ছোট উদ্যোগ থেকে শিল্পসাম্রাজ্য: বাংলাদেশের বৃহৎ ১০ পোলট্রি প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস, সাফল্য, সংকট ও নতুন উদ্যোক্তার স্বপ্ন।।
ড. বায়েজিদ মোড়লের গবেষণাধর্মী প্রতিবেদন।।
বাংলাদেশে বেসরকারি পোলট্রি প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো হালনাগাদ সরকারি ‘বড় থেকে ছোট’ তালিকা নেই। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান বার্ষিক বিক্রয়, মোট সম্পদ, কর্মীসংখ্যা, প্যারেন্ট স্টক এবং বাচ্চা উৎপাদনের তথ্যও নিয়মিত প্রকাশ করে না। তাই নিচের ক্রম নির্ধারণে বিবেচনা করা হয়েছে—

- গ্র্যান্ড প্যারেন্ট ও প্যারেন্ট স্টক;
- হ্যাচারি এবং একদিন বয়সী বাচ্চা উৎপাদন;
- নিজস্ব ও চুক্তিভিত্তিক মুরগির খামার;
- ডিম, মাংস ও প্রক্রিয়াজাত খাবার উৎপাদন;
- পশুখাদ্য কারখানা ও উৎপাদনক্ষমতা;
- দেশব্যাপী বিপণন ও পরিবেশক নেটওয়ার্ক;
- প্রকাশিত বিক্রয়, কর্মসংস্থান ও সম্পদের তথ্য;
- কার্যক্রমের বৈচিত্র্য, প্রযুক্তি ও বাজারে প্রভাব।
এ কারণে তালিকাটি একটি গবেষণাভিত্তিক তুলনামূলক অবস্থান, সরকারি চূড়ান্ত র্যাঙ্কিং নয়।
১. কাজী ফার্মস গ্রুপ

কাজী ফার্মস লিমিটেড প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯৬ সালে। প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী জাহেদুল হাসান। প্রতিষ্ঠানটি প্রথমে আমদানি করা ডিম থেকে বাচ্চা উৎপাদনের হ্যাচারি হিসেবে যাত্রা শুরু করে। ১৯৯৭ সালে নিজস্ব প্যারেন্ট স্টক খামার এবং ২০০৪ সালে গ্র্যান্ড প্যারেন্ট খামারে উৎপাদন শুরু করে। দেশের খামারিদের উন্নত জাতের বাচ্চা ও মানসম্মত খাদ্য সরবরাহ এবং ভোক্তাদের নিরাপদ ডিম ও মুরগির মাংস দেওয়াই ছিল মূল উদ্দেশ্য। কাজী ফার্মসের ইতিহাস ও পণ্য
প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে ব্রয়লার প্যারেন্ট বাচ্চা, ব্রয়লার বাচ্চা, রঙিন মুরগির বাচ্চা, লেয়ার বাচ্চা, খাবার ডিম, মুরগি, পোলট্রি-ফিশ-ক্যাটল ফিড এবং জৈব সার উৎপাদন করে। সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হিমায়িত ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, আইসক্রিম, গণমাধ্যম এবং তথ্যপ্রযুক্তিতেও কার্যক্রম রয়েছে। দেশের শতাধিক স্থানে এর খামার, হ্যাচারি, খাদ্য কারখানা, বিক্রয় ও সহায়ক কার্যক্রম রয়েছে। কর্মীসংখ্যা প্রায় ১০ হাজার বলে প্রতিষ্ঠানটির মানবসম্পদ-সংক্রান্ত প্রকাশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
১৯৯৬ সালের পর শিল্পটির বড় চ্যালেঞ্জ ছিল উন্নত জিনগত মুরগির প্রাপ্যতা, আমদানিনির্ভরতা, দক্ষ জনবলের অভাব এবং আধুনিক জীবাণু-নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা। পরবর্তী সময়ে বার্ড ফ্লু, খাদ্যশস্যের মূল্যবৃদ্ধি, ডলার ও জ্বালানি সংকট, বাচ্চা ও ডিমের দামের অস্থিরতা এবং বাজার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও মোকাবিলা করতে হয়েছে।
প্রকাশিত আর্থিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২২–২৩ অর্থবছরে কাজী ফার্মস লিমিটেডের বিক্রয় ছিল প্রায় ৩,৯৩৮ কোটি টাকা, করপূর্ব মুনাফা প্রায় ১৭৫ কোটি টাকা এবং সঞ্চিত মুনাফা প্রায় ১,৬৮৬ কোটি টাকা। তবে মোট জমি, ভবন, যন্ত্রপাতি ও সম্পদের একীভূত বাজারমূল্য প্রকাশিত হয়নি। প্রকাশিত আর্থিক তথ্য
কেন প্রথম: দেশের বৃহত্তম বাচ্চা ও ডিম উৎপাদকদের অন্যতম হওয়া, গ্র্যান্ড প্যারেন্ট থেকে খাদ্য, ডিম, মাংস ও জৈব সার পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনব্যবস্থা এবং শতাধিক স্থানে কার্যক্রম—সব মিলিয়ে কাজী ফার্মসকে প্রথম স্থানে রাখা হয়েছে।
২. সিপি বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিটেড

থাইল্যান্ডের চারোয়েন পোকফান্ড বা সিপি গ্রুপের বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান সিপি বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিটেড ১৯৯৮ সালে কার্যক্রম শুরু করে। এর মালিকানা থাইল্যান্ডভিত্তিক সিপি বা সিপিএফ গোষ্ঠীর। বাংলাদেশি পোলট্রি ও মৎস্য খাতে উন্নত প্রযুক্তি, মানসম্পন্ন খাদ্য, উন্নত জাতের বাচ্চা এবং সমন্বিত উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলাই ছিল প্রধান উদ্দেশ্য।
সিপির কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে গ্র্যান্ড প্যারেন্ট ও প্যারেন্ট স্টক, হ্যাচারি, একদিন বয়সী বাচ্চা, পোলট্রি ও মাছের খাদ্য, বাণিজ্যিক মুরগি ও ডিম উৎপাদন, চুক্তিভিত্তিক খামার, মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং তৈরি খাবার। ‘ফাইভ স্টার’ নামের খাবারের দোকানও তাদের মূল্যসংযোজিত খাদ্যব্যবস্থার অংশ। প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত পেশাগত তথ্যে বাংলাদেশসহ এর কর্মীসংখ্যার শ্রেণি ১,০০১–৫,০০০ দেখানো হয়েছে; তবে শুধু বাংলাদেশের সুনির্দিষ্ট হালনাগাদ সংখ্যা প্রকাশিত নয়। সিপি বাংলাদেশের পরিচিতি
ঢাকার উত্তরায় প্রধান কার্যালয় থাকলেও খাদ্য কারখানা, খামার, হ্যাচারি, পরিবেশক এবং চুক্তিভিত্তিক খামার ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কার্যক্রম রয়েছে। তবে সব প্রকল্পের হালনাগাদ জেলা ও উৎপাদনক্ষমতার একীভূত তালিকা প্রকাশিত হয়নি।
বাংলাদেশে প্রবেশের পর সিপিকে স্থানীয় বাজার বোঝা, খামারিদের আধুনিক উৎপাদনব্যবস্থায় যুক্ত করা, বিদেশি প্রযুক্তিকে বাংলাদেশের গরম ও আর্দ্র পরিবেশের উপযোগী করা এবং সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ নিতে হয়েছে। বার্ড ফ্লু, করোনাকালীন সরবরাহ সংকট, ভুট্টা-সয়াবিন ও বৈদেশিক মুদ্রার মূল্যবৃদ্ধি এবং ডিমের বাজারসংক্রান্ত প্রতিযোগিতা কমিশনের মামলাও প্রতিষ্ঠানটির জন্য বড় চাপ সৃষ্টি করে।
২০২৩ সালে বাংলাদেশে সিপির পোলট্রি কার্যক্রমের বিক্রয় প্রায় ৪,৩৫৩ কোটি টাকা, করপূর্ব মুনাফা প্রায় ১৫৩ কোটি টাকা এবং সঞ্চিত মুনাফা প্রায় ৬৭৮ কোটি টাকা ছিল। পূর্ণাঙ্গ মোট সম্পদের মূল্য প্রকাশিত নয়। বিক্রয় ও মুনাফার তথ্য
কেন দ্বিতীয়: প্রকাশিত বিক্রয়ের হিসাবে সিপি কাজীর চেয়েও বড়; কিন্তু বাংলাদেশে গ্র্যান্ড প্যারেন্ট, খাবার ডিম, স্থানীয় হ্যাচারি বিস্তার ও সামগ্রিক দেশীয় পোলট্রি পরিচয়ের বিচারে কাজীকে প্রথম এবং সিপিকে দ্বিতীয় রাখা হয়েছে।
৩. প্যারাগন পোলট্রি লিমিটেড

প্যারাগন পরিবারের ব্যবসায়িক ভিত্তি তৈরি হয়েছিল ১৯৫২ সালে, মিজানুর রহমানের মুদ্রণ ও মোড়কজাতকরণ ব্যবসার মাধ্যমে। পরবর্তী প্রজন্মের মোশিউর রহমান ও ইয়াসমিন রহমানের নেতৃত্বে নব্বইয়ের দশকে পোলট্রি খাতে প্রবেশ করে প্রতিষ্ঠানটি। বিভিন্ন উৎসে পোলট্রি কার্যক্রম শুরুর বছর ১৯৮৯, ১৯৯৩ কিংবা আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠার বছর হিসেবে ১৯৯৮ পাওয়া যায়। তাই প্রতিবেদনে বলা নিরাপদ—নব্বইয়ের দশকে প্যারাগনের বাণিজ্যিক পোলট্রি যাত্রা প্রতিষ্ঠিত হয়।
দেশে মানসম্পন্ন বাচ্চা, ডিম, মুরগি ও খাদ্যের ঘাটতি পূরণ এবং নিয়ন্ত্রিত উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলাই ছিল এর উদ্দেশ্য। বর্তমানে প্যারাগনের গ্র্যান্ড প্যারেন্ট ও প্যারেন্ট স্টক, ব্রিডার খামার, হ্যাচারি, ব্রয়লার ও লেয়ার খামার, খাদ্য কারখানা, ডিম ও মুরগির মাংস উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, জৈব সার, বায়োগ্যাস ও সৌরবিদ্যুৎ কার্যক্রম রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, ১০টি স্থানে হ্যাচারি পরিচালিত হচ্ছে এবং সপ্তাহে ৩০ লাখের বেশি একদিন বয়সী বাচ্চা উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। এটিই বাংলাদেশের প্রকাশিত সর্বোচ্চ হ্যাচারি সক্ষমতাগুলোর একটি। দেশের মধ্য, উত্তর, উত্তর-পূর্ব ও অন্যান্য অঞ্চলে এর খামার ও হ্যাচারি ছড়িয়ে রয়েছে। প্যারাগনের হ্যাচারি সক্ষমতা
নব্বইয়ের দশকে আধুনিক হ্যাচারি প্রযুক্তি, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, মানসম্মত প্যারেন্ট স্টক, দক্ষ কারিগরি কর্মী ও শীতল পরিবহনব্যবস্থা তৈরি করা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। পরবর্তী সময়ে বার্ড ফ্লু, অতিরিক্ত উৎপাদনে বাচ্চার দরপতন, খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি, রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রক্রিয়াজাত মুরগির সীমিত বাজার মোকাবিলা করতে হয়েছে।
প্যারাগন পোলট্রির সুনির্দিষ্ট বর্তমান কর্মীসংখ্যা, মোট সম্পদ ও একীভূত আর্থিক হিসাব জনসমক্ষে নেই। প্রকাশিত শিল্পতথ্য থেকে কাজী, সিপি ও প্যারাগনের সম্মিলিত বিক্রয় থেকে হিসাব করলে প্যারাগনের প্রাসঙ্গিক বছরের বিক্রয় আনুমানিক ৭৭০ কোটি টাকার কাছাকাছি হতে পারে; তবে এটি প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক ঘোষিত টার্নওভার হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
কেন তৃতীয়: সপ্তাহে ৩০ লাখের বেশি বাচ্চা উৎপাদন, ১০টি হ্যাচারি এবং গ্র্যান্ড প্যারেন্ট থেকে প্রক্রিয়াজাত মাংস পর্যন্ত সমন্বিত ব্যবস্থার কারণে প্যারাগনকে তৃতীয় স্থানে রাখা হয়েছে।
৪. নরিশ পোলট্রি অ্যান্ড হ্যাচারি লিমিটেড

নরিশ পোলট্রি অ্যান্ড হ্যাচারি লিমিটেড ১৯৯৯ সালে খালেদ গ্রুপ অব কোম্পানিজের উদ্যোক্তাদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়। অপুষ্টি হ্রাস, সাশ্রয়ী প্রাণিজ আমিষ সরবরাহ এবং খামারিদের মানসম্পন্ন বাচ্চা ও খাদ্য দিয়ে উৎপাদনশীল করা ছিল এর ঘোষিত লক্ষ্য। প্রতিষ্ঠানটির প্রথম দিকের মূল পণ্য ছিল একদিন বয়সী বাচ্চা ও পোলট্রি খাদ্য। তাদের প্রাথমিক মূলমন্ত্র ছিল—“আমরা প্রজনন করি, খাদ্য দিই এবং পুষ্টি জোগাই।”
নরিশ বর্তমানে গ্র্যান্ড প্যারেন্ট ও প্যারেন্ট স্টক, ব্রয়লার ও লেয়ার বাচ্চা, বাণিজ্যিক মুরগি, পোলট্রি খাদ্য, মাছ ও গরুর খাদ্য, বীজ, জৈব সার এবং মূল্যসংযোজিত কৃষিপণ্য নিয়ে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি অনুযায়ী, তারা ১৫ হাজারের বেশি ক্ষুদ্র খামারির সঙ্গে বিভিন্নভাবে যুক্ত। ঢাকা, গাজীপুর ও বগুড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় উৎপাদনকেন্দ্র এবং দেশব্যাপী পরিবেশক ও কারিগরি সহায়তা নেটওয়ার্ক রয়েছে। নরিশের ইতিহাস ও কার্যক্রম
প্রকাশিত পেশাগত তথ্যে কর্মীসংখ্যা ৫,০০১–১০,০০০ শ্রেণিতে দেখানো হয়েছে। তবে এটি যাচাইকৃত বেতনভুক্ত কর্মীর নির্দিষ্ট সংখ্যা নয়। প্রতিষ্ঠানের মালিকানা খালেদ গ্রুপের হলেও বর্তমান শেয়ারধারী, চেয়ারম্যান ও পরিবারের মালিকানার পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ্যে সহজলভ্য নয়।
নরিশকে বাচ্চার মান স্থিতিশীল রাখা, খাদ্য রূপান্তর দক্ষতা বাড়ানো, দেশব্যাপী সরবরাহব্যবস্থা তৈরি এবং আমদানিনির্ভর কাঁচামালের মূল্যঝুঁকি মোকাবিলা করতে হয়েছে। বার্ড ফ্লু, খামারিদের লোকসানের কারণে বাচ্চার চাহিদা কমে যাওয়া, খাদ্যের বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা, বৈদেশিক মুদ্রা সংকট এবং রোগমুক্ত প্যারেন্ট স্টক রক্ষা করা বড় চ্যালেঞ্জ।
সাম্প্রতিক বার্ষিক বিক্রয়, মোট সম্পদ, দায়, জমি ও কারখানার আর্থিক মূল্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়নি। পুরোনো শিল্পতথ্যে নরিশের সপ্তাহে প্রায় ১০ লাখ বাচ্চা উৎপাদনের উল্লেখ থাকলেও বর্তমান সক্ষমতা তার চেয়ে বেশি হতে পারে—নতুন যাচাই ছাড়া নির্দিষ্ট সংখ্যা লেখা ঠিক হবে না।
কেন চতুর্থ: নরিশ বাংলাদেশের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ গ্র্যান্ড প্যারেন্ট প্রতিষ্ঠানের একটি; খাদ্য, বাচ্চা, নিজস্ব উৎপাদন ও খামারি নেটওয়ার্কে বড় উপস্থিতির কারণে চতুর্থ স্থানে রাখা হয়েছে।
৫. নাহার এগ্রো কমপ্লেক্স লিমিটেড

নাহার এগ্রোর প্রতিষ্ঠাতা মো. রকিবুর রহমান ১৯৮৯ সালে প্রাণিসম্পদভিত্তিক ব্যবসা শুরু করেন। ১৯৯৪ সালে নাহার ডেইরি, নাহার পোলট্রি ও নাহার পোলট্রি ফিড নামে কার্যক্রম আলাদা করেন। ১৯৯৮ সালে কুমিরায় ৪,২০০টি মুরগি দিয়ে প্যারেন্ট স্টক পালন শুরু এবং ২০০২ সালে নাহার এগ্রো কমপ্লেক্স লিমিটেড গঠন করেন। লক্ষ্য ছিল চট্টগ্রাম অঞ্চলে মানসম্পন্ন বাচ্চা, খাদ্য, ডিম, দুধ ও কৃষিপণ্য উৎপাদনের একটি সমন্বিত প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা।
প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় আসে ২০০৪ সালে। ফ্রান্স থেকে আমদানি করা ৪৬ হাজার প্যারেন্ট স্টক বাচ্চার মধ্যে বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর প্রায় ২৬ হাজার মৃত পাওয়া যায়। এতে বিশাল লোকসান হয়; একই সময়ে ব্যাংকঋণের আবেদনও নাকচ হয়েছিল। উদ্যোক্তা ব্যবসা বন্ধ না করে পুনরায় বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণ করেন। নাহার এগ্রোর সংগ্রামের ইতিহাস
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি একদিন বয়সী ব্রয়লার ও লেয়ার বাচ্চা, পোলট্রি ও মাছের খাদ্য, খাবার ডিম, দুধ, দুগ্ধজাত ও বাগানজাত পণ্য উৎপাদন করে। মিরসরাই, সীতাকুণ্ড, ফটিকছড়ি, সিরাজগঞ্জ ও যশোরসহ বিভিন্ন এলাকায় খামার ও কারখানা রয়েছে। প্রায় ১২ লাখ প্যারেন্ট স্টক থেকে সপ্তাহে ২২–২৪ লাখ বাচ্চা উৎপাদনের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। চারটি খাদ্য কারখানার মাসিক সক্ষমতা প্রায় ৬০ হাজার টন।
প্রতিষ্ঠানটিতে সরাসরি ২,৫০০-এর বেশি এবং পরোক্ষভাবে প্রায় ১০ হাজার মানুষ যুক্ত। প্রায় পাঁচ হাজার খামারের ১০ হাজার খামারিকে বাচ্চা, খাদ্য ও কারিগরি সহায়তা দেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।
প্রকাশিত হিসাবে বার্ষিক বিক্রয় প্রায় ১,০০০ কোটি টাকা। মোট সম্পদের আর্থিক মূল্য প্রকাশিত না হলেও প্যারেন্ট স্টক, হ্যাচারি, চারটি খাদ্য কারখানা, ডেইরি খামার, জমি ও নতুন ১৫০ কোটি টাকার লেয়ার প্রকল্প থেকে এর সম্পদভিত্তি বড় বলে বোঝা যায়। নাহারের উৎপাদন ও বিক্রয়
কেন পঞ্চম: উৎপাদনক্ষমতার দিক থেকে নাহার অনেক ক্ষেত্রে চতুর্থ হওয়ার দাবিদার। তবে দেশব্যাপী বাজারপ্রভাব ও বহুবছরের গ্র্যান্ড প্যারেন্ট অবস্থান বিবেচনায় নরিশের পর পঞ্চম স্থানে রাখা হয়েছে।
৬. আফতাব বহুমুখী ফার্মস লিমিটেড

বাংলাদেশের আধুনিক পোলট্রি শিল্পের পথিকৃৎ প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি আফতাব বহুমুখী ফার্মস। শিল্পপতি জহুরুল ইসলাম ১৯৯১ সালে কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার ভাগলপুরে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। উদ্দেশ্য ছিল গ্রামে আধুনিক কৃষি ও পোলট্রি শিল্প স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশে বাণিজ্যিকভাবে উন্নত মুরগির বাচ্চা, খাদ্য ও মাংস উৎপাদন।
আফতাব দেশের প্রথম দিককার বাণিজ্যিক প্যারেন্ট স্টক প্রতিষ্ঠান এবং গ্র্যান্ড প্যারেন্ট খামার, প্যারেন্ট স্টক, ব্রয়লার ও লেয়ার খামার, আধুনিক হ্যাচারি, পোলট্রি-ফিশ-ক্যাটল ফিড কারখানা এবং মুরগি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গড়ে তোলে। মাছের খামার, মাছের পোনা, ধান-বীজ, ভুট্টা ও পাটবীজসহ অন্যান্য কৃষি কার্যক্রমেও প্রতিষ্ঠানটির অংশগ্রহণ রয়েছে। প্রতিষ্ঠাতা মৃত্যুর পর ব্যবসায়িক নেতৃত্ব পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের হাতে যায়; প্রকাশিত পুরোনো তথ্যে মনজুরুল ইসলাম চেয়ারম্যান হিসেবে উল্লেখিত। আফতাবের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস
কিশোরগঞ্জকেন্দ্রিক বৃহৎ উৎপাদনভিত্তির পাশাপাশি পরিবেশক ও বিক্রয়ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য যায়। তবে বর্তমান সব খামার, হ্যাচারি ও কারখানার হালনাগাদ তালিকা প্রকাশিত নয়।
প্রতিষ্ঠানটিকে নব্বইয়ের দশকে আধুনিক পোলট্রি প্রযুক্তি গ্রহণ, বিদেশ থেকে প্যারেন্ট ও গ্র্যান্ড প্যারেন্ট স্টক আনা, দক্ষ জনবল তৈরি এবং গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুৎ-সড়ক-শীতল সংরক্ষণ অবকাঠামো গড়ার চ্যালেঞ্জ নিতে হয়েছে। ২০০৭–০৮ সালের বার্ড ফ্লু, রোগের আতঙ্কে বাজার সংকোচন, খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি এবং পরবর্তী সময়ে নতুন দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কঠিন প্রতিযোগিতা আফতাবের বাজারের অবস্থানকে প্রভাবাবিত করেছে।
বর্তমান কর্মীসংখ্যা, বার্ষিক বিক্রয়, মোট সম্পদ, দায় এবং হ্যাচারির হালনাগাদ সক্ষমতা জনসমক্ষে পাওয়া যায়নি। অনলাইন কর্মসংস্থানভিত্তিক উৎসের সংখ্যা দিয়ে এত বড় প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত শ্রমশক্তি নির্ধারণ নির্ভরযোগ্য হবে না।
কেন ষষ্ঠ: ঐতিহাসিকভাবে আফতাব শীর্ষ তিনের অন্যতম ছিল। কিন্তু বর্তমান প্রকাশিত উৎপাদনক্ষমতা ও আর্থিক তথ্যের ঘাটতি এবং কাজী, সিপি, প্যারাগন, নরিশ ও নাহারের সম্প্রসারণ বিবেচনায় ষষ্ঠ স্থানে রাখা হয়েছে।
৭. প্রভিটা ব্রিডার্স অ্যান্ড হ্যাচারি লিমিটেড

নুরুন্নবী ভূঁইয়া চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে প্রায় ২০০১ সালে মামা এ কে এম আমিনুল ইসলামের সহযোগিতায় পোলট্রি খাদ্যের ব্যবসা শুরু করেন। পরে ব্যবসাটি প্রভিটা গ্রুপে রূপ নেয় এবং খাদ্য থেকে হ্যাচারি, ব্রিডার, একদিন বয়সী বাচ্চা, বাণিজ্যিক ব্রয়লার ও লেয়ার উৎপাদনে সম্প্রসারিত হয়। কৃষকের কাছে খাদ্য ও বাচ্চা পৌঁছে দিয়ে একটি দেশব্যাপী সমন্বিত কৃষিবাণিজ্য গড়ে তোলাই ছিল লক্ষ্য।
প্রভিটার পণ্য হচ্ছে ব্রয়লার, লেয়ার ও সোনালি মুরগির খাদ্য, মাছ ও গরুর খাদ্য, একদিন বয়সী ব্রয়লার ও লেয়ার বাচ্চা এবং সংশ্লিষ্ট কৃষি উপকরণ। নিজস্ব প্রকাশিত তথ্যে নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, যশোর, ময়মনসিংহ, গাইবান্ধা ও গাজীপুরসহ বিভিন্ন স্থানে খাদ্য কারখানা, ব্রিডার ও হ্যাচারি প্রকল্পের উল্লেখ রয়েছে। দেশব্যাপী বিপণনের জন্য সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, রংপুর, রাজশাহী, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, বরিশাল, কুমিল্লা, সিলেট, লক্ষ্মীপুর ও নরসিংদীসহ বহু জেলায় ডিপো রয়েছে। প্রভিটার উৎপাদনকেন্দ্র
প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে ‘হাজারো কর্মী’র কথা বলা হলেও নিরীক্ষিত হালনাগাদ কর্মীসংখ্যা নেই। একইভাবে বার্ষিক বিক্রয় ও মোট সম্পদের নির্ভরযোগ্য একীভূত হিসাবও প্রকাশিত নয়।
প্রভিটার সবচেয়ে বড় বর্তমান চ্যালেঞ্জ আর্থিক। ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠান-সংশ্লিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে গ্রুপটির মোট ঋণের বোঝা প্রায় ৩,৩০০ কোটি টাকা এবং কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের কথা উঠে এসেছে। উচ্চ সুদ, দ্রুত সম্প্রসারণ, ঋণনির্ভর বিনিয়োগ, কার্যকর মূলধনের সংকট ও বাজারের অস্থিরতা এ অবস্থার পেছনে ভূমিকা রেখেছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে ইঙ্গিত করা হয়েছে। প্রভিটার ঋণসংকট
কেন সপ্তম: উৎপাদনকেন্দ্র, হ্যাচারি ও দেশব্যাপী ডিপোর হিসাবে প্রভিটা বড় প্রতিষ্ঠান। কিন্তু আর্থিক সংকট, ঋণের চাপ এবং বর্তমান উৎপাদন সচলতার যাচাইকৃত তথ্যের ঘাটতির কারণে একে সপ্তম স্থানে রাখা হয়েছে।
৮. কোয়ালিটি ফিডস ও কোয়ালিটি পোলট্রি ব্রিডার্স

কোয়ালিটি ফিডস লিমিটেড প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯৫ সালে। প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত তথ্যে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠাতার নাম সুস্পষ্টভাবে দেওয়া হয়নি; ফলে মালিকের নাম যাচাই ছাড়া উল্লেখ করা নিরাপদ নয়। মানসম্মত ও স্বাস্থ্যসম্মত পোলট্রি, মাছ, চিংড়ি ও গবাদিপশুর খাদ্য উৎপাদন এবং খামারিদের ন্যায্যমূল্যে উন্নত পুষ্টি সরবরাহের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে ওঠে।
বর্তমানে কোয়ালিটি ফিডসের প্রধান পণ্য ব্রয়লার, সোনালি ও লেয়ার খাদ্য; মাছ, চিংড়ি, গরু ও অ্যাকুরিয়ামের মাছের খাদ্য। সহযোগী কোয়ালিটি ব্রিডার্স লিমিটেড ব্রিডার খামার ও পোলট্রি হ্যাচারি পরিচালনা করে। কোয়ালিটি ইন্টিগ্রেটেড এগ্রো খাবার ডিম, ব্রয়লার উৎপাদন এবং মুরগি প্রক্রিয়াজাত করে। তাদের প্রক্রিয়াজাত মুরগির কারখানার প্রতি ঘণ্টায় প্রায় এক হাজার মুরগি প্রক্রিয়াকরণের সক্ষমতার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
গাজীপুর ও বগুড়ায় প্রতিষ্ঠানটির ১৯টি স্বতন্ত্র উৎপাদন ইউনিট এবং বছরে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার টন খাদ্য উৎপাদনের স্থাপিত সক্ষমতা রয়েছে। চারটি সেক্টর কার্যালয়, নয়টি আঞ্চলিক জোন, ৩১টি অঞ্চল, ২৫টি ডিপো, ১০টি রোগনির্ণয় পরীক্ষাগার ও ১,২০০টির বেশি বিক্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে দেশব্যাপী কার্যক্রম পরিচালনা করে। বগুড়ার শাহজাহানপুরে ব্রিডার ও হ্যাচারি এবং হবিগঞ্জের মনতলায় প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা রয়েছে। কোয়ালিটি ফিডসের উৎপাদন ও নেটওয়ার্ক
পেশাগত নেটওয়ার্কে কর্মীসংখ্যা ৫,০০১–১০,০০০ শ্রেণিতে দেখানো হলেও নিরীক্ষিত নির্দিষ্ট সংখ্যা পাওয়া যায়নি। বার্ষিক বিক্রয় ও মোট সম্পদও প্রকাশিত নয়। তবে ১৯টি উৎপাদন ইউনিট, জমি, হ্যাচারি, প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, ১১.২ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ অবকাঠামো এবং পূর্বাচলে নির্মীয়মাণ ২০ তলা কিউ-সেন্টার বড় সম্পদভিত্তির ইঙ্গিত দেয়।
কেন অষ্টম: খাদ্য উৎপাদনের বিচারে প্রতিষ্ঠানটি আরও ওপরে থাকতে পারে; কিন্তু এই তালিকার প্রধান মানদণ্ড মুরগির ব্রিডার, হ্যাচারি ও পাখি উৎপাদন। সেই অংশের প্রকাশিত সক্ষমতা তুলনামূলক কম হওয়ায় অষ্টম স্থানে রাখা হয়েছে।
৯. আমান পোলট্রি অ্যান্ড হ্যাচারি লিমিটেড

আমান গ্রুপের পোলট্রি ও হ্যাচারি প্রতিষ্ঠানটি ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং ২০১২ সালে উৎপাদন শুরু করে। আমান গ্রুপের পারিবারিক ব্যবসার ইতিহাস আরও পুরোনো হলেও হ্যাচারি প্রকল্পটি আলাদা কোম্পানি হিসেবে গড়ে ওঠে উন্নত মানের একদিন বয়সী বাচ্চা উৎপাদন এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের খামারিদের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ দেওয়ার উদ্দেশ্যে।
প্রকল্পটি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার কাকনহাটের ফাদিলপুরে প্রায় ১০ একর জমির ওপর স্থাপিত। মূল পণ্য একদিন বয়সী মুরগির বাচ্চা। প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এর বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ৮৪ লাখ বাচ্চা। সরাসরি প্রায় ৯০ এবং পরোক্ষভাবে প্রায় ৫০০ মানুষের কর্মসংস্থানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আমান পোলট্রি অ্যান্ড হ্যাচারি
আমান গ্রুপের খাদ্য বিভাগ পোলট্রি, মাছ, চিংড়ি ও গরুর খাদ্য উৎপাদন করে। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় খাদ্য কারখানাটি স্থাপিত। আমান গ্রুপের আরেক সহযোগী আনোয়ারা পোলট্রি অ্যান্ড হ্যাচারি নওগাঁর নিয়ামতপুরে অবস্থিত এবং প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত হিসাবে সপ্তাহে প্রায় ১২ লাখ ৪৯ হাজার ৫০০ বাচ্চা উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। ফলে শুধু আমান পোলট্রি নয়, পুরো গ্রুপের হ্যাচারি সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য।
প্রতিষ্ঠানটিকে উত্তরাঞ্চলের তাপমাত্রার বড় ওঠানামা, রোগমুক্ত ডিম সংগ্রহ, বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, হ্যাচারির তাপ ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ এবং দ্রুত বাচ্চা পরিবহনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খাদ্যের দাম, ডলার সংকট, ব্যাংকঋণের সুদ এবং বাচ্চার বাজারমূল্যের অস্থিরতা নতুন চাপ তৈরি করেছে।
আমান পোলট্রি অ্যান্ড হ্যাচারির পৃথক বার্ষিক বিক্রয়, মোট সম্পদ ও মুনাফা প্রকাশিত নয়। আমান ফিড শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হলেও তার আর্থিক হিসাবকে সরাসরি হ্যাচারি কোম্পানির টার্নওভার বলা যাবে না।
কেন নবম: বড় হ্যাচারি সক্ষমতা থাকলেও কাজী, সিপি, প্যারাগন, নরিশ ও নাহারের মতো বিস্তৃত গ্র্যান্ড প্যারেন্ট, নিজস্ব বাণিজ্যিক পাখি, ডিম ও প্রক্রিয়াজাত মাংসের পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা তুলনামূলক সীমিত হওয়ায় নবম স্থানে রাখা হয়েছে।
১০. ইনডেক্স পোলট্রি প্রাইভেট লিমিটেড/ইনডেক্স এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ

ইনডেক্স এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ২০০০ সালে যাত্রা শুরু করে। এটি ইনডেক্স গ্রুপের কৃষিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান। কোম্পানির বর্তমান পরিচালনা ও মালিকানার বিস্তারিত শেয়ারবাজারের বার্ষিক প্রতিবেদনে রয়েছে; কিন্তু একক কোনো ব্যক্তিকে ‘মালিক’ বলা যথাযথ নয়—এটি শেয়ারধারী পরিচালিত তালিকাভুক্ত কোম্পানি। মানসম্মত পোলট্রি ও মাছের খাদ্য, প্যারেন্ট স্টক, হ্যাচিং ডিম এবং একদিন বয়সী বাচ্চা উৎপাদন ছিল প্রতিষ্ঠার প্রধান উদ্দেশ্য।
প্রতিষ্ঠানটি ‘এক্স ফিড’ নামে ব্রয়লার, লেয়ার, মাছ ও গরুর খাদ্য বাজারজাত করে। রাজেন্দ্রপুর ও বগুড়ায় দুটি ব্রিডার খামার এবং রাজেন্দ্রপুর ও রংপুর অঞ্চলে হ্যাচারি রয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ব্রিডার ইউনিটের বার্ষিক সক্ষমতা প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ বাচ্চা এবং হ্যাচারির বার্ষিক সক্ষমতা ১ কোটি ২৫ লাখের বেশি বাচ্চা। খাদ্য উৎপাদনক্ষমতা বছরে প্রায় ৯৬ হাজার টনের বেশি। ইনডেক্স এগ্রোর কার্যক্রম
২০২৫ সালের হিসাবে প্রতিষ্ঠানটির কর্মীসংখ্যা প্রায় ৯৯২ জন। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে মোট বিক্রয় ছিল প্রায় ৪৪১ কোটি টাকা, যার মধ্যে পোলট্রি ও হ্যাচারি বিভাগের বিক্রয় প্রায় ১১৭.৮৮ কোটি টাকা। একই বছরে নিট মুনাফা ছিল প্রায় ২৬.১০ কোটি টাকা।
২০২৫ সালের জুন শেষে নিট সম্পদমূল্য বা শেয়ারহোল্ডারদের ইকুইটি প্রায় ৪০৫.১৭ কোটি টাকা। তবে কোম্পানির মোট সম্পদ নিট সম্পদের চেয়ে বেশি; নিট সম্পদ থেকে দায় বাদ দেওয়ার পর শেয়ারধারীদের অংশ বোঝায়। ইনডেক্সের বিক্রয় ও নিট সম্পদ
প্রতিষ্ঠানটিকে খাদ্যের কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, গ্রাহকের কাছ থেকে বকেয়া আদায়, নগদ প্রবাহ কমে যাওয়া, ঋণের ব্যয় এবং বাচ্চার মৌসুমি দামের ওঠানামা মোকাবিলা করতে হচ্ছে। ২০২৫ সালে মুনাফা সামান্য বাড়লেও পরিচালন নগদ প্রবাহ কমেছে।
কেন দশম: ইনডেক্সের আর্থিক তথ্য সবচেয়ে স্বচ্ছ এবং ব্যবসা লাভজনক; কিন্তু হ্যাচারি, বাচ্চা, ডিম, মাংস, দেশব্যাপী খামার ও মোট উৎপাদনের আকার ওপরের প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় ছোট। তাই এই নির্দিষ্ট তালিকায় দশম স্থানে রাখা হয়েছে।
গবেষণার চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ
এই তালিকার ক্রম সব সূচকে একই থাকবে না। যেমন—
- বিক্রয়ের হিসাবে সিপি বাংলাদেশ প্রথম হতে পারে।
- দেশীয় সমন্বিত পোলট্রি কার্যক্রমে কাজী ফার্মস প্রথম।
- প্রকাশিত হ্যাচারি সক্ষমতায় প্যারাগন অত্যন্ত শক্তিশালী।
- নাহার এগ্রো প্রকাশিত বাচ্চা উৎপাদন ও টার্নওভারে নরিশের সমকক্ষ প্রতিযোগী।
- খাদ্য উৎপাদনে কোয়ালিটি ফিডস তালিকার আরও ওপরে আসতে পারে।
- আর্থিক তথ্যের স্বচ্ছতায় তালিকাভুক্ত ইনডেক্স এগ্রো অন্যদের তুলনায় এগিয়ে।
অতএব, নিশ্চিত জাতীয় র্যাঙ্কিং তৈরির জন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের একই অর্থবছরের মোট প্যারেন্ট স্টক, সাপ্তাহিক বাচ্চা উৎপাদন, খাদ্য উৎপাদন, ডিম-মাংস উৎপাদন, কর্মী, বিক্রয়, মোট সম্পদ, দায় এবং সচল খামারের সংখ্যা সংগ্রহ করা প্রয়োজন। বর্তমান তালিকাটি প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য তুলনামূলক অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
শেষ কথা
এই ১০ প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস নতুন উদ্যোক্তাকে যে স্বপ্ন দেখায়

বাংলাদেশের বৃহৎ ১০টি পোলট্রি প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস পড়লে একজন নতুন উদ্যোক্তার মনে প্রথম যে বিশ্বাসটি জন্মায় তা হলো—বড় প্রতিষ্ঠান সব সময় বড় মূলধন দিয়ে শুরু হয় না; বড় প্রতিষ্ঠান তৈরি হয় ছোট একটি উদ্যোগ, দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য এবং অসংখ্য প্রতিকূলতা অতিক্রম করার সাহস থেকে।
কাজী ফার্মস একটি হ্যাচারি দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। নাহার এগ্রোর উদ্যোক্তা ছোট পরিসরে প্রাণিসম্পদের ব্যবসা শুরু করেছিলেন। একসময় বিদেশ থেকে আনা নাহারের ৪৬ হাজার প্যারেন্ট স্টক বাচ্চার মধ্যে প্রায় ২৬ হাজারই মারা যায়। ব্যাংক থেকেও তখন প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। তবু তিনি থেমে যাননি। আজ প্রতিষ্ঠানটি দেশের অন্যতম বৃহৎ কৃষিভিত্তিক শিল্পগোষ্ঠী। আফতাব বহুমুখী ফার্মস দেখিয়েছে—গ্রামেও আধুনিক হ্যাচারি, খাদ্য কারখানা ও মুরগি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব। নরিশ, প্যারাগন, প্রভিটা, কোয়ালিটি, আমান ও ইনডেক্সের বিকাশও প্রমাণ করে—একটি নির্দিষ্ট পণ্য দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনব্যবস্থা তৈরি করা যায়।
একজন নতুন উদ্যোক্তাকে শুরুতেই লাখ লাখ মুরগি পালনের স্বপ্ন দেখতে হবে না। তিনি ৫০০ কিংবা ১ হাজার মুরগির স্বাস্থ্যসম্মত খামার, ছোট খাদ্য বিপণন কেন্দ্র, ডিম সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণ, মুরগির বিষ্ঠা থেকে জৈব সার, নিরাপদ মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ অথবা স্থানীয় খামারিদের কারিগরি সেবা দেওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু করতে পারেন। মূল বিষয় হচ্ছে—কোন সমস্যার সমাধান করতে চান, সেটি সঠিকভাবে নির্ধারণ করা।
এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ইতিহাস একই সঙ্গে সতর্কও করে। দ্রুত বড় হওয়ার লোভ, অতিরিক্ত ব্যাংকঋণ, হিসাব না রেখে সম্প্রসারণ, একটি ক্রেতা বা একটি পণ্যের ওপর নির্ভরতা এবং রোগনিয়ন্ত্রণে অবহেলা সফল প্রতিষ্ঠানকেও সংকটে ফেলতে পারে। তাই নতুন উদ্যোক্তার প্রথম বিনিয়োগ হওয়া উচিত শুধু ভবন ও মুরগিতে নয়—জ্ঞান, জীবাণু-নিরাপত্তা, প্রশিক্ষিত জনবল, বাজার গবেষণা এবং সঠিক হিসাব সংরক্ষণে।
পোলট্রি ব্যবসায় লোকসান, রোগ, খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং বাজারের দরপতন আসবেই। সফল উদ্যোক্তা তিনি নন, যিনি কখনো সমস্যায় পড়েননি; সফল উদ্যোক্তা তিনি, যিনি প্রতিটি সমস্যা থেকে শিক্ষা নিয়ে আরও শক্তিশালী উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন।
আজকের ছোট খামারই আগামী দিনের বড় প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি হতে পারে। প্রয়োজন সততা, পণ্যের মান, খামারির আস্থা, ধৈর্য এবং প্রতিদিন শেখার মানসিকতা।
স্বপ্নটি বড় হতে পারে, কিন্তু শুরুটি হতে হবে ছোট, পরিকল্পিত ও সৎ। কারণ বাংলাদেশের প্রতিটি বড় পোলট্রি প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসের শুরুতে ছিল একজন মানুষের সাহসী সিদ্ধান্ত—“আমি চেষ্টা করব।”























