চীনের মডার্ন ডেইরি লাখো গরুর আধুনিক দুধ উৎপাদন সাম্রাজ্য।।
ড. বায়েজিদ মোড়লের গবেষণাধর্মী প্রতিবেদন।।

বিশ্বে বাণিজ্যিকভাবে গরু পালন ও কাঁচা দুধ উৎপাদনের কথা উঠলে চীনের China Modern Dairy Holdings Ltd., সংক্ষেপে Modern Dairy, একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। ছোট ছোট পারিবারিক খামারের পরিবর্তে হাজার হাজার গরুকে পরিকল্পিতভাবে এক জায়গায় রেখে আধুনিক প্রযুক্তি, নিজস্ব খাদ্যব্যবস্থা, উন্নত প্রজনন, স্বয়ংক্রিয় দোহন, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার এবং তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কীভাবে শিল্পভিত্তিক দুগ্ধ খামার গড়ে তোলা যায়—তার বড় উদাহরণ এই প্রতিষ্ঠান।
পুরোনো আন্তর্জাতিক তুলনামূলক হিসাবে Modern Dairy-এর গাভীর সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৩৪ হাজার এবং বছরে কাঁচা দুধ উৎপাদন প্রায় ১২ লাখ ৮০ হাজার টন উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি এরপর ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। ফলে বর্তমানে সেই পুরোনো সংখ্যা দিয়ে Modern Dairy-এর প্রকৃত আকার বোঝা যায় না।
২০২৫ সালের শেষ নাগাদ প্রতিষ্ঠানটির মোট গরুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৫৬ হাজার ৯৪৫টি। চীনের ১৪টি প্রদেশ ও স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে তাদের ৫৩টি আধুনিক খামার পরিচালিত হচ্ছে। ২০২৫ সালে তারা প্রায় ৩১ লাখ ৩৯ হাজার টন কাঁচা দুধ বিক্রি করেছে।
অর্থাৎ এটি এখন শুধু একটি বড় গরুর খামার নয়; বরং গরুর খাদ্য, প্রজনন, কাঁচা দুধ উৎপাদন, খামার উপকরণ, প্রযুক্তি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে একসঙ্গে যুক্ত করা বিশাল দুগ্ধ উৎপাদন ব্যবস্থা।
যেভাবে শুরু
Modern Dairy প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০৫ সালে, চীনের আনহুই প্রদেশের মা’আনশানে। শুরু থেকেই প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য ছিল প্রচলিত ছোট আকারের গরু পালনের পরিবর্তে বড় পরিসরে আধুনিক খামার গড়ে তোলা।
তারা এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলে যেখানে গরু খোলা চারণভূমিতে ছেড়ে দেওয়ার পরিবর্তে পরিকল্পিত আবাসন, সুষম খাদ্য, স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ এবং নিয়মিত দুধ উৎপাদন ব্যবস্থার মধ্যে থাকে। পরবর্তী দুই দশকে প্রতিষ্ঠানটি অধিগ্রহণ, নতুন খামার স্থাপন এবং উৎপাদন দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে দ্রুত সম্প্রসারিত হয়। বর্তমানে China Modern Dairy চীনের বৃহৎ কাঁচা দুধ উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম।
বর্তমানে কত গরু?
২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের হিসাবে Modern Dairy-এর মোট গরু ছিল—মোট গরু — ৪,৫৬,৯৪৫টি
এর মধ্যে—দুধ দেওয়া গাভী — ২,৬৫,৭৭৮টি
বকনা ও বাছুর — ১,৯১,১৬৭টি
অর্থাৎ মোট পশুর প্রায় ৫৮.২ শতাংশ তখন দুধ উৎপাদনকারী গাভী। আগের বছর এই হার ছিল ৫১.১ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটি কম উৎপাদনশীল গরু বাদ দিয়ে বেশি উৎপাদনক্ষম গাভীর অনুপাত বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ২০২৪ সালের শেষে তাদের মোট গরু ছিল ৪,৯১,১৬৯টি। ২০২৫ সালে মোট গরু কমে গেলেও দুধ বিক্রি বেড়েছে। এটাই Modern Dairy-এর বর্তমান ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ দিক—শুধু গরুর সংখ্যা বাড়ানো নয়, প্রতিটি গাভী থেকে বেশি ও দক্ষভাবে দুধ উৎপাদন করা।
বছরে কত দুধ?
২০২৫ সালে Modern Dairy প্রায় ৩১ লাখ ৩৯ হাজার টন কাঁচা দুধ বিক্রি করেছে। ২০২৪ সালে এই পরিমাণ ছিল প্রায় ২৮ লাখ ৯৩ হাজার টন। এক বছরের ব্যবধানে বিক্রি হওয়া দুধের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৮.৫ শতাংশ। একই সময়ে প্রতি দুধেল গাভীর গড় বার্ষিক উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২.৯ টন।অর্থাৎ গড়ে একটি দুধেল গাভী বছরে প্রায় ১২ হাজার ৯০০ কেজি দুধ উৎপাদন করছে।
সরল হিসাবে দৈনিক গড়ে প্রায় ৩৫ কেজি দুধের সমতুল্য।এটি বাংলাদেশের সাধারণ দেশি বা স্বল্প উৎপাদনশীল সংকর গাভীর তুলনায় অত্যন্ত বেশি এবং বোঝায় যে উন্নত জাত, পুষ্টি, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনা একসঙ্গে কাজ করলে গাভীর উৎপাদনশীলতা কতটা বাড়ানো সম্ভব।
Bengbu Farm—এক খামারেই ৪০ হাজারের বেশি গরু
Modern Dairy-এর সবচেয়ে আলোচিত স্থাপনাগুলোর একটি হলো Bengbu Farm।প্রতিষ্ঠানটির টেকসই উন্নয়ন প্রতিবেদনে এটিকে চীনের বৃহৎ দুগ্ধ খামারগুলোর অন্যতম হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে এবং সেখানে ৪০ হাজারের বেশি গরু থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এই খামারের আশপাশে প্রায় ১ লাখ মু জমিতে সাইলেজ ও পশুখাদ্য উৎপাদনের ব্যবস্থা রয়েছে। এক মু প্রায় ০.০৬৭ হেক্টরের কাছাকাছি। সেই হিসাবে ১ লাখ মু প্রায় ৬ হাজার ৬৬৭ হেক্টর বা প্রায় ১৬ হাজার ৪৭০ একর জমির সমতুল্য।
কিন্তু Bengbu Farm-এর সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় শুধু গরুর সংখ্যা নয়।এখানে গড়ে তোলা হয়েছে—গরু → গোবর → বায়োগ্যাস/জৈবসার → জমি → ভুট্টা ও পশুখাদ্য → আবার গরু এই চক্রাকার উৎপাদন ব্যবস্থা।
এত গরুকে কীভাবে খাবার দেওয়া হয়?
চার-পাঁচ লাখ গরুর প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি খাদ্য। Modern Dairy গরুর খাদ্যকে শুধু খড়-ঘাস দেওয়ার বিষয় হিসেবে দেখে না। গরুর—বয়স, জাত, ওজন, দুধ উৎপাদনের পর্যায়, উৎপাদনক্ষমতা, প্রজনন অবস্থা এবং পরিবেশ বিবেচনায় নিয়ে খাদ্যের পুষ্টিমান সমন্বয় করা হয়।
খাদ্যের হজমযোগ্যতা বাড়ানো এবং গরু যেন প্রয়োজনীয় শক্তি ও পুষ্টি যথাযথভাবে গ্রহণ করতে পারে—সেদিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এতে একদিকে দুধ উৎপাদন বাড়ে, অন্যদিকে অপচয় এবং অতিরিক্ত গোবর উৎপাদন কমানো সম্ভব হয়।
ভুট্টার সাইলেজ তাদের খাদ্য ব্যবস্থার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ কারণেই বড় খামারের আশপাশে ব্যাপক জমিতে পশুখাদ্য উৎপাদনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
নিজেরাই খাদ্য ও খামার উপকরণের ব্যবসা করে
Modern Dairy শুধু নিজের গরুকে খাবার দেয় না। তাদের ব্যবসার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো গবাদিপশুর খাদ্য ও খামার উপকরণ সরবরাহ।২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির আয়ের বড় তিনটি উৎস ছিল—কাঁচা দুধ বিক্রি, পশুখাদ্য ও খামার উপকরণ, এবং প্রজননসামগ্রী ও খামার ব্যবস্থাপনা সেবা।
২০২৫ সালে কাঁচা দুধ থেকে আয় হয়েছে প্রায় ১০.৪৭ বিলিয়ন ইউয়ান এবং খাদ্য ও খামার উপকরণ থেকে প্রায় ২.১০ বিলিয়ন ইউয়ান। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি এখন শুধু “গরু পালন করে দুধ বিক্রি করা” কোম্পানি নয়; এটি ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ দুগ্ধ খামার ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছে।
তারা কী কী পণ্য ও সেবা দেয়?
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি।Modern Dairy-কে Almarai-এর মতো সুপারশপে দুধ, দই, জুস, পনিরসহ অসংখ্য ভোক্তা-পণ্য বিক্রিকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখলে ভুল হবে। Modern Dairy-এর মূল শক্তি হলো খামার পর্যায়ের উৎপাদন।
তাদের প্রধান ব্যবসা—
কাঁচা দুধ উৎপাদন ও বিক্রি,
জৈব কাঁচা দুধ,
গরুর খাদ্য,
পশুখাদ্য ও খামার উপকরণ,
উন্নত প্রজননসামগ্রী,
গবাদিপশু প্রজনন ও জিনগত উন্নয়ন,
ডিজিটাল খামার ব্যবস্থাপনা সেবা।
২০২৫ সালের আর্থিক প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটি ব্যবসাকে মূলত দুটি বড় ভাগে দেখিয়েছে—কাঁচা দুধ এবং সমন্বিত দুগ্ধ খামার সমাধান।
জৈব দুধের দিকে বড় বিনিয়োগ
Modern Dairy এখন উচ্চমূল্যের জৈব কাঁচা দুধ উৎপাদনের দিকেও গুরুত্ব বাড়িয়েছে।২০২৫ সালের শেষে তাদের ৫টি বড় জৈব দুধের খামারে প্রায় ৪০,৮৬৯টি গরু ছিল। প্রতিষ্ঠানটি জৈব দুধকে ভবিষ্যতের উচ্চমূল্যের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা হিসেবে দেখছে।
এর আগে ২০২৪ সালে Inner Mongolia-র Ulan Buh অঞ্চলের জৈব দুগ্ধ শিল্পাঞ্চলে পাঁচটি খামারে প্রায় ৪৫ হাজার গরু এবং দৈনিক প্রায় ৫০০ টন তাজা দুধ উৎপাদনের তথ্য প্রকাশ করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। এ থেকে বোঝা যায়, ভবিষ্যতে শুধু বেশি দুধ নয়—বিশেষ মানের এবং বেশি দামের দুধ উৎপাদনেও তারা বাজার ধরতে চায়।
উন্নত জাত ও প্রজনন ব্যবস্থাপনা
এত বড় খামারের লাভ নির্ভর করে গরুর জিনগত মানের ওপর। একটি গাভী যদি একই পরিমাণ খাবার খেয়ে অন্য গাভীর তুলনায় বেশি দুধ দেয়, সুস্থ থাকে এবং নিয়মিত বাচ্চা দেয়—তাহলে তার অর্থনৈতিক মূল্য অনেক বেশি। এই কারণে Modern Dairy নিজস্ব প্রজনন ও জিনগত উন্নয়ন ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করছে।
তাদের Meng Yuan Genetics উন্নত প্রজনন ষাঁড় তৈরি এবং গরুর জিনগত মান উন্নয়নের কাজ করছে। ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটি নিজস্বভাবে উচ্চমানের প্রজনন ষাঁড় তৈরিতে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির কথা জানিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এর অর্থ হলো—বিদেশি উন্নত জিনগত উপকরণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব গাভীর উৎপাদনশীলতা বাড়ানো।
প্রযুক্তি দিয়ে প্রতিটি গরুর হিসাব
চার লাখের বেশি গরুকে শুধু শ্রমিকের চোখে দেখে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। তাই Modern Dairy খামার পরিচালনায় তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিয়েছে।
গরুর পরিচয়, দুধ উৎপাদন, খাদ্য, প্রজনন, স্বাস্থ্য এবং খামারের বিভিন্ন উৎপাদন তথ্য সংগ্রহ করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যবস্থা বড় বাণিজ্যিক খামারের মূল ভিত্তি।
প্রতিষ্ঠানটি Aiyangniu নামে একটি বুদ্ধিমান ডিজিটাল সেবা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যার মাধ্যমে খামার শিল্পের বিভিন্ন অংশকে সংযুক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। অর্থাৎ খামার পরিচালনা ক্রমেই “অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভরশীল” ব্যবস্থা থেকে তথ্যের ওপর নির্ভরশীল ব্যবস্থায় পরিণত হচ্ছে।
দুধ দোহন ও মান নিয়ন্ত্রণ
এত বড় খামারে হাতে দুধ দোহনের সুযোগ নেই। বড় আকারের দোহনকেন্দ্র, নির্ধারিত দোহনসূচি, পরিচ্ছন্নতা এবং দ্রুত দুধ ঠান্ডা করার ব্যবস্থা পুরো উৎপাদন ব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ।
গাভীর দুধ দোহনের পর দ্রুত সংরক্ষণ ও পরিবহন না করলে জীবাণুর সংখ্যা বাড়তে পারে এবং দুধের গুণগত মান নষ্ট হতে পারে।
তাই বড় বাণিজ্যিক খামারের সফলতার মূলমন্ত্র—সুস্থ গাভী → পরিষ্কার দোহন → দ্রুত ঠান্ডা → মান পরীক্ষা → নিরাপদ পরিবহন। Modern Dairy-এর মতো প্রতিষ্ঠানে উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে মান নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাদের প্রধান ব্যবসাই হচ্ছে শিল্প পর্যায়ে বিপুল পরিমাণ মানসম্মত কাঁচা দুধ সরবরাহ করা।
গোবর তাদের কাছে বর্জ্য নয়—সম্পদ
৪ লাখের বেশি গরু প্রতিদিন কী পরিমাণ গোবর ও মূত্র তৈরি করে, তা সহজেই অনুমান করা যায়।সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকলে এটি পরিবেশের জন্য ভয়াবহ সমস্যা হতে পারে।Modern Dairy এই সমস্যাকে সম্পদে রূপান্তরের চেষ্টা করছে।
তাদের বিভিন্ন খামারে গোবর ব্যবহার করে—
বায়োগ্যাস উৎপাদন,
বিদ্যুৎ ও তাপশক্তি তৈরি,
জৈবসার উৎপাদন,
এবং সেই সার আবার পশুখাদ্যের জমিতে ব্যবহার করা হচ্ছে। Bengbu Farm-এ গোবর থেকে তৈরি জৈবসার পাইপলাইনের মাধ্যমে জমিতে ফেরত দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, এই ব্যবস্থায় প্রতি মু জমিতে রাসায়নিক সার ব্যবহার প্রায় ২০–২৫ কেজি পর্যন্ত কমানো সম্ভব হয়েছে এবং সাইলেজ উৎপাদনও বেড়েছে।
এটাই আধুনিক খামারের একটি বড় শিক্ষা—গোবর অপসারণে টাকা খরচ নয়; গোবরকে জ্বালানি ও সারে রূপান্তর করে অর্থনৈতিক সম্পদ তৈরি করা।
পরিবেশবান্ধব খামারের চেষ্টা
গরু পালনের ক্ষেত্রে মিথেন গ্যাস বর্তমানে বিশ্বব্যাপী আলোচিত বিষয়।Modern Dairy খাদ্যের গুণমান ও হজমযোগ্যতা বাড়ানো, খাদ্যের উপাদান পরিবর্তন, গোবর পুনর্ব্যবহার, জ্বালানি সাশ্রয় এবং পরিচ্ছন্ন শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবেশগত প্রভাব কমানোর চেষ্টা করছে।
গরুর পাকস্থলীতে খাদ্য হজমের সময় যে মিথেন তৈরি হয়, সেটিও কমানোর জন্য খাদ্যে চর্বিজাত উপাদানের বিন্যাস ও পুষ্টি ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি কাজ করছে।২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক টেকসই উন্নয়ন মূল্যায়নে প্রতিষ্ঠানটির স্কোর উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে।
Modern Dairy-এর অর্থনীতি কত বড়?
২০২৫ সালে Modern Dairy-এর মোট বিক্রয় আয় ছিল প্রায় ১২.৬ বিলিয়ন চীনা ইউয়ান।এর মধ্যে কাঁচা দুধ থেকেই এসেছে প্রায় ১০.৪৭ বিলিয়ন ইউয়ান।
কিন্তু বিপুল বিক্রয় মানেই যে বিপুল নিট লাভ—বর্তমান চীনা দুগ্ধবাজারে তা নয়।চীনে কয়েক বছর ধরে কাঁচা দুধের দাম কমেছে। ২০২৫ সালে Modern Dairy-এর কাঁচা দুধের গড় বিক্রয়মূল্য টনপ্রতি ৩,৩৩৫ ইউয়ান, যেখানে ২০২৪ সালে ছিল ৩,৬১৩ ইউয়ান। অর্থাৎ এক বছরে গড় বিক্রয়মূল্য প্রায় ৭.৭ শতাংশ কমেছে।
এ কারণে প্রতিষ্ঠানটি বেশি দুধ উৎপাদন করেও মূল্যচাপের মুখে রয়েছে।২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১.১৩ বিলিয়ন ইউয়ান নিট লোকসান করেছে। তবে একই সময়ে পরিচালন কার্যক্রম থেকে প্রায় ২.৫০ বিলিয়ন ইউয়ান নগদ প্রবাহ তৈরি হয়েছে।
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা—বিশাল খামার হলেই সবসময় লাভ হবে, এমন নয়। দুধের বাজারমূল্য, খাদ্য ব্যয়, গাভীর উৎপাদনশীলতা এবং ঋণ ও বিনিয়োগ ব্যয়—সবকিছু লাভ নির্ধারণ করে।
গরু কমিয়ে দুধ বাড়ানোর কৌশল
২০২৫ সালের তথ্য Modern Dairy-এর ব্যবস্থাপনার একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত।
২০২৪ সালে গরু ছিল—৪,৯১,১৬৯টি।
২০২৫ সালে কমে হয়েছে—৪,৫৬,৯৪৫টি।
অর্থাৎ মোট গরু প্রায় ৭ শতাংশ কমেছে।
কিন্তু একই সময়ে দুধ বিক্রি—২৮.৯৩ লাখ টন থেকে বেড়ে ৩১.৩৯ লাখ টন হয়েছে।
অর্থাৎ গরু কমেছে, কিন্তু দুধ বেড়েছে।
এর পেছনে রয়েছে কম উৎপাদনশীল পশু বাদ দেওয়া, দুধেল গাভীর অনুপাত বাড়ানো এবং প্রতি গাভীর উৎপাদন বাড়ানো।
বাংলাদেশের খামারিদের জন্য এখানেই সবচেয়ে বড় শিক্ষা—“খামারে কয়টি গরু আছে” সেটি প্রধান হিসাব নয়; “প্রতি গাভী বছরে কত দুধ দেয় এবং এক কেজি দুধ উৎপাদনে কত টাকা খরচ হয়”—এটাই আসল হিসাব।
Mengniu-এর সঙ্গে সম্পর্ক
Modern Dairy-এর ব্যবসায় চীনের বৃহৎ দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান China Mengniu Dairy গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।Modern Dairy মূলত খামার পর্যায়ে বিপুল পরিমাণ কাঁচা দুধ উৎপাদন করে; অন্যদিকে Mengniu সেই দুধ প্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন ভোক্তা দুগ্ধপণ্যের বাজারে কাজ করে।এই সম্পর্কের কারণে উৎপাদন থেকে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণ পর্যন্ত একটি শক্তিশালী দুগ্ধ মূল্যশৃঙ্খল গড়ে উঠেছে।
বর্তমান অবস্থা—২০২৬ সালে কোথায় দাঁড়িয়ে?
২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত পাওয়া সর্বশেষ করপোরেট তথ্য অনুযায়ী Modern Dairy কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে এবং ২০২৫ সালের পূর্ণাঙ্গ বার্ষিক ও পরিবেশগত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির সামনে একই সঙ্গে সুযোগ এবং চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
একদিকে—
প্রতি গাভীর দুধ উৎপাদন বাড়ছে,
দুধেল গাভীর অনুপাত বেড়েছে,
জৈব দুধের খামার সম্প্রসারিত হচ্ছে,
প্রজনন প্রযুক্তি উন্নত হচ্ছে,
ডিজিটাল খামার ব্যবস্থাপনা বাড়ছে,
এবং উৎপাদন ব্যয় কমানোর চেষ্টা চলছে।
অন্যদিকে চীনের বাজারে কাঁচা দুধের কম দাম এবং তুলনামূলক দুর্বল ভোক্তা চাহিদা খাতটির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। ২০২৫ সালে চীনে কাঁচা দুধের দাম টানা চতুর্থ বছরের মতো নিম্নমুখী ছিল।
ফলে Modern Dairy এখন “আরও বেশি গরু” রাখার পরিবর্তে আরও দক্ষ গরু, বেশি দুধ, কম উৎপাদন ব্যয় এবং উচ্চমূল্যের বিশেষ দুধ—এই কৌশলের দিকে এগোচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য কী শিক্ষা?
Modern Dairy-এর বিশাল আকার বাংলাদেশে সরাসরি অনুকরণ করা বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু তাদের ব্যবস্থাপনার অনেক নীতি বাংলাদেশের মাঝারি ও বড় দুগ্ধ খামারেও প্রয়োগ করা সম্ভব।
প্রথম শিক্ষা হলো—নিজস্ব বা চুক্তিভিত্তিক পশুখাদ্য উৎপাদন ছাড়া বড় খামার দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ।
দ্বিতীয়ত—গাভীর সংখ্যা নয়, প্রতি গাভীর উৎপাদন গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয়ত—প্রতিটি গাভীর দুধ, প্রজনন, রোগ, চিকিৎসা ও খাদ্যের তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে।
চতুর্থত—কম উৎপাদনশীল গাভী বছরের পর বছর রেখে খাদ্য খরচ বাড়ানোর পরিবর্তে উৎপাদনভিত্তিক নির্বাচন প্রয়োজন।
পঞ্চমত—গোবরকে সমস্যা হিসেবে না দেখে বায়োগ্যাস ও জৈবসারের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।
ষষ্ঠত—খামার বড় করার আগে নিশ্চিত করতে হবে খাদ্য কোথা থেকে আসবে এবং দুধ কোথায় বিক্রি হবে।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—
“বেশি গরু নয়—সুস্থ, উচ্চ উৎপাদনশীল ও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক গরুই সফল দুগ্ধ খামারের ভিত্তি।”
শেষ কথা
China Modern Dairy-এর গল্প মূলত চীনের দুগ্ধ খামার শিল্পায়নের গল্প। ২০০৫ সালে শুরু হওয়া প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে প্রায় ৪ লাখ ৫৭ হাজার গরু, ৫৩টি আধুনিক খামার এবং বছরে ৩১ লাখ টনের বেশি কাঁচা দুধ বিক্রির বিশাল ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।
Bengbu-এর মতো একটি খামারেই ৪০ হাজারের বেশি গরু পালন, হাজার হাজার হেক্টর জমিতে পশুখাদ্য উৎপাদন, গোবর থেকে বায়োগ্যাস ও জৈবসার তৈরি এবং সেই সার আবার পশুখাদ্যের জমিতে ফেরত দেওয়া—আধুনিক দুগ্ধ খামারের ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাচ্ছে তার একটি বাস্তব উদাহরণ। তবে Modern Dairy-এর সাম্প্রতিক আর্থিক ফলাফল আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য মনে করিয়ে দেয়—প্রযুক্তি, লাখ লাখ গরু ও বিপুল দুধ উৎপাদন থাকলেও বাজারমূল্য অনুকূলে না থাকলে দুগ্ধ খামার লোকসানে পড়তে পারে।
তাই আধুনিক ডেইরি ব্যবসার ভবিষ্যৎ শুধু খামারের আকারে নয়; বরং উন্নত জিনগত মান, সুষম খাদ্য, কম উৎপাদন ব্যয়, তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা, নিশ্চিত বাজার এবং পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ের ওপর নির্ভরশীল। Modern Dairy সেই পরিবর্তনেরই একটি বিশাল পরীক্ষাগার।

তথ্যসূত্র
১. China Modern Dairy Holdings Ltd., Annual Report 2025।
২. China Modern Dairy, Environmental, Social and Governance Reports।
৩. China Modern Dairy, 2025 Annual Results Announcement।
৪. China Modern Dairy, Organic Industrial Park ও Bengbu Farm সম্পর্কিত প্রকাশনা।






















