিপ্ত তথ্যসূত্র
১. Almarai, Integrated Annual Report 2025।
২. Almarai, Footprint and Scale 2025।
৩. Almarai, Dairy Business Review 2025।
৪. Almarai, Our Journey।
৫. Almarai, Investor Relations।






















