বাংলাদেশে পারা ঘাস চাষ: ইতিহাস, বৈশিষ্ট্য, চাষপদ্ধতি, রোগবালাই ও ব্যবস্থাপনা।।
ড. বায়েজিদ মোড়লের গবেষণাধর্মী প্রতিবেদন।।

বাংলাদেশে গবাদিপশুর প্রধান সংকটগুলোর একটি হলো সারা বছর পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর সবুজ ঘাসের সরবরাহ নিশ্চিত করা। বিশেষ করে বর্ষাকালে জলাবদ্ধ নিচু জমি, পুকুরপাড়, খালের কিনারা ও স্যাঁতসেঁতে পতিত জমির বড় অংশ সাধারণ ফসল চাষে ব্যবহার করা কঠিন। এসব জমিতে চাষের জন্য পারা ঘাস একটি কার্যকর বহুবর্ষজীবী গোখাদ্য।
পারা ঘাস দ্রুত বিস্তার লাভ করে, জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে এবং একবার জমিতে প্রতিষ্ঠিত হলে কয়েক বছর পর্যন্ত নিয়মিত ঘাস পাওয়া যায়। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর পুষ্টিমান ও গ্রহণযোগ্যতা কমে যায়। তাই সঠিক সময়ে কাটা, পরিমিত সার প্রয়োগ এবং সুষম খাদ্যের সঙ্গে খাওয়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

১. পারা ঘাসের পরিচয়
- বাংলা নাম: পারা ঘাস
- ইংরেজি নাম: Para grass, Buffalo grass
- বর্তমান বৈজ্ঞানিক নাম: Urochloa mutica
- পুরোনো ও বহুল ব্যবহৃত বৈজ্ঞানিক নাম: Brachiaria mutica
- পরিবার: Poaceae
- প্রকৃতি: বহুবর্ষজীবী, লতানো ও আধা-জলজ ঘাস
- ব্যবহার: গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার সবুজ খাদ্য; সাইলেজ; সীমিতভাবে শুকনা খড় বা হে
এটি মাটির ওপর দিয়ে লম্বা রানার বা স্টোলন ছড়িয়ে বাড়ে। কাণ্ডের গিঁট মাটির সংস্পর্শে এলে সেখান থেকে শিকড় ও নতুন কুশি বের হয়। এ কারণেই অল্প সময়ের মধ্যে জমি ঘনভাবে ঢেকে ফেলতে পারে।
২. উৎপত্তি ও বিস্তারের ইতিহাস
পারা ঘাসের আদি নিবাস আফ্রিকার উষ্ণ ও আর্দ্র অঞ্চল। পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল, অস্ট্রেলিয়া এবং মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার উষ্ণ অঞ্চলে এটি বিস্তার লাভ করে। ব্রাজিলের পারা অঞ্চল বা বন্দর দিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে ছড়িয়ে পড়ার কারণে এটি “Para grass” নামে পরিচিত হয়েছে বলে বিভিন্ন উদ্ভিদবিষয়ক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
ঔপনিবেশিক আমলে দক্ষিণ এশিয়ায় উন্নত চারণ ও গোখাদ্য হিসেবে বিভিন্ন বিদেশি ঘাস প্রবর্তিত হয়। পারা ঘাসও সেই ধারায় ভারতীয় উপমহাদেশের আর্দ্র ও বন্যাপ্রবণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
বাংলাদেশে পারা ঘাস চাষের ইতিহাস
বাংলাদেশে ঠিক কোন সালে বা কোন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রথম পারা ঘাস আনা হয়েছিল—এমন নির্ভরযোগ্য ও একক সরকারি নথি সহজলভ্য নয়। অতএব নির্দিষ্ট সাল দাবি করা ঠিক হবে না। তবে বহু দশক ধরে দেশের নিচু ও জলাবদ্ধ এলাকায় এটি গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় পারা ঘাসকে দেশের উপযোগী গুরুত্বপূর্ণ গোখাদ্য হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। ২০১১ সালে ময়মনসিংহের ত্রিশালে পরিচালিত একটি গবেষণায় পাঙ্গাশ মাছের পুকুরের পলি ব্যবহার করে পারা ঘাস উৎপাদন ও পুষ্টিমান পরীক্ষা করা হয়। গবেষণায় ৪৫ দিন বয়সে ঘাস কাটা হয় এবং পারা ঘাসের আমিষ ও চর্বির পরিমাণ ধানের খড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি পাওয়া যায়। গবেষণাটি পরে Bangladesh Journal of Animal Science-এ প্রকাশিত হয়।
বর্তমানে বাংলাদেশের ময়মনসিংহ, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, বরিশালসহ বিভিন্ন জেলার নদী-খাল, বিল, পুকুর ও নিচু জমিসংলগ্ন এলাকায় পারা ঘাস দেখা যায়। এটি প্রাতিষ্ঠানিক চাষের পাশাপাশি অনেক এলাকায় প্রাকৃতিকভাবেও বিস্তার লাভ করেছে।
৩. পারা ঘাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য
ক. জলাবদ্ধতা সহনশীল
পারা ঘাসের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি ভেজা, স্যাঁতসেঁতে ও দুর্বল নিষ্কাশনসম্পন্ন জমিতে ভালো জন্মে। প্রতিষ্ঠিত গাছ অস্থায়ী বন্যা ও কিছুটা গভীর পানি সহ্য করতে পারে। তবে সদ্য রোপণ করা কাটিং দীর্ঘদিন সম্পূর্ণ পানির নিচে থাকলে পচে যেতে পারে।
খ. দ্রুত বিস্তার লাভ করে
কাণ্ডের গিঁট থেকে শিকড় বের হওয়ার কারণে ঘাসটি দ্রুত জমি ঢেকে ফেলে। বীজের তুলনায় কাণ্ড বা রানারের কাটিং দিয়ে সহজে বংশবিস্তার করা যায়।
গ. বহুবর্ষজীবী
একবার ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হলে সঠিক পরিচর্যায় কয়েক বছর একই জমি থেকে ঘাস সংগ্রহ করা যায়। অতিরিক্ত পুরোনো বা ফাঁকা হয়ে গেলে জমি সংস্কার করে নতুন কাটিং লাগানো প্রয়োজন।
ঘ. উষ্ণ আবহাওয়া পছন্দ করে
এর উপযোগী তাপমাত্রা প্রায় ২২–৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। তাই বাংলাদেশের শীতকালে উৎপাদন কম এবং বর্ষা ও উষ্ণ মৌসুমে উৎপাদন বেশি হয়।
ঙ. মাঝারি ছায়া সহ্য করে
পুকুরপাড় ও বাগানের ফাঁকা জায়গায় চাষ করা যায়। তবে অতিরিক্ত ঘন ছায়ায় কুশি ও ফলন কমে যায়। পর্যাপ্ত আলো পাওয়া গেলে ঘাস বেশি ঘন ও সবুজ হয়।
চ. পশুর কাছে গ্রহণযোগ্য
কচি অবস্থায় গরু ও মহিষ পারা ঘাস আগ্রহের সঙ্গে খায়। বেশি বয়স হলে কাণ্ড শক্ত, আঁশযুক্ত ও কম সুস্বাদু হয়ে যায়।
ছ. মাটি সংরক্ষণে সহায়ক
ঘন শিকড় ও লতানো কাণ্ড পুকুরপাড়, খালের ঢাল এবং ভাঙনপ্রবণ স্থানের মাটি ধরে রাখতে সাহায্য করে।
জ. আগাছায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি
কাটা কাণ্ড বা রানারের ছোট অংশ পানিতে ভেসে নতুন জায়গায় গিয়ে শিকড় গজাতে পারে। ফলে নিয়ন্ত্রণ না করলে এটি জলাভূমি ও সেচনালায় ছড়িয়ে স্থানীয় উদ্ভিদকে ঢেকে ফেলতে পারে।
৪. পুষ্টিমান
পারা ঘাসের পুষ্টিমান ঘাসের বয়স, মাটি, সার, মৌসুম, পানি ও কাটার সময়ের ওপর নির্ভর করে। সাধারণভাবে কচি পারা ঘাসে পাওয়া যেতে পারে:
- শুষ্ক পদার্থ: প্রায় ১৫–২৫ শতাংশ
- অপরিশোধিত আমিষ: শুষ্ক পদার্থের প্রায় ৭–১৪ শতাংশ
- আঁশ: বয়স বাড়লে দ্রুত বৃদ্ধি পায়
- খনিজ: ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, পটাশিয়ামসহ বিভিন্ন খনিজ
- জৈব পদার্থের পরিপাচ্যতা: মান ও বয়সভেদে মাঝারি
বাংলাদেশে পারা, জার্মান ও ধল ঘাসের পুষ্টিমান তুলনা করে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, গাছের বয়স বাড়ার সঙ্গে শুষ্ক পদার্থ ও আঁশ বাড়লেও আমিষ এবং হজমযোগ্যতা কমে। তাই বেশি মোট ওজন পাওয়ার আশায় ঘাস অতিরিক্ত বয়স পর্যন্ত জমিতে রেখে দেওয়া সব সময় লাভজনক নয়।

৫. পারা ঘাস চাষের উপযুক্ত এলাকা
পারা ঘাস চাষের জন্য উপযুক্ত স্থান:
- পুকুর ও মাছের ঘেরের পাড়
- খাল, বিল ও নদীর তীরবর্তী জমি
- মৌসুমি জলাবদ্ধ নিচু জমি
- বাড়ির পাশের স্যাঁতসেঁতে পতিত জমি
- ডেইরি বা মহিষের খামারের কাছের আর্দ্র জমি
- ধান চাষের অনুপযোগী নিচু জমি
- আর্দ্র বাগান বা গাছের মাঝের খালি জায়গা
অতিরিক্ত শুষ্ক, উঁচু বেলে জমিতে নিয়মিত সেচ ছাড়া পারা ঘাস ভালো উৎপাদন দেয় না। লবণাক্ত জমিতে লাগানোর আগে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৬. জমি নির্বাচন ও প্রস্তুতি
পারা ঘাস জলাবদ্ধতা সহ্য করলেও জমিতে চাষাবাদের সুবিধার জন্য আগাছামুক্ত পরিবেশ প্রয়োজন।
১. জমি থেকে কচুরিপানা, ঝোপ ও বহুবর্ষজীবী আগাছা পরিষ্কার করতে হবে।
২. সম্ভব হলে ২–৩টি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করতে হবে।
৩. নিচু জমিতে উঁচু বেড বা সরু আইল তৈরি করলে কাটিং সহজে প্রতিষ্ঠিত হয়।
৪. পুকুরপাড়ে মাটি আলগা করে সারি তৈরি করা যায়।
৫. অত্যন্ত ঢালু পাড়ে ঢালের আড়াআড়ি সারিতে লাগালে মাটি ক্ষয় কমে।
৬. জমিতে শিল্পবর্জ্য, ভারী ধাতু বা দূষিত নর্দমার পানি থাকলে সেখানে গোখাদ্য উৎপাদন করা যাবে না।

৭. রোপণের সময়
বাংলাদেশে পারা ঘাস লাগানোর সবচেয়ে ভালো সময়:
- ফেব্রুয়ারি–এপ্রিল: সেচের ব্যবস্থা থাকলে
- মে–আগস্ট: বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর সবচেয়ে উপযোগী
- সেপ্টেম্বর–অক্টোবর: পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকলে লাগানো যায়
তীব্র শীত এবং গভীর বন্যার সময় নতুন কাটিং লাগানো উচিত নয়।
৮. বংশবিস্তার ও রোপণপদ্ধতি
পারা ঘাস সাধারণত বীজের পরিবর্তে পরিণত কাণ্ড বা রানারের কাটিং দিয়ে লাগানো হয়।
কাটিং নির্বাচন
- রোগমুক্ত ও শক্তিশালী জমি থেকে কাটিং নিতে হবে।
- প্রতিটি কাটিংয়ে অন্তত ২–৩টি গিঁট থাকতে হবে।
- অতিরিক্ত কচি, পচা বা শুকনো কাণ্ড ব্যবহার করা যাবে না।
- কাটিং সংগ্রহের পর দীর্ঘ সময় রোদে ফেলে রাখা উচিত নয়।
রোপণের নিয়ম
- সারি থেকে সারি আনুমানিক ৪০–৫০ সেন্টিমিটার রাখা যায়।
- কাটিং থেকে কাটিং প্রায় ৩০–৫০ সেন্টিমিটার দূরে লাগানো যায়।
- একটি বা দুটি গিঁট মাটির নিচে রেখে বাকিটা বাইরে রাখতে হবে।
- শুষ্ক অবস্থায় লাগানোর সঙ্গে সঙ্গে সেচ দিতে হবে।
- পুকুরপাড়ে কাটিং শুইয়ে দিয়ে কয়েকটি গিঁট মাটিচাপা দিলে দ্রুত শিকড় গজায়।
ঘনত্ব, মাটি ও উৎপাদনের উদ্দেশ্য অনুযায়ী দূরত্ব পরিবর্তন করা যায়। দ্রুত জমি ঢাকতে তুলনামূলক ঘন এবং কাটিং সংগ্রহ সহজ রাখতে কিছুটা প্রশস্ত দূরত্ব ব্যবহার করা যায়।
৯. সার ব্যবস্থাপনা
সারের পরিমাণ অবশ্যই মাটি পরীক্ষা, জমির উর্বরতা এবং স্থানীয় কৃষি বা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার সুপারিশ অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত। সব এলাকার জন্য একই মাত্রা নিরাপদ বা অর্থনৈতিক নয়। সাধারণ ব্যবস্থাপনা হিসেবে:
- জমি তৈরির সময় ভালোভাবে পচানো গোবর বা কম্পোস্ট ব্যবহার করতে হবে।
- ফসফরাস ও পটাশজাতীয় সার সাধারণত জমি তৈরির সময় দেওয়া হয়।
- নাইট্রোজেন সার ভাগ করে প্রয়োগ করলে কুশি ও পাতার বৃদ্ধি ভালো হয়।
- প্রতিবার ঘাস কাটার পর প্রয়োজন অনুযায়ী অল্প মাত্রায় নাইট্রোজেন সার দেওয়া যেতে পারে।
- সার প্রয়োগের পর মাটি শুকনা থাকলে সেচ দিতে হবে।
- পানিতে ডুবে থাকা জমিতে ইউরিয়া ছিটালে পুষ্টির অপচয় ও পানি দূষণ হতে পারে।
পাঙ্গাশ পুকুরের পলি নিয়ে বাংলাদেশে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, পুষ্টিসমৃদ্ধ পুকুরের পলি পারা ঘাসের বৃদ্ধি ও পুষ্টি গ্রহণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে দূষিত, অতিরিক্ত ওষুধ-রাসায়নিকযুক্ত বা শিল্পবর্জ্যমিশ্রিত পলি ব্যবহার করা যাবে না।
১০. সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা
- রোপণের পর মাটি আর্দ্র রাখতে হবে।
- শুকনা মৌসুমে প্রয়োজন অনুসারে সেচ দিতে হবে।
- প্রতিষ্ঠিত পারা ঘাস জলাবদ্ধতা সহ্য করলেও নতুন কাটিং যেন দীর্ঘদিন সম্পূর্ণ ডুবে না থাকে।
- পানি অতিরিক্ত গভীর হলে ঘাস কাটা ও পরিচর্যা কঠিন হয়।
- খামারের অপরিশোধিত তরল বর্জ্য সরাসরি জমিতে দেওয়া উচিত নয়। এতে জীবাণু, ওষুধের অবশিষ্টাংশ ও নাইট্রেটের ঝুঁকি থাকতে পারে।
১১. আগাছা দমন
রোপণের প্রথম ৩০–৪৫ দিন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে আগাছা বেশি হলে কাটিং প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।
- প্রয়োজনমতো হাত দিয়ে বা নিড়ানি দিয়ে আগাছা পরিষ্কার করতে হবে।
- জমি ঘনভাবে ঢেকে যাওয়ার পর আগাছার প্রকোপ সাধারণত কমে যায়।
- আগাছানাশক ব্যবহার করলে গোখাদ্যে ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত পণ্য এবং লেবেলে দেওয়া অপেক্ষাকাল অবশ্যই মানতে হবে।
- জলাশয়ের পাশে নির্বিচারে আগাছানাশক ব্যবহার করা যাবে না।
১২. ঘাস কাটার সময় ও পদ্ধতি
প্রথম কাটিং
রোপণের প্রায় ৬০–৭৫ দিন পর, অথবা জমি ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হলে প্রথম কাটিং করা যায়।
পরবর্তী কাটিং
মৌসুম ও বৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে সাধারণত ৪০–৫০ দিন পরপর কাটলে ফলন ও পুষ্টিমানের ভালো সমন্বয় পাওয়া যায়। বাংলাদেশের গবেষণায় ৪০–৪৫ দিনের কাটিং ব্যবধান ব্যবহৃত হয়েছে।
কাটার উচ্চতা
মাটির একেবারে সমান করে না কেটে সাধারণত ১০–১৫ সেন্টিমিটার গোড়া রেখে কাটতে হবে। এতে দ্রুত নতুন কুশি বের হয়। বারবার খুব নিচু করে কাটলে গাছ দুর্বল এবং জমি ফাঁকা হয়ে যেতে পারে।
ফুল আসার আগেই কাটার সুবিধা
- আমিষ তুলনামূলক বেশি থাকে
- আঁশ কম থাকে
- পশু সহজে খায়
- হজমযোগ্যতা ভালো থাকে
- কাণ্ড অতিরিক্ত শক্ত হয় না
১৩. সম্ভাব্য ফলন
পারা ঘাসের ফলন জমির উর্বরতা, পানি, সার, ঘনত্ব, কাটার বয়স ও পরিচর্যার ওপর ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়। আন্তর্জাতিক তথ্য অনুযায়ী বিভিন্ন Brachiaria/Urochloa প্রজাতিতে বছরে প্রায় ৫–৩৬ টন শুষ্ক পদার্থ পাওয়া যেতে পারে। তবে এই সীমা সরাসরি বাংলাদেশের প্রতিটি জমির ফলন হিসেবে ব্যবহার করা ঠিক নয়।
চাষের আগে স্থানীয় পরিবেশে একটি ছোট প্লটে পরীক্ষামূলক উৎপাদন করে প্রতি কাটিংয়ে পাওয়া সবুজ ঘাস ও শুষ্ক পদার্থের হিসাব রাখা উত্তম।
১৪. পশুকে খাওয়ানোর নিয়ম
পারা ঘাস ভালো সবুজ খাদ্য হলেও একে একমাত্র খাদ্য হিসেবে দেওয়া উচিত নয়।
- ঘাস পরিষ্কার করে ২–৩ ইঞ্চি আকারে কেটে দিতে হবে।
- কাদাযুক্ত বা বন্যার পানি থেকে কাটা ঘাস পরিষ্কার পানিতে ধুতে হবে।
- ভেজা ঘাস কিছু সময় ছায়ায় ঝরিয়ে দিলে অতিরিক্ত পানি কমে।
- ধানের খড়, ডালজাতীয় ঘাস, খৈল, ভুসি, খনিজ মিশ্রণ ও লবণের সঙ্গে সুষম রেশন তৈরি করতে হবে।
- দুধেল গাভীর খাদ্য তার ওজন, দুধের পরিমাণ এবং শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে।
- নতুন ঘাস অল্প পরিমাণ দিয়ে শুরু করে ৫–৭ দিনে ধীরে ধীরে পরিমাণ বাড়াতে হবে।
- পচা, ছত্রাকযুক্ত, দুর্গন্ধযুক্ত বা দূষিত ঘাস খাওয়ানো যাবে না।
ঘাস কি সাইলেজ করা যায়?
পারা ঘাস সাইলেজ করা সম্ভব। তবে এতে পানির পরিমাণ বেশি এবং সহজে গাঁজনযোগ্য শর্করা তুলনামূলক কম থাকতে পারে। তাই কাটার পর কিছু সময় শুকিয়ে নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী শুকনা উপাদান বা উপযুক্ত গাঁজন-সহায়ক ব্যবহারের প্রয়োজন হতে পারে। সাইলেজ তৈরিতে অভিজ্ঞ পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
১৫. পারা ঘাসের রোগবালাই
পারা ঘাস সাধারণত সহনশীল এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগবালাইয়ে বড় ধরনের ক্ষতি হয় না। তবে উষ্ণ, আর্দ্র ও ঘন জমিতে কয়েকটি রোগ দেখা দিতে পারে।
১৫.১ পাতার ব্লাস্ট
সম্ভাব্য জীবাণু: Pyricularia প্রজাতির ছত্রাক।
লক্ষণ
- পাতায় ছোট বাদামি বা ধূসর দাগ
- দাগ লম্বা বা চোখের মতো হতে পারে
- আক্রমণ বেশি হলে পাতা শুকিয়ে যায়
- জমির কিছু অংশ পোড়া মনে হতে পারে
ব্যবস্থাপনা
- আক্রান্ত ঘাস কেটে জমি থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে।
- খুব ঘন জমি পাতলা করতে হবে।
- মাত্রাতিরিক্ত ইউরিয়া প্রয়োগ বন্ধ করতে হবে।
- কাটার যন্ত্র পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত রাখতে হবে।
- পানি চলাচল ও আলো-বাতাসের ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে।
১৫.২ শিথ ব্লাইট বা গোড়া-পচা
সম্ভাব্য জীবাণু: Rhizoctonia প্রজাতি।
লক্ষণ
- কাণ্ড ও পাতার খোলে জলভেজা বাদামি দাগ
- গাছের গোড়া পচে যাওয়া
- জমিতে গোলাকার বা অনিয়মিতভাবে শুকনো অংশ
- অতিরিক্ত আর্দ্রতায় দ্রুত বিস্তার
ব্যবস্থাপনা
- অতিরিক্ত ঘনত্ব কমাতে হবে।
- সম্ভব হলে সাময়িকভাবে অতিরিক্ত পানি সরাতে হবে।
- আক্রান্ত অংশ কেটে নষ্ট করতে হবে।
- অপরিপক্ব গোবর ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।
- একই আক্রান্ত জমির কাটিং নতুন জমিতে নেওয়া যাবে না।
১৫.৩ মরিচা রোগ
লক্ষণ
- পাতার ওপর হলুদ, কমলা বা বাদামি গুঁড়ার মতো দাগ
- হাত দিয়ে ঘষলে রঙিন গুঁড়া উঠতে পারে
- পাতা আগেভাগে শুকিয়ে যায়
ব্যবস্থাপনা
- আক্রান্ত পাতা বা ঘাস দ্রুত কেটে সরিয়ে ফেলতে হবে।
- অতিরিক্ত নাইট্রোজেন পরিহার করতে হবে।
- রোগমুক্ত কাটিং ব্যবহার করতে হবে।
- পরিচ্ছন্ন ও পর্যাপ্ত দূরত্বে চাষ করতে হবে।
১৫.৪ হেড স্মাট
ফুলের শিষ কালো গুঁড়ায় পরিণত হতে পারে। পশুখাদ্যের জন্য সাধারণত ফুল আসার আগেই ঘাস কাটা হয় বলে সময়মতো কাটলে এ রোগের সুযোগ কমে যায়।
১৬. ক্ষতিকর পোকামাকড়
আর্মিওয়ার্ম বা দলবদ্ধ শুঁয়োপোকা
লক্ষণ
- রাতের বেলায় পাতা খাওয়া
- অল্প সময়ে বড় এলাকা পাতাহীন হয়ে যাওয়া
- জমিতে মল ও শুঁয়োপোকা দেখা
দমন
- সকাল বা বিকেলে জমি পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
- আক্রান্ত অংশ দ্রুত কেটে সরিয়ে দিতে হবে।
- ডিমের গুচ্ছ ও শুঁয়োপোকা হাতে সংগ্রহ করে নষ্ট করা যায়।
- পাখি বসার খুঁটি ব্যবহার করা যেতে পারে।
- প্রয়োজন হলে নিবন্ধিত জৈব বা রাসায়নিক বালাইনাশক কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে ব্যবহার করতে হবে।
লিফহপার ও চিন্চ বাগ
এগুলো পাতার রস শোষণ করে। পাতার কিনারা হলুদ বা বাদামি হয়ে “পোড়া” দেখাতে পারে।
ব্যবস্থাপনা
- জমি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ
- অতিরিক্ত ইউরিয়া পরিহার
- আক্রান্ত অংশ কেটে অপসারণ
- জমি ও আশপাশের আগাছা পরিষ্কার
- উপকারী পোকা সংরক্ষণ
স্পিটলবাগ
গাছের গোড়ায় বা পাতায় থুতুর মতো সাদা ফেনা দেখা যায়। পারা ঘাস তুলনামূলকভাবে কিছুটা সহনশীল হলেও বেশি আক্রমণে বৃদ্ধি কমতে পারে।
১৭. কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক ব্যবহারে সতর্কতা
গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত ঘাসে নির্বিচারে ওষুধ প্রয়োগ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ অবশিষ্ট রাসায়নিক পশুর শরীর, দুধ ও মাংসে যেতে পারে।
- প্রথমে পরিচ্ছন্নতা, আক্রান্ত অংশ অপসারণ, ঘনত্ব কমানো এবং পানি-সার ব্যবস্থাপনা ঠিক করতে হবে।
- শুধুমাত্র বাংলাদেশে সংশ্লিষ্ট ফসলে অনুমোদিত বালাইনাশক ব্যবহার করতে হবে।
- লেবেলে উল্লেখিত মাত্রা ও ঘাস কাটার আগের অপেক্ষাকাল মানতে হবে।
- অপেক্ষাকাল শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঘাস পশুকে খাওয়ানো যাবে না।
- জলাশয়, মাছের ঘের ও খাবার পানির কাছে ওষুধ প্রয়োগে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।
- রোগ নিশ্চিত না করে ওষুধ ব্যবহার করা উচিত নয়।
১৮. পশুর সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি
পারা ঘাস সাধারণত নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য গোখাদ্য। তবে কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
অতিরিক্ত কচি ও পানিযুক্ত ঘাস
হঠাৎ অনেক বেশি খাওয়ালে পাতলা পায়খানা, পেট ফাঁপা বা খাদ্যগ্রহণে সমস্যা হতে পারে। তাই খড় ও অন্যান্য খাদ্যের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া উচিত।
দূষিত জমির ঘাস
শিল্পবর্জ্য, রাস্তার ধারের ভারী ধাতু, নর্দমার পানি বা কীটনাশকে দূষিত জমির ঘাস পশুকে দেওয়া যাবে না। পারা ঘাস কিছু ভারী ধাতু শোষণ করতে সক্ষম—এটি দূষিত মাটি পরিষ্কারের গবেষণায় সুবিধাজনক হলেও গোখাদ্য হিসেবে ঝুঁকিপূর্ণ।
খনিজ ভারসাম্য
পারা ঘাসে অক্সালেট থাকতে পারে। বিশেষ করে ঘোড়াকে দীর্ঘদিন একমাত্র খাদ্য হিসেবে ঘন পারা ঘাস খাওয়ালে ক্যালসিয়াম বিপাকের সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা উল্লেখ করা হয়েছে। গরু-মহিষের ক্ষেত্রেও একক খাদ্যের পরিবর্তে সুষম রেশন দেওয়া নিরাপদ।
পশু অসুস্থ হলে
অতিরিক্ত লালা, পেট ফাঁপা, শ্বাসকষ্ট, দুর্বলতা, খিঁচুনি, অস্বাভাবিক মল বা হঠাৎ খাবার বন্ধ করলে সঙ্গে সঙ্গে সন্দেহজনক ঘাস সরিয়ে নিবন্ধিত প্রাণিচিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। নিজে থেকে ওষুধ প্রয়োগ করা উচিত নয়।
১৯. ড. বায়েজিদ মোড়লের পরামর্শ
১. পতিত নিচু জমিকে সম্পদে পরিণত করুন: পুকুরপাড়, মাছের ঘেরের আইল এবং মৌসুমি জলাবদ্ধ জমিতে পারা ঘাস উৎপাদন করলে একই জমি থেকে মাছ ও গোখাদ্য—দুই ধরনের সুবিধা পাওয়া সম্ভব।
২. জাত শনাক্ত করে কাটিং সংগ্রহ করুন: পারা, জার্মান, দল ও অন্যান্য জলজ ঘাস অনেক সময় ভুল নামে বিক্রি হয়। বিশ্বস্ত সরকারি প্রতিষ্ঠান, গবেষণাকেন্দ্র বা পরিচিত খামার থেকে রোগমুক্ত কাটিং নিন।
৩. ৪০–৫০ দিনের মধ্যে কাটুন: অতিরিক্ত লম্বা ও ভারী ঘাস মানেই বেশি পুষ্টি নয়। বয়স বাড়লে কাণ্ড ও আঁশ বাড়ে, কিন্তু আমিষ, গ্রহণযোগ্যতা ও হজমযোগ্যতা কমে।
৪. শুধু পারা ঘাসের ওপর নির্ভর করবেন না: গবাদিপশুকে পারা ঘাসের সঙ্গে খড়, ডালজাতীয় ঘাস, দানাদার খাদ্য, খনিজ ও লবণ দিতে হবে।
৫. মাটি পরীক্ষা ছাড়া অতিরিক্ত ইউরিয়া নয়: বেশি ইউরিয়া গাছকে দ্রুত সবুজ করলেও রোগ, উৎপাদন ব্যয়, মাটি-পানি দূষণ এবং খাদ্যমানের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
৬. মাছের পুকুরের পলি বিজ্ঞানের ভিত্তিতে ব্যবহার করুন: পলি পুষ্টিসমৃদ্ধ হলে সারের ব্যয় কমতে পারে। কিন্তু অ্যান্টিবায়োটিক, রাসায়নিক বা ভারী ধাতুতে দূষিত পলি গোখাদ্যের জমিতে ব্যবহার করা উচিত নয়।
৭. কীটনাশককে শেষ ব্যবস্থা হিসেবে রাখুন: ঘাস পশু খাবে—এ কথা মাথায় রেখে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনাকে অগ্রাধিকার দিন এবং অপেক্ষাকাল শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঘাস কাটবেন না।
৮. জলাভূমিতে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ছড়াবেন না: পারা ঘাসের ভাঙা কাণ্ড পানির সঙ্গে ছড়িয়ে নালা, খাল বা প্রাকৃতিক জলাভূমিতে আগাছা সৃষ্টি করতে পারে। জমির সীমানার বাইরে ছড়িয়ে পড়া রানার নিয়মিত কেটে দিন।
৯. খামারভিত্তিক হিসাব সংরক্ষণ করুন: জমির আয়তন, সার ও শ্রম খরচ, কাটার তারিখ, প্রতিবারের ফলন এবং পশুর দুধ বা ওজনের পরিবর্তন লিখে রাখুন। এতে প্রকৃত লাভ-ক্ষতি বোঝা যাবে।
১০. বড় জমিতে চাষের আগে পরীক্ষামূলক প্লট করুন: স্থানীয় মাটি, পানি ও আবহাওয়ায় পারা ঘাস কেমন ফলন দেয় তা জানতে প্রথমে ৫–১০ শতক জমিতে চাষ করুন।
২০. পারা ঘাস চাষের সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা
| সুবিধা | সীমাবদ্ধতা |
|---|---|
| জলাবদ্ধ ও স্যাঁতসেঁতে জমিতে জন্মে | দীর্ঘ খরা সহ্যক্ষমতা কম |
| বহুবর্ষজীবী এবং দ্রুত বিস্তার লাভ করে | শীতে বৃদ্ধি কমে যায় |
| কচি অবস্থায় সুস্বাদু ও পুষ্টিকর | বয়স বাড়লে কাণ্ড শক্ত ও আঁশযুক্ত হয় |
| কাটিং দিয়ে সহজে রোপণ করা যায় | নিয়ন্ত্রণ না করলে আগাছায় পরিণত হতে পারে |
| পুকুরপাড় ও ঢালের মাটি ধরে রাখে | জলাশয়ে ছড়িয়ে স্থানীয় উদ্ভিদ ঢেকে ফেলতে পারে |
| বারবার ঘাস সংগ্রহ করা যায় | এককভাবে পূর্ণাঙ্গ সুষম খাদ্য নয় |
| রোগ-পোকায় সাধারণত কম ক্ষতিগ্রস্ত | অতিরিক্ত আর্দ্রতা ও ঘনত্বে ছত্রাক বাড়তে পারে |
শেষ কথা
বাংলাদেশের জলাবদ্ধ, স্যাঁতসেঁতে ও নিচু জমিতে সারা বছর সবুজ গোখাদ্য উৎপাদনের জন্য পারা ঘাস অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। এটি বিশেষ করে গরু ও মহিষের খামার এবং মাছ–গবাদিপশু সমন্বিত উৎপাদনব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সফল চাষের জন্য শুধু ঘাস লাগালেই হবে না; রোগমুক্ত কাটিং, সঠিক দূরত্ব, পরিমিত সার, সময়মতো কাটিং এবং নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। পরিকল্পিতভাবে চাষ করলে পারা ঘাস খামারের খাদ্যব্যয় কমাতে এবং অনাবাদি নিচু জমির উৎপাদনশীল ব্যবহার বাড়াতে পারে।























