বাংলাদেশে পাকচং ঘাস চাষ: ইতিহাস, বৈশিষ্ট্য, চাষপদ্ধতি, রোগবালাই ও নিরাপদ ব্যবহারের পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা।।
ড. বায়েজিদ মোড়লের গবেষণাধর্মী প্রতিবেদন।।

বাংলাদেশের গবাদিপশু খাতে সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো সারা বছর পর্যাপ্ত পুষ্টিকর সবুজ ঘাসের সরবরাহ নিশ্চিত করা। জমির স্বল্পতা, গোখাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং প্রচলিত ঘাসের তুলনামূলক কম উৎপাদনের কারণে খামারিরা এখন উচ্চফলনশীল ঘাসের দিকে ঝুঁকছেন। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ব্যাপক পরিচিতি পাওয়া এমন একটি ঘাস হলো পাকচং-১ বা পাকচং ঘাস।
এটি দ্রুত বেড়ে ওঠে, প্রচুর কুশি দেয় এবং সঠিক বয়সে কাটলে গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার জন্য সুস্বাদু ও পুষ্টিকর খাদ্য হতে পারে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর ফলন ও প্রোটিন নিয়ে বহু অতিরঞ্জিত প্রচারও রয়েছে। তাই পাকচং চাষের আগে জাতের বিশুদ্ধতা, জমির উর্বরতা, কাটার বয়স, সুষম সার প্রয়োগ এবং নিরাপদ খাওয়ানোর নিয়ম জানা জরুরি।
পাকচং ঘাস কী?
পাকচং-১ মূলত একটি উন্নতজাতের হাইব্রিড নেপিয়ার ঘাস। ইংরেজিতে এটি Pakchong-1, Super Napier বা Hybrid Napier নামে পরিচিত।
পুরোনো বৈজ্ঞানিক নামের ভিত্তিতে একে সাধারণত বলা হয়: Pennisetum purpureum × Pennisetum glaucum
বর্তমান উদ্ভিদ শ্রেণিবিন্যাসে সংশ্লিষ্ট নাম: Cenchrus purpureus × Cenchrus americanus
অর্থাৎ আফ্রিকান নেপিয়ার বা এলিফ্যান্ট ঘাসের সঙ্গে পার্ল মিলেট বা বাজরা জাতীয় ঘাসের সংকরায়ণ থেকে এর উৎপত্তি। হাইব্রিড হওয়ায় এটি সাধারণত কার্যকর বীজ উৎপাদন করে না; তাই মূলের অংশ বা কাণ্ডের কাটিং দিয়ে বংশবিস্তার করা হয়।

পাকচং ঘাসের উৎপত্তির ইতিহাস
পাকচং-১ থাইল্যান্ডে উদ্ভাবিত একটি উচ্চফলনশীল ঘাস। থাইল্যান্ডের প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন বিভাগের সঙ্গে যুক্ত প্রাণিপুষ্টিবিদ ও উদ্ভিদ প্রজননবিদ ড. ক্রাইলাস কিয়োথং এই জাতটি উদ্ভাবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনের সরকারি পশুপালনবিষয়ক প্রকাশনায় উল্লেখ রয়েছে। থাইল্যান্ডের নাখন রাতচাসিমা প্রদেশের পাকচং এলাকায় জাতটির উন্নয়ন ও মূল্যায়ন হওয়ায় এর নাম দেওয়া হয় পাকচং-১। পরবর্তী সময়ে এটি ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কা, ভারত, বাংলাদেশ, কেনিয়া এবং অন্যান্য উষ্ণমণ্ডলীয় দেশে ছড়িয়ে পড়ে। Philippine Carabao Center এবং Thailand Department of Livestock Development পাকচং-১ উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনাবিষয়ক তথ্য প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশে পাকচং ঘাস চাষের ইতিহাস
বাংলাদেশে পাকচং-১ ঠিক কোন বছর, কোন প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির মাধ্যমে প্রথম আনা হয়েছিল—এ বিষয়ে এখনো নির্ভরযোগ্য ও সুস্পষ্ট সরকারি দলিল সহজলভ্য নয়। ফলে প্রচলিত কোনো ব্যক্তিগত দাবি যাচাই না করে “প্রথম আমদানিকারক” বা “প্রথম চাষি” নির্ধারণ করা ঠিক হবে না। তবে গবেষণাপত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, অন্তত ২০১৯–২০২০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে গবেষণার জন্য পাকচং ঘাস চাষ করা হচ্ছিল। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট—BLRI এবং কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের গবেষকেরা পাকচং ঘাসের কাটার বয়স, উচ্চতা, পুষ্টিমান ও গবাদিপশুর বৃদ্ধির ওপর গবেষণা করেছেন।
২০২১ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশি গবেষণায় পাকচং-১ ও BLRI উদ্ভাবিত BN-3 ঘাস তুলনা করা হয়। সেখানে দেখা যায়, পাকচং-১ তুলনামূলক বেশি কাণ্ডের ব্যাস, পাতার অনুপাত ও ক্রুড প্রোটিন উৎপাদন করতে পারে এবং প্রায় ৬০ দিনের কাটিং ব্যবধানে ভালো ফল দেয়। ২০২৫ সালের আরেকটি গবেষণায় পাতার বয়স ও কাটার উচ্চতা অনুযায়ী পাকচং ঘাসের পুষ্টিমান এবং গরুর বৃদ্ধির পরিবর্তন মূল্যায়ন করা হয়েছে। PubMed গবেষণা
বর্তমানে দেশের ঢাকা, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, সাভার, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, খুলনা, যশোর, রংপুর, রাজশাহীসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ডেইরি ও গরু মোটাতাজাকরণ খামারে পাকচং চাষ সম্প্রসারিত হয়েছে।
পাকচং ঘাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য
১. দ্রুত বৃদ্ধি
অনুকূল আবহাওয়া, পর্যাপ্ত পানি ও সার পেলে এটি দ্রুত লম্বা হয় এবং কাটার পর গোড়া থেকে নতুন কুশি বের হয়।
২. বহুবর্ষজীবী
একবার ভালোভাবে জমি প্রতিষ্ঠিত হলে পরিচর্যার ওপর নির্ভর করে কয়েক বছর একই জমি থেকে ঘাস সংগ্রহ করা যায়। তবে সময়ের সঙ্গে গাছ দুর্বল, রোগাক্রান্ত বা অতিরিক্ত ফাঁকা হলে নতুনভাবে রোপণ করা উত্তম।

৩. উচ্চ জৈবভর উৎপাদন
সাধারণ ঘাসের তুলনায় পাকচং থেকে বেশি সবুজ জৈবভর পাওয়া সম্ভব। কিন্তু ফলন নির্ভর করে:
- মাটির উর্বরতা;
- রোপণের দূরত্ব;
- সেচ ও নিষ্কাশন;
- সার প্রয়োগ;
- কাটার বয়স;
- মৌসুম;
- জাতের বিশুদ্ধতা;
- আগাছা ও রোগ ব্যবস্থাপনার ওপর।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একরপ্রতি ১৫০–২০০ টন বা তারও বেশি ফলনের দাবি পাওয়া যায়। এসব সংখ্যা সব অঞ্চল ও ব্যবস্থাপনায় নিশ্চিত নয়। ফলনের হিসাব দেওয়ার সময় এক কাটার ফলন, বার্ষিক ফলন, একর ও হেক্টর—কোন একক ব্যবহার করা হয়েছে তা যাচাই করতে হবে।
৪. মোটা ও রসালো কাণ্ড
এর কাণ্ড সাধারণ নেপিয়ারের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে মোটা ও রসালো হয়। কাণ্ড বেশি শক্ত হওয়ার আগেই কাটলে পশু সহজে খেতে পারে।
৫. বেশি পাতা ও কুশি
সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় গোড়া থেকে বহু কুশি বের হয়। কম বয়সে পাতার অনুপাত বেশি থাকে; বয়স বাড়ার সঙ্গে কাণ্ড, আঁশ ও লিগনিন বেড়ে যায়।
৬. ভালো খাদ্যগ্রহণযোগ্যতা
কচি অবস্থায় কেটে ছোট করে দিলে গরু-মহিষ সাধারণত আগ্রহের সঙ্গে খায়। অতিরিক্ত পরিপক্ব ঘাসে কাণ্ড শক্ত হওয়ায় পশু পাতা বেছে খেয়ে কাণ্ড ফেলে দিতে পারে।
৭. পুষ্টিমান
পাকচং ঘাসে ক্রুড প্রোটিনের পরিমাণ বয়স, সার, মাটি এবং পাতার অনুপাত অনুযায়ী ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়। কচি ও পাতাবহুল ঘাসে শুষ্ক পদার্থের ভিত্তিতে তুলনামূলক বেশি প্রোটিন পাওয়া যায়। কিন্তু সব অবস্থায় “১৬–১৮ শতাংশ প্রোটিন” পাওয়া যাবে—এ দাবি বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক নয়। ঘাসের বয়স বাড়লে সাধারণত:
- মোট সবুজ ফলন বাড়ে;
- শুষ্ক পদার্থ বাড়ে;
- আঁশ ও লিগনিন বাড়ে;
- প্রোটিনের হার কমে;
- হজমযোগ্যতা কমতে পারে।
গবেষণায় ৬০ দিনের ঘাসে প্রায় ৫৫.৭১ টন/হেক্টর এবং ৭০ দিনের ঘাসে প্রায় ৫৯.৯১ টন/হেক্টর পর্যন্ত একক কাটার সবুজ জৈবভর পাওয়া গেছে; তবে এগুলো নির্দিষ্ট পরীক্ষার ফল—বাংলাদেশের সব জমির নিশ্চয়তাপ্রাপ্ত ফলন নয়। Pakchong-1 productivity study
বাংলাদেশের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ
পাকচং উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ায় ভালো জন্মে। বাংলাদেশের অধিকাংশ অঞ্চল এর চাষের উপযোগী। উপযুক্ত শর্ত হলো:
- তাপমাত্রা প্রায় ২০–৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস;
- পর্যাপ্ত সূর্যালোক;
- দোআঁশ, বেলে দোআঁশ বা এঁটেল দোআঁশ মাটি;
- জৈব পদার্থসমৃদ্ধ উর্বর জমি;
- মাটির pH আনুমানিক ৫.৫–৭.৫;
- পানি সেচ ও দ্রুত পানি নিষ্কাশনের সুবিধা।
জলাবদ্ধ জমিতে গোড়া ও শিকড় পচে যেতে পারে। আবার দীর্ঘ খরায় সেচ না দিলে বৃদ্ধি ও কুশির সংখ্যা কমে যায়।
রোপণের সময়
বাংলাদেশে সাধারণত ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রোপণ করা যায়, যদি সেচ বা প্রয়োজনীয় মাটির আর্দ্রতা থাকে। সবচেয়ে সুবিধাজনক সময়:
- ফেব্রুয়ারি–এপ্রিল: সেচের ব্যবস্থা থাকলে;
- মে–জুলাই: বৃষ্টির শুরুতে;
- আগস্ট–সেপ্টেম্বর: উঁচু ও জলাবদ্ধতামুক্ত জমিতে।
অতিবৃষ্টি, স্থায়ী জলাবদ্ধতা বা শীতের তীব্র সময়ে নতুন চারা প্রতিষ্ঠা দুর্বল হতে পারে।
জমি প্রস্তুতি
১. জমি ৩–৪টি গভীর চাষ দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করতে হবে।
২. আগাছা, পুরোনো শিকড় ও ফসলের রোগাক্রান্ত অবশিষ্টাংশ সরাতে হবে।
৩. শেষ চাষের সময় ভালোভাবে পচানো গোবর বা কম্পোস্ট মেশাতে হবে।
৪. নিচু জমিতে উঁচু বেড ও নিষ্কাশন নালা তৈরি করতে হবে।
৫. বড় জমিতে শ্রমিক ও ঘাস পরিবহনের জন্য চলাচলের রাস্তা রাখতে হবে।
রোপণ উপকরণ নির্বাচন
বিশুদ্ধ, রোগমুক্ত এবং ভালো ফলন দেওয়া মাতৃগাছ থেকে কাণ্ড সংগ্রহ করতে হবে। ভালো কাটিংয়ের বৈশিষ্ট্য:
- কাণ্ড পরিপক্ব কিন্তু অতিরিক্ত বয়স্ক নয়;
- রোগের দাগ, পচন বা পোকা নেই;
- প্রতিটি কাটিংয়ে ২–৩টি সুস্থ গিঁট আছে;
- কাটার পর দ্রুত রোপণ করা হবে;
- শুকিয়ে যাওয়া বা অজানা উৎসের কাটিং ব্যবহার করা হবে না।
কাটিংয়ের একটি বা দুটি গিঁট মাটির নিচে এবং অন্তত একটি গিঁট মাটির কাছাকাছি রেখে তির্যকভাবে রোপণ করা যায়। মূলসহ কুশি দিয়েও রোপণ করা সম্ভব।
রোপণের দূরত্ব
জমির উর্বরতা ও ব্যবস্থাপনার ওপর ভিত্তি করে দূরত্ব নির্ধারণ করা উচিত। প্রচলিতভাবে ব্যবহার করা যায়:
- সারি থেকে সারি: ৬০–৯০ সেন্টিমিটার;
- গাছ থেকে গাছ: ৪০–৬০ সেন্টিমিটার।
নিবিড় উৎপাদনে ৫০ × ৪০ সেন্টিমিটার দূরত্ব নিয়ে গবেষণা হয়েছে। আবার যান্ত্রিক পরিচর্যা, মোটা কাণ্ড বা বেশি কুশির জন্য দূরত্ব কিছুটা বাড়ানো যায়। খুব ঘন করে লাগালে বাতাস চলাচল কমে রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
সার ব্যবস্থাপনা
পাকচং উচ্চফলনশীল হওয়ায় মাটি থেকে প্রচুর নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়ামসহ অন্যান্য পুষ্টি গ্রহণ করে। তাই শুধু ইউরিয়া দিয়ে দীর্ঘদিন ভালো ফলন ধরে রাখা যায় না। সার প্রয়োগের মূলনীতি:
- প্রথমে সম্ভব হলে মাটি পরীক্ষা;
- জমি তৈরির সময় পচা গোবর বা কম্পোস্ট;
- প্রয়োজনমতো ফসফরাস, পটাশ, সালফার ও অন্যান্য পুষ্টি;
- ইউরিয়া কয়েক কিস্তিতে প্রয়োগ;
- প্রতিবার কাটার পর সেচ দিয়ে প্রয়োজনীয় টপ ড্রেসিং;
- বছরে অন্তত একবার জৈবসার দিয়ে মাটির গঠন বজায় রাখা।
একটি সাধারণ প্রারম্ভিক ধারণা হিসেবে প্রতি একরে প্রায় ৪–৬ টন পচা গোবর ব্যবহার করা যেতে পারে। রাসায়নিক সারের নির্দিষ্ট মাত্রা মাটির পরীক্ষা, পূর্ববর্তী ফসল এবং প্রত্যাশিত ফলনের ভিত্তিতে উপজেলা কৃষি অফিস বা প্রাণিসম্পদ বিভাগের পরামর্শে নির্ধারণ করতে হবে। অতিরিক্ত ইউরিয়া দিলে ঘাস দ্রুত বড় হলেও কাণ্ড নরম ও দুর্বল হতে পারে এবং ঘাসে নাইট্রেট জমার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
সেচ ও পানি নিষ্কাশন
রোপণের পর মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা না থাকলে হালকা সেচ দিতে হবে। শুকনা মৌসুমে মাটির ধরন অনুযায়ী ৭–১৫ দিন পরপর সেচ প্রয়োজন হতে পারে। প্রতিবার কাটার পর সার প্রয়োগ করে সেচ দিলে নতুন কুশি দ্রুত বের হয়। বর্ষাকালে সেচের চেয়ে পানি নিষ্কাশন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জমিতে দীর্ঘ সময় পানি দাঁড়িয়ে থাকলে:
- শিকড় পচে যায়;
- কুশি কমে যায়;
- গাছ হলুদ হয়ে পড়ে;
- ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগের ঝুঁকি বাড়ে।
আগাছা নিয়ন্ত্রণ
রোপণের প্রথম ৩০–৪৫ দিন আগাছা নিয়ন্ত্রণ খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে এক বা দুইবার নিড়ানি দিতে হবে। ঘাস প্রতিষ্ঠিত হয়ে ছায়া তৈরি করলে আগাছার চাপ কমে যায়। আগাছানাশক ব্যবহারের আগে মনে রাখতে হবে, এটি পশুখাদ্যের ফসল। তাই অনুমোদিত বালাইনাশক, অপেক্ষমাণ সময় ও পশুখাদ্যে ব্যবহারের নিরাপত্তা যাচাই না করে কোনো রাসায়নিক প্রয়োগ করা উচিত নয়।
ঘাস কাটার সময় ও পদ্ধতি
প্রথম কাটিং সাধারণত রোপণের প্রায় ৭০–৯০ দিন পর করা যায়। পরবর্তী কাটিং মৌসুম, বৃদ্ধি ও পুষ্টির লক্ষ্যের ওপর নির্ভর করে প্রায় ৪৫–৬০ দিন পরপর করা যায়। বাংলাদেশি গবেষণায় দেখা গেছে, খুব বেশি বয়স পর্যন্ত রেখে না দিয়ে পাতার পর্যায় বিবেচনা করে কাটলে পুষ্টিমান এবং গরুর বৃদ্ধি ভালো হয়। ২০২৫ সালের গবেষণায় প্রায় ছয় পাতার পর্যায়ে এবং মাটি থেকে প্রায় ১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে কাটার ব্যবস্থাটি পুষ্টিমান, খাদ্য রূপান্তর এবং গরুর বৃদ্ধির জন্য উপযোগী পাওয়া গেছে। Animals journal study
ঘাস খুব নিচ থেকে কাটলে:
- গোড়ার বৃদ্ধি-কুঁড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে;
- সঞ্চিত খাদ্য কমে যেতে পারে;
- পরবর্তী কুশি আসতে দেরি হয়;
- গোড়ায় পানি জমে পচনের ঝুঁকি বাড়ে।
পশুকে খাওয়ানোর নিয়ম
পাকচং ঘাস সরাসরি না দিয়ে সাধারণত ২–৪ সেন্টিমিটার টুকরা করে খাওয়ানো ভালো। এতে পশু বেছে খাওয়া ও অপচয় কমায়। নিরাপদ ব্যবহারের নিয়ম:
- নতুন ঘাস ধীরে ধীরে খাদ্যতালিকায় যোগ করুন;
- একমাত্র খাদ্য হিসেবে শুধু পাকচং দেবেন না;
- খড়, সাইলেজ, লেগুম ঘাস এবং প্রয়োজনীয় দানাদার খাদ্যের সঙ্গে দিন;
- কাদাযুক্ত, পচা বা ছত্রাকধরা ঘাস দেবেন না;
- সার বা বালাইনাশক প্রয়োগের পর নির্ধারিত অপেক্ষমাণ সময় মানুন;
- হঠাৎ বৃষ্টি পাওয়া খরাপীড়িত জমির অতি কচি ঘাস পরীক্ষা ছাড়া বেশি পরিমাণে দেবেন না;
- দুধাল বা দ্রুত বর্ধনশীল পশুর রেশন প্রাণিপুষ্টিবিদের মাধ্যমে তৈরি করুন।
একটি পশুকে কত কেজি সবুজ ঘাস দিতে হবে তা শুধু “প্রতি গরু” ধরে নির্ধারণ করা উচিত নয়। পশুর ওজন, বয়স, দুধ উৎপাদন, গর্ভাবস্থা এবং ঘাসের শুষ্ক পদার্থ বিবেচনা করতে হবে। সাধারণভাবে গবাদিপশুর দৈনিক মোট শুষ্ক পদার্থের প্রয়োজন জীবন্ত ওজনের প্রায় ২–৩ শতাংশ হতে পারে।
সাইলেজ তৈরি
বর্ষাকাল বা দ্রুত বৃদ্ধির সময়ে অতিরিক্ত পাকচং ঘাস সাইলেজ করে সংরক্ষণ করা যায়। সাইলেজ তৈরির জন্য:
১. ঘাস উপযুক্ত বয়সে কাটুন।
২. ২–৩ সেন্টিমিটার করে কুচি করুন।
৩. ঘাসে পানি বেশি থাকলে কয়েক ঘণ্টা ছায়ায় ঝরিয়ে নিন।
৪. প্রয়োজন হলে ভুট্টা, শুকনা খড়ের গুঁড়া বা মোলাসেস মিশিয়ে শর্করা ও শুষ্ক পদার্থ সমন্বয় করুন।
৫. ড্রাম, ব্যাগ বা পিটে স্তরে স্তরে রেখে বাতাস বের করে শক্তভাবে চাপুন।
৬. সম্পূর্ণ বায়ুরোধী করে বন্ধ করুন।
৭. পচা, কালো, দুর্গন্ধযুক্ত বা ছত্রাকধরা সাইলেজ পশুকে দেবেন না।
পাকচং ঘাসের রোগবালাই
পাকচং তুলনামূলক সহনশীল হলেও “কোনো রোগ হয় না”—এমন দাবি সঠিক নয়। নেপিয়ারজাতীয় ঘাসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিচের রোগগুলো দেখা গেছে। তবে সব রোগ বাংলাদেশে পাকচং-১-এ নিশ্চিতভাবে শনাক্ত হয়েছে—এমনটি ধরে নেওয়া যাবে না।
১. পাতায় দাগ রোগ
লক্ষণ:
- পাতায় বাদামি, কালচে বা ধূসর দাগ;
- দাগের চারপাশে হলুদ বলয়;
- দাগ একত্র হয়ে পাতা শুকিয়ে যাওয়া।
করণীয়:
- আক্রান্ত পাতা ও কাণ্ড অপসারণ;
- অতিরিক্ত ঘনত্ব কমানো;
- জমির পানি নিষ্কাশন;
- ওপর থেকে ঘন ঘন পানি না দেওয়া;
- একই যন্ত্র জীবাণুমুক্ত না করে অন্য জমিতে ব্যবহার না করা।
২. কাণ্ড বা গোড়া পচা
লক্ষণ:
- গোড়া নরম ও কালচে হওয়া;
- দুর্গন্ধ;
- গাছ হেলে পড়া;
- কুশি ও শিকড় পচে যাওয়া।
করণীয়:
- জমিতে পানি জমতে না দেওয়া;
- আক্রান্ত গোড়া তুলে দূরে নষ্ট করা;
- কাটিং নেওয়ার সময় পচা কাণ্ড বাদ দেওয়া;
- অতিরিক্ত জৈবসার বা কাঁচা গোবর সরাসরি গোড়ায় না দেওয়া।
৩. নেপিয়ার স্টান্ট রোগ
এটি ফাইটোপ্লাজমাজনিত রোগ হিসেবে পূর্ব আফ্রিকায় গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করেছে। লক্ষণ:
- গাছের বৃদ্ধি থেমে যাওয়া;
- ছোট ও সরু পাতা;
- অতিরিক্ত কিন্তু দুর্বল কুশি;
- পাতা হলুদ বা বিবর্ণ হওয়া;
- ফলন দ্রুত কমে যাওয়া।
এই রোগের কার্যকর রাসায়নিক চিকিৎসা নেই। আক্রান্ত গাছ গোড়াসহ তুলে নষ্ট করা, রোগমুক্ত কাটিং ব্যবহার এবং বাহক পোকা নিয়ন্ত্রণই প্রধান ব্যবস্থা।
৪. হেড স্মাট
এটি Ustilago kamerunensis নামের ছত্রাকের কারণে হতে পারে। লক্ষণ:
- ফুল বা শীষের স্থানে কালো গুঁড়ার মতো স্পোর;
- কুশি দুর্বল হওয়া;
- গাছের বৃদ্ধি ও ফলন কমে যাওয়া।
করণীয়:
- শীষ বের হওয়ার আগেই নিয়মিত ঘাস কাটা;
- আক্রান্ত গাছ তুলে নষ্ট করা;
- রোগাক্রান্ত জমি থেকে কাটিং সংগ্রহ না করা;
- কাটার যন্ত্র পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করা।
নেপিয়ার হেড স্মাট কোনো কোনো অঞ্চলে ঘাসের ফলন ২৫–৪৬ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ রয়েছে। Napier disease research
ক্ষতিকর পোকামাকড়
পাকচং ঘাসে সম্ভাব্যভাবে দেখা যেতে পারে:
- জাবপোকা;
- পাতাফড়িং;
- শুঁয়োপোকা;
- ঘাসফড়িং;
- উইপোকা;
- কাণ্ডছিদ্রকারী পোকা।
প্রাথমিক ব্যবস্থাপনা:
- নিয়মিত জমি পর্যবেক্ষণ;
- আক্রান্ত অংশ অপসারণ;
- আগাছা পরিষ্কার;
- সুষম সার প্রয়োগ;
- উপকারী পোকা সংরক্ষণ;
- আলো বা ফেরোমন ফাঁদ যেখানে প্রযোজ্য;
- প্রয়োজন হলে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে পশুখাদ্যের জন্য অনুমোদিত বালাইনাশক ব্যবহার।
বালাইনাশক ব্যবহারের পর নিরাপদ অপেক্ষমাণ সময় শেষ হওয়ার আগে ঘাস পশুকে দেওয়া যাবে না।
রোগ না পুষ্টির অভাব—কীভাবে বুঝবেন?
সব হলুদ বা দুর্বল গাছ রোগাক্রান্ত নয়।
| লক্ষণ | সম্ভাব্য কারণ |
|---|---|
| পুরোনো পাতা সমানভাবে হলুদ | নাইট্রোজেনের ঘাটতি |
| পাতার কিনারা পোড়া বা বাদামি | পটাশের ঘাটতি বা লবণাক্ততা |
| গাছ খাটো, পাতা ছোট | পুষ্টির অভাব, স্টান্ট রোগ বা শিকড়ের সমস্যা |
| নিচু অংশে গোড়া পচা | জলাবদ্ধতা বা ছত্রাক |
| পাতায় পৃথক দাগ | ছত্রাক বা ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ |
| পুরো জমি হঠাৎ হলুদ | পানি, সার, মাটির pH বা শিকড়ের সমস্যা |
লক্ষণ দেখে অনুমানের ভিত্তিতে ছত্রাকনাশক না দিয়ে নমুনা নিয়ে উপজেলা কৃষি অফিস, প্রাণিসম্পদ অফিস বা উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব পরীক্ষাগারের সহায়তা নেওয়া উচিত।
ঘাসে নাইট্রেট ও অক্সালেটের ঝুঁকি
অতিরিক্ত নাইট্রোজেন সার, দীর্ঘ খরার পর হঠাৎ বৃষ্টি, কম আলো, অপরিণত ঘাস এবং অন্যান্য পরিবেশগত কারণে নেপিয়ারজাতীয় ঘাসে নাইট্রেট জমতে পারে। শুধু উচ্চ নাইট্রেটযুক্ত ঘাস বেশি পরিমাণে খেলে গবাদিপশু বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে। সম্ভাব্য লক্ষণ:
- দ্রুত বা কষ্টকর শ্বাস;
- কাঁপুনি ও দুর্বলতা;
- মুখে লালা;
- অসংলগ্ন চলাফেরা;
- শ্লেষ্মা নীলচে বা বাদামি হওয়া;
- হঠাৎ পড়ে যাওয়া।
এগুলো জরুরি অবস্থা। সন্দেহ হলে সঙ্গে সঙ্গে ওই ঘাস খাওয়ানো বন্ধ করে পশুচিকিৎসক ডাকতে হবে। নেপিয়ার ঘাসের কারণে মারাত্মক নাইট্রেট বিষক্রিয়ার ঘটনাও গবেষণায় নথিভুক্ত হয়েছে। Feedipedia
নেপিয়ার ঘাসে দ্রবণীয় অক্সালেটও থাকতে পারে। অতিরিক্ত অক্সালেট শরীরে ক্যালসিয়ামের ব্যবহার বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তাই একমাত্র খাদ্য হিসেবে পাকচং না দিয়ে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত করা এবং সুষম রেশনে খাওয়ানো নিরাপদ।
অর্থনৈতিক সম্ভাবনা
পাকচং ঘাস খামারির কয়েকটি বড় ব্যয় কমাতে পারে:
- বাজার থেকে কাঁচা ঘাস কেনা;
- অতিরিক্ত দানাদার খাদ্যের ওপর নির্ভরতা;
- বর্ষায় ঘাসের অপচয়;
- শুষ্ক মৌসুমের খাদ্যসংকট;
- দূর থেকে ঘাস পরিবহন।
তবে শুধু বেশি সবুজ ওজন পাওয়া মানেই বেশি লাভ নয়। লাভ হিসাবের সময় কাটিং, শ্রম, সেচ, সার, পরিবহন, শুষ্ক পদার্থ, পুষ্টিমান এবং পশুর উৎপাদন—সব বিবেচনা করতে হবে।
ড. বায়েজিদ মোড়লের পরামর্শ
১. নাম দেখে নয়, মাতৃজমি দেখে কাটিং কিনুন। বিক্রেতার ফলন ও জাতের দাবি যাচাই করুন।
২. প্রথমে ছোট পরিসরে পরীক্ষামূলক চাষ করুন। এলাকার মাটি ও আবহাওয়ায় ফলন দেখে পরে জমি বাড়ান।
৩. শুধু গাছের উচ্চতা দেখে ফলন বিচার করবেন না। পাতার পরিমাণ, শুষ্ক পদার্থ, প্রোটিন এবং পশুর খাদ্যগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ।
৪. অতিরিক্ত ইউরিয়াকে উৎপাদন বাড়ানোর সহজ পথ ভাববেন না। এতে ব্যয়, মাটির অবক্ষয় ও নাইট্রেটের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
৫. ৪৫–৬০ দিনের মধ্যে অবস্থাভেদে ঘাস কাটুন। বেশি বয়স হলে কাণ্ড শক্ত ও পুষ্টিমান কমে যায়।
৬. মাটি থেকে প্রায় ১০ সেন্টিমিটার রেখে কাটুন। এতে পুনরায় কুশি বের হওয়ার সুযোগ ভালো থাকে।
৭. পাকচংকে একমাত্র খাদ্য করবেন না। খড়, লেগুম, খৈল, দানাদার খাদ্য, লবণ ও খনিজের সঙ্গে সুষম রেশন তৈরি করুন।
৮. বর্ষার উদ্বৃত্ত ঘাস সাইলেজ করুন। এতে শুষ্ক মৌসুমে খাদ্যসংকট ও বাজারের ওপর নির্ভরতা কমবে।
৯. রোগাক্রান্ত জমি থেকে কখনো কাটিং বিক্রি বা সংগ্রহ করবেন না। কাণ্ডের মাধ্যমে রোগ দূরের এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।
১০. হিসাব সংরক্ষণ করুন। প্রতি কাটায় ওজন, সার-শ্রমের খরচ, পশুর দুধ বা ওজন বৃদ্ধি এবং অপচয়ের হিসাব লিখে রাখুন।
১১. ‘সুপার ঘাস’ প্রচারণায় বিভ্রান্ত হবেন না। পাকচং ভালো ঘাস, কিন্তু এটি কোনো জাদুকরী পূর্ণাঙ্গ খাদ্য নয়।
১২. বড় খামারে নিয়মিত ঘাস পরীক্ষা করুন। শুষ্ক পদার্থ, ক্রুড প্রোটিন, NDF, ADF, নাইট্রেট এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অক্সালেট পরীক্ষা করলে সঠিক রেশন তৈরি করা যায়।
শেষ কথা
পাকচং-১ বাংলাদেশের গবাদিপশুর খাদ্যসংকট মোকাবিলায় সম্ভাবনাময় উচ্চফলনশীল ঘাস। দ্রুত বৃদ্ধি, বেশি কুশি, ভালো গ্রহণযোগ্যতা এবং সাইলেজ তৈরির উপযোগিতা এর প্রধান সুবিধা। কিন্তু ভালো ফলনের জন্য প্রয়োজন রোগমুক্ত কাটিং, উর্বর জমি, সুষম সার, পানি নিষ্কাশন, সঠিক বয়সে কাটিং এবং বৈজ্ঞানিক খাদ্য ব্যবস্থাপনা।
পাকচং ঘাসকে দানাদার খাদ্যের সম্পূর্ণ বিকল্প বা সব সমস্যার সমাধান মনে করা যাবে না। সঠিকভাবে চাষ, সংরক্ষণ ও সুষম রেশনে ব্যবহার করা গেলে এটি খামারের উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে দুধ ও মাংস উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।























